তিনি কেবল প্রয়াত কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের মা ছিলেন না, ছিলেন হাজার, লক্ষ, কোটি চুরাশির মা। তার পরও ছিলেন একা। এই ‘ঝাঁসীর রাণী’ রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কেউ হয়তো ফিরেও দেখত না। তার পেছনে থাকত না মিডিয়ার ব্যস্ততা। কোনো কালেই তিনি সেলিব্রিটি হয়ে উঠতে চাননি। হয়েছিলেন ভারতের শোষিত, নিপীড়িত সাধারণ মানুষ, জমিহারা কৃষক আর আদিবাসীদের নৈতিক লড়াইয়ে ‘স্তনদায়িনী’ মা অথবা ‘মারাং-দাই’। ছ’আনা পয়সা বাঁচাতে বাপ্পার মা পিচ-গলা রাস্তায় ভরদুপুরে হাঁটতেন— নব্বই বছরে এসে সেই পা জোড়া থেমে গেছে
(গত সংখ্যার পর)
লেখকদের আর্থিক স্বাধীনতা কতটা প্রয়োজন?
অনেকটা, তবে এই প্রয়োজন একেকজনের একেক রকম। যে লেখক যেভাবে নেয়। আগেই তো বলেছি, আমার ‘চাওয়া’ খুব কমই ছিল। আশাপূর্ণা দেবীকে দেখেছি। ওঁর এবং ওঁর স্বামীর খুব সিম্পল লাইফ ছিল। সোমনাথ হোড়ের স্ত্রী আমার সহপাঠী। ওকেও দেখেছি। প্রতিভা বসু? যখন ওঁর গল্প-উপন্যাস নিয়ে সিনেমা হলো, তখনই তিনি কিছু টাকার মুখ দেখতে শুরু করেছিলেন। আমার মনে পড়ছে, ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল অব পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিসে কাজ করেছি। সরকারি চাকরি। সে সময় ১৫০ টাকা বেতন। কত সাল হবে? ১৯৫০— কিছু মেয়েকে ওরা সেই সময় চাকরিতে নিয়েছিল। অসম্ভব আনন্দিত হয়েছিলাম। মনে হলো পারব, আমি পারব। আই ক্যান পে দ্য হাউজ রেন্ট। ঘর ভাড়ার টাকা তখন কোথায় পাব, এই চিন্তা আমাকে বড় কষ্ট দিত।
আমি যে ধরনের মানুষ, কখনো টাকার প্রত্যাশা করিনি। টাকার পেছনে ছুটিনি। দেখো, আমি ম্যাগসেসে পেলাম, সব টাকাই তো দিয়ে দিলাম। টাকাটা আমার কাছে কোনো দিনই ইম্পর্ট্যান্ট নয়। যখনই যা পেয়েছি, তা দিয়ে দিয়েছি। সাহিত্য আকাদেমি পেলাম— তার টাকাও দান করে দিয়েছি।
অথচ টাকা রোজগারের জন্য আমাকে লিখতে হয়েছে, হচ্ছেও। আমি যখন বিয়ে করি বিজনকে, তখন তার পেছনে একটা ইডিওলজি কাজ করেছিল। বাবা, কাকা ঋত্বিক ঘটক— এঁদের কাউকে কখনো টাকা টাকা করতে দেখিনি। লোভ বা চাহিদা ছিল না। আমিও জীবনে কাজকেই প্রাধান্য দিয়েছি। শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে এ শিক্ষাই পেয়েছিলাম। নিরলস, নিরবচ্ছিন্ন কাজের অনুপ্রেরণা আমার চেতনাকে সবসময় জাগিয়ে রাখে। কোনো দিকে তাকাইনি এত দিন— শুধু লেখা, ওটাই আমার সাধনা ছিল। তার সঙ্গে আদিবাসী মানুষ ও তাদের জীবন, বেঁচে থাকার লড়াই, তাতে শামিল হওয়া আমার ধর্ম হয়ে উঠল। পরে ওরা আমায় চাকরি থেকে বের করে দিল। আমার স্বামী কমিউনিস্ট— এই আমার অপরাধ। আমি আর কী করি? আমার ছেলে তখন ছোট। শ্যামবাজারের মোড়ে একটা ভাড়া বাড়িতে তখন থাকি। ট্রামে যাওয়া-আসা করি, দরকার হলে হাঁটি। তখন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়— ওঁকে গিয়ে বললাম। শুনে তিনি বললেন অতুলচন্দ্র গুপ্তর সঙ্গে কথা বলতে। অতুলবাবু তখন সিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত। বড় অ্যাডভোকেট। তা অতুলবাবু চিঠি লিখে দিলেন। জমাও দিলাম। ‘লাল সম্পর্ক’র জন্য ছাঁটাই হলাম। তাঁর চেষ্টায় পুনর্বহালও হলাম। আর সে কি কাণ্ড, আমার অফিস টেবিলের ড্রয়ারের ভেতর থেকে বেশকিছু লেনিন-স্তালিন, মার্কসের বই বের হলো। ষড়যন্ত্র কাকে বলে। তার পর একদিন দরকার নেই বলে বের করেও দিল। বিধান রায়ের সঙ্গে আরেকবার দেখা হয়েছিল। ওঁর বাড়িতে বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন। আমার বাবা (মনীশ ঘটক), সুশোভন সরকার ও উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্ধু ছিলেন। বাবা কীভাবে জানি না বিধান রায়কেও চিনতেন। বিধান রায়ের কাছে বাবা এক গরিব মুসলমানকে নিয়ে গিয়েছিলেন চিকিত্সার জন্য। বিধানবাবু তাকে দেখেই বললেন, মদ খাওয়া ছাড়তে হবে। নইলে বাঁচবে না। সেতারশিল্পী নিখিল ব্যানার্জি— তাঁর দাদার স্ত্রীর বাচ্চা হবে। জটিল কেস। বিধান রায় গেলেন, বাচ্চাদের মোজা বোনার কাঁটা দিয়ে (স্টেরিলাইজ করে) কোনো একটা জায়গায় ফোটাতেই প্রবলেম সলভড। এটা আমার শোনা কথা। বিধান রায় নামেই কেমন একটা জাদু ছিল।
