‘বাংলাদেশের পুরো গল্প কখনই বলা সম্ভব হবে না। বাঙালি ভাইদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা প্রকাশের উপযুক্ত কোনো শব্দ মানুষের শব্দভাণ্ডারে নেই।’ ভারতীয় আলোকচিত্রী কিশোর পারেখের বই ‘বাংলাদেশ আ ব্রুটাল বার্থ’-এর ভূমিকার শুরুতেই কথাগুলো লিখেছেন এস মুলগাওকার। প্রচলিত আছে অনেক সময় একটি ছবি নাকি হাজার শব্দের চেয়ে সহজে কোনো বিষয়কে প্রকাশ করে। এ কথার সত্যতা পাওয়া যাবে কিশোর পারেখের গ্রন্থে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একপলকে বুঝতে চাইলে এ বইয়ের পাতাগুলো উল্টে দেখলেই চলে। বাংলাদেশের বিজয়ের সেই অমোঘ মুহূর্তটিও আমাদের জন্য ধরে রেখেছেন কিশোর। রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কমান্ডার আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আর তাঁর দু’পাশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জগজিত্ সিং অরোরা এবং বাংলাদেশের মেজর হায়দার।
সশস্ত্র সংঘাত, যুদ্ধ এবং স্থান ও মানুষের ওপর তার প্রভাবকে ক্যামেরার লেন্সে আবদ্ধ করাই ওয়ার ফটোগ্রাফি। বলা হয় ওয়ার ফটোগ্রাফির সূচনা হয়েছিল ১৮৫০-এর দশকে সংঘটিত ক্রাইমিয়ার (১৮৫৩-১৮৫৬) যুদ্ধে। ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার রজার ফেনটন (১৮১৯-১৮৬৯), জেমস রবার্টসন (১৮১৩-১৮৮৮), ইতালীয়-ব্রিটিশ ফেলিস বিটো (১৮৩২-১৯০৯) ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান ক্যারল জাথমারি (১৮১২-১৮৮৭) প্রথমবারের মতো দুনিয়ার বড় কোনো সশস্ত্র সংঘাতকে ক্যামেরাবন্দি করেন বলে ইতিহাসবিদদের মত। এ
চারজনের ছবিতে হয়তো আধুনিক যুদ্ধ ও তার ফটোগ্রাফির নাটকীয়তা পাওয়া যায় না কিন্তু ইতিহাসে সেই আমলে দুর্বল প্রযুক্তি দিয়ে তারাই প্রথম যুদ্ধকে ফ্রেমে আবদ্ধ করেছিলেন। রজার ফেনটনই ছিলেন দুনিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার ফটোগ্রাফার। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে তার তোলা ছবি দি ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজে প্রকাশিত হয়েছিল।
এর কয়েক বছর পরেই ম্যাথিউ ব্রাডি, আলেক্সান্ডার গার্ডনার এবং অন্যরা ফেনটন, রাবর্টসন কিংবা বিটোর চেয়ে আরো স্পষ্ট ও বিশদভাবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্রের খাবরাখবর প্রচারে আলোকচিত্র কত দ্রুত একটি জরুরি মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল।
ব্রিটিশদের বেঙ্গল আর্মির শল্যচিকিত্সক জন ম্যাককশকে অনেক ইতিহাসবিদ প্রথম ওয়ার ফটোগ্রাফার হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি ১৮৪৮-৪৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধের সময় যুদ্ধরত অনেক কর্মকর্তা, তাদের স্ত্রী-সন্তানদের ছবি তুলেছিলেন। তিনি যুদ্ধে ব্যবহূত বিভিন্ন অস্ত্র এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞেরও ছবি তুলেছিলেন। তবে ম্যাককশের ছবি হয়তো সেভাবে যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধারণ করতে পারেনি। তাই প্রথম ওয়ার ফটোগ্রাফারের খেতাবটা রজার ফেনটনই পান।
১৮৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেনটন, রবার্টসন ও বিটো কলকাতায় পা রাখেন, উদ্দেশ্য, সিপাহি বিদ্রোহকে ক্যামেরাবন্দি করা। তারা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের ছবি তুললেন। লক্ষৌয়ের সিকান্দার বাগের প্রাসাদের সামনে ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহিদের মরদেহের ছবি তুললেন বিটো। এ ছবিই যুদ্ধের ভয়ানক চেহারাকে প্রথমবারের মতো আলোকচিত্রে তুলে ধরল।
