[লেখাটি দ্বিজেন শর্মার প্রকাশিতব্য গ্রন্থ সমাজতন্ত্রে বসবাস বইয়ের ভূমিকা।

দ্বিজেন শর্মা এ বইয়ের শিরোনাম দিয়েছেন সমাজতন্ত্রে বসবাস। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা ও বোঝাপড়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সেসবের পরিবর্তনের কথা রয়েছে এ বইয়ের লেখাগুলোয়। ওই সমাজে দীর্ঘ দুই দশক ধরে সপরিবার বসবাসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি সোভিয়েত সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন, তার সবই ওই ব্যবস্থার মধ্যে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার নির্যাস।

সে অর্থে এটি দ্বিজেন শর্মার এক ব্যতিক্রমী বই। এ বইয়ে তিনি নিজের চর্চিত জ্ঞানবিদ্যার বাইরের জগতে পা রেখেছেন, কিন্তু সেই জগৎ তার একটুও অচেনা নয়, বরং দীর্ঘ সময় বসবাসের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে খুব নিবিড়ভাবে চেনা। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বামপন্থা এবং সামগ্রিকভাবে সমাজ-রাজনীতি বাংলা ভাষায় তাত্ত্বিক লেখালেখিই বেশি, সেই সমাজে বসবাসের অভিজ্ঞতার লেখা বইয়ের সংখ্যা খুব কম। তাই এসব বিষয় সম্পর্কে আগ্রহী সাধারণ পাঠকদের জন্য এ বই হবে একটি উপভোগ্য পাঠ। রাজনীতির তত্ত্ব ও প্রয়োগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে যাদের আগ্রহ ও কৌতূহল আছে, এ বই তাদের আরো কৌতূহলী করবে, আরো চিন্তার খোরাক জোগাবে। যারা সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে ভাবেন, পড়াশোনা ও গবেষণা করেন এবং যারা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারাও এ বইতে কিছু গভীর, গুরুতর ও অমীমাংসিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন।]

 

দ্বিজেন শর্মা পরিচিত প্রধানত প্রকৃতিবিদ হিসেবে। অবশ্য কিছু মানুষের কাছে তার প্রধান পরিচয় শিক্ষক, কারণ তিনি কর্মজীবনের শুরুতে এক দশকের বেশি সময় বরিশালে এবং ঢাকার দুটি নামকরা কলেজে শিক্ষকতা করেছিলেন। তার শিক্ষকতার সঙ্গেও প্রকৃতিবিদ্যার সম্পর্ক ছিল। তিনি ছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় তার নামের সঙ্গে প্রকৃতিবিদ, নিসর্গী, বৃক্ষসখা, পরিবেশ বিষয়ক লেখক ইত্যাদি লেখা হয়। তিনি চার্লস ডারউইনকে নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন। তার লেখা বইপত্রের বিষয় গাছ, ফুল, পাখি, উদ্যান ইত্যাদি। বিজ্ঞান শিক্ষা এবং শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও তিনি লেখালেখি করেছেন। লিখেছেন সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়ে; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়েও তার একটি বই আছে।

দ্বিজেন শর্মার আরেক পরিচয় অনুবাদক হিসেবে। এখন বিলুপ্ত দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক ছিলেন তিনি। তার হাতে অনূদিত অনেক বইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক পাঠক পরিচিত। রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি লেখালেখি করেননি বললেই চলে। তার রাজনৈতিক মত ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তার অনেক ভক্ত পাঠকেরও সম্ভবত তেমন কোনো ধারণা নেই। কৌতূহল আছে কিনা, সেটাও আমার পক্ষে বলা কঠিন। তার পাঠকদের বড় অংশই সম্ভবত রাজনৈতিক বিষয়ে আগ্রহী নন কিংবা তারা তাকে প্রকৃতিবিদ হিসেবে জানেন বলে তার কাছ থেকে রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য প্রত্যাশা করেন না। কিন্তু দ্বিজেন শর্মা একজন সংবেদনশীল রাজনীতি-সচেতন মানুষ ছিলেন, তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্য ছিল এবং তিনি লেখার মাধ্যমে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে গেছেন।

