জাতে ইংরেজ কিন্তু জন্ম ভারতের আলমোড়ার, ১৩ মে ১৮৫৭ সালে; কোম্পানি রাজের বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহের সেই টালমাটাল বছরে। গাট্টাগোট্টা গুঁফো চেহারার এ ফৌজি ডাক্তার সার্জন মেজর রোনাল্ড রস লন্ডনের নামকরা হাসপাতাল থেকে পাস করে ভারতে ইংরেজ ফৌজের মেডিকেল সার্ভিসে ঢুকেছেন।

স্বভাবে আমুদে, হইচই আর গলফ খেলার প্রচণ্ড ভক্ত। ডাক্তার সাহেব কিন্তু নিয়মকানুনের তেমন ধার ধারেন না। তাই ব্রেকফাস্টের টেবিলে একটু হুইস্কি পানে আপত্তি নেই। গোড়ার দিকে মশা নিয়ে গবেষণার কোনো আগ্রহই ছিল না তার। এ দেশের প্রযুক্তি দুর্বল পরিবেশ ও উন্নত ল্যাবরেটরিবিহীন কর্মস্থল আর ফৌজি চাকরির নিয়মিত ঠাঁই বদলের ঝামেলা কাটিয়ে ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণায় তিনি সফল হবেন, এমনটি অনেকেই ভাবতে পারেননি। গবেষণায় তেমন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকও তার হাতের কাছে ছিল না। শুধু তার গুরু ড. ম্যানসন সুদূর লন্ডন থেকে চিঠি মারফত মাঝে মধ্যে তাকে পথ দেখিয়েছেন। তখন কি ড. রসের মনে হয়েছিল যে, তিনি শুধু সফলই হবেন না, অতি অল্প সময়ের মধ্যে তার গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার (১৯০২) হাতে এসে যাবে? উল্লেখ্য, মশা নিয়ে গবেষণা ভারতের অনেক ফৌজি শহরে করলেও তার চূড়ান্ত ও শেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল বাংলায়— কলকাতায়। এ নোবেলজয়ী সাহেবের নাম যে রোনাল্ড রস, তা বাংলাদেশের প্রাইমারি শিক্ষার্থীরাও জানে। তবে রস কিন্তু ম্যালেরিয়া রোগ আবিষ্কার করেননি। ম্যালেরিয়ার সে সময়ের বিখ্যাত ওষুধ কুইনাইনও তার আবিষ্কার নয়। রসের জন্মের বহু আগে কুইনাইন বের হয়ে গেছে।

তাহলে কী আবিষ্কার করেছিলেন ড. রস, যার ফলে তার নোবেলপ্রাপ্তি? রসের কৃতিত্ব মশা কীভাবে প্রাণীর দেহে ম্যালেরিয়া ছড়ায়, তা প্রমাণসহ আবিষ্কার করা। একই সঙ্গে ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট বা পরজীবীর জীবনচক্র, সাদা বাংলায় ঠিকুজি-কুলুজি সঠিকভাবে নির্মাণ করার কৃতিত্বও তার। রসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ম্যালেরিয়ার মহামারী রূপের সম্যক বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক মডেলের উদ্ভাবন করা, যার কারণে ম্যালেরিয়া দমন সহজতর হয়ে ওঠে। আর এ উদ্ভাবনের জন্যই কয়েক বছর পর ফিজিওলজিতে নোবেল পান তিনি।

রস সাহেব কীভাবে তার গুরুর কৃপায় ম্যালেরিয়া আর মশায় আগ্রহান্বিত হলেন, সে কাহিনী বলার আগে বঙ্গজীবনে মশা ও ম্যালেরিয়ার তাণ্ডব নিয়ে দু-চারটি কথা বলা আবশ্যক। তা না হলে মানবজাতির কল্যাণে রসের যুগান্তকারী আবিষ্কারের যথাযথ মূল্যায়ন হবে না।

হাল আমলে ম্যালেরিয়ার চেয়ে মশার কামড়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আক্রমণে বিপর্যস্ত বাঙালি। কিন্তু যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জন্মেছে, তাদের অনেকের স্মৃতি থেকে সেই সময়ের ম্যালেরিয়ার মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়ার করাল দৃশ্য এখনো মুছে যায়নি। তখন ম্যালেরিয়ার তেমন উপযুক্ত প্রতিষেধক ছিল না, মশক দমনের বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কেও মানুষের জ্ঞান ছিল সীমিত। তবু বাঙালি মশার সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের প্রাণশক্তির পরিচয় দিয়েছিল। নিজের বিদ্যাবুদ্ধি অথবা সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে ম্যালেরিয়া জ্বরের মোকাবেলা করেছিল। এ জ্বর নিয়মিত বিরতি দিয়ে অর্থাত্ পালা করে আসত বলে এর নাম লোকের মুখে হয়েছিল পালাজ্বর।

