জগৎসংসারে মানুষের জগৎ দুই। এক তার জ্ঞানকাণ্ড। অন্যকাণ্ড মানুষের কর্ম। জ্ঞান আর কর্মের জগতে বিরাজ করে ধর্ম। ধর্ম মানে বিশ্বাস নয়, মানে মানুষ যা ধারণ করে বেঁচে থাকে। আদি জ্ঞানকাণ্ডের প্রশ্ন তুললে বলতে হবে, জগৎসংসার বেঁচে আছে অধরাকে ধরার ভেতর দিয়েই। এককালে এও ভাবা হতো, মানুষের বাঁচা-মরা ভর করে মৃত্যুর পর। অর্থাত্ মানুষের মৃত্যুর পর যার নাম জগৎসংসারে উচ্চারিত হয়, তিনি দীর্ঘায়ু। দীর্ঘ আয়ুর সামনের দুয়ার— একালের জ্ঞান সেকালের দুয়ারেও কড়া নাড়বে। নিছক কড়া নাড়া মানে আলাপের ধ্বনিকেই ধরে নিচ্ছি, যাকে হাল দুনিয়ায় বলা হয় সমালোচনা। কিন্তু সমালোচনাকে কীভাবে আমরা বাগে আনি?
আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাবুদ্ধির দুয়ার খাটো। কেন খাটো? আমাদের সাহিত্য নেই, শিল্প নেই, সংস্কৃতি নেই, ইতিহাস নেই— বিষয়খানা এমন নয়। এত সব থাকার ফলেও ভেদ-অভেদের বিচার খুব বেশি চোখে পড়ে না। ফলে সমালোচনা সাহিত্য বলে বাজারে যা চলে, তাতে বিদ্যাবুদ্ধির গতির নড়চড় নেই। নতুন করে নতুন বিদ্যা জাহির করার সুযোগও কম। আমরা আগে-পিছে তত্ত্বতালাশ করে দেখেছি, বাংলাদেশের বাংলায় চারুবিদ্যার কোনো ইতিহাস নেই। দুই-চারি যা আছে, হাতে তসবি গোনার মতো। ‘কী নিয়া লাগি এই বঙ্গদেশে?’ কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে বিকাশিত হয় তিন পদে। এক সংস্কৃতিশাস্ত্র, দুই অর্থশাস্ত্র, তিন রাজনীতিশাস্ত্র। দেশের আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে হয়তো অনেক শাস্ত্রী আছেন, কিন্তু তাদের বেশির ভাগেরই তুল্যমূল্য কোনো শাস্ত্র বিশেষ নেই। কারণ আমরা অন্য জ্ঞানকে আমলে নিই কম। এ না থাকার বঙ্গ দুনিয়ার আমরা মুখ ফিরাব কোন দিকে? জ্ঞান-গরিমার কেবলা আমাদের দুস্তর অতীত। তাই অন্যের কোশেশ করতে চাই। অন্য কী?
শিল্পী বাহরামের জন্ম ঢাকায়, ১৯৫০ সালে। আদি নাম সৈয়দ কৌমার হোসেন সিরাজি। মাত্র ১১ বছর বয়সে শুরু করেন শিল্পীর কাজ। প্রথম জীবনে ব্যক্তিগত কাঙ্ক্ষায় তিনি পেন্সিল স্কেচ করতেন। কিন্তু শিগগিরই তিনি এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। আর্থিক সঙ্গতির অভাব তাঁকে নানা পেশার করুণ পথে ধাবিত করে। বয়স পনেরোতে রিকশা পেইন্টিংয়ে হাত দেন তিনি। রিকশা শিল্পের শ্রমিকের যে শৃঙ্খলাবদ্ধ শ্রম, যে নির্দিষ্ট ছকের শিল্পের কোশেশ করতে হয়, বাহরাম তাতে তৃপ্ত হতে পারেননি। কারণ বাহরামের অসম্ভব কল্পনাশক্তি শিল্পের নানা পথে চরতে বাধ্য করে। এ শক্তি তাঁকে নতুন দৃষ্টিপাত ও ভঙ্গির দিকে চালিত করেছে।