অনেক দিন পর একটা গল্প লিখলেন। ‘নেয় না’—
‘নেয় না’ গল্পটা? অনেক দিন পর এমন একটা গল্প লিখলাম ‘আমার সময়’-এ। নিউজ পেপার আর্টিকেল লিখতে লিখতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম। এত চাপ ওই সব লেখার যে কী বলব। ওই সব লেখার একটা তাগিদও আছে। হঠাত্ করে কেন এমন বিষয় নিয়ে লিখলাম, তা বলতে পারি না। সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি গিয়েছি— তারাও আমার কাছে আসেন। আমি ওই সব মেয়েকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখিও। ওদের মধ্যে প্রতিবাদটা অনেক দিন আগেই শুরু হয়েছিল— তা আমরা ধরতে পারিনি। মেয়েদের স্বাধীনতার উপলব্ধিটা জীবন দিয়ে ওরা সহজভাবে বুঝেছে। এই যে দেখি শহরে ঠাণ্ডা ঘরে শিক্ষিত মেয়েরা ডিবেট-টিবেট করে, তারা হয়তো রিয়েল লাইফ কেসগুলোর কথাই জানে না। খবরই রাখে না।
সো কলড উইম্যানস লিব-এ আমার কোনো কালেই বিশ্বাস ছিল না। আমি মনে করি, কোনো মেয়ে নিজেকে লিবারেট করতে চাইলেই করতে পারে। কাজের মাধ্যমে তা করতে হবে। আমি যে একজনের সঙ্গে থাকলাম। আলাদা বাড়ি নিয়ে থাকলাম। প্রথম ডিভোর্স করি, বিজনের সঙ্গে বিভাজন হয়ে গেল। অসিত গুপ্ত আমাদের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতেন। বয়সে অসিত আমার চেয়ে ছোট ছিলেন। বিজনের সঙ্গে থাকতে পারছিলাম না। অসিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হলো— ভেবেছিলাম ওটা ভালোবাসা, কিন্তু সেটাও ভেঙে গেল। টিকল না।
আপনার বিয়ে হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। ফেব্রুয়ারিতে। স্বাধীনতার আগে; বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন অভিনেতা, নাট্যকার, গায়ক। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বিজনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ১৯৬২ সালে। অসিত গুপ্তর সঙ্গে বিয়ে ১৯৬৫ সালে। অসিত গুপ্তর সঙ্গে সম্পর্ক স্থায়ী হয়েছিল ১১ বছর। এই ভাঙা-গড়া আপনার সাহিত্যজীবনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি?
ফেলেছিল বৈকি। গভীরভাবেই হয়তো ফেলেছিল। অসিতকে বিয়ে করে দেখলাম ইট ইজ নট ওয়ার্কিং। আমি ইকোনমিক সাপোর্ট পাচ্ছি না। আমি যে স্বাধীনতা চাই, তাও পাচ্ছি না। আমার জীবন আমারই জীবন। আমি যখন বিজনকে ছেড়ে চলে এলাম, ছেলের জন্য ভীষণ কষ্ট পেতাম। ‘হাজার চুরাশির মা’তে তার অনেকটা, মানে আমার এ কষ্টের অনেকটা প্রতিফলিত হয়েছে। বিজনকে ছেড়ে চলে আসার সময় আমি একদম সমাজের কথা ভাবিনি। তখন আমার একটাই দাবি— স্বাধীনতা। আই নিডেড আ ফ্রিডম। তখনো সস্তার তাঁতের শাড়ি পরি। ছেড়ে এসেও বদলাইনি। যা ছিলাম, তা-ই আছি। আমার প্রথম জীবনের ক্যারিয়ার গ্রাফটা দেখো—
‘পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশন’-এ প্রাতর্বিভাগে পড়ানো— ১৯৪৮-৪৯ সাল। পরের দুই বছর পোস্ট অফিসে চাকরি। তার পর চাকরি চলে গেল, সম্পূর্ণ বেকার। সংসার চলত টিউশনি করে। একসময় পয়সার জন্য কাপড় কাচার সাবানও বিক্রি করেছেন; এই অবস্থা ছিল ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত। ওই বছর আবার শিক্ষকতা শুরু হলো— রমেশ মিত্র বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক— ১৯৮৪ সালে স্বেচ্ছা অবসর। এর পর তো লেখা আর লেখাই। ১৯৮৬তে ‘পদ্মশ্রী’, ১৯৯৬তে জ্ঞানপীঠ আর ১৯৯৭তে ম্যাগসেসে পুরস্কার, এর পর রয়েছে বর্তমান-ভবিষ্যত্।
মনে পড়ছে সব। অসিতকে ছেড়ে আসার পর আমার জীবন একটা নতুন মোড়ে এসে, বলা ভালো একটা সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে আমি আদিবাসীদের সমাজ-জীবন ও তার জনস্মৃতিতে মিশে গেলাম।
সেই সন্ধিক্ষণে মনের ওপর খুব চাপ পড়েছিল? কোনো ডেস্ট্রাকটিভ প্রবণতা, সাময়িকভাবে উচ্ছৃঙ্খল জীবনে ঢুকে পড়ার একটা টান...
