নমিতা অরোরা। অনুবাদ: এস এম রশিদ

ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস শহরে একটা জাদুঘর আছে, যার নাম ইন্ডিয়ান ক্যারিবিয়ান মিউজিয়াম। জাদুঘরটি তৈরি হয়েছে এখানকার বেশ কয়েক লাখ ইন্দো-ক্যারিবীয় মানুষের ইতিহাস সংরক্ষণে। এদের পূর্বপুরুষরা ভারত থেকে এ দ্বীপদেশে এসেছিলেন ১৮৩৮ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে। এদের আনা হয়েছিল চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করানোর জন্য। এরা মূলত ক্যারিবিয়ায় আখের খামারে কাজ করতেন। জাদুঘরে অভিবাসীদের জাহাজের বিবরণ, গিরমিটের (শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি) কপি ও ভারতীয় শ্রমিকদের ক্যারিবীয় জীবনের দুর্লভ সব ছবি সংরক্ষিত আছে।

জাদুঘরে আছে কিছু উত্তেজনাকর নিদর্শন: একটা সারঙ্গি, এক জোড়া খড়ম, ভারতের গ্রামে এখনো ব্যবহার হয় এমন ঘূর্ণায়মান আখ মাড়াইয়ের কল, এমনকি শ্রমিকদের ব্যবহূত কুঁড়েঘরের বাস্তবানুগ আকারের একটা মডেল। ইন্দো-ক্যারিবীয় সমাজের উল্লেখযোগ্য নানা ঘটনার ছবিও সংরক্ষিত আছে। ১৯৭০ সালে প্রথম কোনো ইন্দো-ট্রিনি নারী পুলিশে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে ইন্দো-ট্রিনিরা তাদের প্রথম স্কুল স্থাপন করার অনুমতি পায়, যেখানে তারা খ্রিস্টীয় শিক্ষার পরিবর্তে হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষা চালু করার সুযোগ পায়।

ব্রিটিশ সরকার শ্রমিকের জন্য প্রথমে নজর দেয় চীনের দিকে। প্রথম দফায় তারা আড়াই হাজার চীনা শ্রমিক ক্যারিবিয়ায় নিয়ে যায়। কিন্তু এ দীর্ঘ জাহাজ যাত্রা বেশ ব্যয়বহুল ছিল এবং চীনা কর্তৃপক্ষকে ফিরতি টিকিট বুঝিয়ে দিতে হতো। অনেক চীনা শ্রমিক চুক্তির টাকা পরিশোধ করে নিজেই অন্য ব্যবসা শুরু করতেন। এসব খামার মালিকদের জন্য বিরাট ক্ষতি বয়ে আনে। ব্রিটিশরা এবার তাই নিজেদের ভারতীয় উপনিবেশের দিকে দৃষ্টি দেয়। ভারতের আবহাওয়া ত্রিনিদাদের মতোই ছিল এবং এখানে লাখ লাখ গরিব কৃষকও মজুদ ছিল।

ভারত থেকে ত্রিনিদাদে শ্রমিক নিয়ে আসা প্রথম জাহাজটির নাম ছিল ফাতেল রোজাক। পাঁচ মাসের যাত্রা শেষে ১৮৪৫ সালে জাহাজটি ভারত থেকে ত্রিনিদাদে পৌঁছে। এতে যাত্রী ছিল ২২৫ জন ভারতীয়। বেশির ভাগের বয়স বিশের ঘরে। নারীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম, প্রতি আটজনের বেশি পুরুষের জন্য ছিল একজন করে নারী। জাহাজে নারী ও পুরুষদের আলাদা কোয়ার্টারে রাখা হতো। এ জাহাজ থেকে নেমে প্রথম যে ভারতীয় ত্রিনিদাদের মাটিতে পা রেখেছিলেন, তার নাম ভারত স্বরূপ। 

১৯০১ সালের আগে ভারত থেকে ক্যারিবিয়ায় শ্রমিক বহনকারী জাহাজগুলো ছিল পাল তোলা। এরপর আসে বাষ্পীয় জাহাজ (আগ জাহাজ)। এ বাষ্পীয় জাহাজ সাগরযাত্রাকে পাঁচ মাস থেকে তিন মাসে কমিয়ে আনল। ১৮৪৫ থেকে ১৯১৭ সময়কালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ভারতীয় শ্রমিককে ত্রিনিদাদে আনা হয়েছিল, প্রয়োজন হয়েছিল ৩২০টি জাহাজ যাত্রার।