ম্যালেরিয়ার হাড় কাঁপানো জ্বর কখন আসে, জ্বরের সময় কীভাবে লেপ দিয়ে রোগীকে চেপে ধরতে হয়, রোগীর হাড় মড়মড়ানি কোন টোটকায় বন্ধ করা যায়— এসব কখনো ডাক্তার-কবিরাজের কাছ থেকে শিখতে হয়নি। স্রেফ জন্মসূত্রেই সেই সময়ের ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত এলাকার প্রতিটি বাঙালি শিখে নিয়েছিল, মশা কী এবং ম্যালেরিয়া রোগটা কী? নিয়তির হাত ধরেই যেন মশার সঙ্গে বাঙালির ওঠাবসা, ঘরসংসার করা।

দিনে কিংবা রাতে, শহর কিংবা গ্রামে, বস্তির একচিলতে ঘর কিংবা বহুতল বাড়ির ১৬ তলায় প্রশস্ত ফ্ল্যাট— সর্বত্র মশা এখন সাক্ষাত্ কালান্তক। ‘দিনে মাছি, রেতে মশা/ এই নিয়ে বেঁচে আছি’— কথাটা বোধহয় এখন আর তেমন প্রযোজ্য নয়। সব মশাই নিশাচর নয়। এডিস মশার লেডিস বাহিনী দিনেও শিকার ধরতে পারঙ্গম। তবে অধিকাংশ মশাই সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁক বেঁধে লোকালয়ে হানা দেয়। কিছু আবার পুরোপুরি গৃহপালিত। দিনের বেলায় ঘরের মধ্যে অপেক্ষাকৃত অন্ধকার জায়গা, জামাকাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মশা সন্ধ্যা হলেই ছড়িয়ে পড়ে সারা বাড়িতে। দুটি ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যায় এক কিলোমিটারের মধ্যে যেকোনো এলাকায়। বাসে চেপে পৌঁছে যায় শহরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা কিংবা লিফটে চেপে ২০ তলার ওপর।

মশা যেন এখন সাক্ষাত্ ভয়ঙ্করী। আসলে পুরুষ মশা মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীকে কামড়ায় না; স্ত্রী মশাই মানুষ কিংবা অন্য প্রাণীকে কামড়ায়। স্ত্রী মশা কিন্তু রক্ত খায় না, নিজেদের বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনেই ওরা রক্ত শোষণ করে। আর মানুষের রক্ত মশার ডিম্বাশয়ের পক্ষে সবচেয়ে কার্যকর। এসবের কামড়েই ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার এমন রমরমা আমাদের দেশে।

ম্যালেরিয়া নামটি হাল আমলের হলেও রোগটি যে অতি প্রাচীন, তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন পরপর ফিরে আসা এ ধরনের জ্বরের বিবরণ প্রাচীন অ্যাসিরীয়, চীন ও ভারতীয় চিকিত্সা গ্রন্থে পাওয়া যায়। ভারতের রোগবালাইয়ের ইতিহাসে ম্যালেরিয়া নতুন কিছু ছিল না। প্রথমদিককার জ্বরের একাধিক উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থ অথর্ব বেদে, সংস্কৃতে লেখা এ শাস্ত্র খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর আগে রচিত বলে ধরা হয়। এ গ্রন্থে জ্বরের ধরন হিসেবে সুস্পষ্টভাবে পালা করে আসা-যাওয়ার কথা উল্লিখিত হয়েছে: প্রাথমিক জ্বর, তারপর একদিন পরপর জ্বর, তারপর জ্বরের প্রকোপ দেখা দেবে তৃতীয় দিন পার হয়ে চতুর্থ দিনে। শুধু তাই নয়, এ গ্রন্থে কোন কোন মৌসুমে জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তাও বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন: শীত, গ্রীষ্ম, আর বর্ষাকাল। আর যেসব অঞ্চলে বৃষ্টির জল জমে থাকে এবং প্রচুর ঘাস জন্মে, সেই এলাকায় এ জ্বরের আক্রমণ বেশি। এ গ্রন্থে জ্বরের প্রাদুর্ভাবের জন্য বিশেষ করে গান্ধারিয়া (পেশোয়ার জেলা ও হোতি মর্দান), আঙ্গা (ভাগলপুর) ও মগধ (বিহার জেলা) অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যে কারণে ভারতে শতাব্দীর পর শতাব্দী পালাজ্বর এক সাধারণ রোগ হিসেবেই পরিগণিত হয়ে এসেছে। অথর্ব বেদে মশাকে উল্লেখ করা হয়েছে মাক্কা বলে, প্রাচীন সংস্কৃতে এ মাক্কাই মাছকা, অর্থাত্ মশা। আর ইংরেজির মসকিউটো শব্দের উত্পত্তিও এ শব্দ থেকেই। প্রাচীন ভারতের চিকিত্সক চরক ও সুশ্রুত আয়ুর্বেদিক পর্বে এ ধরনের পালা করে ফিরে আসা জ্বরের কথা উল্লেখ করে গেছেন।