থাক। আজ আর সেসব কথা বলতে চাই না। নিজের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। অফ কোর্স সেটা ডেস্ট্রাকটিভ। কিন্তু এখন ওসব আর বলব না। আমার দিক থেকে লজ্জা, শরম— সোসাইটির গুরুত্ব নেই। তবে ওই সময়টায় ভীষণ একটা ভ্যাকুয়াম হয়েছিল।
এটা কাটিয়ে উঠলেন কীভাবে?
লিখে। স্রেফ লিখে। ‘হাজার চুরাশির মা’ লিখেছিলাম ওই সময়েই। উপন্যাসটা পড়লে বোঝা যাবে। আর ওই সময় আমি অসম্ভব ঘুরে বেড়াতে লাগলাম— তার একমাত্র কারণ ছিল এটাই। মনের একটা কষ্টকে চাপতে চেষ্টা করেছি। হয়তো এটাই আমার জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট। ওই সময় দিনে ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করেছি।
এই সময় থেকেই কর্মী লেখক হয়ে উঠলেন?
হ্যাঁ। একদিকে আমি কোয়ালিটি রাইটিংয়ের দিকে মন দিলাম, অন্যদিকে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করতে শুরু করলাম। এই দিকটা অবশ্যই আমার লেখাকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করেছিল। একটা না দেখা ওয়ার্ল্ড, কেউ জানে না, বোঝে না। তার সমস্ত অনুভূতি ক্ষোভ-দুঃখগুলো আমার লেখার কালির সঙ্গে খুব মিশে যাচ্ছিল।
‘মার্ডারারের মা’ উপন্যাস রচনার নেপথ্য কাহিনী কী ছিল? প্লটটা মাথায় এল কীভাবে?
এ উপন্যাসের মূল কাহিনীটি একেবারে সত্য। মার্ডারারের মা পাঠকের কাছে পৌঁছায় ১৯৯২ সালে। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট আরো পূর্বের। জানো তো, এখন যেমন, আগেও তেমনভাবে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, ক্ষমতা দখল, এলাকা দখলের জন্য সমাজবিরোধী তৈরি করত। টেকনোলজি যেমন বদলায়, তা পুরনো হয়, তেমনিভাবে সমাজবিরোধীদের চরিত্রও বদলায়, তাদের তৈরি করা হয় প্রয়োজনমতো। সে সময় দেখেছি, সমাজবিরোধীরা মূলত ছিল কংগ্রেস রাজনীতিতেই বিশ্বাসী। তাদের একটা মূল্যবোধও ছিল। তারা রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আশ্রয় নিত। পরে দেখলাম রাজনৈতিক নেতারাই সমাজবিরোধী বানাচ্ছেন আবার তাদের প্রয়োজনে হত্যাও করছেন। এখন রাজনীতি আর সমাজবিরোধিতা একসঙ্গে জুড়ে রয়েছে। মার্ডারারের মা একটা সময়ের দলিল। বেকারির দায়ে, দারিদ্র্যের যন্ত্রণায় তপনের মতো ছেলেরা সমাজবিরোধী হয়ে যেত। তাদের তৈরি করতেন সমাজের উঁচুতলার লোকজন। পরে কাজ শেষ হলে মেরেও ফেলতেন।
‘দ্রৌপদী’ গল্প লেখার নেপথ্যে কি কোনো তাড়না ছিল?
