বাতাসের একটানা গোঁ গোঁ শব্দ আমাকে মাতাল করে তুলেছে। আর ছনছন শব্দ আমাকে পাগলের মতো টানছে। না, বেশি এগোনো ঠিক হবে না। আমার ভাবনার এই ফাঁকে শ্যামলী মনে হয় কোনদিকে লুকিয়ে গেল। এটা কি তবে লুকোচুরি খেলা? ছোটবেলায় কত খেলেছি এ খেলা। মেয়েদের সঙ্গে খেলার অপরাধে মা কত বকেছে আমায়। বল তো, ‘তুই কি মেয়ে নাকি, ওদের সঙ্গে হাঁড়ি-পাতিল খেলিস?’
মাথাটা ঠাণ্ডায় কেমন জমে যাচ্ছে। এবার আমি উল্টো পথ ধরি। থামের আড়ালে তার ঘাগরার পাড়ের সোনালি ছটা আমাকে টানে। আমি তার সামনে দাঁড়াতেই সে একদম ভীতু হরিণীর মতো আঁতকে ওঠে।
‘তুমি আমার কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলে কেন?’
‘আপনাকে তো আমি চিনি না।’
‘শ্যামলী, কি বলছ এসব?’
আমি শ্যামলীর কথায় বিস্মিত না হয়ে পারি না।
‘আপনি ভুল করছেন।’
‘ভুল?’
‘হুম, ভুল করেছেন। আমি শ্যামলী না। আমি অর্পিতা।’
আমি দমে গেলাম। ভাবলাম, শ্যামলী বুঝি চালাকি করছে আমার সঙ্গে। তবে আমি কেন শুধু শুধু তাকে ধরা দেব! ঠিক আছে, সে অর্পিতা হয়েই থাক। বললাম, ‘তুমি শ্যামলীর কী হও?’
সে বলল, ‘সে হিসাব তো করিনি। আর যদি অত প্যাঁচের সম্পর্কের হদিস করতে যান, তবে অনেক গবেষণার প্রয়োজন হবে।’
‘কেন, কেন?’
‘আর কিছু আপনাকে বলতে পারব না। কারণ আপনি দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছেন। আবার চলে যাবেন। এত কিছু জানার প্রয়োজন নেই আপনার।’
‘নাকি মনে করছ, সে অধিকার আমার নেই?’
‘অধিকারের প্রশ্নে আমি যাচ্ছি না। ওসব কথা বলে লাভ নেই। এত কথা না বলে বলুন তো, এত রাতে আপনি না ঘুমিয়ে বাইরে হাঁটছেন কেন?’
‘কেন হাঁটা যাবে না? সমস্যা আছে?’
‘সমস্যা তো থাকতেও পারে!’
‘আমার ঘুম আসে না। কে যেন আমাকে ডাকে। বুঝি না। তাই বাইরে এসেছি। তোমার নূপুরের ধ্বনি আমি শুনেছি। আমার মনে হয়েছে, আমি কোনো হারানো রাজকন্যার সন্ধান পেয়েছি। তাই আরো উত্সুক হয়ে বেরিয়ে এসেছি।’
‘হুম, আমি সে রকমই। তবে ভিন্ন জগতের হারানো এক রাজকন্যা।’
‘তোমার ভেতর এক ধরনের অপূর্ণ ইচ্ছা আছে।’
‘কী করে বুঝলেন?
‘তোমার কথায়ই বুঝেছি।’
‘হুম তা আছে। সে আর পূরণ হবার নয়।’
‘নাচ করতে ভালোবাসো?’
‘হ্যাঁ বাসি। এখন আমি সারাক্ষণ নাচি।’
‘তাই নাকি!’ বিজলি চমকাল। আমি সে আলোয় তার অপরূপ রূপ দেখলাম।
অর্পিতা বলল, ‘আজ যাই। তার অনুমতি নিয়ে রাখব। যদি পারেন কাল এমন সময় আসবেন। নাচ দেখাব।
কার অনুমতি?’
