ক্রিসি ইলে। অনুবাদ: শওকত হোসেন
[সোফিয়া লোরেনের জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ সালে, ইতালিতে। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার পর অভিনয় প্রশিক্ষণে নাম লেখান, ১৯৫০ সালে ১৬ বছরে বয়সে তার অভিনয়জীবন শুরু। প্যারামাউন্টের সঙ্গে পাঁচ ছবিতে অভিনয়ের চুক্তির আগ পর্যন্ত ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় ছাড়া তার তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। প্যারামাউন্টের হাত ধরে ১৯৫৬ সালে সোফিয়া লোরেনের আন্তর্জাতিক অভিনয়জীবন শুরু। এ সময়ে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি দ্য প্রাইড অ্যান্ড দ্য প্যাশন, হাউজবোট ও ইট স্টারটেড অ্যাট নেপলস। ভিট্টোরিও ডি সিকার টু উইম্যানে অভিনয়ের পর লোরেন ১৯৬২ সালে কান উৎসবের পর অস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। বিদেশী ভাষায় অভিনয় করে সোফিয়া লোরেনই প্রথম অভিনেত্রী, যিনি অস্কার জিতেন। ইয়েস্টারডে, টুডে অ্যান্ড টুমোরো, ম্যারেজ ইতালিয়ান স্টাইল ছবির জন্য আরো দুবার অস্কার মনোনয়ন পান। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে পাঁচবার জিতেন গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড। প্রচুর পুরস্কারের মধ্যে ১৯৯১ সালে তাকে সম্মানজনক একাডেমি অ্যাওয়ার্ডও দেয়া হয়। ১৯৯৯ সালে লোরেনকে আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট হলিউড চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা ২৫ অভিনেত্রীর একজন বলে ঘোষণা করে। ঘোষিত তালিকার অভিনেত্রীদের মধ্যে শুধু সোফিয়া লোরেনই এখনো জীবিত।
ইয়েস্টারডে, টুডে অ্যান্ড টুমরো: মাই লাইফ সোফিয়া লোরেনের প্রথম স্মৃতিকথা। এ বই যুদ্ধবিধ্বস্ত নেপলস, সেখানে বেড়ে ওঠার সংগ্রাম, তারপর রুপালি পর্দার কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া এবং এক মমতাময়ী মায়ের ভাষ্য। কিন্তু আরো অনেক কিছু তিনি এখানে গ্রন্থভুক্ত করার আগেই ধ্বংস করে ফেলেছেন।]
সোফিয়া লোরেনের বহু ছবি বস্তুত ইতালীয় হলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি গ্ল্যামার ও নিখাদ হলিউডি যৌনাবেদনের প্রতীক হয়ে ছিলেন। হাউজবোট-এর (১৯৫৮) মতো সম্ভবত আর কোথাও সোফিয়া লোরেন ও ক্যারি গ্রান্টের বড় পর্দায় এমন রসায়নের অস্তিত্ব নেই। ১৯৫৭ সালে দ্য প্রাইড অ্যান্ড প্যাশন নির্মাণের সময় এ দুজনের পরিচয় হয়, প্রকৃতই একে অন্যকে ভালোবেসেছিলেন। গ্রান্টে মোহিত হয়েছিলেন সোফিয়া, অন্যদিকে সোফিয়া লোরেনে মজেছিলেন গ্রান্ট।
সোফিয়া লোরেনের আত্মজীবনী ইয়েস্টারডে, টুডে অ্যান্ড টুমরো: মাই লাইফ গ্রন্থে ক্যারি গ্রান্ট হাজির হয়েছেন। দুজনের সম্পর্ক নিয়ে অধ্যায় দুটি সুখময় ঝলক বিলোচ্ছে। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে নিজের জীবন নিয়ে, বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, সেট সম্পর্কে কাব্যিক ঢঙে লেখা খুঁটিনাটি বর্ণনা যথেষ্ট বিনোদনমূলক এবং বিশদ। এর সবকিছুই পিতৃহীন যুদ্ধবিধ্বস্ত ছোটবেলার দারিদ্র্য ও হতাশাজনক অবস্থার সঙ্গে ভীষণ বেমানান।
