অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

লতা মঙ্গেশকর লাজুক, ৯০ বছরের জীবনে হাতেগোনা ক’টি সাক্ষাৎকার। ২৫ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন এই ‘নাইটিঙ্গেল অব ইন্ডিয়া’। ২০১৯ সালে উদযাপিত হচ্ছে লতা মঙ্গেশকরের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। সে উপলক্ষে ১৯৮৪-র মার্চে সোসাইটি ম্যাগাজিনের জন্য মাধু ভাল্লুরি ও অনুপ মেহতার নেয়া লতা মঙ্গেশকরের দুর্লভ সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ এখানে পত্রস্থ হলো—

প্রশ্ন: আপনি কখনো কোনো সাক্ষাৎকার দেন না কেন?

লতা মঙ্গেশকর: বিশেষ কোনো কারণ নেই। আমি খুব ব্যস্ত থাকি, তাছাড়া হাতে সময়ও খুব কম।

প্রশ্ন: ইংরেজিতে সাক্ষাৎকার দিতে হবে, এ কারণে কি?

লতা: এটা সত্যি, আমি হিন্দি ও মারাঠিতে বলতে পারব। কিন্তু ইংরেজিটা ভালো চালাতে পারব না, এটা আমার মাতৃভাষা নয়।

প্রশ্ন: শৈশবের কথা বলবেন? শুরুর দিকের স্মৃতি।

লতা: আমার বাবার নিজের ড্রামা কোম্পানি ছিল, সেখানে ড্রামা আর গান ছিল সমার্থক। বাবা যেহেতু সুপরিচিত সংগীত শিল্পী ছিলেন, তিনি আমাদেরও শেখাতেন। তিনি পরিবারে সংগীতের একটি উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। একটি বিশেষ ঘটনা আমাকে সংগীতে টেনে আনে। আমার বাবা তার সাগরেদকে একটি বিশেষ রাগ অনুশীলন করার কথা বলে তিনি তার অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাগরেদ যেভাবে অনুশীলন করছিলেন, তার একটি সুর ঠিকভাবে আসছিল না, এটা আমার কানে লাগে। ঠিক পর মুহূর্তেই আমি তাকে সংশোধন করে দিই। আমার বাবা যখন ফিরলেন, তিনি তার নিজের কন্যার ভেতরে একজন সাগরেদ আবিষ্কার করলেন। পরদিন সকালেই আমাকে একটি তানপুরা দেয়া হলো এবং বাবা আমাকে শেখাতে শুরু করলেন। আমার মনে পড়ছে, আমি যখন রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী দিয়ে হাতেখড়ি নিচ্ছি, তখন আমার বয়স ছয় বছর।

প্রশ্ন: এই অনুশীলন কোথায় চলছিল?

লতা: আমরা তখন সাঙ্গলিতে (মহারাষ্ট্রের একটি জেলা, হলুদ উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত) থাকতাম। সাঙ্গলির মহারাজার জমিতে একটি সিনেমা কোম্পানি চালু করার জন্য বাবা তার ড্রামা কোম্পানি গুটিয়ে ফেললেন। আমার বাবা সাদাসিধে মানুষ, তার সিনেমার উদ্যোগ ভেস্তে যায়, অনেক টাকা মার খেতে হয়। এখানেই আমার বোন আশা ভোসলে উষা এবং ভাই হূদয়নাথ জন্মগ্রহণ করে; আমার বোন মিনা (খাদিকার) আর আমার জন্ম ইন্দোর।

প্রশ্ন: কখনো কি মঞ্চনাটকে গান গেয়েছেন?

লতা: হ্যাঁ, শিশুশিল্পী হিসেবে বাবার নাটকে অংশ নিয়েছি।

প্রশ্ন: প্রথম কবে মঞ্চে এলেন?

লতা: নয় বছর বয়সে, মঞ্চে আমি প্রথম গান গাই, তাতে আমার বাবাও গেয়েছিলেন।

প্রশ্ন: সাঙ্গলিতে?