ছিল। যে সময়ের লেখা, সেই সময়টাকে ধরা হয়েছে। তার উল্লেখ করাও আছে গল্পে। ইট ওয়াজ আ ফাইন স্টোরি— সবাই তখন বলাবলি করতেন। গল্পের প্রেক্ষাপট নকশাল আন্দোলনের সময়। বীরভূমের ও অন্যান্য অঞ্চলের জঙ্গলের কথা— কীভাবে ওই সব অঞ্চল ব্যাটেল-ফিল্ড হয়ে উঠেছিল... আমরা খবর পাচ্ছিলাম। আফটার অল যা দেখেছি, যা-ই করেছি, সেসবই উঠে এসেছে লেখায়। লেখক যখন লিখবে, সেটা তো নিজের মতোই হবে। দ্রৌপদী গল্পটা একদিনে লিখেছিলাম। ‘পরিচয়’ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় বেরিয়েছিল। তখন পরিচয় পত্রিকা দেখতেন দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়। দীপেন আমার ছেলে নবারুণকে বলেছিল, মাকে বলো না একটা গল্প লিখতে। ওদের অনুরোধে দ্রৌপদী লিখলাম। গল্পটা সকালে লিখতে শুরু করে রাত ১২টা নাগাদ শেষ করে ফেললাম। মনের মধ্যে যেন গল্পটা তৈরি হচ্ছিল।
মনে আছে, গল্পটা পড়ে শঙ্খ ঘোষ প্রশংসা করেছিলেন। দীপেনও করেছিল। সে তো ভারি খুশি। তখনকার নবীন লেখকদের অনেকেরই গল্পটা ভালো লেগেছিল। সে সময় নকশালদের ওপর অত্যাচার চলছে। নিজের চোখে দেখেছি। এক উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার মেয়েদের অত্যাচার করত। তার কোনো ডকুমেন্ট অবশ্য ছিল না। কিন্তু ঘটনা যে ঘটছে, ঘটেছে তা সত্যি— পুলিশ অ্যাট্রোসিটিসের কোনো ডকুমেন্ট কোনো দিনই থাকে না। ভিকটিমদের মনে থাকে, মানুষের ক্ষোভের মধ্যে রয়ে যায়। তার কথা আমি লিখেছি। হাজার চুরাশির মাতেও সেই অভিজ্ঞতার কথাই লিখেছি।
হাজার চুরাশির মা উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে শারদীয় ‘প্রসাদ’ পত্রিকায়। বই হয়ে বের হয় পরের বছরই। প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন খালেদ চৌধুরি। হিন্দি চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয় ‘হাজার চৌরাশি কি মা’ নামে। উপন্যাসটি হিন্দি, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন Marielle Morin— এই লেখা হলো কীভাবে?
এই যে বললাম, অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছি। হাজার চুরাশির মা লেখার সময়টা খুব মনে আছে। প্রসাদে উপন্যাসটা বেরোনোর পর আমার ভাই অবলোকিতেশকে পাঠালাম। ও তখন পণ্ডিচেরিতে। স্কুলে পড়ায়। নভেম্বরে কলকাতায় এল। বলল, পড়িনি উপন্যাসটা। এবার পড়ব। এখানে এসে তিন-চারদিন পরই মারা গেল। অবলোকিতেশ আর আমার উপরের ভাই অনীশের কথা আমি ছোটদের লেখায় প্রচুর লিখেছি। হাজার চুরাশির মা উপন্যাসের চরিত্র ব্রতীর শৈশব নিয়ে যা লিখেছি, তা তো আমার ছেলেরই শৈশবচিত্র।
হাজার চুরাশির মা উপন্যাসের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে এর আগে কিছু কিছু লিখেছি। পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। বলতে দ্বিধা নেই, সত্তরের দশকের আন্দোলন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। ওই আন্দোলনের জেরেই আমার ওই উপন্যাস। আমরা তখন বিপিন পাল রোডে। বাংলাদেশে যুদ্ধ চলছে— কলকাতায় নকশাল হত্যাও; তখন আমি রাস্তা হেঁটেই যাওয়া-আসা করতাম। একা নির্জন নিষ্প্রদীপ পথ ধরেও ফিরেছি দিনের পর দিন। তখন শহরে কারফিউ— উত্তাল দিন। দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান— দুটি ছেলে প্রায়ই বিপরীত ফুটপাত ধরে আমাকে অনুসরণ করে আসত। চাদরে মাথা ঢাকা। ঠিক বোঝা যায় না ওরা কারা। একদিন ওদের সত্যি সত্যি জিগ্যেস করে বসলাম— কেন আসো তোমরা আমার পেছনে? ওরা বলল, আমি একা যাই তাই।
কিছুদিন পরে ওই ১৯৭৩ সালেই দুটি ছেলে এক সন্ধ্যায় আমার ওই বাড়ির বারান্দায় এসে বলল— আপনি গ্রামের কথা লিখছেন। আর শহরে যে আমরা প্রত্যহ মার খাচ্ছি, তার কথা কে লিখবে? এখান থেকেই ওই কাহিনীর বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। এক জননী— সে হাজার চুরাশির মা। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। ছেলের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক এমনই যে, ছেলেকে পেয়ে সে নিজেকেও খুঁজে পায়। জননী সুজাতা।
গল্প, উপন্যাসের চরিত্ররা আপনার মাথায় কীভাবে আসে? তারা কি ভিড় করে থাকে? আসে যায়?
বলতে পারব না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চরিত্রদের চিনি। ঘটনা থেকে চরিত্ররা উঠে আসে। মাথায় থাকে— তার পর কখন যে কালি-কলমের মধ্যে ঢুকে পড়ে কে জানে। কিছু কিছু চরিত্র চেনাশোনা— তাদের সঙ্গে আমার কথা হয় মনে মনে। একটা সময় এটা খুব হতো।
আপনি একজন নারী। মেয়েদের জীবন নিয়ে, তাদের ক্রাইসিস নিয়ে লিখেছেন। আবার খেড়িয়া শবরদের নিয়েও বেশকিছু লেখা আপনার কলমে এসেছে— এই লেখা কি কোনো পুরুষের হাতে ভালো হতো, নাকি আপনি নারী বলে এই উত্কর্ষ পেল?