২

সমাজতন্ত্রের প্রসঙ্গ এলে অবধারিতভাবে বামপন্থী রাজনীতির কথা আসে, কারণ বামপন্থীরাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সম্ভবত এখনো দেখেন। বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশটি বাম রাজনৈতিক মনোভাবাপন্ন। এ দেশের তত্ত্বচর্চা, শিল্পসাহিত্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বামপন্থী ভাবাদর্শের প্রভাব গভীর। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় নেতাকর্মীর সংখ্যা কম, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতি নৈতিক সমর্থন বোধ করেন, এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। একটা সময় ছিল, যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী, পড়ুয়া ও সংস্কৃতিবান ছাত্র-ছাত্রীরা ছিলেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতা, কর্মী ও সমর্থক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও শ্রদ্ধেয় অংশটি ছিল সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সমর্থক; অনেকে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। পাকিস্তান আমলের মূলধারার রাজনীতিতেও বাম ভাবধারার প্রভাব এত গভীর ছিল যে, সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর নবীন রাষ্ট্রটির জন্য রচিত সংবিধানে যে চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর একটি হলো সমাজতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার।

দ্বিজেন শর্মাও বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজের সেই অংশেরই প্রতিনিধি ছিলেন, যারা সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন লালন করতেন। মার্ক্সবাদী চিন্তা ও আদর্শের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছিল গত শতকের ৫০ দশকে, যখন তিনি আসামের করিমগঞ্জ ও ত্রিপুরার আগরতলায় স্কুল-কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি ওই অঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং এক পর্যায়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সামন্ত-পুঁজিবাদী শোষণ-নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।

অবশ্য কোনো বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হয়ে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি অংশ নেননি। বিদ্যা অর্জন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতি তার আকর্ষণ ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছিল; উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন এবং উচ্চতর পর্যায়ে আরো পড়াশোনা ও গবেষণার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। বরিশালের বিএম কলেজে কিছু সময় শিক্ষকতা করার পর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেই সময়ে ঢাকার ছাত্র-শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-সংস্কৃতিসেবীদের বৃহত্তর অংশের সান্নিধ্যে এসেছিলেন, যারা ছিলেন কম-বেশি বাম ভাবধারার। ১৯৬৪ সালে তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং অচিরেই ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। একাডেমিক পরিমণ্ডলের বাইরে শিল্পসাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জগতের বহু মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠেছিল। ততদিনে তিনি বিভিন্ন সাময়িক পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেছিলেন এবং বিদ্বৎসমাজে কিছুটা পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি জানতেন শিক্ষকতা ধনসম্পদ অর্জনের পেশা নয় এবং কোনো বৈষয়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ছিল না, শিক্ষকই হতে চেয়েছিলেন। ফলে নটর ডেম কলেজে শিক্ষকতার পেশাটি তার বেশ মনঃপূত হয়েছিল। সব মিলিয়ে তার জীবনের এ পর্বটি ছিল বেশ আনন্দময়।

কিন্তু এ সচ্ছল ও সম্মানজনক পেশা, প্রাণবন্ত লেখালেখির জগৎ ও অজস্র বন্ধুবান্ধবের আনন্দময় সান্নিধ্য ছেড়ে ১৯৭৪ সালে অনেকটা হঠাৎ করেই তিনি চলে যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। সিদ্ধান্তটা ছিল আকস্মিক, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন নামের দেশটির প্রতি তার মোহময় আকর্ষণ আকস্মিক ছিল না। 

৩

দ্বিজেন শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের আগস্টে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়কর ক্ষয়ক্ষতির রেশ কাটিয়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ চাঙা ছিল। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছিল, ১৯৭৩ সালে ঘটেছিল বিরাট উল্লম্ফন। ওই বছর চতুর্থবারের মতো আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বাধলে কয়েক মাসের মধ্যেই তেলের দাম বেড়ে যায় ৪০০ শতাংশ। ফলে সোভিয়েত অর্থনীতি অপ্রত্যাশিত মাত্রায় চাঙা হয়ে ওঠে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব সোভিয়েত জনগণের জীবনযাত্রায় বেশ ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাত দশকের ইতিহাসে ১৯৭০ দশক ছিল সবচেয়ে সচ্ছল ও সুখী সময়।

সেই সময়ই দ্বিজেন শর্মা সেই দেশে প্রথম পা রাখেন এবং সোভিয়েত মানুষের মধ্যে সেই সুখী ভাব লক্ষ করে আনন্দিত হয়েছিলেন। এ বইয়ের প্রথম দিকের লেখাগুলোয় সেই সুখী দিনগুলোর বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন প্রথম লেখাটিতেই পাই:

‘সেদিন হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি যেন সূর্য নেমে এসেছে আমার জানালায়। সারা ঘরে আলো। আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। না, সূর্যদেব নন। তিনি বহু দূরের কোনো অন্ধকারে পলাতক। ঘড়িতে সবে রাত দুটো। এ হলো ক্রেনের দীপ্ত চোখ। সশব্দে সে ঘুরছে। তার দীর্ঘ হাতে নির্মীয়মাণ বাড়ির সাজ-সরঞ্জাম। 

