এমন এক সময়— পত্রিকা, টেলিভিশন কিংবা ফেসবুকের হোমপেজে গেলেই নির্যাতিত, রক্তাক্ত, নিহত ও দেশান্তরী রোহিঙ্গাদের ছবি। আরাকান জ্বলছে আগুনে, আর লাখ লাখ রোহিঙ্গা পাড়ি দিচ্ছে সীমান্ত— হেঁটে, নৌকায়, কাঁধে চড়ে; নারী-শিশু-বৃদ্ধ। এক জাত্যভিমানী রাষ্ট্রের নিপীড়নে পৃথিবীর সবচেয়ে অভাগা রাষ্ট্রহারা গরিব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।
একই সময়ে ঢাকায় এল রিজওয়ান। না বললেও বোঝা যায়, সে এসেছে কাশ্মীর থেকে। সেই কাশ্মীর, যেখানে শুধু ১৯৪৭ সালেই আড়াই লাখের বেশি মানুষ খুন হয়েছিল। ভিটাছাড়া হয়েছিল পাঁচ লাখের মতো। সেটা কেবল শুরু। সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার রিজওয়ানকে হতে হয়নি। সে মরেছে আরো পরে। আগা শাহীদের কবিতাকে প্রামাণ্য করলে ১৯৯০ সালের দিকে। ’৪৭ থেকে ’৯০, ’৯০ থেকে আজতক কাশ্মীরে আগুন জ্বলছেই। ফলে রিজওয়ানকে আমরা স্বাগত জানাই। এই রিজওয়ান বড় চেনা আমাদের।
এই কাশ্মীর থেকে আরাকান— বাংলাদেশকে কেন্দ্রে রেখে রাষ্ট্রীয় প্রযত্নে এই যে সংখ্যালঘু মুসলিম হত্যাযজ্ঞ, তাকে গভীরভাবে ভাবার দরকার আছে। সৈয়দ জামিল আহমেদ সেই সময়োচিত ভাবনার কৃতিত্বটুকু পাবেন। কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি আগা শাহীদ আলীর কবিতার বই The country without a post office থেকে রিজওয়ানকে খুঁজে বের করেছিলেন ভারতের মেধাবী তরুণ নাট্যকার ও নির্দেশক অভিষেক মজুমদার। রিজওয়ান তার বহুনন্দিত কাশ্মীর ট্রিলজির প্রথম নাটক। জামিল আহমেদ নির্দেশিত রিজওয়ান মূলত অভিষেকের নাটকেরই বাংলা অনুবাদের মঞ্চায়ন। অবশ্য প্রচার-প্রচারণায়, বিশেষত পোস্টার-ব্রশিউরে সৈয়দ জামিল আহমেদের নামের ছায়ায় অভিষেক মজুমদার চাপা পড়েই থেকেছেন। এটা অদরকারি ছিল। দৃষ্টিকটু তো বটেই। কেননা অভিষেক রচিত নাটক রিজওয়ানকে জামিলের হাতে বেমানান লাগার কথা নয়। জামিল নির্দেশিত নাটক চাকা ও জামিল অভিযোজিত নাটক বিষাদসিন্ধু মিলিয়ে আমাদের অতীব পছন্দের এ নাট্যনির্দেশকের যে ভ্রমণ, রিজওয়ান তার প্রাসঙ্গিক গন্তব্য বলেই মনে হয়।
আপাতত রিজওয়ানকে আমরা আগা শাহীদের কবিতা ও অভিষেক মজুমদারের নাটক আকারেই পাঠ করব। রিজওয়ান কাশ্মীরের চিরচেনা গল্প। পৃথিবীর সব গণহত্যারই অনিবার্য ন্যারেটিভ এটি। গণহত্যার গল্প জীবিত মানুষ বলতে পারে না। মৃত মানুষকেই বলতে হয়। ফলে রিজওয়ান মৃত। যেমন মৃত তার বাবা, দাদু, মা ও বোন ফাতিমা। তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মৃত। ১৮ বছরের রিজওয়ান তখনো জীবিত, যখন তার পুরো পরিবারকে খুন করা হয়। কিন্তু মৃত্যু উপত্যকায় তো মৃত মানুষের আলাদা বসতি থাকবে না, জীবিত মানুষেরই সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে তারা! ফলে রিজওয়ান তাদের সঙ্গেই থাকে, এমনকি তাদের মৃত্যুকে উপেক্ষা করে। তারপর একদিন যখন সেও নিহত হয়, কাফেলা দীর্ঘ হয়। কিন্তু ততদিনে মৃত মানুষের মধ্যেও জীবিত মানুষের ভাণ আর মমতা ঢুকে গেছে। তাই রিজওয়ান মাঝিকে জানায়, সে যে মরে গেছে, এটা যেন তার মৃত আত্মীয়স্বজনকে না জানানো হয়! এভাবে এই মৃত মানুষের জবানিতে অভিষেক এক আশ্চর্য গল্প জড়ো করেন