প্রথমত. আমি ‘লেখিকা’ শব্দটি সাপোর্ট করি না। তোমরা ডাক্তারকে কী বলো? কেরানিকে? মহিলা লেখক তবুও বলতে পারো। আমি লেখক। আলাদা করে মেয়েদের লেখা বলে কিছু হয় না। মানুষ লিখছে বলে ভাবছ না কেন? আমি লিখি, তাই আমি রাইটার। ১৯৮৬ সাল হবে। আমরা তখন অর্গানাইজ করেছিলাম মহিলা লেখিকাদের এক জায়গায় করার জন্য। শরত্ বসুর মেয়ে চিত্রা ঘোষ এর উদ্যোক্তা ছিলেন। সীতা দেবী, শান্তা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী, শৈলবালা ঘোষ জায়াদের সম্মান-জ্ঞাপন করা হয়। আমাদের পরিকল্পনা ছিল বাণী রায় ও আশাপূর্ণা দেবীকেও এ সংবর্ধনা দেয়ার। তবে সেটা হয়নি। এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন প্রবোধকুমার সান্যাল ও তারাশঙ্কর। সীতা দেবী-শান্তা দেবীরা প্রত্যেকেই খুব শক্তিশালী লেখক ছিলেন। ওঁরা যে সময়টা নিয়ে লিখেছেন, তার মধ্যে শিক্ষিত মেয়েদের সমাজচেতনার ভাবটি ফুটে উঠেছে। শৈলবালা বর্ধমানের অখ্যাত গ্রামে বসে ‘সেখ আন্দু’ লিখলেন। প্রবাসীতে ছাপাও হলো। সাহিত্যের ইতিহাসে এঁদের নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। শৈলবালা যে লেখক, তা ভুলে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্য। একজন গাড়োয়ান ও জমিদারকন্যার প্রেম নিয়ে তিনি অসামান্য একটি উপন্যাস লেখেন। আশাপূর্ণা দেবী নিজের সময়কে ডকুমেন্ট করেছেন। যে জীবন তিনি দেখেছেন, তা-ই লিখেছেন। ওঁর ইতিহাস চেতনা প্রখর ছিল। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ পড়লে তা বেশ বোঝা যায়। ওঁর মেয়ে পুষ্প দেবী আমাদের সঙ্গে বেলতলায় পড়তেন। আমরা জানতাম পুষ্পর মা লেখেন। এভাবেই তাঁকে পড়েছি। আশাপূর্ণার কাছে গেছি— আমাকে মনের দিক থেকে সাপোর্ট দিয়েছেন। লেখা ভালো হলে জানাতেন।
পরের দিকে কোন কোন মহিলা লেখকের লেখা ভালো লেগেছে?
সুলেখা সান্যাল। জয়া মিত্র। মীনাক্ষী সেন। নকশাল আন্দোলন নিয়ে বেশ কয়েকজন ভালো লিখেছিলেন। এঁদের কাছ থেকে একটা সময় প্রমিস পেয়েছি। পুরুষ লেখকদের মধ্যে অমর মিত্র, ভগীরথ মিশ্র, সাধন চট্টোপাধ্যায়, অভিজিত্ সেন। এই দেখো নাম ভুলে যাচ্ছিলাম— নবনীতা দেবসেন। বাণী বসু। ওঁর ‘মৈত্রেয়জাতক’ পড়েছি। সুচিত্রা? ভালো লেখে। বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার পড়তে ভালো লাগে। খুব প্রিয় লেখক আমার। এখন তেমন পড়তে সময় পাই কই?— লেখকদেরও তো দায়িত্ব থাকে আমাকে দিয়ে পড়িয়ে নেয়ার। একসময় প্রচুর গোয়েন্দা কাহিনী পড়েছি। ওয়াইল্ড লাইফ পড়েছি।
একদিকে দেখো, অরুন্ধতী রায়। এক্সট্রিমলি ইম্পর্ট্যান্ট রাইটার। আমি অবশ্য ওঁর ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ ছাড়া তেমন কিছু পড়িনি। থ্রু রাইটিং, শি ইজ অ্যান অ্যাকটিভিস্ট। নন্দীগ্রাম ফেজে ও এসেছে আমার বাড়িতে।
এই উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায়, ঈদ সংখ্যায়— ১৯৮০ সালে। ‘ঝাঁসীর রাণী’ লিখলেন ’৫৫তে, তার প্রায় ২৫ বছর পর আপনার চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর— একটা সিগনেচার বুক। কীভাবে এই উত্তরণ সম্ভব হলো? কেমন করে খুঁজে পেলেন চোট্টি মুণ্ডাকে?
