১৬৪১ সালের বসন্তে দুজন পর্তুগিজ যাজককে লাহোরের এক প্রাসাদের মূল অভ্যর্থনা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এ প্রাসাদের মালিক আসফ খান ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী লোক। সেদিন সন্ধ্যায় মোগল সম্রাট শাহজাহানকে রাতের খাবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আসফ খান ও তাঁর স্ত্রী। লুকানোর জায়গা থেকে রেশমি রুপা আর সোনালি নকশা করা দামি গালিচা বিছানো হলঘরের দিকে নজর রাখছিলেন দুই যাজক। কামরার চারপাশে সাজানো সুগন্ধিদানিতে জ্বলছিল আগরবাতি, অ্যাম্বারগ্রিস আর মৃগনাভি। মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম টেবিলক্লথের চারপাশে সাজানো গদি। তাদের চোখের সামনেই মুক্তা ও সোনার মালা পরা মোগল সম্রাট পরিবারের আরো দুজন সদস্যকে নিয়ে মেজবানের পেছন পেছন হাজির হলেন। গদিতে বসার পর সুন্দরী পরিচারিকাদের বাড়িয়ে দেয়া গামলায় হাত ধুয়ে নিলেন তাঁরা। তার পর বাদ্যযন্ত্রের কানে তালা লাগানো শব্দে খাবার নিয়ে আসা হলো। আমাদের নাকাড়ার চেয়ে ভিন্ন নয়। তবে অনিশ্চিত আর শোকার্ত সুর। বিভিন্ন রঙের ট্রাউজার ও সূক্ষ্মতম মসলিন পোশাক পরা খোজারা খাবার পরিবেশন করল। সম্রাটের দুই পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা দুই সুন্দরী মহিলাকে খাবারের
সোনালি গামলা চালান করল তারা [এবং]... তাঁর সামনে বিভিন্ন খাবার রেখে একইভাবে খাওয়ার পানিও দিল, সরিয়ে নিল অপ্রয়োজনীয় সব পদ। মুসলিম ‘বর্বরদের’ এমন নিখুঁত টেবিল ম্যানারের জ্ঞান দেখে বিস্মিত বোধ করলেন যাজকরা। ৪ ঘণ্টারও বেশি স্থায়ী হয়েছিল ভোজ পর্ব। সবকিছু পরিষ্কার করার পর উদ্দীপক ও ইঙ্গিতপূর্ণ পোশাক পরা নর্তকীরা হাজির হয়ে ‘অসংযত হাবভাব ও অঙ্গভঙ্গি দিয়ে আমোদিত করল তাদের। তবে সামনে তিনটা পাত্রে রাখা ধনরত্নের প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন শাহজাহান। সম্রাট পদ্মরাগমণি আর পান্না পরখ করার সময় যাজকদের গ্যালারিতে নিয়ে যাওয়া সেই খোজারা ফিরে এসে জানাল, তাদের বিদায় নেয়ার সময় হয়েছে। আমরা উঠে পথপ্রদর্শককে অনুসরণ করলাম। রাজকীয় প্রহরীদের সামনে না পড়ার জন্য মাটির নিচের সুড়ঙ্গ দিয়ে রাস্তায় নিয়ে এল সে আমাদের। আমাদের জন্য মোগল সম্রাটের রাতের খাবারের বর্ণনা রেখে যাওয়া এ যাজক হলেন সেবাস্তিয়ান মানরিক। একজন মুসলিম অভিজাতের প্রাসাদে অনুপ্রবেশের তাঁর এ দাবি স্পর্ধিত। প্রতিটি প্রাসাদের কেন্দ্রের একান্ত অংশটুকু উঁচু দেয়ালে ঘেরা থাকত, পাহারায় থাকত প্রহরীরা। কঠোর বিচ্ছিন্নতায় রাখা হতো মহিলা সদস্যদের, কেবল পরিবারের সদস্য ও ভৃত্যদেরই এ অংশে পা রাখার অনুমতি ছিল। একজন পর্তুগিজ যাজককে অন্দরমহলের নারীদের দিকে চোখ ফেলার জন্য প্রবেশের অনুমতি দেয়ার ব্যাপারটা খুবই অসম্ভব বলেই মনে হয়। মানরিক হয়তো দরবারে চালু বিভিন্ন রটনা থেকে এ কাহিনী তৈরি করে থাকতে পারেন। সপ্তম শতকের ভ্রমণ লেখকরা প্রায়ই লেখকসুলভ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে নিজেদের বিভিন্ন ঘটনায় স্থাপন করতেন।
রোমে যাওয়ার উদ্দেশে ভারত সফর করছিলেন মানরিক। নয় বছর ধরে শাহজাহানের হাতে বন্দি এক যাজকের পক্ষে আবেদন জানাতে লাহোরে যাত্রাবিরতি করেছিলেন তিনি। যে অভিজাত ব্যক্তি তাঁর বক্তব্য শোনেন, তিনি আসফ খান। মোগল দরবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ হওয়ার পাশাপাশি সম্রাটের চাচাও ছিলেন তিনি। নিশ্চয়ই আলোচনার নৈপুণ্যের সঙ্গে দারুণ আকর্ষণ মেলাতে পেরেছিলেন মানরিক। হতভাগ্য যাজককে কেবল মুক্তই করেননি তিনি, বরং আলোচনা শেষে খান ‘আমাকে সবসময় বিনা বাধায় তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেয়ার কথা প্রহরীদের জানিয়ে দিতে হুকুম দিয়েছিলেন এক খোজাকে। সামান্য অনুগ্রহ ছিল না সেটা।’ আসফ খান সম্রাটকে আপ্যায়ন করতে যাচ্ছেন শোনামাত্র নিজের সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ‘এসব সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার’ অনুমতি চান তিনি। খোদ আসফ খানই গ্যালারি থেকে নজর রাখার ব্যবস্থা করে থাকতে পারেন। তবে তিনি যাজকের উপস্থিতির কথা জেনে থাকলেও সফর ঘিরে থাকা গোপনীয়তা, গ্যালারির গোপন নজর রাখার জায়গা এবং গোপন সুড়ঙ্গপথে ফিরতি যাত্রা বোঝায় যে, সম্রাটকে কিছুই জানানো হয়নি। সম্রাট শাহজাহান, যাঁর খাদ্যাভ্যাস মানরিককে দারুণ কৌতূহলী করে তুলেছিল, ভারতে পঞ্চম মোগল শাসক ছিলেন। প্রথমজন ছিলেন অষ্টম হেনরির সমসাময়িক বাবুর বা ‘বাঘ’। বর্তমান উজবেকিস্তানের মধ্য এশীয় রাজ্য ফারগানার তৈমুরীয় যুবরাজ ছিলেন বাবুর। অঞ্চলে তৈমুরীয় বংশকে প্রধান শক্তিতে পরিণত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ১৫ বছর বয়সে তৈমুরের এককালের রাজধানী অনন্যসুন্দর শহর সমরখন্দ অধিকার করেন তিনি। কিন্তু শহরটি ধরে রাখতে পারেননি বাবুর, উজবেকদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। এর পর বহু বছর পাহাড়ে-পর্বতে ঘুরে বেড়ান তিনি। তবে তাতে বাবুরের আকাঙ্ক্ষা মোটেই দমেনি। শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট শক্তিশালী বাহিনী জোগাড় করে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে নেন। এর পর ১৫২৬ সালে সে সময় হিন্দুুস্তান নামে পরিচিত উত্তর ভারতে মারাত্মক হামলা চালান বাবুর।