‘যে আমার, আমি যার। তার অনুমতি।’
অর্পিতার খিল খিল হাসিতে রাতের বাতাস শিরশির করে উঠল। এ বাড়ির খানাখন্দরে সে হাসির তীব্রতা অদ্ভুত শোনাল।
আমি বলেতে চেয়েছিলাম, ‘আরে অমন করে ছুটলে তো পড়ে যাবে। শেষে হাত-পা ভেঙে যাবে আর নাচ দেখাতে পারবে না।’
কিন্তু তার আগেই সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। অর্পিতা কিছুক্ষণ আগেও ছিল। এ কথাটাই আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। অথচ বাতাসে এখনো তার হাসির রেণু ছড়িয়ে আছে। যাক, এখন ঘুম আসছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। কিন্তু তার ঠাণ্ডা রেশ এখনো রয়ে গেছে। গাছের পাতা থেকে জল ঝরছে, টুপটাপ শব্দে। শুয়ে রইলাম, ঘুম আসছে না। নানামুখী প্রশ্নের চাপে মাথাটা গিজগিজ করছে। একটারও উত্তর মিলছে না।
২.
ঘুম মানুষকে ক্লান্তিহীন করে। তার চোখের চারপাশ ঘিরে চুলের রিং। এটা তাকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। প্রতিদিন সকালের মতোই আজ সে ফুল এনেছে। আমার ঘুম ভাঙিয়েছে। সকালে পুজোয় তার মধুর কণ্ঠের আরাধনা শুনে ঘুম ভেঙেছিল। ওদের বাড়ির আশপাশে হরেক রঙের ফুলগাছ আছে। তাছাড়া নানা জাতের গাছেও গিজগিজ করছে জায়গাটা। একটু দূরেই বড় পুকুর। অবশ্য পুকুর না বলে এটাকে দীঘি বললেই ভালো। আশপাশে কয়েকটা তালগাছ বেশ মোটাতাজা হয়ে উঠেছে। একপায়ে এরাই যেন আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। ছাদের ওপর থেকে দীঘির টলটলে জলের ওপর যেন ছায়া পড়ে কিংবা জলের আয়নায় বুঝি অবয়ব দেখা যায়। অনায়াসে একটা লাফ দিয়ে ডাইভ দিলে দীঘির জলে হারিয়ে যাওয়া যাবে। সকালের দূর্বা ঘাসে কেমন একটা কোমল ভাব জমেছে। শ্যামলী হাত বাড়িয়ে সেটা ছুঁয়ে নিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর উচ্ছলতা দেখি। কি প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটা মেয়ে।
৩.
কেটে গেল আনন্দের দিনগুলো। কোনদিক দিয়ে যে গেল টেরই করতে পারলাম না। বিদায় পর্ব সমাসীন। আহ্ মনে হচ্ছে আজ কত যুগ এখানে বসবাস করছি। ছয়-সাতদিন হচ্ছে বন্ধু পলকদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। সবার খুব মন খারাপ— অর্পা, মাসি, শ্যামলী, পলক। পলক বলছে, ‘আর কটা দিন থেকে গেলেই পারতি।’ কিন্তু থাকা হয় না আমার। বাড়ি থেকে ফোন এসেছে, বাবা অসুস্থ। যেতেই হবে আমাকে আর তাছাড়া অর্পিতার ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না। গতকাল পলককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অর্পিতাকে চেনে কিনা?
ও বলল, ‘কোত্থেকে এসব নাম পাস? আমি কোনোদিন নাম শুনিনি।’
আমি অবাক হলাম। অর্পিতা আমাকে যা বলেছিল তাই হলো। অর্পিতা তবে কে? তার মানে ও কি এই সময়ের কেউ নয়? ও কি এখন সুদূর অতীত! একটা চিন্তার স্রোত আমাকে আমূল নাড়িয়ে দিয়ে যায়। ব্যাপারটা কেমন যেন ঠেকছে। একবার ভালো লাগছে আবার ব্যাপারটা অশুভ মনে হচ্ছে।
রাতে অর্পিতার সঙ্গে আবার দেখা হলো। অর্পিতাও মন খারাপ করে বসল। বলল, ‘চলে যাবেন?’
