[চৌধুরী রহমত আলী রচিত ‘নাউ অর নেভার: আর উই টু লিভ অর পেরিশ ফরএভার’ নামক প্যাম্ফলেট ১৯৩৩ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। ভারতের সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১৯৩৩ সালে আয়োজিত তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে ব্রিটিশ ও ভারতীয় প্রতিনিধিদের মাঝে বিতরণের জন্য এটি রচিত হয়েছিল। এ প্যাম্ফলেটেই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। ‘পাকিস্তান’ নামের ব্যবহার এ পুস্তিকাতেই প্রথম দেখা যায়। তাই এটি ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামেও পরিচিত। এ প্যাম্ফলেটে ‘পাকিস্তান’ নামটি প্রস্তাব করার পাশাপাশি রাষ্ট্রটির রূপরেখাও বর্ণনা করেছেন চৌধুরী রহমত আলী। তার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে এ পুস্তিকায়। প্যাম্ফলেটটি প্রকাশিত হওয়ার পর ‘পাকিস্তান’ নামটি জনপ্রিয়তা পায়। প্যাম্ফলেটটি অনুবাদ করেছেন আহমেদ দীন রুমি]
নিশ্চয় ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে।
(আল কোরআন ১৩: ১১)
ভারতীয় ও ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা যখন ফেডারেল সাংবিধানিক ভিত্তি রচনায় মনোযোগী, ইতিহাসের সে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এ আহ্বান। রাজনৈতিক হত্যা ও উৎপাটনের বিরুদ্ধে আমাদের যে অনিবার্য সংগ্রাম, তাতে সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য পাকিস্তানের (পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান) তিন কোটি জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করছি।
হিন্দু জাতীয়তাবাদের বেদিতে আমাদের বাক্শূন্য জাতিকে কেবল অমুসলিমরাই কোরবানি করছে না। কোরবানি করছে চিরাচরিত ইসলাম বিদ্বেষী, আমাদের নামকাওয়াস্তে নেতারা, ভবিষ্যৎকে অবহেলা ও ইতিহাসের শিক্ষাকে অবজ্ঞা করার প্রবণতাও। গোলটেবিল বৈঠকে ভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধি দল অমার্জনীয় ভুল করেছে। তারা একরকম বশ্যতা স্বীকার করেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামে মুসলিম জাতির কপালে চিরকালীন বশ্যতার তিলক পরিয়েছে। নেতারা এর মধ্যেই কোনো প্রতিবাদ ও সংরক্ষণনীতি ছাড়াই সর্বভারতীয় ফেডারেশনের ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নে সম্মত হয়েছেন। বিষয়টি ভারতবর্ষে ইসলামের মৃত্যু পরোয়ানার চেয়ে কম কিছু না। অথচ তা করতে গিয়ে তারা জাতির তথাকথিত ম্যান্ডেটকে ব্যবহার করেছে।
তারা ভুলে গেছে, আত্মঘাতী ম্যান্ডেট তারাই নিজের হাতে তৈরি এবং প্রণয়ন করেছিল। আদতে সে ম্যান্ডেট ভারতীয় মুসলমানদের ম্যান্ডেট ছিল না। জাতি কখনই নিজের প্রতিনিধিদের অস্তিত্ব বিকিয়ে দেয়ার ম্যান্ডেট দেয় না। বিবেকবান ব্যক্তিরাও কখনো গ্রহণ করে না এ ধরনের আত্মবিধ্বংসী ম্যান্ডেট। যদি ম্যান্ডেট দেয়াও হয়, তা কার্যকর করা হয় খুব কম অংশেই। চলমান বিশাল সংকটের সময়ে প্রধান কর্তব্য হলো একটি ন্যায্য, দৃঢ় ও নির্ভীক