৩৬ বছর ধরে জেনভায় আছেন তিনি, সেখানেই দেখা হয়েছে আমাদের। একটা নিরিবিলি জাঁকালো পেন্টাহাউজ স্যুটে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে। সব জাঁক নিয়ে ওখানেই ছিলেন তিনি।
সাদা-কালো ট্রাউজার স্যুট ছিল তার পরনে। পরলোকগত স্বামী কার্লো পন্টি একবার সবসময় তার স্যুট পরা উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন। ছিপছিপে গড়নের আবেদনময়ী তিনি। এমনকি ৮০ বছর বয়সেও দুর্দান্ত দেহবল্লরীর অধিকারী—বড় বড় চোখ, বিশাল ঠোঁট। প্রথম ফটোশুটের পর লোরেনকে তার চেহারার অনুপাতে ঝামেলা থাকার কথা বলা হয়েছিল। নাক বড্ড বেশি বড়। কিন্তু স্বপ্নেও কোনো কিছু পাল্টানোর কথা ভাবেননি তিনি।
নিজেকে জানতেন। তাই কিছুটা বিষণ্নভাবেই তার মাথায় চুলের বদলে এক ধরনের আড়ষ্ট পরচুলা লক্ষ করেছি। তা সত্ত্বেও এখনো তিনি ইতালীয় মায়ের উষ্ণতা ও তীক্ষ মুগ্ধতায় ভরপুর। কিছুই হারাননি। সবসময় কি লেখক ছিলেন তিনি? “প্রতিদিনই ডায়েরি লিখতাম। আমি তুলা রাশির জাতক, বড়ই বিরক্তিকর, একঘেয়ে। ডায়েরিটা হাতে পেয়ে মনে মনে বলেছিলাম, দেখি তো কত বছর আগে লিখেছিলাম এটা। অনেক জিনিসই দেখেছি সেখানে। আমার নিজের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে দিতে চাইনি, এমন অনেক কিছু ছিল। তাই পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে ফেলেছি। তারপর আরেকটা ছিঁড়েছি। তারপর আরেকটা। তারপর আরো একটা।
শেষে হঠাৎ মনে হলো, আমি যখন থাকব না, এসব বই টিকে থাকুক চাইব না আমি। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখতে চাই। তাই সব পুড়িয়ে ফেলেছি। তো প্রতি বছর ডায়েরি লেখার সময় এখানে একটা বাক্য, ওখানে একটা তারিখ। কারো সঙ্গে দেখা হওয়া সম্পর্কে কোনো টিকা। আর প্রতি বছরই নষ্ট করেছি সেগুলো। এমন কিছু ব্যাপার আছে, যা স্রেফ নিজের কাছেই রাখতে চাই।”
সেক্ষেত্রে আত্মজীবনী লেখা ও সেটির প্রচারণার জন্য সাক্ষাত্কারে সব রসাল ঘটনার কথা পুড়িয়ে ফেলার কথা কবুল করা বেশ অস্বাভাবিক। তবে বইটি পুরোপুরি অনাকর্ষণীয় নয়। যেমন এটি তার ছোটবেলার এত অসংখ্য বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছে যে আপনার মনে হবে বুঝি রীতিমতো পারমিযান পনির গুঁড়ো করার গন্ধ পাচ্ছেন। যদি সেটা থাকে। পরে সন্তানের জন্য আকুতি ও অন্তহীন গর্ভপাতের কথা বলার সময় রীতিমতো কঠিন ঠেকে। এরপর ভুল করে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা কর ফাঁকির মামলায় কারারুদ্ধ করার পর কারাগারের দিনলিপিকে প্রিজন বি-চলচ্চিত্রের মতো মনে হয় (ট্র্যাজিক ইভনিং। একজন সহবন্দি নিজের রগ কেটে ফেললে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়...)। তবে এখন তিনি কোন জিনিসগুলো বাদ দিয়ে গেছেন, জানতে চাই আমি।
‘এ বইটা গল্পের মতো পড়ার জন্য আমার জীবনকাহিনী,’ বললেন তিনি। ‘আমার মনে হয় ডায়েরিতে ভিন্ন কথা লেখেন আপনি। স্রেফ অুনভূতি, বাস্তব কিছু নয়; যার সঙ্গে সম্ভবত জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। যাহোক, কেন সবকিছু খুলে বলতে যাব আমি?’