অভিবাসী ভারতীয় শ্রমিকদের বেশির ভাগ এসেছিলেন গাঙ্গেয় সমভূমির ঘনবসতিপূর্ণ বর্তমান উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে। এ শ্রমিকদের অনেকেই কলকাতার মতো কোনো বড় শহর দেখেননি। কলকাতা থেকেই এরা ত্রিনিদাদগামী জাহাজে চড়তেন। এদের ভাষা ছিল মূলত ভোজপুরী। জাহাজে তোলার আগে এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো। পরীক্ষায় উতরাতে না পারলে তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হতো। এ শ্রমিকদের বুড়ো আঙুলের ছাপ ও বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বিবরণী রাখা হতো। বাছাইকৃত শ্রমিকদের নির্দিষ্ট পোশাক দেয়া হতো এবং তাদের বাহুতে একটা ধাতব চাকতি লাগানো হতো; যেমনটা ভারতীয় রেলওয়ের কুলিদের হাতে একসময় দেখা যেত।&dquote;&dquote;

এ সময় ভারতীয় শ্রমিকরা কেন ক্যারিবিয়ায় যেতে আগ্রহী হয়েছিলেন? এর জবাব রয়েছে সে সময়ের ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা করের হার অনেক বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ তখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে। অনেকে আবার নানা অপরাধ করে দেশ ছাড়তে চাইছিল। কেউ পরিবার বা বর্ণ প্রথার নানা দ্বন্দ্ব থেকে বাঁচতে চাইছিল। আর অনেকের আকর্ষণ ছিল নিছক অ্যাডভেঞ্চারে। এছাড়া ১৮৭৬-৭৮ সালে দুর্ভিক্ষে ভারতে বেশ কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এজেন্টরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে তরুণদের ডামরু টাপুতে (ব্রিটিশ গায়ানার কাছে ডেমেরারা দ্বীপ) ভালো বেতনের কাজের আশ্বাস দিত। বেতনের পরিমাণ ছিল ভারতে একই কাজের বেতনের কয়েক গুণ বেশি এবং সেখানে ঘরেরও ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। এ ডামরু দ্বীপ কোথায় তা নিয়ে কারো কোনো ধারণা ছিল না। উপরন্তু, হিন্দুদের মধ্যে ছিল কালা পানির ট্যাবু। এ সংস্কার অনুসারে হিন্দুরা মনে করত লবণ পানি পেরোলে তাদের জাত নষ্ট হবে। তবে এসব সংস্কার কাটিয়ে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে অনেকেই সাগর পাড়ি দিতে রাজি হন। শুরুতে নারীদের সংখ্যা ছিল কম, এগিয়ে আসেন অল্প কয়েকজন নারী। অনেক প্রচেষ্টায় ১৮৬৮ সালের পর থেকে নারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, এদের মধ্যে বেশির ভাগ নারীই ছিলেন অবিবাহিত। প্রতি ১০ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা চার। নারীর সংখ্যা বাড়লেও সেটা ছিল পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে ক্যারিবিয়ায় অভিবাসী ভারতীয় সমাজে নানা ধরনের লৈঙ্গিক সমস্যা দেখা দেয়, যার মধ্যে ছিল নারীর প্রতি সহিংসতা। যারা কলকাতা থেকে যেত, তাদের ত্রিনিদাদে ডাকা হতো কলকাতাইয়া নামে। ১৮৭০-এর দশকে কিছু মাদ্রাজি গিয়েছিল, কিন্তু তারা কাজের জন্য উপযুক্ত ছিল না এবং তারা নানা ধরনের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। এ অভিবাসীদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ছিল হিন্দু এবং ১৫ শতাংশ মুসলমান। হিন্দুদের মধ্যে ১৫ শতাংশ ছিল ব্রাহ্মণ।

সমুদ্র যাত্রাটা মোটেই সুখকর হতো না। জাহাজগুলো আগেকার দিনের দাস পরিবহনের জাহাজের মতো ছিল না, তবে তার চেয়ে খুব একটা ভালোও ছিল না। শ্রমিকদের থাকার জায়গা ছিল খুবই ছোট। জাহাজে শ্রমিকদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, রান্নার আয়োজন, খাবার ভাগাভাগি ইত্যাদি কাজের তত্ত্বাবধানের জন্য কয়েকজন ভারতীয় সর্দার থাকতেন। এসব কাজে ভারতীয় সমাজের প্রচলিত রীতির প্রতিফলন দেখা যেত। রাঁধুনি হতো উচ্চবর্ণের কেউ, আর মেথরের কাজ করত নিম্নবর্ণের মানুষ। অবসর সময়ে শ্রমিকরা তাস ও কাবাডি খেলতেন। প্রতিটি জাহাজেই ঢোলসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র থাকত, জাহাজের যাত্রীদের উদ্দীপ্ত রাখতে গান-বাজনার আয়োজন হতো।&dquote;&dquote;

