মানুষটাকে তার মাঝে মাঝে বাড়ির সামনের মাঠ পেরিয়ে অপারের দিগন্তরেখার মতো অনেক দূরের মনে হয়। কেমন যেন চিরকালের অচেনা, পাথরের মতো কঠিন একটা মানুষ। কঠিন না হলে জগতে এত এত কাজ থাকতে একটা পাখির সাথে কেউ এমন নিষ্ঠুর আচরণ করে (এ পাখির সাথে নিষ্ঠুর আচরণ নিয়ে কারো সাথে সে কথাও বলতে পারে না। কথা বললে অনেকেই তার দিকে ব্যাকাটেরা চোখে চায়। আর কাজ নেই বুঝি। মানুষই মানুষের সাথে এখন আর কতটা ভালো আচরণ করে)। পাখি দিয়ে পাখি ধরা, এটা কোনো কাজ হলো! সারা দিন বনে-বাদাড়ে ছুটে বেড়ানো, খোলা মাঠে পাখির ফাঁদ পাতা। এটা কি বন-জঙ্গলের বুনোকাল! কেউ যখন জানতে চায়, ‘তর জামাই কিতা করে।’

কিচ্ছু বলতে পারে না হাছনা বেগম। তার মুখটাতে গাছের ছায়া পড়ে। ঠোঁটটা চুপসে যায়। বেশির ভাগ সময় চুপ করে থাকে। নাছোড়বান্দাদের কাছে কেবল বলে, ‘কিতা আর করতা, খেতর কাজ করইন।’ কথাটার মাঝে এমন একটা ঢঙ থাকে, অনেকেই মনে করে হাছনা বেগমের বরের অনেক জায়গাজমি। তা চাষবাস করেই সংসারে ফুরফুরে হাওয়া বইছে। হাছনা বেগম মনে মনে হাসে। ...‘কোন জমিদারর নাতি, আমি তো জানি। কুনুরকম পাও থইবার একটা ভিটা বাপে থইয়া গেছলা, নাইলে কেউর দেউরিত থাকা লাগলোনে।’...

তবে জমিজমা নিয়ে হাছনা বেগমের কোনো মাথাব্যথা নেই, আফসোস নেই। জমিজমা থাকলেই কী, না থাকলেই কী! মানুষটা যদি ঠিকঠাক না থাকে। তাইলে সম্পদ, আর টাকা-পয়সা কোন কাজে লাগে। পেটের ভাত যেমনে তেমনে যে কেউ জোগাড় করতে পারে। মানুষের সম্মান, মর্যাদা না থাকলে বাঁচার কোনো অর্থ আছে। পশু-পাখিও তো খায়দায়, ঘুমায়। বাচ্চা জন্মায়। লোকটারে কতবার বলেছে, ‘আর কুনতা পাওনানি। মাটি কাটলেও তো ভালা টেখা মিলে। এমন এক কাজ করো, না কেউরে কওয়া যায়, না কেউ ইজ্জত দেয়।’

হারুন শেখ বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন এক টুকরো হালকা মেঘ তার চোখের সামনে ছায়া ফেলে উড়ে যায়। কোনো কথা বলে না। ঠোঁট চেপে হাসে (ভাবটা এমন, বউ কী বলল, না বলল, তাতে তার কিছু যায় আসে না। বউয়ের কাজ বলার, বলে গেছে)। তার চোহারার মধ্যে রাগ-ক্ষোভ কোনো কিছুরই আভাস ফুটে না। হাছনা বেগমের কাছে অবাক লাগে। এ রকমও মানুষ হয়। এত মোটা গায়ের চামড়া। যতই খোঁচাও কোনো সাড়া দেবে না। হারুন শেখ বলে, ‘কিতা যে কও। গোলামি করতাম মাইনষর! বনর পাখি ধরিয়া বেচি। কেউর হাঁকডাক তো হুনা লাগে না।’

‘কিন্তু আমার তো ভালা লাগে না। পাখিগুইনতারে কত যে কষ্ট দেরায়। অসহায় প্রাণীর অভিশাপ লাগব কইলাম।’

‘ধুর, ধুর। এতা তো খাইবার লাগিই!’...