এরপর ১৮৬১-৬৫ সময়কালে অনুষ্ঠিত আমেরিকার গৃহযুদ্ধে হ্যালি সিমস ও আলেক্সান্ডার গার্ডনার ওয়ার ফটোগ্রাফির প্রাথমিক কালের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হন। তারা যুদ্ধের আবেগ, উত্তেজনাকে ছবিতে তুলে আনতে চেষ্টা করলেন। যুদ্ধের বর্বরতাকে স্পষ্ট করতে তারা অনেক ক্ষেত্রে সেনাদের মরদেহগুলো সাজিয়ে ছবি তুলেছিলেন। তাদের ছবি প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয়েছিল, যা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে উন্মোচন করে।
বিশ শতকে ছোট-বড় সব সশস্ত্র সংঘাত ও যুদ্ধকে পেশাদার ফটোগ্রাফাররা ক্যামেরাবন্দি করেছেন। অনেক ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ দিয়েছেন। রবার্ট কাপাকে হয়তো কেউই ভুলতে পারবেন না। স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে ডি-ডে’র সেনা অবতরণ কিংবা প্যারিসের পতন— সবই তিনি তার ক্যামেরায় বন্দি করেছেন। ১৯৫৪ সালে ইন্দোচীনে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিহত হওয়ার আগে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া থেকে বিরাম নেননি।
যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করে দুনিয়ার অনেক আলোকচিত্রীই বিখ্যাত হয়েছেন। তাঁদের সাহস, ত্যাগকে দুনিয়া শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক আলোকচিত্রীর কাজ স্মরণীয় হয়ে আছে। এক কথায় তাঁদের ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণিক দলিল। দেশের আলোকচিত্রীরা ছাড়াও অনেক বিদেশী ওয়ার ফটোগ্রাফার, ফটোসাংবাদিক, আলোকচিত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তাদের ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রেখেছেন। বিদেশী ফটোগ্রাফারদের মধ্যে আছেন— ইরানের আব্বাস আত্তার, ব্রিটিশ ডোনাল্ড ম্যাককলিন, উইলিয়াম লাভলেস, মেরিলিন সিলভারস্টোন, ক্রিস স্টিল-পার্কিন্স, মার্ক এডওয়ার্ডস; মার্কিন ফটোসাংবাদিক ডেভিড বার্নেট, মেরি এলেন মার্ক, ডেভিড হিউম কেনেরলি; ফরাসি ব্রুনো বার্বি, রেমন্ড দেপার্দো, মার্ক র্যাবো, মিশেল লরেন্ট; ভারতের কিশোর পারেখ, রঘু রাই, রবিন সেনগুপ্ত, বাল কৃষ্ণান, অমিয় তরফদার; জার্মান হুর্স্ট ফাজ, টোমাস বিলহার্ডট প্রমুখ।
আব্বাস আত্তার
ইরানি আব্বাস আত্তার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বগুড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পে বন্দি ভারতীয় মেজর ফুল সিংয়ের বিখ্যাত ছবিটি আব্বাসেরই তোলা। ঢাকায় বাংলাদেশের নতুন পতাকা সেলাইয়ের ছবিটিও তাঁর তোলা। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিয়াজির বেশকিছু ছবি তুলেছেন আব্বাস; যুদ্ধেক্ষেত্র থেকে আত্মসমর্পণের টেবিল পর্যন্ত। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় বাঙালির বিজয় উল্লাস কিংবা পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা সবই আব্বাস তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও আব্বাস ভিয়েতনামের রণাঙ্গনে কাজ করেছেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবও তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এই বিপ্লবের পর তিনি দেশ ছাড়েন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সালে তিনি মেক্সিকোর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান। তিনি এমনভাবে মেক্সিকোর ছবি তুলেছিলেন, মনে হয়েছিল যেন কোনো উপন্যাস লিখছেন। তাঁর এ ছবি ও ভ্রমণবৃত্তান্ত নিয়ে রিটার্ন টু মেক্সিকো, জার্নি বিয়ন্ড দ্য মাস্ক নামে একটি বইও প্রকাশ হয়েছিল। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত চীন থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র ইসলামী তত্পরতার ছবি তুলেছেন এবং এসব নিয়ে আল্লাহু আকবর নামে একটি প্রদর্শনী হয়েছে। শেষ জীবনে ইসলাম ও রাজনীতি নিয়ে বেশকিছু বই লিখেছেন। আব্বাসের জন্ম ১৯৪০ সালে ইরানে।

