নামের সঙ্গে দূরবর্তী কোনো লেখকের অস্তিত্ব যদি থেকে থাকে, তো তিনি ছিলেন ফের্নান্দো পেসোয়া। পর্তুগিজ ভাষায় পেসোয়া অর্থ ‘ব্যক্তি’ এবং আর যা-ই হোক এই জিনিসটাই তিনি হতে চাননি। ঘুরে ঘুরে গদ্য ও কবিতা— দুটি মাধ্যমেই কোনো ধরনের সুস্পষ্ট সত্তা হিসেবে অস্তিত্ব থাকার কথা অস্বীকার গেছেন ফের্নান্দো পেসোয়া। ‘নিজেকে জানতে শুরু করেছি আমি। আমার কোনো অস্তিত্ব নেই,’ একটা কবিতায় লিখছেন তিনি। ‘আমি যা হতে চেয়েছিলাম আর লোকে আমাকে যেমন করে তুলেছে, তারই ফারাক আমি... এটাই আমি। ব্যস।’
বছরের পর বছর কাজ করে গেলেও তার প্রধান রচনাটি প্রকাশ করা দূরে থাকুক, অসমাপ্ত কাল্পনিক দিনপঞ্জির চেহারায় তুলে ধরা প্রবচন এবং ভাবনাগুচ্ছের সংকলন দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট-এ পেসোয়া সেই চিন্তায় ফিরে গেছেন: ‘ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পর্কহীন এই ভাবনাগুলোর ভেতর দিয়ে আমিই আমার ঘটনাবিহীন আত্মজীবনী, আমার জীবনহীন ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক কথক। এগুলো আমার স্বীকারোক্তি, এগুলোয় আমি যদি কিছু না বলে থাকি, তার কারণ বলার মতো কিছু নেই আমার।’
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মহান রচনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এমন একটি সৃজনশীল রচনার বেলায় একে নৈরাশ্যময় ভিত্তি মনে হতে পারে। একজন লেখক যদি কিছুই না হন, তিনি যদি কিছুই না করেন এবং তার বলার মতো কিছুই না থাকে, তবে কি নিয়ে লিখতে পারেন তিনি? কিন্তু বলতে গেলে কোনো কিছু বাদেই মহাবিশ্বে রূপান্তরিত বিগ ব্যাঙের মতো পেসোয়ার কল্পনার বিপুল শক্তি কাজ করার ক্ষেত্রে খুবই সামান্য কাঁচামালের চাহিদার কথা তুলে ধরে। সত্যি বলতে, ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকের গিয়াকোমো লেপার্দি থেকে শুরু করে বিংশ শতকের স্যামুয়েল বেকেটের মতো ইউরোপীয় মহান লেখকদের স্বতন্ত্র ঘরানার সদস্য তিনি, যাদের কাছে বিনাশই ভাবনার বিষয়। সব সিদ্ধির ব্যর্থতা, নিঃসঙ্গতার আচ্ছন্নতা, বিষাদ যেভাবে জগত্-সম্পর্কিত আমাদের ধারণাকে রাঙিয়ে তোলে: পেসোয়ার প্রিয় ধারণা-সংক্রান্ত অন্তর্দৃষ্টিকে চড়া দামে কেনা হয়েছে, কিন্তু অন্য কোনোভাবে চাইতেন না তিনি। ‘কারো ব্যক্তিত্ব খুইয়ে সেটা খুঁজে পাওয়া— খোদ বিশ্বাসই এই ধরনের নিয়তির বোধে সায় জানায়,’ লিখেছেন তিনি।
পেসোয়ার নিয়তির বাস্তবতা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৮৮৮ সালে লিসবনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, তার সত্বাবাকে ডারবানে পর্তুগিজ কনসাল নিয়োগ করা হলে সাত বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। স্কুলে বিভিন্ন রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়ার ভেতর দিয়ে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। সারা জীবন ইংরেজিতেই কবিতা লিখে গেছেন। ১৯০৫ সালে আবার লিসবনে ফিরে আসেন ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য। অবশ্য দুই বছর বাদেই ছাত্র ধর্মঘটের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষিত হলে পড়াশোনা বাদ দেন পেসোয়া।