সংকোচ, গাম্ভীর্য আর নির্ভীকতার কাছাকাছি পর্যায়ে আত্মবিশ্বাসের মিশেল হয়ে হাজির হন তিনি, সমানভাবে খোলামেলা এবং সতর্ক। ‘বইটিতে আমার জীবনের সত্যি ঘটনা তুলে ধরতে চেয়েছি। কীভাবে সফল হলাম। যুদ্ধের সময় আমার জীবন কেমন ছিল। আমি আমার সব আন্তরিকতা দিয়েই কাজটা করতে চেয়েছি, কারণ অন্যরা আমাকে নিয়ে বই লিখেছেন, অনেক সময় সেসব সত্যি নয়, একেবারে বানোয়াট ছিল।
অনেক সময় পত্রিকায় পড়া কথাবার্তা টুকে দিয়েছেন তারা। এমন নয় যে আমি ভুল শোধরাতে চেয়েছি, স্রেফ আমার বেলায় কী ঘটেছিল, সেটাই বলতে চেয়েছি। কারণ আমি গর্বিত। আমি আসলে কিছুই ছিলাম না, পিতৃহীন পরিবারের মরিয়া জীবন কাটানো দুঃখী ছোট একটা মেয়ে মাত্র। যুদ্ধের সময় সবাই উপোস করছিল।’
কথা মিলিয়ে যায় তার। আসলে বাবার অভাব বোধ করছিলেন তিনি। বাবা ছিল তার। তাকে তিনি চিনতেন, কিন্তু তিনি তার মাকে বিয়ে করেননি। তার মা রোমিলদা ভিলানি ছিলেন তারার মতো, অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। মাত্র সতেরো বছর বয়সে ইতালিতে এমজিএম স্টুডিও নতুন গ্রেটা গার্বোর খোঁজে প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। পুরস্কার ছিল হলিউডে পাড়ি জমানো। তার বয়স বেশি কম বলে তাকে যেতে দেননি তার মা-বাবা। রোমিলদা, তার মেয়ের ভাষ্যে, ‘প্রলোভন উসকে’ দিতেন।
তার বদলে রিকোর্দো সিকোলোনের সঙ্গে আবেগময়, বিপর্যয়কর একতরফা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। সোফিয়া লোরেনই সেই শিশু। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ, কিন্তু পরাস্ত মানুষ ছিলেন রিকার্দো। প্রথম সন্তান সোফিয়াকে নিজের পদবি দিলেও তার বোন মারিয়ারও পারিবারিক নাম সিকোলোনে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মাশুল দিতে হয়েছে সোফিয়াকে (নিজের প্রথম চেকটা ব্যবহার করেছেন)। (অভিনেত্রী পঞ্চাশের দশকে নিজের নাম ‘লোরেন’-এর পরিবর্তন করেন।)
বয়স্ক, কর্তৃত্বপরায়ণ কোনো পুরুষসত্তাকে সবসময়ই খুঁজে ফিরেছেন তিনি, হয়তো এ কারণেই তার চেয়ে প্রায় ২২ বছরের বড় ইতালীয় চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক কার্লো পন্টির সঙ্গে পরিচয় হতেই প্রেমে পড়েছেন। ক্যারি গ্রান্ট তার চেয়ে ৩০ বছরের বড় ছিলেন।
বই লেখা কি তার জন্য উপশম ছিল? শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন লোরেন। কথাটা বুঝতে পেরেছেন কিনা, নিশ্চিত হতে পারলাম না। (অনেক সময় ইতালীয় ভাষায় উত্তর দিচ্ছিলেন তিনি) বাবার প্রসঙ্গে কথা বলার সময় চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। যেন বইটিকে তাড়া করে ফিরছেন মানুষটা। তিনি তাকে উপহার কিনে দিচ্ছেন, ভালো লাগছে তার, চিরদিন সেটা রেখে দেবেন। তারপর হারিয়ে গেলেন তিনি। ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে মিলেছেন, তারপর আবার আলাদা হয়ে গেছেন ওরা। আবার এক হয়েছেন, তারপর আবার তাকে ছেড়ে গেছেন, বারবার।