আলো অন্ধকারে ওর চোখের জ্যোতি আমাকে কেমন বিবশ করে দিল। আমি বললাম, ‘হুম, চলে যাব। বাড়িতে যেতে হবে। তাই বেশি দেরি করতে পারছি না।’
‘না, এই কয়দিন আপনার সঙ্গে কথা বললাম। ভালোই লেগেছে। মনে পড়বে, এমন ঝড় ও জলের রাত্রি এলে আপনার কথা স্মরণ করব।’
আমার মনটাও খারাপ হয়ে উঠল। অর্পিতা আমার একটা হাত ধরে বসে রইল। বলল, ‘আজ আপনাকে নাচ দেখাব। আমি বললাম, ‘তাই? তবে তোমার পুরুষটি কিছু মনে করবে না তো!’
‘হ্যাঁ, ও একটু হিংসুটে। আমি বলেছি ওকে, কিছু করলে আমি ওকে ছেড়ে চলে যাব। ও বলেছে, তবে আমি যেন গভীরভাবে আপনার সঙ্গে না মিশি।’
আমি হাসলাম। হাসি আর থামতেই চায় না।
অর্পিতা বলল, ‘এভাবে হাসছেন কেন? ও আপনার অনেক ক্ষতি করতে পারে। জানেন না তো, ও অনেক বদ।’
‘কী করতে পারে?’
‘এই যেমন আপনাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে।’
আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘তাই নাকি!’
‘হুম। কিংবা আপনার ভেতরে ঢুকে অস্বাভাবিক আচরণে বাধ্য করতে পারে। কোনো ওঝা-বৈদ্য দিয়েই তখন কাজ হবে না— এমন!’
‘থাক থাক দরকার নেই। ওকে বলবেন, আমি কোনোভাবেই আপনার ওপর কোনো ছায়াপাত করব না। তাই কাল ভোরেই আমি চলে যাচ্ছি।’
‘চলে যাচ্ছেন?’
অর্পিতার কথায় কেমন একটা মন খারাপের সুর।
‘হ্যাঁ, যাচ্ছি। বাবা অসুস্থ। বাড়িতে যেতে হবে। আর এখানে বন্ধুর বাসায় আর কতদিন।’
অর্পিতা বলল, ‘আমার সঙ্গে আসেন।’
আমি বললাম, ‘কোথায়?’
ও বলল, ‘কোনো ভয় নেই। ওপর থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব না।’
আমি ওর পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম। আমার পেছনে যেন কে হাঁটছে। আমি পেছনে তাকালাম। কেউ নেই। আবারো হাঁটছি। পেছন পেছন কে যেন আসছে। না, আর চেক দিতে পারছি না। যে আসবে, আসুক। অসুবিধা নেই। আমি অর্পিতার পিছু পিছু কোথায় চলেছি বুঝতে পারছি না। অদ্ভুত জায়গা। এত দূরত্ব। ঘুরতে ঘুরতে একটা বন্ধ দরজার সামনে চলে এলাম। অর্পিতা আসতেই যেন দরজা নিজে নিজে খুলে গেল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। অর্পিতা ভেতর থেকে ডেকে উঠল, ‘আসুন।’
আমি ভয়ে ভয়ে ভেতরে পা রাখলাম। গা-টা কেমন ভারী ভারী মনে হচ্ছে। মেঝেতে শতরঞ্জি পাতা। চারপাশে শাহি আসন। মাথার ওপর ঝাড়বাতি। চারপাশে নানা আলোকসজ্জা। অদ্ভুত রঙের আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল।
এ আমি কোথায় এসে পড়েছি! অর্পিতা পাশের একটা ঘরে ঢুকে গেল। আমি একাকী বসে আছি। মনে হচ্ছে, নীরব জলসায় জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক কবি। স্বপ্নের টানে দুচোখে স্বপ্ন ঠেসে এখানে জীবনের সঞ্জীবনী সুধা পান করতে এসে বসে আছি। বিশাল হলরুম। চারপাশে বসার আসন। এটি একটি জলসাঘর? একপাশে পানপাত্র, মাঝখানে কেন্দ্রবিন্দু। একটু পরই রিনিঝিনি আওয়াজে ফিরে তাকালাম। কী বলব, আমার চোখ যেন পাথর বনে গেল। বিস্ময়ে পলক ফেলতে পারছি না। মুখ হাঁ হয়ে গেল। আমি নির্ঘাত স্বপ্ন দেখছি। অর্পিতা আস্তে আস্তে এসে দাঁড়াল আসরের মাঝখানে। আমার মনে হলো, আরো অনেক