আমাদের শোনার জন্য। সেই গল্প তার যাবতীয় মমতা ও বেদনাসমেত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল নস্টালজিয়া আক্রান্ত এক কাশ্মীরি প্রবাসী কবির কবিতায়। ফলে আদিতে, রিজওয়ান প্রায় গল্পহীন এক গল্প। এক অনুভূতিপ্রবাহ যেন, দানা বাঁধছে আবার ছড়িয়ে যাচ্ছে, আবার দানা বাঁধছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাহলে রিজওয়ানের ন্যারেটিভ জড়ো হতে পারল কোথায়? উত্তর হলো, মৃত্যুর কোটরে। মৃত্যুই এ নাটকের কেন্দ্রীয় ঘটনা। কেন্দ্রীয় চরিত্র। মুখ্যতম মশকরাও। বিশেষত যখন দাদাজানকে ফাতিমা বলছে, সৈনিকটির ধর্ষণে কিংবা গুলিতে মৃত্যু হয়নি তার। সে মরেছে ঠাণ্ডায়। কারণ সৈনিকটি তার গরম পোশাক কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল। দাদাজান তখন আশ্বস্ত হয়ে বলছেন, তাহলে তো স্বাভাবিক মৃত্যু! অত্যাশ্চর্য ঘটনা তো বটেই, সেই উপত্যকায়, যেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি নেই বহুযুগ ধরে। আর মৃত্যু যখন বয়ানকারীর ভূমিকা নেয়, তখন মৃত ফাতিমার পক্ষে ঘটনাকে নানা তল থেকে পাঠ করা সম্ভব হয়ে ওঠে। যেমন সে বলছে, তাকে যে সৈনিকটি ধর্ষণ করছিল, সেই মুহূর্তে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সৈনিকটির স্ত্রী মারা যাচ্ছিল। ফলে সেই মুহূর্তে সে আসলে তার মৃত স্ত্রীকেই ধর্ষণ করছে! কিংবা সৈনিকটি নিজ নিয়তির হাতেই ধর্ষিত হচ্ছে। সেও এই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত সমর ব্যবসার শিকারমাত্র। ফাতিমা যেমন। ফলে ধর্ষণ সৈনিক একাই করছে না। ফাতিমাও করছে সৈনিকটিকে। বিষয়টি অবগত হওয়ার বা থাকার সুবিধা নিয়ে। সবার ওপরে রাষ্ট্রই মূলত ধর্ষক।
এভাবে অভিষেক মজুমদার কবি আগা শাহীদের কবিতায় পোড়া, দগদগে, ধোঁয়া উঠতে থাকা, মসজিদের মিনার গুঁড়িয়ে যাওয়া, নিহত মোয়াজ্জিনের শহর শ্রীনগরকে একটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ও সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মেনিফেস্টো হিসেবে পুনঃপাঠ করতে থাকেন। বিষণ্ন, দগ্ধ, মৃত কাশ্মীর কেবল এক মার্কিন প্রবাসী কাশ্মীরি কবির নস্টালজিয়ার উপাদান হয়ে থাকছে না, বরং ধর্মীয় ইন্ধনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কাঠামোগত গণহত্যার শক্তিশালী স্মারক হয়ে উঠছে। আর সেটা হয়ে উঠছে কোনো রকম নাটুকেপনা ছাড়াই। নাটুকেপনা বলতে আমি বোঝাচ্ছি, নাটকের প্রথাগত আঙ্গিকে যেভাবে আমরা সংলাপ ও ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে একটা ন্যারেটিভকে স্পষ্ট করতে দেখি, রিজওয়ানে তা লক্ষণীয়রূপে গরহাজির। বরং কবিতা আর নাটকের এক অপূর্ব লড়াই রিজওয়ানের আখ্যানকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। এটা ঠিক গীতিনাট্য নয়। আগা শাহীদের কবিতার ব্যবহার অভিষেকের নাটকে যেন যাত্রাপালার বিবেকের মতো। এখানে কখনো প্রিল্যুড কখনো ইন্টারল্যুড হয়ে নাটককে পথ বাতলে দিচ্ছে। নির্জীব কাঁচামাল হয়ে উঠছে না, অলঙ্কারও হয়ে উঠছে না।
