একালের সংসদ অধিবেশনে প্রশংসা ও নিন্দাধ্বনি দুই-ই বেশি শোনা যায়, সেকালেও কিঞ্চিৎ প্রশংসা বাক্য এবং নিন্দাও বর্ষিত হয়েছে। তবে তা নির্লজ্জ প্রশংসা বা বেপরোয়া নিন্দা মনে হয়নি।

অবিভক্ত বাংলার সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর, ছাঁটাই প্রস্তাব ও বাজেট আলোচনার কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত হচ্ছে। বলা আবশ্যক সংসদের কার্যবিবরণী ইংরেজিতে লিখিত হয়েছে। সংসদের ভাষাও ছিল ইংরেজি।

১৯৩৭ সাল পর্যন্ত অখণ্ড বাংলার সংসদ মানে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল, এর পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি। একটি আইন পরিষদ, একটি আইন সভা।

১৯২২, ১৯৩২, ১৯৩৫, ১৯৩৭, ১৯৪০, ১৯৪৩ ও ১৯৪৪ সালের কার্যবিবরণী থেকে অনূদিত কয়েকটি নমুনা উপস্থাপন করা হচ্ছে—

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানের বেতন

১৯২১-এর ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু। ৮৪৭ জন ছাত্রছাত্রী ৬০ জন শিক্ষক এবং ১২টি বিষয় এই নিয়ে যাত্রা। ১৯২২-এর ১৭ জানুয়ারি মাননীয় সদস্য ইয়াবুলউদ্দিন আহমেদ শিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী পিসি মিত্রের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত পাঁচটি প্রশ্ন রাখলেন—

১। বিএ ও বিএসসি এবং এমএ ক্লাসে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কত?

২। মিস্টার ল্যাংলি কতজন ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে থাকেন?

৩। লাইব্রেরিয়ান মিস্টার টার্নারকে কত টাকা মাইনে দেয়া হয়?

৪। লাইব্রেরিয়ান পদে কম মাইনেতে কোনো ভারতীয় পাওয়া যায়নি?

৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান কত মাইনে পান? তার যোগ্যতা কী?

মাননীয় মন্ত্রী জবাবে জানান—

১। ১৯৩ জন ছাত্রছাত্রী বিএ অনার্স ক্লাসে, ৫৬ জন বিএসসি অনার্সে এবং ১১৭ জন এমএ পাঠ্যরত।

২। ল্যাংলি সাহেবের ছাত্র পাঁচজন।

৩। টার্নার সাহেব দুটো কাজ করেন। তিনি ঢাকা হলের প্রভোস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান। এ ছাড়াও তিনি ইংরেজির অবৈতনিক প্রভাষক। তিনি ১ হাজার ৭৫০ রুপি বেতন পান। ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালের বেতনের চেয়ে তার বেতন কিছু কম। তিনি প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্যতাসম্পন্ন। প্রিন্সিপাল হতে রাজি হলে তিনি আরো ১৫০ রুপি বেশি বেতন পেতেন।

৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভারত সরকারকে জানিয়েছে টার্নার সাহেব যেসব দায়িত্ব পালন করে ১ হাজার ৭৫০ রুপি বেতন নেন, এত কম অর্থে কোনো যোগ্য ভারতীয় প্রার্থী পাওয়া যায়নি।

৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানের বেতন স্কেল ১৫০-২০০ রুপি। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ১০ রুপি।

 

কলকাতা পুলিশে মুসলমান কজন?

৩১ আগস্ট ১৯২১।

ফরিদপুরের (উত্তর) আব্দুল করিম পুলিশ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যকে জিজ্ঞেস করলেন:

ক) কলকাতা পুলিশে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, ইন্সপেক্টর, সাব ইন্সপেক্টর ও অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা কত? তাদের মধ্যে কজন মুসলমান?

খ) এটা কি সত্য সম্প্রতি কলকাতা পুলিশে ইন্সপেক্টর পদে কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাকে নিয়োগ করা হয়েছে?