কাজেই খানিক বিরতি দিয়ে ফিরে ওই জ্বরকে ম্যালেরিয়া বলেই সন্দেহ করা হয়। ওই পালাজ্বরই যে আজকের ম্যালেরিয়া, তা নির্ভুলভাবে চিনে নেয়ার মতো বর্ণনা রয়েছে আজ থেকে খ্রিস্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে গ্রিক চিকিত্সক হিপোক্রেটস দ্বিতীয়র লেখায়, যেখানে ম্যালেরিয়ার কিছু বিষম প্রতিক্রিয়ার উল্লেখও রয়েছে। এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে রোমের চিকিত্সকরাও কিছু তথ্য সংযোজন করেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেমন— ইতালি, হল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি জায়গায় পানি নিষ্কাশনের পদ্ধতি, বিশেষ করে কৃষিভূমির জমা জল সরানোর ব্যাপারটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এর মূল কারণ হয়তো ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে জলাভূমির সংযোগ লক্ষ করে জ্বরের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। এ প্রসঙ্গে গ্যালেনের নামও এসে যায়। তিনিও বহু শতবর্ষ আগে পরামর্শ দিয়েছিলেন বদ্ধ জলাশয়গুলোয় খাল কেটে ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে। অর্থাত্ তার একটা আবছা ধারণা হয়েছিল ম্যালেরিয়া কোথায় কীভাবে ছড়াতে পারে।

১৬৫০ সালে সেবাস্তিয়ান বাদো নামে একজন চিকিত্সক ঘোষণা করেন, সিনকোনা ছাল মানবজাতির জন্য সোনা-রুপার চেয়েও মূল্যবান, দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনিয়ার্ডরা এ মহামূল্যবান গাছের সন্ধান পেয়েছে। সিনকোনার ছাল লাতিন আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে বহুযুগ ধরেই ব্যবহার হয়ে আসছে। পেরুর স্প্যানিশ জেসুইট মিশনারিরা (১৬২০ ও ১৬৩০ সালে) স্থানীয়দের কাছ থেকে এ ছালের চিকিত্সা জ্ঞান লাভ করেন। মূলত লোক্সায় একজন জেসুইট ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হলে স্থানীয়রা তাকে সিনকোনা ছালের চিকিত্সায় সুস্থ করে তোলে। তখন পর্যন্ত মিশনারিরা একে লোক্সা বার্ক বলে উল্লেখ করছেন। লোক্সা বর্তমান ইকুয়েডরের লোহা প্রদেশ। এর অবস্থান বর্তমান পেরুর দক্ষিণ সীমান্তে। ১৬৩০ সালে কাউন্টেস অব সিনকন (মতান্তরে সিনকোনা) মাত্র ইউরোপ থেকে এসেছেন, নতুন ভাইসরয়ের স্ত্রী। পেরুর লিমায় পা দিয়েই তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়লেন, কাউন্টেসের জীবন রক্ষায় এগিয়ে এলেন জেসুইট পাদ্রিরা। প্রচুর পরিমাণে লোক্সা ছালে জীবন বাঁচল কাউন্টেসের। চিকিত্সার জন্য আনা উদ্বৃত্ত কিছু ছাল তিনি বিতরণ করলেন ম্যালেরিয়া আক্রান্ত আরো কিছু রোগীকে। কখনো নিজে, কখনো জেসুইট পাদ্রিদের দিয়ে। ১৬৪০ সালে কাউন্টেস স্পেনে ফিরে এলেন এবং তার হাত ধরে লোক্সা বা সিনকোনা ছাল প্রথম ইউরোপে প্রবেশ করল।

