বিস্মৃত চৌধুরী রহমত আলীকে নিয়ে ভারতীয় লেখক কার্তিক ভেঙ্কটেশের একটি লেখা থেকে খানিকটা ভাষান্তর করছি—
২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫১ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমানুয়েল কলেজের মাস্টার (প্রতিষ্ঠানপ্রধান) এডওয়ার্ড ওয়েলবোর্ন সাগ্রহে তাদের প্রাক্তন ছাত্রকে কেমব্রিজের নিউমার্কেট রোড গোরস্তানে সসম্মানে সমাহিত করার সব আয়োজন করেন। মানুষটি দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলেন। মারা গেছেন দুই সপ্তাহ আগে, ৩ ফেব্রুয়ারি। এডওয়ার্ড ওয়েলবোর্নের প্রভাবের কারণেই মৃতের সাবেক প্রতিষ্ঠান তার শেষকৃত্যের ব্যয়ভার বহন করেছে এবং এমনকি হাসপাতালের বিলও পরিশোধ করেছে।
কিন্তু চৌধুরী রহমত আলীর ব্যাপারে তো এমনটা ঘটার কথা ছিল না। তার গৌরবের ভাগীদার দেশবাসীকে দেখানোর জন্য মরদেহটি তো পাকিস্তান সরকার দেশে আনতে পারত। দুই বছর আগে ১৯৪৮-এর ১১ সেপ্টেম্বর প্রয়াত পাকিস্তানের কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রাপ্যের চেয়ে কম হলেও সম্মান পেয়েছেন। কিন্তু রহমত আলীর মৃত্যু যেমন নীরবে এসেছে দেশবাসীর অগোচরে, শেষকৃত্যও হলো বিদেশীদের উদ্যোগে। সে সময় তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
২৮ জানুয়ারি ১৯৩৩ একই বছরের কিছুটা বেশি সময় আগে তরুণ টগবগে ব্যারিস্টার ও বহুমুখী মেধার অধিকারী চৌধুরী রহমত আলীর লেখা একটি পুস্তিকা ‘নাউ আর নেভার: আর উই টু পেরিশ অর লিভ ফরএভার’-এ এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাধিক্যের দেশ পাকিস্তান অভ্যুদয়ের অনিবার্যতার কথা বলা হয়েছে। সে পুস্তিকাতেই প্রথম ‘পাকিস্তান’ নামটি লিখিত হয়। কাগজে-কলমে তিনিই পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা, কিন্তু দুর্ভাগ্য তার স্বপ্নের ফ্যান্টাসি ল্যান্ড অখণ্ড থাকতে পারেনি। তাদের নেতারাই পাকিস্তানকে ভাঙনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বপ্নের দেশটির অভ্যুদয় ঘটল। কিন্তু চৌধুরী রহমত আলী যেমন পাকিস্তান চেয়েছিলেন তার চাওয়া নতুন দেশটিতে কমই প্রতিফলিত। তবু কায়েদে আজমের মৃত্যুর এক মাস পর ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতটি পাওয়ার জন্যই সম্ভবত পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। তিনি প্রত্যাশা করছিলেন দেশ তাকে স্বাগত জানাবে। তিনি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবেন। সিংহাসন ষড়যন্ত্রের অন্যতম নেতা লিয়াকত আলী খান তখন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশে চৌধুরী রহমত আলীকে দেশের মাটিতে আর পা রাখতে দেয়া হলো না। তার স্যুটকেস-ব্যাগেজ বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং তাকে পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো।
রহমত আলী রাজনৈতিক অভিলাষ নিয়ে ৬ এপ্রিল ১৯৪৮ লাহোর এলেন। লাহোর পৌঁছে তিনি বিবৃতি দিলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে একটি ক্ষুদ্র পাকিস্তান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে—এ পাকিস্তান তিনি মানেন না। তিনি জিন্নাহকে কায়েদে আজম না বলে বললেন ‘কুইসলিং-ই-আজম’ বা স্বদেশদ্রোহী পিতা। তিনি ক্ষমতাসীনদের চটিয়ে দিলেন। ভয়ংকর চটলেন লিয়াকত আলী খান। নিজের পরিণতি কী হবে সে চিন্তার সুযোগ তার ছিল না। দেশ ছাড়া করলেন রহমত আলীকে। তিনি ফিরে গেলেন ইংল্যান্ড। রহমত আলীর নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ১০ মাস না পেরোতে রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানিবাগে এক লাখ লোকের বড় সমাবেশে সাইয়িদ আকবর নামের একজন পেশাদার ঘাতকের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে লিয়াকত আলী খান ‘শহীদে মিল্লাত’ হয়ে গেলেন। কবরস্থানই হলো তার আশু গন্তব্য।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রহমত আলীকে সমাহিত করার পর পাকিস্তান সরকারের কাছে শেষকৃত্য ও চিকিৎসা ব্যয় চেয়ে বসল। বহু লেখালেখির পর ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান এ অর্থ পরিশোধ করেছে।
চৌধুরী রহমত আলীর সততার দিকটি হচ্ছে, তিনি মনেও করেননি, পরবর্তী সময়ে দাবিও করেননি যে বাংলাদেশ তার স্বপ্নের পাকিস্তানের অংশ—বাংলার মুসলমানদের জন্য তার স্বপ্নের ভূমির নাম ‘বাঙ্গিস্তান’। তার ‘নাউ অর নেভার’ পুস্তিকার পাকিস্তান হচ্ছে উত্তর ভারতের পাঁচটি ইউনির সমন্বয়ে গঠিত ভূখণ্ড। তাতে অখণ্ড পাঞ্জাব থাকবে, আফগানিয়া (এখনকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ), কাশ্মীর, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান। ইতিহাসবিদ আকিল আব্বাস জাফরী চৌধুরী রহমত আলীকে পাকিস্তানের উদ্গাতা স্বীকার করতে নারাজ। তিনি মনে করেন, কাশ্মীরি সাংবাদিক গুলাম হোসেন শাহ কাজমি ৩ জুলাই ১৯২৮ একটি সংবাদপত্র প্রকাশের আবেদন করেন। অ্যাবটাবাদ থেকে প্রকাশিত এ সংবাদপত্রের নাম হবে ‘পাকিস্তান’। তবে এটা সত্য তিনি রাষ্ট্রের নাম হিসেবে পাকিস্তান ভাবেননি।
