ঢাকার বিশিষ্ট খাবার শিরোনামের রচনাটি হাকিম হাবিবুর রহমান রচিত ঢাকা : পঞ্চাশ বছর আগে (ঢাকা পাচাস্ বারস্ পহেলে) গ্রন্থ থেকে সংকলিত। গ্রন্থটিতে ১৮৯৫ সালের ঢাকার ইতিহাস, সমাজ-সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে হাকিম হাবিবুর রহমানের নিজের প্রত্যক্ষ করা ঘটনার ধারাভাষ্য স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে। এখানে শুধু ঢাকার অধিবাসীদের খাবার ও খাদ্যাভ্যাসের অংশটুকু মুদ্রিত হলো।]
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিমান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার ওপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারি কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার-দাবারে আর্মেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাত্ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আর্মেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটারের ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দুভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে, ‘পাশানো’, প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়, যখন সামান্য সিদ্ধ বাকি থাকে, তখন দরকারি মসলা-পাতি দিযে দমে বসানো হয়। এ নিয়ম সমস্ত ভূভারতে কম-বেশি প্রচলিত আছে। অন্য পদ্ধতি যেখানে বিদ্যা এবং কৌশলের প্রয়োজন পড়ে, যাকে এখানে ‘লেপিটা’ বলে অর্থাত্ পোলাও তার প্রকৃতরূপেই পোলাও হয়ে থাকে। ঢাকাবাসী চাল সিদ্ধ করে নিয়ে পোলাও তৈরি পদ্ধতি পছন্দ করে না। আগে এটি খুবই ত্রুটিপূর্ণ মনে করা হতো কিন্তু কিন্তু আজও ঢাকার বিশিষ্ট পোলাও চাল সিদ্ধ করা পদ্ধতির নয়, আর যে বাবুর্চি এটা করতে চায় তাকে বাবুর্চি হিসেবেই গণ্য করা হয় না। যাহোক, ঢাকার বিশিষ্ট পোলাও হচ্ছে ‘খাচ্ছা’ পোলাও, যাতে মুরগির গোশত দেয়া হয় এবং মুরগির গোশতের টুকরা আস্ত রাখা হয় না। এর পরিচয় এই যে, গোশত মিশ্রিত থাকা সত্ত্বেও পৃথক দেখা যাবে। ঘি এত হবে না যে, চাল ঘি শুষে নিয়ে আবার বের করে দেয় এবং প্রত্যেক চালের পেট ঘিতে পূর্ণ থাকবে। এরূপ মোরগ পোলাও ঢাকা ছাড়া কোথাও রান্না হয় না এবং ঢাকাবাসী ছাড়া এটা কেউ রান্নাও করে না। অন্যান্য শহরে যাকে মোরগ পোলাও বলে, তার সঙ্গে এর কোনো তুলনাই চলে না। অন্যান্য শহরে যেসব পোলাও রান্না হয়, সেসবই এখানে তৈরি হয়, কিন্তু ‘খাচ্ছা’ যাকে এখন মোরগ পোলাও বলে, এখানকার বিশিষ্ট জিনিস। কিন্তু এটা ছাড়া ঢাকাবাসীরা নিজেদের বাড়িতে এবং ছোট এবং মাঝারি দাওয়াতে সাধারণত বুন্দিয়া পোলাও, মাছ পোলাও, ডিম পোলাও অবশ্যই রান্না করে থাকেন। কেননা সেগুলিও ঢাকাবাসীর আন্তরিক পছন্দের পোলাও। বুন্দিয়া পোলাওয়ে এই আধিক্য হতো যে, গোশতের মটরদানা পরিমাণের কোফতা কিছু নোনতা এবং কিছু টক-মিষ্টিযুক্ত দমে দেয়ার সময় এমন পরিমাণে প্রয়োগ করা হতো, যেন প্রত্যেক গ্রাসে কয়েকটি কোফতা এসে যায়। কিন্তু অধিকাংশ নোনতা হতো। বর্তমানে এতে এ বৃদ্ধি ঘটেছে যে, কাঁচা সবুজ মটরদানা দেয়া হয়। এটি দেখতেও খুব সুন্দর লাগে। এ পোলাওয়ের পরিচয় এই যে, কোফতা শক্ত হবে না এবং ভঙ্গুর ও মোলায়েম হবে। মাছ পোলাওয়ের মধ্যে রুই এবং ইলিশ মাছের পোলাও রান্না হতো। রুই মাছের পোলাও খুবই সুস্বাদু হয় এবং রান্না করার জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। কিন্তু ইলিশ পোলাও যেভাবে রান্না হয়, তাতে কোনো অভিজ্ঞতা বা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। একজন রুচিশীল ব্যক্তি ইলিশ পোলাও বুন্দিয়া পোলাওয়ের পদ্ধতিতে তৈরি করেছিলেন, এতে করে প্রকৃতই শুধু নতুনত্ব এবং অসাধারণই হয়নি, বরং মাছ পোলাওয়ের একটি উত্তম ধরনও উদ্ভাবন হয়ে গেছে এবং স্বাদও দ্বিগুণ হয়ে গেছে; কিন্তু খরচ এবং কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে।
তেহারি প্রাচীন পোলাও, মসলাদার গোশত এবং চাল একই সঙ্গে দমে দেয়া হয়। লোকেরা এটিকে একেবারে ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু এখন পুনরায় এটি নবজীবন লাভ করেছে এবং খুব ব্যাপকভাবে চলছে এবং এখন সকাল সকাল প্রত্যেক গলিতে ফেরিওয়ালা গরম গরম তেহারি বিক্রি করে ঢাকাবাসীর পোলাও খাবার স্বাদ আস্বাদনের সান্ত্বনা জোগাচ্ছে। তেহারি দাওয়াতে দেখা যায় না। ঘরোয়া খাবারে এটিকে গণ্য করা হয়। অনুরূপভাবে ডিম পোলাও যাকে পূর্বে খাসি পোলাও বলা হতো, ঘরোয়া জিনিস কিন্তু প্রচুর রান্না করা হয়। এখানে সেই পোলাও যাকে ‘হোগলা পোলাও’ বা সাদা পোলাও বলে এবং যা বর্তমানে প্রত্যেক ছোট বড় দাওয়াতের অপরিহার্য উপাদান, এটি শুধু আস্ত মসলার সাদা আখনী থেকে রান্না করা হয় এবং কোথাও কোথাও কিছু গোশতও আখনীতে ফেলে দেয়া হয়।
‘কাবুলি’ প্রকৃতপক্ষেই খিচুড়ি গোত্রের এবং এটা প্রথমত গোশত ছাড়াই রান্না হতো অথবা গোশতের আখনী প্রয়োগে রান্না হতো। অতঃপর খাসির গোশত দেয়া শুরু হয়। ঢাকায় সুবাজ মটরদানা অথবা বুটের কাবুলি রান্না হয় এবং এখানকার অধিবাসীর এটি খুবই প্রিয় জিনিস। সবুজ বুট অথবা সবুজ মটরশুটি এক এক দানা বেছে বেছে খোসা ছাড়িয়ে প্রয়োগ করা হয় এবং মোরগ পোলাওয়ের মতো সেরপ্রতি তিনটি মোরগও দেয়া হয়। মোরগের সমবয়স্ক এবং একরূপ হওয়ার ব্যাপারটি লক্ষ রাখা হয়, কিন্তু স্বাদ আস্বাদনকারীরা সবুজ বুটের কাবুলিতে মোরগের পরিবর্তে মটরদানা পরিমাণের নোনতা কোফতা প্রয়োগ করাটা পছন্দ করেন। এখানে কাবুলির এমন সংস্কার হয়েছে যে, বর্তমানে এই কাবুলি প্রত্যেক জায়গায় সমাদৃত। বর্তমানে কাবুলি যে রঙরূপ সৃষ্টি করে ফেলেছে, তার সময় পঞ্চাশ-ষাট বছরের বেশি নয়।
শিমের বিচির কাবুলিও রান্না হয়। কিন্তু এটি সাধারণ নয় এবং সবার পছন্দনীয়ও নয় এবং না অনুরূপ স্বাদ এবং সৌন্দর্য হয়, যা সবুজ বুট বা মটরদানায় হয়। খিচুড়ির কথা যখন এসেই পড়েছে, তখন এটা বলা দরকার যে, ঢাকাবাসী বর্ষাকালে খিচুড়ি খেতে খুবই আগ্রহী। ভাজা মুগের খিচুড়ি যেমন সব জায়গায় রান্না হয়ে থাকে, এখানেও অনুরূপ রান্না হয়, কিন্তু এখানে সিদ্ধ ডিম ঘিতে ভেজে অপরিহার্যভাবে খিচুড়িতে প্রয়োগ করা হয় এবং সাধারণভাবে খিচুড়ির সঙ্গে মোরগ বা খাসির গোশতের দো-পিঁয়াজাও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু কিছু কিছু পরিবারে ভাজা মুগের ডালের খিচুড়িতে কিমাও দেয়া হয়। এটি কোনো নতুনত্ব নয়। কেননা এটি শোলাহ্-এর প্রাচীন পদ্ধতি। কিন্তু এর প্রচলন খুবই কম। খিচুড়িতে পনির প্রয়োগ করা ঢাকাবাসীর নিজস্ব উদ্ভাবন। এতে যথেষ্ট নিপুণতার প্রয়োজন পড়ে। এছাড়াও ছোলা, মসুর অথবা মাষকলাইয়ের খিচুড়িরও প্রচলন রয়েছে, কিন্তু ছোলা ও মসুরের খিচুড়ি, পোলাও রান্নার প্রক্রিয়াগত দমের