&dquote;কলকাতার

তারপর জেসুইট পাদ্রিদের এ আবিষ্কার শিগগিরই ‘জেসুইট পাউডার’ জ্বরের ওষুধ হিসেবে সারা ইউরোপে ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। প্রথমে সব জ্বরের বিরুদ্ধেই এটি প্রয়োগ করা হয়। পরে দেখা গেল, জলা জায়গায় এক বিশেষ ধরনের জ্বরেই কেবল এ ওষুধ কার্যকরী হচ্ছে। ইতালীয়রা এ জ্বরের নাম দিল ম্যাল-এরিয়া, যা থেকে ম্যালেরিয়া শব্দটি এসেছে। ম্যাল অর্থ খারাপ, এরিয়া বলতে বোঝায় বাতাস। পুরো অর্থটি হলো খারাপ বাতাস। ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কার হয়ে গেলেও তখন পর্যন্ত ম্যালেরিয়ার পরজীবীকে শনাক্ত করা যায়নি। মশাকে ম্যালেরিয়ার আসামি করতে বড় বড় বিজ্ঞানীর আরো বহু বছর লেগে গেল। পেটের পিলে বড় হওয়াকে ম্যালেরিয়া জ্বরের লক্ষণ বলে শনাক্ত করা হয়। ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ আর্মি এক কমিশন গঠন করে ম্যালেরিয়ার কারণ নির্ধারণে। ১৮৪৮ সালে এ কমিশনের সদস্য ডেম্পস্টার মোটামুটিভাবে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের কারণ, অল্প কিছু প্রতিরোধের উপায় নির্ধারণ এবং মশাবাহিত এ রোগ কীভাবে ছড়ায়, তার বর্ণনা হাজির করেন। কিন্তু ডেম্পস্টারের রিপোর্টও ম্যালেরিয়া চিকিত্সার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

ম্যালেরিয়া পরজীবী আবিষ্কার হওয়ার আগে চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের ক্রমেই একটি ধারণা গড়ে উঠেছিল যে, এটি মশা-মাছিবাহিত কোনো রোগ। ১৮৭৮ সালে প্যাট্রিক ম্যানসনের আবিষ্কার মশা ফাইলেরিয়া রোগের বাহক— এ সন্দেহই আরো জোরদার করে তোলে। ১৮৮৯ সালে রাশিয়া থেকে পাখির রক্তে ম্যালেরিয়ার পরজীবীর অস্তিত্বের সংবাদ পাওয়া গেল। প্যাট্রিক ম্যানসনের দৃঢ় বিশ্বাস হলো, ম্যালেরিয়া মশাবাহিত রোগ। কিন্তু তখনো এ তথ্যের সপক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইউরোপে যখন ম্যালেরিয়া নিয়ে এতসব গুরুত্বপূর্ণ কাণ্ড ঘটে গেছে, তখনো রসের ম্যালেরিয়া নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। কিন্তু ভবিতব্য খণ্ডাবে কে! এ সময় ড. রোনাল্ড রস ছুটি কাটাতে ইংল্যান্ডে এসে তার ভাবী গুরু ম্যানসনের দেখা পান। তার সংস্পর্শে এসেই রসের মশা ও ম্যালেরিয়া নিয়ে নেশা ধরে গেল। ড. ম্যানসনের সৌজন্যে রস জীবনে প্রথমবারের মতো (১৮৯৪) অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ম্যালেরিয়ার পরজীবী স্বচক্ষে দেখেন। এ সাক্ষাত্কার তার জীবনের লক্ষ্য স্থির করে দিল। ম্যানসনের তত্ত্ব তাকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে। ম্যানসন রসকে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে পরামর্শ দিলেন। ইংরেজদের তখন ভীষণ দুশ্চিন্তা— বিজ্ঞান ও ভূগোলের অনালোকিত রহস্যগুলো সমাধান করার চেষ্টায় তারা অন্য ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে অনেক পেছনে পড়ে গেছে। জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়রা প্রবল বেগে এগিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এদের সরকার একমাত্র ম্যালেরিয়ার কারণ খুঁজে বেড়ানোর জন্য তাদের বিশেষজ্ঞদের অর্থভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিতে কার্পণ্য করেনি। ইংরেজরাও যশ-সম্মান চায়, সেই বা জার্মান-ফরাসিদের চেয়ে কম কি! কিন্তু ইংরেজ সরকার টাকাকড়ি খরচে আগ্রহী নয়। রোনাল্ড রস ইংরেজ আমলাতন্ত্রের কাছ থেকে বেশ খানিকটা অসহযোগিতা পেয়েছিলেন তার গবেষণাকাজে। ভারতে ফিরেই ম্যালেরিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তার তত্কালীন কর্মস্থল বর্তমান তেলেঙ্গানার সেকেন্দরাবাদ ফৌজি ছাউনিতে। এখান থেকে তিনি নিয়মিত চিঠি লিখতেন তার গুরু ও পরামর্শদাতা ম্যানসনকে। পরে এসব চিঠি প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ খতিয়ে দেখেছেন, যার প্রভাব তার বিখ্যাত ইংরেজি উপন্যাস ‘ক্যালকাটা ক্রোমোজম’-এর পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে। তার এ উপন্যাস থেকে রোনাল্ড রস ও ম্যানসন সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়।

