১৮৭৩ থেকে পরবর্তী ১০-১২ বছর মহর্ষি ভ্রমণ করেই সময় কাটিয়েছেন, কখনো কাছে, কখনো অনেক দূরে। ১৮৭৩ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো হিমালয় সফরে যান। এবার সঙ্গে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ তখন ১২ বছরের বালক। সবে তার উপনয়ন সম্পন্ন হয়েছে। ঠিক সে সময়ে মহর্ষি যখন তার পুত্রকে হিমালয় সফরের প্রস্তাব দিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথের খুশির বাঁধ ভেঙেছিল। পিতার সঙ্গে এ সফরের বিবরণ রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে তার জীবনস্মৃতিতে দিয়েছেন। এ বর্ণনায় নিজের সন্ত প্রকৃতির পিতার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা যায়
বলা হয় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ দিনগুলো তিন দশকের বেশি সময়কাল ধরে বিস্তৃত। এ সময়টা তিনি পার করেছেন ভ্রমণ, ধ্যান, অধ্যয়ন ও বিশ্রামে। মহর্ষি তার শেষ জীবন আর ১০টা মানুষের মতো কাটাননি। তিনি তার শেষ জীবনের এ বছরগুলো কাটিয়েছেন জীবনের সত্যের খোঁজে আত্মানুসন্ধান ও আত্মোপলব্ধির তৃষ্ণা নিবারণে। তার মনের এই অভ্যন্তরীণ আলোড়নের সামান্য কোনো চিহ্নও কিন্তু তার বাইরের জীবনে পড়েনি। মহর্ষির জীবনীকার অজিতকুমার চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘তার শেষ জীবনের বিবরণ দেয়াটা কঠিন, কারণ এ সময়টা ছিল তার মনের অভ্যন্তরের ইতিহাস। এ সময়ে তার সামজিক জীবনে ন্যূনতম কোন সক্রিয়তাও দেখা যায় না।’
১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কাশ্মীরে মুরি পাহাড়ে ভ্রমণে যান। এ ভ্রমণের বিবরণ তার বেশ কয়েকটি চিঠিতে লিপিবদ্ধ আছে। এর পরের বছর তিনি কলকাতায় এসেছিলেন শুধু পর্বতের ডাকে শহর ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে। হিমালয়ে তিনি মুসাফিরের মতো এ স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং শেষমেশ ধর্মশালায় থিতু হন। এরপর আবার তিনি সমতলে ফিরে আসেন সামান্য সময়ের জন্য। ১৮৭১-৭২ সময়কালে তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিতর্কের বিষয় ছিল কেশবকে যিশুর প্রতিকৃতিতে প্রকাশের পরিকল্পনা এবং ব্রাহ্ম বিবাহ বিল ১৮৭২। দেবেন্দ্রনাথ বৈষয়িক জীবন থেকে সব ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন সম্পন্ন করে এনেছিলেন। তাই তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে বিতর্কে না এগিয়ে প্রথম সুযোগেই নিজেকে সরিয়ে নিলেন।
১৮৭৩ থেকে পরবর্তী ১০-১২ বছর মহর্ষি ভ্রমণ করেই সময় কাটিয়েছেন, কখনো কাছে, কখনো অনেক দূরে। ১৮৭৩ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো হিমালয় সফরে যান। এবার সঙ্গে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ তখন ১২ বছরের বালক। সবে তার উপনয়ন সম্পন্ন হয়েছে। ঠিক সে সময়ে মহর্ষি যখন তার পুত্রকে হিমালয় সফরের প্রস্তাব দিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথের খুশির বাঁধ ভেঙেছিল। পিতার সঙ্গে এ সফরের বিবরণ রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে তার জীবনস্মৃতিতে দিয়েছেন। এ বর্ণনায় নিজের সন্ত প্রকৃতির পিতার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা যায়। একই সঙ্গে তার নিজের রসবোধও ফুটে উঠেছে বিবরণীতে।
যাত্রার শুরুতে তারা প্রথম বিরতি নিয়েছিলেন বোলপুরে এবং সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করেন। এই বোলপুর ঠাকুর পরিবারের পরবর্তীকালের ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে।
