প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্টি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
দ্বিতীয় অধ্যায়
অনুবাদকরা ও জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ
(চতুর্থাংশ)
সেই সময়ের পর থেকে ১৪৯১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু পর্যন্ত ক্যাক্সটন তাঁর অভিজাত খদ্দেরদের জন্য বিস্তর বই ছেপে গেছেন। তাঁর প্রকাশনাগুলোর মধ্যে দুই ধরনের রচনা ছিল: দরবারি কবি যেমন— চসার, গাওয়ার ও লিডগেইটদের লেখা এবং তাঁর নিজের বা তাঁর পৃষ্ঠপোষকদের অনুবাদ করা ফরাসি বইয়ের গদ্য সংস্করণ। ক্যাক্সটন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ ছেপেছিলেন: ওভিদের মেটামরফসিস; গোল্ডেন লেজেন্ড (Jacobus de Voragine-এর Legenda Aurea নামের এক ত্রয়োদশ শতকের সন্ত-জীবনী সংগ্রহের ফরাসি সংস্করণ থেকে); Mirrour of the World (Image du Monde নামের এক জনপ্রিয় মধ্যযুগীয় জ্ঞানরাজির সংকলন থেকে); Aesop’s Fables (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে লিয়ন-এ ছাপা একটি ফরাসি সংস্করণ থেকে)।
কথ্য উপভাষাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৈচিত্র্য থাকলেও ক্যাক্সটন যখন তাঁর ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, তখন ইংরেজির লন্ডনীয় রূপভেদটি লেখার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল। যদিও নানা সমস্যার একটি ছিল এই যে, তাঁর ছাপাখানায় কর্মরত কম্পোজিটরদের বেশির ভাগই ছিলেন বিদেশী এবং ইংরেজি লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁরা প্রশিক্ষিত ছিলেন না। এ কারণে ক্যাক্সটনের ছাপা বইগুলোয় বানান হয়ে ওঠে ‘অস্থির’, যদিও কালক্রমে ছাপাখানাটি ‘প্রমিত মানের অভিভাবক’ (guardian of the standard) হয়ে ওঠে। ক্যাক্সটন তাঁর অসংখ্য অনুবাদ ও ছাপা অন্যান্য বইতে লন্ডন এবং দক্ষিণপুব অঞ্চলের ইংরেজির, বিশেষ করে সেখানে প্রচলিত বানানের প্রতিরূপ রচনা করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল: ‘তাঁর এবং তাঁর উত্তরাধিকারীদের ছাপাখানা থেকে বের হওয়া বইগুলো লন্ডনীয় ইংরেজির প্রচলন শুরু করল, আর তাতে করে সবচেয়ে বড় যে কাজটি হলো তা হচ্ছে, দ্রুত সেই ইংরেজি লোকে গ্রহণ করল।’
ছাপাখানা আসার আগেই ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ভাষাতাত্ত্বিক নানা পরিবর্তন ঘটে গেলেও ক্যাক্সটন যখন তাঁর ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, ইংরেজি তখনো বিকশিত হচ্ছিল। যে ভাষার ‘বানান পদ্ধতি বা বানানতত্ত্ব তখনো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল’, ক্যাক্সটনের প্রভাবাধীন মুদ্রণের ফলে সেই বানান পদ্ধতি দানা বাঁধার ‘দুর্ভাগ্যজনক’ পরিণতি বরণ করেছিল। আর সে কারণেই আজ ইংরেজি যেভাবে লিখিত হয় এবং যেভাবে উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে এত প্রভেদ।
