রাজধানীর শাহবাগে বারডেম হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ঢুকে দ্বিজেন শর্মার বেডের দিকে এগিয়ে যেতেই তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘তুই এসেছিস? কাছে আয়, তোর সাথে কথা আছে।’ আমি তার বেডের কিনারে গিয়ে দাঁড়ালে তিনি বললেন, ‘তোর নেওয়া বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাত্কারটা আমি পড়েছি। এ বিষয়ে আমার অনেক কথা আছে। আমি বের হয়ে আসি, তারপর তোকে সব বলব।’
তার একদিন আগেই প্রথম আলোতে বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাত্কারটা ছাপা হয়েছিল। আলাপের বিষয় ছিল, ভারত উপমহাদেশের বামপন্থী রাজনীতির অতীত ও বর্তমান। রাশিয়া ও চীনে যে রকম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছে, ভারত উপমহাদেশে সে রকম কিছু কেন ঘটেনি, সেই প্রশ্নও উঠেছিল। এসব বিষয়েই তার অনেক কথা বলার ছিল। কিন্তু কিছুই আর বলা হলো না। ১৫ সেপ্টেম্বর ভোর পৌনে ৪টায় স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। গত ২৩ জুলাই তিনি অসুস্থ হয়ে বারডেম হাসপাতালের হাই ডিপেনডেনসি ইউনিটে ভর্তি হয়েছিলেন, সেখান থেকে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে নেয়া হয়েছিল, অবস্থার অবনতি ঘটলে ২৯ জুলাই তাকে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার চিকিত্সা চলে ৯ আগস্ট পর্যন্ত। অবস্থার বেশ উন্নতি ঘটেছে দেখে সেদিন তাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়।
কেবিনে তিনি আরো সেরে উঠতে থাকেন, কথা বলেন। আমি তাকে প্রতিদিন দেখতে যেতাম, তার সঙ্গে গল্প করতাম। তার নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো থাকত। সেই অবস্থায় তার কথা বলতে অসুবিধা হতো না। কিন্তু বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাত্কারের প্রসঙ্গটা আর তুলিনি। এখন ভাবি, ওই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে কী বলতে চেয়েছিলেন। সাক্ষাত্কারটা ছিল ভারত উপমহাদেশে বামপন্থী রাজনীতির অতীত ও বর্তমান নিয়ে। বামপন্থী রাজনীতি সম্পর্কে দ্বিজেন শর্মার আগ্রহ ছিল। তিনি ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতিই করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কোনো পদ কখনো নেননি বটে, কিন্তু মনে মনে কমিউনিস্ট ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে প্রগতির জন্য প্রায় ৪০টা বই অনুবাদ করেছেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মস্কোতেই ছিলেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে মাস ছয়েকের মধ্যে প্রগতি প্রকাশন বন্ধ হয়ে যায়, তার চাকরিটাও চলে যায়। তখন তিনি মস্কোতে বাংলাদেশের দূতাবাসের স্কুলে শিশুদের পড়িয়েছেন। স্কুলটা করা হয়েছিল দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের জন্য। আমিও কিছুদিন তার সঙ্গে ওই স্কুলে পড়িয়েছি। সেখানে দেখেছি, শিশুদের পড়াতে তিনি খুব আনন্দ পেতেন।
তিনি আসলে শিক্ষকই ছিলেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে বরিশালের বিএম কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ডেমোনস্ট্রেটর হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, তখন শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিকেল করাতেন। ওই চাকরির ফাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানে মাস্টার্স
পড়েন। মাস্টার ডিগ্রি পাওয়ার পর তিনি বরিশাল বিএম কলেজেই ফিরে যান, কারণ তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষকে কথা দিয়েছিলেন যে মাস্টার্স পাস করে ফিরে গিয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেবেন। সেখানে শিক্ষকতা করার সময় ১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, তিনি ছাত্রদের হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। আন্দোলনরত ছাত্রদের সহযোগিতা করছিলেন বলে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে ধরতে যায়। তিনি পালিয়ে সিলেটের মৌলভীবাজারে নিজের বাড়িতে চলে যান। মাস দুয়েক পেরোলে তার মনে হয়, পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এসেছে, গোয়েন্দা পুলিশ নিশ্চয়ই তার কথা ভুলে গেছে। তিনি কলেজে ফিরে আসেন এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হয়ে বরিশাল জেলা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন।