‘এত রাতে কাজ! মনে পড়ল, সেদিন এদের গৃহ নির্মাণ-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান দেখছিলাম। গৃহ নির্মাণ মাত্রায় এ দেশের স্থান সারা বিশ্বে প্রথম। তাছাড়া জনসংখ্যার অনুপাতে নির্মিত ফ্ল্যাটের সংখ্যাও সারা দুনিয়ায় নজিরবিহীন। বর্তমানে প্রত্যেক শহরবাসী নাগরিকের জন্য বরাদ্দ বাসস্থানের আয়তন ১১ দশমিক ২ বর্গমিটার। ১৯৭১-৭৫ সালের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আবাসগৃহ নির্মাণের ব্যয় ৭ হাজার ৩৫০ কোটি রুবল এবং তা পূর্ববতী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে ২২ শতাংশ বেশি। এ সময়ে নির্মিত হবে সারা দেশে ১ কোটি ৪০ লাখ ফ্ল্যাট এবং সর্বমোট মেঝের পরিমাণ হবে ৫৮ কোাটি বর্গমিটার, যা ১৯৫০-এর সারা দেশের সমগ্র বা বাসযোগ্য মেঝের পরিমাণের অধিক। এ সঙ্গে আরো ছয় কোটি পরিবারের ঘরবাড়িরও উন্নতি ঘটবে।

‘আমি শুয়ে পড়লাম। তখনো ক্রেন থামেনি।... ক্রেনের চোখে ঘুম নেই, দেহে ক্লান্তি নেই। ইস্পাতের হাতে নির্মিত হচ্ছে মানুষের জন্য সুখ। এক সময় আধো ঘুমে আমার মনে হলো দূরের সেই লক্ষ তারার মিছিল হঠাৎ এগিয়ে আসছে, এগিয়ে আসছে নদী মাঠ পেরিয়ে, দুহাতে অন্ধকার ঠেলে ঠেলে, তারপর থমকে দাঁড়িয়েছে একেবারে আমার মুখোমুখি। না, এখন আর তারারা নেই, আছে অজস্র আলোকিত জানালা, লক্ষ সহাস্য সুখী মুখ।’ (লক্ষ তারার মিছিল)

সোভিয়েত ইউনিয়নের জীবন ব্যবস্থা ও মানুষ সম্পর্কে তার মনে যে ইতিবাচক ধারণা ছিল, সে দেশে পৌঁছার পর তিনি তার পক্ষে সমর্থন খুঁজে পেয়েছিলেন। সে দেশে যা দেখতেন, তা-ই তার ভালো লাগত। সব মানুষকে মনে হতো সহজ, সরল, আন্তরিক, সদালাপী, বন্ধুবৎসল, নিরহংকার, পরোপকারী:

‘আমাদের পাশের ঘরেই থাকেন ইভান নিকোলাইয়েভিচ কারোভ। কারখানার শ্রমিক। সদানন্দ ও লাজুক এ প্রতিবেশীর সহূদয় সাহায্যেই আমাদের তিন পরিবারের গৃহসজ্জা সম্পূর্ণ। তিনি নিজের হাতেই আমাদের কোট ঝোলানোর হ্যাংগার, বাথরুমের আয়না, বারান্দায় কাপড় শুকানোর দড়ি ইত্যাদি সব আটকে দিয়েছেন। এক হায়াৎ মামুদ ছাড়া আমরা কেউই রুশ ভাষা জানি না। তবু হূদয় বিনিময়ে প্রতিবন্ধ নেই। আকার-ইঙ্গিতে ইভানদের আমাদের প্রয়োজন বোঝাই। তারাও বেশ বুঝতে পারেন। ... ইভান-গিন্নি ভালিয়া প্রায়ই আমাদের খোঁজখবর নেন। কোলে তার ন’মাসের মেয়ে ওলিয়া আর সঙ্গে সাত বছরের ছেলে জেনিয়া। মাঝে মাঝে ইভানের গৃহে আমাদের ডাক পড়ে। না গেলে জোর করে টেনে নেন। রুশ খাবার চেখে দেখতে বলেন। তার শাশুড়ি এলে তো কথাই নেই। বিশালদেহী সেই সুদর্শনা প্রৌঢ়া গ্রামের বাড়ি থেকে মেয়ের জন্য বয়ে আনেন টক শসার আচার, জামের জ্যাম, গাছের আপেল, বুনো ব্যাঙের ছাতা। আমরাও ভাগ পাই।’ (লক্ষ তারার মিছিল)

৪&dquote;&dquote;

