আবুল ফজলের পত্র
শ্রদ্ধাস্পদেষু, চিটাগাং
এই অকিঞ্চিত্কর লেখাগুলির স্থান বিশেষও যদি রবির স্নেহ-রশ্মিপাতে ধন্য হয়, তবে এই নগণ্য লেখকের ক্ষীণ প্রচেষ্টাও সার্থক বিবেচিত হবে। গল্প-গ্রন্থ দু’টিতে বঙ্গের পূর্ব সীমান্তবাসী মুসলমান সমাজ ও পরিবার জীবনের কিছু কিছু ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে, ফলে তাদের মুখের ও জীবনের, সাহিত্যে এখনো অপ্রচলিত বহু শব্দ ও প্রকাশ-ভঙ্গিমা বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি এবং আমার বিশ্বাস মুসলমান সমাজের ছবি আঁকতে গেলেই এ রকম বহু অপ্রচলিত শব্দ বাংলা ভাষাকে হজম করতেই হবে।
মুসলমান নায়িকা মুসলমান নায়ককে দস্তরখানা বিছিয়ে নাস্তা পরিবেশন করছে, বহু ভেবেও এ রকম বাক্যকে বিশুদ্ধ বাংলায় পরিবর্তন করতে পারিনি। অথচ দস্তরখানার কোনো বাংলা প্রতিশব্দ আমি খুঁজে পাইনি, তৈয়ের করে নিতেও পারিনি। অথচ দস্তরখানা মুসলমান পরিবারে রোজ দু’বেলাই ব্যবহার করা হয়। নাস্তার প্রতিশব্দ জোর করে হয়ত ‘জলখাবার’ করা যায়, কিন্তু তা করলে মুসলমানের কানে তা শব্দের ‘শুদ্ধিকরণে’র মতোই শোনাবে। আর নিশ্চিত মুসলমান জীবনে ও শব্দের ব্যবহার ঘরোয়া না হয়ে পোশাকী হয়েই থাকবে (আমি অবশ্য আমার পূর্ব বঙ্গের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি)।
হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাড়ির জেয়াফতে আমার দাওয়াত আছে, এর পরিবর্তে কোন মুসলমান হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাড়ির ভোজে আমার নিমন্ত্রণ আছে বলে না, বল্লে অনুবাদের মতো শোনাবে। এই মাসের মাসিক সওগাত পত্রিকায় একটি চমত্কার খবর পড়লাম। খবরটি এই, ‘পণ্ডিত মদন মোহন মালবীয়, তাঁর পুত্র এবং মুজীবর রহমান (‘মুসলমান’ পত্রিকার পরলোকগত সম্পাদক) একবার ট্রেনে সহযাত্রী ছিলেন। আহারের সময় উপস্থিত হলে বাবা তখনই খাবেন কি না, পুত্র জিজ্ঞাসা করলেন। পণ্ডিতজী উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, ‘খাহেশ ন্যাহি হ্যায়’; কিন্তু ‘খাহেশ’ শব্দটি আধা উচ্চারণ করেই পণ্ডিতজী পিছিয়ে গেলেন ও বল্লেন: ‘ইচ্ছা ন্যাহি হ্যায়’। এ ক্ষুদ্র ঘটনাটি থেকে এই মহাপুরুষের সমগ্র সাধনা ও আদর্শবাদের একটা আভাস পাওয়া গেল। কিন্তু এই আদর্শ সাহিত্য-সেবীর কাছে শ্রদ্ধার দাবী করতে পারার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি? যে-জীবনকে অবলম্বন করে সাহিত্য রূপ নেবে, সেই জীবনের পরিবেষ্টনকে বাদ দিয়ে সে সাহিত্যের ভাষার অন্য কোনো স্বধর্ম আশা করা যায় কিনা ভাববার বিষয়। ব্যাকরণ ও অভিধান ঘেঁটেই সম্ভবত সে স্বধর্ম খুঁজে বের করতে হবে!