বাকি জীবন ব্যবসায়িক যোগাযোগে ফ্রিল্যান্স অনুবাদকের কাজ করে রুটিরুজির মাধ্যমে পড়াশোনা ও লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। তিনি বিয়ে করেননি এবং তার যৌনজীবন সম্পর্কে জীবনীকাররা নানা আঁচ-অনুমান করলেও ‘আমি ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের ভেতর ছিলাম না/একটা লিঙ্গকে অন্যটির উপরে জায়গা দিয়েছি,’ একটা কবিতায় লিখেছেন তিনি— সম্ভবত কুমার অবস্থাতেই মারা গেছেন। মাত্র দুটি সংখ্যা বেরোনো পর্তুগালে আধুনিকতার সূচনাকারী হিসেবে বিবেচিত বিখ্যাত একটি সাময়িকী ‘অরফিউ’সহ বেশকিছু সাহিত্যিক উদ্যোগে জড়িত ছিলেন তিনি। জীবদ্দশায় মাত্র একটি বই প্রকাশ করেছিলেন— ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত পর্তুগিজ ইতিহাসের প্রেরণায় রচিত কবিতার সংকলন দ্য মেসেজ। লিসবনের সাহিত্য জগতে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি, কিন্তু ১৯৩৫ সালে ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুর সময় তার নামে প্রধান কোনো সাফল্য ছিল না। একে তার জীবনের ‘জীবনহীন একটা ইতিহাস’ বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু ‘ইফ আই ডাই ইয়াং’ কবিতায় ভবিষ্যদ্বাণী করা অসাধারণ ভবিষ্যত্ পাওনা ছিল পেসোয়ার: ‘জমিনের গভীরে শিকড় লুকিয়ে থাকতে পারে/ কিন্তু সবার চোখের সামনে তাদের ফুলগুলো ফুটে ওঠে।/ তাই তো হওয়ার কথা। কোনো কিছুই একে ঠেকাতে পারে না।’ মৃত্যুর সময় তার জিনিসপত্রের ভেতর ছিল ২৫ হাজারেরও বেশি পাতার পাণ্ডুলিপি ভর্তি একটা ট্রাংক; প্রায় উন্মত্ততার কাছাকাছি ক্ষমতার সারা জীবনের সৃষ্টি। অন্যতম নেতৃস্থানীয় ইংরেজি অনুবাদক রিচার্ড জেনিথ যেমন লিখেছেন, ‘পেসোয়া আলগা কাগজে, নোট বুকে, খামের গায়ে, কিংবা হাতের কাছে পাওয়া যেকোনো টুকরো কাগজেই লিখেছেন।’
এখন পর্তুগালের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রাখা দলিলপত্রের ভাণ্ডারে পেসোয়াকে বর্তমান শতকের সেরা কবিতে পরিণত করার মতো যথেষ্ট মাস্টারপিসের অস্তিত্ব রয়েছে— প্রকৃতপক্ষেই, খুব সম্ভব লুই দে কামুর ষোড়শ শতকের জাতীয় মহাকাব্য ‘দ্য লুসিয়াদস’-এর পর সর্বসেরা। কাগজপত্রের ভেতর দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট গড়ে তোলা শত শত ভুক্তিও রয়েছে— কিন্তু বিশেষ কোনো ধারাক্রম বজায় না থাকায় পর্যায়ক্রমিক সম্পাদকদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করার সুযোগ করে দিয়েছে। পেসোয়ার মৃত্যুর প্রায় ৫০ বছর পরে ১৯৮২ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত জেরোনিমো পিসাররোর পর্তুগিজ ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে অনূদিত নতুন করে প্রকাশিত মার্গারেট জুল কস্টার তর্জমার নাম রাখা হয়েছে দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট: দ্য কমপ্লিট এডিশন (নিউ ডিরেকশন)। এটাই পেসোয়ার তারিখ ও অন্যান্য সূত্র থেকে যতদূর সম্ভব সবগুলো ভুক্তিকে সময়ানুক্রমিক ধারায় স্থান দেয়ার প্রয়াস পেয়েছে।