ম্যানসনের একটি মজার কাহিনী রয়েছে অমিতাভের বইয়ে, যা থেকে ম্যানসনের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিত্সার চেহারাটা ভেসে ওঠে। সাহেব তার দুজন সহকারীকে পাঠিয়েছিলেন ইতালির রোম শহরের কাছে জলাজঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। একটি শর্ত অবশ্য দিয়েছিলেন এ দুই কর্মীকে, রাতে অবশ্যই মশারির ভেতর শুতে হবে তাদের। জলাজঙ্গলে সারা দিন ঘোরাঘুরি করেও তাদের ম্যালেরিয়া জ্বর হলো না। এতে একটি প্রশ্নের উত্তর পেলেন তিনি।

এই ম্যানসন সাহেব নিজের ছেলেকেও গিনিপিগ করলেন। তাকে ম্যালেরিয়ায় কাবু করালেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। সত্যের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা না পারেন এমন কাজ নেই— লিখেছেন অমিতাভ ঘোষ।

অমিতাভের বইয়ে রসের ম্যালেরিয়া সন্ধানে দুটি অবিস্মরণীয় চরিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে— আবুল কাদির ও লছমন। ১৮৩৫ সালের মে মাসে রস তার কর্মস্থল বেগমপেটে এসেছেন। এরই মধ্যে ইউরোপের বিজ্ঞানীরা ম্যালেরিয়া নিয়ে কাজ অনেক দূর এগিয়ে এনেছেন। ১৮৮০ সালে ফরাসি লাভারন (লম্ভারন) ম্যালেরিয়া রোগীর রক্তে প্যারাসাইটের বা পরজীবীর সন্ধান পেয়ে গেছেন। কিন্তু তার পাঠানো রিপোর্ট পাস্তুর সাহেবের মনঃপূত হয়নি। তার ধারণা, এর পেছনে কোনো ব্যাকটেরিয়া আছে, প্যারাসাইট নয়। আর ম্যানসন সাহেবের সন্দেহ (১৮৯৫ সালে), মশার দেহ পানিতে মিশলে এবং সেই পানি খেলে ম্যালেরিয়া হয়।

বর্তমান কর্মস্থল বেগমপেটে হন্যে হয়ে রস রক্ত খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর আঙুলের ডগার প্রতি বিন্দু রক্তের জন্য ১ টাকা পর্যন্ত দেবেন বলে ঘোষণা দিলেন। বেগমপেটে তখন প্রচণ্ড ম্যালেরিয়া। ১ টাকা শুনতে সামান্য হলেও ১৮৯৪ সালে এর ক্রয়মূল্য সামান্য ছিল না। মহারানী ভিক্টোরিয়ার মুকুটসহ প্রতিচ্ছবি দেয়া রুপার ১ টাকায় চারজনের একটি পরিবারের পুরো এক মাসের দানাপানির খরচ কুলিয়ে যায়। ‘ওয়ান রুপি পার প্রিক’-এর মতো লোভনীয় প্রস্তাবেও কেউ রক্ত দিতে রাজি হয় না। কৌরবরা পাণ্ডবদের সামান্য সূচ্যগ্র ভূমি দিতে রাজি হয়নি। আর বেগমপেটের মানুষও টাকার বিনিময়ে সূচ্যগ্র রক্ত দিতে প্রস্তুত নয়। কারণ খুঁজতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। কারা যেন রটিয়ে দিয়েছিল, এই পাগলা সাহেবের মতিগতি ভালো নয়, রক্ত নিয়ে কালা জাদুতে ব্যবহার করার তালে রয়েছেন তিনি। এমন সর্বনাশা মানুষকে রক্ত দেয়ার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে— ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করে টাকার লোভে নিজের ও পরিবারের সবার সর্বনাশ ডাকার দরকার নেই। সুতরাং এ বিপজ্জনক ডাক্তারের ধারেকাছে কেউ যেতে রাজি হয় না। তাকে দেখলেই রাস্তা থেকে লোকে পালাতে শুরু করে। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মানুষের রক্ত না পেয়ে রস হতাশায় ডুবে গেলেন। ৩-৪ টাকা পর্যন্ত দিতে তিনি রাজি ছিলেন একেকবার রক্তের নমুনার জন্য। আর যদি সেই রক্তে একফালি বাঁকা চাঁদের মতো পরজীবী দেখা যায়, তাহলে আরো বেশি টাকা দিতেন তিনি। কিন্তু ‘বেগমপেটের ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীরা ভাবে, আমি ডাকিনিবিদ্যায় লিপ্ত’— রস লিখেছেন গুরু ম্যানসনকে তার চিঠিতে।