১৩ বছর বয়সে বাহরাম ট্যাক্সি পেইন্টিং থেকে আঁকিবুকির শিল্পশিক্ষা, যা তাঁকে এ পেশায় পারদর্শী করে তোলে। প্রথম দিকটা বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে, বাণিজ্যিক পন্থার শিল্প কোশেশের কারণে তিনি পেয়েছিলেন সব ধরনের চিন্তা বা কল্পনা অন্বেষণের স্বাধীনতা। তাঁর কাজের পরিধিতে দেখা মিলবে হরেক রকম কাজের। যেমন সাইনবোর্ড, ব্যানার আর সিনেমা স্টুডিওর ব্যাক স্ক্রিনের সিনারি বা শিল্পকর্ম। এসব কর্মতত্পরতা তাঁর দৃশ্যকল্প বা শিল্পচিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করেছে।
বাহরামের শিক্ষা-দীক্ষার হাতেখড়ি পিতার হাতেই, যিনি আদৌ শিল্পী ছিলেন না। তাঁর অন্য ভাই তাঁকে শিল্পকর্মে নিয়ে এসেছেন। তাঁর কাজের জায়গা ছিল পুরান ঢাকার আগামসি লেইন। ওই হিসেবে বলা যায়, শিল্পী আবদুলই তাঁর শিক্ষাগুরু। কাজ করেছিলেন তাঁরই সহযোগী শিল্পী হিসেবে। কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি শিল্পের নানা কৌশল রপ্ত করেন। এ শিশু বয়সে ১৯৬০ সালের দিকে বাহরামের গুরু আঁকতে দেন সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের প্রতিকৃতি। সে সময় তিনি আঁকতেন পাকিস্তানের চিত্রতারকা ওয়াহিদ মুরাদ, জেবা আর ভারতীয় সুপার স্টার দিলীপ কুমার, কিশোর কুমার আর মধুবালার প্রতিকৃতি।
যৌবনে বাহরাম প্রায়ই ঘুরে বেড়াতেন নানা ধরনের আর্ট স্টুডিওতে। সে সময়কার ঢাকার খ্যাতনামা স্টুডিও শিল্পী সৈয়দ ভাই, লাদলা ভাই, পাপ্পু ভাইয়ের সান্নিধ্য লাভ করেন। এসব শিল্পীর সান্নিধ্য লাভের ফলে তিনি চলচ্চিত্রশিল্পীদের প্রতিকৃতি আঁকার কৃেকৗশলে আরো পারদর্শী হয়ে ওঠেন। গোটা ষাটের দশকে তিনি চলচ্চিত্রের ছোটবড় অসংখ্য ব্যানার এঁকেছেন। শেষ নাগাদ জনপ্রিয় এ শিল্পমাধ্যমই জীবনকর্মের আয়-রোজগারের একমাত্র উপায় হিসেবে দাঁড়ায়। প্রথাগত এ শিল্পের পথ কোমল নয়। শিল্পশ্রমের অর্থমূল্য অনর্থের মতো। অর্থের দিকে তাকালে জীবন যেনবা পরশ পাথর। তবে এ কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসরে তিনি রিকশা, ব্যানার আর ট্যাক্সি পেইন্টিংয়ের কাজও করতেন।
জাতিগতভাবে বাহরাম বাঙালি শিয়া মুসলমান। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিয়ে করেছেন ১৯৭৪ সালে। সে একটা সময় কেটেছে তাঁর, জনপ্রিয় প্রথাবদ্ধ সেই শিল্পকর্মের জোগান দিতে দিতে। দিনাতিপাত চলছিল চলতিভাবেই। নব্বইয়ের দশকে এসে এ শিল্পের জায়গা দখল করে নেয় ডিজিটাল শিল্পমাধ্যম। শিল্পজীবনে চরম সংকট দেখা দেয় তাঁর। বাহরাম তাতেও পেশার বদল ঘটাননি। তিনি নেন শাড়ির কাজ। কাজটা নকশা তৈরির। কাজটা করতে এসে তাঁর নৈপুণ্যের কারণে একবিংশ শতকের শুরুর দিকে শিল্পানুষ্ঠান বৃত্তের এক কর্মশালায় অংশ নেন। পরে আস্তে আস্তে সান্নিধ্য পান প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের। অংশও নেন দু-একটি যৌথ প্রদর্শনীতে। ফলে তিনি সুযোগ পান মূলধারার শিল্পের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপনে। এ সম্বন্ধ স্থাপনে বাহরামের শিল্পব্যক্তিত্ব অনন্য। কেন অনন্য? তিনি শিল্পকর্মে দুই ধারার শিল্পের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। মিশ্রণের ঘটনাটি নতুনত্বের সাক্ষ্য বহন করে। কারণ তিনি না প্রথাগত, না প্রাতিষ্ঠানিক।