ছয় মাস কারাভোগের কারণে তার বিএম কলেজে চাকরিটা চলে যায়। ১৯৬৪ সালে তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। সেই কলেজের চত্বরে অনেক গাছ লাগান। সেসব গাছের অনেকগুলো এখনো রয়ে গেছে। শিক্ষক হিসেবে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। মিশুক ও সদালাপী বলে তার প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি সিকান্দার আবু জাফরের সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতেন। ওই সময় কয়েকটা সায়েন্স ফিকশন গল্পও লিখেছিলেন বলে তিনি আমাকে বলেছিলেন, কিন্তু সেগুলোর একটাও সংরক্ষণ করেননি। কিছু লেখার কাটিং রেখেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সব হারিয়ে গেছে।
১৯৭৪ সালে তিনি প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে মস্কো চলে যান। মস্কোতেই ১৯৮৭ সালে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। ওই বছর আমি পড়াশোনার জন্য মস্কো যাই। তার পরের ৩০ বছর ধরে আমি তার ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছি। সেই সুবাদেই আমি তাকে জেনেছি, একজন মানুষের পক্ষে আরেকজন মানুষকে যতটা জানা সম্ভব। তার সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান ৩৭ বছর।
মানবজীবনের সব দিকের প্রতি দ্বিজেন শর্মার গভীর আগ্রহ ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখার প্রতি ছিল সীমাহীন ঔত্সুক্য। আর মানুষের জন্য ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। মানুষের প্রতি মানুষের অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনার অবসানের পথ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতি ও দর্শনের মধ্যে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি প্রবল আকর্ষণই ছিল তার সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার মূল কারণ। সেই দেশে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সমাজতন্ত্রে বসবাস নামে একটা বই লিখেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। সে বইয়ের একটা প্রবন্ধে লিখেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘মানুষে মানুষে ধনবৈষ্যমের ফারাক সবচেয়ে কম। এমন আশ্চর্য সমাজ আগে পৃথিবীর কোথাও তৈরি হয়নি, এখনো সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীর বাইরে কোথাও নেই। আমি শিক্ষক ছিলাম, দেশের খুব ভালো কলেজে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। আমার একটাই দুঃখ ছিল, যে দারিদ্র্যের মধ্যে আমার ছাত্রজীবন কেটেছে, সেই জীবনের অংশীদার কাউকেই আমি পড়াতে পারি না। পড়াই শুধু ধনিক শ্রেণীর সন্তানদের। একজন সত্ শিক্ষকের পক্ষে এক বেদনাময় নৈরাশ্যময় অভিজ্ঞতা। তাছাড়া ধনতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষক তো ধনতন্ত্র নিজে। আমরা সেখানে তার একটি যন্ত্র বা আধার মাত্র। ন্যায়ের রঙিন মুখোশ পরানোই ধনতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষকদের কাজ। সমাজতান্ত্রিক সমাজেই কেবল শিক্ষার সত্যিকার আদর্শ বাস্তবায়িত হতে পারে। শিক্ষক নিজেকে মুক্ত স্বাধীন ও সম্পূর্ণ বলে উপলব্ধি করতে পারেন।’
সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেক ভুলত্রুটি আর দুর্বলতাও তার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল। গর্বাচভের গ্লাসনস্ত-পিরিস্ত্রোইকার পুরোটা সময়জুড়ে তিনি মস্কোতেই ছিলেন। তখন দেখেছি, তার মনে নতুন আশাবাদ জেগেছিল যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এবার দূর হবে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি দেখে তাকে বেদনাহত হতে দেখেছি। আবার কখনো বলতে শুনেছি, সমস্যার পাহাড় এতটাই জমে উঠেছিল যে সম্পূর্ণ সমাধানের উপায় ছিল না। আরো পরের দিকে তার ভাবনার আরো পরিবর্তন লক্ষ করেছি। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটা উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন যে মানুষের স্বভাবের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নের কিছু বিরোধ বা বৈপরীত্য আছে। মানুষ মূলত আত্মকেন্দ্রিক, সমষ্টির স্বার্থকে সে স্বভাবত নিজের স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখতে পারে না। জোর করে তাকে সমষ্টির সেবায় বাধ্য করতে চাইলে সে অসত্ হয়, ফাঁকি দেয়, চুরি করে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার এটা একটা বড় দুর্বলতা ছিল।