নেতৃত্ব। কিন্তু হায়! আমাদের নেতারা ভারতে আট কোটি সহধর্মবাদীদের কাছে ক্রমাগতভাবে অস্বীকৃত হয়ে আসছে ৭৫ বছর ধরে। কতিপয় মিথ্যা ইস্যু, হারানো সুযোগ এবং মুসলিম স্বার্থের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও জরুরি বিষয় নিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধত্বের বছর ছিল দিনগুলো। সর্বদা কর্মের প্রতি বীতরাগ ও আচরণগত অধীনতার সময়। তারা ভয় ও সন্দেহের ভারে পঙ্গু হয়ে থেকেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ও সুবিধার জন্য তারা রাজনৈতিক নীতি-আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছে। এমনকি বেদলামের এ গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণেও তা করা হয়েছে তাদের মাধ্যমে। সত্যটির দিকে মুখ তুলে না দেখাটা আমাদের জন্য নিষ্ক্রিয় থাকার অপরাধ হবে। আমরা যত শক্তভাবে চোখ বন্ধ করব, সত্য ততই কঠিন হয়ে আঘাত করবে। সংকটময় মুহূর্তটিতে যখন ট্র্যাজেডি সংঘটিত করা হচ্ছে, সে সময়ে দাঁড়িয়ে একটি পৃথক ফেডারেশনের দাবির প্রতি সক্রিয় সমর্থনে অনুমতি দিন। ভারতের মুসলমানদের জন্য জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
যেভাবে ভারত গঠিত হয়েছে, তা একটি একক দেশের নাম নয়; একক জাতির বাসস্থানও নয়। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশদের দ্বারা তৈরি একটি রাষ্ট্রের উপাধি এটি। এটা এমন লোকদের নিয়ে গঠিত, যারা আগে ইতিহাসের কোনো সময়ে ভারতকে অংশ হিসেবে তৈরি করেনি। কিন্তু ইতিহাসের সূচনা থেকে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত স্বতন্ত্র জাতীয়তা ধারণ করেছে এবং ধরে রেখেছে। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় পাঁচটি প্রদেশে, প্রায় চার কোটি জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমান প্রায় তিন কোটি। আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, উত্তরাধিকার আইন, উত্তরাধিকার ও বিবাহ ভারতের বাকি অংশে বসবাসকারী লোকদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। যে আদর্শগুলো এ প্রদেশগুলোয় বসবাসকারী আমাদের তিন কোটি বিশ্বাসী ভাই-বোনদের ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রেরণা দেয়, তা হিন্দুদের অনুপ্রাণিত করা বিষয়গুলো থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। পার্থক্যগুলো মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তার চেয়েও বিস্তৃত। জীবনের ক্ষুদ্রতম বিবরণ পর্যন্ত প্রসারিত। জাতীয় রীতিনীতি, ক্যালেন্ডার, এমনকি আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-পরিচ্ছদ ভিন্ন।
রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের সঙ্গে মুসলমান ও হিন্দুদের পার্থক্যের তুলনা করাটা অযৌক্তিক। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয়ই একটি ধর্মীয় ব্যবস্থার অংশ—খ্রিস্টধর্ম। হিন্দু ও মুসলমানরা মূলত এবং মৌলিকভাবে দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ব্যবস্থার অনুসারী। মুসলমান ও হিন্দুদের ক্ষেত্রে ধর্ম ব্যক্তিগত মতামতের বিষয় নয়, যেমনটি খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে। বরং তারা সিভিক চার্চের মধ্যে দিয়ে অনুগামীদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পালন করার আচরণবিধি নির্ধারণ করে।