দ্বিজেন শর্মা সপরিবারে সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলেন দুই দশক। এই দীর্ঘ সময়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র, তার অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থার অনেক দিক তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি ছিলেন ওই ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘ সময় বসবাসকারী একজন সচেতন-সংবেদনশীল মানুষ। ব্যবস্থাটির ভালো-মন্দ, ত্রুটি-বিচ্যুতি বোঝার চেষ্টা করেছেন বাস্তবের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বইপত্র পড়া, চলচ্চিত্র, থিয়েটার ইত্যাদি দেখা, সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করেছেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন লক্ষ করেছেন, চিন্তাভাবনার খবর রেখেছেন। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি করার ফলে সে দেশের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কেও তার প্রত্যক্ষ ধারণা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল।

সমাজতন্ত্র সম্পর্কে এক ধরনের রোমান্টিক দৃষ্টি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে মুগ্ধতাপূর্ণ পূর্বধারণাবশত সোভিয়েত-বাসের বৃহত্তর কালপর্বে ব্যবস্থাটির নেতিবাচক দিকগুলো তার বিচারি দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচভের ক্ষমতালাভ ও তার গ্লাসনস্ত-পিরিস্ত্রোইকা নামক সংস্কার উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর যে  খোলামেলা আলোচনা-সমালোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তা সোভিয়েত জনগণের মতো তাকেও প্রভাবিত করেছিল। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা দৃষ্টি উন্মোচনের মতো: যে সব ভুলত্রুটি, অসঙ্গতি, এমনকি গুরুতর নেতির দিক এত দিন ধরা পড়েনি, পিরিস্ত্রোইকা-পর্বে সেগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তা সত্ত্বেও সমাজতন্ত্রের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি গভীর বিশ্বাসজাত সমর্থন বোধ করার কারণে ব্যবস্থাটিকে তিনি তখন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলোপের কয়েক মাস আগে প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদ বিভাগের কাজ বন্ধ হওয়ার পর তিনি লেখেন:

‘আমার প্রথম অনুবাদ মানব সমাজ পড়ি এবং অবশেষে সেই মোক্ষম জায়গাটুকুতে পৌঁছই: ১৯৮০ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের বস্তুগত ও প্রকৌশলগত ভিত্তি নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে সমগ্র জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় বৈষয়িক ও আত্মিক উপকরণের প্রাচুর্য উচ্ছ্রিত হবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজনানুগ বণ্টনের মহানীতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাবে, অতঃপর ক্রমান্বয়ে সর্বজনীন মালিকার একত্রীভবন ঘটবে। এভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের যথাযথ প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হবে।

‘কথাগুলি সেদিন বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ ছিল বৈকি। পূর্ব-প্রত্যয়ের সঙ্গে এখানকার অনেক কিছুই হুবহু মিলে গিয়েছিল, ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে মেলানোর যুক্তির অভাব ঘটত না। দেশের শ্রেণিহীন আবাসন ব্যবস্থা, নির্ব্যয় শিক্ষা ও চিকিৎসা, শিশুকল্যাণ, চাকরির নিশ্চয়তাসহ সর্বত্র বিরাজমান এক ধরনের সমতার আবহ যেকোনো বিবেকী মানুষকেই মুগ্ধ করত। সাতাত্তর সালে পশ্চিম ইউরোপের ভোক্তা সমাজের পণ্যপ্রাচুর্যে ক’মাস বাস করে এসেও মস্কোর দোকানে খদ্দরের লাইন দেখে বিন্দুমাত্র বিভ্রান্ত হইনি, বরং এই ভেবে স্বস্তি বোধ করেছি যে, সজ্জনের সংসারের মতো সমাজতান্ত্রিক সমাজে আতিশয্যহীনতা ও কিছুটা অনটনই স্বাভাবিক। ফাঁক-ফোকর? ছিল বৈকি। তবে মানুষ তো ঈশ্বর নয় তার সমাজও নিখুঁত হবার নয়।’ (১৭ জুবোফস্কি বুলভার)