এতক্ষণ যা বলেছি, তার মধ্যেই রয়েছে প্রথম প্রশ্নের উত্তর।
এ উপন্যাসের আধার যে সময়টায়, তাকে বুঝতে হবে। সেই সময় ট্রাইবাল এগজিস্ট্যান্স থ্রেটেন্ড হচ্ছে। তাদের ইউনিটি ভেঙে যাচ্ছে। নতুন কলকারখানা আসছে। ওদের চাষের জমি, ঘরদোর নিয়ে নিচ্ছে। গরিব আদিবাসীদের মধ্যে যে অটুট বন্ধন ছিল, তা আর রইল না। ওদের ওপর তীব্র শোষণ শুরু হলো। আমি ওই সময় প্রায়ই পালামৌ যেতাম। বছরে অনেকবারই। বিশেষ করে তীর খেলার সময়। এ উপন্যাসের কাহিনীসূত্র পাই পালামৌ জেলার এক অখ্যাত আদিবাসী অঞ্চল থেকে। মেলা উপলক্ষে তীর খেলা দেখতে যাওয়ার সময়। একদিন বাসে করে যেতে যেতে হেসালং বাজারে একটা মেলায় গিয়ে পড়ি। দেখি, সেখানে তীরন্দাজি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। সেই প্রতিযোগিতার বিচারের ভার পড়ত এক বৃদ্ধ মুণ্ডার ওপর। প্রথামতো এই বৃদ্ধ মুণ্ডা-বিচারক প্রতিযোগিতার শেষে এলাকার মান্যি, শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ হিসেবে শেষ তীরটি ছুড়বেন। সবাই বলত, তার তীর মন্ত্রপূত। চোট্টি মুণ্ডার চরিত্রটির মধ্যে ওই দক্ষ তীরন্দাজের ব্যাপারটি রয়েছে। বাকিটা মিলবে না। তবে এ কথা বলা যায়, প্রতিটি ঘটনাই সত্য, সত্য এবং সত্য।
আপনার এ উপন্যাসের শুরুতেই একটি দৃশ্য রয়েছে এইভাবে— ‘কথা বলতে বলতেই ও তীর ছোড়ে আর নিশানি বাঁধে। ডোনকা হাঁটু ছুঁয়ে সম্মান জানিয়েছিল। চোট্টি বলেছিল, যত জনা পারে নাই, তত জনার ধনুক নিয়ে দেখাব? মন্তর পড়া আছে বটে। কিন্তু মন্তর পড়া তীরটা দেখো ব্যবহার করি নাই। যেটাতে নিশানি বিঁধলাম, সেটা আমার নাতিটার তীর। এ কথাও সত্যি ও মন্তর পড়া তীর কাছে থাকতে আমি নিশানাছুট হব না।
কে যেন বলছিল, তবে তো তোমার তীর খেলা ঠিক হয় না। ৬০ বছর বয়স হলো, তা তুমি কেন বিচারক হও না? একজন তো হয় তোমাদের সমাজ থেকে।
তাই হব।
সেই থেকে চোট্টি মুণ্ডা এই তীর খেলায় হয় বিচারক। দারোগা বলেছিল, এমন হাত তোর! যদি বন্দুক চালাতিস।
চোট্টি বলেছিল, তীর ছোড়ে হাঁ-মরদ। গুলি ছোড়ে না-মরদ।’
আপনি কি মুণ্ডারী ভাষা, বিরসা, ধানী, চোট্টি মুণ্ডাদের ভাষা শিখেছিলেন? প্রতিটি চরিত্রের মুখের ভাষা এমন নিখুঁত এবং নিবার্য হয়ে উঠল কী করে?
শিখিনি। কানে শুনেই তৈরি হয়ে গেছে চরিত্রের মুখের ভাষা। ওদের সঙ্গে তো আমি কম দিন, বছর কাটাইনি— সেটা ভুললে চলবে কেন?
আপনার ‘রচনা সমগ্র’র নবম খণ্ডের ভূমিকায় এক বিশিষ্ট লেখক সাংবাদিক চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর উপন্যাসের সঙ্গে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড’ উপন্যাসের তুলনা করে লিখেছেন, ‘বিরসা, ধানী, চোট্টির জগতের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের প্রসঙ্গেই কি মার্কেসের কল্পনার নগর মাকোন্দর বাস্তব বৃত্তান্তের ক্ষয়ে ক্ষয়ে ঝরে পড়ার কথা মনে এল? ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে মার্কেসও উদ্বিগ্ন ছিলেন। ...বিলীয়মান স্মৃতি ও ইতিহাসের সমস্যার পাশাপাশি আরো দুটি কারণে সলিচুড ও চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীরকে সধর্মী, সন্নিভ মনে হয়।’ এ তুলনা প্রসঙ্গে আপনার মত কী?
আমি মার্কেস পড়িনি। ইটস ট্রু। নব্বইয়ে যখন আমি প্রথম আমেরিকা গেলাম, সর্বপ্রথম জিগ্যেস করেছিলাম— আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা কোথায়? তাদের সাহিত্য কেমন? শুনেছিলাম রেড-ইন্ডিয়ানদের মেরে দিয়েছে— শেষ!
তীর শব্দের মধ্যে কোনো ম্যাজিক আছে কি?
চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর— তীর শব্দের মধ্যে কোনো দ্যোতনা বা ম্যাজিক নেই। রিয়েলিটি আছে বরং। প্রাচীন ভারতের ফ্লেভার বহন করে। তীর শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিউক্লিয়ার ওয়েপনের মতো। তীর একটাই লক্ষ্য স্থির করে— ম্যান টু ম্যান। নাথিং মেকানিক্যাল, পুরোটাই ম্যানুয়াল। সোর্ড অনেককে কাটতে পারে। তীর মানে— একজন ছোড়ে, একটাই লক্ষ্য। কে ছুড়েছে, কী ছুড়েছে, কাকে ছুড়েছে— সেটাই ইম্পর্ট্যান্ট।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের সংস্কৃতি, মন ও জনস্মৃতির মধ্যে থেকে আপনি যে সম্পদ তুলে আনলেন, যেভাবে মিশে গেলেন ওদের মধ্যে, তাতে কি সাহিত্যক্ষেত্র আরো বিস্তৃত হয়নি?