যদি পাকিস্তানের মুসলমানরা বন্ধু ও শত্রুদের দ্বারা প্রস্তাবিত ভারতীয় ফেডারেশনে বিভ্রান্ত হয়, তবে আমরা এক-চতুর্থাংশ অনুপাতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হব। চিরকালের জন্য ভারতে মুসলিম জাতির মৃত্যুধ্বনি এটি। আসন্ন বিপর্যয়ের মাত্রা উপলব্ধি করার জন্য মনে করিয়ে দিই যে আমরা তিন কোটি মুসলিম আনুপাতিকভাবে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রায় এক-দশমাংশ। মাতৃভূমি পাকিস্তান গঠিত পাঁচটি ইউনিট নিয়ে। এটি আয়তনে ইতালির চার গুণ, জার্মানির তিন গুণ ও ফ্রান্সের দ্বিগুণ। আমাদের জনসংখ্যা অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথের সাত গুণ, কানাডার ডোমিনিয়নের চার গুণ, স্পেনের দ্বিগুণ এবং ফ্রান্স ও ইতালির সমান।
কঠিন হলেও এটাই বাস্তবতা। তার জন্য যে কাউকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। এ তথ্যের ভিত্তিতেই দ্বন্দ্বের ন্যূনতম ভয় ছাড়াই দৃঢ়তার সঙ্গে জোর দিয়ে বলছি, পাকস্তানের মুসলমানরা ভারতের বাকি অংশ থেকে একটি আলাদা ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার অধিকারী। এজন্য ভারতের বাকি অংশ থেকে একটি পৃথক ফেডারেল সংবিধান মঞ্জুর করে একটি পৃথক জাতীয় মর্যাদার স্বীকৃতি দেয়া উচিত।
মুসলমানদের পাশাপাশি ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ণয়ের আরো দুই নায়ক ব্রিটিশ ও হিন্দুদেরও আমি আহ্বান করছি। তাদের অবশ্যই বুঝতে হবে, আমাদের দেহ ও আত্মা আটকে গেছে। আমাদের অস্তিত্ব ও মঙ্গল এটার ওপরেই নির্ভর করে। পাঁচটি রাজ্যের জন্য একটি সর্বভারতীয় ফেডারেশনে যোগদান করা কেবল আমাদের জন্য নয়, ব্রিটিশ এবং হিন্দুসহ ভারতের প্রতিটি জাতি ও স্বার্থের জন্য বিপর্যয়কর। অর্থাৎ গোলটেবিল বৈঠকে প্রস্তাবিত বন্দোবস্তের ন্যায্য ও যুক্তিসংগত বিকল্প রয়েছে, যা উপমহাদেশের জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করবে। একজনকে অন্যের অধীন না করে দুই জনগোষ্ঠীকে প্রত্যেককে সর্বোচ্চ বিকাশের অনুমতি দেয়া উচিত। বিকল্পটি হলো পাঁচটি মুসলিম প্রধান ইউনিট নিয়ে পৃথক ফেডারেশন—পাঞ্জাব, আফগানিয়া (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ), কাশ্মীর, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান।
উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম ফেডারেশন যেকোনো বহিরাঘাত ঠেকিয়ে দেবে। সেটা চিন্তাগতই হোক কিংবা অস্ত্রের আঘাত। এ ধরনের একটি ফেডারেশন তৈরি করলে ভারতের বাকি অংশে মুসলিম ও হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত বস্তুগতভাবে বিঘ্নিত হবে না। এটা সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ ও হিন্দু রাষ্ট্রনীতির স্বার্থে মিত্রতাপূর্ণ স্বাধীন, শক্তিশালী এবং সন্তুষ্ট মুসলিম জাতি, যা সবকিছুতে তাদের মতোই। কিন্তু পৃথক সংবিধান রয়েছে, যা ভারতের জন্য প্রণীত হচ্ছে। স্বদেশের পৃথক ফেডারেশন ছাড়া আর কিছুই আমাদের সন্তুষ্ট করবে না।