কাজের প্রতি নিষ্ঠা আর অনুবর্তিতায় তিনি এক জাত শিল্পী বনে ওঠেন। জাত শিল্পী বলার পেছনে কারণ তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। মানে শিল্প জিনিসটা তাঁর মজ্জাগত বা প্রকৃতিগত। তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এটাকে সহজ বলা হয়। তাত্ত্বিক দিকটা কী? কেননা তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই একজন শিল্পী মানুষে পরিণত হয়েছেন। শিল্পের ভাষা রপ্ত করেছেন। সাধারণত আমরা যাকে বলি সহজ শিল্প। শুধুই কাজের অভিজ্ঞতা একে সহজ মজ্জাগত রূপে সৃষ্টি করেছে। ঠিক তার বিপরীতে আছে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প। এ শিল্প রপ্ত করতে প্রয়োজন শিক্ষা পুঁজি। বাহরামের তা ছিল না আদৌ। সমাজের চলতি কাঠামোর ভেতর যে জ্ঞান, তা তাঁকে শিল্পী করে তুলেছিল। প্রথাগত ইমেজকে ভেঙে তিনি শিল্পে যোগ করেন নতুন ভাষার। সমাজের অন্তর্দশা হয়তো বাহরামের ছবিতে নেই। আছে প্রকৃতির অন্তর্দশা। তাঁর উত্তরণ সরল নয়, সহজ; যা প্রকৃতির স্বভাব সহজ জাত। ভেদ-বুদ্ধির অভিজ্ঞতায় তিনি এমনই শিক্ষা রপ্ত করেছেন। তাই তাঁকে আমরা বলছি সহজাত শিল্পী।
ক্যানভাসের ফিগার বা অবয়ব দেখলে কখনো কখনো মনে হবে, বাহরামের শিল্পে মিথ বিরাজিত। অনেক ফিগার বা অবয়ব এক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ‘পাখির সাথে বাঘ’, ‘হাতির সাথে মানুষ’, ‘ঘোড়ার সাথে হাত’, ‘প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভেতর মানুষ-পাখি’ আর নিত্যকার পদ আর পদার্থে ভরা তাঁর শিল্প। শিল্পে প্রকৃতির সরলতাকে সহজভাবে তুলে আনা কম কথা নয়। সহজ ভাব তাই জীবের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক নির্ণয়। আর জীবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্বন্ধ নির্ণয়। এ সম্পর্ক চেনা জগেক অচেনা করে দেয়। স্বভাবত বস্তুর আকার সরল। এক আকারের সঙ্গে অন্য আকারের সম্পর্ক সৃষ্টিকে বলছি সহজাত শিল্প। মানে এক অদ্ভুত জৈবিক তত্ত্বে একে অন্যের ভেতর রূপ ধরে আছে। মানুষ, বাঘ, হরিণ, বক, পাখি, গাছগাছালি একই ক্যানভাসের ভেতর বাস করছে। এ বাস শুধু উপযোগের নিবাস নয়। প্রাণের সঙ্গে প্রাণের সজীব মিলন। সহজ রেখায় অতি বা মহাজাগতিক এক সম্পর্কের সূত্র আবিষ্কার করছেন তিনি। ফলে বাহরামের শিল্পে দৃষ্টির আরাম কম। দৃষ্টির আরাম কম কেন? অসম্ভব এক কল্পনাশক্তির সম্মিলনে তাঁর ক্যানভাসের অবয়বগুলো এক অভিনব জগৎ সৃষ্টি করে। নিছক গল্প নয়, যেন কাহিনীর বিস্তার ঘটে। খোদ দর্শককে কল্পনাপ্রবণ হতে বাধ্য করে। মানে দর্শক তাঁর ছবির ভেতর দিয়ে কল্পনার অন্যলোকে পৌঁছতে পারে।