হাছনা বেগমের মাঝে মাঝে মনে হয় এ সংসারটা ছেড়ে এমন কোথাও চলে যেতে, যেখানে চেনা কোনো মুখ নেই। দরকার নেই তিনবেলা খাওয়ার। দুবেলা-একবেলা খাবে, তবু মনের শান্তিতে বেঁচে থাকা। কখনো কখনো বাপের ওপরও ক্ষোভ হয়। না-হয় গলার কাঁটাই ছিল। তাই বলে কী দেখে এ রকম একটা লোকের গলায় ঝুলিয়ে দিল তাকে। আবার বেশিক্ষণ এ ক্ষোভ মনের মধ্যে থাকেও না। সব বাপই তো চায় মেয়ে তার যেনতেনভাবে ভালো থাকুক, সুখে থাকুক। তাছাড়া হারুন শেখ যখন কাছ ঘেঁষে বসে। কোথা থেকে একটা বুনো ফুলের গন্ধ আসে হাওয়ায়। ঘরটা কী রকম অচেনা ফুলের গন্ধে ভরে যায়। একটা বুনো পাহাড় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ডালপালার ফাঁক গলে রোদ ঝরে মাটিতে। হাওয়া পাতার কাছে এসে দোল খায়। মরদ মানুষটা দুই হাত দিয়ে যখন পাঁজাকোলা করে, বুকের হাড়ের সাথে জড়িয়ে রাখে মাংসের পুতুল, তখন কেমন এক আকুলতা গাঙের জলে ঢেউ তুলে পাড়ে আচড়ে পড়ে (তার তখন বিস্ময়ও লাগে। এই মানুষটাই কিনা পাখির কাছে আরেক রকম। কোনো দয়ামায়া  নেই)। 

বিয়ের প্রথম রাতেই লোকটার প্রতি অচেনা বিহ্বলবোধ তৈরি হয়েছিল তার। কোথায় দু-চারটা রসটসের কথা বলবে তা না, শুরু যে করল কোন বনে কী রকম পাখি আছে। তার মতো পাখি শিকার নাকি আর এ তল্লাটে কেউ করতে পারে না। কোনো পাখিকে টার্গেট করলে সেই পাখিকে না ধরা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। হাছনা বেগম তার কথা বলার সেই ঢঙটা এখনো ভুলতে পারে না— ‘পাখি যাইবো কই। যেই বনে যাউক। ধরা তারে দিতেই অইবো।’

হাসিতে পেট ফুলে ওঠে হাছনা বেগমের। শরমভরমের মাথা খেয়ে খিলখিল করে হাসতে থাকে— ‘পাখি ছাড়া বুঝি আপনার দুনিয়ায় আর কুনতা নাই।’

পাখি ধরার নেশাটা ছোটবেলা থেকেই হারুন শেখের। তখন পাখিও ছিল প্রচুর। বাড়ির গাছে গাছে পাখি বাসা বুনেছে। খোলা মাঠে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমেছে শালিক, ঘুঘু, টিয়ে। কত রকমের পাখি। আম গাছে লতিয়ে থাকা গাছের রেম কুড়িয়ে এনেছে। রেম থেকে আঠা বের করেছে। সেই আঠা দিয়ে বাঁশের তৈরি তিন ডালের ফাঁদ বানিয়েছে। তাতে সুতলির মধ্যে গোঘরা পোকা আটকে ফাঁদটি মাটিতে পুঁতে রেখেছে। গোঘরা খেতে এসে আঠার সাথে আটকে গেছে কত পাখি। এটা ছিল শখ। কিন্তু একদিন এ শখটিকেই হারুন শেখ কিনা জীবিকার উপায় ভেবে নিল। খাঁচার মধ্যে পোষা ঘুঘু রেখে সেই ঘুঘুকে দিয়ে বুনো ঘুঘু ধরা। বুনো ঘুঘুদের আশেপাশে জালের ফাঁদ পেতে খাঁচাটি রেখে দেয় হারুন শেখ। পোষা ঘুঘুটি অবিরাম ডাকতে থাকে। সেই ডাক শুনে বুনো পাখিরা ছুটে আসে জালের সীমানায়। একসময় দূর থেকে জালের সুতোতে টান দিলে বুনো পাখিগুলো আটকে যায়। এটাই হারুন শেখের পাখি ধরার কৌশল। পাখির ডানা ভেঙে দিতে পারলেই তার সুখ।