জাহাজ বঙ্গোপসাগর হয়ে কেপ অব গুড হোপের দিকে যাত্রা করত। উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় জাহাজে মাঝে মধ্যেই কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, হুপিং কাশি মহামারী আকারে দেখা দিত। এতে যাত্রাপথেই অনেক যাত্রীর মৃত্যু ঘটত। এ মৃত্যুহারে সময় ও জাহাজভেদে ভিন্নতা দেখা যেত। ১৮৫৮ সালে সেলসিট্টে নামের একটি জাহাজে থাকা ১৯৭ জন ভারতীয়র মধ্যে ১০৬ জনই মারা যান। এর মধ্যে অনেক সময় জাহাজডুবি, জলদস্যুর আক্রমণ এবং জাহাজে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটত। এসব বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, উনিশ শতকে এসব জাহাজ যাত্রায় ৫ শতাংশ যাত্রী মারা যেত। জাহাজে অনেকে আত্মহত্যা করেছেন এবং অনেক নারী জাহাজে সন্তানও জন্ম দিয়েছেন। এ জাহাজেই ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে এক বন্ধন গড়ে উঠত, তারা হয়ে উঠতেন একে অন্যের জাহাজিভাই কিংবা জাহাজিবেহেন। এ ভ্রাতৃত্ববোধ নতুন ভূখণ্ডে তাদের সমাজ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ ভ্রাতৃত্ববোধ অনেক সময় বর্ণ প্রথা, এমনকি ধর্মের ভিন্নতাকেও অতিক্রম করে গিয়েছিল। 

এ শ্রমিকদের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৪ সালে নীতিমালা চূড়ান্ত করে। এ নীতিমালা অনুসারে প্লানটেশনগুলোয় শ্রমিকদের পাঁচ বছর কাজ করার বাধ্যবাধকতা ছিল এবং সপ্তাহে তাদের কমপক্ষে ৫০ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। টিকিট ছাড়া তারা প্লানটেশন এলাকা থেকে বাইরে যেতে পারতেন না এবং নিয়ম ভাঙলে তাদের কারাগারেও যেতে হতো। চুক্তির সময় শেষ হওয়ার পর আরো পাঁচ বছর থাকলে তাদের ফিরতি টিকিট বিনা মূল্যে দেয়া হতো।

দাপ্তরিক দলিলে এ ভারতীয়রা ‘কুলি’ বলে সম্বোধিত হতেন। নতুন দেশে এ কুলিরা মালিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই মূলত এ বিরোধ। ১৮৮৪ সালে মহররমের শোভাযাত্রা বের করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে সেখানে মুসলমান শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ জানান এবং এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে ২২ জন নিহত হন। এমন অনেক প্রতিবাদকে কঠোরভাবে দমন করা হয়। ১৯৪৫-এর আগ পর্যন্ত হিন্দু বা মুসলিম বিবাহ কোনোটাই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ফলে সেখানে ইন্দো-ত্রিনি শিশুরা কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেত না এবং সম্পত্তির মালিকানা নিয়েও সমস্যা হতো।

ত্রিনিদাদের ঔপনিবেশিক সরকার ক্ষমতাধর ও ধনী খামার মালিকদের বিরুদ্ধাচরণ করার সাহস পেত না। প্রয়োজন না থাকলেও ভারত থেকে শ্রমিক আনা হতো মজুরির হার কম রাখার জন্য। অন্যদিকে অতিরিক্ত শ্রমিক নিজেদের মধ্যে সমস্যার জন্ম দেয়। মজুরির হার অনেক কমে যায়। ১৮৪২ সালে কুলিদের মজুরি ছিল দিনে ৫০ সেন্ট এবং ১৮৭০ সালে তা কমে আসে ২৫ সেন্টে। এর মধ্যে হাজির হয়েছিলেন আফ্রো-ত্রিনি শ্রমিকরা। এ আফ্রো-ত্রিনিরা ছিলেন ভারতীয় কুলিদের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, শহুরে, ইংরেজি ভাষা জানা এবং খ্রিস্টান। ফলে কাজে এবং ক্ষমতায় তারা ভারতীয় কুলিদের তুলনায় এগিয়ে যায়।&dquote;&dquote;