আমি এ নিয়ে কিছু বলব না। সমালোচকরা বলবেন। ওদের মধ্যে গিয়েছি বলে আমি জীবনকে সঠিকভাবে দেখেছি।
হাজার চুরাশির মা প্রকাশিত হয়েছিল প্রসাদ পত্রিকায়। আপনার জনপ্রিয় গল্প ও উপন্যাসগুলোর বেশির ভাগই কিন্তু নামিদামি পত্রিকায় বের হয়নি। তবুও পাঠকের অভাব হয়নি। এক নম্বর পত্রিকাগুলোয় একসময় লিখতেন না কেন?
ঠিক করেছিলাম লিখব না সেখানে, ‘যেখানে না লিখলে কেউ লেখক হয় না’ বলে কথিত আছে। নামিদামি কাগজের বাইরেও তো প্রচুর কাগজ আছে— তাদেরও প্রচুর পাঠক আছে। কোথায় লিখছি, সেটা বড় নয়— কী লিখছি তা-ই বড়। দ্রৌপদী লিখেছিলাম শারদীয়া পরিচয়-এ, তাতে কী এসে গেল। মানুষ পড়েননি? মোস্ট ডিসকাসড স্টোরি মনে রাখেননি ‘বাঁয়েন’ গল্প। বাঁয়েন অবশ্য অমৃততে বেরিয়েছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসুরা সাধারণ পত্রিকায়ও লিখেছেন। অনেক লেখকই অনামি পত্রিকায় লিখে বড় হয়েছেন। আগামী দিনেও হবেন। কেউ কাউকে বড় করতে পারে না, যদি না লেখকের নিজস্ব প্রতিভা থাকে। গত কয়েক দশকে কেন বড় বড় পত্রিকায় ব্রেক থ্রু হলো না? একটা উপন্যাস মনে করতে পারো, যা এক কথায় পাঠকের মুখে এসে পড়ছে— আলোড়ন তুলেছে— অবধূত, আশাপূর্ণা দেবীরা তো সাধারণ মানের পত্রিকায়ই লিখে কাটিয়ে দিলেন। যেখানেই লিখেছি, দেখি মানুষ পড়েন। আজকাল তরুণ লেখকদের কেউ প্রমোট করে না। এ ক্রাইসিসটা আমি বুঝি। আমি তখন প্রতিষ্ঠিত লেখক। আমি অমর মিত্র, অভিজিত্ সেন, জয়ন্ত জোয়ারদার, ভগীরথ মিশ্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী— এঁদের লেখা নিয়ে কাগজের অফিসে দৌড়তাম। ভালো লিখলে সম্পাদকদের বলতাম। এখন তরুণ লেখকদের লেখা কেউ পড়েও দেখেন না। আমরা এ পরিবেশটা পাইনি। বিমল মিত্র আমার সমসাময়িক লেখক ছিলেন। তাঁর বহু লেখা মন দিয়ে পড়েছি। বিমল করের ‘খড়কুটো’, শংকরের ‘কত অজানারে’ পড়েছি। পড়েছি জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সমরেশ বসু। সমরেশ আমার ‘বায়োস্কোপের বাক্স’ পড়ে লিখেছিলেন এবারের শারদীয়ার শ্রেষ্ঠ লেখা। আজকের জেনারেশনের সামনে কিন্তু এসব নেই। অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ভোলা যায়? মনে পড়ছে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা। কী পাওয়ারফুল! আজকের তরুণ লেখকদের সামনে সেই রকম একটা পরিবেশ গড়ে উঠছে না কেন, তা বলতে পারি না। তরুণদের লেখা কারা এগিয়ে এসে ছাপেন জানো? অনেক ভালো লেখক এখন অ্যাপ্রিসিয়েশন পান না। এত দিনে অনেক ভালো লেখক উঠে আসা উচিত ছিল।
‘রুদালি’ উপন্যাস যেভাবে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে, তা ভালো লেগেছিল কি? কীভাবে গল্পটা হাতে এল?
কল্পনা লাজমির ছবি দেখে যা বলার তা বলেছি আগেই। নতুন কোনো কথা বলার নেই। শুধু একটাই বলার, ডিম্পল খুব ভালো অভিনয় করেছিল। আমার গল্পের প্রাণটাই তো ছবিতে নেই। তখন আমি পালামৌতে। বছর বারো-চোদ্দর ছেলেমেয়েরা আসত আমার কাছে। যে মেয়েটি আমার কাজ করত, সে ওদের জন্য খিচুড়ি রাঁধত। একদিন তারা এল, সঙ্গে তাদের মায়েরা। তারা আদিবাসী। সে বলল— মা, ওদের কাজ সেরে আসতে তিনটে হবে। তখন এদের খেতে দিবি। বললাম— কেন? সে বলল, কেউ একজন মারা গেছে। ওখানে ওরা কাঁদতে যাবে। না কাঁদলে আত্মা স্বর্গে যাবে না। এ ঘটনার সঙ্গে আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল। কলকাতায় কাশী মিত্তিরের ঘাট। শিশির ভাদুড়ি মারা গেছেন। আমি আর বিজন গেলাম। সেদিন কোনো এক ধনী মাড়োয়ারি মারা গেছেন। দেখেছিলাম, সেখানেও অনেক মহিলা কাঁদছেন। ওর জন্য আপন কেউ কাঁদার নেই। ভাড়া করে এনে কাঁদাতে হলো। এ দৃশ্যটা মনে ছিল। তার পর পালামৌয়ের ঘটনা। শুরু হলো অন্বেষণ। তার পর? সে তো ইতিহাস।
সাহিত্যের আড্ডায় আপনাকে দেখা যেত না...