কবিতার পক্ষে কি এ মতাদর্শ-উত্তর দুনিয়ায় এতখানি অর্থবহ ও সাংগঠনিক হয়ে ওঠা সম্ভব? এর জবাব আমরা আগা শাহীদের রেফারেন্সেই পাই। ২০১৬ সালে যখন ভারতের লোকসভায় সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আফজাল গুরুর ফাঁসির আদেশ হয়, একটা বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়ার পর তা নিয়ে ভারতের ছাত্রসমাজ উত্তাল হয়ে ওঠে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম যে সমাবেশটি হয়, তা শুরুই হয় আগা শাহীদ আলীর কবিতা The country without a post office পাঠের মধ্য দিয়ে। সেখান থেকে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানও ওঠে, এমন দাবি করা হয়। গণগ্রেফতার হয়রানি হয় প্রচুর। পরে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সে দাবির সত্যতা পায়নি। কিন্তু বলাই বাহুল্য, এই পোস্ট অফিস সংখ্যালঘু কাশ্মীরি মুসলিমদের আত্মপরিচয়ের স্মারক হয়ে ওঠে। এটা নিয়ে এমনকি ভারতের সংসদেও আলাপ ওঠে আগা শাহীদের মৃত্যুর পর। সেটা নিয়ে স্ক্রল-ইন সাইটে মীর্জা ওয়াহেদ মশকরা করে লিখেছেন, পোস্ট অফিস নেই, এমন একটি মিথ্যা বক্তব্যের মাধ্যমে যেহেতু ভারতের মানমর্যাদা বহির্বিশ্বে ধূলিসাত্ করেছেন আগা শাহীদ, তার মরণোত্তর বিচারের দাবি করতে পারে পার্লামেন্ট!
পোস্ট অফিস কীভাবে কাশ্মীরিদের আত্মপরিচয়ের ঐতিহাসিক সূত্র হয়ে উঠল? ১৯৯০ সালে একবার কাশ্মীরে ব্যাপক ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়, প্রচুর মানুষ মারা যায়, ধর্ষিত হয় আর ভিটাছাড়া হয়। তখন টানা সাত মাস কাশ্মীরে কোনো চিঠি বিলি হয়নি। পোস্ট অফিসে হাজার হাজার চিঠি স্তূপীকৃত হয়ে থাকে। আগা শাহীদ আলী তখন বিদেশে। তার এক বন্ধু কৌতূহলবশত একদিন শ্রীনগরের একটি পোস্ট অফিসে ঢুকে পড়ে থাকা চিঠিপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ছেলেকে লেখা আগা শাহীদের বাবার একটি চিঠি খুঁজে পান। এটিই প্রণোদনা এই বিখ্যাত কবিতাটির। আগা শাহীদ থেকে আজফার হোসেন অনুবাদ করেছেন এভাবে—
পড়ি সেগুলো, প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠি, উন্মাদ চিঠিগুলো,
আর পড়ি তাকে লেখা আমারটাও, যার কোনো উত্তর আসেনি।
আমি বাতি জ্বালাই, উত্তর পাঠাই, ডাকি প্রার্থনায়
বধির পৃথিবীগুলোকে সব মহাদেশ জুড়ে। আর আমার আর্তনাদ
হয়ে উঠে অসংখ্য ক্রন্দন; শেষ-হয়ে-আসা, প্রায় শেষ-হয়ে-আসা
পৃথিবীর কাছে পাঠানো স্তব্ধ-মৃত চিঠিগুলোর মত কান্না কান্না কান্না।
বৃষ্টির বিশাল প্যাকেটে-প্যাকেটে ভর্তি হয়ে আমার শব্দগুলো
চলে যায়, সেখানে যায়, ঠিকানায়-ঠিকানায়, সাগরের ওপারে।
পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের
শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ, যেন দরগার
স্বীকৃত মানত, টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত।
খুবই কো-ইনসিডেন্টাল মনে হতে পারে। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আফজাল গুরুর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর তার স্বজনদের চিঠি দেয়া হয় আসামির সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু সে চিঠি তার পরিবারের কাছে পৌঁছল ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরদিন। পোস্ট অফিস যেখানে নেই, সেখানে এটাই তো ভবিতব্য!