গ) যদি তা সত্য হয়, তা হলে পদসংখ্যা কত এবং এ পদের কটি মুসলমানরা পেয়েছে?

ঘ) এটা কি সত্য সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙ্গিয়ে কিছু কনিষ্ঠ সাব ইন্সপেক্টরকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে?

ঙ) যারা পদোন্নতি পেয়েছেন এবং যাদের ডিঙ্গিয়ে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে, তাদের নাম কি জানাবেন?

দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য স্যার হেনরি হুইলারের জবাব—

ক) পদের নাম           মোট নিয়োগ    মুসলমান

অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার         ১৩       শূন্য

ইন্সপেক্টর     ৬০       ৪

সাব ইন্সপেক্টর          ১০৯     ২৯

অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর  ১৪৫     ৪২

খ) হ্যাঁ।

গ) ৭০ জন। এর মধ্যে ১৪ জন বিভিন্ন শাখায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন এবং পাবলিক ভেহিকেলস ডিপার্টমেন্টের প্রশিক্ষিত অফিসার। পদোন্নতিপ্রাপ্ত মুসলমান অফিসারের সংখ্যা দুজন।

ঘ-ঙ) জ্যেষ্ঠতা ও নির্বাচনের ভিত্তিতে পদোন্নতি হয়ে থাকে। পদোন্নতির অযোগ্য কর্মকর্তাদের ডিঙ্গানো হয়েছে। তাদের নাম প্রকাশ করা সমাচীন হবে না।

 

জেলখানার খাবারে পেঁয়াজ

৭ নভেম্বর ১৯৩২

পণ্ডিত সত্যেন্দ্রনাথ সেন লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির অধিবেশনে প্রশ্ন রাখলেন—

ক. এটা কি সত্য কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীন জেলখানাগুলোয় কয়েদিদের খাবার তৈরিতে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান?

খ. সরকার কি অবহিত যে শাস্ত্র অনুযায়ী উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের পেঁয়াজ ভক্ষণ নিষিদ্ধ?

গ. জেলখানা অবস্থানকারী উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের খাবারে পেঁয়াজের ব্যবহার বন্ধ করতে সরকার কি সম্মত?

অথবা যাদের পেঁয়াজের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে, তাদের কি নিজস্ব রান্না করার অনুমতি দেয়া হবে?

স্বরাষ্ট্র এবং জেল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য এইচ জি হেইগ জবাব দিলেন:

ক. পেঁয়াজ স্কার্ভি রোগ প্রতিহত করতে সাহায্য করে, সেজন্য কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত খাবারে পেঁয়াজ মেশানো হয়, তবে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রাধীন সব কারাগারে পেঁয়াজ সরবরাহ দেয়া হয় না।

খ. শাস্ত্রের যে নির্দেশনার কথা বলেছেন, আমি সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করতে চাই না।

গ. জেলখানার খাবারে পেঁয়াজ ব্যবহার নিয়ে কোনো অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবহিত নই। বরং বাংলার যেসব কয়েদিকে আন্দামান জেলে পাঠানো হয়েছে, তারা খাবারে পেঁয়াজ দেয়ার দাবি জানিয়েছে।

শ্রীমতি শান্তি ঘোষ ও শ্রীমতি সুনীতি চৌধুরী

নোয়াখালীর (পশ্চিম) সদস্য মৌলবি মুহাম্মদ ফজলুল্লাহ ২৫ নভেম্বর ১৯৩৫ রাজনৈতিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য আর এন রিডকে জিজ্ঞেস করেন—

ক) হিজলি জেলে আটক শ্রীমতি শান্তি ঘোষের শারীরিক অবস্থা কেমন?

খ) এটা কি সত্য যে তিনি ১৭ পাউন্ড ওজন হারিয়েছেন?

গ) ১. তিনি যখন জেলে ঢুকেন, তখন তার ওজন কত ছিল?

২. তার বর্তমান ওজন কত?