বাবুরই হিন্দুস্তানে হামলাকারী প্রথম মুসলিম ছিলেন না। ১৩০৮ সালে তাঁর পূর্বসূরি তৈমুর দিল্লি অধিকার করেছিলেন। দ্বাদশ শতকের পর থেকে বেশ কয়েকজন মুসলিম সুলতানের অধীনে শহরটি শাসিত হয়েছিল। এ সময় তুরস্ক, পারস্য ও আফগানিস্তানের মুসলিমরা উত্তর ভারত ও দাক্ষিণাত্যে বসতি করেছিল। মূলত হিন্দু কথাটি হিন্দুস্তানের লোকের ফারসি নাম ছিল। ইসলামে ধর্মান্তর হয়নি, এমন ভারতীয়কে বোঝাতে পরিভাষাটি ব্যবহার করে মোগলরা একে ধর্মীয় অর্থ দিয়েছিলেন। ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় জনগণ ছিল বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মিশেল। এদের বেশির ভাগই অন্তহীন জীবনচক্র এবং বিভিন্ন দেব-দেবীকে প্রসন্ন করার প্রয়োজনের মতো বেশকিছু কেন্দ্রীয় বিশ্বাসের অংশীদার ছিল। তবে ভারতে এ সময়ের ধর্ম অর্থোডক্সির বদলে অর্থোপ্র্যাক্সির মতো ছিল, যার ফলে হিন্দু ও মুসলিমদের ভেতর অনুশীলনের আদান-প্রদান চলত। গুটিবসন্তের দেবী শীতলাকে প্রসন্ন করতে হিন্দুদের অনুষ্ঠানে যোগ দিত মুসলিমরা, আবার হিন্দুরাও সুফিদের সমাধিতে অর্চনা করত, যদিও সতীর্থ মুসলিম উপাসকদের সঙ্গে খাবার খেতে তৈরি ছিল না তারা।
নিজের নতুন বিজয়ে হতাশ ছিলেন বাবুর। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় অঞ্চলটি মুসলিম শাসনের অধীনে থাকলেও একে এশিয়া ও আফগানিস্তান থেকে একেবারেই ভিন্ন রকম আবিষ্কার করে অবাক হয়েছিলেন তিনি। ‘আমাদের দেশের সঙ্গে তুলনা করলে একেবারেই ভিন্ন জগত্... সিন্ধু নদ পেরোনোর পর জমি, পানি, গাছপালা, পাথর, মানুষজন, বিভিন্ন গোত্র, আচার-আচরণ আর রীতিনীতি, এসবই একেবারে হিন্দুস্তানি কেতার।’ লিখেছেন তিনি। জীর্ণ ন্যাংটি বাদ দিলে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায় লোকজন, সৌন্দর্য নেই। সমাজ মহিমা বা আভিজাত্য, সৌজন্য রহিত। তাঁর দেশের সর্বোচ্চ সংস্কৃতির চিহ্ন কাব্য প্রতিভা বলে কিছু নেই কারও। তাপ, কামড় বসানো হাওয়া আর ধুলোর কবল থেকে বাঁচতে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা হাম্মামখানায় আশ্রয় নিয়েছেন। হিন্দুস্তানের একটা ভালো দিক ছিল, ‘প্রচুর সোনা আর টাকার বিশাল দেশ ছিল এটা। ভারতে ক্ষমতা সংহত করে থলে ভর্তি ধনরত্ন নিয়ে ফের সমরখন্দ অধিকার করতে ফেরাই বাবুরের পরিকল্পনা ছিল। সেটা সফল হয়নি। ভারতেই মারা গেছেন তিনি। হিন্দুস্তান সম্পর্কে বাবুরের অন্যতম অভিযোগ ছিল এখানকার খাবার জঘন্য। ভালো কোনো খাবার, আঙুর, তরমুজ বা অন্য ফল নেই। বরফ, শীতল পানি, ভালো খাবার বা রুটি নেই বাজারে, অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। খাবার উপভোগ করে এমন সংস্কৃতির মানুষ ছিলেন বাবুর। বাগদাদের প্রাচীনতম রান্নাবিষয়ক বইয়ের একটি— ছয়টি আমোদের ভেতর খাবারকে ‘সবচেয়ে অভিজাত ও ফলদায়ী’ বলে উল্লেখ করেছে [অন্যগুলো হলো মদ, পোশাক, যৌনতা, সৌরভ আর শব্দ]। সমরখন্দ হাতছাড়া হওয়ার পর অনেক বছর পাহাড়-পর্বতে আত্মগোপনে থাকার সময় মধ্য এশীয় স্তেপের যাযাবর অশ্বারোহী রাখালদের মাংসপ্রধান খাবার খেয়ে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। ১৯২০-এর দশকে খাইবারের এক গার্ডেন পার্টিতে এক ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা এক ধরনের কাবাবের স্বাদ নিয়েছিলেন ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে, বাবুর হয়তো সেটা খেয়ে থাকবেন। যুদ্ধবাজ পাহাড়ি লোকদের একটা গোত্র স্থানীয় আফ্রিদিরা ওই ব্রিটিশকে অস্ত্র, আতশবাজি প্রদর্শনী এবং কীভাবে তারা শত্রু অবস্থানের ওপর হামলা চালায়, দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অতিথিরা তাঁবু ঘিরে বসে চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার সময় এক বয়স্ক আফ্রিদি এগিয়ে এসে একটা শিকে গাঁথা টাটকা ঝলসানো ভেড়ার মাংস বাড়িয়ে ধরে। ছিঁড়ে হাতে ধরে খেতে হতো এসব। পিলাও ছিল যেকোনো মধ্য এশীয় রাঁধুনির ভাণ্ডারের আরেক আবিশ্যিক ডিশ। স্থানীয় ভেড়ার মাংসল লেজ ব্যবহার করা হতো এতে। ১৮৬০-এর দশকে ব্যাপকভাবে মধ্য এশিয়া সফরকারী প্রাচ্য ভাষার হাঙ্গেরীয় প্রফেসর আর্মিনিয়াস বাম্বারি প্রস্তুত প্রণালির বর্ণনা দিয়েছেন: একটা পাত্রে কয়েক চামচ চর্বি গলানো হয় (...সাধারণত লেজের চর্বিই নেয়া হয়)। যথেষ্ট উত্তপ্ত হওয়ার পর ছোট ছোট টুকরো করা মাংস ছেড়ে দেয়া হয় তাতে। অর্ধেক ভাজি হলে তিন আঙুল পরিমাণ পানি ঢেলে ধীরে ধীরে মাংস সিদ্ধ হতে দেয়া হয়। এর পর মরিচ আর পাতলা করে কাটা গাজর মিশিয়ে তার ওপর চাল বিছানো হয়...। আরো পানি ঢালা হয়, চাল সেটা শুষে নিলে কমিয়ে দেয়া হয় আগুন। চাল, মাংস, গাজর ভাপে পুরোপুরি সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত শক্ত করে আটকানো পাত্রটা রেখে দেয়া হয় গনগনে অঙ্গারের ওপর। আধঘণ্টা পর ঢাকনা খুলে এমনভাবে খাবার পরিবেশন করা হয়, যাতে বিভিন্ন স্তর আলাদাভাবে থালায় পড়ে, প্রথমে চর্বিতে ভাসা ভাত, তার পর গাজর এবং সবার উপরে মাংস। খাবার শুরু হয় এটা দিয়েই। একে চমত্কার বলেছেন বাম্বারি।