গত বছরের ১৬ নভেম্বর প্রথম আলোয় তার লেখা একটি ছোট্ট নিবন্ধের এক জায়গায় তিনি লেখেন:
“সব রাস্তা যেমন রোম নগরে পৌঁছায়, তেমনি আমাদের সব সমস্যাও শেষাবধি পুঁজিতন্ত্রে গিয়ে ঠেকে। প্রাথমিক পুঁজি সঞ্চয়ের এ যুগ অবাধ লুণ্ঠনের যুগ আর তাতে যথেচ্ছ লুণ্ঠিত হয় শ্রমশক্তির সঙ্গে প্রকৃতির সম্পদভাণ্ডারও। এখানে প্রেম প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। শ্রমজীবীকে ‘ভাই’ এবং প্রকৃতিকে ‘মা’ বলা অর্থহীন আওয়াজ মাত্র। শোষণ ছাড়া পুঁজি সৃষ্টি হয় না আর পুঁজি ব্যতীত কোনো বৃহত্ নির্মাণও সম্ভব নয়। পুঁজি হলো উন্নয়নের চালিকাশক্তি। ‘অপুঁজিবাদী উন্নয়ন’ বলে কিছু নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন উন্নয়নশীল দেশে এই তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্য অঢেল অর্থ ও শক্তি ক্ষয় করে ব্যর্থ হয়েছে।
এই সঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে পুঁজিতন্ত্র দ্বন্দ্বকীর্ণ মানবস্বভাবের সঙ্গে সবচেয়ে লাগসই ও সর্বোত্তম সমাজব্যবস্থা। আমি পুঁজিতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইছি না। এখানে রয়েছে সত্য ও স্বপ্নের ফারাক। স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার স্পৃহা মানুষের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য এবং এসব প্রবৃত্তি দ্বারাই সে পরিচালিত। আমাদের নৈতিক বিবেচনায় এগুলো নেতিবাচক হলেও জীবজগতের নিয়মে জীবনসংগ্রামে টিকে থাকার জন্য এগুলোর ভূমিকা ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ।
মানবমনে কু ও সু-র দ্বন্দ্ব সম্বন্ধে ধর্মবেত্তারা অবহিত ছিলেন এবং ডারউইন প্রক্রিয়াটির বাস্তব ভিত্তি উদ্?ঘাটন করেছেন। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের স্পৃহা কতটা প্রবল এবং সার্বিক রাষ্ট্রীয় সহায়তায় মানুষ কীভাবে সরকারের ক্রীডনকে পরিণত হয়, সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক বছর বসবাস করার সুবাদে এটি দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সাত দশকের চেষ্টা সত্ত্বেও মানবস্বভাব তেমন কিছু বদলাতে পারেনি এবং শেষে পুঁজিতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করেছে।”
চোখের সামনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হতে দেখার পরেও এক ধরনের আশাবাদ তার মনে থেকেই গিয়েছিল। তিনি মনে করতেন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের চেয়ে উন্নত কোনো এক সমতাবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে। আবার একই সঙ্গে আবার মানবস্বভাবের অন্তর্নিহিত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বা আত্মপরতার কথা ভেবে তার মনে হতো, সম্পূর্ণ শোষণহীন, সংঘাতহীন সমাজ গঠন করা হয়তো কখনই সম্ভব হবে না। ওই একই নিবন্ধে তিনি লিখেছেন:
“ঐতিহাসিক বাস্তববাদের নিয়মে অন্তর্দ্বন্দ্বে জীর্ণ পুঁজিতন্ত্র একসময় সৃজনশীলতা হারিয়ে অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং আরেকটি সভ্যতার অভ্যুদয় ঘটবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বৈব ব্যর্থ রাষ্ট্র হলে, বলাবাহুল্য, পরবর্তী ‘আদর্শ’ রাষ্ট্রের ইউটোপীয় আদলও অদ্যাবধি কোথাও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, যেমনটি সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। ইদানীং সমাজতন্ত্রের জাতশত্রু বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের সংকরায়ণ ঘটানোর একটা কথা কেউ কেউ বলছেন, যা আজও অনুকল্পের অধিক কিছু নয়। মানবস্বভাবের সঙ্গে লাগসই শোষণহীন, সংঘাতহীন সমাজ ইউটোপিয়ারও অধিক মনে হয়।”