দ্বিজেন শর্মা একবার মস্কো থেকে দেশে বেড়াতে এলে বরিশালগামী এক লঞ্চে আলাপ হয়েছিল এক তরুণের সঙ্গে। তরুণটি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সোভিয়েত দেশে আপনার সবচেয়ে কী ভালো লাগে?’ উত্তরে দ্বিজেন শর্মা বলেছিলেন, ‘মানুষে মানুষে ধনবৈষম্যের সবচেয়ে কম ফারাক। এমন আশ্চর্য সমাজ আগে পৃথিবীর কোথাও তৈরি হয়নি, এখনো সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীর বাইরে কোথাও নেই। দেখুন, আমি শিক্ষক ছিলাম। দেশের খুব ভালো কলেজে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। আমার একটাই দুঃখ ছিল, যে দারিদ্র্যের মধ্যে আমার ছাত্রজীবন কেটেছে, সেই জীবনের অংশীদার কাউকেই আমি পড়াতে পারি না। পড়াই শুধু ধনিক শ্রেণীর সন্তানদের। একজন সৎ শিক্ষকের পক্ষে এক বেদনাময় নৈরাশ্যময় অভিজ্ঞতা। তাছাড়া ধনতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষক তো ধনতন্ত্র নিজে। আমরা সেখানে তার একটি যন্ত্র বা আধার মাত্র। সত্যিকার মানবিক শিক্ষা সেখানে অসম্ভব। শোষণকে, অস্তিত্বের অসম লড়াইকে ন্যায়ের রঙিন মুখোশ পরানোই ধনতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষকদের কাজ। সমাজতান্ত্রিক সমাজেই কেবল শিক্ষার সত্যিকার আদর্শ বাস্তবায়িত হতে পারে, শিক্ষক নিজেকে মুক্ত স্বাধীন ও সম্পূর্ণ বলে উপলব্ধি করতে পারেন।’ (পড়ো পড়ো পড়ো)

সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে ছিল সাত দশকের বেশি সময়। যে বলশেভিকরা ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের অনেকের মধ্যে শঙ্কা ছিল রাষ্ট্রটি হয়তো বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। স্বয়ং লেনিন এ শঙ্কা একাধিকবার প্রকাশ করেছিলেন। ১৯২১ সালে তিনি লিখেছিলেন, চারদিকে শত্রু-পরিবেষ্টিত থেকে, পুঁজিবাদী দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যক্ষ বিরুদ্ধতার মুখে সোভিয়েত ইউনিয়ন একা টিকে থাকতে পারবে না, সম্ভবত ১০ বছরও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে টিকে থাকতে হলে ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলোয়ও শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে হবে।’

কিন্তু রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের মতো ঘটনা ইউরোপের আর কোথাও ঘটেনি, অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে ছিল। শুধু টিকেই ছিল না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নািস-ফ্যাসিস্ট চক্রের বিরুদ্ধে বিজয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও ভূরাজনীতির সূচনা ঘটেছিল, সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যুদয় ঘটেছিল দ্বিতীয় পরাশক্তি হিসেবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শিক ও সামরিক প্রভাবের ফলে পৃথিবী দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জার্মানির পূর্বাংশসহ পূর্ব ইউরোপের অনেকগুলো দেশ মিলে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক বলয়, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে তা তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সমর্থন ও প্রেরণা জুগিয়েছিল।

১৯৮৫ সালের মার্চে মিখাইল গর্বাচভ যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখনো দেশটি প্রবল শক্তিধর পরাশক্তিই ছিল। ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ কোথাও ছিল না। অর্থনৈতিক অবস্থা ১৯৭০ দশকের মতো চাঙা ছিল না বটে, তবে এমন কোনো সংকটও দৃষ্টিগোচর ছিল না, যার ফলে পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যেই ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়া অনিবার্য ছিল। পুঁজিবাদী দুনিয়ায়ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন আকস্মিক পতন কেউ কল্পনা করেনি।

তাই গর্বাচভের গ্লাসনস্ত-পিরিস্ত্রোইকা কর্মসূচির তৃতীয়-চতুর্থ বছরেই পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটির ভেঙে পড়া এবং ১৯৯১ সালের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি বেশ বিস্ময়কর ঘটনা। কারো কারো কাছে ঘটনাটি রহস্যময়, কেউ কেউ মনে করেন এটা একটা বিরাট ষড়যন্ত্রের ফল। ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসীরা মনে করেন, এর জন্য দায়ী মিখাইল গর্বাচভ, তারা তাকে বিশ্বাসঘাতক বলে অভিযুক্ত করেন। গর্বাচভকেই দায়ী মনে করেন, কিন্তু তাকে বিশ্বাসঘাতক বলেন না, এমন একটা পক্ষও আছে। তারা মনে করেন, গর্বাচভ সোভিয়েত ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করতে চেয়েছিলেন, সমাজতন্ত্রের নবায়ন ঘটাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনেক রকমের ভুল পদক্ষেপ নেয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন।

সোভিয়েত ব্যবস্থা কেমন করে, কিসের শক্তিতে ৭৪ বছর ধরে টিকে ছিল এবং কেমন করে, কী কারণে মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ল— এ দুই প্রশ্নের উত্তরে অনেক রকম মতামত প্রচলিত আছে। দীর্ঘ সময় টিকে থাকার আর্থরাজনৈতিক কারণ অনেকেই অনেক তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তির সাহায্যে দেখানোর চেষ্টা করেছেন; কিন্তু অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ধসে পড়ার কারণ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। এ বিতর্কের একটা কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ হলো সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কারযোগ্যতা।