এই বিষয়ে আপনার আরও কিছু মন্তব্য জানতে পারলে উপকৃত হতাম, কিন্তু আপনার ক্ষীণ স্বাস্থ্যের উপর আরও দাবী জানাতে লজ্জা ও সঙ্কোচ অনুভব করছি। যে-টুকু অপরাধ করলাম আশা করি তা নিজ গুণেই ক্ষমা করবেন। ইতি-
শ্রদ্ধাবনত
আবুল ফজল
৩১.৮.১৯৪০
[পত্র প্রেরকের চৌচির, মাটির পৃথিবী ও বিচিত্র কথা নামক তিনখানি গ্রন্থ]
রবীন্দ্রনাথের পত্র
বিনয় সম্ভাষণ,
কিছুদিন হ’তে দৃষ্টিক্ষীণতাবশত পড়াশুনা করতে কষ্ট হয়। ডাক্তার চোখকে বিশ্রাম দিতে বলেন। ভাষা ব্যবহার সম্বন্ধে আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। আচারের পার্থক্য ও মনস্তত্ত্বের বিশেষত্ব অনুবর্তন না করলে ভাষার সার্থকতাই থাকে না। তথাপি ভাষার নমনীয়তার একটা সীমা আছে। ভাষার যেটা মূল স্বভাব, তার অত্যন্ত প্রতিকূলতা করলে ভাব প্রকাশের বাহনকে অকর্মণ্য করে ফেলা হয়। প্রয়োজনের তাগিদে ভাষা বহুকাল থেকে বিস্তর নতুন কথার আমদানী করে এসেছে। বাংলা ভাষায় ফারাসী আরবী শব্দের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু তারা সহজেই স্থান পেয়েছে। প্রতিদিন একটা দু’টো করে ইংরেজী শব্দও আমাদের ব্যবহারের মধ্যে প্রবেশ করছে। ভাষার মূল প্রকৃতির মধ্যে একটা বিধান আছে যার দ্বারা নূতন শব্দের যাচাই হতে থাকে, গায়ের জোরে সেই বিধান না মানলে জারজ শব্দ কিছুতেই জাতে ওঠে না। ইংরেজী ভাষার দিকে তাকিয়ে দেখলে আমার কথার সত্যতা বুঝতে পারবেন। ওয়েল্স্ আইরিশ স্কচ ভাষা ইংরেজী ভাষার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী, ব্রিটেনের ঐ সকল উপজাতিরা আপন আত্মীয় মহলে ঐ সকল উপভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে স্বভাবতই ব্যবহার করে থাকেন কিন্তু যে সাধারণ ইংরেজী ভাষা তাঁদের সাহিত্যের ভাষা ঐ শব্দগুলি তার আসরে জবরদস্তি করতে পারে না। এই জন্যেই ঐ সাধারণ ভাষা আপন নিত্য আদর্শ রক্ষা করে চলতে পেরেছে। নইলে ব্যক্তিগত খেয়াল অনুসারে নিয়ত তার বিকার ঘটত। ‘খুনখারাবি’ শব্দটা ভাষা সহজেই মেনে নিয়েছে, আমরা তাকে যদি না মানি তবে তাকে বলব গোঁড়ামি। কিন্তু রক্ত অর্থে খুন শব্দকে ভাষা স্বীকার করেনি, কোনো বিশেষ পরিবারে বা সম্প্রদায়ে ঐ অর্থই অভ্যস্ত হতে পারে তবু সাধারণ বাংলা ভাষায় ঐ অর্থ চালাতে গেলে ভাষা বিমুখ হবে। শক্তিমান মুসলমান লেখকরা বাংলা সাহিত্যে মুসলমান জীবনযাত্রার বর্ণনা যথেষ্ট পরিমাণে করেন নি, এ অভাব সম্প্রদায় নির্বিশেষে সাহিত্যের অভাব। এই জীবনযাত্রার যথোচিত পরিচয় আমাদের পক্ষে অত্যাবশ্যক। এই পরিচয় দেবার উপলক্ষে মুসলমান সমাজের নিত্য ব্যবহূত শব্দ যদি ভাষায় স্বতই প্রবেশ লাভ করে তবে তাতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে না, বরং বলবৃদ্ধি হবে, বাংলা ভাষার অভিব্যক্তির ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত আছে।