সরল চোখে দেখলে বাহরামের শিল্পকর্ম মনে হতে পারে কিম্ভূতকিমাকার বা অ্যাবসার্ড। একটি অবয়বের ভেতর আরেকটি অবয়ব, একটি প্রাণীর ভেতর আরেকটি প্রাণী, একটি চিত্রকল্পের ভেতর আরেকটি চিত্রকল্প, একটা বাস্তবের ভেতর আরেকটা বাস্তব। এমন নয় যে, তার শিল্পকর্মে বাস্তব শুধু বাস্তব আকারে হাজির। এ বাস্তব অন্য বাস্তবকে খর্ব করে। খর্ব মানে পরিণতি নয়, পরিণত কাহিনীর বাস্তবের জন্ম দেয়। তাঁর শিল্পকর্ম অনেকটা সার্কাস্টিক রিয়েলিটি বা উদ্ভট বাস্তবতার সম্মিলন। এ চিত্রকল্পের বড় গুণ উদ্ভট রস সৃষ্টি করা। আপাত মনে হতে পারে, উদ্ভট রসে কোনো রাজনৈতিক কাঙ্ক্ষা নেই! শুধুই নান্দনিকতার অদ্ভুদত্ত্ব! কিন্তু শুদ্ধ নন্দনতাত্ত্বিক বাস্তবকে বাহরামের শিল্পকর্ম নাকচ করে। শিল্পের প্রাথমিক নন্দনতাত্ত্বিক ভিত চিত্রকল্পের বাস্তব উপস্থাপনের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাহরাম সেই ভিত বদলে দেন। এটা আদতে সমাজ বাস্তবতার বিরুদ্ধে এক অভিনব রাজনৈতিক কাঙ্ক্ষা। কেননা বাহরামের শিল্পকর্ম রাজনৈতিক নন্দনতত্ত্বের অন্য দুয়ার খুলে দেয়। এমন রাজনৈতিক কাঙ্ক্ষাকে বলা চলে চলতি সমাজের অন্তর্নিহিত শক্তি। মানে ভেতরগত রূপকে শিল্পে রূপান্তর করা। যদি বলি বাহরাম কী? এক বাক্যে বাহরাম বাংলা চারুশিল্পে একক আর অনন্য।
বড় অসময়ে চলে গেলেন শিল্পী বাহরাম। মানব প্রকৃতিতে ৬৬ তেমন কোনো বয়স নয়। বেশকিছু যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তবে একক প্রদর্শনী করেছেন একটি মাত্র। ঢাকা আর্ট সেন্টারের তাঁর সেই প্রদর্শনী বেশ সাড়া জাগিয়েছিল শিল্পসমাজে। তার কারণও ছিল। কেননা বাহরাম লোকজ শিল্পের সঙ্গে আধুনিক শিল্পের এক জৈব রসায়ন সৃষ্টি করেছিলেন। ইমেজ বা আকারে একক কোনো প্রাণ বা বস্তুর রেখা আঁকেননি। একই রেখায় উন্মীলিত একাধিক প্রাণ বা বস্তুর আকার তাঁর ক্যানভাসকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি অবচয়ী। এ অবচয় ফিগার বা অবয়বকে নস্যাত্ করে না, বরং নতুন রূপে শিল্পে আবির্ভূত হয়। অন্তত বাংলাদেশের শিল্পালয়ে বাহরাম স্বশিক্ষিত এক শিল্পচিহ্নের নাম। অনাগত ভবিষ্যতে শিল্পে তিনি চিহ্ন আকারে থাকবেন। চিহ্ন নিছক ছকে বাঁধা নয়, ছকহীনতার অপূর্ব দুয়ারে। নতুন ভাষায়, নতুন শিল্পের রূপকথায়। বাহরামের রূপকথা ভুলি কী করে!
Every expression of human mental life can be understood as a kind of language, and this understanding, in the manner of a true method, everywhere raises new questions.
&dquote;On Language as Such and on the Language of Man&dquote; (1916), translated by E. Jephcott, in Walter Benjamin: Selected Writings, Vol. 1 (1996), p. 62