মিখাইল গর্বাচভ ও তার সমমনা কমিউনিস্ট নেতারা মনে করতেন, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা অবশ্যই সংস্কারযোগ্য এবং তার ব্যাপক সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। সোভিয়েত জনগণের বৃহত্তর অংশের মধ্যেও এ প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল। তাই গর্বাচভ যখন গ্লাসনস্ত-পিরিস্ত্রোইকা নামক সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, তখন তা জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে ও পশ্চিমা বিশ্বের বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ, যারা মনে করতেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ছিল একটি অশুভ ও মানব সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর ব্যবস্থা, তাদের দাবি ছিল, ব্যবস্থাটি সংস্কারযোগ্য ছিল না। সে কারণেই সংস্কার করতে গিয়ে সেটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে দ্বিজেন শর্মার লেখার কোথাও কোথাও জিজ্ঞাসার দেখা মেলে। যেমন ‘আমাদের চোখের সামনেই সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের গর্বোদ্ধত প্রাসাদটি ধসে পড়ল এবং অত্যন্ত দ্রুত, সংক্ষিপ্ততম কালপরিসরে। কেউ তার গায়ে একটা ঢিলও মারেনি। কোনো শ্রমিক, কোনো কৃষক, কোনো ছাত্র কেউ না। ধসে গেল ভেতর থেকে, বিরুদ্ধ স্বভাবের সব ধাতু দিয়ে তৈরি উপকথাকল্প মহার্ঘ্য সেই জাহাজের মতো। তবে কি সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের কাঠামোর মালমসলায় অঢেল বৈরগর্ভ উপাদানের মিশেল ছিল? প্রাজ্ঞ নির্মাতারা কি এগুলি সঠিকভাবে শনাক্ত না করেই চোখ-ধাঁধানো একটা ব্যাপার ঘটাতে চেয়েছিলেন? (পালাবে কোথায়)

সংবাদপত্রে আমার এক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘৭০ বছর রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র টিকে ছিল প্রথমে বিপ্লব থেকে উৎপাদিত শক্তি ও জনগণের প্রবল আশাবাদের কল্যাণে, শেষে রাষ্ট্রশক্তির কঠোরতম নিয়ন্ত্রণে। কালে কালে প্রথম দুটি উবে যায়, থাকে শুধু শেষেরটি। সমাজে ব্যাপক দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে, আমলাতান্ত্রিকতার দরুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিপ্লবের সুফল কুড়োতে ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাশিয়া ব্যর্থ হয়। টফলারের মতে, সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-সম্পর্ক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে বাধা হয়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের সঙ্গে পুরনোদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে, গর্বাচভ সমাজতন্ত্র সংস্কারে উদ্যোগী হন, কিন্তু ততদিনে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষয়ে গিয়েছিল, তাই সংস্কার আর সম্পন্ন হলো না, ভেঙে পড়ল গোটা কাঠামো।’

কিছু মানুষ সোভিয়েত ব্যবস্থার কিছু ঘাটতি, দুর্বলতা ও বিকার লক্ষ করেন, কিন্তু সেসবের জন্য অক্টোবর বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী বলশেভিক নেতাদের বা তাদের উত্তরসূরিদের দায়ী করতে চান না, বরং ওই ব্যবস্থার বাইরের কিছু বিষয়কে দায়ী করেন। যেমন তারা বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তরাধিকারসূত্রে এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিতের ওপর গড়ে উঠেছিল, যেখানে একটি পরিকল্পিত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি ছিল না। জারতান্ত্রিক রাশিয়া ছিল ইউরোপের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম এবং সেখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার সহায়ক ছিল না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত বৈরী। পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রবল বিরুদ্ধতার ফলে সোভিয়েত রাষ্ট্র একদম গোড়া থেকেই ত্রুটিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে। এর জন্মই ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং যতদিন পশ্চিমা পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়ার বিরুদ্ধতা অব্যাহত থেকেছে, ততদিন পর্যন্ত সোভিয়েত রাষ্ট্র তার সেসব জন্মগত ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের মতে, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রধান ত্রুটি এই যে, সেখানে অত্যন্ত প্রবল ও সর্বাত্মক এক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল, যা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিপরীত। সেই রাষ্ট্রকে গড়তে হয়েছিল এক সুবিশাল সামরিক বাহিনী, সেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ভীষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়েছিল গোপন পুলিশি ব্যবস্থার ওপর। অসমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছিল। ভেতরে ভেতরে অপরাধবৃত্তি ও দুর্নীতি বাসা বেঁধেছিল দুরারোগ্য ব্যাধির মতো।