বাঙ্গিস্তানের মতোই দাক্ষিণাত্যের মুসলমানপ্রধান অংশ তার কাছে ছিল উসমানিস্তান। চৌধুরী রহমত আলী ছোট আকারের পাকিস্তান চাননি। দুটি গোলটেবিল বৈঠকে মুসলিম নেতৃত্বের আপসকামিতার তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। ধর্মীয় দিক দিয়ে তিনি উদারপন্থী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ হিন্দুত্ববাদীদের পদানত হয়ে পড়েছে। কাজেই হিন্দুত্ববাদ এবং একই সঙ্গে ক্ষুদ্র মুসলিম স্বার্থ থেকে বেরিয়ে এসে সব মুসলমানকে সম্মিলিত আন্দোলনে অংশীদার করে তুলতে হবে। তিনি ‘নাউ অর নেভার’ নামক পুস্তিকায় প্রচার করছেন: আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সামাজিক বিধান ও অর্থনৈতিক পদ্ধতি, উত্তরাধিকার আইন ও পরম্পরার প্রথা এবং বিবাহসূত্র ভারতের অধিকাংশ মানুষের চেয়ে ভিন্ন। যে আদর্শ আমাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করতে শেখায় আর যে আদর্শ হিন্দুদের অনুপ্রাণিত করে তা মৌলিকভাবে ভিন্ন। আমাদের জাতীয় রীতিনীতি, পঞ্জিকা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক সবই তাদের চেয়ে ভিন্ন।
চৌধুরী রহমত আলীর দাবির পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে। সেক্ষেত্রে সহিংসতার বাড়াবাড়ি বাদ দিলে হিন্দুত্ববাদীরাও কেবল তাদের রাষ্ট্র চান, মুসলমান সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত।
তিনি লিখেছেন, আমাদের সাহসী কিন্তু স্বরহীন জাতি হিন্দু জাতীয়তাবাদের যূপকাষ্ঠে বলি যেমন হচ্ছে, তেমনি তথাকথিত নেতারা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করে ইসলামের ভয়ংকর অবমাননা করেছেন।
প্রথম গোলটেবিল বৈঠকের অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন ধারণার তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। কিন্তু মুসলিম লীগ তা মেনে নেয়ায় নেতারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বলে তিনি মনে করেছেন। মুসলমানদের আত্মহত্যার পথ প্রশস্ত করার ম্যান্ডেট জিন্নাহ ও অন্যান্য নেতাকে দেয়া হয়নি।
পাঞ্জাবি পরিবারে ১৬ নভেম্বর ১৮৯৭ সালে তার জন্ম। পড়াশোনা লাহোর ও পাঞ্জাবে। ১৯৩৩ সালে কেমব্রিজে স্নাতক। কিছুকাল রাজনীতি চর্চা করে ১৯৪০ সালে কেমব্রিজের এমএ এবং ১৯৪৩ সালে লন্ডনের মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টার। তিনি ইংল্যান্ডে পাকিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট নামক যে আন্দোলনটি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তা ছিল বিভিন্ন বিষয়ে জিন্নাহ-লিয়াকত আলীর মুসলিম লীগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কাজেই জিন্নাহ-লিয়াকতের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানে তিনি যে গৃহীত ও বরণীয় হবেন না, এটাই স্বাভাবিক।
রাষ্ট্রের নাম হবে পাকিস্তান। তার স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তবতা বিবর্জিত ছিল। এমনকি জিন্নাহ যখন ‘মথ ইটেন’ পাকিস্তান পেলেন, যত বাস্তবই হোক শাসকদের আচরণ ও নিজ দেশে উপনিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ সেই পাকিস্তানকে দীর্ঘজীবী করেনি। যেটুকু এখনো পাকিস্তান হিসেবে টিকে আছে, তাও যদি ভবিষ্যতে দ্বিখণ্ডিত হয়, ইতিহাস পর্যালোচকরা বিস্মিত হবেন না।
একটি পাদটীকা:
পাকিস্তান নামটি চৌধুরী রহমত আলীর মনে কেমন করে এল, এ নিয়ে তিনটি ভাষ্য রয়েছে। ১৯৩২ সালে কেমব্রিজের ৩ নম্বর হাম্বারস্টোন রোডে থাকার সময় তিনি প্রথম ‘পাকিস্তান’ নামটি লেখেন। তার বন্ধু আবদুল করিম জব্বারের মতে, তিন বন্ধু চৌধুরী রহমত আলী, পীর আহসান উদ্দিন ও খাজা আবদুর রহিম টেমস নদীর পাড় দিয়ে হাঁটার সময় মুসলমানদের জন্য একটি দেশের অভ্যুদয়ের আলোচনা করতে করতে একসময় রহমত আলী ‘পাকিস্তান’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। আর তার সেক্রেটারি মিস ফ্রস্ট লিখেছেন, দ্বিতল লন্ডন বাসের ওপরতলায় ভ্রমণকালে ‘পাকিস্তান’ নামটি তার মনে আসে।
চৌধুরী রহমত আলী যে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, এটি পাকিস্তানের রাজনীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; তিনি নিহতও হতে পারতেন।
এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