৩. কারাগারে তার কোনো সহযোগী কি রয়েছেন?

ঘ) ঢাকা জেলে আটক শ্রীমতি সুনীতি চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা কেমন?

ঙ) এটা কি সত্য যে দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই তার জ্বর আসছে?

চ) ১. তিনি যখন জেলে ঢোকেন, তখন তার ওজন কত ছিল?

২. তার বর্তমান ওজন কত?&dquote;&dquote;

ছ) এটা কি সত্য যে তাকে ‘সি’ শ্রেণীর কয়েদি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে?

জ) মাননীয় সদস্য কি জানেন সুনীতি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিক্ষিত মেয়ে?

ঝ) এটা কি সত্য যে তাকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে?

ঞ) মাননীয় সদস্য বলবেন কি কোন কারণে তার পুরনো সঙ্গীদের কাছ থেকে পৃথক করা হয়েছে?

সদস্য আর এন রিড সাহেবের জবাব—

ক) ভালো।

খ) সত্য নয়।

গ) ১ দশমিক ১০৭ পাউন্ড

২. ১২২ পাউন্ড

৩. হ্যাঁ।

ঘ) ভালো।

ঙ) সত্য নয়।

চ) ১ দশমিক ৯৬ পাউন্ড

২. ১০৭ পাউন্ড

ছ) হ্যাঁ।

জ) তিনি একজন অবসর প্রাপ্ত কেরানীর কন্যা, তার পেনশন মাসে ৪০ টাকা। তিনি অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছিলেন।

ঝ) তিনি একই শ্রেণীপ্রাপ্ত অন্য কয়েদিদের সঙ্গে অবস্থান করছেন।

ঞ) শান্তি ঘোষ দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদি। আইন অনুযায়ী তাকে তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

বাংলার কারাগারে&dquote;&dquote;

১৯৩৭-৩৮ সালের বাজেটে কারাগার খাত ৩৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখেন স্বরাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য স্যার প্রভাস চন্দ্র মিত্র। বিরোধী দল প্রবল আপত্তি জানায়। স্বরাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যের উপস্থাপনা শেষ হলে হরিপদ চট্টোপাধ্যায় ছাঁটাই প্রস্তাব আনলেন। তিনি বললেন, জেলখানাগুলো হচ্ছে জীবন্ত নরক। এর ভেতরের অবস্থা ভয়াবহ। এগুলো হচ্ছে সভ্যতার প্লেগ-স্পট।

মাননীয় স্পিকারকে সম্বোধন করে বললেন, এটা তো সবচেয়ে বড় সত্য কয়েদিদের জেলে পাঠানোই হয় যন্ত্রণা ও হরেক ধরনের শাস্তি ভোগের জন্য। জেলখানার স্টাফ আর মেডিকেল স্টাফের তখন এর প্রতিযোগিতা চলে কে কত বেশি শাস্তি দিতে পেরেছে, তারা সরাসরি নরহত্যা না করেও ঘাতকের ভূমিকাই পালন করছে।

বাংলার জেলের ভেতর চলে স্বৈরাচারী সেপাইদের রাজত্ব। সেপাইরা কয়েদিদের মনুষ্যজ্ঞান করে না। তাদের সম্বোধন করে চোর, শালা, ডাকু, বদমাশ বলে। আর কয়েদিরা তাদের সম্বোধন করে বাবু কিংবা হুজুর। কয়েদিদের জন্য সে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব। যখন খুশি সেলাই আর বালান— মানে কয়েদিকে কম্বলে ঢেকে কয়েকজন বুট, ব্যাটন ও লাঠির আঘাতে তার জীবন বিপন্ন করে তুলবে; বাহ্যত কোনো আঘাত দেখা যাবে না। সেপাই সেপাই ও চিকিৎসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য কয়েদিদের আত্মহত্যার ঘটনা বিরল নয়।