পেসোয়া আর্কাইভের আকার এবং বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি জটিলতার অন্য একটি বিভ্রান্তিকর মাত্রা রয়েছে: এটা এক অর্থে বহু লেখকের কাজ। পাণ্ডুলিপি এবং এমনকি ব্যক্তিগত চিঠিপত্রেও পেসোয়া নানা কাল্পনিক দ্বৈত সত্তাকে নিজের রচনার কৃতিত্ব দিয়েছেন, একে তিনি বলছেন ‘হেটারোনিমস’। পণ্ডিতরা এই ধরনের প্রায় ৭২টি নামের তালিকা করেছেন। গোড়ার দিকেই কাল্পনিক নামের প্রতি তার দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল: ছয় বছর বয়সে ফরাসি শেভালিয়ে দে পাস নামে চিঠিপত্র লিখেছেন তিনি এবং অচিরেই আলেক্সান্দার সার্চ এবং চার্লস রবার্ট আনোনের মতো ইংরেজ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু তার পরিণত রচনাগুলোয় ব্যবহার করা হেটারোনিমগুলো আরো বেশি রসিকতাপূর্ণ সাংকেতিক নামের চেয়ে বেশি কিছু। নিজস্ব জীবনী, দর্শন, সাহিত্যিক ধরনসহ পূর্ণাঙ্গ চরিত্র তারা। পেসোয়া এমনকি তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ও কল্পনা করেছেন এবং পরস্পরের রচনা সম্পর্কে মন্তব্য করার সুযোগ দিয়েছেন। তার দাবি মোতাবেক তিনি যদি ফাঁকা হয়ে থাকবেন, সেটা শূন্যতার ফাঁক নয় বরং মঞ্চের, যেখানে এসব বিভিন্ন সত্তা দেখাসাক্ষাত্ করতে পারে।
পেসোয়ার কবিতায় এই হেটারোনিমগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নিজের নাম স্বাক্ষর করা কবিতার পাশাপাশি তিনি প্রকৃতির অশিক্ষিত সন্তান হিসেবে আলবার্তো কেইরো নামে; ধ্রুপদী প্রকরণ ও ভাবনায় নিবেদিত বিষণ্ন ডাক্তার রিকার্দো রেইস নামে; এবং ওয়াল্ট হুইটম্যানের ভক্ত নেভাল ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশ্বপর্যটক আলভারো দে কাম্পোস নামেও লিখেছেন। এই প্রতিটি সত্তাকে পেসোয়ার নিজের জন্ম বছরের আশপাশে একটি করে জন্মদিন জোগানো হয়েছে এবং তাদের কিংবদন্তিগুলো পরস্পর সম্পর্কিত: পেসোয়া একবার একটা অনুচ্ছেদ লিখেছেন, যেখানে ক্যাম্পোস রেইস কীভাবে কেইরোর পাঠ শুনে মৌলিকভাবে বদলে গিয়েছেন, তার ব্যাখ্যা জুগিয়েছে।
সাধারণত আমরা গুরুত্বপূর্ণ কবিদের ভিন্ন স্টাইল, একজন চিত্রশিল্পী যেভাবে তার তুলির আঁচড়ের কারণে শনাক্ত হয়ে থাকেন, তেমনিভাবে তাদের পরিচিত করে তোলা লেখার ভঙ্গি থাকবে বলে আশা করি। কিন্তু আপন সত্তার বিভাজন পেসোয়াকে একসঙ্গে অন্তত চারটি স্টাইল পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বনামে লেখার সময় পেসোয়া তীর্যক, আধিবিদ্যিক, আবেগপ্রবণ:
নিথর পুকুরের কথা ভাবি আমি
মৃদু হাওয়ায় যার জল কেঁপে ওঠে।
আমি কি সব কিছু নিয়ে ভাবছি
নাকি সবকিছু আমাকে ভুলে গেছে?..