এভাবেই পোস্ট অফিস রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের সিগনিফায়ার হয়ে ওঠে। আগা শাহীদের কবিতায় পোস্ট অফিস যেমন পরিত্যক্ত, মসজিদের মোয়াজ্জিনও তেমন নিহত। মোয়াজ্জিনকে আমরা দেখতে পারি ধর্মীয় পরিচয়ের দ্যোতকরূপে। মসজিদের মিনার যেখানে ধসে গেছে, মোয়াজ্জিনকে মেরে ফেলা হয়েছে, পোস্ট অফিসে শত শত চিঠি বিলি না হয়ে স্তূপাকার হয়ে আছে, সেই কাশ্মীর একদা ভূস্বর্গ ছিল। রিজওয়ান অর্থ স্বর্গের দ্বাররক্ষক। এ অর্থবিজ্ঞান কেবল আমরা নাটকে বা কবিতায়ই শুধু প্রয়োগ করব না। শহীদ মানে প্রেমিক। আবার শহীদ মানে আত্মোত্সর্গকারী। কোরবান। এ দুই মিলিয়েই কবি আগা শাহীদ আলী। তার প্রেম, এক অভিবাসীর দেশের জন্য প্রেম, ছেঁড়াখোঁড়া স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে। যে দেশ ক্রমাগত লাশের পাহাড় হয়ে উঠছে। তা কেবলই ইমেজের সরবরাহ নয়, ছন্দের ঝনঝনানি নয়, এ এক আত্মঘাতী প্রেম। আগা শাহীদের জীবনই তার প্রমাণ।
যাই হোক, কবিতা আর নাটকের পাতানো লড়াই বা দুতিয়ালির কথা বলছিলাম। সংগীতের মঞ্চে যেমন বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গায়কির পাল্টাপাল্টি হয়, ঠিক রিজওয়ানেও এ রকম বেশুমার পাল্টাপাল্টি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। রিজওয়ান চরিত্রটিও ঐতিহাসিক। এ তরুণকে যখন খুন করে সৈন্যরা, জানাজার উদ্যোগ নেয়া হয়, সেই জানাজায়ও হামলা চালায়। ছত্রভঙ্গ জানাজা, নারীদের আর্তচিত্কার আর ফেলে যাওয়া শত শত জুতো। এই তবে রিজওয়ানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া! আগা শাহীদ লিখলেন—
“Rizwaan, it’s you, Rizwaan, it’s you” I cry out!
As he steps closer, the sleeves of his Pheran torn
“Don’t tell my father I have died”, he says
And I follow him through blood on the road
And hundreds of pairs of shoes the mourners
Left behind, as they ran from the funeral.
(I see Kashmir from New Delhi at Midnight)
মনে রাখতে হবে, এ কবিতা আগা শাহীদ কিন্তু লিখছেন কাশ্মীরে বসে নয়! বরং হাজার মাইল দূরের এক শহরে বসে। এভাবেই তিনি কাশ্মীরকে বহন করেছেন, সৃজন করেছেন, হত্যা-খুন-ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেকে হাজির রেখেছেন। এই তবে অভিবাসীর নিয়তি। আশীষ নন্দী যেমন বলেন, অভিবাসী সবসময় মাতৃভূমিতে ফিরে আসার খোয়াবের মধ্যে বেঁচে থাকে। আগা শাহীদও সেভাবে বেঁচে ছিলেন। অন্যদের সময়ে। পুরনো কাশ্মীর, বেগম আখতারের গজল আর Bruce King -এর ভাষায় Tricultural Nostalgia-এর মধ্যে। তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশিষ্ট লেখক অমিতাভ ঘোষ একবার তাকে বললেন, আপনি তো কাশ্মীরের জাতীয় কবি। আগা শাহীদ বললেন, জাতীয় কবি তাও ভালো, কিন্তু জাতীয়তাবাদী হতে চাই না। এ বয়ান থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদে তার সায় ছিল না। তিনি ভারত সম্প্রীতিতেই বিশ্বাস রাখতেন। ফলে তার এ ট্রাইকালচারাল নস্টালজিয়া তার জন্য দুধারি তলোয়ার হয়ে উঠেছিল। সম্প্রীতিময় ভারত, রক্তাক্ত কাশ্মীর আর আধাচেনা বৈদেশ। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল তার হূদয়।
তাহলে কবির হূদয়ই নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রের জন্য এখনো বড় হুমকি? আগা শাহীদ একবার কোনো দেশের বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে আটকে গেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এমন কিছু তিনি বহন করছেন কিনা যা ওই রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি জবাবে বললেন, তার হূদয়। হুমকি হয়ে উঠতে পারে। চেনা চেনা লাগছে এ উচ্চারণ? মনে করিয়ে দিই আগা শাহীদের সমবয়সী বাঙালি কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখা:
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে
অথচ আমার সঙ্গে হূদয়ের মতো মারাত্মক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র, আমি জমা দেইনি।
(... ... ...)