কখন ভদ্রলোককে অপ্রয়োজনীয় বলে স্থির করেছিলেন তিনি? “আপনার বয়স পাঁচ, ছয় বা সাত বছর হলে আপনি শান্তি চান বলে মায়ের কথামতো চলেন। আপনি স্বাভাবিকতা চান, যেটা আমাদের ছিল না। মা ‘সোফিয়া ভীষণ অসুস্থ, তুমি এসো’ লিখে টেলিগ্রাম করলেই বাবা চলে আসতেন। তার আসার কারণটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
আমি যেটা সবসময় চেয়েছি, কারণ আমার সব বন্ধুর তা ছিল, একজন বাবা। ওদের মতো হতে চাইতাম আমি, স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। ১৩-১৪ বছর বয়সে প্রায় বড় হয়ে যাওয়ার পর এসব বুঝতে পারেন আপনি। আসল কথা জেনে যান।”
তবে সেটা জানতে না চাওয়ার কথা স্বীকার করলেন তিনি। “ছোট শহরে থাকতাম, তাই অনেক কিছুই শিখতে হয়েছিল আমাকে। এমনকি বয়সে ছোট ছেলেদের সঙ্গে মেশারও সুযোগ ছিল না আমার। পুরো ব্যাপারটাই ছিল অসম্ভব।
পন্টির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পরই স্বস্তি বোধ করেছিলাম। পরস্পরকে দেখার পর ওকে ছেড়ে বাড়ি ফেরার সময় প্রশান্ত লাগত। নিজেকে জিজ্ঞেস করতাম, তোমার এমন মনে হয় কেন? কারণ ওকে আমি বিশ্বাস করেছি। ভীষণ কম ছিল আমার বয়স। আমার বয়স ছিল ১৭, অনেকদিন গড়িয়ে যাওয়ার আগে আমাদের একসঙ্গে কিছু ছিল না। ব্যাপারটা আজকের মতো ছিল না।
আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে ও। অনেক কিছুই শিখিয়েছে। একদিন আমার জন্য একটা স্যুট কিনে এনে বলল, ‘স্যুটে তোমাকে খুবই ভালো মানায়, তাই সবসময় স্যুট পরা উচিত তোমার।’ অবশ্যই বরাবর এ ধরনের কথা বলত ও। তখনকার দারুণ সফল অভিনেত্রী লুকা বোসের মতো চেহারা বানাতে চুল খাটো করেছিলাম, তখন কার্লো বলেছিল, ‘তোমার সবসময় চুল খাটো রাখা উচিত।’
যখনই কিছু করতাম, ও সবসময় বলত, ‘তোমার সবসময়ই এটা করা উচিত’ এবং হ্যাঁ, সেটা আমাকে আত্মবিশ্বাস জোগাত। তীক্ষ নজর ছিল ওর, আমার নিরাপত্তাহীনতা মুছে দিয়েছিল, হ্যাঁ। ওর চেহারা ও কথায় মনে হতো আমার যত্ন নেবে ও, যেটা আর কোনো পুরুষ নেয়নি।” সত্যিই তার যত্ন নিয়েছিলেন তিনি? ‘আরে, হ্যাঁ।’
গ্রান্টের সঙ্গে পরিচয়ের সময় তিনি আর পন্টি একসঙ্গে ছিলেন। একসঙ্গে থাকলেও বিয়ে করতে পারছিলেন না, কারণ তালাক নিতে পারেননি পন্টি। সে সময় ইতালির আইন চরম ক্যাথলিক ছিল। লোরেনের পক্ষে হতাশার উৎস ছিল এটা, কারণ স্রেফ স্বাভাবিক হতে চেয়েছিলেন তিনি।
নাজুক এ মুহূর্তে হাজির হন সূক্ষ্ম আবেদনময়, অসম্ভব মোহনীয় গ্রান্ট, তিনি সেটে অন্তরঙ্গ সংক্ষিপ্ত ডিনারে প্রেম নিবেদন করেন তাকে এবং পরে বিয়ের প্রস্তাব দেন। গ্রহণ করলেন না কেন তিনি?
“সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের লোক ছিল ওরা। কঠিন ছিল কাজটা। প্রথম আমেরিকান ভাষায় ছবি করছিলাম আমি। কিন্তু আমার আমেরিকান ভাষা ছিল যাচ্ছেতাই, তাই ভীষণ বিচলিত ছিলাম। ভাষা ঠিক করার জন্য বহুবার সাহায্য লেগেছে, ক্যারি আমাকে সাহায্য করত।
আমেরিকার ভিন্ন জগতের মানুষ ছিল ক্যারি। সেই জগতে কখনই মানিয়ে নিতে পারব না বলে মনে হতো আমার। জাতীয়তার কারণে ওখানে কখনো কোনো ভবিষ্যৎ নেই আমার। এ সম্পর্ক বা আধা সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে কিনা না জেনে জীবনে পুরোপুরি বদলে যেতে ভয় ছিল।
ছবির কাজ শেষ হলো। ফোননাম্বার বিনিময় করলাম আমরা। আমাকে ফোন করবে বলল ও। টু উইমেন ছবির সেটে এসেছিল ও; আবার নিউইয়র্কে একটা ছবির কাজের সময় বাড়িতেও এসেছে। কার্লোর সঙ্গেই ছিলাম আমি, একটা ছেলেও হয়েছে।
একদিন নিউইয়র্কে আমাকে ফোন করল ও, ওখানে আরেকটা ছবি হচ্ছিল আমার। ‘কেমন আছ?’ ‘আমি চমত্কার আছি,’ বললাম। ‘ফোন করেছ কেন?’ তখন ও বলল, ‘কারণ আমি চিয়াও বলতে চাই।’ ব্যস এই। তারপর মারা যায় ও। নিশ্চয়ই মৃত্যুর খবর জানত।” কণ্ঠ কেঁপে গেল তার।
বইটির একটা কিছু আমাকে বিভ্রান্ত করে। একদিন ক্যারি গ্রান্টের সঙ্গে তার দ্বিতীয় ছবির কাজ শেষে গ্রান্ট এক তোড়া হলুদ গোলাপ পাঠিয়েছিলেন তাকে। পন্টির সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গোলাপ প্রসঙ্গে বাড়িয়ে বলছিলেন। ‘হ্যাঁ, কাজটা ঠিক হয়নি। হয়তো ওকে পরখ করতে চেয়েছিলাম, ওর কেমন লাগে দেখতে চেয়েছি। অল্প ছিল বয়স, ভেবেছিলাম ও ক্রুদ্ধ ও ঈর্ষান্বিত হলে তার মানে হবে— আমাকে ও ভালোবাসে।’
আসলে পন্টি এতটাই ক্রুদ্ধ ও ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন যে তাকে আঘাত করে বসেন। ‘হ্যাঁ, আঘাত করেছে। খুব আলগোছে। একে অতিরঞ্জিত করার দরকার নেই। কিন্তু সেটাই আমাকে স্বস্তি দিয়েছিল। মনে হয়েছিল ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি।’
আমি বললাম, আমি এখনো বুঝতে পারিনি, ঈর্ষা আর ভালোবাসা সমান নয়। চুপ করে রইলেন তিনি। তিনি আরো যেসব কিংবদন্তিসুলভ মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের সম্পর্কে কী বলবেন— মার্লোন ব্রান্ডো, চার্লি চ্যাপলিন, রিচার্ড বার্টন? এজন্য কি কখনো ভীতি বোধ করেছেন?