একটা সময় পর্যন্ত হাছনা বেগম হারুন শেখের এ নেশা আর পেশা, যা-ই বলে এটাকে মেনে নিয়েছে। তার তো কিছু করার নেই। চাইলেই হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে যেতে পারে না। বিয়ের পর বাবা-ভাইয়ের সংসারে মেয়েরা পর। ঠেকলে হয়তো ঠাঁই মিলে। কিন্তু তাতে মান-সম্মান থাকে না। ভাইয়ের বউ একবার আদর করে তো, দশবার খোঁটা মারে। এ খোঁটা মারার কথাটা মনে হলে হাছনা বেগম মরদ মানুষটার দোষ-ত্রুটির চেয়ে তার আহ্লাদটাকে বড় করে দেখে (যদিও এ দেখাটাকেও সে মন থেকে মেনে নিতে পারে বলে মনে হয় না। কেমন একলা পুড়ে, নিজেকে পোড়ায়)।

নিজের এই একলা পোড়ার কষ্টটা হাছনা বেগমকে মাঝে মাঝে খুব ক্ষুব্ধ করে। আরশি-পড়শি নারীদের সাথে কথা বলতে গেলে অনেকবারই মুখ ফসকে বলেছে কথাটা, ‘বেটিনতর অইলো উস্টার জীবন। কপালো যা আছে, অতা লইয়াই চলা লাগে।’ প্রতিবেশী নারীরাও যে মুখ বুজে থাকে তখন, তা না। তারাও তার কথায় সায় দেয়। বিশদ বেদনাকে মেনে নেয়ার এক নীরব সক্ষমতা সবার চোখেমুখে ফুটে।

হাছনা বেগমের চোখের সামনে তখন কোনো মাঠ আর ফসল ভরা নেই। মনে হয়, কেউ শূন্য করে রেখে গেছে নাড়ার রোদন। ভাঁড়ারও খালি। তবু এ খেতের পাশেই আরো বহু বছর ধরে বেঁচে থাকতে হাছনা বেগম ঘর সাজায়। উঠান লেপে। এক টুকরো উঠোনের পাশে একটা-দুটা জবা ফুল, নয়তো হাসনাহেনার গাছ রোপণ করে। অচেনা দু-একটা ফুলও ফুটে নানা মৌসুমে।

তবে নিঃশব্দ ক্ষোভটা তাকে পোড়াতেই থাকে। বুকের ভেতরটায় অদেখা আগুনের শিখা যেন হু-হু করে জ্বলে। পাখির মাংস যে হাছনা বেগম কোনোকালে খায়নি, তা না। বাবার বাড়িও এক-দুইটা কানি বক, শীতের সময় তাদের বাড়ির পাশের হাওড়ে আসা পাখির ঝাঁক থেকে শিকারির জালে ধরা পড়া এক-দুইটা লেনজা হাঁস অনেকবার খেয়েছে। কিন্তু একটা ঘুঘু পাখির প্রতি এমন নির্মমতা দেখে হারুন শেখের দিকে তাকাতেও তার ইচ্ছে করে না। হারুন শেখ তার গা-গতরে হাত দিলে হয়তো সে ফিরিয়ে দেয় না। তবে এতে কোনো সাড়াও বোধ করে না। জড় মাংসের শরীর নিয়ে কাদামাটি হয়ে পড়ে থাকে। শুধু তার মনে হয়, এ জীবন তার নয়। অন্য কারো। যাকে সে চেনে না। কখনই যাকে সে ধারণ করেনি।