মধ্য এশিয়ায় মাংস পৌরুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কিত ছিল। পশু শিকারকে শরীর ঠিক রাখার এবং যুদ্ধ-প্রস্তুতির উপায় মনে করা হতো। ভারতেও শক্তি ও বীরত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল মাংস। মহাভারতের মতো ভারতীয় মহাকাব্যে দেবতারা ঝলসানো মাংসের বিপুল খাবারের সামনে বসেন। আয়ুর্বেদিক চিকিত্সায় মাংসকে টিকে থাকার মূল ধরন ও সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ মনে করা হতো। মাটির পরিবেশগত অস্তিত্ব প্রথমে উদ্ভিদ এবং তার পর তৃণভোজীতে রূপান্তর হয়ে আবার মাংসাশীদের খাবারে পরিণত হয় বলে মনে করা হতো। প্রতিটি পরিবর্তন অস্তিত্বের আরো শক্তিশালী রূপ তৈরি করত। এভাবে সব খাবারের সেরা খাবার ছিল মাংস। শিকারি ও যোদ্ধাদের মতো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, অগুনতি স্ত্রী ও উপপত্নীদের কাছে যৌনক্ষমতা প্রদর্শন করবেন এবং সরকারের দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে পালন করবেন বলে প্রত্যাশিত রাজা মাংসপ্রধান খাবারের ওপর নির্ভর করতেন।
দ্বাদশ শতকের রাজা তৃতীয় সোমেশ্বর ভারতীয় দরবারি খাবারের অন্যতম সেরা তথ্য রেখে গেছেন। বর্তমান মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের শাসক রাজা পশ্চিম চালুক্যিয়া বংশের মানুষ ছিলেন তিনি। যুদ্ধের চেয়ে শিল্পকর্ম ও সাহিত্যের প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন। রাজ্যের বিভিন্ন অংশ হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকলেও রাজকীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার ওপর একটি বিশ্বকোষ লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। প্রীতিকরভাবে মনোশল্যসা অর্থাত্ মন ভালো করা শিরোনামের রচনাটি রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজার প্রয়োজনীয় গুণাবলির দিকে নজর দিয়েছে। তবে বেশির ভাগ জায়গাই শিকার, মালিশ, যৌনতা থেকে অলঙ্কার, যানবাহন এবং তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয় খাবারসহ বিভিন্ন রাজকীয় প্রমোদ ও বিনোদন দখল করে নিয়েছে। আয়ুর্বেদিক চিকিত্সা শাস্ত্রে রাজাদের তারুণ্য বাড়াতে মাংসপ্রধান যৌন উত্তেজক এবং বিভিন্ন জিনিসের মিশেলের কথা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়েছে। এ জাতীয় বর্ণনার প্রতি নজর দিয়ে সোমেশ্বর উল্লেখ করেছেন যে, ‘রাজার জুতসই, স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন’ খাবার গ্রহণ করা উচিত। পাঁচ শতাব্দী পরও বিচিত্র ধরনের মাংস খাওয়ার অভ্যাস দক্ষিণের অন্যতম বিশাল ও শক্তিশালী হিন্দু রাজ্য বিজয়নগরের রাজাদের হাতে টিকে ছিল। খাসি, শুয়োর ও হরিণের মাংসের পাশাপাশি ‘চড়াই, ইঁদুর, বিড়াল আর গিরগিটি’ রাজধানীর বাজারে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
অবশ্য নিরামিষবাদে পাল্টা ঝোঁকের কারণে মাংসের প্রতি ইতিবাচক প্রবণতা জটিলতার মুখে পড়েছিল। পঞ্চম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধ ও জৈন মতবাদ সহানুভূতি প্রকাশের উপায় হিসেবে নিরামিষ ভোজের পক্ষে প্রচারণা চালায়। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮ থেকে ২৩১ পর্যন্ত ভারতের এক বিশাল অংশের শাসক অশোক নিরামিষ ভোজকে বাড়তি জোর জুগিয়েছিলেন। বুদ্ধ মতবাদে প্রভাবিত অশোক ধর্মের পথ বেছে নিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রজাদের। পাহাড়ের বুকে এবং বিশেষভাবে নির্মিত স্তম্ভের গায়ে খোদাইয়ের ব্যতিক্রমী কায়দায় প্রজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তিনি। এমনই এক খোদাইকর্মে শাসকদের হেঁশেলে স্যুপে পরিণত হাজার হাজার পশু হত্যার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি উল্লেখ করেছেন: ‘এখানে আর কোনো পশুকে হত্যা বা জবাই করা হবে না।’ আরো অন্যান্য খোদাইকর্মে অশোক কোন কোন পশু হত্যা করা যাবে না, কোন দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ, মনে করিয়ে দিয়ে হত্যা থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে প্রজাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন।
বাবুরের হিন্দুস্তান অধিকার করার সময় নাগাদ নিরামিষ ভোজ ভারতীয় সমাজে কারো অবস্থানের শক্তিশালী প্রকাশে পরিণত হয়েছিল। এককালে আচরিক বিসর্জন দিত যারা, সেই ব্রাহ্মণরা এখন গোঁড়া নিরামিষভোজীতে পরিণত হয়েছিল। মানবীয় প্রকৃতির পাশবিক বৈশিষ্ট্য তেজ ও আবেগ উসকে দেয়ায় তারা মাংস প্রত্যাখ্যান করে। গোঁড়া ব্রাহ্মণরা এ-জাতীয় সব খাবারই এড়িয়ে যেত, যেমন মাংস, পেঁয়াজ, রসুন। তার বদলে এমনিতে খাবার হজমে ব্যয়িত হতো যে শক্তি, তাকে শরীর-মন সমৃদ্ধ করে তোলার কাজে লাগাতে সক্ষম করা সহজ পাচ্য নিরামিষী (সাত্ত্বিক) খাবার গ্রহণকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল।