‘ভীতি কি জিনিস? ওদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল, কখনই ভয় পাইনি। রিচার্ড তখন তার জীবনের খুবই খারাপ সময় কাটাচ্ছিল, প্রচুর অসুখবিসুখে ভুগছিল, আমরা তার পরিচর্যা করেছি। ছোট শিশুদের সঙ্গে খেলত ও, চমত্কার সময় কাটাত, কিন্তু এলিজাবেথ হাজির হলে দুপুরের খাবার খেত ওরা, তখন আর কিছুই ভালো থাকত না।’
রিচার্ড বার্টনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি? ‘ওকে শ্রদ্ধা করতাম। ভীষণ সুদর্শন ছিল ও। দারুণ কণ্ঠস্বরের মালিক। যখন অভিনয় করত, মারাত্মক ছিল ও। ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি।’
আর কোনো সহ-অভিনেতার প্রতি আবেগীয় আকর্ষণ বোধ করেছেন তিনি? ‘না।’ না? ‘তুমি কত সহজে এসব জিজ্ঞেস করছ। ভেবেছ আমাকে এসব জিজ্ঞেস করতে পারবে, আর আমিও উত্তর দেব? খুবই হাস্যকর। কথাবার্তায় আনাড়ি মনে হচ্ছে, কিন্তু তুমি তা নও।’
এটাই সম্ভবত কোনো সাক্ষাত্কারে সবচেয়ে মোহনীয় প্রত্যাখ্যান ছিল। এবার বুঝতে পারলাম বইটায় কোন জিনিসটা অনুপস্থিত থাকতে পারে। নিশ্চিতভাবেই আমাকে বলবেন না তিনি।
১৯৬২ সালে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও পুরস্কার না পেলে ভীষণ ভেঙে পড়বেন ভেবে অনুষ্ঠানে যেতে চাননি কেন, সেটা জানাও কঠিন। তাই বাড়িতেই অপেক্ষা করছিলেন। যুদ্ধের সময় ইতালির এক মায়ের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য এক দশকেরও বেশি বয়স বাড়িয়ে নিয়েছিলেন তিনি। অনাহারে কাটানো এবং অনেক সময় ভীতসন্ত্রস্ত ছোটবেলার দিনগুলোর সব আবেগ ঢেলে দিয়েছেন। বিরাট ব্যাপার ছিল সেটা। ইতালীয় ভাষার ছবি হওয়ায় তার কোনো সুযোগই ছিল না।
সরাসরি সম্প্রচার শুরুর অনেক বছর আগের কথা এটা। অপেক্ষার সময় নিজেকে শান্ত রাখতে সস বানিয়েছিলেন তিনি। ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানির জন্য অড্রে হেপবার্ন ও স্প্লেন্ডর ইন দ্য গ্রাসের নাটালি উডের বিপরীতে ছিলেন সোফিয়া। ‘রান্নাবান্না এমন কিছু, যা আপনাকে ঘরোয়া অনুভুতি দেয়। ঘরোয়া অনুভূতি থাকলে ভালো বোধ করো তুমি কিংবা অন্ততপক্ষে আমি করি। প্রতিরক্ষার ভেতর আছি মনে হয়।’
তার প্রিয় খাবার কোনটা? ‘বেগুন দিয়ে পারমিযান।’
পুরস্কার পেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন, আর না পেলে ভেঙে পড়বেন, এ কারণে অস্কার অনুষ্ঠানে যাওয়ার বদলে টমেটো সস বানিয়েছেন তিনি। ‘হ্যাঁ, কথাটা ঠিক।’
কিন্তু সে রাতে পরে গ্রান্ট ফোন করে বললেন, ‘ডার্লিং, তুমি জিতেছ।’
অল্প পরেই ১৯৬৪ সালে পন্টি ও তিনি প্যারিসে চলে আসেন, কারণ তখনো ইতালিতে তালাকের অবকাশ ছিল না। অনেক বছর আগে মেক্সিকোয় দূত মারফত বিয়ে করেছেন বলে ভাবতেন তিনি। এটা অনেকটা ভালো অনুভূতি দিয়েছে তাকে, বললেন তিনি। যন্ত্রণা দূর করেছিল। বৈধ বিয়ে ছিল না, তবে অন্তত কার্লো যে তাকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চান, সেই বোধ দিয়েছিল।