হারুন শেখ পোষা ঘুঘুটার দুটো চোখের পাতা যেদিন তার চোখের সামনে সুঁই-সুতো দিয়ে সেলাই করে দিল, হাছনা বেগম চোখ সরিয়ে নিয়েছে। মনে হয়েছে, তার শরীর থেকে অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে রক্ত ঝরছে। সারা শরীর ভরা সুচ বেঁধার যন্ত্রণা তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। প্রতিটি ছিদ্র দিয়ে রক্ত ঝরছে। আর সেই রক্ত দেখে হারুন শেখ আনন্দে মিটমিট করে হাসছে।

হাছনা বেগম বারবার বলেছে, ‘এতা করিও না। পাখিটারে এত কষ্ট দিও না।’

হারুন শেখ কথাটা শুনেনি। সে সুঁই-সুতো দিয়ে তার মতো করে পাখির দুটো চোখের পাতা সেলাই করতে থাকে। মুঠোর ভেতর ঘুঘুটি ধুকপুক ধুকপুক করে। ঘুঘুটি আর দেখতে পারবে না, এটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার সেলাই থামে না। সেলাইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ে টুপটুপ করে রক্ত ঝরতে থাকে হাছনা বেগমের দুই চোখের পাতা থেকে। তার চোখ রক্তে-ঘামে ঝাপসা হতে থাকে। কুয়াশার মতো চাদর রোদের প্রবাহকে আটকে দেয়। এ রক্তঝরা ও কুয়াশার মেঘ কেবল হাছনা বেগম অনুভব করতে পারে, হারুন শেখ এ রক্ত ও মেঘ কিছুই দেখে না।

হয়তো ঘুঘুর চোখের পাতা সেলাই করার রাতেই ঘটনাটি ঘটেছিল, হয়তো অন্য কোনো রাতে কিংবা অন্য কোথাও। হাছনা বেগম একটা বিভ্রমের মধ্যে ডুবে যায়। কখন সে দৃশ্যটি দেখেছে, নাকি কখনই এমন দৃশ্য সে দেখেনি (সময়টা এখন তার কাছে আপেক্ষিকই না, অধরা একটা বিষয়। যেন সে কিছুতেই সময়টাকে নির্দিষ্ট করতে পারে না। যেন নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই। কেবল মহাকালের ভেতর সে ঘুরতে আছে। ছুটতে আছে। তার অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ কোনো কিছু নেই)।

ঘুঘুর চোখের পাতা সেলাই করা দেখার পর থেকে সে একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। কিছুতেই চোখের সামনে থেকে একটা জীবন্ত প্রাণীর চোখের পাতা সেলাইয়ের মতো ঘটনা মুছে ফেলতে পারছিল না। রাতে ঘুম আসে না। কোনোভাবেই চোখের পাতা এক করতে পারে না সে। পাশেই মরদ মানুষ দিনের সব ক্লান্তিতে কাদা হয়ে নাক ডাকিয়ে রাত পার করে যায়। একসাথে অনেকগুলো শেয়াল ডেকে ওঠে। মানুষটি ঘুমিয়েই থাকে (হাছনা বেগমের মতো দু-একজন ছাড়া এ সময়টিতে গ্রামের অন্য সবও একই রকম ঘুমে)।

ঘরের সাথেই লাগোয়া কাঁঠাল গাছের ডালে দু-একটা পাখি ডানা ঝাপটায়। এটা নতুন কিছু না। পাখি কমে গেছে। হয়তো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি নেই। তাই বলে গ্রামের দু-একটি ঝোপঝাড়ে, গাছের ডালে পাখির দেখা মেলে না, এমন তো না। ভোরের আভাস পেয়ে কাঁঠাল গাছে পাখি গা-ঝাড়া দিলে খাঁচার পাখিটিও নড়েচড়ে ওঠে, ডানা নাড়ায় (হয়তো চোখের পাতা মেলারও চেষ্টা করে)।

হাছনা বেগম জানে, এ পাখিটি এখন আর দিনের আলো দেখতে পারবে না। চাইলেই সে চোখ মেলতে পারবে না। এ ঘুঘুটির কাছে সবসময় একই রকম। ধূসর, অন্ধকার। তার কোনো খোলা আকাশ নেই। নেই খোলা মাঠ। নেই বুনো ঝোপ।