ডন ম্যাককলিন
ব্রিটিশ ফটোসাংবাদিক স্যার ডন ম্যাককলিনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ৯ অক্টোবর। যুদ্ধকালীন ছবি তোলার জন্য তিনি বিখ্যাত। ১৯৫৯ সালে লন্ডনের একটি আন্ডারওয়ার্ল্ড দলের ছবি তোলেন, যা ছাপা হয় দ্য অবজারভারে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত সানডে টাইমস ম্যাগাজিনের বিদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে নাইজেরিয়ার সংঘাতময় অঞ্চল বিয়াফরায় কাজ করেন। একই সময় আফ্রিকার এইডস মহামারীতে আক্রান্তদের নিয়েও কাজ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
ডন ম্যাককলিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও ছবি তুলেছেন। তাঁর ছবিতে মূলত উঠে এসেছে ভারতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া বাঙালিদের দুর্দশা। কলেরায় মৃত স্বজনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ণ, ছিন্নবস্ত্রের মানুষের ছবি সহসাই মনে করিয়ে দেবে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের ত্যাগকে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তা করতে এ দেশে এসেছিলেন মাদার তেরেসা। তাঁর একটি ছবিও তুলেছিলেন ডন ম্যাককলিন।

জন ডাউনিং
ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার জন ডাউনিংয়ের জন্ম সাউথ ওয়েলসে। ১৯৫৬ সালে ডেইলি মেইলে কাজ করার মাধ্যমে তাঁর পেশাদার ফটোগ্রাফি ক্যারিয়ার শুরু। ১৯৬৪ থেকে ২০০১ পর্যন্ত কাজ করেছেন দি এক্সপ্রেসে। তারপর থেকে ফ্রিল্যান্স কাজ করছেন। ফটোগ্রাফার হিসেবে কাভার করেছেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বৈরুত, ইরাক, সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র। বসনিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন বহুবার। বহু সপ্তাহ কাটিয়েছেন সুদানের গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কলকাতার কাছে এক শরণার্থী শিবিরে জন ডাউনিংয়ের একটি ছবি তুলতে বেশ কয়েক ঘণ্টা কাদায় ডুবে অপেক্ষা করেছেন। তাঁর তোলা একটি ছবিতে দেখা যায়, একজন বিদেশিনী নার্স একটি শিশুকে ভ্যাকসিন দেয়ার চেষ্টা করছেন। শরণার্থী শিবিরগুলো তখন কলেরার আক্রমণে মৃত্যুপুরী। নার্সের হাতে থাকা ভ্যাকসিনেশনের যন্ত্রটি দেখে শিশুটি ভয়ে পালাতে চাচ্ছিল। আর নার্সও আন্তরিক ভঙ্গিতে শিশুটিকে অভয় দিচ্ছিলেন। ফটোগ্রাফির জন্য জন ডাউনিং জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে তিনি রয়্যাল ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশনের সম্মানিত ফেলো নির্বাচিত হন।

মেরি এলেন মার্ক
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ক্যামেরায় ধারণ করা নারী আলোকচিত্রী মেরি এলেন মার্ক। এ মার্কিন আলোকচিত্রীর জন্ম ১৯৪০ সালে। মারা গেছেন ২০১৫ সালের ২৫ মে মাসে। তাঁর ফটোগ্রাফির উদ্দেশ্য ছিল, সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষকে ক্যামেরার ফ্রেমে তুলে আনা।
