[কবিতা জ্যামিতি বৈকি। ভবের নাট্যশালায় আওয়াজের ভিতর দিয়া যাহা লোক-লোকান্তরে ছড়াইয়া পড়ে, তাহার দু-একটা ধ্বনিতরঙ্গ অক্ষর আকারে প্রকাশ করিতে পশু মানুষ হইয়াছে। তাই প্রতিদিনকার জীবনই কবিতার চলকবিশেষ। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, জ্যামিতির বেগ রহিয়াছে। ইহারই সামাজিক নাম প্রগতি। ইহা অ-ছন্দে চলিতে পারে না। শিল্পকলা বলিয়া যে বস্তুর কল্পনা করা হয়, তাহাতে আমার বিশেষ আস্থা নাই। আমি বিশ্বাস করি, জীবন যে চলমান তাহার সত্য ভাষা প্রকাশে, ইহার সহিত আমার গোপন বিবাহ হইয়াছে বলিয়া আমি জবান খুলিয়া দিয়াছি, সংসার তো করিতে হইবে! আদি ও আজিকার কথা বর্তমানের মুহূর্তে ধরিবার চেষ্টা কবিতাকে যে জ্যামিতি প্রদান করে, তাহাই প্রভুর আদেশে গ্রহণ করিয়াছি মাত্র]
পুরস্কারস্বরূপ
এই ফল শুদ্ধতার ফল— ফলাফলসহ, তাহার ছায়া অথবা আভা অনেক অনেক দূর যায়, সেই পর্যন্ত যাইবার জন্য যাত্রা শুরু হইয়াছিল। তাহারা নিকট ও দূর— দুই বিন্দু পাড় হইয়া অনপনেয় পাপ ধুইতে ধুইতে, শব হইতে হইতে জলাভূমি পার হইয়াছিল সুসভ্য হইতে। ছুরি আর কার্তুজভরা বন্দুক, বর্শা আর তীর— কেউ কেউ এতদসমূহ যে জাগরণ তাহা কেন মিথ্যা হইবে, এই প্রশ্নে বইপত্র খুলিয়া বসিয়াছিল, নিম্নরেখা দিতে দিতে কয়েক হাজার গ্রাম, কয়েক শত শহর, ফুটনোটে অধিক সব সংযুক্ত ব্রিজ হাইফেন কাটিয়া পুনর্বার সংযোজনার মহোত্সবে আবার পুড়াইয়া ফেলিয়া দিয়াছে। এক্ষনে সকলে খুশি, সেই আনন্দে মদ্যপান চলিতেছে, বিকারসম্ভব দেহ আর মন তাহাদের ব্যক্তিগত চোলাই দিয়া ধুইয়া মহামশকরায় আবার ফলের বা ফলাফলের দিকে যাইতেছে। যে আভা তাহারা নিয়া গিয়াছিল পরিখার ভিতর অনন্ত জন্মের, সেইখানে রাখিয়া আসিল যুদ্ধাস্ত্র, কৌশল আর শত্রুনাশবিদ্যাসমূহ, তখন আর কেহমাত্র নাই, যাহাকে হত্যা করা যাইবে। অতঃপর, ফলত্বকে, মসৃণ মর্যাদায় পৌঁছিয়া দেখিল, নুনহীন বায়ুর ভিতর তাহাদের নিতান্ত আর্তনাদ অথবা গোঙানি। যেইখানে একদিন তাহারা আদির আরম্ভে ছিল, সেইখানেই লুটাইয়া পড়িয়া রহিয়াছে— ফল অথবা শুদ্ধতার ফলাফলসহ— পুরস্কারস্বরূপ...
আদমেরা দেখিল আদম নহে তারা
ফলে শুধু পাকিবার ব্যথা— অশুদ্ধ বিকৃত নানান চেহারা
ধ্বংসের আগে
সুগঠিত ছিল না তখনও, উপরন্তু ধুরন্ধর বায়ুসঞ্চালনে বৃন্তচ্যুত হইবার ভয় জাগিতেছিল, মেয়েদের স্বভাবে ছেলেরা হাত-পা ঘষিতেছিল বাতিল পুকুরে— সাবানে, ক্ষারের ফেনবিক্ষোভে ত্বকসহ একদিকে দাবিয়া যাইতেছিল আকার আর প্রকারের। বহু-বহুদিন পর হত্যার ইচ্ছা জাগা সমিতির দায়ের ধার, বহু-বহুদিন পর কুত্সারত পান ও পানীয়সভা মধ্যরাত্রিতে ঘন হইতে থাকে, ইহার পর আর কিছু বলিতে পারা যায় না— কপালে কী আছে। প্রসব বেদনা শুরু হইলে লোকজন শব সত্কারে নিজেদের প্রস্তুত করিতে তত্পর হয়। এহ ভিন্ন আর কিছু জানা যায় না। ভ্রান্ত এবং সম্ভ্রান্ত একসঙ্গে গা মুছিতে থাকে, বগোলতলায় পানির প্রাচীন শ্যাওলা পাথর হইয়া উঠিতে থাকে। আশ্চর্য হইবার কেহ নাই আর, কেননা এমনই ছিল আকারের বিকারের দিকে ছুটিয়া চলা—। বুঝা যাইতেছে আদি হতাশা— যাহার প্রারম্ভেই গঠন মশকরা ছিল। জবরদস্তি, ধর্মধারণা, দ্বিধার মহিমা, একের পুনঃপুন আত্মহত্যা— এই নিয়া তর্ক তালাশ নাই, চাষবাস নাই, একাজন্ম একখানি খয়ের গাছ— রঙ শুকাইয়া বিবর্ণ হইয়া পড়িয়াছে— হাটে-মাঠে মুখে মুখে কথারঞ্জনের রসোন্মাদনার ইচ্ছাটিও মৃত, যেইটুকু আছে, তাহা শুধু সমিতির হত্যা-উত্সবের জন্য তুলিয়া রাখা। বাকি লোকজন পান ও পানীয় সুদূর অতীতে রাখিয়া পুকুরে নামিয়াছে আর সেইখানে দাবিয়া যাইতেছে দেহকোষ, জৈবজটিল প্রোটিনকল্পনা, বুঝা যাইতেছে সুগঠিত হইবার, সংগঠিত হইবার আর কোনো সম্ভাবনা নাই...
