অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব
১৮৯৭ সালে রহমত আলীর জন্মের সময় পাঞ্জাব সাম্প্রদায়িক কলহে জর্জরিত ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে পাঞ্জাব উপমহাদেশের অন্য যেকোনো অঞ্চল থেকে বেশি বৈচিত্র্যময়। তিনটি ধর্ম—ইসলাম, হিন্দু, শিখ বিভিন্ন রকম অস্বস্তিসহ বসবাস করছে তিন ভিন্ন ভাষা—উর্দু, হিন্দি ও পাঞ্জাবি নিয়ে, যাদের সবার আলাদা লিপি রয়েছে। ১৮৫৭-এর শুরুতে সাম্প্রদায়িক চিড়গুলো স্পষ্ট হতে থাকে। যোগাযোগ, প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন এবং ধর্মান্তরকরণে খ্রিস্টান মিশনারিদের আক্রমণাত্মক কর্মসূচি পাঞ্জাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। আগুনে ঘি ঢালে ব্রিটিশ নীতি। এন জেরাল্ড ব্যারিয়ার মনে করেন, ১৮৮০ নাগাদ পাঞ্জাব সরকার সাম্প্রদায়িক নিরপেক্ষতার সাধারণ নীতি পরিত্যাগ করে। তবে তিনি ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের সংস্কারে সাম্প্রদায়িক বিভেদ বৃদ্ধিতে ধর্মের কোনো ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন না। এ সংস্কারে পৌর কমিটির ক্ষমতাবলয় প্রসারিত করা হয় এবং প্রতিনিধি নির্বাচনের পরিবর্তে মনোনয়নের পদ্ধতি চালু করা হয়। জেরাল্ডের মতের বিরোধিতা করে সত্য এম রাই এ সংস্কারের ফলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বৃদ্ধির ঘটনা দেখতে পেয়েছেন—কারণ মনোনয়ন দেয়া হচ্ছিল ধর্ম বিবেচনায় নিয়ে। আমলাতন্ত্র ও পৌর কমিটির নিচের অংশ ধর্মীয় বিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিতে হিন্দু, মুসলমান ও শিখরা একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছিল।
খ্রিস্টান মিশনারি এবং তাদের ধর্মান্তরকরণের আগ্রাসী তৎপরতা তিন ধর্মের মধ্যে সংস্কারের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। মিশনারিরা পাঞ্জাবে ছাপাখানা চালু করে এবং পুস্তিকা, প্যাম্ফলেট ও ধর্মীয় পত্রিকা প্রকাশ শুরু করে। স্বভাবতই এর প্রতিক্রিয়ায় কয়েকটি সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে—হিন্দুদের মধ্যে আর্য সমাজ, শিখদের সিং সভা ও মুসলিমদের আঞ্জুমান-ই-হিমায়ত-ই-ইসলাম। এগুলো প্রত্যেকে অন্য সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। উনিশ শতকের শেষভাগে আর্য সমাজ শুধু খ্রিস্টান নয়, মুসলিম ও শিখদের বিরুদ্ধেও বড় প্রচারণা শুরু করে। অর্থাৎ রহমত আলী বড় হয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ একটি পরিবেশে। তার হিন্দু বিরোধিতার প্রাথমিক কারণ ছিল আর্য সমাজের মুসলিম বিদ্বেষ।
ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করে রহমত আলী লাহোরে আসেন। তিনি এ শহরে ছিলেন ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। তিনি বেছে নিয়েছিলেন রেলওয়ে রোডের ইসলামিয়া কলেজ। থাকতেন রিভাজ হোস্টেলের ১২ নং কক্ষে। ১৯১৮ সালে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। চার বছরের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে তার লেগে যায় ছয় বছর। কে কে আজিজের মতে, এই দেরির কারণ ছিল দারিদ্র্য। আর্থিক সংকটের কারণে বেশ কয়েকবার তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মাঝের সময়টাতে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন কিছু উপার্জনের জন্য। লাহোরভিত্তিক উর্দু দৈনিক প্যায়সা আখবারে কাজ করে তিনি মাসে ২৫-৩০ রুপি উপার্জন করতেন। পড়াশোনায় নানা বাধা এলেও ইসলামিয়া কলেজে তার শিক্ষাজীবন ছিল সৃষ্টিশীলতায় পূর্ণ। তিনি কলেজ ম্যাগাজিন ক্রিসেন্টের সম্পাদক, কলেজ ডিবেটিং ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন, ছিলেন টিউটোরিয়াল গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট। লাহোরে ছাত্রজীবনে তিনি লেখক নাম নিয়েছিলেন আজাদ। শোনা যায় কলেজজীবনে কবিতা লিখতেন এ নামে। তবে তার কোনো কবিতা পাওয়া যায়নি।