এমন হতাশার সময় ১৭ মে ১৮৯৫ সালে রসের ভাগ্যাকাশের কালো মেঘের ফাঁকে আলো যেন উঁকি দিল। ম্যালেরিয়া রোগী মোহাম্মদ বক্স (অমিতাভ ঘোষ তার উপন্যাসে যার নাম পাল্টে করেছেন আবদুল কাদির) নিজ থেকে তার চেম্বারে রক্ত দিতে হাজির। চটপট তাকে বিবস্ত্র করে শুইয়ে দিলেন বিছানায়, টাঙালেন ভিজে মশারি। এবার মশারির ভেতরে টেস্টটিউব থেকে একপাল মশা ছেড়ে দিলেন। পরদিন ১৮ মে সেসব মশা সংগ্রহ করে নিলেন রস। পরবর্তী সংবাদ উত্তেজনাময়। আবদুল কাদিরের মশারির ভেতর থেকে একটি মশার (মশা নং ১৮) দেহ বিচ্ছিন্ন করে রস একবারেই পেয়ে গেলেন ৬০টি প্যারাসাইট বা পরজীবী। সাফল্যের আনন্দে আত্মহারা রস গুরু ম্যানসনকে দ্রুত লিখে পাঠালেন তার আশ্চর্য প্রাপ্তির কথা, যাকে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘ওয়ান্ডার কেস’ বলে। এরপর ২৬ জুন আবদুল কাদিরের রক্তে রস প্রথমবারের মতো বহুকাঙ্ক্ষিত একফালি বাঁকা চাঁদ আকারের পরজীবী দেখতে পেলেন। রসের আনন্দের আর সীমা রইল না। পরের কয়েক মাস আবদুলের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে তার গবেষণার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রস একে একে পেরিয়ে এলেন।

বিজ্ঞানের জগতে একটি মাত্র কেস স্টাডি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসা অনুচিত— বিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে এ প্রাথমিক অনুজ্ঞা জানা সত্ত্বেও রসের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, আবদুলের রক্তে যে সাক্ষ্যপ্রমাণ পেয়েছেন, আগে বহু রক্তের নমুনা করেও তেমন প্রমাণ পাননি। এমন সাফল্যে রস যে আত্মহারা হবেন তা স্বাভাবিক, কিন্তু সাফল্যের আনন্দ স্থায়ী হয়নি। কয়েক দিন পরই দেখা গেল, আবদুল কাদিরের রক্তে প্যারাসাইট মিলিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর অস্তিত্ব আর পাওয়া যাচ্ছে না। হতাশ রস ২২ মে গুরুকে লিখলেন, ‘হায়! ভাগ্য আমাকে যে আশ্চর্য নমুনা দিয়েছিল, তা দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে।’ ড. ম্যানসনের ধারণা হলো, রস সম্ভবত তার গবেষণার মূল বিষয় থেকে ধীরে ধীরে বিচ্যুত হয়ে পড়ছেন। তিনি রসকে চিঠি লিখে তার নিজের থিওরি আবার মনে করিয়ে দিলেন, যার মূল কথা— শারীরিক যোগাযোগের মাধ্যমে মশার রোগ মানুষের কাছে পৌঁছে। তিনি মৃত মশার দেহের নির্যাস নিয়ে শরবত বানিয়ে কাউকে খাইয়ে এর ফলাফল দেখার জন্য রসকে নির্দেশ দিলেন। রস মশা পিষে শরবত বানাতে দেরি করলেন না, কিন্তু আগের মতো এবারো এ বস্তু পান করার কোনো স্বেচ্ছাসেবক পেলেন না। অবশেষে তিনি পেলেন কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি রসের সহকারী ছিলেন। তবে অমিতাভ ঘোষ তার উপন্যাসে রসের সাহায্যকারী ও ভৃত্য হিসেবে হাজির করেছেন লছমন নামে এক ব্যক্তিকে।

&dquote;

এই লছমনকে শরবত খাওয়াতে রাজি করাতে সক্ষম হলেন ২৫ মে। পরদিন সকালে লছমনের শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি। রস লিখেছেন, লছমনকে অসুস্থ দেখাচ্ছে। রস ধরেই নিয়েছেন, ড. ম্যানসনের থিওরি ‘মশার গুঁড়ো’ থেকেই ম্যালেরিয়া ছড়ায়— এবার সঠিক প্রমাণ হতে চলেছে, কিন্তু বিকালে লছমনের আর জ্বর এল না। একদিন পর লছমন সম্পূর্ণ সুস্থ, তার রক্তে ম্যালেরিয়ার কোনো চিহ্নই নেই। মশার গুঁড়োর থিওরি এখানেই শেষ। আবদুল কাদিরের রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করার কাজে হাত দিতে রসের আর কোনো বাধা রইল না।