বোলপুরের অবস্থান বীরভূম জেলায়, কলকাতা শহর থেকে ১০০ মাইল দূরে। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ এখানে জমি কিনেছিলেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে বিখ্যাত শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। বোলপুরে জমি কেনার গল্পটা জানতে একটু পেছনে যেতে হবে। দেবেন্দ্রনাথ বীরভূমের প্রভাবশালী জমিদার রায়পুরের সিনহাদের বাড়িতে যেতেন মাঝে মাঝে। এ রকম এক সফরে মহর্ষি যখন বোলপুর হয়ে রায়পুরে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি বিস্তৃত এলাকাজুড়ে আমের বাগান ও জঙ্গল দেখতে পান। এ স্থানটি তখন ‘ভুবনডাঙার মাঠ’ নামে পরিচিত ছিল এবং এখনো তা-ই আছে। সে আমলে অঞ্চলটি ডাকাত ও খুনিদের আস্তানা ছিল। সাধারণ মানুষ দিনের বেলায় এ জায়গা পার হতে ভয় পেত। স্থানটির বিশালতা মহর্ষির মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। বিশেষত একটি ছাতিম গাছ। মহর্ষি তার লটবহরকে থামতে নির্দেশ দেন এবং ছাতিম গাছের তলায় ধ্যানে বসেন। এটা তার মনে প্রশান্তি আনে। জায়গাটি তার খুব পছন্দ হয় এবং ঠিক সেখানে বসে তখনই তিনি এখানে জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন। জমির মালিক ছিলেন রায়পুরের সিনহারা। তাদের কাছ থেকেই মহর্ষি ২০ বিঘা জমি কিনেছিলেন।
জমি ক্রয়ের পরই মহর্ষি নির্জনে ব্রহ্মার পূজা করার জন্য একটি মন্দির নির্মাণ করান। এর ২৩ বছর পরে ১৮৮৬ সালের ৮ মার্চ এ জমির জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করেন এবং তিন সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে এর দেখাশোনার ভার ন্যস্ত করেন। এবং শর্ত যুক্ত করা হয়, এ জমিতে একটি আশ্রম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নিরাকার ব্রহ্মার উপাসনা করা হবে। মহর্ষির এ ইচ্ছা পরবর্তীকালে পূরণ হয়েছিল তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক শান্তিনিকেতনে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলনীতি হচ্ছে— সত্যম শিবম অদ্বিতীয়ম। এবং এখানে প্রকৃতি একটি গৃহে বাস করে (যাত্রা)।
মহর্ষি সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার উত্তর-পশ্চিমমুখী যাত্রা শুরু করলেন। পথে সাহেবগঞ্জ, দানাপুর, এলাহাবাদ, কানপুর প্রভৃতি স্থান স্পর্শ করে অমৃতসরে যাত্রাবিরতি করেন। স্বর্ণমন্দির দর্শন শেষে তিনি শিখদের সঙ্গে আপনজনের মতো মতবিনিময় করেন। অমৃতসর থেকে যাত্রা করেন ডালহৌসির দিকে এবং আস্তানা করলেন বাকরোটায়। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি এ জায়গার স্মৃতিচারণে ভরপুর। কয়েক মাস পরে রবীন্দ্রনাথকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু মহর্ষি অন্য সঙ্গীদের নিয়ে বরফে ঢাকা পার্বত্য অঞ্চলে তার সফর অব্যাহত রাখলেন।
১৮৭৫ সালের মার্চে দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী স্মৃতি সারদা দেবী মারা যান। হিমালয় ছেড়ে মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রীর পাশে শেষমুহূর্তে এসে হাজির হতে পেরেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ তার মনে গভীর দাগ কেটেছিল, কিন্তু সেই বেদনার প্রকাশ তিনি অন্য কাউকে বুঝতে দেননি। স্ত্রীর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে তিনি আবার বাকরোটা পর্বতের চূড়ায় বাস শুরু করেন এবং টানা কয়েক বছর সেখানেই থাকেন। এ সময় তিনি সমতলের জীবনের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখেননি। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে কিছু সময় কাটানোর পরে তিনি চীন গমন করেন। এ সফরের কোনো রেকর্ড নেই। তিনি তার আত্মীয় ও বন্ধুদের জন্য চীন থেকে অনেক উপহারসামগ্রী নিয়ে আসেন।
এভাবে আজ এখানে, কাল সেখানে করে তার দিন কেটেছে। কিন্তু কলকাতা শহরে তিনি সময় কাটাননি। পণ্ডিত প্রিয়নাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়েছেন উত্তর ভারতের মুসৌরিতে। শাস্ত্রী লিখেছেন, সারা দিন ধ্যান আর প্রার্থনা করার সময় তিনি মাঝে মাঝেই হাফিজের কবিতা আবৃত্তি করতেন।