এদিকে সুশৃঙ্খল স্তবকে জীবন এবং ভালোবাসার পলায়নপরতা নিয়ে ভাবিত রেইস অনেকটা হোরেস কিংবা ক্যাটালাসের মতো শোনায়:
যেন প্রতিটি চুম্বন
বিদায়ের চুম্বন,
এসো ভালোবেসে চুম্বন করি আমরা।
সম্পূর্ণ উল্টোদিকে থাকা ক্যাম্পোস সহজে উত্তেজিত হওয়ার মতো ভবিষ্যদ্বাণী, আধুনিকতার শক্তি ও গতিতে ঝলমল করছেন:
আমার সকল বোধ হিসহিস করে এবং সমস্ত ধূমায়িত রোমকূপ নিয়ে
ভীষণ সর্বেশ্বরবাদী উন্মাদনা
সবই একটিমাত্র গতি বাদে কিছু নয়, একক শক্তি, এক ঐশ্বরিক ধারা
খোদ এটা থেকে এবং এতেই, উন্মত্ত গতির রুদ্ধতা এবং বচসা।
এবং তারপর রয়েছেন বিশের কোঠার মাঝামাঝি বয়সে কথিত যক্ষ্মায় প্রাণ হারানো কেইরো। অন্য হেটারোনিমদের ‘গুরু’ হিসেবে শ্রদ্ধেয়, বিমূর্ত ধারণাকে পাশ কাটিয়ে সহজ ভাষায় কবিতা লিখেছেন এবং প্রায় জেনসুলভ (Zen) প্রজ্ঞার চেতনায় স্বাভাবিক জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকেছেন:
আমি ভালো নই বলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই
কিন্তু ফুল আর আপন পথে বয়ে যাওয়া নদীর
স্বাভাবিক অহমবাদ আছে
অজান্তেই কেবল তাদের ফোটা আর
বয়ে যাওয়া নিয়েই ভাবিত।
বহু পাঠকের কাছে জটিল কিংবদন্তি নিয়ে হেটারোনিমগুলো পেসোয়ার আবেদনের একটা বিরাট অংশ: অন্য পাঠকরা তাদের অপ্রয়োজনীয় ও দুর্বহ অঙ্গ ভাবতে পারেন। কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে তাকে প্রধান আধুনিকতাবাদীতে পরিণত করা অন্যতম উপাদান। অস্কার ওয়াইল্ডের ‘মুখোশের সত্যি’তে বিশ্বাসী কবিদের একটি প্রজন্ম এটি। জে. আলফ্রেড প্রুফ্রোকের চেয়ে কখনই বেশি এলিয়টীয় ছিলেন না টিএস এলিয়ট। পেসোয়ার সঙ্গে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জন্ম লাভ করা দুজন কবিরই জৌলুস, সাধারণের প্রতি বিতৃষ্ণা, নৈর্ব্যক্তিকতার প্রতি এক ধরনের নীতিগত সংশ্লিষ্টতা এবং দুঃখের বিকাশ ঘটানোর ঝোঁঁক ছিল।
পেসোয়া অবশ্য এক ধরনের ইচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতা তৈরি করার চেয়েও বহুদূরে অগ্রসর হয়েছেন। ‘হাউ টু ড্রিম মেটাফিজিকস’ শিরোনামে দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট-এর একটা অংশে সচেতনতাকে অদৃশ্য করার পদ্ধতি জুগিয়েছেন তিনি, কঠোরতার দিক থেকে যা আত্মসম্মোহনের ম্যানুয়াল কিংবা ধর্মীয় আচারগুচ্ছের সঙ্গে মিলে যায়। প্রথম রয়েছে উপন্যাস পড়া, তোমাকে যা বাস্তব জগতের চেয়ে কাল্পনিক জগতের ব্যাপারে বেশি যত্নশীল হওয়ার তালিম দেবে। তারপর আসছে তোমার কল্পনাকে দৈহিকভাবে অনুভব করার ক্ষমতা যেমন— ‘ইন্দ্রিয়পরায়ণ’ কারো উপন্যাসে স্খলন ঘটার মুহূর্তে সেই অভিজ্ঞতা পাওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। সবশেষে, আরো বেশকিছু পর্যায়ের পর আসছে, পেসোয়া যাকে বলছেন, ‘স্বপ্ন দেখার সর্বোচ্চ স্তর’: ‘কতগুলো চরিত্র তৈরি করার পর আমরা একই সঙ্গে সেগুলোয় বেঁচে থাকি— আমরা যৌথ এবং পারস্পরিকভাবে ওইসব আত্মা।’ এটা অবশ্যই তিনি অর্জন করেছিলেন এবং একদিক থেকে কথাটা আত্মবিলোপের মতো শোনালে অন্যদিকে এটা আত্ম-অর্চনার মতো: ‘আমি ঈশ্বর,’ শেষ হয়েছে ভুক্তিটি। হাজার হোক, আপনার কল্পনা যদি জগেক ভরিয়ে তোলার মতো শক্তিশালী হতে পারে, তাহলে বাস্তব মানুষের অস্তিত্বের কোনোই দরকার নেই।
দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট যেমন প্রকাশ করছে, এই ধরনের আত্মজ্ঞানবাদ পেসোয়ার পক্ষে এক বিরাট প্রলোভন ছিল। গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি যেসব উপাদান বেছে নিয়েছিলেন, সেগুলো দুটি পর্যায়ে লেখা হয়েছিল, প্রতিটি তার কবিতায় প্রাধান্য বিস্তারকারী চারটি চরিত্র থেকে ভিন্ন নিজস্ব হেটারোনিম দিয়ে। ১৯১৩ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ের রচনাগুলোর জন্য তিনি ভিনেন্তে গেদেকে কৃতিত্ব দিয়েছেন, ভূমিকাংশে ‘তিরিশের কোটার বয়সী, হালকাপাতলা, বেশ লম্বা, বসে থাকা অবস্থায় দাঁড়ানো অবস্থা থেকে ঢের বেশি কুঁজো মনে হওয়া পুরোপুরি অসচেতনভাবে অবহেলাভরে পোশাক পরা একজন মানুষ হিসেবে তাকে বর্ণনা করেছেন তিনি। অনুচ্ছেদটি গেদের সংযম, বিষণ্নতা, বুদ্ধিমত্তা এবং আপাত তাত্পর্যহীনতা তুলে ধরেছে— অবশ্যই স্রষ্টার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়া সব গুণ। এভাবে পেসোয়া যখন দ্য বুক অব ডিসকোয়য়েটকে ‘কখনো অস্তিত্ব ছিল না এমন কারো আত্মজীবনী’ হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন যুগপত্ এক ধরনের বাস্তব সত্যি (গেদে বলে কেউ কখনো ছিলেন না) উচ্চারণের পাশাপাশি কাব্যিক স্বীকারোক্তিও করছেন: জগত্ যাকে পূর্ণাঙ্গ জীবন মনে করে, সেই জীবন কখনো ভোগ করেননি তিনি।
বিশের দশকে পেসোয়া বইটিকে এক পাশে সরিয়ে রেখে অকাল্টিজম এবং জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি সারা জীবনের মুগ্ধতা নিয়ে কবিতায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালে আবার এটির কাছে ফিরে এলে লেখককে নতুন করে কল্পনা করেন তিনি। এখন তা লিসবনের একটা কাপড় কোম্পানির সহকারী হিসাবরক্ষক বার্নার্দো সোরসের রচনা হওয়ার কথা। সোরসও আধ্যাত্মিকভাবে পেসোয়ার স্বগোত্রীয় ছিলেন: প্রকৃতপক্ষে, পেসোয়া লিখেছেন যে, তিনি কেবল ‘আধা-হেটারোনিম,’ কারণ ‘তার ব্যক্তিত্ব, যদিও আমার নিজস্ব নয়, আমার থেকে ভিন্নও নয়, বরং স্রেফ এর বিকৃতি।’ সোরস তার পূর্বসূরি গেদের চেয়ে ঢের বেশি পূর্ণাঙ্গভাবে কাল্পনিক চরিত্র। এমনভাবে কর্মক্ষেত্র রুয়া দোস দুরাদোর্সে নিজের মহল্লা বায়াক্সা এবং বস ভাসকেস সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন, যা বইটির দ্বিতীয় পর্যায়কে অনেক বেশি উপন্যাসসুলভ বোধ দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, রিচার্ড জেনিথ সম্পাদিত দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট-এর পেঙ্গুইন ক্লাসিক সংস্করণটি এক ধরনের মিনিয়েচার বয়ানসহ পাঠকের প্রবেশকে মসৃণ করে সূচনার কাছাকাছি এমন বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদকে স্থান দিয়েছে।