আপনার চৌচির গল্পটি আমার দৃষ্টিকে ক্লিষ্ট করেও পড়েছি। আমার পক্ষে এ গল্প বিশেষ ঔত্সুক্যজনক। আধুনিক-মুসলমান সমাজের সমস্যা ঐ সমাজের অন্তরের দিক থেকে জানতে হলে সাহিত্যের পথ দিয়ে জানতে হবে—এই প্রয়োজন আমি বিশেষ করেই অনুভব করি। আপনাদের মতো লেখকদের হাত থেকে এই অভাব যথেষ্টভাবে পূর্ণ হতে থাকবে এই আশা করে রইলুম। চাঁদের এক পৃষ্ঠায় আলো পড়ে না সে আমাদের অগোচর, তেমনি দুর্দৈবক্রমে বাংলাদেশের আধখানায় সাহিত্যের আলো যদি না পড়ে তা হলে আমরা বাংলাদেশকে চিনতে পারব না, না পারলে তার সঙ্গে ব্যবহারের ভুল ঘটতে থাকবে। কিন্তু এই পরিচয় স্থাপন ব্যাপারে কোনো একটা জিদ বশত ভাষার প্রতি যদি নির্মমতা করেন তা হলে উল্টো ফল ফলবে। এই উল্টো ফল ফলাবার অধ্যবসায়ে বাংলাদেশ আজ কণ্টকিত। চোখ একটু সুস্থ হলে আপনার অন্য দুটি বই পড়বার চেষ্টা করব। একটু আধটু যা চেয়ে দেখতে পেরেছি তাতে বোধ হয়েছে আপনার লেখনীর অবাধগতি আছে। ইতি—
—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.৯.১৯৪০
আবুল ফজলের জবাব
পরম শ্রদ্ধাস্পদেষু,
ভাষার নমনীয়তা সম্বন্ধে আপনি যা বলেছেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। মনে হয় যে ভাষায় লেখক লিখবেন তার প্রাণধারার সঙ্গে যদি লেখকের পরিচয় গভীর হয়, সেই ভাষার মূল প্রকৃতির সন্ধান পেতে তাঁর হয়তো বেগ পেতে হয় না। এইজন্যে, আমার বিশ্বাস লেখক মাত্রেরই ভাষার ইতিহাস ও তার ক্রমবিকাশের সঙ্গে পরিচয় থাকা উচিত। আমাদের অনেক লেখকের রচনায় এই পরিচয়ের অভাব লক্ষ্য করা যায়।
ভাষার মূল প্রকৃতি যদি লেখকের আয়ত্ত হয়, তা’হলে অপ্রচলিত শব্দও প্রয়োগনৈপুণ্যে ভাষার গায়ে বেমালুম স্থান করে নিতে পারে।
আপনার রচনার আশ্রয় নিচ্ছি—
‘তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁকে
মশক কাঁখে একুশ লাখ ভিস্তি।
পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক
নদীর জলে নাহিক চলে কিস্তি।’
[জুতা আবিষ্কার]
‘মশক’ ও ‘ভিস্তি’ শব্দের কোনো প্রতিশব্দ বাংলায় নেই। কিস্তি শব্দের আছে এবং এক দাবা খেলোয়াড় ছাড়া বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানেরাও নৌকা অর্থে কিস্তি সাধারণ কথাবার্তায় কি লেখায় ব্যবহার করে না, তবুও ঐ শব্দের প্রয়োগ এখানে এমন চমত্কার। হয়েছে যে কোনো গোড়া পাঠকও ঐ শব্দ ব্যবহারের জন্য কোনো আপত্তি করেছেন বা করবেন, এমন দুর্দিনের কল্পনা করা যায় না।
আপনি যে ‘খুন’ শব্দের কথা বলেছেন তার বিচিত্র প্রয়োগ আমাদের ভাষা স্বীকার করে নিয়েছে। হত্যা অর্থে খুন, যেমন-কাল পদ্মার চরে দু’টো খুন হয়েছে, বলা চলে। খুনীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা একটা খুনোখুনী ব্যাপার ঘটেছে, মুখে ও সাহিত্যে সচল বলেই বোধ হচ্ছে। রাজশেখর বাবুর অভিধানে (চলন্তিকায়) ‘খুনচড়া’ শব্দটিও দেখলাম এবং তিনি তার অর্থ দিয়েছেন, ‘ক্রোধে রক্ত গরম হওয়া’। আমাদের ভাষায় এই খুন শব্দটির অর্থ ব্যাপ্তি ঘটেছে, যেমন-ছেলেটি হেসেই খুন, অথবা—
‘শুনিয়া গোবু ভাবিয়া হল খুন’
[জুতা আবিষ্কার]
একটি লোক খুন হয়েছে, লোকটি খুনী, খুনোখুনী ব্যাপার ইত্যাদি প্রয়োগের সঙ্গে রক্তের আভাস পাঠকের মনে আসে এবং রক্ত অর্থে খুন শব্দটি আমাদের ভাষার অভিধানে স্থান পেয়েছে। রাজশেখর বাবু ও জ্ঞানেন্দ্রমোহন দত্তের অভিধানে রক্ত অর্থে খুন শব্দ দেখেছি। অন্য অভিধান হাতের কাছে নেই বলে যাচাই করতে পারিনি। অভিধান ভাষার শব্দ সম্পদের ভাণ্ডার বলেই অভিধানের দোহাই পাড়লাম, না হয় অভিধান সামনে রেখে কেউ সাহিত্য সৃষ্টি করেন বা করবেন তেমন বিশ্বাস আমার নয়। ভাষার অভিধানে স্থান পেলেই শব্দ জাতে উঠলো বলা যেতে পারে। কিন্তু মনে