হাছনা বেগমের মাথার ভেতর কী যে হয় তখন। কার্পাস ফলের মতো মাথার ভেতর নীরব বিস্ফোরণ ঘটে। মাথার ভেতর অনেক পাখি যেন একসাথে ডানা ঝাপটাতে থাকে। ডাকতে থাকে। অনেক রকম ডাক, অনেক রকম পাখি। কোনোটা চেনা, কোনোটা অচেনা। হাছনা বেগম অস্থির বোধ করে। এতদিনের স্থবির সময় যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে থাকে। সে ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসে। হাতে ঘুঘুর খাঁচা। হারুন শেখ তখনো ঘুমে। ঘুমে থাকারই কথা। তখনো সূর্য রাতের বুকে। আবছা অন্ধকার উঠানে। হালকা সাদা কাপড়ের মতো ভোর একটু একটু করে উজ্জ্বল হয়। হাছনা বেগম খাঁচার দরজা খুলে ঘুঘুটিকে মুঠোর মধ্যে ধরে খাঁচার বাইরে বের করে। তারপর ঘুঘুটির চোখের পাতার সেলাই আলতো করে খুলতে থাকে। প্রথমে বাম চোখ, পরে ডান চোখের সেলাই খুলে। চোখের পাতা খুলতেই ঘুঘুটি তার চোখের দিকে মণি ঘুরিয়ে তাকায়। অবাক করা চোখ। হাছনা বেগম ঘুঘুটিকে মুঠো থেকে মুক্ত করে। ঘুঘুটি মুঠো থেকে ছাড়া পেয়ে এক ঝটকায় উড়ে যায়। বেশি দূর যায় না। উঠোনে গিয়ে বসে। তারপর হাছনা বেগমের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে উড়াল দেয়। হাছনা বেগমের মাথাটা কেমন হালকা লাগে। সে শূন্য খাঁচার দিকে তাকায়। শূন্য খাঁচা দেখে তার ভালোই লাগে (অনেক দিন ধরে হারুন শেখের সাথে থেকে থেকে খাঁচার মধ্যে পাখি দেখে সেও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। খালি খাঁচা দেখলে তার বুকটাও কেমন শূন্য শূন্য লাগে। কিন্তু আজ একটুও শূন্যতা বোধ হচ্ছে না)।

ঠিক তখনই তার কানে আর্তনাদের মতো কিছু শব্দ আসে। প্রথমে হাছনা বেগম কিছুই আন্দাজ করতে পারে না। তার মনে হয় হয়তো বুনো শেয়ালগুলো রাত ফুরিয়ে যাওয়ায় ডাকতে ডাকতে দিনের আলোয় গর্তে ঢুকছে। কিন্তু শব্দগুলো ঘুরেফিরে তার ঘরের চারপাশে উড়তে থাকে। একবার মনে হয় তার ঘরের পশ্চিমে। আবার মনে হয়, না, পূর্বদিকের বুনো ঝোপের দিকে। আলো তখন আরো একটু ফরসা হয়েছে।

হাছনা বেগম ঘরের পশ্চিম দিকে পা বাড়াতেই কেউ একজন তার পথ আগলে দাঁড়ায়। প্রথম তার মনে হয়েছিল ছায়া। পরে মনে হলো, না মানুষই তো। ছায়া নড়ছে। তখনই তার মনে হয় কাছেই কোথাও একজন মানুষ গোঙাচ্ছে। হাছনা বেগম ছায়াটাকে পাশ কাটিয়ে সামনে যেতে চাইলে ছায়াটা শরীরী হয়ে ওঠে। আড়াল থেকে কেউ একজন বলে, ‘আগ বাড়িস না। ফিরত যা কইলাম।’