নতুন সংস্করণের সময়ানুক্রমিক পদ্ধতি যেকোনো ধরনের বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসকে নিরুদ্ধ করেছে, ফলে বইটি আগেরগুলোর তুলনায় কম বোধগম্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্বলতম উপাদানে শুরু হওয়া এর আংশিক কারণ, যখন পেসোয়া মাত্র ২৫ বছর বয়সে ফরাসি প্রতীকীবাদ ও আঠারশ উনিশ দশকের ডিকাডেন্ট আন্দোলনে প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন (পর্তুগাল যেন প্যারিস ও লন্ডনের সাহিত্যিক কাল থেকে এক প্রজন্ম পেছনে ছিল)। ‘আমার আত্মা এক গুপ্ত অর্কেস্ট্রা,’ প্রথম ভুক্তি বলছে। ‘জানি না কোন যন্ত্র, কোন বেহালা আর সেতার, ঢোল আর টাম্বুর আমার ভেতর লড়ছে। নিজেকে কেবল এক সিম্ফনি হিসেবেই জানি আমি।’
এই অনুচ্ছেদটি রচনার প্রথম অংশ জুড়ে প্রাধান্য বিস্তার করা সাবলীল কবিতার স্বর স্থির করে দিয়েছে। কোনো কোনো ভুক্তির ‘লিটানি অব ডিসপেয়ার’ কিংবা ‘অ্যান অ্যায়েসথেটিকস অভ অ্যাবডিকেশন’-এর মতো ভারী শিরোনাম রয়েছে। অন্যগুলো আকাশ ও ল্যান্ডস্কেপের ইম্প্রেশনিস্টিক স্কেচের সমাহার। যেমন— রেইনি ডেতে আছে: ‘আকাশ গুপ্ত হলুদ, নোংরা শাদার ভেতর দিয়ে দেখা ফিকে হলুদের মতো।’ অর্ধেক ভার্জিন মেরি আর অর্ধেক বেলে ডেইম স্যান্স মার্সির মতো নামহীন নারীদের নিয়ে বিকৃত স্বপ্ন-কল্পনা রয়েছে: ‘তুমিই একমাত্র রূপ, যা ক্লান্তি বিকিরণ করে না, কারণ তুমি আমাদের অনুভূতির সঙ্গে বদলে যাও, কারণ আমাদের আনন্দকে চুম্বন করার সময় তুমি স্বস্তিদায়ী আফিম আর বিশ্রাম বয়ে আনা ঘুম আর আমাদের বুকের ওপর আলগোছে হাত ভাঁজ করে থাকা মরণ।’
দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট-এ কেবল এটুকুই থাকলে সেটা আধুনিক মাস্টারপিস না হয়ে একটা টাইম ক্যাপসুলে পরিণত হতো। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধের অবক্ষয়ের প্রথা থেকেই আধুনিকতাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছে; এবং পেসসাওয়ার রচনায় ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দীতে উত্তরণের ক্রান্তিকালটুকু মোহনীয়ভাবেই দৃশ্যমান। সময়ের মূল্যবোধগুলোর অসঙ্গত রদকে ভিত্তি করে অবক্ষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল: কঠোর পরিশ্রম এবং নৈতিক আন্তরিকতার জায়গায় ওয়াইল্ড এবং হোরস-কার্ল হাইসম্যানদের মতো লেখকরা কল্পনানির্ভর আলস্য এবং উসকানিমূলক বৈপরীত্যের উন্নতি ঘটিয়েছেন। তরুণ পেসোয়ার দ্বিধা এবং প্রত্যাহারকে এক ধরনের শৈল্পিক গুণের দিকে নিয়ে যাওয়ায় তার পক্ষে এই বাণী অনুরণিত হয়েছে: ‘কখনই জোরালো চেষ্টা করিনি আমি,’ ১৯১৫ সালের একটি ভুক্তিতে লিখছেন তিনি। ‘সৌভাগ্য, চাইলে এসে আমাকে খুঁজে নিতে পারে। আমি খুব ভালো করে জানি যে আমার সর্বোচ্চ প্রয়াসগুলো অন্যরা যেভাবে উপভোগ করে, সেভাবে সাফল্যের মুখ দেখবে না।’