লোরেন অবশ্য সবসময়ই সত্যিকারের স্ত্রী হতে চেয়েছেন, সত্যিকারের সংসার চেয়েছেন। স্বাভাবিক থাকতে চেয়েছেন। ‘অনেক সময় নিলেও সেটা হয়েছিল। কিন্তু তারপর সন্তান না হওয়ায় মন্দ সময় যাচ্ছিল কিংবা অন্তঃসত্ত্বা হলেও হারিয়ে ফেলছিলাম।’
এক ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন, তিনি কখনো সন্তানের মা হতে পারবেন না। ‘কিন্তু একজন দুর্দান্ত ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন অস্ট্রোজেনের ঘাটতির কারণেই গর্ভপাত ঘটছে। তিনি আমাকে অস্ট্রোজেন দিলেন। আমি অন্তঃসত্ত্বা হলাম।’
দুটি ছেলে আছে তার: কার্লো জুনিয়র, ২৫ এবং এদোয়ার্দো, ৪১। একজন অর্কেস্ট্রাল কন্ডাক্টর, অন্যজন লেখক ও পরিচালক; দুজনই স্পষ্টই সমীহের অধিকারী।
‘না, আমি বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করি না। দুটো ছেলেই চমত্কার। ওরা আমার জীবনকে ভীষণ সুখময় করেছে। আমার চারটে নাতি-নাতনী রয়েছে। কার্লোর ছেলেটি একদম কার্লোর মতো। মেয়েটি ওর সুইডিশ স্ত্রীর মতো। নীল চোখ ওদের,’ বিশাল সোনালি চোখে দ্যুতি নিয়ে আমাকে বললেন তিনি।
নিজের চোখ দুটোকে কি তিনি সেরা বৈশিষ্ট্য মনে করেন? ‘না। মনে করি না। আমার চরিত্রই আমার সেরা বৈশিষ্ট্য।’
সকৌতুকে বললেন, অনেক দিন একটা পত্রিকার সঙ্গে থাকতে হয়েছিল তাকে, যেটি তার সৌন্দর্য ও দেহ সৌষ্ঠবকে প্রচুর স্প্যাগেটি খাওয়ার ফল বলে দাবি করেছিল। উদ্ধৃতিটুকু ছড়িয়ে পড়েছিল: ‘সবকিছুর জন্য আমি স্প্যাগেটির কাছে ঋণী,’ হাসতে হাসতে বললেন তিনি।
জেনেভায় নিজের জীবন নিয়ে তিনি সুখী। ইতালীয় খাবার হয়তো পছন্দ করতে পারেন, কিন্তু ইতালীয় কর্তৃপক্ষ, ধর্ম ও করভার নিশ্চিতভাবেই তাকে প্রীত করে না। কারাগারে কাটানো সময়ের কথা লেখা কি কষ্টকর ছিল? ‘কষ্টকর ছিল, কারণ আগাগোড়া নির্দোষ ছিলাম আমি। মন্দ ব্যবস্থপনা ছিল সেটা, কিন্তু ওরা বিচারের পথেই গেছে। আমাকে এক মাসের কারাদণ্ড দেয় ওরা, কিন্তু ১৭ দিন পর ছেড়ে দিয়েছিল।’
ছেড়ে দিয়েছিল বলেই কি আপনি নির্দোষ? ‘না, ৪০ বছর লেগেছে এবং ৪০ বছর পর মামলা জিতেছি আমি। কথাটা ঠিক ছিল না। পাই পয়সা মিটিয়ে দিয়েছিলাম। আমাকে ইতালি থেকে বের করে দেয়ার কথাটা ঠিক নয়। ইতালির বাইরে প্রচুর ছবি বানিয়েছি আমি, সুবিধাজনক ছিল বলেই আমরা চলে এসেছি।’
তার হাতে এখন কোনো কাজ আছে? ‘হ্যাঁ। মনে মনে একটা কাজের কথা ভাবছি, কিন্তু আমরা কিংবা অন্তত প্রযোজক এখনো স্বত্বের ফয়সালার ব্যাপারে কাজ করছেন, তাই সেটা নিয়ে কথা বলতে পারছি না। আমি কেবল অভিনয় করছি।’
ভূমিকা সম্পর্কে কোনো আভাসও দেবেন না তিনি, তবে হাল ছাড়ছেন না জেনে ভালো লাগল। এখনো ক্লান্তিহীন, এখনো ক্যারিশমাটিক এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে উষ্ণ আছেন তিনি। বিদায় নেয়ার সময় আমাকে বেগুন-পারমিযান বানিয়ে খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন। আশা করি মন থেকেই বলেছেন।