ঢাকা জেলের একটি ঘটনার সাক্ষী আমার বন্ধু মাননীয় সদস্য মনোরঞ্জন ব্যানার্জি ও গিয়াসউদ্দিন আহমেদ; তারাও তখন জেলে। এক দরিদ্র অপরাধীকে ধোলাই করার পর আধ-অজ্ঞান অবস্থায় জেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কিছুদিন থাকার পর কোমরে যন্ত্রণা রয়ে যাওয়ার কথা বললে চিকিৎসক তাকে বকাঝকা করেন এবং কোমরে ফুটন্ত পানি ঢেলে দেন। শরীরে ফোস্কা পড়ে যায়। সেন্ট্রিদের অসতর্কতার সুযোগে হামাগুড়ি দিয়ে লোকটি বের হয়ে যায়, তার অভিযোগ শোনানোর জন্য জেল সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সে জেলখানার ভেতর একটি গাছে উঠে পড়ে এবং উপরে উঠে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। এ নিয়ে কয়েদিদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। জেল সুপার তাকে গাছ থেকে নামিয়ে আনার জন্য দুজন সেন্ট্রিকে গাছে তুলে দেন। সেন্ট্রি যখন তার কাছাকাছি, ধরা পড়ার পর আবার ধোলাই খেতে হবে এই আশঙ্কায় সে গাছ থেকে লাফ দেয়। এবং সেখানেই তার নির্মম মৃত্যু হয়। আমার স্মৃতি যদি আমাকে বিভ্রান্ত না করে, তখন ছিল এপ্রিলের ভয়ঙ্কর গরম, দিনটি ছিল শনিবার। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে লোকটি যখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই জেলা সুপার দাঁড়িয়ে দেখেছে, এক ফোঁটা পানিও তার মুখে দেয়া হয়নি। আর কয়েকজন কয়েদি তখন দরকারি পাখা নিয়ে জেল সুপারকে বাতাস করছে। আমি হিজলি জেলে দেখেছি বিনা অপরাধে সব কয়েদিকে ডাণ্ডাবেড়ী পরিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ জেলখানায় একদিকে দেয়াল নেই, গাছে কাঁটাতারের বেষ্টনী।

দুঃসহ যন্ত্রণা ও জেলখানা ব্যবস্থাপকদের দুর্নীতির বিবরণ উঠে এল হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের বর্ণনায়।

তারপর বরদা প্রসন্ন পাইন, নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, আসিম উদ্দিন আহমেদ ছাঁটাই প্রস্তাবের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখলেন। কারাগারের বরাদ্দ থেকে ১০০ টাকা কমিয়ে দেয়ার আরেকটি ছাঁটাই প্রস্তাব পেশ করলেন নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী। তিনি বললেন, স্টালিন, মুসোলিনি কিংবা হিটলার যাদের কামানের মুখে উড়িয়ে দিতেন কিংবা সাইবেরিয়ান বালু খাইয়ে বেঁধে রাখতেন, বাংলার সরকার তাদের জন্য বরাদ্দ করেছে প্রায় সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা। তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মোটা মাইনে দিয়ে নিযুক্ত করেছি কত বড় বড় পণ্ডিত কর্মচারী। ‘... বাজার সুদ্যা কিন্যা আইন্যা ঢাল্ল্যা দিছি পায়— তবুও বিশ্বনিন্দুক তোমরা তোমাদের মন উঠবে না, তবুও তোমরা প্রভু ইংরেজের জয়ধ্বনি করতে চাইবে না।’

বাজেটে অর্থমন্ত্রী কয়েদিদের নিজেদের টানা ঘানির রক্তমাখা তেল সপ্তাহে একদিন একটুখানি মাখার অনুমতি দিয়েছেন— এই হচ্ছে গরু মেরে জুতা দান। কয়েদিদের দিয়ে ঘানি টানানো সম্পর্কে বলেছেন, গভর্নমেন্ট পশুর ক্লেশ সইতে না পেরে অনেক আইন করেছে, কিন্তু মানুষকে পশু বানানোর এমন বৈজ্ঞানিক নির্মমতা আর কারো নেই।