লতা: না, সোলাপুরে। বাবার এক বন্ধু তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং গাইতে অনুরোধ করেন।

প্রশ্ন: কী গেয়েছিলেন?

লতা: সে অনুষ্ঠানে? যদি ঠিক মনে করতে পারি, এটা ছিল রাগ খামবায়াতি এবং আরো দুটো গান।

প্রশ্ন: মারাঠি ভাষায়?&dquote;&dquote;

লতা: হ্যাঁ, তবে ধ্রুপদ রাগটি হিন্দি। তারপর আমি স্টেজেই ঘুমিয়ে পড়ি। আমার বাবা নিজের মেয়েদের মঞ্চাভিনয় নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। সিনেমা তো আমাদের জন্য নিষিদ্ধই। আমরা মূলত বাড়িতেই গানের চর্চা করতাম এবং গাইতাম।

প্রশ্ন: সে কারণেই আপনার খুব কমই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হয়েছে?

লতা: হ্যাঁ, সে কারণে আমি যা শিখেছি, এমনকি ভাষা হিন্দি, উর্দু, বাংলা এবং কিছুটা সংস্কৃত, সব বাড়িতেই। সেই দিনগুলোয় আমরা বিখ্যাত কেএল সায়গলের জনপ্রিয় গানগুলো শুনতাম। আমার বাবা নিয়মিত তার গান উপভোগ করতেন, আমি তার গানে অনুপ্রাণিত হয়েছি।

প্রশ্ন: আপনার বাবা কি কেএল সায়গলকে চিনতেন?

লতা: না, তাদের কখনো দেখা হয়নি, দুর্ভাগ্যবশত আমিও কখনো তাকে দেখিনি।

প্রশ্ন: আমরা জানি, শুরুর দিকে আপনাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। মফস্বলের ট্রেনে বা হেঁটে আপনাকে বোম্বে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে।

লতা: হ্যাঁ, সবার ক্ষেত্রেই যেমন ঘটে, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে শুরুতে সংগ্রাম করতে হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত মাত্র ১৩ বছর বয়সেই আমাকে পরিবারের জন্য উপার্জনে নামতে হয়েছে। কারণ ভাইবোনদের মধ্যে আমি ছিলাম সবার বড়। বোম্বেগামী মফস্বল ট্রেনে অনেক সফর করতে হয়েছে, লম্বা পথ হেঁটে স্টুডিওতে যেতে হয়েছে (হেঁটে যেমন মালাঠ স্টেশন থেকে বোম্বে টকিজ)। অনেকটা পথ—আমি থাকতাম নানা চকে আর ট্রেন ধরতাম গ্র্যান্ড রোডে।

প্রশ্ন: আপনার বাবা কেন আপনার সিনেমাতে গান গাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন?

লতা: আমি যখন প্রথম সিনেমার জন্য গাই, বাবা তখন খুবই অসুস্থ। কিন্তু আমরা কেউ সিনেমার জন্য গাইব, এটা তিনি পছন্দ করেননি। তবে একটি মারাঠি ছবির জন্য গান গাইতে তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন। কারণ ছবিটির পরিচালক ছিলেন ড্রামা কোম্পানিতে বাবার সহকর্মী শ্রী সদাশিব রাও।

প্রশ্ন: বোম্বেতে?

লতা: না, পুনেতে। এখন প্লেব্যাক গায়কের যেমন চাহিদা, তখন এমন ছিল না। আর ১৩ বছর বয়সে আমার স্বর এতটাই তীক্ষ ছিল যে, তা সিনেমার নায়িকাদের জন্য মানানসই হতো না, কিন্তু টাকা-পয়সার জন্য আমাকে অভিনয় করতে হতো।

প্রশ্ন: সিনেমাতে সুযোগ পাওয়া কি তাহলে সহজ ছিল?