ইসলামিয়া কলেজে থাকার সময় ১৯১৫ সালে রহমত আলী বাজমে শিবলী নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। রহমত আলীর চিন্তার সঙ্গে বিশিষ্ট পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ শিবলী নোমানীর (১৮৫৭-১৯১৪) কোনো মিল ছিল না। এমন কিছু পাওয়া যায় না যা থেকে বলা যায় যে রহমত আলীর রাজনৈতিক বাসনায় নোমানীর কোনো প্রভাব ছিল। তবে বাজমে শিবলী একটি সংগঠন হিসেবে রহমত আলীর রাজনৈতিক ভাবনার প্রাথমিক ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। এ ভাবনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে এবং তা চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯৩৩ সালে, যখন তিনি রচনা করেন নাউ অর নেভার।
কে কে আজিজ জানিয়েছেন, গ্র্যাজুয়েশনের পর রহমত আলী আইনশাস্ত্র পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে সময় খুব সম্ভবত আর্থিক সংকট তাকে সে ইচ্ছা পূরণ করতে দেয়নি। কিছুদিন তিনি মুহাম্মদ দিন ফকের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে কাজ করেন। কিছুদিন পর তিনি লাহোরের এচিসন কলেজে শিক্ষকতার সুযোগ পান। তাকে এ কাজটি পেতে সহায়তা করেছিলেন ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হেনরি মার্টিন। এচিসন কলেজে তিনি শিক্ষকতা করেছেন পাঁচ বছর (১৯১৮-১৯২৩)। কলেজে যোগ দেয়ার পর পরই তাকে নিয়োগ করা হয় পাঞ্জাবের দক্ষিণের প্রিন্সলি স্টেট বাহাওয়ালপুরের নবাবের পুত্রের শিক্ষক হিসেবে। রহমত আলীর এ ছাত্র ১৯১৯ সালে ইংল্যান্ডে চলে গেলে এবার নিযুক্ত হন মাজারি নবাবের পুত্রের শিক্ষক হিসেবে। এসব যোগাযোগ রহমত আলীকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিল, যার মধ্যে ছিল তার ইংল্যান্ডে যাওয়ার স্বপ্নপূরণ। রহমত আলী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে যোগ দেন (১৯২৩-২৫)। তবে তিনি তার ডিগ্রি শেষ করেছিলেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই সময় তিনি সর্দার দোস্ত মুহাম্মদ খানের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান। এই দোস্ত খান ছিলেন ডেরা গাজী খান জেলার রোজহানের মাজারি তামুনদার (বালুচ ট্রাইবাল নেতাদের উপাধি)। রহমত আলী এ পদে কাজ করেন ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। পৈতৃক জমি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে দোস্ত খানকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন রহমত। মাজারিরা আইনি লড়াইয়ে জিতে যান। রহমত আলীর ভূমিকার কারণে তাকে ৬৭ হাজার রুপি সম্মানী দেয়া হয়। এ অর্থ তিনি বিলাতে উচ্চশিক্ষা নেয়ার জন্য খরচের সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে ১৯৩০ সালের ৩০ বা ৩১ অক্টোবর রহমত আলী ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেন এবং নভেম্বরের মাঝামাঝি সেখানে পৌঁছান।