আমি কখনো তেমন কোনো সাহিত্যের আড্ডায় যাইনি। পদ্মপুকুর রোডের বাড়িতে বিজনের কাছে প্রভাত দে সরকার, সুভাষ মুখোপাধ্যায়রা আসতেন। কথা হতো, আলোচনাও হতো। সুভাষ মারা যাওয়ার পর আমি আর নবারুণ গেলাম। কীভাবে সুভাষ নেগলেকটেড হয়েছিল, সে কথা যখন ভাবি, দুঃখ হয়।
একসময় আমি চলে গেলাম এইটিন বাই এ, বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে। মিত্র ও ঘোষের অফিসে মাঝে মধ্যে যেতাম। আমার সিনিয়র লেখকদের সঙ্গে কখনো কখনো দেখা হতো— তারাশঙ্কর, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। ওঁদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। রেগুলার সাহিত্যের আসরে জীবনে যাইনি আমি। ওসবে কিছু হয় না। লেখককে থাকতে হয় নেপথ্যে। চার বছর বয়স থেকে আমার বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ১২-১৪ ঘণ্টা একভাবে পড়তাম। আমার দিদিমা খুব ভালো পাঠিকা ছিলেন। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও প্রচুর অন্য ধরনের লেখা পড়তাম। আমরা তারাশঙ্কর, সতীনাথ ভাদুড়ি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গো-গ্রাসে গিলতাম। ‘পথের পাঁচালী’ তখন বিচিত্রায় বেরোচ্ছে। আমরা তন্ময় হয়ে পড়ে যাচ্ছি। বিভূতিভূষণকে আমি জীবিতকালে দেখিনি। তারাশঙ্কর বাবু আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন— সে কি আনন্দ আমাদের। জগুবাবুর বাজারে পাঞ্জাবি সোসাইটি হলে ওঁকে সংবর্ধনা দেয়া হলে আমরা সেখানে উপস্থিত হই। ওঁর ছেলে সনত্ বন্দ্যোপাধ্যায় ভালো লিখতেন। ওঁর ‘চন্দন যাত্রা’ লেখাটি এখনো মনে আছে। গজেন্দ্র মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ, প্রমথনাথ বিশীকে দেখেছি।
পেছনের দিকে ফিরে দেখে, সামনের দিকে তাকিয়ে কখনো কি ভাবেন— ‘কী পেলাম!’ না-পাওয়া আর কী রইল?
পার্থিব চাহিদা আমার কোনোদিনই ছিল না। গাড়ি, বাড়ি— যা যা মানুষের চাহিদা, সেই সব আমি চাইনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদর্শে বড় হয়েছি তো! আমার যদি কোনো বিষয়ের ওপর আলটিমেট শ্রদ্ধা থাকে, সেটা পেন অ্যান্ড পেপার। আমি চিরকাল জেদি ছিলাম। আমি সরকারের বিরুদ্ধে যেভাবে লিখেছি, তা হয়তো আজ পর্যন্ত কেউ লেখেননি। অথচ আজ পর্যন্ত ওরা আমার বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেনি। আমি চিরকালই বামপন্থী। বাম রাজনীতির মানুষ। আজো তা-ই আছি। এত দিন ওরা মানুষের জন্য তেমন কিছুই করেননি, তাই আমি প্রতিবাদ করে এসেছি। এ প্রতিবাদ আমি নিজের কাজের জায়গায়ও করেছি। একবার এক সম্পাদক আমায় বললেন, টাকাটা না নিয়ে ভালো করলেন না। তাঁকে বলেছিলাম— আপনাদের এখানে লিখব না। আমি তবুও লিখব, শুধুই লিখব। লিখেই বেঁচে থাকব। আমি আমার কথা রেখেছি।
আপনার কোন লেখাগুলো বেঁচে থাকবে?
পাঠক যা বাঁচিয়ে রাখবে। তবে আমার মনে হয়— অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর।
লেখা নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে?
কিছু না। অন্য একটা আক্ষেপ আছে। ভাবি, এখানকার সরকার এভাবে কেন অ্যান্টি-পিপল হয়ে গেল। এও একটা অদ্ভুত ঘটনা। তারা স্টেটকে কিছু দিল না। নন-ট্রাইবাল সোসাইটির জন্য কিছু করল না। তাই তো এখনো লিখি কাগজে। চোখ ওদের একদিন খুলবেই। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা হচ্ছে, আমার মরে যাওয়ার ইচ্ছে একদম নেই। কী করব? জানো, আমার মরতে ইচ্ছে করে না। কেন মরব? মরে যেতে চাই না। আরো কিছুদিন বাঁচতে ইচ্ছে হয়— লেখার জন্যই পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না।
সাক্ষাত্কার: কল্যাণ মৈত্র