বর্ণ প্রথায় উচ্চমর্যাদা বরাবর নিরামিষ ভোজের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। অভিজাত ইতালীয় পর্যটক পিয়েত্রো দেইলিয়া ভ্যালে লক্ষ করেছিলেন যে, রাজস্থানের শাসক যোদ্ধা শ্রেণী রাজপুতরা ‘আভিজাত্যের দিক থেকে কোনো রকম কুসংস্কারে আচ্ছন্ন না হয়েই মাংস খেত।’ শিকার রাজপুত সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পোষ না মানানো পশুর মাংসেই ল্যান্ডস্কেপের অস্তিত্ব ঢের বেশি নিবিড়ভাবে থাকে বলে মনে করা হতো। ফলে শিকারকে দারুণ গুরুত্ব দেয়া হতো। রাজস্থানি খাবারে এখনো শিকার রেসিপির একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখা রয়েছে, যেমন উন্মুক্ত আগুনে পেঁয়াজ, ধনে, জিরা, রসুন ও আদা দিয়ে রান্না করা শুয়োর। এবং বুনো মাংস এখনো ‘বীর্য লাভে সাহায্য করার পাশাপাশি সাহস আর শক্তি’ বাড়িয়ে পুরুষের পৌরুষ বাড়ায় বলে কথিত আছে।
তবে নবাগতদের চোখে বেশির ভাগ ভারতীয়কেই ধর্মীয় বিশ্বাস বা দারিদ্র্যের কারণে নিরামিষভোজী মনে হতো। খাবারের মানের বেলায় ইউরোপীয় পর্যটকরা বাবুরের মতোই হতাশ ছিলেন। মূল্যবান পাথর কিনতে ভারত সফরকারী ফরাসি জুয়েলার জাঁ-ব্যাপ্তিস্তে ট্রাভেনিয়ার মুসলিম শাসকের এক বড় গ্রামে ‘ভেড়া, মুরগি আর কবুতর বিক্রি হতে দেখা গেছে’ বলে জানতে পারেন। কিন্তু বানিয়ার দোকান নামে পরিচিত হিন্দু বণিকের আবাস বিভিন্ন গ্রামগুলোয় খুবই সীমিত ছিল সেটা। অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পিয়েত্রো দেইলা ভ্যালে, ‘নিজের খাবারের বেলায় যথেষ্ট ধকল পোহাতে হয়েছে আমাকে। খাবারের বেলায় এ ভারতীয়রা দারুণ খুঁতখুঁতে হওয়ায় মাংস বা মাছ পাওয়ার জো ছিল না ওদের কাছে। ভাত, মাখন কিংবা দুধ অথবা এ-জাতীয় জড় বস্তুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে কাউকে।’
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের ভারতে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ গ্রাম্য কৃষক শ্রেণী এবং শহুরে কারুশিল্পী ও শ্রমিকদের প্রধান খাবার ছিল অল্প পানিতে একসঙ্গে সিদ্ধ করা সাধারণভাবে চাল ও ডালের মতো দুটি শস্যের মিশেল খিচুড়ি। প্রত্যেক অঞ্চলে প্রধান ফসল হিসেবে উত্পাদিত শস্যের ওপর ভিত্তি করে রেসিপির ভিন্নতা ছিল। ভারতীয় সৈনিকদের খাওয়ার সময় গলানো ঘিয়ের বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে খাবারকে আরো উপাদেয় করে তোলার বিষয়টি ট্রাভেনিয়ার খেয়াল করেছিলেন। আচার বা লোনা মাছও খিচুড়ির সঙ্গে ভালোই চলত। বেশি সচ্ছলরা স্বাদ সৃষ্টিতে নিপুণ রাঁধুনিদের চাকরি দিয়ে ক্রয়ক্ষমতার প্রকাশ ঘটাত। ঔরঙ্গাবাদের যুবরাজদের জন্য রান্না করা খাবারের বর্ণনা দিয়েছেন ট্রাভেনিয়ার: ‘যেমন বলেছি ওদের সব খাবারের উপাদান ভাত ও সবজি এত মরিচ, আদা আর অন্যান্য মসলায় ভরা থাকত যে আমার পক্ষে সেসব খাওয়া ছিল অসম্ভব। প্রবল ক্ষুধা নিয়েই খাবার রেখে দিয়েছিলাম আমি।’
জীবনের যে অবস্থানেই থাক, গরুর মাংস খাওয়ার বেলায় সব হিন্দুর সংস্কার ছিল। গরুর মাংস খাওয়াকে কেমন করে ‘খুবই ঘৃণ্য কাজ, দূষণ ও কল্পনাতীত পাপময়’ মনে করা হতো, তার বর্ণনা দিয়েছেন ভেনিসীয় নিকোলাও মানুচ্চি। সবসময় এমন অবস্থা ছিল না। আয়ুর্বেদিক চিকিত্সা শাস্ত্র গরুর মাংসের উপকারিতার বর্ণনা দিয়ে একে ‘গুরুতর, তপ্ত, চর্বিদার ও মিষ্টি’, গুরুপাচ্য এবং সতর্কতার সঙ্গে খাওয়ার কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছে। তার পরও গরুর মাংসকে সবচেয়ে ফলপ্রসূ ওষুধ বিবেচনা করা হতো। প্রথম শতাব্দীর দিকে ভারতীয়রা নিয়মিত গরু বলি দিয়ে মাংস খেত। মহাভারত এমনকি ব্রাহ্মণদের গরুর মাংস খাওয়ার কথা বলেছে। যদিও তাতে একটা অনুচ্ছেদ আছে, যেখানে একটা গাভী তার আত্মীয়দের নির্বিচার হত্যা নিয়ে অভিযোগ করছে। গরু হত্যা নিয়ে গড়ে ওঠা অস্বস্তিবোধের এটাই ছিল প্রথম আলামত। মহাকাব্যগুলো মূলত লোককাহিনী, তবে ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক বিধিনিষেধ জোগানো ব্রাহ্মণদের হাতে সেগুলো লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পরিণামে টেক্সটের স্ববিরোধিতা সময়ের পরিক্রমায় গরুর মাংস খাওয়ার ব্যাপারে পরিবর্তিত প্রবণতাই প্রকাশ করেছে। পরিবর্তনের একটা প্রায়োগিক ব্যাখ্যা হলো, দেশ ক্রমেই কৃষিনির্ভর হয়ে ওঠায় ভারতীয়রা চাষাবাদ ও দুধের উত্স হিসেবে বেশি করে গরুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠায় সেগুলোকে হত্যা করতে অনীহ হয়ে ওঠে।
বাবুরের ভারত অধিকারের সময় নাগাদ গরু পরিণত হয়েছিল পবিত্র পশুতে। এ লোকগুলো কেবল গরুর মাংস খাওয়াকে ঘৃণিতই মনে করে না, বরং গরুর বিভিন্ন উত্পাদনকে পবিত্র জ্ঞান করে এবং পাপ মোচনের লক্ষ্যে দুধ, মাখন, গোবর ও চনার মিশেল খেতে দ্বিধা করে না জেনে মানুচ্চি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
গরু ও খাসির প্রতি মোগলদের আন্তরিক আগ্রহ তাদের নতুন প্রজাদের অনেকেরই খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। মুসলিমরা খাবারকে বিনোদন মনে করত। মোগলদের হেঁশেলে আপাত