নরেন্দ্র নারায়ণের সময় ফুরিয়ে এলে তিনি স্পিকারকে বললেন, আমি নয় বছর জেলখানায় ছিলাম, আমাকে আর ৩ মিনিট সময় দিন।

বর্ধিত সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করলেন-

১. জেলখানায় অবাঙালি সিপাইদের বদলে শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের নিয়োগ দেয়া।

২. বাংলার বিভিন্ন জেলের ৪ হাজার ৮৭৮ দাগী কয়েদিকে পৃথক জেলে রাখা।

৩. নারী কয়েদিদের জন্য পৃথক জেলের ব্যবস্থা করা ও তাদের জন্য নারী কর্মচারী নিয়োগ করা।

৪. প্রত্যেক জেলে বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

৫. অন্তত পাঁচ বছর মেয়াদি কয়েদিদের মধ্যে আগে যার যে পেশা ছিল, সেই পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া।

৬. সশ্রম দণ্ডে দণ্ডিতদের বেতনের ব্যবস্থা করা। মুক্তির পর সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ মিলবে।

৭. দীর্ঘমেয়াদি কয়েদিদের ছুটির ব্যবস্থা করা।

৮. জেলখানায় সাধারণ কয়েদিদের তামাক সরবরাহ করা।

৯. রেডিও, আন্তঃকক্ষ খেলাধুলা, সিনেমা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা।

সৈয়দ জালালউদ্দিন হাশেমীও একটি ছাঁটাই প্রস্তাব আনলেন। জেলখানার ভেতরের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কথা তিনি বললেন। আসিমউদ্দিন বললেন, যারা জেলের ভেতরে আছেন, তাদের কেউ কেউ বাইরে থাকলে এই অ্যাসেম্বলিতে বসতেন। ছাঁটাই প্রস্তাব হলেও বক্তব্য প্রদানের সময় প্রায় সবাই বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছেন।

মন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন অনেক অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও কারা পরিবেশ উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেন। ভোটে দেয়া হলে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলোর একটিও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পায়নি। অর্থাৎ সবগুলোতেই সংখ্যার জোরে সরকার পক্ষই জয়ী হয়।

সরকারি চাকুরেদের ২৫ বছর চাকরি শেষে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া:

বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির ১০ আগস্ট ১৯৩৭ তারিখের অধিবেশনে মাননীয় সদস্য মৌলভি মোহাম্মদ ইসরায়েল প্রশ্ন রাখলেন, অর্থ বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন কি যেসব সরকারি চাকুরেদের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেয়ার বিষয়টি সরকার ভাবছে কিনা?

মাননীয় মন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকার বললেন, না, উত্তর ঋণাত্মক।

শরৎ চন্দ্র বোস জিজ্ঞেস করলেন, কেন ভাবছে না?

মন্ত্রী বললেন, এটা কার্যকরী করার দরকার নেই। ৪৫ বছর বয়সেই সে সরকারি চাকুরে ২৩ বা ২৫ বছর চাকুরি করেছে, তিনি নিশ্চয়ই তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সমর্থ।

সদস্য খান সাহেব আবদুর রৌফ বললেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদায় করার জন্য এটাই কি শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি নয়?

স্পিকার বললেন, এটি ব্যক্তিগত মতামত। এ নিয়ে আলোচনা চালানোর দরকার নেই।

মাননীয় সদস্য যোগেশ চন্দ্র গুপ্ত বললেন, তীব্র বেকার সমস্যা আর অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে এ বাধ্যতামূলক অবসরদান বাস্তবায়ন করা হলে কি বেকার সমস্যা আংশিক সমাধান এবং সেসব বেকারের আর্থিক সংকটের কিছুটা সমাধান করা যেত না?