অংশের রহিল না সমগ্রের প্রতি কোনো টান
খ-বিন্দু উত্পাটিত— অনালোক ভবিষ্যত্ বিধান
ঈদ
সাধু। সাধু। জগত্ অভিষিক্ত হইল। নিঃশঙ্কচিত্তে এবার লালের অভিগামী হইতে পারা যাইবে। ক্রমকৌশলে সকল চিন্তাই ধর্ম, তাই নহে?
গরু বা ছাগল সুপ্রচুর মসলাসহকারে টেবিলে আসিতেছে। রান্না করা উষ্ণ মাংসের ঝোলময় জয়গান— সঝাল জিহ্বার ডগা ও মূলে পরিতৃপ্তিময় দুপুর— তাহারই চতুর্দিক গোল হইয়া বসিয়াছে মানবসমাজ। মদ্য কি আসিবে এখন? রোহিঙ্গাবার্তা আসে, শ্রমণেরা দুই হস্তে তুলিয়া লইয়াছে ধারালো অস্ত্র— ধাওয়া দিতেছে তাহারা আলাওল-বেভুল দুলালদের, আসিতেছে বৈদিক জ্ঞান গুহ্যদ্বার ছিঁড়িতে ছিঁড়িতে, মদ্য আসে না তবু!
তখেতর ওপর হইতে ডাকিয়া উঠিল কে— তক্ষক তিনি? নারী প্রতিভায় ঝলমল দ্বিপ্রহরে সে কাহাকে ডাকিল? চাহিয়াছি লাল— অভিগামী হইতে পারিব। নিশ্চয়, নিশ্চয়— এই বিশ্বাসে কাঁপে তৈজস। কী তাহার পরিচয়, কহ? জান না সে কে? ধর্মের ধারণা জাগ্রত যাহাতে নরক আর স্বর্গ সমুজ্জ্বল সদা? এবং মাঝবরাবর ঝুলিয়া থাকেন আদম সন্তান!
মদ্য আসিবে। উঁচুতে উঠিবে সব স্ফটিকস্বচ্ছ গ্লাস। জাগিবে জিহ্বাদল, ব্যক্তিগত মেদ ও মনীষাময় বুর্জোয়াসমাজ।
পাখি সব করে রব দর্জিদের ভেজা জাঙ্গিয়ায়
সাধুশয়তানেরা গরুচিত্তে মানুষের মাংস ছিঁড়ে খায়...
জ্যামিতিমৈথুন
খগোল কল্পনা হইতে পরিমাপযোগ্য ত্রিভুজ হইল। ইহার পর আরও আরও আকার গঠিতে লাগিল। অনন্তের অন্তবিন্দুর কলা ও কৌশল রপ্ত করিতেছে তাহারা। ইহা মাত্র ধ্বংসের প্রগতি উদ্যোগ— আরেক আরম্ভ। দু-একটা বাইসনের ছায়া, হ্লাদক্রিয়াচ্ছলে হরিণের হিয়া গোচর হইতেছে। কে দেখিল আগে, তাহা অবশ্য বলিতে পারা কঠিন। উন্মূল আদ্যধ্বনি উদ্ভিদে বাড়ি খাইয়া, পশুর গোঙানিতে, জলস্থল মন্থন করিয়া শবে থামিল যখন, তখন শব্দ লালা ও বিজল মাখিয়া গ্রন্থিত হইল। তৈরি হইল ডায়নামো— ঊর্ধ্বগতিময় অজৈব পণ্যসম্ভার রাশি রাশি।
কুন্দফল পাকিল তাহারও পূর্বে, না আরও একটু বিলম্বের পর? ভুলিয়া যাইতেছে তাহারা একের পর এক, শুদ্ধ পাপিষ্ঠ জটাধারী দু-একজন ছাড়া যাহারা ত্রিশূলের উত্তরাধিকার— শব্দ আর শববাহকেরা। স্মরণবিকল্পে দু-একটা যজ্ঞরসের ধক শুধু লাগিয়া রহিল, যেহেতু বায়ু তখনও বহিতেছে অধিক সিসার প্রগতিতে। ইহাই গণিত— ক্রমসংস্কারের ধ্বংসোদ্যোগ। তাহারা মনেও করিতে পারিতেছে না, শুরুতে কী ছিল? প্রারম্ভে? প্রত্যুষায়?
বলিতে পারা যায়, ইহাই নিয়তি— পুনশ্চয়নকৃত চির-অন্ধকার
স্থিতি, পরাগতিসহ একটা বিকাশ-উন্মুখ হাঁ জরায়ু জবার