লতা: সে সময় আমি কঠোর প্র্যাকটিস করতাম, এখন করি রেওয়াজ। ১৯৪২ সালে আমি মাস্টার বিনায়কের কোম্পানির সঙ্গে কোলাপুর যাই। সেখানে এবং বোম্বেতে তিনিই সিনেমার সঙ্গে আমার চুক্তি করিয়ে দেন। প্রতি মাসে ৮০ টাকা নির্ধারিত বেতনে।

প্রশ্ন: এভাবেই পরিবারের ভরণ-পোষণ করতেন?

লতা: হ্যাঁ, গোটা পরিবারই আমার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৪৫ সালে সব পাট চুকিয়ে আমরা বোম্বে চলে আসি।

প্রশ্ন: বোম্বেতে কোথায় উঠেছিলেন?

লতা: ইম্পেরিয়াল সিনেমার ধারেকাছে কোথাও।

প্রশ্ন: লতাজি, আপনি কাকে আপনার গুরু বিবেচনা করেন।

লতা: অবশ্যই আমার বাবাকে। কিন্তু ওস্তাদ আমান আলী খান ১৯৪৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আমার জন্য গান বাঁধেন। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে আমি তার ছাত্রী হয়ে গেলাম। ১৯৪৭ সালে মাস্টার বিনায়ক মারা গেলেন এবং আমি চাকরি হারালাম। কাজেই আমি প্লেব্যাক গান শুরু করতে বাধ্য হলাম। তারপর ভারত ভাগ হলো। মাস্টার গোলাম হায়দার...

প্রশ্ন: মানে যিনি পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন?&dquote;&dquote;

লতা: হ্যাঁ, কিন্তু সেটা আরো পরে। তিনি ‘শহীদ’ নামের সিনেমার জন্য গান বাঁধছিলেন। তারপর আরো একটি সিনেমা ‘মজবুর’—আমি দুটোতে গান গাওয়ার সুযোগ পাই। এটাই ছিল সত্যিকারের ব্রেক। তারপর এল বারসাত বড়ি বহেন ও আন্দাজ।

প্রশ্ন: এখনকার সঙ্গে তুলনা করলে তখন কি এমন সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না?

লতা: না, কঠিন।

প্রশ্ন: দেশভাগের সঙ্গে অনেক মেধা পাকিস্তান চলে গেলে একটি শূন্যস্থান সৃষ্টি হলো...

লতা: না, তেমন বেশি কিছু নয়। যারা গিয়েছেন তারা মূলত পশ্চিম পাঞ্জাবেরই। তারা সেখানে ফিরে গেছেন। জিনাত বেগম চলে গেলেন, কিন্তু জোহরাবাই, শামসাদ বেগম, হামিদা বানু সবাই রয়ে গেলেন।

প্রশ্ন: নূরজাহান তখনকার দাপুটে রানী চলে গেলেন।

লতা: হ্যাঁ, কিন্তু সুরাইয়া তো এখনো রয়ে গেছেন।

প্রশ্ন: তার মানে অনেক প্রতিযোগিতা ছিল?

লতা: প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু যথেষ্ট সহমর্মিতাও ছিল। সেই দিনগুলোয় অনেক বড় মাপের মেধাবী সংগীত পরিচালকরা ছিলেন, যারা তাদের নিজ নিজ কৌশলে শিল্পীর কাছ থেকে তার শ্রেষ্ঠটি বের করে আনতে পারতেন—অনিল বিশ্বাস, নওশাদ আলী, শচীন দেব বর্মণ, শ্যাম সুন্দর, বসন্ত দেশাই এবং আরো অনেকে।

প্রশ্ন: মানুষ বলে আপনি নূরজাহানকে নকল করতেন?