সেই হূদয় বা আত্মা ন হন্যতে। তাকে হত্যা করা যায় না। তাই তো রিজওয়ানকে হত্যা করা গেল না। ফাতিমা কিংবা দাদাজানকেও না। আগা শাহীদকেও না। হূদয়কে হত্যা করা যায় না বলেই অভিষেক মজুমদারের পক্ষে এমন একটি ন্যারেটিভ নিয়ে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্রিটিক করা সম্ভব। একই কারণে সৈয়দ জামিল আহমেদের পক্ষেও সম্ভব তাকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাজির করা।
সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাই নিপীড়নমূলক। নইলে জামিল আহমেদ কেন রিজওয়ানকে ঢাকার মঞ্চে দেখাতে চাইবেন। কেনই বা কাশ্মীরের পাত্রপাত্রীরা দু-একটা সংলাপ চাকমা ভাষায়ও বলবে? চাকমা ভাষা পরিবেশনার প্রতীকী তাত্পর্য আছে এবং সেটা রাষ্ট্রের সমালোচনা আকারেই। তবু কথা থেকে যায়। ২০১৭ সালে জ্বলন্ত কাশ্মীর আর পার্বত্য চট্টগ্রাম এক জিনিস নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু আদিবাসী নিপীড়ন ঐতিহাসিক সত্য, কিন্তু সমসাময়িক পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনোভাবেই সমসাময়িক কাশ্মীরের তুল্য সিগনিফায়ার হয়ে উঠতে পারে না। নিপীড়ন আছে, দমনও আছে, তবু হত্যা-খুন পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিদিনের ঘটনা নয় আর। এটাকে স্বীকার করে না নেয়া অন্যায়। তবে কি জামিল তার স্মৃতির কাছে প্রতারিত হলেন? কেন এ মেয়াদোত্তীর্ণ তুলনা? বিশেষত এ রকম জাজ্বল্যমান রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক মুহূর্তে, যেখানে বাংলাদেশের দক্ষিণে আরাকান এখন কাশ্মীরের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে? আমরা যখন নাটক রিজওয়ানে শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু দেখছি, বাস্তবের আরাকান তখন সেই একই এপিসোডের রিপ্লে করে দেখাচ্ছে। গণহত্যা চলছে সেখানে। নিপীড়িত, ধর্ষিত, ভাগ্যবিড়ম্বিত, দেশান্তরী হয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করতে থাকা কিন্তু পটেনশিয়ালি সন্ত্রাসবাদের কিংবা মাদক চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা মিলিয়েই বর্তমানের রোহিঙ্গা ন্যারেটিভ। রোহিঙ্গা রিজওয়ান কিংবা ফাতিমাকে এ ন্যারেটিভের অংশ হয়ে আমরা এখন বঙ্গোপসাগরে ডুবে যেতে দেখছি। সৈয়দ জামিল আহমেদ তার দেখাটাকে এ পর্যন্ত হালনাগাদ করতে পারতেন। তাতে বরং আমাদের হূদয়ে মঞ্চ ও বাস্তব মিলে মিশে যেতে পারত। কেউ কেউ হয়তো বলবে, রোহিঙ্গা সেদিনের ঘটনা। কিন্তু জামিল আহমেদ তো নাটকের প্রস্তুতি বহুদিন ধরেই নিচ্ছেন। সত্যি। কিন্তু যখনই রোহিঙ্গা ইস্যু আকারে সামনে চলে এল, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় থাকল না। সে কারণে নতুন রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ন্যারেটিভ এক মেয়াদোত্তীর্ণ ঐতিহাসিক অনুভব ছাড়া আর কিছুই উপহার দেয়নি দর্শককে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, সৈয়দ জামিল আহমেদেরও।
