‘ঊনবিংশ শতকের মাঝখানে এসে
আমার রেলগাড়ি ভেঙে যায়
তখন থেকেই আমি আটকা পড়ে আছি
যখন আমি নেমে আসি
দেখলাম আমি বিংশ শতক পার হয়ে এসেছি।’
ডেরেক ওয়ালকট এখন একুশ শতক ছেড়ে অনন্তে মিলিয়ে গেলেন ১৭ মার্চ। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ছোট্ট দ্বীপ এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ার ডেরেক ওয়ালকট কবি ও নাট্যকার এবং পৃথিবীর কয়েকটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক। ১৯৯২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
ডেরেক ওয়ালকট চিত্রশিল্পী সেজানের মতো হতে চেয়েছিলেন, কবিতায় হতে চেয়েছিলেন ডিলান টমাস। তাঁর আঁকা ছবি প্রশংসিত হয়েছে আর কবিতা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে খ্যাতির শিখরে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ২৪টি, নাটক ২৫টি ও অন্যান্য নন-ফিকশন ৮টি।
দুজন নোবেল বিজয়ী কবি জোসেফ ব্রডস্কি ও সিমাস হিনির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব বহুল আলোচিত।
মাতৃভূমির মালিকানা বদলে যায়
২৩৮ বর্গমাইলের একটি মাতৃভূমি, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ছোট একটি দ্বীপ সেন্ট লুসিয়া বিভিন্ন চুক্তির কারণে বহুবার হাতবদল হতে হতে ১৯৭৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
শুরুটা ফরাসি জলদস্যু ফ্রাঁসোয়া লে ক্লার্কের সেন্ট লুসিয়া অভিযান দিয়ে ১৫৫০ সালের দিকে; কিছুকাল পর ফরাসি কর্তৃত্বের অবসান ঘটায় ওলন্দাজ অভিযাত্রা। তারও অবসান ঘটে ১৬০৫-এ যখন ৬৭ জন কলোনি স্থাপনকারীকে নিয়ে ব্রিটিশ জাহাজ অলিভ ব্রাংক্ট সেখানে পৌঁছে। পাঁচ সপ্তাহে দ্বীপের বহিরাগতদের জনসংখ্যা অসুখ ও স্থানীয় দ্বন্দ্বে ৬৭ থেকে ১৯-এ নেমে আসে। তারাও পালিয়ে যায়। ১৬৩৫-এ ফরাসিরা এ দ্বীপ দখল করে নেয়। এভাবেই চলতে থাকে।
এই ছোট্ট দ্বীপ দুজন নোবেল লরিয়েটের মাতৃভূমি— ১৯৭৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল আর্থার লিইউইসের, আর ১৯৯২ সাহিত্যের নোবেল ডেরেক ওয়ালকটের। ডেরেকের যখন জন্মে ২৩ জানুয়ারি ১৯৩০ সাল, সেন্ট লুসিয়া তখন একটি ক্যাথলিক অধ্যুষিত ব্রিটিশ কলোনি। তাঁর বাবা ছবি আঁকতেন, কবিতা লিখতেন, খুব স্বল্পায়ু নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তাঁর মা স্কুলশিক্ষক যখন যমজ পুত্র নিয়ে গর্ভবর্তী, সে অবস্থায় ৩১ বছর বয়সে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। যমজ দুজনের একজন পরবর্তী সময় ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ডেরেক ওয়ালকট এবং অন্যজন নাট্যকার ও পরিচালক রোডেরিক ওয়ালকট।