মেরির ছবিগুলো ১৮টি সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ছবি প্রকাশিত হয়েছে লাইফ, রোলিং স্টোন, দ্য নিউইয়র্কার, নিউইয়র্ক টাইমস আর ভ্যানিটি ফেয়ারে। জীবনে পেয়েছেন বহু সম্মাননা। তিনবার পেয়েছেন রবার্ট এফ কেনেডি জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড। মৃত্যুর আগের বছর ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অর্গানাইজেশন থেকে আউটস্ট্যান্ডিং কন্ট্রিবিউশন ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
মেরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবিও তুলেছেন। তাঁর ছবিতে মূলত দেখা গেছে বন্দি রাজাকারদের। তবে তাঁর তোলা যে ছবিটি সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষক, সেটি হচ্ছে এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার। হাফপ্যান্ট পরা শীর্ণ দেহের এক কিশোর। যার হাতে তাঁর প্রায় সমান দৈর্ঘ্যের একটি রাইফেল। মাথায় দেয়া হেলমেটটি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে কুড়িয়ে পাওয়া, স্পষ্টতই তাঁর মাথার চেয়ে বড় আকারের।

ব্রুনো বার্বি
মরক্কোয় জন্ম নেয়া ফরাসি আলোকচিত্রী ব্রুনো বার্বি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন গুরুত্বপূর্ণ ফটোগ্রাফার। তাঁর জন্ম ১৯৪১ সালে। তাঁর চার দশক সময়কাল বিস্তৃত ক্যারিয়ারে পাঁচ মহাদেশ ঘুরেছেন, ক্যামেরায় ধারণ করেছেন বহু যুদ্ধ।
সুইজারল্যান্ডে ফটোগ্রাফি এবং গ্রাফিক আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৬৪ সালে কাজ শুরু করেন ম্যাগনাম ফটোজের সঙ্গে। ষাটের দশকে প্যারিসের রাস্তায় বিখ্যাত ছাত্র বিক্ষোভের ছবি তুলেছেন। নিজেকে ‘ওয়ার ফটোগ্রাফার’ হিসেবে পরিচয় দিতে না চাইলেও তিনি নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য, কম্বোডিয়া, ইরাক, কুয়েতসহ কাভার করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ব্রুনো বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে তৈরি যৌথবাহিনীর যোদ্ধা এবং শরণার্থী শিবিরের ছবি তুলেছেন।

রেমন্ড দেপার্দো
ফরাসি আলোকচিত্রী, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা রেমন্ডের জন্ম ১৯৪২ সালে। স্বশিক্ষিত আলোকচিত্রী, ফটোসাংবাদিক রেমন্ডের পেশাদার কাজ শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, শাদ, বিয়াফরার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করেছেন। ২০১২ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিকৃতিটি তাঁরই তোলা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি বিখ্যাত ছবি— কাঁধে রাইফেল ফেলে গ্রামের কর্দমাক্ত পথে একসারিতে হেঁটে যাওয়া একদল মুক্তিযোদ্ধার ছবি। ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর বিখ্যাত যশোর রোডে একটি ভারতীয় ট্যাংকের এগিয়ে যাওয়াকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন রেমন্ড। যশোর মুক্ত হওয়ার পর রাইফেল উঁচিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লাস করার ছবিটিও অনেকের মনে গেঁথে থাকবে। এছাড়া রেমন্ড তাঁর ক্যামেরায় শরণার্থী শিবিরে বাঙালিদের দুর্দশা, আত্মসমর্পণ করা পাকিস্তানি সেনা এবং আটক রাজাকারদের ছবিও তুলেছেন।

উইলিয়াম লাভলেস
ব্রিটিশ সাংবাদিক উইলিয়ামের জন্ম ১৯২৪ সালের ২৪ অক্টোবর। যুদ্ধ থেকে হলিউড তারকা— সবই ছিল তাঁর ছবি তোলার বিষয়বস্তু। এলিজাবেথ টেলর, রিচার্ড বার্টনের মতো তারকাদের ছবি তুলেছেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সেনাদের যশোর রোড সংস্কার করার ছবি তুলেছিলেন এই উইলিয়াম। কাকতালীয়ভাবে ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ ৭৮ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মেরিলিন সিলভারস্টোন