শরৎ চন্দ্র বোস বললেন, যেসব কর্মকর্তা ২২, ২৩, ২৪ এবং ২৫ বছর বয়সে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন, সেই কর্মকর্তার হিসাবে তাদের সংখ্যার অনুপাত জানতে চাই। সদস্য আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বললেন, সরকারি প্রাদেশিক এবং অধস্তন চাকরিতে এরই মধ্যে যাদের ২৫ বছর হয়েছে, তাদের সংখ্যা জানতে চাই।

শামসুদ্দিন আহমদের প্রশ্ন ২৫ বছর চাকরি করার পরও কতজন অফিসার দক্ষতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন, তার পরিসংখ্যান সরকারের হাতে রয়েছে কি?

রসিক লাল বিশ্বাস বললেন, ২৫ বছর পূর্তিতে চাকরি থেকে বিদায় দিলে একটি বড় ধরনের সাশ্রয় হবে, এটা কি সরকার অনুধাবন করতে পারছে?

অর্থমন্ত্রী এসব প্রশ্নের জবাবে বললেন, নোটিস চাই এ মূহূর্তে জবাব দেয়া যাবে না। মূল প্রশ্নের সঙ্গে এগুলোর কোনো সঙ্গতি নেই। তবে তিনি মেনে নিলেন এই জবরদস্তির অবসরদানে আর্থিক সাশ্রয় হবে। তবে এটি বাস্তবায়নের কথা সরকার ভাবছে না। ২৫ বছর চাকরি শেষ করার পরও চাকুরেরা বেশ সক্রিয় থাকেন বলেই প্রশ্নকর্তা ইঙ্গিত করলেন।

 

ছোটলাটের ঢাকা সফর ও ট্রাফিক জ্যাম

১ আগস্ট ১৯৪০ বিকাল পৌনে ৫টায় কলকাতার অ্যাসেম্বলি হাউজে অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার খান বাহাদুর এম. আজিজুল হক। ১০ জন মন্ত্রী এবং ২১৫ জন সদস্য হাজির।

প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলির তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন দিয়ে সভার কার্যক্রম শুরু হলো। মাননীয় সদস্য প্রশ্ন রাখলেন —

স্বরাষ্ট্র (পুলিশ) দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী জানেন কি, (১) ২ জুলাই ১৯৪০ বাংলার গভর্নর যখন ঢাকায় এলেন, তিনি জনাকীর্ণ ব্যবসা ও বাণিজ্যিক এলাকা যেমন সদরঘাট জনসন রোড, নবাবপুর রোড ধরে গিয়েছেন?

(২) আধ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ট্রাফিক চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় এবং পথচারীদের এমনকি রাস্তা পারাপার হতেও দেয়া হয়নি। (৩) ৪ জুলাই তিনি যখন আহসান মঞ্জিলে টি-পার্টিতে যোগদান করতে গিয়েছিলেন, সেদিনও একইভাবে ট্রাফিক চলাচল ও পথচারীদের আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। (৪) তারপর যতবারই গভর্নর রাস্তায় বের হয়েছেন ট্রাফিক ও জনগণের একই দশা হয়েছে। (৫) এসব প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের সফরের সময় সাধারণ ব্যবসায়ীদের দুর্গতি লাঘবে সরকার কি ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে।

উত্তরে স্বরাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, সরকার এ সম্পর্কে অবগত। সবাই জানেন ওইটি হচ্ছে একমাত্র রুট।

এক্সিলেন্সি গভর্নর মহোদয়ের আগমনের অল্প সময় আগে ট্রাফিক চলাচল বন্ধ করা হয়। তার আগমনের কয়েক মিনিট আগেও পথচারী পারাপার অব্যাহত ছিল। ট্রাফিক মাত্র ৫ মিনিটের জন্য বন্ধ ছিল এবং গভর্নর মহোদয়ের নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যতটা সম্ভব কম অসুবিধে সৃষ্টি করে গোটা কর্মসূচি তৈরি করা হয়েছে।

এই জবাবের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চেপে ধরেন সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, অতুল চন্দ্র সেন, অতুল কৃষ্ণ ঘোষ ও চারুচন্দ্র রায়।

সুরেন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেন, ৫ মিনিট বন্ধ থাকার তথ্যটি মাননীয় মন্ত্রী কোথায় পেলেন? স্পিকার তাকে এগোতে দিলেন না। সুরেন্দ্রনাথ বললেন, আধঘণ্টা ট্রাফিক চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে, মাননীয় মন্ত্রী বলছেন কেবল ৫ মিনিট। তিনি কি পুলিশ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে জবাব দিয়েছেন?