শৈশব— ডেরেকের নিজের কথা
আমার পারিবারিক প্রেক্ষাপটের সবটা জুড়ে কেবলই আমার মা। মা ছিল বিধবা। খুব কম বয়সে আমার বাবার মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স ৩১ বছরই হবে। আর ছিল আমার যমজ ভাই এবং বোন। আমাদের দুজন ফুপুও ছিল। তবে নিজের পরিবার মানে তখন আমার মা, আমার ভাই, আমার বোন এবং আমি। খুব ছোটবেলার স্মৃতি আমার মনে আছে। আমার মা ছিলেন একজন শিক্ষক, সারা বাড়ি আবৃত্তি করে বেড়াত। আমার বাবার আঁকা ড্রইং, বাবার লেখা কবিতা, বসার ঘরে দেয়ালে টাঙানো বাবার আঁকা জলরঙ ছবি— তাঁর আঁকা মূল ছবিগুলোই আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। আর ছিল দারুণ দারুণ বই, চার্লস ডিকেন্সের অনেকগুলো, ওয়াল্টার স্কটেরও আইভান হো, আর প্রচুর কবিতার বই। অনেকগুলো ধ্রুপদ রেকর্ডসহ একটি পুরনো কলের গান। শিল্পের প্রতি আমার পরিবারের বরাবরই আকর্ষণ ছিল। একটি ফরাসি ক্যাথলিক দ্বীপে সংখ্যালঘু মেথোডিস্টদের মাঝখান থেকে এসে আমরা দলছুট বোধ করতাম।

সেন্ট লুসিয়ায় ফরাসি প্রধান ধর্মযাজক যে নসিহত করতেন, তা ছিল ভয়ঙ্কর পুরনো ধাঁচের, পক্ষপাতপূর্ণ মধ্যযুগীয় এবং অনেকটা তেড়ে আসা ক্যাথলিসিজমের মতো। সেখানে যে তত্ত্বের শিক্ষা দেয়া হতো, তাতে প্রটেস্ট্যান্টদের জন্য বরাদ্দ ছিল অনিশ্চয়তা। কাজেই আমাদের অবস্থানটির প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আমরা অনুভব করতাম। এ সংকট দেখা দেয়নি, তবুও আমরা অনুভব করতাম আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে। এটা আমার জন্যও ভালোই ছিল, প্রটেস্ট্যান্ট হিসেবে আমি বৃহত্তর কৃর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে পারতাম। সে সময় আমার প্রজন্মের আমার বয়সের কেউ চার্চের সম্পূর্ণ ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস পেত না। এমনকি ষষ্ঠ গ্রেডে পড়ার সময় আমি ও আমার বন্ধুরা ধর্মীয় তত্ত্ব নিয়ে ভয়ঙ্কর বিতর্ক করতাম। এটা একটা দারুণ কাজ। আমি মনে করি, তরুণ লেখকদের গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়।
আমার মার বয়স প্রায় ৯০ (১৯৮৬ সালে দেয়া সাক্ষাত্কারে ডেরেক ওয়ালকট বলছেন), এখনো অবিরাম আমার বাবা সম্পর্কে কথা বলতেই থাকেন। বাবার অনুপস্থিতি আমার মার মনে যে গভীর বেদনা সৃষ্টি করেছে, আমি সারা জীবনই তার সঙ্গে পরিচিত। আর সেই সঙ্গে বাবাকে নিয়ে তাঁর যে অহঙ্কার, তাও আমার জানা। কানের ইনফেকশন ম্যাসোডাইটিসে তাঁর মৃত্যু হয়। সে সময় সেন্ট লুসিয়ায় চিকিত্সা পদ্ধতি ছিল হাতুড়ে ও চিকিত্সার সুযোগও