সমাজতন্ত্র সম্পর্কে দ্বিজেন শর্মার একটি বিশেষ মত ছিল, যা প্রণিধানযোগ্য। জীবনের শেষ পর্যায়ে তার মনে হয়েছিল, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্রের মধ্যে একটা মৌলিক সাদৃশ্য আছে এবং সেটা মানব সভ্যতার এক গভীর সমস্যা। তার মতে, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ উভয় ব্যবস্থার লক্ষ্য বস্তুগত উৎপাদনের প্রাচুর্য সৃষ্টি করা। তিনি লিখেছেন, ‘সমাজতন্ত্র ধনতন্ত্রের মতোই শিল্পপ্রধান ও প্রবল কেন্দ্রিকতানুগ সমাজ নির্মাণে প্রয়াসী এবং উৎপাদিকা শক্তির অমেয় বৃদ্ধির মধ্যে, পণ্য-প্লাবনের মধ্যে দ্বন্দ্বহীন সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখে। অতীতের মতো আজও তা ইউটোপিয়াই রয়ে গেল। সোভিয়েত দেশে সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল শুধু লক্ষ্যের সঙ্গে উপায়ের, ব্যষ্টির সঙ্গে সমষ্টির, দূর লক্ষ্যের সঙ্গে আশু লক্ষ্যের দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যর্থতার জন্য নয়, ধনতন্ত্রের মুখ্য চালিকাশক্তি, সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফার বিকল্প খুঁজে না পাওয়ার জন্যও। যৌথত্ব সেই তুলনায় অনেকটা দুর্বল ও গৌণ, যেমনটি অশেষ গুরুত্ব সত্ত্বেও জীববিবর্তনে সহযোগিতা কখনই অস্তিত্বের সংগ্রামের সমকক্ষ হয়ে?ওঠেনি। ঘনীভূত লালসা ইত্যাকার বিশেষণে বহুনিন্দিত এ মুনাফা নামক আদিম বস্তুটি অশুভ ও শুভর এক অদ্ভুত মিশ্রণ এবং প্রবল শক্তিশালী। সমাজতন্ত্র তাকে বাগ মানাতে পারেনি বরং সে সমাজতন্ত্রকেই বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।’

মানুষের ভোগ্য বস্তুর উৎপাদনের উচ্ছ য় ঘটানোর ক্রমবর্ধমান উদ্যম ও প্রচেষ্টা, যা সমাজতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্র উভয় ব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য, তা পৃথিবী নামের গ্রহটির জন্যই এক বিরাট বিপদের বিষয় বলে দ্বিজেন শর্মা উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো পথ তার জানা ছিল না।

৫

সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিল পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে শ্রমজীবী শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার পত্তন ঘটেছিল। দেশটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল সারা পৃথিবীর অনেক মানুষ। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষের কাছে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব ছিল শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রেরণার উৎস। এমনকি শিল্পোন্নত পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বেও বুদ্ধিজীবী সমাজের এক বিরাট অংশের কাছে সোভিয়েত ব্যবস্থা বিবেচিত হয়েছিল মুনাফাতাড়িত ও অমানবিক পুঁজিতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থার শ্রেয় বিকল্প হিসেবে। অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই বিকল্প ব্যবস্থার উদ্বোধন ঘটেছিল বলে তারা মনে করতেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ এবং ১৯২০ দশকের অর্থনৈতিক মহামন্দার ইউরোপীয় পটভূমিতে রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবকে দেখা হয়েছিল এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার সূচনা হিসেবে, যা পুঁজিতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাবে, মুনাফা বৃদ্ধির লাগামহীন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির ব্যবস্থার জায়গায় একটি সমতাপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। পশ্চিমা পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়ার আদর্শবাদী বুদ্ধিজীবীরা সমাজতন্ত্রকে পুঁজিতন্ত্রের চেয়ে শ্রেয় সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তাদের বিবেচনায় পুঁজিতন্ত্র একটি ব্যাধিগ্রস্ত ব্যবস্থা, যার মূল চালিকাশক্তি হলো লোভ, শোষণ ও আধিপত্য আর সমাজতন্ত্রের মর্মকথা হলো সমতা। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক— সব ক্ষেত্রে সামগ্রিক সমতা।