ওপর রান্না করা হয় এবং কাঁচা ঘি ও রসুন(?) (পেঁয়াজ) মরিচের চাটনিসহযোগে শীতের সময় খাওয়া হয়ে থাকে। খোসাসহ মাষকলাইয়ের খিচুড়ি বিশেষ বিশেষ পরিবারে রান্না হয় এবং বিশিষ্ট লোকেরাই পছন্দ করেন। ‘শেবেত’ পোলাও (শাক পোলাও) যাকে বর্তমানে ‘সোইয়া’ পোলাও বলে। এটি শুধু বছরে এক দুবার রান্না হয়। এদিকে আকাশের রঙ বদলায় এবং আশ্বিন মাসে সোইয়া শাক (শুয়ো শাক) নতুন নতুন বাজারে আসে, আর সোইয়া পোলাও দস্তরখানে হাজির হয়ে যায়। এ যেন শীতের আগমণের বিজ্ঞপ্তি। মিশ্রিত (মজমুয়া) পোলাওয়ের প্রচলন এখন কম হয়ে গেছে, কেননা এটা প্রস্তুত করা অনেক বাবুর্চিরই সাধ্যের বাইরে। এই পোলাওয়ের পরিচয় এই ছিল যে, একই ডেগ থেকে তিন/চার স্বাদের রঙ-বেরঙের পোলাও বের করা হতো। এটি ছিল এক ধরনের শিল্পকলা। কিন্তু ‘মাগলুবা’ পোলাও, যার প্রচলন এখন খুবই কমে গেছে, মোগল এবং আর্মেনীয় পরিবারের বিশিষ্ট জিনিস ছিল। এতে মোরগের পরিবর্তে খাসির চর্বিহীন গোশত, সমওজনের অর্থাত্ যতটা চাল তত পরিমাণ গোশত দেয়া হতো এবং কপি, গাজর, শালগম, বিট, টমেটো ভেজে দমের সঙ্গে দেয়া হতো। এটি ইরানি-পছন্দ খাবার এবং ঢাকায় মোগল এবং আর্মেনীয় পরিবারে উত্তম রান্না হতো। যদিও টমেটো পরবর্তী সংযোজন, কিন্তু খুবই ভালো সংযোজন। মাগলুবা পোলাওয়ের মধ্যে যদি পালংশাক বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেয়া হতো, তাহলে ডিম সিদ্ধ করে এবং ঘিতে ভেজে লাল করে মাঝ থেকে কেটে ডিশে পোলাও বের করার সময় অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এটি এখন নার্গিসী পোলাও নামে পরিচিত। যখন দস্তরখানে পরিবেশিত হয়, তখন দস্তরখান পুষ্পোদ্যানে পরিণত হয়ে যায়। ঢাকায় সেই বিরিয়ানি তো রান্না হয়, যাকে ‘দোগোশা’ এবং কোরমা পোলাও বলে। কিন্তু কলকাতায় যে বিরিয়ানি রান্না হয়, যাতে আলু প্রয়োগ করা হয়, তার সঙ্গে ঢাকাবাসী পরিচিত নন এবং এখানকার লোকদের তুলনামূলকভাবে এটি বেশি পছন্দনীয়ও নয়। তাদের ছাড়া যারা কলকাতায় বেশি থাকেন এবং তারাই শুধু কলকাতার এ বিশেষ বিরিয়ানি পছন্দ করেন। অবশ্য কিছু কিছু ঘরে যীর বিরিয়ানি তৈরি হয়। এটিই বিরিয়ানির কঠিনতম, কিন্তু শ্রেষ্ঠতম ধরন। বর্তমানে সবুজ মটরদানা পোলাওয়ের মধ্যে কোথাও কোথাও দেয়া শুরু হয়েছে। এটি একটি নতুনত্ব এবং এর নিজস্ব কোনো সৌন্দর্য নেই। তবে বুন্দিয়া পোলাওয়ের ক্ষেত্রে খারাপ লাগে না। কোথাও কোথাও পোলাওয়ের মধ্যে শিকারলব্ধ পাখি দিয়ে রান্না করা হয়, বিশেষত বক (বগীদি), কিন্তু এটা বাড়াবাড়ি। প্রাচীন খাবারে এটি অন্তর্ভুক্ত নয়। মুতান্জান বর্তমানে খুবই দেখা যায়। বড় দাওয়াতে তো একবারেই দেখা যায় না, কিন্তু বাড়িতেও খুব কম দেখা যায়। আমার তো বিশ্বাস যে, কিছু দিন পর লোকরা এর স্বাদের সঙ্গেও অপরিচিত হয়ে যাবে এবং শুধু নামটিই রয়ে যাবে।
অনুবাদ: ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম
লেখক মরহুম হাকিম হাবিবুর রহমান প্রসঙ্গে অনুবাদক
হাকিম হাবিবুর রহমান ঢাকার খোশবাস মুসলমানদের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্নমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিব্বী চিকিত্সা, উর্দু সাহিত্য ও প্রাক-পাকিস্তানি যুগের রাজনীতির ক্ষেত্রে বাংলার এক অতি পরিচিত নাম হাকিম হাবিবুর রহমান আখুনজাদা। তিনি ১৮৮১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার ছোট কাটরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন।