দাবিটি ১৯৩০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ সভাপতির ভাষণে মুহম্মদ ইকবালের প্রস্তাবের থেকে ভিন্ন। তিনি প্রদেশগুলোকে একটি একক রাজ্যে একীভূত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা সর্বভারতীয় ফেডারেশনের একটি মাত্র ইউনিট হবে। আমরা প্রস্তাব করছি প্রদেশগুলোর নিজস্ব পৃথক ফেডারেশন থাকার কথা। যদি আমরা হিন্দু অধ্যুষিত ফেডারেশনে প্রতারিত হই। নিজেদের ভাগ্যের মালিক ও আত্মার অধিনায়ক হতে না পারি। তাহলে দেশে শান্তি ও স্থিরতা থাকতে পারে না।
সংবিধানে দেয়া সুরক্ষাগুলো কি আমাদের পরিত্রাণের জন্য কাজ করার সুযোগ দেয়? একটুও না। সুরক্ষাকবচ হলো সে জাদু শব্দ, যা আমাদের নেতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তাদের বিবেককে নিস্তেজ করে দেয়। হ্যালুসিনেশনের আনন্দে তারা মনে করে যে সুরক্ষার বড়িগুলো দেশ ধ্বংসকারী ভূমিকম্প নিরাময় করতে পারে। নেতাদের দ্বারা চাওয়া সুরক্ষা ও সংবিধান প্রণেতাদের দ্বারা সম্মত হওয়া কখনই স্বতন্ত্র জাতীয়তা হারানোর বিকল্প হতে পারে না। মুসলমানদের আমৃত্যু লড়াই করতে হবে।
সর্বভারতীয় ফেডারেশনে সংখ্যালঘুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও স্বার্থের জন্য বলিদান করা থেকে কী সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে? মুসলিম জাতির প্রতিটি সামাজিক ও ধর্মীয় আদর্শের হতাশা নিয়ে চিরকালের জন্য দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়া বিপর্যয় রোধ করতে পারে কোন সুরক্ষা? এ জাতীয় জাগরনের পেছনে আমাদের স্বতন্ত্র জাতীয় মর্যাদা যেন ধ্বংস না হয়, তার সুরক্ষা কেমন হবে? সুরক্ষা ব্যবস্থা যতই কার্যকর ও ব্যাপক হোক না কেন, জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং গর্বিত প্রতীকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। সেনা ও নৌবাহিনী, বৈদেশিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, ডাক ও টেলিগ্রাফ, কর এবং শুল্ক ব্যবস্থা থাকবে একটি ফেডারেল সরকারের হাতে, যেখানে মাত্রাতিরিক্ত হিন্দু হওয়াটা বাধ্য। এত কিছুতে হিন্দু আদর্শের সঙ্গে বিরোধ-সংঘাত হলে আমরা কীভাবে আমাদের আদর্শ অর্জন করতে পারি?
গত শতাব্দীর ইতিহাস এক্ষেত্রে আমাদের জন্য অবিস্মরণীয় পাঠ। যে দৌড়ায় সেও পড়তে পারে। শুধু একটি উদাহরণ নিতে চাই আমি। সব সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমরা জাতীয় ভাষাকে উর্দু হিসেবেই উপভোগ করেছি। সে ভাষাকে ভারতীয় ভাষার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এটা যাচাই করার জন্য আমাদের শুধু সর্বশেষ আদমশুমারির রিপোর্ট খুলতে হবে। এটি দুঃখজনক পতন। আমাদের নিয়তি কেবল আরো দূরে ছিটকে পড়া?