জোড়া দৃষ্টি অর্পিতার ওপর স্থির হয়ে আছে। কিন্তু তাদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আপাতত মনে হচ্ছে, আমি একাই এ জলসার দর্শক। শুরু হলো অর্পিতার অদ্ভুত নৃত্য। আমার কাছে সবকিছু অপার্থিব মনে হচ্ছে। আমি যে কোথায়, সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে। এত সুরের ঐকতান কোত্থেকে যে আসছে, আমি বুঝতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, আমি ছাড়া অনেকেই এখানে আছে, শুধু আমি ওদের দেখতে পাচ্ছি না। আমি যেন অনেক পেছনের সময়ে চলে এসেছি। আর সেই সময়ের একজন মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে বসে আছি অর্পিতার জলসায়। অর্পিতার মিহিন কাপড়ের অন্তরালে তার অপরূপ যৌবনের যে স্বর্ণালি আভা, তা আমাকে কেমন বিবশ করে তুলছে। একের পর এক মোহনীয় মুদ্রা আসছে। একের পর এক সুর পরিবর্তন হচ্ছে। আমি মগ্ন হয়ে এই অপরূপ সুধা পান করছি। তারপর একসময় কি আমি ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়লাম? না হলে আমার কোনো কিছু মনে নেই কেন?
৪.
ভোরের আলোতেও আমার ঘুম ভাঙেনি। একটা মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে-মুখে জড়িয়ে আছে। নরম কিছুর সঙ্গে আমার মুখ লেগে আছে। একটু উষ্ণতাও আছে তাও বুঝতে পারছি, কিন্তু কোথায় বুঝতে পারছি না। চোখ খুলতেই পারছি না। কানের কাছে পরিচিত একটা কণ্ঠ মোলায়েমভাবে ডাকছে, ‘মঞ্জুদা, এই মঞ্জুদা। ওঠেন, ওঠেন বলছি।’
আমি চোখ মেলে দেখি ভোরের আকাশ। তারপর দেখি এক জোড়া চোখ উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠায় উপুড় হয়ে আছে। আর তার বুকের উষ্ণতায় আমার মুখমণ্ডল। আর তার দুহাত পরম মমতায় আমাকে ধরে আছে।
‘কী হয়েছে আমার? আমি কোথায়?’
‘আপনি ঘর ছেড়ে বাইরে কেন?’ শ্যামীলর উদগ্রীব কণ্ঠ শুনলাম।
আমি মনে করতে চাইলাম। কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। আমার কী হয়েছে? গতরাতের কথা মনে পড়ল। শ্যামলীকে অর্পিতার কথা জিজ্ঞেস করতে হবে। এখনি সময়।
‘আচ্ছা শ্যামলী, বলো তো, অর্পিতা তোমার কোন কাকার মেয়ে?’
অর্পিতার নাম শুনে মনে হয় শ্যামলী চোখ দুটি বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
‘কী, কিছু বলছ না কেন? শ্যামলী কে? তোমাদের কেউ কি হয়, যে এ বাড়িতে বসবাস করে?’
কী ভাবছে শ্যামলী কে জানে! সে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘সে আমাদের আর কেউ হয় না। সে এখানে থাকে না। তুমি ভুল করে কী দেখেছ, কে জানে?’
আমি যেন একটা ধাক্কা খেলাম। শ্যামলী এমন আচরণ করছে কেন? কী হয়েছে? তাহলে কি এখানে কোনো কিন্তু আছে? একটা জট খেলছে মাথার ভেতর। কিন্তু আমার হাতে তো সময় নেই। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ট্রেনের সময় হয়ে যাবে। তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? এ ব্যাপারটি অমীমাংসিত থেকে যাবে? আমি ধীরে ধীরে উঠে রুমের দিকে চলে এলাম। পলক তখনো ঘুমাচ্ছিল। ওকে একটু ডাকতেই ধড়ফড় করে জেগে উঠল। বলল, ‘কিরে সময় কি হয়ে গেছে?’