বেমানান খাদ্য সংস্কৃতি মিলেমিশে উত্তর হিন্দুস্তান, মধ্য এশিয়া ও পারস্যের খাবারের রেসিপির একটা সিন্থেসিসে পরিণত হয়েছিল। ফল ছিল ভারতের বাইরে বহু মানুষের কাছে ভারতীয় খাবারেরই সমার্থক অসাধারণ মোগলাই খাবার। অবশ্য বিশ্রীভাবেই ভারতীয় খাবারের সঙ্গে মোগলদের সাক্ষাত্ শুরু হয়েছিল। বাজারের জোগান দেখে হতাশ হলেও পরাজিত সুলতান ইব্রাহিম লোদির হেঁশেলের বাবুর্চিদের চারজনকে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাবুর। নিজের কৌতূহলের জন্য অনুতাপ করেছেন তিনি। স্মৃতিকথায় এক শুক্রবার সন্ধ্যায় খরগোশের স্ট্যু, জাফরান সুবাসিত মাংস ও পাতলা চাপাতির ওপর পরিবেশিত তেলে রান্না করা ভারতীয় ডিশের সামান্য অংশ খাওয়ার পর বমি করার কথা বলেছেন তিনি। বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে ভেবে ওই বমি একটা কুকুরকে জোর করে খাইয়েছিলেন। কুকুরটা অচিরেই বাবুরের খাবারে ভাগ বসানো ভৃত্যদের মতোই অসুস্থতার আলামত দেখাতে শুরু করে। জানা যায় যে, পরাজিত সুলতানের মা মাংসে বিষ ছিটিয়ে দেয়ার জন্য এক বাবুর্চিকে ঘুষ দিয়েছিলেন। কুকুরসহ সবাই বেঁচে যায়। কিন্তু অত্যাচারের মুখে স্বীকারোক্তি দেয়া বাবুর্চির জীবন্ত চামড়া খসানো হয় আর স্বাদ পরখকারীকে কুটিকুটি করে ফেলা হয়। এসব শাস্তির নিষ্ঠুরতার বিচারে মূল ষড়যন্ত্রী সুলতানের মা অল্পেই পার পেয়েছেন, তাকে স্রেফ কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ঘটনা তেমন একটা ক্ষতি করতে পারেনি বাবুরের, স্রেফ তাঁর বেঁচে থাকার ইচ্ছাকেই আরো জোরাল করেছে সেটা। এর পরও নিজের হেঁশেলে হিন্দুস্তানি বাবুর্চিদের রেখে দিয়েছিলেন কিনা স্মৃতিচারণে আমাদের সেটা বলেননি তিনি। অবশ্য আমরা জানি, বাবুরের ছেলে ও দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুন হিন্দুস্তানি বাবুর্চিদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। বাংলার আফগান শাসক শের শাহর কাছে সিংহাসন খুইয়ে পারস্যে ছিলেন হুমায়ুন। ১৫৫৫ সালে মোগলদের পক্ষে ফের সিংহাসন অধিকারের জন্যে পর্যাপ্ত শক্তি সংগ্রহের আগে ১৫ বছর আফগানিস্তান ও পারস্যে নির্বাসনে কাটিয়েছেন তিনি। ফেরার সময় পারস্যের খাবারের প্রতি বিপুল দুর্বলতা ও একদল পারসি রাঁধুনি নিয়ে এসেছিলেন। এ রাঁধুনিরা ৫০০ বছর আগে বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফার অধীনে তৈরি একটা বিশেষ খাবার নিয়ে আসে। অষ্টম ও দশম শতকের মাঝামাঝি ক্ষমতার তুঙ্গে থাকার সময় খলিফারা তাঁদের হেঁশেলের পেছনে প্রচুর খরচ করেছেন। খাবারের পেছনে তাঁদের খরচ অতিভোজনের সঙ্গে মিলে গেছে— খলিফা আল-মনসুর (৭৫৪—৭৭৫) অতিভোজের কারণে মারা গিয়েছিলেন বলে কথিত। গোটা মুসলিমবিশ্ব— তুরস্ক, আরব, মিসর— থেকে রাঁধুনিরা বাগদাদে ভিড় জমায় এবং তাদের স্থানীয় খাবারগুলো দরবারি খাবারের তালিকায় যোগ করে। এমনকি ৭১৩ সালে আরবদের অধিকার করা সিন্ধু (বর্তমান পাকিস্তানের দক্ষিণ অংশ) থেকে ভারতীয় বাবুর্চিরাও হাজির হয়েছিল। বিশ্বস্ততা, সততা আর মসলাদার খাবারের জন্য তাদের সুনাম ছিল।
পারসি খাদ্যতালিকার পিস দে রেসিস্ট্যান্স ছিল পিলাও (যা আমাদের কাছে পোলাও নামে পরিচিত এখন)। খলিফার দরবারে যাযাবর রাখালদের ক্যাম্পফায়ারের আগুনে তৈরি পিলাও একটি অনন্য ও রুচিশীল খাবারে পরিণত হয়েছিল। পারস্যে বার্লি এবং গম ছিল প্রধান ফসল, কিন্তু ভারত থেকে আমদানি করা চাল অপেক্ষাকৃত দামি হওয়ায় বিলাসিতা একে মনে করা হতো। সপ্তম শতকে ট্রাভেনিয়ার বলেছেন, পারসিরা বিশেষ করে আগ্রার দক্ষিণ পশ্চিমে ফলা চাল পছন্দ করত। ‘সাধারণ চালের চেয়ে এর দানাগুলো অর্ধেক ছিল আর রান্নার পর তুষারও এর সাদার কাছে ম্লান হয়ে যেত...।’ পারস্যে ভাত খাওয়ার সময় বাড়তি খাবারের বদলে বরং মূল খাবার হিসেবেই তৈরি করা হতো একে।
চালের গুণাগুণ দিয়ে পোলাওয়ের মান যাচাই করত পারসিরা। আঠালো আর দলা না পাকিয়ে পুরোপুরি ফুলে ওঠার কথা ছিল তার। ভালো পোলাও দারুণ সুবাসিতও ছিল, মসলার দারুণ সৌরভ গোটা কামরাকে ভরিয়ে তুলত। পোলাওয়ের নানা রকম ভাষ্য বের করেছিল তাদের বাবুর্চিরা: ফ্রুট পোলাও, বিশেষ উপলক্ষে মোরগ পোলাও; পেঁয়াজ আর রসুন বা বাদাম বা কিসমিস মেশানোয় কোনো কোনোটা ভিন্ন রকম হতো; অন্যগুলো রঙের কারণেও আলাদা হতো। রান্নার সময় ঝকঝকে সাদা হওয়ার ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে পারসিরা দীর্ঘসময় ধরে চালকে লোনা পানিতে ভিজিয়ে রাখত বলে তা কয়লার মতো কালো থেকে শুরু করে হলদে রঙের সাধারণ চালের সঙ্গে ভীষণ পার্থক্য জোগাত। জন ফ্রায়ার নামে সপ্তদশ শতকের ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির এক সার্জন যেমন বলেছেন, ‘যাতে আপনি বুঝতে পারেন যে বাবুর্চিরা বুদ্ধিমান।’ পারস্য থেকে পোলাও সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তুরস্কে একে বলা হয় পিলাভ। স্পেনে সামুদ্রিক খাবার যোগ হয়ে আর জাফরানের ওপর জোর দিয়ে এটা পরিণত হয়েছে পিলায়। ইতালিতে মাখন একে পরিণত করেছে রিসোতোয়। পারসি ও মধ্য এশীয় সংস্কৃতি যেখানে হিন্দুস্তানি সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে গেছে, সেই ভারতে পরবর্তী মোগল সম্রাটের হেঁশেলে এর আরেক দফা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাওয়া বাকি ছিল।
তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরই (১৫৫৫—১৬০৫) প্রথমবারের মতো ভারতে স্বস্তি বোধ করেছিলেন। দাদা বাবুরের বিপরীতে ভারতীয়দের আচরণ ও রীতিনীতি প্রীতিকর আবিষ্কার করেন তিনি। মধ্য এশিয়ার হূত স্বদেশভূমির জন্য আকুল না হয়ে বরং হিন্দুস্তানে মোগল শাসন সংহত করার দিকেই নজর দিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে ভারতীয় প্রজাদের ওপর স্রেফ মুসলিম শাসন চাপিয়ে দেয়ার বদলে তাদের সমন্বিত করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছেন। বাবুর ও হুমায়ুনের আমলের মতো সরকারে মধ্য এশীয় ও পারসিদের প্রাধান্য থাকলেও আকবর ভারতীয় মন্ত্রীদেরও নিয়েছিলেন। মধ্য এশীয় ও পারস্য সংস্কৃতির সঙ্গে হিন্দুস্তানি সংস্কৃতির সংশ্লেষের ভেতর দিয়ে মোগল সংস্কৃতি নির্মাণ নিশ্চিত করতে চেয়েছেন আকবর। রাজকবি ছিলেন ভারতীয় ও রাজস্থানি সংগীতজ্ঞ তানসেন রাতের খাবার শেষে সম্রাটের মনোরঞ্জন করতেন। আকবরের শিল্পকলাগারে পারসি শিল্পী আব্দুস সামাদ ১০০ জন ভারতীয় শিল্পীকে পারসি মিনিয়েচার শিল্পকর্মের তালিম দিয়েছিলেন। এ শিল্পীকে পারস্য থেকে নিয়ে আসেন হুমায়ুন। পারসিদের জ্যামিতিক নকশা উত্তর ভারতীয়দের ঝলমলে সজীব প্যাটার্নের সঙ্গে মিলে মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের এক জাঁকালো মোগল কেতার সূচনা ঘটিয়েছিল।
একই সংশ্লেষ প্রক্রিয়া ঘটেছিল হেঁশেলেও। এখানে সূক্ষ্ম সুবাসিত পারসি পোলাও হিন্দুস্তানের মসলাদার তীব্র সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে মিলে ধ্রুপদী মোগলাই খাবার বিরিয়ানি সৃষ্টি করেছে। মাংসকে দইয়ে ভিজিয়ে নেয়া পারসি খাদ্যবিদ্যার অন্যতম অনন্যকৌশল ছিল। বিরিয়ানির জন্য পেঁয়াজ, রসুন, বাদাম ও বিভিন্ন মসলাপাতি দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে মাংসের ওপর প্রলেপ দেয়ার জন্য পুরু মণ্ড বানানো হয়। মাংস ভিজে গেলে তাকে অল্প ভেজে একটা পাত্রে নেয়া হয়। এর পর পোলাও রান্নার কৌশল অনুসরণ করে আধাসিদ্ধ চাল মাংসের ওপর ঢেলে দেয়া হয়। সুবাস আর রঙের জন্য ঢালা হয় দুধে ভেজানো জাফরান এবং পুরো খাবারটিকে শক্ত করে ঢেকে ঢাকনা ও পাত্রের চারপাশে জ্বলন্ত কয়লা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। ঠিক পোলাওয়ের মতো। ফলে বিরিয়ানি পারসি পোলাওয়ের চেয়ে ঢের বেশি মসলাদার। আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় খাবার এটি।
আবুল ফজল নামে পরিচিত সভাসদের লেখা আইনি আকবরি থেকেই আকবরের হেঁশেলের খোঁজখবর পেয়েছি আমরা। আবুল ফজলই বেশির ভাগ প্রচলিত খাবারের রেসিপি জুগিয়েছেন, যাতে দেখা যায় যে চাল, ডাল, বাটা গম আর চিনির ওপর বেশ নির্ভর করত মোগল বাবুর্চিরা। কৃষির উন্নতির ভেতর দিয়ে এসব প্রধান ফসলের ফলন বাড়ানো হয়েছিল। মোগলদের অধীনে চাষযোগ্য জমিনের পরিমাণ বাড়ানো হয়। জলাধার পরিষ্কার, নতুন খাল খনন করা হয়, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। চিনির উত্পাদন বাড়ে এবং অনেক জায়গায়ই বছরে দুটি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছিল। আইনি আকবরির বিভিন্ন রেসিপিতে মোগল খাবারে মধ্য এশীয় সংস্কৃতির প্রভাব সুস্পষ্ট।
বর্তমানে ভারতবর্ষের রেস্তোরাঁর মেনুতে খুবই পরিচিত দোপেঁয়াজার রেসিপি দিয়েছেন আবুল ফজল। এতে ২২ পাউন্ড মাংসে ৪১ পাউন্ড পেঁয়াজের প্রয়োজন পড়ে। বাংলায় দোপেঁয়াজার মানে ‘দুবার পেঁয়াজ’ এবং এর প্রস্তুতির ওপর দোপেঁয়াজা নির্ভর করে: একটা অংশ পাতলা করে কেটে ভাজা হয়, বাকিটুকু বেটে মণ্ড বানানো হয়। এভাবে খাবারটি বড় বেশি পেঁয়াজের গন্ধঅলা হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি টেক্সচারের মিশেল। আবুল ফজলের রেসিপি বোঝায় যে হিন্দুস্তানি রাঁধুনিরা মোগলাই দোপেঁয়াজায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। রেসিপি অনুযায়ী ৪ আউন্স মরিচ, ৩ আউন্স করে জিরা, ধনে, এলাচ আর লবঙ্গ প্রয়োজন, সেই সঙ্গে বাড়তি ১৮ আউন্স মরিচ ও প্রচুর পরিমাণ লবণ। নতুন ডিশ তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন খাবারের সংশ্লেষের পাশাপাশি মোগলাই খাবার একই খাবারের এসব ঐতিহ্যের বিভিন্ন ডিশের সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্য এশিয়া, পারসিয়া ও হিন্দুস্তানের রন্ধনবিদ্যারও সমন্বয় ঘটিয়েছে।