একজন খ্যাতনামা নারী আলোকচিত্রী। ১৯২৯ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে মেরিলিন ফটোসাংবাদিকতা শুরু করেন। পরের বছর রবিশঙ্করের ছবি তোলার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ভারতে আসেন। এর পর ধীরে ধীরে ভারতের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। চীনের আক্রমণে তিব্বত থেকে দালাইলামা ভারতে আশ্রয় নেন। সে সময় মেরিলিন দালাই লামার ভারতে পা রাখার ছবি তোলেন। এ ছবি লাইফ ম্যাগাজিনে লিড হয়েছিল।
১৯৬৭ সালে তিনি ম্যাগনাম ফটোজে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটির পাঁচজন নারী সদস্যের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। ইরানের শাহর সিংহাসনে আরোহণের অনুষ্ঠান মেরিলিন কাভার করেছিলেন।
মেরিলিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবিও তুলেছেন। তাঁর ছবিগুলো মূলত বাঙালি শরণার্থীদের। তবে এ শরণার্থীদের মধ্যে নারী ও শিশুদের দুর্দশা মেরিলিনের ক্যামেরায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ছিন্ন-ভিন্ন দেহের একটি ছবিও তুলেছেন তিনি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিয়েছিলেন। মঞ্চে ভাষণরত বঙ্গবন্ধুর একটি বিখ্যাত ছবি মেরিলিনেরই তোলা।
খ্রিস্টান হিসেবে জন্ম নিলেও মেরি পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এবং একসময় বৌদ্ধ নান হয়ে যান। ১৯৯৯ সালে এ নারী আলোকচিত্রী মৃত্যুবরণ করেন।

কিশোর পারেখ
কিশোরের জন্ম ১৯৩০ সালে ভারতে। ১৯ বছর বয়সে প্রথমবার ক্যামেরা হাতে তুলে নেন। ১৯৫৬ সালে কিশোর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় ভর্তি হন তার প্রিয় বিষয় ফিল্মে। ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ঝুঁকে পড়েন ফটোগ্রাফিতে। সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র ও স্থিরচিত্রের ওপর ডিগ্রি লাভের পর ফটোসাংবাদিকতা শুরু করেন। কিশোর তাঁর ফটোগ্রাফি ক্যারিয়ারের শুরুতে লাইফ ম্যাগাজিন এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় সাতটি ক্যাটাগরির মধ্যে ছয়টি পুরস্কার জিতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে শিক্ষাজীবন শেষে ভারতে ফিরে আসেন। এর পর ছয় বছর কিশোর কাজ করেন ফটো জার্নালিস্ট হিসেবে।
কিশোর হতে চেয়েছিলেন সিনে ক্যামেরাম্যান। সিনেমা বানানোর আকাঙ্ক্ষায় দেশে আসার পর পরই মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে চেষ্টা করেন কাজ করার। কিন্তু সেভাবে সুযোগ মেলেনি।
কিশোরের তখন ছিল একটা লাইকা ক্যামেরা। এটি তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিয়ে যায় ভিন্ন পথে। তাঁর তোলা জিডি বিড়লার একটি ছবি তাঁকে নিয়ে যায় ফটোসাংবাদিকতার পথে। বিড়লা পরিবার কিশোরের কাজে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন তাদের পত্রিকা দ্য হিন্দুস্তান টাইমসের চিফ ফটোগ্রাফার হিসেবে।
তখনকার দিনে ৫০০ রুপির চাকরি পেলেই তরুণরা বর্তে যেতেন, কিন্তু বিড়লার প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে কিশোর ১০ হাজার রুপি পারিশ্রমিক আর গাড়ি-বাড়ি চেয়ে বসেন। কিন্তু বিড়লা তাতেও রাজি হয়ে যায়।
কিশোরের হাত ধরে মাসখানেকের মধ্যেই হিন্দুস্তান টাইমসের ফটোগ্রাফির চেহারা পাল্টে যেতে শুরু করে। নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন কিশোর। ’৬১ থেকে ‘৬৭ সালকে বলা হয় ইনডিয়ান প্রেস ফটোগ্রাফির স্বর্ণযুগ। বিহারের দুর্ভিক্ষ কাভার করতে গিয়ে তিনি তাঁর মেধার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটান। জওহরলাল নেহরুর জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে প্রাঞ্জল ডকুমেন্টেশন হলো কিশোরের ছবি।