গলায় সরাসরি নির্দেশের সুর।

এ সময়ই তার চোখে পড়ে কয়েকজন মানুষ তাকে কিছু একটা গোপন করতে চাইছে (এরা মানুষ, নাকি অন্য কোনো প্রাণী তাত্ক্ষণিকভাবে এ নিয়েও তার দ্বন্দ্ব হয়)। ভোরের আলো সকালের দিকে হাঁটতে থাকলে এ মানুষগুলোর চেহারা কিছুটা স্পষ্ট হতে থাকে। বাঁশবনটি স্পষ্ট হতে থাকে। একবার মনে হয়, এ মানুষগুলোর মুখ সে চেনে (জামিল, রফিক, কাটা মুমিন, হিজবুল্লা...কত কত নাম)। এরা তার আশপাশেই থাকে। একসাথে, নয়তো আলাদাভাবে ঘুরেফিরে।

আবার মনে হয়, না এদের কাউকেই সে চেনে না। এরা শুধু ছায়া, এরা শুধু শরীর (এদের চিনলে ঘর পুড়ে যায়। নারী ধর্ষিত হয়। মানুষের বুক থেকে রক্ত ঝরে। এদের পেছনে অনেক অনেক সাদা-কালো হাত)।

হঠাৎ করে ঘুঘু পাখিটার কথা তার মনে পড়ে। পাখিটা এখন কোথায় গেছে (এ সময়টিতে কেন জানি একবারও হারুন শেখের কথা তার মনে আসেনি। ঘুঘুটার চোখ খুলে মুক্ত করার জন্য হারুন শেখ কী আচরণ করে, সে ভাবনাটাও কেন জানি তার মাথায় ঢুকে না)।

বাঁশবন থেকে আবারো ভেসে আসা গলায় কেউ একজন বলে, ‘তুই ঘরও যা। মনও রাখিছ। তুই কুনতা দেখছছ না।’

হাছনা বেগম ঘুঘুর সেলাই করা চোখের ঘোর থেকে বেরিয়ে নতুন এক ঘোরে ঢুকে যায়। এ কণ্ঠটাকে তার চেনা মনে হয়। সব কণ্ঠকেই তার মনে হয় সে চেনে (সে কণ্ঠের সাথে মিলিয়ে নাম মনে করার চেষ্টা করে। কিছু কিছু নাম তার মাথায় আসে, কিন্তু মুখে আসে না)। সে চোখ তুলে সামনের দিকে তাকায়। সকালের আলোয় কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেউ নেই। কোনো ছায়া, শরীর, মানুষ। ...কোনো কিছুই তার চোখে পড়ে না। সকালটা ডানা মেলে এখন রোদে ভাসছে।

হইচইটা তার পরেই সে শুনতে পারে। বাঁশবনের ঝোপে একটি লাশ। লাশের মুখ নেই, চোখ নেই। সারা শরীর ফালাফালা। লাশ দেখতে বানের জলের মতো চারপাশের গ্রাম থেকে মানুষের ঢল নামে। মানুষ আসতে থাকে। হুঁইসেল বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি আসে, পুলিশ আসে। পুলিশ লাশ গাড়িতে তুলে। তারপর একসময় পুলিশের গাড়িটিও উধাও হয়ে যায়। কিন্তু লাশ আর কোনো নাম-পরিচয়ে চিহ্নিত হতে পারে না।

হাছনা বেগম ভোরের আলো সকালের দিকে হাঁটার সময় যে মানুষগুলোকে সে বাঁশবনের কাছে দেখেছে, তাদের নামধাম, চেহারা সব সে ভুলে যায়। ছায়া ভুলে যায়, শরীর ভুলে যায়। একজন মানুষ নাই হয়ে যাওয়ার শূন্যতা তাকে গ্রাস করে।

হাছনা বেগম উঠোনের পাশে কাঁঠাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কিছুই দেখতে পারে না। সকাল দেখতে পারে না। বাঁশবন তার কাছে অচেনা। মানুষের ছায়া, মুখ ও শরীর এখন ধূসর, মাতৃগর্ভের মতো অন্ধকারে ডুবে থাকে সব। সে খাঁচার ঘুঘুটির মতো ছটফট করে। যেন তার সেলাই করা চোখ, এ চোখ মেলতে পারে না। ভোরবেলার ভেসে আসা গোঙানির অতল আর্তনাদের ভেতর সে তলিয়ে যেতে থাকে।...