রস এ রিপোর্ট ম্যানসনের কাছে পাঠানোর সময় লিখলেন, ‘অনুগ্রহ করে এ পরীক্ষার কথা ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনকে জানাবেন না। কারণ লছমন একজন সরকারি কর্মচারী। সরকারি কর্মচারীকে রোগাক্রান্ত করার চেষ্টা করেছি জানলে আমার বিপদ হতে পারে।’

এই লছমন শেষ পর্যন্ত রসের সঙ্গে থেকে গিয়েছিল। মে ১৮৯৫ থেকে জুলাই ১৮৯৮ পর্যন্ত যখন রস কলকাতায়, তিনি তার যুগান্তকারী আবিষ্কারের দোরগোড়ায়।

১৮৯৭ সালের এপ্রিলে ছুটি কাটাতে রস লছমনকে নিয়ে নীলগিরি পাহাড় গিয়েছিলেন। পাহাড় থেকে নিচে উপত্যকায় নেমে এসেছিলেন ম্যালেরিয়া পরজীবীর খোঁজে। এ সময় রস জীবনে প্রথমবারের মতো ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। রোগসজ্জায় লছমন তাকে একটি তথ্য মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল বলে অমিতাভ ঘোষ তার বইয়ে ইঙ্গিত করেছেন। তথ্যটি এই— সব মশা নয়, একটা বিশেষ ধরনের মশাই (অ্যানোফিলিস মশা) ম্যালেরিয়া ছড়ায়। লছমন এটি শুনেছিল গায়ের মানুষের কাছ থেকে, যারা পাহাড়ে ছাগল চরায়। অ্যানোফিলিস মশা সম্পর্কে রসের তেমন বিশদ ধারণা ছিল না। ওই বছর ১৬ আগস্ট হাসপাতালের দেয়ালে বসে থাকা একটি মশার দিকে (অ্যানোফিলিস) তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন হাসপাতালের এক কর্মচারী। রস তার পাইপের তামাক ধোঁয়া দিয়ে মশাটি মেরে বিচ্ছেদ করলেন। পরদিন আরো একঝাঁক ওই রকম অ্যানোফিলিস মশা ধরে একটি জার ভর্তি করে রসকে এনে দিল লছমন। ২০ আগস্ট রস তার গবেষণার প্রথম বড় সাফল্য হাতে পেলেন। ওইদিন রোনাল্ড রস অ্যানোফিলিস মশার পেটে ম্যালেরিয়া অর্থাত্ গ্লাসমেডিয়াম জাইগট পেলেন। রস তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘ইউরেকা! সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছি।’

কিন্তু গবেষণার আরো কাজ যে বাকি, এজন্য প্রয়োজন একটি উন্নত ল্যাব। এবার রসের কেন্দ্র হলো কলকাতা, যেখানে সমসময়ের সবচেয়ে উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে উত্কৃষ্ট একটি ল্যাবরেটরি গড়ে তুলেছেন সার্জন কর্নেল ডি. ডি কানিংহাম। তিনিও রসের মতো ব্রিটিশ ইন্ডিয়া আর্মির ডাক্তার। পেশায় প্যাথলজিস্ট ও একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী। রস বহুবার চিঠি লিখে কানিংহামকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তাকে এ উন্নত ল্যাবরেটরিতে মশা নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ দেয়া হোক। কিন্তু প্রতিবার কানিংহাম তার অনুরোধ উপেক্ষা করেছেন। কানিংহাম প্রভাবশালী মানুষ, বিলাতের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো। তার নামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এফআরএস। সে সময়ের সবচেয়ে সম্মানজনক উপাধি। কানিংহাম নিজেও এ ল্যাবরেটরিতে তার মূল্যবান গবেষণাগুলো করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। পৃথিবীর এ অংশে এটি সবচেয়ে নামকরা ল্যাবরেটরি। পিজি হাসপাতালের এক কোণে এখনো একটি পরিত্যক্ত ভবনে রোনাল্ড রস মেমোরিয়াল ওয়ার্ড খুঁজলে পাওয়া যাবে। এ ওয়ার্ডের আরেক কোনায় টিনশেডের কয়েকটি ঘর। রোনাল্ড রসের ভৃত্যদের থাকার জায়গা। এখানেই রসের ডানহাত লছমনের থাকার স্থান। তার কাজ ছিল রসের গবেষণার জন্য পায়রার ঝাঁক পোষা। মশা পায়রা, চড়ুই এসব পাখির রক্ত খায়। পাখির রক্তে ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট পাওয়ার সংবাদ পৌঁছলে রস কলকাতায় রোগাক্রান্ত পায়রা সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন লছমনকে, যা লছমন সাফল্যজনকভাবে পালন করে। ১৮৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে রসের ম্যালেরিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হলে এ পায়রাগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়।