তবুও এ রকম একটি নাটককে বাংলা ভাষায় ও ঢাকার মঞ্চে পরিবেশন করার জন্য সৈয়দ জামিল আহমেদকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। আমি নাটকের লোক নই, ফলে বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করার সুযোগ নেই আমার। দর্শক ও সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে সামান্য কিছু বলা সম্ভব। যেমন এটা নিশ্চিত যে, অনুবাদের দোষেই বাংলা ভাষায় রিজওয়ানকে অনেক ম্যাড়মেড়ে লেগেছে। কারণ রিজওয়ান যতখানি গল্প, তার চেয়ে বেশি কবিতা। অভিষেক মজুমদারের মূল পাণ্ডুলিপি আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেটি ইংরেজি ও হিন্দির মিশেলে দারুণ দ্যোতনা তৈরি করে। বাংলায় তার ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু জামিল আহমেদের ক্যারিশম্যাটিক পরিচালনা নজর কাড়বার মতো। মঞ্চটিকে তিনি অনেক সৃজনশীল উপায়ে ব্যবহার করেছেন, তাতে একটা ত্রিমাত্রিক আবহ তৈরি হয়েছে শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে। রিজওয়ানের অন্যান্য নির্দেশনা থেকে জামিলের নির্দেশনা ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। সেগুলো দেখার সুযোগও আমার হয়নি। অনুমান করতে পারি, অভিষেকের রিজওয়ানে মৃতরা ঝিলাম নদীতে ডুবে যায়, জামিলের রিজওয়ানে তারা সিঁড়ি বেয়ে ঊর্ধ্বলোকে উঠে যায়। কোরিওগ্রাফি আকর্ষণীয় হয়েছে। যদিও কিছু কিছু বিষয়ের কোরিওগ্রাফি খুব আক্ষরিক হয়ে ওঠায় বিদ্ঘুটে লেগেছে। যেমন ফাতিমা যখন তার ধর্ষণের বিবরণ দেয়, তখন সে এক জায়গায় বলছে, সেও ধর্ষণ করছে সৈনিকটিকে। অভিষেকের মূল পাণ্ডুলিপিতে এ বর্ণনাটুকু অনেক সাবলাইম, যার ব্যাখ্যা আমি একটু আগে করেছি। যা মূলত প্রতীকী, তাকে নাটকের কোরিওগ্রাফিতে এমন একটা শারীরিক স্তরে হাজির না করেও বোধ হয় অন্যভাবে বলা যেত। তবু একটা নাটকের টানা ১০ দিনেরও বেশি ধরে প্রদর্শনী চলাও ঢাকার মঞ্চে বিরল ঘটনা। সেটার জন্যও সৈয়দ জামিল আহমেদকেই কৃতিত্ব দিতে হয়। এ নাটকে প্রচুর শারীরিক কসরতের ব্যাপার আছে, সেটা তার কলাকুশলীরা যেভাবে করেছেন, তাতে তাদের অনেক সময়ই ক্লান্ত মনে হয়েছে। এ ক্লান্তি ছোঁয়াচে, তা দর্শককেও আক্রান্ত করে থাকবে। যে কারণে রিজওয়ানের কলাকুশলীরা মঞ্চে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করেন, সেই পরিমাণ আবেগ তা দিয়ে তারা উপার্জন করতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি। তবু ঢাকার মঞ্চে এ রকম সুশৃঙ্খল ও দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনার জন্য সৈয়দ জামিল আহমেদকে সাধুবাদ জানাই। নাট্যনির্দেশক হিসেবে তিনি যে অন্য স্তরের, এটা সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় নিন্দুকও অস্বীকার করবেন না।
(১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে রিডিং ক্লাবের আমন্ত্রণে জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স মিলনায়তনে দেয়া বক্তৃতার লিখিত রূপ)