লতা: তিনি একজন বড় শিল্পী, বড় শিল্পীর যা প্রয়োজন—নিজস্ব শৈলী, সুন্দর উচ্চারণ, সুরেলা কণ্ঠ, সবই তার আছে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, আমার গানের ওপর তিনি একটি বড় প্রভাব ফেলেছেন।

প্রশ্ন: হিন্দি গানের বর্তমান ধারা সম্পর্কে আপনি কী মনে করেন?

লতা: অবশ্যই তুলনা করার মতো অবস্থা নেই। পশ্চিমের প্রভাবে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। হয়তো কখনো আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারে। সেক্স ও সহিংসতা গানের মানকে প্রভাবিত করেছে।

প্রশ্ন: কোনো বিশেষ ধরনের গান গাওয়া কি আপনার অপছন্দের? যদি কোনো প্রযোজক বলেন ‘আপনাকে এই গানটা গাইতে হবে...’

লতা: না, আমাকে কেউ কখনো বলেননি কোনটা গাইতে হবে, কোনটা গাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন: তার কারণ কি এই যে তারা আপনাকে ভয় পান?

লতা: না, কারণ তারা আমার পছন্দ ও অপছন্দ সম্পর্কে জানেন। হিন্দি ছবির সংগীত পরিচালকরা জানেন আমি ক্যাবারে গান গাইতে পছন্দ করি না, মারাঠি সংগীত পরিচালকরা জানেন আমি ‘লাভনিস’ পছন্দ করি না, কাজেই যত সম্ভব এ ধরনের গান গাইতে অনুরোধ করা থেকে তারা দূরে থাকেন।

প্রশ্ন: ডিস্কো গানের ব্যাপারে কী বলবেন?

লতা: সাধারণত আমি এসব গান গাই না, তবে রাজেশ রোশনের জন্য দু-একটি গেয়েছি। সে এসে বলল, ‘দিদি অবশ্যই গাইতে হবে।’ আমি ছেলেটিকে আমার চোখের সামনে বড় হতে দেখেছি, তাকে কেমন করে প্রত্যাখ্যান করি। তাছাড়া সে তখন খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আমি তার জন্য যে একটি গান গেয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাচক্রে হিট: অ্যাংরেজি ম্যায় ক্যাহতে হ্যায় কে আই লাভ ইউ।

প্রশ্ন: এবার সংবেদনশীল বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। গানের জগতে মঙ্গেশকর পরিবারের একচেটিয়াত্ব...

লতা: মঙ্গেশকর একচেটিয়াত্ব, এটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির লোকদের একটি কল্পিত ধারণা। আশা আর আমি বোন, কিন্তু আমাদের মাঝখানে প্লেব্যাক গানে নারী সংগীত শিল্পীদের বিশাল একটা অংশ। প্রভাব খাটিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায় না।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: যেসব সংগীত পরিচালক ও প্রযোজক আপনার স্বার্থ সংরক্ষণ করেন, তারা ষড়যন্ত্র করে কি একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন না?

লতা: আপনি এ কথা কেমন করে বলেন? ১০ বছর ধরে আমার গান কত কমিয়ে এনেছি, লম্বা ছুটিতে চলে গেছি, দেশের বাইরে একটার পর একটা কনসার্ট করেছি। উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে আমার প্রোগ্রামের জন্য দেশে মানুষ দুই মাস, তিন মাস ধরে অপেক্ষা করেছে। আপনি তো কাউকে আর্থিকভাবে ভোগাতে পারেন না। আমার কানে এসেছে সংগীত পরিচালকদের কেউ কেউ অন্য শিল্পীদের ব্রেক দেয়ার অনুপযুক্ত মনে করে সত্যি কথা না বলে বানোয়াট দোহাই দিয়েছে। যেমন তাদের চান্স দেয়া হলে আমি ও আশা বর্জন করব। এমনকি রুনা লায়লা উল্লেখ করেছেন, এক সংগীত পরিচালক তাকে বলেছেন আমি চাই না রুনা গানে থাকুক। আপনি কাউকে গান গাওয়া থেকে কেমন করে বিরত রাখবেন। আমি নিশ্চিত সংগীত পরিচালকরা এমন শিল্পী চান না, যারা কেবল আশা ও আমাকে নকল করেছেন, তারা খোঁজেন স্বকীয় গুণাগুণের শিল্পী।

প্রশ্ন: এখন যারা উঠে এসেছেন, সেই শিল্পীদের মধ্যে কাকে কাকে মেধাবী মনে করেন?