অবশ্য বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং বিশেষ করে দ্য বুক অক ডিসকোয়ায়েট-এ ফিরে আসার পর এই সাহিত্যিক অবস্থানকে পেসোয়া আরো জোরালো ও তীক্ষধার করে তোলেন। এক ধরনের আধিবিদ্যিক নাস্তিবাদে পরিণত হয় তা, যেখানে শিল্পী যে মহাসত্যি জানাতে চান, সেটা হলো কিছুই এসে যায় না। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলঙ্কারিক মহিমাসহ গেদেকে বাদ দিয়ে কোনো ধরনের জৌলুসের ঘাটতি থাকা সোরসের মাধ্যমে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রকৃতপক্ষেই ভাড়া করা জীর্ণ কামরা আর একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ নিয়ে সোরস যতদূর সম্ভব একজন সাধারণ— যে ধরনের ব্যক্তির কাছ থেকে একজন নান্দনিকতাবাদী দূরে সরে যাবে বা স্রেফ খেয়ালই করবে না। ‘দ্য ওয়েইস্ট ল্যান্ড’-এর এলিয়ট লন্ডন ব্রিজের ওপর দিয়ে সোরসের মতো লোকদের ভেসে যেতে দেখেছেন, তাদের এরই মধ্যেই মৃত মনে করেছেন তিনি: ‘ভাবতে পারিনি মৃত্যু এত মানুষকে ধ্বংস করেছে।’
অবশ্য পেসোয়ার পক্ষে চূড়ান্ত বৈপরীত্য হলো জীবন্ত মৃৃতরাই মানুষের অস্তিত্বের সেরা দৃষ্টিকোণ জোগায়। আপনি যদি সোরসকে একটিমাত্র শব্দে বর্ণনা করতে চান, সেটা হবে ‘অপ্রতারিত’, কারণ তার কোনো চাহিদা নেই, সবকিছু ভেদ করে দেখতে পান তিনি। ‘হ্যাঁ, এটাই একঘেয়েমি: আত্মার নিজেকে প্রতারিত করার ক্ষমতা খোয়ানো,’ লিখছেন পেসোয়া। বুক অব ডিসকোয়ায়েট-এ তাকে মুগ্ধ করতে ব্যর্থ জিনিসগুলোর ভেতর রয়েছে ভ্রমণ (‘ভ্রমণের চিন্তাই আমাকে দৈহিকভাবে অসুস্থ করে ফেলে’), রাজনীতি (‘সব বিপ্লবী সব সংস্কারকের মতোই নির্বোধ’) এবং ভালোবাসা (‘অমন কিছু করার মতো ধৈর্য কিংবা মনোযোগের কোনোটাই আমার নেই’)। পেসোয়ার রচনায় লক্ষণীয়ভাবেই রাজনীতি অনুপস্থিত: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জুড়ে এবং ফ্যাসিস্ট শাসকদের ক্ষমতায় নিয়ে আসা পর্তুগালের বেশকিছু রাজনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে বাস করলেও প্রবলভাবে নিজের বিবেচনা থেকে এসব বিষয়কে বাদ দিয়েছেন। স্রেফ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করেই যেন সুখী মনে হয়েছে তাকে এবং বহু ভুক্তিতে সূর্য, আর আকাশ, মেঘ আর বৃষ্টির কোমল বর্ণনা ধারণ করেছে।
এই নিরাসক্তিকে কাজের ক্ষেত্রে পেসোয়ার ঢেলে দেয়া প্রয়াস ও নৈপুণ্যের সঙ্গে মেলানো কঠিন। কিছুই যদি করার না থাকে, ২৫ হাজার পাতা লিখতে যাওয়া কেন? সময়ে সময়ে ভাবনা ও লেখালেখি স্রেফ সময় কাটানোর একটা কায়দা বলে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি— হাতের বেলায় সূচিকর্মের মতোই মনের একটা কাজ, ‘ইমপ্যাসিভলি’ কবিতায় যেমনটা বলছেন:
আমার কুশিকাটা আছে
আমার চিন্তা শুরু করার সময় থেকেই আছে ওটা
ফোঁড়ের পর ফোঁড় কিছু ছাড়াই সমগ্রকে গড়ে তুলছে...