অতুল চন্দ্র সেন বললেন, মাননীয় মন্ত্রী কি জানেন, অতি উৎসাহী পুলিশ অফিসার ও কনস্টেবল পথচারীদের দীর্ঘ সময় আটকে রেখেছেন।

মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বললেন, আমি বিশ্বাস করি এমনটা ঘটেনি। অতুল চন্দ্র সেন ট্রাফিক আটকে রাখার এই বাড়াবাড়ির তদন্ত দাবি করলেন।

কিন্তু মন্ত্রী বললেন, তদন্তের প্রয়োজন দেখছি না।

প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলির তারকাখচিত প্রশ্ন: ৬ জুলাই ১৯৪০ শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার পর থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় এক্সিলেন্সি গভর্নর বাহাদুরের ঘোড়দৌড়ের মাঠে আসা উপলক্ষে গভর্নর হাউজ থেকে জিমখানা রেস গ্রাউন্ড পর্যন্ত ঢাকা শহরের সব রাস্তাই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল?

জবাবে মন্ত্রী বললেন, পুরনো প্রথা অনুযায়ী তা করা হয়েছে। পরে এই প্রথা ভাঙার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

চারু চন্দ্র রায় জিজ্ঞেস করে বসলেন, তথাকথিত জনপ্রিয় মন্ত্রিসভা পুরনোর প্রথা আঁকড়ে আছে কেন?

মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ

২৯ মার্চ ১৯৪৩ সোমবার সকাল ৯-৪০ অ্যাসেম্বলি হাউজ, কলকাতা।

স্পিকার সৈয়দ নওশের আলী সভাপতির আসনে। ১৮৭ জন সদস্য উপস্থিত। সংসদীয় সব কার্যক্রম ইংরেজি ভাষায়। অনূদিত। ভাষান্তরিত বিবৃতি উপস্থাপন করা হচ্ছে।

সবার আগে উঠে দাঁড়ালেন কিরণ শঙ্কর রায়। বললেন, ‘মাননীয় স্পিকার, দিনের কাজ শুরুর আগে আমি আপনার অনুমতি নিয়ে মুখমন্ত্রীকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। মাননীয় স্পিকার আমি কি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারি— প্রথমত, তিনি কি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন? দ্বিতীয়ত, যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন? তৃতীয়ত, তার পদত্যাগের মানে কি সব মন্ত্রিসভার পদত্যাগ?

মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় এ কে ফজলুল হক উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, স্যার, আমার কিছু বলার  ছিল না। কিন্তু কংগ্রেস পার্টির প্রধান সরাসরি আমাকেই একটি প্রশ্ন করেছেন। আমি মনে করি এ ধরনের প্রশ্নে হাউজকে আস্থায় নিয়ে হাউজের সামনে সত্য ঘটনাটি বিবৃত করা প্রয়োজন।

স্যার এটা সত্যি যে গভর্নর আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলাম। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘক্ষণ একটি জাতীয় সরকার ধরনের মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যার কিছু কিছু আমার আত্মসম্মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মনে না হওয়ায় আমি গ্রহণ করতে পারিনি। মান্যবর গভর্নর পরামর্শ দিলেন আমাকে ইস্তফাপত্র দাখিল করতে হবে। আমি তাকে বলেছি আমার পার্টি ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা না করে তা আমি করতে পারছি না। গভর্নর সম্মত হলেন না। এ অবস্থায় আমাকে ইস্তফাপত্র স্বাক্ষর করতে হলো। (অংশ বিশেষ)