দ্বিজেন শর্মা মূলত প্রকৃতিবিদ হিসেবে পরিচিত। এর পেছনেও ছিল মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা, মানুষের মঙ্গলচিন্তা আর স্নিগ্ধ সৌন্দর্যবোধ। প্রকৃতি থেকে তিনি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতেন না। কিংবা উল্টো করে বললে, মানুষকে তিনি প্রকৃতিরই অংশ বলে মনে করতেন। এই ভাবনার সমস্যার দিকটাও তার জানা ছিল। মানুষ প্রকৃতির অংশ হলেও মানুষের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রকৃতিকে শোষণ ও দোহন করতে হয়। তাকে প্রাণী হত্যা করতে হয়, গাছ কাটতে হয়, জঙ্গল পরিষ্কার করতে হয়, নদীনালা ভরাট করতে হয়। কারণ এগুলো তার জীবন ধারণের উপকরণ। প্রকৃতি তার কাছে সম্পদ, ভোগ্যবস্তু। শ্যামলী নিসর্গ নামের বইটির ভূমিকায় তিনি গাছ সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘তরু-নির্ভরতা অমোঘ নিয়তি বলেই সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অদ্যাবধি মানুষ প্রকৃতির এই অনুষঙ্গের প্রবল অস্তিত্বে যাদুমুগ্ধ। সভ্যতার অগ্রগতি মানুষের স্বাধীনতাকে বহুদূর প্রসারিত করলেও প্রকৃতির আওতা থেকে পূর্ণ মুক্তির দিন সুদূর ভবিষ্যতেও অস্পষ্ট। আমাদের খাদ্যবস্তুর এক অনন্য জোগানদার এই তরুরাজ্য। অধুনাতম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও এ পথে বিকল্পের সন্ধান দিতে পারেনি।’
তরুরাজ্য যদি খাদ্যবস্তু হয়, তবে সেই তরুর প্রতি ভালোবাসার কথা বলা বাতুলতা। গাছের সৌন্দর্য উপভোগ করা আর কাঠের ব্যবহারিক উপকারিতা ভোগ করার মধ্যকার দ্বন্দ্ব ঘোচাতে দ্বিজেন শর্মা কোনো জুতসই পথ বাতলাতে পারেননি। তবে এখানে তিনি শুধু রোমান্টিকও থাকতে চাননি, বরং বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে চেয়েছেন। অন্তত এই উপলব্ধি তিনি জাগাতে চেয়েছেন যে, যে আক্রোশে মানুষ এতকাল প্রকৃতিকে ‘জয়’ করতে চেয়েছে, এখন তা বন্ধ করা দরকার। প্রকৃতিকে উজাড় করে তার সব সম্পদ আহরণ করে মানুষের ভোগবিলাসের কাজে লাগানোর বিরোধী ছিলেন তিনি। এখানে তিনি পূঁজিতন্ত্র আর লাগামহীন ভোগলিপ্সাকে বিরাট প্রতিবন্ধক বলে মনে করেছেন। প্রাকৃতিক জঙ্গল কেটে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গাছ লাগানো, যাকে বলে সামাজিক বনায়ন, তিনি তার ঘোর বিরোধী ছিলেন।
মানুষের জীবন কী করে সুন্দর, সচ্ছল, বৈষম্যহীন ও নৈতিক করা যায়— এটাই ছিল তার সারা জীবনের ভাবনা। সেজন্য শিক্ষার ওপর তিনি বিশেষ জোর দিতেন। শিক্ষা নিয়ে বেশকিছু নিবন্ধ-প্রবন্ধও তিনি লিখেছেন। তবে যে শিক্ষা তিনি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, তা হলো ভালোবাসা। একঝুপেরির ছোট্ট রাজপুত্তর ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় বই। এ বই তিনি নিজে কিনে অনেক ছেলেমেয়েকে উপহার দিয়েছেন। বইটির মূল বিষয় ভালোবাসা। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। ভালোবাসাই মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-বিভেদ, শোষণ-বঞ্চনা লাঘব করতে পারবে, যুদ্ধ থামাতে পারবে, প্রকৃতির বিনাশ ঠেকাতে পারবে। তার নিজের জীবন ছিল ভালোবাসাময়। যে মানুষ তার সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছে, সে-ই তার ভালোবাসায় ধন্য হয়েছে। একইভাবে তিনিও অজস্র মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন।
১৯৯২ সালে প্রগতি প্রকাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে দ্বিজেন শর্মা পেশাগত দিক থেকে অবসর জীবন যাপন করেছেন। মাঝখানে কিছু সময় এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া প্রকল্পের কাজ ছাড়া তিনি আর তেমন কিছু করেননি। কিন্তু এই পুরোটা সময়ই তিনি লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন, মৃত্যুর দুই মাস আগ পর্যন্ত দেখেছি প্রচুর বই ও পত্রপত্রিকা পড়তেন। গত বছর দেখেছি, স্লাভোই ঝিঝেকের বই পড়ছেন। তরুপল্লব নামে একটা সংগঠন গড়ে তুলেছেন, এই সংগঠনের আয়োজনে গাছ চেনানোর জন্য তরুণ-তরুণীদের নিয়ে পার্কে পার্কে ঘুরেছেন নিয়মিত। পত্রপত্রিকায় নিবন্ধ-প্রবন্ধ লিখেছেন, বিভিন্ন পার্ক ও উদ্যানে গাছ লাগানোর ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছেন, সভা-সমিতি, বইয়ের প্রকাশনা উত্সব ইত্যাদি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছেন। অত্যন্ত সক্রিয় ও আনন্দময় একটা দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে গেলেন তিনি। এমন সার্থক জীবন খুব কম মানুষেরই হয়।