একটা কাপড় এবং আমি জানি না ওটা পোশাকের জন্য, নাকি কিছুই না।
চিন্তাকে যদি সক্রিয়তার অনুপস্থিতি মনে করা হয়, তো একে জীবনের প্রত্যাখ্যান বলেই মনে হতে পারে। দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট একঘেয়েমি, অনুতাপ আর হতাশার প্রকাশে ভরপুর। একই সময়ে অবশ্য পেসোয়া বিশ্বাস করেছেন যে চিন্তাই সবসেরা অ্যাডভেঞ্চার, যেকোনো সম্ভাব্য অ্যাকশনের চেয়ে ঢের বেশি উন্নত। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের যেহেতু নিজস্ব ধ্যানধারণা ছাড়া জগতে প্রবেশাধিকার নেই, তাই ঠিকভাবে বলতে গেলে জগতে সক্রিয়তা অপ্রয়োজনীয়। কল্পনা করতে পারলে কেন কিছু করতে যাবেন? এভাবে কেরানি সোরস চরম অভিজাতে পরিণত হচ্ছেন, সাফল্য ও মর্যাদার মতো ব্যাপারগুলোর যার কোনো দরকার নেই, কারণ নিজেকে তিনি তাদের চেয়ে ঢের বেশি উন্নত মনে করছেন। ‘একজন মানুষ মর্যাদার দিক থেকে যত উপরে ওঠে, ততই বেশি বেশি তাকে বর্জন করতে হয়। পাহাড় চূড়ায় কেবল একজন মানুষেরই জায়গা থাকে,’ নিটশের জরাথ্রুস্টের মতো বলছেন সোরস। লেখালেখি একাধারে এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ও প্রমাণ: ‘সাহিত্য... আমার কাছে মানুষের প্রয়াস চালিত হওয়ার মতো লক্ষ্য বলে মনে হয়।’
আত্মঘৃণা ও আত্মপ্রমোদের মাঝে এই দোলাচলে দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েটকে মৌলিকভাবে উন্মত্ত হতাশাজনক মহাকাব্য বলে মনে হতে পারে। পেসসাওয়ার সাফল্য, ইচ্ছাকৃত কিংবা ঘটনাক্রম যা-ই হোক, দেখিয়ে দেয় যে আত্মজ্ঞানবাদে কেমন করে বিশেষ ধরনের দুর্দশার শিকড় লুকিয়ে থাকে— সত্তার বাইরে কিছুই না থাকার বিশ্বাস, যেন মন কখনই তার অভিজ্ঞতার কারণে সত্যিকার অর্থে প্রভাবিত হতে না পারে। ‘বিচ্ছিন্নতা হলো মুক্তির সম্ভাবনা,’ শেষ ভুক্তিতে লিখেছেন তিনি। ‘তুমি একাকী থাকতে না পারলে, তার মানে ক্রীতদাস হয়ে জন্ম নিয়েছ।’ শেষ পর্যন্ত পেসোয়াও একাকী থাকতে পারেননি; নিজেকে বানোয়াট হেটারোনিমের সঙ্গ দিয়েছেন, বাস্তব মানুষের বিপরীতে যারা সব সময় তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কেবল মৃত্যুই তাদের এবং তাকে তার কল্পনার জোরালো বাঁধন থেকে মুক্তি দিতে পারে।
[কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুইশ স্টাডিজে এমএ কর্মসূচির পরিচালক অ্যাডাম কার্চসের রচনা অবলম্বনে।]