আকবরের হেঁশেলে বিপুল পরিমাণে চমত্কার সব খাবার রান্না হলেও খুব সামান্যই খেতেন তিনি। তরুণ বয়সের অতিভোজী হিসেবে সম্রাট বিস্ময়কর সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বন্ধু ও বিশ্বস্ত সভাসদ আবুল ফজল আমাদের জানাচ্ছেন যে, দিনে একবার মাত্র খেতেন তিনি এবং পুরোপুরি তৃপ্ত হওয়ার আগেই খাওয়া ছেড়ে উঠে যেতেন। মাংসের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণাও দেখা দিয়েছিল তাঁর ভেতর এবং প্রায় নিরামিষভোজীতে পরিণত হয়েছিলেন। যুদ্ধযাত্রার সময় অন্তরের বিশুদ্ধতার চিহ্ন হিসেবে বাবুর ও হুমায়ুন অনেক সময় মাংস ও মদ ত্যাগ করতেন, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের এ মাত্রা কোনো মুসলিম শাসকের পক্ষে অস্বাভাবিক ছিল। আকবরের বৈরাগ্য ভারতীয় প্রজাদের ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতি শুক্রবার ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করতেন তিনি, যেখানে ধর্মীয় বিষয়আশয় আলোচনার লক্ষ্যে পবিত্র পুরুষদের আহ্বান জানানো হতো। গোড়ার দিকে ইসলামী পণ্ডিতদের ভেতরই তারা সীমিত থাকলেও অচিরেই নিমন্ত্রণের পরিধি বাড়িয়ে ব্রাহ্মণ, জৈন, পারসি এবং এমনকি পর্তুগিজ জেস্যুইটদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। দরবারের মুসলিম পবিত্র পুরুষদের হতাশ করে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ব্রাহ্মণ আর জৈনদের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছেন আকবর। প্রজারা গরুকে পবিত্র জ্ঞান করে, এর স্বীকৃতি দিয়ে আকবর গরুর মাংস ত্যাগ করেছেন এবং গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছেন। এমনকি নির্দিষ্ট ছুটির দিনে সব ধরনের মাংস বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রজাদের পেঁয়াজ ও রসুন খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। প্রকৃতপক্ষেই আকবর কোনো মুসলিম শাসকের চেয়ে বরং হিন্দু সন্ন্যাসীর উপযুক্ত খাবারই বেছে নিয়েছিলেন।
মোগলরা সঙ্গে করে ফলের রসের সাথে মেশানো বরফের কুচির শরবত নিয়ে এসেছিলেন, তবে সেটা খাবারের মাঝখানে পান করা হতো। খাবারের সঙ্গে থাকত কেবল সাদা পানি। গঙ্গার পানিকে ‘অমরত্বের জল’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি এবং নদী যত দূরেই থাকুক না কেন, কেবল এর পানি খাওয়ার ওপরই জোর দিয়েছেন। জাঁ-ব্যাপ্তাইজ ট্রাভেনিয়ার উটের কাফেলা দেখেছেন, যার কাজ ছিল স্রেফ দরবারে সরবরাহ করার জন্য পানি বয়ে আনা। এমনকি আকবর গঙ্গা নদী থেকে ২০০ মাইল দূরে পাঞ্জাবে থাকলেও বিরাট আকারের পাত্রে ভরে বেশ কয়েক দফায় এ পানি দরবারে পাঠানো হতো।
আকবরের উত্তরসূরি জাহাঙ্গীর (১৬০৫-২৭) ও শাহজাহানের (১৬২৭-৫৮) অধীনেই মোগল শক্তি ও সম্পদ তুঙ্গে পৌঁছেছিল। শাহজাহান সবচেয়ে ধনী সম্রাট ছিলেন। শাহজাহানের শাসনামলে সেবাস্তিয়ান মানরিককে বাঙালিদের উত্সবে খাওয়া ‘অনেক বেশি দামি’ খিচুড়ি দেয়া হয়েছিল। ‘আখরোট, কিসমিস, লবঙ্গ, মেস, নাটমেগ, এলাচ, দারচিনি আর মরিচের’ মতো উপাদানে সুবাসিত থাকত সেটা।
ভারতকে নিয়ে বাবুরের মূল হতাশাগুলোর একটা ছিল ভালো ফলের অভাব। জীবনের শেষ দিকে ভারতেই মিষ্টি আঙুর আর তরমুজের ফলন সম্ভব বলে আবিষ্কার করেন তিনি, কিন্তু তরমুজের স্বাদ এত বেশি দেশের কথা মনে করিয়ে দিত যে কেঁদে ফেলতেন। পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে উদ্ভিদবিদদের এনে রাজকীয় ফ্রুটারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আকবর। সমরখন্দ ও কাবুলের আপেলের গুণাগুণ, এক বসায় ঠিক কয়টা চেরি খাওয়া সম্ভব; তাঁর চাচার আখরোট গাছ; আর আহমেদাবাদের শেখদের গুজরাটে জন্মানো তরমুজের চেয়ে পারসি তরমুজের উন্নত স্বাদ দেখে বিস্মিত হওয়া নিয়ে দীর্ঘ রচনা লিখেছেন জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান তাদের সামনেই ফলের ওজন করা দেখতে আনন্দ পেতেন। ব্যাপারটা স্রেফ ভোজনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি কিছু ছিল। এসব ফল মধ্য এশিয়ায় স্বদেশের কথা মনে করিয়ে দিত মোগলদের। তাঁদের কথাবার্তা ছিল স্বদেশের প্রতি দরদের সাংকেতিক প্রকাশ। পারসি তরমুজের দারুণ সুবাস, সমরখন্দের আপেলের মিষ্টতা তাদের জন্মগত সংস্কৃতিকে প্রতীকায়িত করেছে, যেসব তাদের পক্ষে আর ঠিকমতো উপভোগ করা সম্ভব ছিল না। ভারতে এসব ফলের আমদানি বর্বরোচিত ভারতকে দান করা মধ্য এশিয়ার সভ্যতার বিশেষ স্মারক ছিল। গোটা মোগল দরবার ফলের রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত ছিল। ফলের পেছনে মোগল অভিজাত ও প্রশাসকদের খরচ দেখে বিদেশীরা বিস্মিত হয়ে গেছে।
সব মোগল সম্রাটই মধ্য এশীয় ফলফলাদির বেলায় আবেগপ্রবণ ছিলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান ভারতীয় ফলের প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তাতে মনে হয়, স্বদেশভূমি তার রোমান্টিক ভাবমূর্তি না হারালেও তাদের হদয় এখন হিন্দুস্তানে তাদের সাম্রাজ্যেই অবস্থান করছিল। হাজার হোক, তাদের কেউই কখনো মধ্য এশিয়ায় পা রাখেননি। ভারতীয় আম ছিল তাদের প্রিয় ফল। আমকে ভারতের সেরা ফল হিসেবে মেনে নিতে ইচ্ছুক ছিলেন বাবুর, কিন্তু খুব একটা তারিফ দাবি করে বলে মনে করেনি। ৮০ বছর পর জাহাঙ্গীর ‘কাবুলের ফলের স্বাদ সত্ত্বেও আমার রুচি অনুযায়ী সেগুলোর কোনোটারই আমের মতো স্বাদ নেই’ ঘোষণা করেছিলেন। একবার ছেলের ওপর ক্ষিপ্ত অবস্থায় দাক্ষিণাত্যে তাঁর প্রিয় গাছের সেরা আম তাঁকে না পাঠিয়ে নিজে খেয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছিলেন শাহজাহান। আমে স্বাদ বদল ছিল মোগলদের মনে-প্রাণে ভারতীয় হয়ে ওঠার স্পষ্ট আলামত। শাহজাহান উজবেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এরাই বাবুরকে সমরখন্দ থেকে বিতাড়িত করে তাঁকে তাঁর চোখে জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। প্রায় ১০০ বছর পর হিন্দুস্তানে অসুখী বোধ করা বাবুর ও তাঁর লোকজনের বিপরীতে শাহজাহানের সৈনিকরা মধ্য এশিয়ায় পুরোপুরি অস্বস্তি বোধ করেছে। হিন্দুস্তানের ক্ষেত্রে বাবুরের প্রথম প্রতিক্রিয়ার স্মারক ভঙ্গিতে মোগল আমলের এক সমসাময়িক লিপিকার ‘দেশের জন্যে স্বাভাবিক ভালোবাসা, হিন্দুস্তানের রীতিনীতির জন্যে পক্ষপাত আর বালখের লোকজনের হাবভাবের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং পরিবেশের কঠোরতা’ কীভাবে মোগল অভিজাতদের ভেতর ভারতে ফিরে যাওয়ার মরিয়া আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল, তার বর্ণনা দিয়েছেন।
মধ্য এশিয়ায় শাহজাহানের অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষদের দৃষ্টিতে মোগলদের বিলাসিতায় গা ভাসানো এবং তাদের কর্তৃত্ব ও সামরিক শক্তির অবনতি ঘটানো দুর্নীতিপরায়ণ স্বেচ্ছাচারিতাই ছিল এর কারণ। শাহজাহানের নীতিভ্রষ্ট বাবা জাহাঙ্গীরের হাতেই এর শুরু বলে যুক্তি দেখিয়েছেন তারা। টমাস রো ‘মদে মত্ত এমন লোক’ আর কখনো দেখেননি। বিরল ক্ষেত্রে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হলে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জাহাঙ্গীরকে প্রায়ই এত বেশি পান করতে দেখেছেন যে, একপর্যায়ে অসংলগ্ন কথা বলা শুরু করতেন তিনি, আলোচনার মাঝপথেই ঘুমিয়ে পড়তেন। স্মৃতিকথায় জাহাঙ্গীর খোলাখুলি এ ভ্রষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন এবং অ্যালকোহলের প্রতি তাঁর বিশেষ ও বেসামাল আসক্তির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ...কেবল চিকিত্সকের তরফ থেকে কড়া সতর্কবাণী শোনার পরই পানের মাত্রা কমিয়ে আনার মতো ইচ্ছাশক্তি অর্জন করতে পেরেছিলেন তিনি। তাঁর জেডে পাথরের পানপাত্র এখন ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে দেখা যায়।
সভাসদদের নিয়ে প্রায়ই পানের উত্সবে মেতে উঠতেন জাহাঙ্গীর এবং মদপানের এ দোষ পরবর্তী সম্রাট শাহজাহান পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। শাহজাহানের চরিত্র সম্পর্কে সামান্যই জানা আছে। জীবনীকাররা তাঁর সম্পর্কে যা কিছু লিখতেন, খুঁটিয়ে পরখ করতেন তিনি, যাতে উত্তর প্রজন্মের জন্য অল্প কিছু খুঁতই লিখিত হয়েছে। শাহজাহানের সেনাবাহিনীর এক গোলন্দাজ নিকোলো মানুচ্চি মন্তব্য করেছেন যে, মদপান না করলেও ‘সবাইকে যার যার মতো চলতে দিয়ে নিজে নারীদের নিয়ে সময় কাটাতেন তিনি।’ ফরাসি ডাক্তার ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার নর্তকীদের সঙ্গে তাঁর মাখামাখি শোভনীয়তার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন। বিলাসিতার প্রতি শাহজাহানের ভালোবাসা মোগল সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করেছে। সিংহাসনে আরোহণের সময় শুরু করা ময়ূর সিংহাসন নির্মাণের কাজে শিল্পীরা ব্যস্ত ছিল। নির্মাতা ও স্থপতিরা অনন্যসুন্দর শহর শাহজাহানাবাদ (বর্তমানে পুরনো দিল্লি নামে পরিচিত) এবং আগ্রায় তাজমহল নির্মাণ করেছে। তাঁর রাঁধুনিরা স্রেফ সাদা সস দিয়ে তৈরি খাবারের বিভিন্ন ভোজের আয়োজন করত। সেজন্য জিরা ব্যবহার করত তারা, আজকের দিনে দিল্লির বাবুর্চিরা একে শাহী জিরা (রয়াল কামিন) বলে থাকে। দরবারি খাদ্যবিদ্যা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। সব প্রধান নগরে রান্নার দোকান ভর্তি বাজার ছিল। ১৬৪১ সালে লাহোর সফরের সময় পল্লী এলাকায় দরবার বিস্তৃত হয়ে যেতে দেখেন মানরিক: ‘আশপাশের আধা লীগেরও বেশি এলাকা দর্শনীয়, চমত্কারভাবে সাজানো নানা বর্ণের তাঁবু আর প্যাভিলিয়নে বিন্যস্ত চলমান শহরে ঢাকা ছিল।’ এ তাঁবু শহরটি সুস্বাদু আর খিদে জাগানো খাবার জোগানো বাজারে ভরা ছিল... এসব খাবারের ভেতর প্রধান ও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল সুবাসিত মোগল ব্রিঞ্জ (বিরিয়ানি) এবং নানা রঙের পারসি পিলাও...।
আওরঙ্গজেবের একটি আনন্দ খাবার ছিল বলে মনে হয়। রাজকীয় হেঁশেলে দিনে ১ হাজার রুপি খরচ করতেন আর ভালো ভালো বাবুুর্চিদের খুঁজে বের করতেন তিনি। তার ছেলে রাজকীয় হেঁশেলে কাজ করার জন্যে ‘বিরিয়ানি পাকানো বাবুর্চি সুলেইমানকে’ পাঠাতে অস্বীকার করলে হতাশ হয়ে ‘খাওয়ার ইচ্ছা এখনো পুরোপুরি আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়নি’ বলে এ দক্ষ বাবুর্চির কোনো শিষ্যের খোঁজ করতে বলেছিলেন তাকে। আওরঙ্গজেবের অধীনে মোগল সাম্রাজ্য এর সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছিল। কিন্তু ১৭০৭ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর উত্তরসূরিরা প্রাদেশিক গভর্নরদের নতুন নতুন করদরাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা রোধ করতে পারেননি। এসব আঞ্চলিক দরবারেই অষ্টম শতকে মোগলাই খাবারের তথা শাহী বিরিয়ানির বিকাশ অব্যাহত ছিল।
[লিজি কালিংহ্যামের কারি: আ টেল অব কুকস অ্যান্ড কনকোয়েরার্স থেকে]
[সংক্ষেপিত]