আবার কানিংহাম পর্বে ফিরে যাই। কেন জানি না, কানিংহাম সাহেব রসকে কলকাতা আসা থেকে বিরত করার জন্য সব রকম প্রতিবন্ধক দাঁড় করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত সে সময়ই রসকে রাজপুতনায় বদলি হয়ে যেতে হয়। ফলে তার গবেষণায় বড় বাধা পড়ে। সাফল্যের এত কাছে এসে এ বাধায় রস খুব ভেঙে পড়েন এবং গুরু ম্যানসনের সাহায্য চান। অবশেষে ম্যানসনের হস্তক্ষেপে তাকে কলকাতায় বদলি করা হয়। তিনি পিজি হাসপাতালে কানিংহামের ল্যাবরেটরি ব্যবহারের অনুমতি পান। কিছুদিনের মধ্যে ডেভিড কানিংহাম হঠাত্ চাকরি থেকে পদত্যাগ করে বিলাত চলে গিয়েছিলেন। ফলে গবেষণাকাজ চালাতে রসের আর কোনো বাধা রইল না।

এভাবে কলকাতায় বসে রস প্রথম মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের একটি পূর্ণ চিত্র প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠা করলেন। রস আরো জানালেন, তার পরীক্ষা পাখির দেহে করা হলেও মানুষের শরীরে একইভাবে ম্যালেরিয়ার পরজীবী প্রবেশ করে। ১৮৯৮ ও ১৯০০ সালে স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা তার বক্তব্য নির্ভুল প্রমাণ করেন। ম্যালেরিয়া গবেষণার পথিকৃত্ হয়ে রোনাল্ড রস ১৯০২ সালে ফিজিওলজিতে নোবেল পুরস্কার পান।

সবাই বলে, রোনাল্ড সাহেব কপালে মানুষ। মাত্র তিন বছর তাকে ব্যয় করতে হয়েছিল মশা ও ম্যালেরিয়ার সন্ধানে। তাও পুরো সময়টা নয়। অমিতাভ ঘোষের হিসাবমতো ৫০০ দিন। তাতেই দুনিয়া কাঁপানো ফল হাতে এসেছিল তার।

রস সাহেব এরপর সামরিক বাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিলাতে ফিরে আসেন এবং অধ্যাপনা ও গবেষণার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রস আমৃত্যু তার গুরু ম্যানসনের ঋণ স্বীকার করে গেছেন তার পথনির্দেশক বলে। ১৯৩২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর লন্ডনে ৭৫ বছর বয়সে রস মারা যান।

রোনাল্ড রস নোবেল পুরস্কার পান ম্যালেরিয়ার পরজীবী জীবাণুর জীবনচক্র আবিষ্কার করে। রসের গবেষণা মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণের ধারণাকে মূল করে পরিচালিত হয়নি। তার গবেষণা পরিচালিত হয়েছে পাখিকে কেন্দ্র করে। ১৮৯৭ সালে এক ইতালীয় চিকিত্সক ও প্রাণিবিজ্ঞানী গিওভান্নি বাতিস্তা গ্রাসি ও তার সহকর্মীরাও প্রমাণ করতে সক্ষম হন, অ্যানোফিলিস মশায় ম্যালেরিয়ার পরজীবী জীবাণুর বৃদ্ধি ঘটে এবং তারা নারী অ্যানোফিলিস মশার সম্পূর্ণ জীবনচক্রও: পি. ফ্যালসিপারুম, পি. ভিভাক্স ও পি ম্যালেরিয়া প্রকাশ করেন। ১৯০২ সালে চিকিত্সায় অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার বিবেচনার সময় প্রাথমিকভাবে দুজনকেই পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু রস তখন গ্রাসির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতারণার অভিযোগ তোলেন। পরে পুরস্কার কমিটির নির্বাচিত সালিশির জার্মান মধ্যস্থতাকারী রবার্ট কখের রায় রসের দিকেই যায়। রস তার রায়ে বলেন, গ্রাসি পুরস্কার পাওয়া যোগ্য নন। রসই প্রথম দেখিয়েছেন, ম্যালেরিয়ার জীবাণু মশার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়।