আমি বললাম, ‘হাতে আর বেশি সময় নেই।’
ও বলল, ‘রেডি হয়ে নে। আমি স্টেশনে তোকে তুলে দিয়ে আসব।’
বিদায় পর্বে শ্যামলী বলল, ‘মঞ্জুদা, ভালো থেকো।’
আমার হাতের মধ্যে ছোট্ট এক টুকরো কাগজ আর একটা কী যেন গুঁজে দিল। আমি নিলাম। কিছু না দেখেই প্যান্টের পকেটে রাখলাম। ভাবলাম, যখন ট্রেন ছাড়বে তখন নিরিবিলি বের করে দেখব। রাস্তার মোড়েই পলক একটা রিকশা দাঁড় করাল। অর্পা বিদায় নিল এখান থেকে। ও মা, এ পিচ্চিটাও ঢপ করে পা ছুঁয়ে সালাম করে বসল। আমি বেকুব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মানিব্যাগ বের করে ওকে কয়েকশ টাকা দেব ভাবছি। যেই মানিব্যাগ বের করলাম, ও চোখ মুছে দৌড়ে পালাল।
স্টেশনে এসে গেছি। নামলাম স্টেশনে, অনেক মানুষ। সবাই উত্তর দিকে তাকিয়ে আছে। কখন ট্রেন আসে। সবার হাতে বড় বড় ব্যাগ। কিছু বড় বড় বস্তাও অপেক্ষা করছে। স্টেশনজুড়ে শুঁটকি মাছের গন্ধ। নাক টানতেই ভক ভক করে গন্ধ পেটের মধ্যে চালান হয়ে যাচ্ছে। মানুষজন-হকার একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। দাঁড়িয়ে আছি। ৫, ১০ করে ২০ মিনিট। ট্রেন এল অবশেষে। নির্দিষ্ট আসন নিয়ে বসলাম। জানালার কাছে পলক দাঁড়িয়ে রইল। গাড়ি চলতে শুরু করলে ওকে পেছনে রেখে আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার মনটা হু হু করে কেঁদে উঠল। কেন কাঁদছে, কার জন্য কাঁদছে। বুঝতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, আমার আপনজন কাউকে ছেড়ে আমি দূরে কোথাও চলে যাচ্ছি।
শ্যামলী আর অর্পিতার কথা মনে পড়ল। দুজনের মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত মিল। চেহারা, কথায় সবকিছুতেই। কাল রাতে অর্পিতার নাচ দেখতে দেখতে আমার কেন এমন ঘুম পেয়েছিল? অনেক ভাবলাম। কূলকিনারা করতে পারলাম না। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, শ্যামলী আমাকে কিছু একটা দিয়েছিল। সিট থেকে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলাম।
আমি বিড়বিড় করে পড়তে লাগলাম, মঞ্জুদা, যেটুকু দিয়েছ, তাতেই আমি খুশি। মালাটি নিজের কাছে রেখো, যে কয়দিন থাকে। তোমার স্মৃতিটুকু রেখে দিলাম নিজের করে। জানি না, পারব কিনা ধরে রাখতে শেষ পর্যন্ত! তবে চেষ্টা করব। না পারলে এ অস্তিত্ব বিলীন করতে একটুকু দ্বিধা করব না। যে পৃথিবীতে তোমার স্পর্শ নেই, সেখানে আমিও নেই। ভালো থেকো।
ট্রেনের জানালায় যখন ট্রেনের লেজটাকে খুঁজে পেলাম, তখন মনে হলো শ্যামলী বুঝি আমার কামরায় উঠে এল। আমার পাশে বসে সে তার চিরায়ত ভঙ্গিতে কথোপকথন চালাতে লাগল। আমি চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে পড়ে রইলাম। ট্রেন ছুটে চলার শব্দ বারবার আমাকে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালাতে থাকল।
অলঙ্করণ: মোহাম্মদ আল সাঈদ