যত্সামান্য। আমি জানি অপারেশন করতে বাবাকে বার্বাডোজ যেতে হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর কথা কিংবা এ ধরনের কিছু আমার স্মৃতিতে নেই কিন্তু বাড়িতে তাঁর আঁকা ছবিগুলো থাকার কারণে আমি সবসময় তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতাম। ডিম্বাকার একটি ফ্রেমে আমার মায়ের পোর্ট্রেটের পাশে তাঁর জলরঙের একটি আত্মপ্রতিকৃতি ছিল। বাবার আঁকা আমার মায়ের ছবিটা তেলরঙের, অপেশাদার শিল্পীর কাজ হিসেবে এটাকে বেশ চমত্কারই বলতে হবে। একবার সাধারণ কাপড়ে তৈরি একটি মঞ্চের পেছন পর্দা পেয়ে যাই, তাতে বাবার আঁকা পূর্ণিমা রাতের দৃশ্য, কনসার্ট কিংবা আবৃত্তির প্রেক্ষাপট হিসেবে এটি ব্যবহূত হয়। কাজেই এটা সবসময়ই দেয়ালে থাকত। এটা আমাকে বিষণ্ন, নিষ্প্রাণ শিশুতে পরিণত করেনি। বরং এটা আমাকে প্রেরণা দিয়েছে, বিষয়টিকে অব্যাহত রাখার প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি অনুভব করতাম, তাঁর কাছ থেকে কী বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং তাঁরই বর্ধিতাংশ আমাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে।
জাস্ট অ্যা রেড নিগ্রো
আমি কেবল এক লাল নিগ্রো
যে সমুদ্রকে ভালোবাসে
আমার পর্যাপ্ত ঔপনিবেশিক শিক্ষা আছে
আমার মধ্যে রয়েছে ওলন্দাজ নিগ্রো ও ইংরেজ
এবং হয় আমি কেউ নই
নতুবা আমি একটি জাতি।
(ডেরেক ওয়ালকটের আত্মজৈবনিক কবিতা ‘দ্য শুনার ফ্লাইট’ থেকে)
উইলিয়াম লোগান লিখেছেন, কবিরা যেখানে বিচরণ করেন, সেখানেই তাদের বিজয়ীর আচরণ— কবিতার নতুন একটি ফর্ম তুলে নেন কিংবা একজন প্রেমিক, কিছু অনুসন্ধিত্সু অভিশাপ কিংবা একটি অসুখ। ইতালি ও গ্রিস বাদ দিয়ে বায়রন কি বায়রন হতে পারতেন? লন্ডনের সঙ্গে বৈরিতা না হলে কি এলিয়ট আর পাউন্ড টিএসএলিয়ট ও এজরা পাউন্ড হয়ে উঠতে পারতেন? ক্যারিবিয়াকে বাদ দিয়ে আমরা হার্ট ক্রেনের কথা ভাবতে পারি না কিংবা রিও ছাড়া এলিজাবেথ বিশপকে। ডেরেক ওয়ালকট অনেক সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন, তাঁর কবিতার বহুল পাঠ কার্ল বেডেকারের ট্র্যাভেল বুকসের মতো। সেন্ট লুসিয়ায় জন্ম নেয়া একটি বালকের ইংরেজি
কবিতার স্বরভেদ ও ছন্দজ্ঞান তো তাঁকে দেয় যেকোনো দেশে প্রবেশাধিকার, কিন্তু তা আসে বোঝা হিসেবে। ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষা তাঁকে আকর্ষণ করেনি।
কিন্তু তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন, তাতে আফ্রিকা আছে, তাতে ক্রীতদাসকালের স্মৃতি আছে, ক্যারিবীয় জলতরঙ্গের ধ্বনি আছে। ডেরেক ওয়ালকট এভাবেই নিজের পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তাঁর প্রপিতামহ শ্বেতবর্ণ, প্রপিতামহী ক্রীতদাস বংশোদ্ভূত, তিনি নিজেকে বলছেন লাল নিগ্রো।