হয় তার চলিষ্ণুতা নির্ভর করবে, সাহিত্য-স্রষ্টার প্রয়োগনৈপুণ্যের উপরই। বিচিত্রসম্ভবা ‘খুন’ শব্দটি নানাভাবে আমাদের মুখ ও কানের সঙ্গে সুপরিচিত হয়ে পড়েছে, কালে হয়তো ‘রক্ত’ অর্থেও আমাদের ভাষা এই শব্দটিকে স্বীকার করে নেবে। যাঁর লেখনীর যাদুস্পর্শে ‘নৌকা’ অর্থে ‘কিস্তি’ আমাদের সাহিত্যে স্থান লাভ করেছে এবং আজও নিত্য-নূতন শব্দ স্থান লাভ করছে, হয়তো কোনদিন তাঁরি লেখনির অমর স্পর্শে এই সুপরিচিত শব্দটিও ‘রক্ত’ অর্থেই স্বীকৃতি পাবে।
আজকাল কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দের উচ্চারণ বা বানানে বিশুদ্ধিকরণের প্রয়াস লক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু যে সব স্বাভাবিক নিয়মে হতে একটা নিজস্ব রূপ পরিগ্রহ করেছে, তাকে বৈদেশিক উচ্চারণ ও বানান অনুয়ায়ী লিখতে প্রয়াস বাঞ্ছনীয় বলে মনে হয় না; যেমন হাসপাতালকে হসপিটেল, বাক্সকে বক্স বা নম্বরকে নাম্বার লেখা; উর্দু নেহায়েৎ আলাহিদা বা আরবী জওয়াব আমাদের ভাষায় বহু ব্যবহারে রূপান্তর পরিগ্রহ করেছে নেহাৎ, আলাদা ও জবাবরূপে। মূল ভাষার উচ্চারণ ধরে আজ তাকে বিশুদ্ধিকরণের চেষ্টা করা অর্থহীন বলেই মনে হয়। ইদানীং সুনীতি বাবুও এই মত সমর্থন করেছেন।
মাঝে মাঝে দেখা যায়, জনসাধারণের মুখে মুখেই বিদেশী শব্দ চমত্কাররূপে রূপান্তরিত হয়ে সচল হয়ে উঠেছে; মনে হয় হাসপাতাল, বাক্স, বিজলি বাতি প্রভৃতি ভাষাতাত্ত্বিকের সহায়তা ছাড়াই জনসাধারণ মুখে মুখে তৈয়ার করে নিয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলে সাধারণে Torch light এর বাংলা করে নিয়েছে ‘টিপ বাত্তি’ এবং এই শব্দ ব্যাপকভাবেই প্রচলিত। শুনেছি চট্টগ্রামের সমুদ্রগামী মাঝিমাল্লারা Torpedo কে বলে ‘তেলপেডা’, ধ্বনিগত সাম্য বজায় রাখার জন্যে আমরা না হয় তাকে ‘তেলপেডো’ করে নিতে পারি। আমাদের দোকানদারেরা তাদের কর্মচারীদের পুরা বেতনে যে privilege leave দেন, তার অনুবাদ করে নিয়েছেন ‘অনুগ্রহ বিদায়’। অনুবাদ নেহাৎ মন্দ হয়েছে বলে মনে হয় না। বাংলা ভাষা যদি আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের বস্তু না হয়, তাহলে তার প্রসার ও সমৃদ্ধি আশা করা যায় না। কোনো কোনো বিষয়ে শব্দ সম্পদের দিক দিয়ে বাংলা ভাষা দরিদ্র স্বীকার করি, কিন্তু আমার বিশ্বাস প্রতিদিনের ব্যবহার ও তার প্রয়োজনে নিত্য-নূতন শব্দ সৃষ্টি হবে এবং এই সৃষ্টি শুধু সংস্কৃত ধাতু থেকেই করতে হবে এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়মও চলবে বলে মনে হয় না। এই কাজে আমরা খুব সহায়তা পাবো আমাদের অফুরন্ত গ্রাম্য শব্দসম্পদের কাছে। নৌকার তিন-চারটা অংশের নাম হয়তো আমরা শিক্ষিত লোকেরা জানি; কিন্তু নৌকার মাঝি হয়তো পঞ্চাশটা অংশের পঞ্চাশটা নাম বলতে পারবে, ঘর সম্বন্ধেও আমাদের সাহিত্যিক শব্দ ঐরকম শোচনীয়ভাবেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু সাধারণ গৃহস্থ বা ঘরামি একটা চালেরই হয়তো বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন নাম বলতে পারবে।