বঙ্গভঙ্গের ফলে উদ্ভূত এবং এর বিরুদ্ধে সৃষ্ট শক্তিশালী রাজনৈতিক বিক্ষোভের সময় তিনি নবাব সলিমুল্লাহর সক্রিয় সহযোগী ছিলেন। ১৯২১ সালে হাকিম সাহেবের প্রচেষ্টায় ইউনানী তিব্ব-এর পর্যালোচনার জন্য তদনীন্তন সরকার একটি কমিটি গঠন করে, যার সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি। এ কমিটি ঢাকা ও কলকাতায় তিব্বীয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে। দুঃখের বিষয়, পেশকৃত স্কিমটি কার্যকর হয়নি। এতে হাকিম সাহেবের উদ্যমে এতটুকু ভাটা পড়েনি। তিনি ঢাকায় তিব্বীয়া কলেজ প্রতিষ্ঠায় সফল হন। জনসাধারণের মাঝে হাকীমি দাওয়া জনপ্রিয় করে তোলার জন্য অক্লান্ত সাধনা ও প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকেন এবং তার সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও কলেজটি যথেষ্ট ভালোভাবে চলতে থাকে। এ কলেজের সঙ্গে একটি দাওয়াখানা ছিল, সেখান থেকে গরিব রোগীদের বিনা পয়সায় ওষুধ ও চিকিত্সা সেবা প্রদান করা হতো। আর এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাকে ‘শেফাউল মূলক’ (দেশের রোগমুক্তি) উপাধি প্রদান করে সম্মানিত করে। কিন্তু মুসলিম লীগের সিদ্ধান্ত অনুসারে তিনি এ উপাধি পরিত্যাগ করেন।
হাকিম সাহেব পণ্ডিত হিসেবেও প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি ছিলেন কবি ও লেখক। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি নবাব খাজা আহসানউল্লাহর মৃত্যু উপলক্ষে একটি কবিতা রচনা করেন। সমকালীন অন্যান্য প্রতিভাবান ব্যক্তির ন্যায় তিনি উর্দু সাহিত্য ও কাব্যচর্চা করতেন। তিনি আগ্রার গুলাবখানার মুশায়রায় (কাব্য পাঠের আসর) যোগদান করতেন এবং তার কবি নাম বা তাখাল্লুস ছিল ‘আহসান’। ২০ বছর বয়সেই তার উর্দু গজল খুবই জনপ্রিয় হয়।
বিশ শতকের প্রারম্ভে ঢাকায় উর্দু ভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে হাকিম সাহেবের অবদান ছিল অতুলনীয়। ১৯০৬ সালে তার সম্পাদনায় ঢাকায় সর্বপ্রথম উর্দু মাসিক পত্রিকা ‘আল মাশরিক’ প্রকাশ হয়; যা পরবর্তীতে সাপ্তাহিকী আকারে কিছুদিন চালু ছিল। ১৯২৪ সালে খাজা আদীলের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ‘যাদু’ নামে অন্য একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকা প্রায় আড়াই বছর টিকে ছিল। চল্লিশের দশকে তারই পরিচালনায় তিব্বীয় হাবিবিয়া কলেজের পক্ষ থেকে ‘শেফা’ নামে চিকিত্সা-বিষয়ক একটি বাংলা মাসিকও প্রকাশিত হয়। ছাত্রাবস্থায় তিনি যেসব পুস্তক রচনা করেন, তার মধ্যে শুধু আল-ফারিক ও হায়াত-ই-সুকরাত প্রকাশ হয়। উর্দু ভাষায় লেখা তার বইয়ের মধ্যে আসুদেগান-ই-ঢাকা, যেখানে ঢাকার বিভিন্ন মাজার ও দরগা সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে, শু’য়ারা-ই-ঢাকা, মাসাজিদ-ই-ঢাকা, ঢাকা কি তারীখি ইমারত প্রভৃতি। ঢাকা পাচাস বারস পহেলে তার বেতার কথিকার ওপর প্রকাশিত ছাপা পুস্তক। তার সব রচনা, বেতার কথিকা ও গবেষণা কাজের মধ্যে ঢাকা সম্পর্কে বহু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। পণ্ডিত হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। প্রকাশিত ‘যাদু’ পত্রিকা জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার বিভিন্নমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। ইতিহাস ও টপোগ্রাফির ওপর তার জ্ঞান ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন ভাইস চ্যান্সেলর (স্যার) এএফ রহমানের সভাপতিত্বে ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গল পাবলিকেশন কমিটি’ গঠিত হয়। নয় সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটির একজন সদস্য ছিলেন হাকিম হাবিবুর রহমান।
তিনি ভোজনরসিকও ছিলেন এবং প্রতিটি বিষয়েই অনুপুঙ্খভাবে অবলোকনের দৃষ্টি ও অনুসন্ধিত্সা তার ছিল। ঢাকা পাচাস্ বারস্ পহেলে পুস্তিকাটিই এর সত্যতা নিরূপণের জন্য যথেষ্ট। তিনি শুধু ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের বিষয়ে রচনা ও সাহিত্য এবং তিব্ব নিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না। প্রাচীন নিদর্শনাদির প্রতি তার অনুরাগ এবং উত্তরসূরিদের জন্য তার সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও ছিলেন সজাগ এবং সক্রিয়। অধিকন্তু তিনি প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ করে শুধু যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখে উত্তরাধিকারীদের নির্লিপ্ত উদাসীনতা ও কীটপতঙ্গের ভোজনোত্সবের জন্য ছেড়ে যাননি বরং প্রতিটি জিনিসের যথাযথ ব্যবহার সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা সম্পন্ন করে গেছেন নিজের জীবদ্দশায়। ফার্সি, আরবি ও উর্দু ভাষার প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও পুস্তকের একটি মূল্যবান সংগ্রহ এবং একটি মুদ্রা সংগ্রহ ও কিছু প্রত্নবস্তুর সংগ্রহ তার ছিল। পাণ্ডুলিপি সংগ্রহটি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন এবং মুদ্রা সংগ্রহটি ঢাকা জাদুঘরকে ক্যাটালগ প্রকাশের শর্তে উপহার দেন। মুদ্রা-সম্পর্কিত তার পাণ্ডিত্যের বিষয়ে ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিটি আশা করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। হাকিম হাবিবুর রহমানের মুদ্রা সংগ্রহ-সম্পর্কিত ক্যাটালগের ভূমিকায় ড. ভট্টশালী অকপটে স্বীকার করেছেন যে, “... Twelve years ago when I was engaged in writing my book coins and chronology of the early independent sultans of bangle the hakim rendered me ungrudging help of which I was then very much in need.... I have thus had ample opportunity for knowing that no one is better fitted to compile this catalogue than the donor himself. But as his profession is ‘herbs’ and mine ‘Coins’ he has wisely and compassionately left the work to be done by the professional, though, I am sure, the man of Herbs knows more about old conins than the man of ‘Coins’ himself.”
পরিশেষে বলতে হয় হাকিম সাহেবের তুলনা তিনি নিজেই। তার মতো বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব সচরাচর সব যুগে বা সমাজে পাওয়া যায় না। ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ ৫০ বছর অতিবাহিত হতে চলল, আমরা এখনো একজন হাকিম হাবিবুর রহমানের প্রতীক্ষায় রয়েছি। আমাদের প্রতীক্ষার শুভ সমাপ্তি আসবে কি?