ছবির মানুষ ডেরেক
ডেরেক ওয়ালকটের আত্মজৈবনিক কাব্যগ্রন্থ ‘অ্যানাদার লাইফ’-এ এটা স্পষ্ট যে, দুজন শিল্পী তাঁর গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা হলেন— হ্যারল্ড সিমন্স ও ডানস্টেন ওমের; তাঁর কবিতায় এ দুজন হয়ে উঠেছেন হ্যারি ও গ্রেগরিয়াস। ডেরেকের জীবনে তাঁদের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেছেন:
বাবার বন্ধু হ্যারি আমাদের পড়াতেন। তাঁর স্টুডিওতে রঙ আর সংগীত ছিল। যখন তিনি বুঝতে পারলেন আমরা ছবি আঁকা পছন্দ করছি, আমাদের চার-পাঁচজন করে তাঁর স্টুডিওতে ডাকতেন, আমরা তাঁর বারান্দায় বসতাম। তিনি আমাদের হাতে রঙ-তুলি তুলে দিয়ে আঁকতে বলতেন। শহরে কিংবা অন্যত্র এমন ঘটেই থাকে, কিন্তু সে সময় সেন্ট লুসিয়ার মতো ক্ষুদ্র ও দরিদ্র একটি দেশে এটা ছিল অসাধারণ একটি ব্যাপার। শনিবার বিকালটা ছবি এঁকে কাটাতে তিনি উত্সাহ দিতেন, তাঁর নিজের আঁকা ছবিসহ আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখতেন। তাঁর বই, তাঁর সঙ্গীত, তাঁর তত্ত্বাবধান, তাঁর জীবনের স্থিরতা ও নৈবেদ্য— সেই স্টুডিওতে তাঁর, জীবনের কী মানে তা বোঝানোর এক দারুণ উদাহরণ। তাঁর প্রভাব তেমন বেশি কিছু নয় এবং দুর্বোধ্য কিছু নয়। তবে আমি অবশ্যই তাঁর কাছ থেকে কিছু ভালো কৌশল শিখেছিলাম— কেমন করে সুন্দর আকাশ আঁকা যায়, কেমন করে কাগজ সিক্ত করা যায়, কেমন করে বৃত্ত আঁকা যায়। ড্রইংয়ের বাইরেও অনেক কিছু ছিল: পেশাজীবী শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন মডেল— আদর্শ। কিছু সময় পর অন্যরা ছুটে গেলে আমি ও ডানস্টেন ওমের রয়ে গেলাম। আমরা একসঙ্গে বেরুতাম এবং ছবি আঁকতাম, চিত্রশিল্পকে আমরা একসঙ্গে আবিষ্কার করি।
যে শিল্পীকে আমি সত্যিই রপ্ত করতে পারব বলে মনে করেছি, তিনি হলেন সেজান। সেন্ট লুসিয়ার শুষ্ক মৌসুমের
গোলাপি, সবুজ ও বাদামির সঙ্গে তাঁর আঁকা ছবির এক ধরনের মিল আছে। আমি ছাদের ওপর থেকে ভিগির ব্যারাকের দিকে তাকাতাম, দেখতাম পাণ্ডুর গোলাপি ছাদ এবং ইটের কাজ, গাছের আবরণ, বৃক্ষচূড়া, বিস্তৃত নীল আর সেজানের কথা অনেক মনে পড়ত। হতে পারে চৌকোর দৃঢ়তা ও উল্লম্ব রেখাগুলোর কারণে। মনে হতো, সেজান সেন্ট লুসিয়ার ল্যান্ডস্কেপ কেমন জানতেন। তাঁর ছবিতে মনে হতো, এসব যেন ওখানেই ঘটছে। জিওজিয়নের মতো আরো অনেক শিল্পী ছিলেন কিন্তু আমি যখন ছবি আঁকতাম, সেজান আমাকে অনেক শক্তি দিতেন।
কবিতা ও প্রার্থনা সমান্তরাল— ডেরেক কেমন করে লেখেন?