বয়স আশির কোটায় পৌঁছানোর পর মহর্ষির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে থাকে। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য তিনি কিছুকাল চিনসুরা আবার কিছুকাল বোম্বাইয়ের উপকূলে অবস্থান করেন। এরপর যান দার্জিলিংয়ে কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। জীবনের শেষ ১০ বছর তার কেটেছে কলকাতার পার্কস্ট্রিটে একটি ভাড়া বাড়িতে। বেশির ভাগ সময় কাটাতেন ধ্যান ও প্রার্থনায়। এ সময় পিতার সঙ্গে ছিলেন এবং তার সেবা করেছেন কন্যা সৌদামিনী দেবী। সৌদামিনী তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন— “পিতা একটি সোফায় সারাদিন প্রায় একই ভঙ্গিতে বসে থেকে ঈশ্বরের আরাধনা করতেন। খাওয়া আর স্নান বাদে বাকি সময়টা তিনি নিজের সকল মনোযোগ ঈশ্বরের ওপরই নিবিষ্ট রাখতেন। কখনও যদি আমরা কোন দরকারে তার সঙ্গে কথা বলতে যেতাম, তখন ঘোরলাগা, বিস্মিত কণ্ঠে তিনি বলে উঠতেন, ‘আমি কোথায়? তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছ?’ তাকে বিরক্ত করার জন্য আমরা তখন অপরাধবোধে ভুগতাম।”
রবীন্দ্রনাথ তখন আদি ব্রাহ্ম সমাজের সভাপতি। সন্তানদের মধ্যে এ সময় রবীন্দ্রনাথই মহর্ষির খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ব্রাহ্ম সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে এ সময় পিতার পরামর্শ চাইতেন। ব্রাহ্ম সমাজের সব শাখার— আদি, সাধারণ বা নব বিধান— সদস্যই মহর্ষির স্বাস্থ্যের খোঁজখবর ও তার আশীর্বাদ নিতে সাক্ষাত্ করতে আসতেন। ব্রাহ্ম সমাজের এই মহান পৃষ্ঠপোষকের সামনে এলে সমাজের বিভিন্ন শাখার মধ্যে চলমান শত্রুতা বা দ্বন্দ্ব মিলিয়ে যেত। এভাবে মহর্ষির সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তাকে সম্মান জানাতে আসেন রাজনারায়ণ বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, উমেশচন্দ্র দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল, সুরন্দ্রেনাথ ব্যানার্জী, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ।
শেষ জীবনে মহর্ষি সবসময় বাড়ি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন। জাগতিক সব সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জন স্থানে প্রার্থনা ও ধ্যানে জীবন কাটানোই ছিল তার চাওয়া। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি মহর্ষি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। মৃত্যুর আগে তাকে তার এই পৈত্রিক ভিটায় আনা হয়েছিল।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম উপযুক্ত মূল্যায়ন হয়নি। তার লেখায় আছে অত্যন্ত উচ্চমানের ধর্মীয় চিন্তা এবং ঠিক এ কারণেই সাহিত্য সমালোচকরা তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করেননি। বাঙালিরা তাকে ঈশ্বরভীরু, আধ্যাত্মিক নেতা ও দার্শনিক হিসেবে মূল্যায়ন করে। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন, ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এ দেশের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় চিন্তকদের একজন। তিনি প্রাচীনকালের ঋষিদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী।’ বাংলা গদ্যের অগ্রদূত হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ছাত্ররা জানেন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্তের নাম। কিন্তু আমরা যদি শিল্পের মাপকাঠিতে লেখার ধরন বিবেচনায় নেই, তাহলে বাংলা গদ্যে দেবেন্দ্রনাথের অবদান অন্যদের চেয়ে একটু কম নয়। মহর্ষি বাংলা ভাষায় মাধুর্য এনেছেন।
আমরা দেখতে পাই তিনি সমতল ও পার্বত্য— উভয় ধরনের পরিবেশেই জীবন কাটিয়েছেন। সমতলে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের মতো সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। আবার পার্বত্য এলাকায় ঈশ্বরের আরাধনায় ধ্যানমগ্ন হয়েছেন। তুলনামূলক বিবেচনায় এই পার্বত্য পরিবেশে ধ্যানই তার চরিত্রের মূল দিক। তিনি আরো আরো বেশি আলোর সন্ধান করেছেন। জার্মান লেখক গ্যোটের মতো এই ঊর্ধ্বমুখী তাকানোর বৈশিষ্ট্য দেবেন্দ্রনাথের লেখায় এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। মহর্ষির এ বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি দেখা যায় তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে।
লেখক রচিত ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর’ গ্রন্থের অংশবিশেষ