ভারতীয় কুলিদের বেশির ভাগই খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেননি। বরং তারা অন্য অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকদের তুলনায় নিজের ধর্ম বেশি করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। ভারতীয় কুলিরা ছিলেন বেশ গরিব, অশিক্ষিত ও অরক্ষিত। তাই ত্রিনিদাদে তারা নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। তাদের বসবাসের ব্যারাকগুলো ছিল নোংরা এবং মানুষে ঠাসা। মাঝে মাঝেই ম্যালেরিয়া ও কৃমির আক্রমণ দেখা দিত। খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলগুলোয় তারা ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মুখে পড়তেন। অনেককে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য চাপ দেয়া হতো। ফলে অনেক ভারতীয় কুলি পরিবারই তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হতো না। শেষমেশ কানাডীয় প্রেসবাইটেরিয়ান মিশনারিরা ভারতীয়দের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার পর এ সমস্যা দূর হয়। গরিবি অবস্থা, নিম্ন মর্যাদার কাজ ত্রিনিদাদে ভারতীয় কুলিদের অবজ্ঞাময় এক জীবন উপহার দিয়েছিল। এমনকি যে খামার মালিকদের জন্য তারা কাজ করতে আসতেন, তারাও কুলিদের অবজ্ঞাই করতেন।

প্রথমবার পা রাখার পর এক প্রজন্মের মধ্যেই ভারতীয় কুলিরা ত্রিনিদাদে তাদের খামার মালিকদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন। অভিজ্ঞ শ্রমিকদের ভারতে ফেরা বন্ধ করতে ১৮৬৯ সালে ১০ বছর কাজ করেছেন এমন কুলিদের জমি প্রদানের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। আবার অনেক কুলি তাদের জমানো টাকা দিয়েও ত্রিনিদাদে জমি কিনে ফেলেন। তারা নিজেরাই কৃষিকাজ শুরু করেন এবং অনেক জায়গায় গ্রামের পত্তন করেন। গ্রামের নাম দেন কলকাতা, ব্যারাকপুর, ফৈজাবাদ। তারা মূলত ধান ও সবজি চাষ করতেন এবং ভারত থেকে আনা গরু ও মহিষ পালতেন। এছাড়া ভারত থেকে তারা আম, পেয়ারা, কুমড়া, ডাল, আদাসহ নানা ধরনের গাছ নিয়ে যান।&dquote;&dquote;

এভাবে ভারতীয় কুলিরা ত্রিনিদাদে এক নতুন সমাজ, সংস্কৃতি চালু করেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে অনেকেই উপকারী নাগরিক হিসেবে ত্রিনিদাদে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। কিন্তু ভারতীয়রা তাদের সংস্কৃতি ছেড়ে ক্রেয়ল সংস্কৃতি গ্রহণে সম্মত হয়নি। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ভারতীয়রা তাদের নিজস্ব জীবনযাত্রা— পোশাক, ধর্ম, ভাষা, সংগীত, খাদ্যাভ্যাস অক্ষুণ্ন রেখেছিল। তবে বর্ণ প্রথা নিজেদের মধ্যকার একতাকে সবসময়ই বাধাগ্রস্ত করেছে।

বিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতীয় কুলি বা ইস্ট ইন্ডিয়ানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার উন্মেষ ঘটতে দেখা যায়। অনেকে স্থানীয় গণমাধ্যমে নিজেদের কথাও বলতে শুরু করেন। ভারতের রাজনৈতিক নেতা যেমন গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, মহাত্মা গান্ধীর প্রচেষ্টায় ১৯১৭ সালে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হয়। ১৯২৩ সালে ত্রিনিদাদে শেষ ভারতীয় শ্রমিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর সেখানে বসবাসরত শ্রমিকদের প্রায় ২৫ শতাংশ ভারতে ফিরে যান। তবে অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরতে পারেননি, বিশেষত অনেকে দেশে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন। বর্তমানে ত্রিনিদাদের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই এ ইন্দো-ত্রিনি।

বিখ্যাত এক ইন্দো-ত্রিনি হলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি. এস. নাইপল। তিনি তার দি এনিগমা অব অ্যারাইভালে লিখেছেন, ‘এ দ্বীপ আমাকে লেখক বানিয়েছে। আমাকে লেখার জন্য এমনসব বিষয় দিয়েছে, যেগুলো বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’