এসব বিতর্কিত তথ্যের সামনে আমাদের এ প্রশ্ন করার অধিকার আছে। ঠিক কোন উদ্দেশ্যে আমাদের জাতীয়তাকে বিসর্জন দেয়ার কথা বলা হচ্ছে? ফেডারেশনে গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের কী কী উপকার হতে পারে তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমাদের কি শুধু নেতাদের মুখ বাঁচানোর জন্য ক্রুশবিদ্ধ করা হবে নাকি ভারত একক জাতি হতে পারে এমন প্রস্তাবকে জোরদার করার জন্য? এটা কি সব মূল্যে সমঝোতা অর্জনের লক্ষ্যে? নাকি হিন্দু জাতীয়তাবাদ যে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য কাজ করছে, এমন ভ্রমকে সমর্থন করার জন্য? এ ধরনের প্রকৃতি ও মাপকাঠিতে মানসিক অস্থিরতাই থাকে শুধু। আমরা অতীতে কোনো বচসা ছাড়াই কষ্ট পেয়েছি এবং বিনা বাধায় বিপদের মুখোমুখি হয়েছি। এক জিনিস যা আমরা কখনই ভোগ করব না তা হলো আমাদের নিজের শ্বাসরোধ করা। আমরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ক্রুশে নিজেদের বিদ্ধ করব না হিন্দু-উৎসবে পালন করার জন্য।
ফেডারেল সংবিধানকে সমর্থনকারী মুসলিম বা ব্রিটিশ কিংবা হিন্দু—সব রাষ্ট্রনায়ককে জিজ্ঞাসা করার অনুমতি কি আমাদের দেয়া যেতে পারে, ভারতকে একটি জাতি করার জন্য আমরা কি সবটাই ত্যাগ করব, যা ইসলাম গত ১ হাজার ৪০০ বছরে আমাদের জাতিকে দিয়েছে? মানবতা কি সত্যিই এই অসামান্য আত্মত্যাগের দ্বারা লাভবান হবে? আমরা সাহস করে বলতে পারি যে ইসলাম এখনো দেদীপ্যমান এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু নেতাদের এটিকে বাঁচতে দিতে হবে। ভারতের শান্তি ও সমৃদ্ধিতে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করা দুটি মৌলিকভাবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র জাতি মুসলিম ও হিন্দুর পক্ষে সহাবস্থান কেবল সম্ভব নয়, অত্যন্ত কাম্য। পরিহাসের বিষয় যে আমাদের নেতারা আমাদের রাজনৈতিক পরিত্রাণের জন্য ন্যূনতম দাবি করার সাহস পান না।
আমরা এখন সর্বোচ্চ ট্র্যাজেডির মুখোমুখি। আজকের মতো সমস্যা ইসলামের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল ইতিহাসে দেখা যায়নি। এটা কোনো সম্প্রদায় বা সম্প্রদায়ের পতনের প্রশ্ন নয়; কিন্তু এটা হলো সর্বোচ্চ সমস্যা, যা সমগ্র ইসলাম এবং লাখ লাখ মানুষের ভাগ্যকে প্রভাবিত করবে। তাদের ভাগ্য, যারা সম্প্রতি পর্যন্ত ভারতে ইসলামের গৌরবের এবং সীমান্তের রক্ষক ছিলেন। সামনে আরো বৃহত্তর ভবিষ্যৎ রয়েছে, যদি সর্বভারতীয় ফেডারেশনের দাসত্ব থেকে রক্ষা করা যায়। আর কোনো ভুল করা সম্ভব না। প্রধান মন্ত্র হলো এখন না হলে কখনই নয়। হয় আমরা বেঁচে থাকব না হলে চিরতরে বিলীন হয়ে যাব। ভবিষ্যৎ আমাদের কেবল তখনই, যদি আমরা আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করি। তকদির দেবতাদের থেকে আসে না। এটি আমাদের নিজের হাতে থাকে। আমরা এটি তৈরি করতে বা ধ্বংস করে ফেলতে পারি। গত শতাব্দীর ইতিহাস যেন উন্মুক্ত সতর্কবার্তায় পূর্ণ। সে নিদর্শনগুলো যেকোনো জাতিকে দেয়া সতর্কতার মতোই সরল। আমাদের সম্পর্কেও কি এটাই বলা হবে যে আমরা সব সতর্কবাণী উপেক্ষা করে প্রাচীন ঐতিহ্যকে নিজেদের হাতে বিনষ্ট করে গেছি?
চৌধুরী রহমত আলী
মুহাম্মদ আসলাম খান, প্রেসিডেন্ট, খায়বার ইউনিয়ন
শেখ মুহাম্মদ সাদিক
ইনায়াত উল্লাহ খান, সেক্রেটারি, খায়বার ইউনিয়ন