শুধু আদর্শবাদী ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবীরা নন, পশ্চিমের অনেক অর্থনীতিবিদের কাছেও সমাজতন্ত্র পুঁজিতন্ত্রের চেয়ে অধিক কল্যাণকর ও মানবিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তারা এমন এক সমাজ কল্পনা করেছিলেন, যা নিয়ন্ত্রিত হবে সচেতন মানবিক কর্মকাণ্ডের দ্বারা। মানুষের জীবনযাপনের সমুদয় চাহিদা মেটাতে পুঁজিতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থার প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের স্বতঃস্ফূর্ত অনিশ্চয়তা দূর করা হবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দ্বারা। ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করা হবে মুনাফা অর্জনের লক্ষে নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাহায্যে বণ্টনের উদ্দেশে। শ্রেণীহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষে মানুষে সম্পর্ক প্রতিযোগিতামূলক হবে না, হবে সহযোগিতামূলক।

এ রকম একটা সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম বড় আকারের প্রচেষ্টা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। অক্টোবর বিপ্লবের পর সেখানে ক্রমান্বয়ে ভূমিসহ সব সম্পদ এবং কৃষি, শিল্প-কারখানাসহ উৎপাদনের সব উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়েছিল। মুনাফাতাড়িত বাজার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এভাবে একটা শ্রেণীহীন ও সমতাপূর্ণ এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পদ ও বাজার ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধিত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকৃত অর্থে শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা পায়নি। পুঁজিবাদী সমাজের মতো প্রকট শ্রেণীবৈষম্য যদিও ছিল না, তবু একটা অভিজাত শ্রেণী গড়ে ওঠে, যাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা ছিল। শাসন ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল; ‘সোভিয়েত’ বা সর্বসাধারণের সমিতিগুলোর হাতে সব ক্ষমতা ন্যস্ত করার স্লোগান (‘অল পাওয়ার টু দ্য সোভিয়েতস’) শোনানো হয়েছিল বটে, কার্যত সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির আমলাদের হাতে। সোভিয়েত আমলাতন্ত্রে স্বৈরতান্ত্রিক জার আমলের আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিগুলো অনেকটাই অটুট ছিল।

তবে সব সত্ত্বেও সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ইতিবাচক অর্জন হিসেবেই মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুক্ত হবে বলে দ্বিজেন শর্মা মনে করতেন। তিনি লিখেছেন, ‘অক্টোবর বিপ্লব না ঘটলে, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটলে রাশিয়ার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা অবশ্যই এ দেশের মানুষের জন্য অধিকতর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি করতে পারত। বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের শরিক হিসেবে সেও বিশ্ব লুণ্ঠনের বখরা পেত, কিন্তু দুনিয়াজোড়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার এতটা দ্রুত পতন ঘটত কি? পুঁজিতান্ত্রিক দেশের শ্রমিকরা আজকের এতটা সুযোগ-সুবিধা পেতেন কি? অভ্যুদয় ঘটত কি বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের? আজকের কল্যাণ রাষ্ট্র আসলে বিশ্ব বিপ্লবের ভয়তাড়িত পুঁজিতন্ত্রের বাধ্যতামূলক আপস রফার ফল— এমন ভাবনা কি খুবই অবান্তর?’ (ইতিহাসের সরল সত্য)

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতন ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলোপের ঘটনায় দ্বিজেন শর্মা অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। তার কারণ শুধু এই ছিল না যে এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, বরং এ জন্য যে সব ভুলত্রুটি সত্ত্বেও ওই ব্যবস্থাটির প্রতি তার এক ধরনের মোহাবিষ্ট আকর্ষণ ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘পারি কমিউনের পর সত্তর বছর স্থায়ী দ্বিতীয় শ্রমিকরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সারা বিশ্বে শ্রমজীবী মানুষ ও তাদের কল্যাণচিন্তায় নিবিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের মনে যে ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সকল মানুষের জন্য ন্যায়বিচারভিত্তিক ও সাম্যদর্শী সমাজ নির্মাণের চিন্তা সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে অদ্যাবধি মানুষ কখনই ত্যাগ করেনি। এমনটি অত্যুক্তি নয় যে, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র নির্মাণের ব্যর্থতার হেতুগুলোর শিক্ষা ভাবী সমাজ নির্মাতাদের প্রাজ্ঞতর করবে, তাদের নিপুণতর দক্ষতার সাধিত্র জোগাবে, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের সার্থক প্রয়োগের নতুন পথ দেখাবে। বিপ্লবের ব্যর্থতা ও প্রতিবিপ্লবের জয় সর্বদাই নৈরাশ্যের ধূম্রজাল সৃষ্টি করে, কিন্তু কখনই স্থায়ী হয়ে ওঠে না। অগ্রগতির পথ যতই কষ্টার্জিত ও দীর্ঘ হোক, মানুষ কোনো দিন তা থেকে পিছু হটে না।’ (ইতিহাসের সরল সত্য)