Eneydos-এর ‘প্রাককথন’-এ ক্যাক্সটন তাঁর অনুবাদ পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন; বইটি ছিল ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ফরাসি Eneydes-এর একটি ‘ইংরেজি’ সংস্করণ, ওদিকে আবার Eneydes ছিল ভার্জিলের ঈনীড-এর একটি স্বাধীন সরল বর্ণনা, যেটা সম্ভবত আগের একটি ফরাসি সংস্করণ থেকে ধার নেয়া, যেখানে বোক্কাশিও আর অন্যান্য লেখকের প্রভাব মোটেই দুর্লক্ষ্য নয়। নিজের সংস্করণে ক্যাক্সটন এমন একটি ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন, যে ভাষা তাঁর নিজের পাঠকের কাছে বোধগম্য হবে বলে তিনি মনে করেছেন: ‘I haue reduced and translated this sayd booke in to our englysshe, not ouer rude ne curyous, but is suche termes as shall be vnderstanden।’ ক্যাক্সটন তাঁর মুদ্রিত রচনাগুলোয় যেসব প্রাককথন (prologue) ও অন্ত্যভাষ (epilogue) জুড়ে দিতেন, সেখানে এ ধরনের আত্মবিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখা যেত। সম্ভবত বই বিক্রির তাগিদে অথবা তাঁর অনুবাদের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষা কীভাবে উপকৃত হবে স্রেফ সে ব্যাপারটির ওপর গুরুত্বারোপ করতে তিনি ভাষাটির তখনো অপরিশীলিত বা ‘কর্কশ’ বৈশিষ্ট্যের এবং সেটার শোভাবর্ধন করার ক্ষেত্রে তার নিজের প্রচেষ্টার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন চসার এবং অন্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
একই সঙ্গে ক্যাক্সটনের অনুবাদগুলোর বিশেষ অভিমুখ তাঁর মূল টেক্সটগুলোর উত্স এবং তাঁর পাঠকদের রুচি নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে সেখানে একটি ‘ফরাসি’ স্বাদ বজায় থেকেছে, বিশেষত সেই অনুবাদ ফরাসি শব্দক্রমের প্রতি সংলগ্ন থাকায় এবং প্রায়ই ফরাসি শব্দ বা প্রতিশব্দ ধার নেয়ায়; এবং এ চর্চাটি ইংরেজি শৈলী ও শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধিতেও সহায়ক হয়েছে।
ক্যাক্সটন এবং তাঁর পরবর্তী মুদ্রকরা ‘অনুবাদকদের পরিশ্রম’-কে তাঁদের কাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই গণ্য করেছেন; তাঁরা স্বদেশী ভাষায় রচনার অভ্যাসে প্রেরণা জোগানোর মাধ্যমে ‘দেশী ভাষায় রচিত সাহিত্যের সম্ভাবনা’ বৃদ্ধি করেছেন। আরো সাধারণভাবে বললে, বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানের প্রসার বৃদ্ধিতে মুদ্রণ বেশ সহায়তা করেছে। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের আগে গোটা ইউরোপে প্রায় ৩৫ হাজার বই মুদ্রিত হয়েছিল। আর সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল লাতিন ভাষায় রচিত। পরবর্তী ১৫০ বছরে কেবল ইংল্যান্ডেই ২০ হাজার আইটেম ইংরেজিতে ছাপা হয়। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মোটামুটি এক ধরনের সাক্ষরতা অর্জন করে। কাজেই স্বদেশী ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যমই ছিল না, যা লেখকরা ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার করছিলেন; সেটা আসলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ পড়ছিলেনও বটে।
পণ্ডিতরা যখন লাতিন ও ইংরেজির দোষ-গুণ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছিলেন, তখন কিন্তু ‘অনুবাদকরাই সেই বিষয়টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিচ্ছিলেন।’ রেনেসাঁ জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুনর্জন্ম ঘটাল, ধ্রুপদী আদর্শগুলো এবং নতুন নতুন আবিষ্কারের প্রতি মানুষ আবার কৌতূহলী হয়ে উঠল। প্রাচীন যুগের এবং ভিনদেশগুলোর প্রজ্ঞা কেবল পণ্ডিত ও বিদগ্ধ মানুষগুলোর সম্পত্তি রইল না। কূটনীতিক, রাজসভাসদ ও বণিকদের এ জ্ঞানের চাহিদা মেটাতে অনুবাদের পর অনুবাদ হতে লাগল। টমাস নর্থ প্লুটার্ক অনুবাদ করলেন; টমাস এলিয়ট প্লুটো, সিসেরো, সেনেকা এবং অন্যান্য ধ্রুপদী লেখকের রচনা অনুবাদ করলেন এবং ইরাসমাস, কেলভিন ও লুথারের রচনা ইংরেজিতে অনূদিত হলো। ইংরেজি ভাষার ওপর এসবের প্রভাবটা এল এন্তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ ঋণ এবং নতুন শব্দ তৈরির মধ্যে দিয়ে: ইংরেজি ভাষায় যুক্ত হলো প্রায় ১০ হাজার নতুন শব্দ। ‘নিছক সাহিত্যিক শব্দাবলি’ (inkhorn terms) বা ‘পণ্ডিতি ভাষা’ এবং ‘সহজ-সরলতা’র মধ্যে একটা লড়াই চলল গোটা ষোড়শ শতক ধরে।
ইংল্যান্ডে এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে স্বদেশী ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে বাইবেলের অনুবাদ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। জন ওয়াইক্লিফ (John Wycliffe; Wyclif বা Wiclif; মৃত্যু: ১৩৮৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং তাঁর অনুসারী ললার্ডরা সেই চতুর্থ শতকে সন্ত জেরোম রচিত লাতিন Vulgate-এর ওপর ভিত্তি করে ইংরেজিতে বাইবেলের প্রথম সম্পূর্ণ অনুবাদ সম্পন্ন করেন (ষষ্ঠ অধ্যায়ে Vulgate সম্পর্কে আরো কথা বলা হয়েছে)। ওয়াইক্লিফ এবং তাঁর সহযোগীরা লাতিন উত্সবিশিষ্ট এক হাজারেরও বেশি শব্দ ইংরেজিতে প্রচলনের কৃতিত্বের দাবিদার। এসব শব্দের অনেকগুলোরই টেকনিক্যাল অর্থ ছিল আর সেগুলোয় -able, -ible, -ent, -al, -ive— এ ধরনের শেষাংশ ছিল, যেগুলো এখন ইংরেজি ব্যুত্পন্ন শব্দ বা derivative-এর মামুলি বা সাধারণ উপাদান। ললার্ডদের করা অনুবাদ আরো কিছু বাইবেল অনুবাদের একটা পথ দেখাল এবং এসব অনুবাদ সাধারণভাবে ইংরেজি ভাষার ওপর তাদের চিহ্ন রেখে গেল। তবে সবচেয়ে নিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটি ছিল টিনডেলের, যাঁর বাইবেলটির উত্স ছিল মূল গ্রিক ও হিব্রু।
উইলিয়াম টিনডেল (আনুমানিক ১৪৯৫-১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দ) গ্লস্টারশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন এবং অক্সফোর্ডের মাগডালেন কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৫১৯ সালে তিনি যাজকীয় বৃত্তি গ্রহণ করেন। প্রথম দিকেই তিনি ধর্মদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে সে অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেও একজন সমস্যা সৃষ্টিকারী হিসেবে তাঁকে সতর্ক করে দেয়া হয়। ইংরেজিতে বাইবেল অনুবাদ করার জন্য তাঁর পরিকল্পনা লন্ডনের বিশপের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের উদ্দেশে ইংল্যান্ড ত্যাগ করেন এবং সেখানে তাঁকে পলাতকের মতো ঘুরে বেড়াতে হয়। জার্মানিতে তাঁর সঙ্গে লুথারের পরিচয় ঘটে। তারপর তিনি নিউ টেস্টমেন্ট অনুবাদ করেন এবং তা প্রকাশ করেন। অ্যান্টওয়ার্পে তিনি ওল্ড টেস্টমেন্টের প্রথম পাঁচটি খণ্ড বা ‘পেন্টাটিউক’-এর তাঁর করা অনুবাদ প্রকাশ করেন। রাজা পঞ্চম চার্লসের চরদের কাছে এক ইংরেজ বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে ধরিয়ে দিলে ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ অক্টোবর ব্রাসেলসের কাছে ভিলভোর্ডে উইলিয়াম টিনডেলকে শ্বাসরুদ্ধ করে এবং পুড়িয়ে মারা হয়।
(ক্রমশ)