লিখতে বসে কাগজে কলম চালানোর আগে লেখকরা কী আচার পালন করে থাকেন, তা কজন স্বীকার করবেন আমি জানি না। আমার মনে করি: সব শিল্পী, সব লেখকের কাজের জন্য প্রস্তুতি নেয়া এবং কাজটি শুরু করা, তা দিনেই হোক কিংবা রাতে, যত সংক্ষিপ্তই হোক কিছু একটা আচার, সবিনয় ও ঈশ্বর-সমর্পিত কিছু একটা করে থাকতেই পারেন। প্রত্যেক লেখকের আলাদা ভাবভঙ্গি, আলাদা ভূমিকা, আলাদা শারীরিক প্রকাশ রয়েছে— যখন তাঁরা খালি কাগজ সামনে রেখে দাঁড়াচ্ছেন কিংবা লিখতে বসছেন— এক অর্থে এসব না করে নিজেদের ক্রুশচিহ্ন টেনে সমর্পণ করছেন। এটা ক্যাথলিকদের পানির কাছে যাওয়ার মতো— তার আগে নিজের ক্রস এঁকে নিচ্ছেন। যার গুরুত্ব আছে, এমন একটা কিছু করার উদ্যোগ নেয়াটাই আচার পালনের মতো। আমি যে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করি, তা লক্ষ করিনি। কিন্তু আমি জানি, যখন কেউ বুঝতে পারে একটি কবিতা আসছে— টাইপরাইটারের শব্দ, জানালার বাইরে গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ কিংবা যা-ই থাকুক, আপনি নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নেবেন, এক ধরনের নীরবতায় নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবেন, যে নীরবতা আপনাকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবে। তখন আপনি যা করছেন, তা নিজের পরিচিতির নবায়ন নয়, বরং নিজের অজ্ঞাতনামের নবায়ন— যাতে আপনার সামনে যা আসছে, তা যেন আপনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। একই সঙ্গে একই মাপে এটা ভানসর্বস্ব মনে হতে পারে, যখন ভালো কিছু করেছি বলে মনে করি, আমি প্রার্থনা করি, আমি ধন্যবাদ দিই। এটা যে সবসময়ই করি এমন নয়, প্রতিদিনও নয়। আমি কোনো পুরোহিত নই, কিন্তু সে রকম কিছু ঘটলে আমি ধন্যবাদ দিই, কারণ এটা সৌভাগ্যের অংশ, আমার বেলায় এটা বহমান সময়ের একটি দান, যা আমি পেয়েছি। শুরু, শেষ এবং রচনাকালে মোহগ্রস্ততার একটি পর্যায় রয়েছে, যেখানে আপনি প্রবেশ করতে চান, যেখানে আপনার মেধার সব অংশ যুগপত্ ওই রচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করবে। কিন্তু কোনোভাবেই সেই মোহগ্রস্ততার কাল আরোপ করা যায় না।
ইদানীং লক্ষ করছি, আমি ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ছি, এটা বোধহয় মধ্যম বয়সের শেষভাগের লক্ষণ। এটা আমাকে উদ্বিগ্ন করে। আমার ধারণা, এটাও আচারের অংশ— কেটলিতে আগুন দিই, আমি এক কাপ কফি বানাই, একটি সিগারেট ধরাই। এখন অবশ্য নিশ্চিত নই, আমি কফি খাওয়ার জন্য উঠছি নাকি লেখার জন্য। হয়তো ধূমপান করার জন্য সকালে উঠছি, লেখার জন্য নয়।
সময়টার হেরফের হয়। কখনো রাত সাড়ে ৩টায়— এটা ভালো নয়। গড়পড়তা সময় ভোর ৫টা; আমি কতটা ভালো ঘুমোচ্ছি, এটা তার ওপর নির্ভর করে। তবে সে সময়টা, দিনের পুরোটাই ক্যারিবিয়া অত্যন্ত চমত্কার। আমি শীতল অন্ধকার এবং উদীয়মান সূর্যের বৈভব ও আনন্দ উপভোগ করি। আর তখন হাতে কফি থাকুক কিংবা লেখালেখি সবটাই আচারের মতো— আমি আরো এগিয়ে বলব, এটা ধর্মীয়। এর নিজস্ব হাতিয়ার ও পরিবেশ রয়েছে। আর তখন আপনি অনুভব করতে পারেন, আপনার আত্মা জেগে উঠছে।
প্রথম কবিতা: সেন্ট লুসিয়ার কণ্ঠস্বর