ইংল্যান্ডে রহমত আলী ইনার টেম্পল ইনে যোগ দেন কিন্তু বারের স্বীকৃতি পেতে তাকে ১২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। লন্ডনে তিনি ছিলেন স্যার উমর হায়াত খান তিওয়ানার (১৮৭৪-১৯৪৪) বাড়িতে। এ উমর হায়াত ছিলেন পাঞ্জাবের সারগোধা জেলার অভিজাত ভূস্বামী পরিবারের সদস্য। রেগান পার্কের উল্টোদিকে অভিজাত পাড়ায় ছিল তার বসবাস। লাহোরের দিন থেকেই উমর হায়াত রহমত আলীকে চিনতেন। সম্ভবত এটা ছিল এচিসন কলেজের সংযোগ, উমরও এই কলেজের ছাত্র ছিলেন। শুধু থাকার জায়গার ব্যবস্থাই নয়, উমর হায়াত রহমত আলীকে একটি শংসাপত্র লিখে দিয়েছিলেন, যা তাকে কেমব্রিজের ইমানুয়েল কলেজে ভর্তি হতে সহায়তা করে। ভারত থেকে রেফারেন্স লেটার এবং উমর হায়াত খানের প্রভাবে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েটেড শিক্ষার্থী হিসেবে কেমব্রিজে ভর্তি হন ১৯৩১ সালের ২৬ জানুয়ারি। ১৯৩২ সালের জুনে তিনি ল টাইপস নেন; ১৯৩৩ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি পান। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান ১৯৪০ সালে। দুটি পরীক্ষাতেই তিনি তৃতীয় বিভাগে পাস করেন। অর্থাৎ একাডেমিক রেজাল্ট তার একেবারেই ভালো ছিল না। এর প্রভাব তার পেশাগত জীবনেও পড়েছিল। আইন ব্যবসায় তিনি কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছিলেন। কেমব্রিজে অবস্থানের সময় তিনি সেখানকার বুদ্ধিজীবী মহলে পুরোপুরি মিশে যেতে পারেননি, পরিধিতেই থাকতে হয়েছে তাকে। থেলমা ফ্রস্ট জানিয়েছেন, মৃত্যুর সময় রহমত আলী ছিলেন নিঃস্ব, অসহায়, নিঃসঙ্গ। একইভাবে পলিন হান্ট কেমব্রিজ ইভনিং নিউজে লিখেছেন, তিনি ‘খুব একাকী হয়ে গিয়েছিলেন, নিজের চিন্তা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া করতেন, কিছুদিন পরপর থাকার জায়গা বদল করতেন।’
রহমত আলীর রাজনৈতিক রূপকল্পের জন্ম
বাজমে শিবলীর মিটিংগুলোতে রহমত আলীর রাজনৈতিক রূপকল্পের অদ্ভুত ভাবনার ইশারা পাওয়া যায়। বাজমে শিবলীতে দেয়া তার প্রথম ভাষণটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানেই ছিল পাকিস্তান ধারণার প্রাথমিক বিবরণ। ধীরে ধীরে যা বিস্তৃত হয়ে দিনিয়া মহাদেশে পরিণত হয়। এই ভাষণে তিনি বলেন,
ভারতের উত্তরাংশ মুসলিমপ্রধান এবং আমার এ অঞ্চলকে মুসলিমই রাখব। শুধু তা-ই নয়, আমরা এ অঞ্চলকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র বানাব। কিন্তু আমরা এটা তখনই করতে পারব যখন আমরা এবং আমাদের উত্তরাঞ্চল আর ইন্ডিয়ান পরিচয়ে থাকবে না। এটা হলো প্রাথমিক শর্ত। তাই যত দ্রুত আমরা ‘ভারতীয়ত্ব’ ত্যাগ করব সেটা আমাদের এবং ইসলামের জন্য ভালো হবে।
তার লেখা ‘পাকিস্তান: দ্য ফাদারল্যান্ড অব দ্য পাক নেশন’-এ রহমত আলী নিজে উল্লেখ করেন যে ১৯০৯ ও ১৯১৫ সালের মধ্যে ভারতীয় মুসলিমদের ভবিষ্যৎ আমার জীবনের মুখ্য মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠে। একই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন যে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে তিনি এত জোর দিয়ে সওয়াল করেছেন সেটা ছিল হিন্দু ও মুসলিম নেতাদের সমঝোতার প্রতিক্রিয়া। এ নেতারা ‘জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে’ কিছু সাধারণ বিষয়ে একমত হতে চাইছিলেন, যা ১৯১৬ সালে লখনৌ প্যাক্টে পূর্ণতা পায়। তিনি এ প্যাক্টকে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যা দেন। কিন্তু তিনি এই যে দারুণ চরমপন্থী ভাবনায় আটকে গিয়েছিলেন, এমনকি তিনি হিন্দুদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায়ও সমর্থন দিতে রাজি ছিলেন না, এর