বাংলার পল্লীচাষীর জীবনের ছবি আঁকতে গেলে বাঙালী সাহিত্যিক তো শব্দের অভাবে চাষীর ঘর দুয়ারের ও জীবনযাত্রার একটা খাঁটি বর্ণনাই দিতে পারবেন না। বাংলার, চাষী মজুর, তাঁতীজেলে মাঝিমাল্লা, যারা দেশের মাটি কামড়ে পড়ে আছে, তাদের জীবনের ছবি এখনো আমাদের সাহিত্যে ফুটে ওঠেনি এবং এদের জীবনের যথাযথ ছবি আঁকবার চেষ্টা করলেই আমাদের সাহিত্যিক ভাষার দারিদ্র্য সহজেই উপলব্ধি হবে। আমার বিশ্বাস, আমাদের ভাষা যদি আমাদের প্রতি কাজের ভাষারূপে ব্যবহূত হয় তাহলেই এই দারিদ্র্যের প্রতিকার হতে পারে। এখন আমরা নেহাৎ ঘরোয়া কাজেও অনাবশ্যক বিদেশী ভাষার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকি। বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনকে চিঠি লিখবো তাও লিখি ইংরেজীতে। সরকারী দপ্তরের কথা ছেড়েই দিলাম, যেখানে আমাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে সেখানেও আমরা ইংরেজীর আশ্রয় নিয়ে থাকি; বেসরকারী স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিউনিসিপ্যালিটি করপোরেশন, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, পত্রিকা অফিস ইত্যাদির হিসাব-নিকাশ, চিঠিপত্র অবাধেই বাংলায় চলতে পারে; প্রদেশের বাইরে যেসব চিঠিপত্র যাবে তার ইংরেজী অনুবাদের ব্যবস্থা রাখলেই কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ব্যবহারের ভিতর দিয়েই আমরা আমাদের ভাষার অভাব ও প্রয়োজনীয়তার পরিচয় লাভ করবো। এই অভাব ও প্রয়োজনীয়তা মিটবেই, সচল ভাষা নিশ্চল হয়ে থাকতে পারে না, পারে না বলেই ‘বিজলী বাতি’, ‘বোমারু’, ‘টিপ্ বাত্তি’, ‘অনুগ্রহ বিদায়’ ‘আকস্মিক বিদায়’ (casual leave) সৃষ্টি হয়ে চলেছে।
বাংলা ভাষার দারিদ্র্যের আর একটা দিকেও আমাদের শিক্ষিতদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়া উচিত, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও দেশ সম্বন্ধে আজ পর্যন্ত যা গবেষণা হয়েছে, তার বেশির ভাগই ইংরেজী ভাষায় লিখিত। গবেষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা উপাধি যেমন ডি. লিট, পি.এইচ.ডি, পি.আর.এস. ইত্যাদি পেয়েছেন তাদের গবেষণা বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজী ভাষাতেই প্রকাশ করেছেন। এতে গবেষক পণ্ডিতদের পাণ্ডিত্যের পরিচয় ও গবেষণার ফলাফল বাংলার বাইরেও প্রচারের সুবিধা হলো বটে, কিন্তু বাংলা ভাষার দারিদ্র্য তো ঘুচলো না। বাংলা ভাষায় লিখে পি.এইচ. ডি. ডি. লিট পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুনে কোনো বাধা আছে কিনা জানি না, যদি থাকে এই অযৌক্তিক বাধা যত শীঘ্র দূর হয় ততই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মঙ্গল। এই বিষয় আপনি একটু ইঙ্গিত করলেই বোধ হয় এই বেড়া ওঠে যেতে পারে। এই সব কথা লিখে আপনাকে বিরক্ত করার কারণ, আপনি আমাদের ভাষার ক্ষীণ স্রোতস্বতীকে মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত করে দিয়েছেন, এখনো এর গতিপথে যত বাধা ও বাঁধন আপনিই তা অনায়াসে দূর করতে পারেন। আপনি লিখেছেন ‘বাংলাদেশের আধখানায় সাহিত্যের আলো পড়েনি’, অতি কঠোর সত্য কথা। যদি বেয়াদবি মনে না করেন তবে এই প্রসঙ্গে আমার ও আমার বন্ধুগণের দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন উত্থাপন করি। বাংলা সাহিত্যের অনির্বাণ ভাস্কর পর্যন্ত এই আধখানা বাংলার দিকে ফিরে তাকাননি,-রবির কিরণে বিশ্ব