ডেরেক ওয়ালকটের প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘দ্য ভয়েস অব সেন্ট লুসিয়া’ মাত্র ১৪ বছর বয়সে লেখা। ডেরেক কবিতাটি নিয়ে বলেছেন: চার্চের মাধ্যমে নয়, প্রকৃতির মাধ্যমে ঈশ্বর সম্পর্কে জানা— এ বিষয়েই কবিতা। এটি মিলটনীয় ধাঁচের কবিতা, প্রকৃতিকে মনে করা হয়েছে জ্ঞানলাভের পথ। ‘আমি স্থানীয় একটি পত্রিকায় এটি পাঠিয়ে দিই এবং তা ছাপাও হয়। যেকোনো তরুণ লেখকের জন্য ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখতে পাওয়া একটি বিশাল অর্জন। তারপর পত্রিকায় একজন ধর্মযাজকের কবিতাকারে লেখা একটি পত্রও ছাপা হয়— তাতে বলা হয়, আমি যা লিখেছি, তা ঈশ্বরদ্রোহী আর ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়ার সত্যিকার ঠিকানা হচ্ছে চার্চ। ধর্মযাজক পরিপক্ব বয়স্ক মানুষ এবং একজন ইংরেজ— একজন তরুণ লেখককে যদি এমন একজন মানুষ ঈশ্বর দ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত করেন, তা লেখকের জন্য বড় আঘাত। আমার জন্য কঠিন শাস্তি হলো, আমার কবিতার জবাবটাও কবিতায় লেখা। তার কারণ, তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন, তিনিও ইংরেজিতে লিখতে জানেন। তাঁরটা ছন্দোবদ্ধ পঙিক্ততে, আমারটা ফ্রি-ভার্স। আমি ভাবি, যদি দুটো কবিতার দিকে তাকাই, আমারটাই কবিতা হিসেবে বরং ভালো।’
প্রথম কবিতার বই: খরচ ২০০ ডলার
আমি একটি এক্সারসাইজ খাতায় প্রতিদিনই লিখতাম, প্রথম দিকে আমার লেখায় দারুণ মৌলিকত্ব ছিল। যত কঠিন সম্ভব এবং আমি যেমন অনুভব করতাম, সেভাবেই তখন লিখতাম। আমি যখন অডেন, এলিয়ট ও অন্যদের লেখা পড়তাম, একটা কিছু ধরে কি যে আনন্দ ও মুক্তির স্বাদ পেতাম। একদিন আমি লিখতাম স্পেন্ডারের মতো, অন্যদিন ডিলান টমাস। যখন অনুভব করলাম আমার অনেক কবিতা লেখা হয়েছে, আমি এগুলোকে মুদ্রিত অবস্থায় দেখতে চাই। সেন্ট লুসিয়ায় কিংবা ক্যারিবিয়াতে কোনো প্রকাশনা সংস্থা ছিল না। এলিয়ট ও অডেনের মতো কবিদের কবিতা নিয়ে ফেবার অ্যান্ড ফেবারের বইগুলো আমি দেখেছি। আমি ভাবলাম, আমারও ওরকম বই হওয়া চাই। আমি ২৫টি কবিতা বাছাই করলাম। ভাবলাম ভালোই হবে, বিদেশ থেকে প্রকাশিত কবিতার বইয়ের মতো দেখাবে। মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমি কবিতার একটি বই প্রকাশ করতে চাই, আর এজন্য আমার ২০০ ডলার লাগবে।’
মা কেবল একজন স্কুলশিক্ষক আর সেলাইয়ের কাজ করে। আমার মনে আছে, মা খুব বিচলিত হয়ে পড়ল। কারণ আমাকে টাকাটা দিতে চাইছে। যেভাবেই হোক, এটা জোগাড় করল— আমার মায়ের বেতনের তুলনায় অনেক বেশি টাকা। মা আমাকে টাকাটা দিল। আমি টাকাটা ত্রিনিদাদ পাঠিয়ে দিলাম, বইটা ছাপা হলো। যখন বই হাতে পেলাম, আমি বন্ধুদের কাছে বিক্রি করলাম। টাকাটা আমার হাতে উঠে এল। একটি বইকে ছাপার অক্ষরে দেখার জন্য এটাই ছিল একমাত্র পথ— নিজে প্রকাশ করা।
পাদটীকা: বই ছাপাতে তাঁকে আর পকেটের টাকা খরচ করতে হয়নি কিন্তু বই থেকে তেমন একটা সম্মানীও পাননি। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য, নোবেল পুরস্কারই তাঁকে টাকার মুখ দেখিয়েছে।
(নিবন্ধটি ডেরেক ওয়ালকটের সাক্ষাত্কারের ওপর ভিত্তি করে রচিত)