কারণ ছিল সম্ভবত পাঞ্জাবে বড় হয়ে ওঠার সময় তার দেখা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ। হিন্দু প্রশ্নে তার অনড় অবস্থান তাকে মুসলিম লীগ থেকে দূরে নিয়ে যায়। এই বিদ্বেষ সারা জীবন তার মধ্যে রয়ে গিয়েছিল। এচিসন কলেজে থাকার সময় ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এ পার্টির সঙ্গে ব্রিটিশদের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তারা ছিল মূলত পাঞ্জাবের ভূস্বামীদের প্রতিনিধি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে পাঞ্জাবের ভূস্বামী উমর হায়াত খান তিওয়ানা কেমব্রিজে ভর্তি হতে রহমত আলীকে সহায়তা করেছিলেন। ধীরে ধীরে রহমত আলীর ভাবনা আরো সংকুচিত হতে থাকে, তিনি হিন্দু ও ব্রিটিশ—উভয়কেই তার চিন্তার দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেন। দ্বিতীয় যে বড় প্রভাবটি তিনি গ্রহণ করেছিরেন তা হলো প্যান-ইসলামিজমের ধারণা, যা দৃঢ়ভাবে তার সব রাজনৈতিক কল্পনার মৌল নীতিতে পরিণত হয়। মিল্লাতের রাজনৈতিক বিভাগ এবং ভারতের বিকল্প কাল্পনিক রাজনৈতিক স্থান দিনিয়া মহাদেশের ভৌগোলিক উপস্থাপন ছিল রহমত আলীর ওপর প্যান-ইসলামিজমের প্রভাব।
১৮৯০-এর দশকে বিশ্বশক্তি হিসেবে ইসলামের ক্ষয় সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা। হজ ও মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিমদের সফরের পরিমাণ বাড়ছিল। তারপর দেখা গেল উর্দু ছাপাখানার বিস্তার—এভাবে ভারতীয় মুসলিমরা বৃহত্তর মুসলিম জাহানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যেমনটা ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। জামাল উদ দিন আফগানি (১৮৩৯-৯৭) ছিলেন এ সময়ের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ভারতীয় মুসলিমরা আফগানি থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। তিনি মুসলিমদের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। আফগানি মুসলিম দেশগুলোর দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের অবসান হয় ১৮৫৭ সালে আর তুর্কির অটোমানরা অনেক আগেই তাদের গৌরব হারিয়েছে। মুশিরুল হাসান বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন যে রহমত আলী যখন বড় হচ্ছিলেন তখন মুসলিম দেশগুলো কেমন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল—‘উত্তর আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া একই অবস্থা। আর তা ভারতীয় মুসলিমদের চিন্তাশীল অংশটির ওপর প্রভাব রেখেছিল।’ রহমত আলী ‘ভারতীয়ত্ব’কে পুরোপুরি খারিজ করতে তার সবচেয়ে শক্তিশালী যে অস্ত্রটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি হলো প্যান-ইসলামিজম।
পাকিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট
‘নাউ অর নেভার : আর উই টু লিভ অর পেরিশ ফরএভার?’ ছিল রহমত আলীর প্রথম সার্কুলার, যা লেখা হয়েছিল ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে। এটা প্রকাশিত হয়েছিল পাকিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট নামে একটি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় কেমব্রিজে, ১৯৩৩ সালে। রহমত আলী ছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং একমাত্র উল্লেখযোগ্য সদস্য। সংগঠনে তার ভূমিকাই ছিল প্রধান। কারণ, সব ধারণা, পরামর্শ, বিবৃতি, লিফলেট, ঘোষণা, প্যাম্ফলেট বা দাবিনামা একজন মানুষের মাথা থেকেই আসছিল। একজন ব্যক্তি (রহমত আলী) আর আন্দোলন ছিল মূলত একই বিষয়। (কে কে আজিজ)
পাকিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্টের একটি ভূমিকা সংগ্রহ করা যেতে পারে রহমত আলীর আরেকটি প্যাম্ফলেট ‘হোয়াট ডাজ দ্য পাকিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট স্ট্যান্ড ফর?’ থেকে। এটি প্রকাশিত হয় নাউ অর নেভার-এর পরিপূরক হিসেবে।
নাউ অর নেভার এবং রাজনৈতিক কল্পনা হিসেবে পাকিস্তান
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘নাউ অর নেভার: আর উই টু লিভ অর পেরিশ ফরএভার?’ ছিল রহমত আলীর প্রচার করা প্রথম সার্কুলার। এটি প্রথমবার প্রকাশ হয় ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে। পরের বছর লেখাটি আবার প্রকাশিত হয়। রহমত আলী নিজেই এটা লিখেছিলেন। প্যাম্ফলেটের শেষে রহমত আলীর সঙ্গে আরো কয়েকজনের নাম যুক্ত হয়েছিল—মুহাম্মদ আসলাম খান, শেখ মুহাম্মদ সাদিক ও ইনায়াত উল্লাহ খান। রহমত আলীর জীবনীকার কে কে আজিজ উল্লেখ করেছেন, ঘোষণাটিকে ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ করে তুলতে রহমত আলী আরো কয়েকজনকে খুঁজছিলেন। মাসাধিককাল তিনি সেই মানুষদের খোঁজেন যারা তার এ ঘোষণাকে অনুমোদন দেবে। শেষমেশ তিনি লন্ডনে তিনজন তরুণকে খুঁজে পান যারা তার ঘোষণাকে সমর্থন করতে প্রস্তুত ছিলেন। আসলাম খান ছিলেন অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী, শেখ মুহাম্মদ সাদিক লন্ডনে আইন পড়ছিলেন আর ইনায়াত উল্লাহ খান ছিলেন লন্ডনে প্রকৌশলের শিক্ষার্থী। আসলাম খান প্যাম্ফলেটে স্বাক্ষর করেন খাইবার ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে আর ইনায়াত উল্লাহ সংগঠনের সচিব। কিছুদিন পর অবশ্য আসলাম খান সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। রহমত আলী তখন একাই ইংল্যান্ডের মাটিতে তার সংগঠনের কাজ শুরু করেন।
দাবিনামার দিকে মনোযোগ দিলে দেখা যায় পাঞ্জাব ও নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ারের এ ছাত্ররা রহমত আলীর নেতৃত্বে বাজারে থাকা অনেকগুলো প্রস্তাব থেকে একেবারে ভিন্ন ভাবনা হাজির করেছিলেন। এসব ভাবনা ছিল হাসরাত মোহানি, লালা লাজপত রায়ের কিংবা ১৯৩০-এর ইকবালের বিখ্যাত এলাহাবাদ ভাষণ। রহমত আলী ও তার সহযোগীরা ‘ভারতের মাটিতে পাকিস্তান নামে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের’ প্রস্তাব হাজির করেন।
উপসংহার
মুসলিমদের অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার ছিল রহমত আলীর প্রধান লক্ষ্য, ভাববিলাসী কিন্তু নতুন এক ভাবুক। তিনি ব্রিটিশ শাসন নিয়ে যেমন বীতশ্রদ্ধ, তেমনি হিন্দু আধিপত্যের শাসন নিয়েও চিন্তিত ছিলেন। তার রাজনৈতিক আদর্শে সহাবস্থান বলে কিছু ছিল না। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ১৯৩৩-এ পাকিস্তানের ধারণা থেকে ১৯৪০ নাগাদ দিনিয়া মহাদেশের ধারণায় বিবর্তিত হয়েছে। প্যান-ইসলামিজম এবং সম্ভবত পাঞ্জাবের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তার মনে তৈরি হওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি বিরুদ্ধতা রহমত আলীর রাজনৈতিক মতাদর্শকে নির্মাণ করেছে।
[লেখকের Choudhary Rahmat Ali and his Political Imagination : Pak Plan and the Continent of Dinia প্রবন্ধের সংক্ষেপিত অনুবাদ। লেখকের অনুমতিক্রমে অনুবাদটি প্রকাশ হলো]
ড. তাহির কামরান: ইতিহাসবিদ। লাহোরের বিকনহাউজ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের সাবেক আল্লামা ইকবাল ফেলো