আলোকিত হয়েছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, বাংলার মাটির আঙিনায় রবির আলোকপাত হলো না! এর যথাযথ কারণ আমরা ধারণা করতে পারছি না। শুনেছি গল্পগুচ্ছের অনবদ্য গল্পগুলো শিলাইদহে আপনাদের জমিদারীতে বসেই লেখা, শিলাইদহের মুসলমান প্রজামণ্ডলীর মধ্যে আপনার কি আসন তা শ্রীযুক্ত সুধাকান্ত রায় চৌধুরীর প্রবন্ধ না পড়েও আমরা আন্দাজ করতে পারি; অথচ এদের জীবন আপনার কোনো সাহিত্য প্রচেষ্টার উপাদান হতে পারলো না। মনে হয় আসল কথা, মানুষের বাইরের চেহারা বা তার সঙ্গে বাহ্যিক সম্বন্ধ যতটুকু না সাহিত্যের উপাদান, তার অন্তরের চেহারা তার থেকে বহুগুণ বেশি সাহিত্য সৃষ্টির কারণ ও প্রেরণা যোগাতে পারে। কিন্তু বঙ্গদেশের এক বৃহৎ অংশের অন্তরলোকে প্রবেশ করার কোনো প্রয়াস কোনো দিক থেকেই লক্ষিত হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রনেতা ও সংবাদপত্র সম্পাদকগণের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দিন দিন হিন্দু ও মুসলমানের ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
আমাদের সামনে আদর্শ কি? হয় আমাদের এক জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে হবে, না হয় পৃথক পৃথক সম্প্রদায় হিসেবে একটা বোঝাপড়া করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে হবে। বাঙালী জাতি গঠনই যদি আমাদের আদর্শ হয় তা হলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য আমাদের ত্যাগ করে উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোই গ্রহণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে উভয় সম্প্রদায়ের অনাপত্তিকর নূতন আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য তৈয়ার করে নিতে হবে, তখন আমাদের শুধু অন্ন-বস্ত্রে এক হলে চলবে না, রক্তেও এক হওয়ার সাধনা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। তখন আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের বহু বেড়া আলগা করতে হবে ও বহু ধারণা আমাদের বদলাতে হবে। যদি পরস্পরের তথাকথিত বৈশিষ্ট্য আমরা ছাড়তে না পারি, তা হলে পৃথক পৃথক সম্প্রদায় হিসেবেই আমাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে হবে, তখন প্রতি ক্ষেত্রে একটা বোঝাপড়ার প্রয়োজন হবে। তখন ভাগ বাটোয়ারার গাণিতিক নির্ভুলতাই হবে আমাদের সাধনা ও আদর্শ।
ভবিষ্যৎ বঙ্গসন্তানদের পক্ষে কোন সাধনা অধিকতর কাম্য হবে কে জানে?
আমাদের জীবন পথে রবির আলোকপাত হউক। ইতি -
শ্রদ্ধাবনত
আবুল ফজল
১৯-৯-১৯৪১
পত্র দুটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সওগাত’ পত্রিকায়। পরে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ‘বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ’ (প্রকাশকাল: জুন ১৯৮৫) সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। পত্র দুটির প্রকাশকালের কোনো উল্লেখ নেই। তবে আবুল ফজলের শেষ চিঠিতে ১৯.৯.১৯৪১ তারিখের ব্যবহার দেখে অনুমান করা যায় এটি ১৯৪১ সালের পরে ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়েছিল।
সূত্র: সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন, আবুল ফজল, বইঘর, ঢাকা-চট্টগ্রাম।