১৯৬৭ সালের পর কিশোর পারেখ ফটোসাংবাদিকতা ছেড়ে দেন। চলে যান সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে। যোগ দেন দ্য এশিয়া ম্যাগাজিনে। সেখানে তিনি এক্সক্লুসিভ কিছু ফটোসিরিজ করেন। এর পর কাজ করেন দ্য প্যাসিফিক ম্যাগাজিন লিমিটেডে। সেখানে ছিলেন ফটো-এডিটর।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোর হংকংয়ে। কিশোর তখন ট্রাভেল ও ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতে ব্যস্ত। একদিন কিশোরকে খুব অস্থির দেখাচ্ছিল। তাঁর ছেলে স্বপন পারেখের বয়স তখন পাঁচ বছর। স্বপন সেদিনের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, বাবা বলে উঠলেন, ‘আমার দেশ জ্বলছে আর আমি এখানে বসে এসব করছি।’ উল্লেখ্য, কিশোরের জন্ম ১৯৩০ সালে অবিভক্ত ভারতে, তাই বাংলাদেশকেও তাঁর নিজের দেশই মনে করতেন। এর পর চার শিশুসন্তান ও স্ত্রীকে পেছনে রেখে ভারতে রওনা দিলেন। নামলেন মুম্বাইয়ে, সেখান থেকে এক বন্ধুর কাছে কলকাতায়। বন্ধুকে রাজি করালেন বাংলাদেশের সীমান্তে তাঁকে পৌঁছে দিতে। সঙ্গে ৪০ রোল ফিল্ম। সীমান্তে পৌঁছে দেখলেন, একটি সামরিক হেলিকপ্টার অনুমতিপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে। সেটা ছিল ৮ ডিসেম্বর। কিশোরের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র না থাকায় সেনাবাহিনীর মেজর তাকে সঙ্গে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন কিশোর বলে উঠলেন, ‘হয় আমাকে সঙ্গে নাও নয়তো এখানে গুলি করে রেখে যাও।’ রণাঙ্গনের বিখ্যাত সশস্ত্র যোদ্ধাদের মুখে এমন কথা শোনা যায়, এবার শোনা গেল এক আলোকচিত্রীর মুখে। সেই মেজর আর কিশোরকে ফেলে যেতে পারলেন না। কিশোর বাংলাদেশের রণাঙ্গনে পৌঁছে গেলেন, মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সখ্য গড়লেন। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে একটা জিপ দিলেন।

এর পর পাঁচদিন ছবি তুললেন। ১৬ ডিসেম্বরের সাক্ষী হলেন। তার পর আরো এক বা দুদিন বাংলাদেশে ছিলেন। পরে ফিরে যান হংকংয়ে। বাসায় না ঢুকে কিশোর সোজা চলে যান স্টুডিওতে। সে ক’দিনে কিশোরের ওজন কমে গিয়েছিল। কিশোর জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে তিনি শুধু পচা মাংসের গন্ধ পেয়েছিলেন।কিশোর পারেখের স্ত্রী সরোজ পারেখ স্মৃতিচারণ করেছেন: ১৯৬৭ সালে হিন্দুস্তান টাইমসের চাকরি ছাড়ার পর সপরিবারে হংকং চলে আসে এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁরা হংকংয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি সমুদ্রসৈকতে ছবি আঁকতে পছন্দ করত। উপমহাদেশ যখন অগ্নিবলয় এবং যুদ্ধকবলিত, এ অবস্থায় বিবেকের তাড়নায় সিদ্ধান্ত নিল ভারত হয়ে বাংলাদেশে গিয়ে যুদ্ধকে কাভার করার। ঢাকায় অবস্থানকালে তাঁর পক্ষে একজন সিভিলিয়ান হয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি তোলা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। তাই তিনি পাকিস্তান আর্মির পোশাক জোগাড় করে ঐতিহাসিক কাজগুলো সাহসিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিলেন। এর জন্য তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরাও পড়েন। পরে অবশ্য বোঝাতে সক্ষম হন, তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং ফটোসাংবাদিক। কোনো চাকরিগত বাধ্যবাধকতা নয়, আর্থিক কোনো লাভ নয়, স্রেফ একটি যুদ্ধকে ইতিহাসের অংশ করে রাখার জন্যই চলে আসেন যুদ্ধাক্রান্ত বাংলাদেশে।