লতা: অনুরাধা পাডোয়াল, অলকা ইয়াগনিক, সাধনা স্বরগম তারা সবাই ভালো গান। পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে সুরেশ ওয়াডকার তো এর মধ্যেই বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন।

প্রশ্ন: মঙ্গেশকর একচেটিয়াত্বের কথা বাদ থাক। লতা একচেটিয়াত্বের ব্যাপারে কী বলবেন? এসব নিয়ে কি আপনার এবং আপনার বোন আশা ভোসলের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়নি?

লতা: আশা ও আমার মধ্যে ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা একই ফ্লোরে বসবাস করি, আমাদের সম্পর্ক আন্তরিক, আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি।

প্রশ্ন: একসময় আপনি তার প্রথম বিয়ের বিরোধিতা করেছেন।

লতা: এটা ছিল আশার নিজের সিদ্ধান্ত, এ ব্যাপারে আমাদের কারো কোনো কিছু বলার ছিল না।

প্রশ্ন: রাজ সিং ডুঙ্গারপুরের সঙ্গে আপনার বিয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বহু কানা ঘুষা হয়েছে।

লতা: হ্যাঁ, বেশকিছু সময় ধরে অনেকেই এ ধরনের একটি অনুমানকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। না, আমি বিবাহিত নই, তিনি ২৫ বছর ধরে আমাদের পারিবারিক বন্ধু। আমি তার উপদেশ ও নির্দেশনাকে মূল্য দিই। আমাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও তাকে একই রকম গুরুত্ব দেয়। আমি নিশ্চিত, যতবার আমি লন্ডন যাই, সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে গসিপ কলামে এসব লেখা চলতে থাকে। আমার অবস্থান স্পষ্ট করতে চাই, আমি যদি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই, আমার সেটা লুকোবার কারণ নেই, আর বিয়ে করার জন্য আমাকে হাজার মাইল দূরেও যেতে হবে না।

প্রশ্ন: তাহলে আপনি বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন?

লতা: সে রকম কিছু নয়। আমি কেবল অপ্রয়োজনীয় এবং অসত্য গল্পগুজব স্পষ্ট করে দিচ্ছি।

প্রশ্ন: সম্প্রতি একটি সাপ্তাহিকের প্রথম পাতায় আপনাকে নিয়ে খবর বেরিয়েছে, আপনি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ মালিকানাধীন রেকর্ডিং কোম্পানির জন্য গান গেয়েছেন, অথচ আপনি ভারত সরকারের বর্ণবাদবিরোধী অবস্থানের কথা জানেন। মন্তব্য করুন।

লতা: আমাকে বলতে দিন। আমাকে বহুবার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, কিন্তু আমি কখনই সেখানে যাইনি, তাদের বর্ণবাদী নীতি যতদিন থাকবে, আমি যাবও না। সোয়াজিল্যান্ড জোটনিরপেক্ষ দেশগুলির একটি অংশ, সেখানে কোনো অনুষ্ঠান হলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী লোকজন আসতে পারে। তারা ২০০ থেকে ৩০০ মাইল পথ অতিক্রম করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে গান শুনতে এসেছে। লন্ডনে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত পারিবারিক বন্ধু মি. পার্মার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। আপনি জেনে কৌতূহলী হতে পারেন যে, ভারতীয় হাইকমিশনার মি. বেদী কেবল উপস্থিতি হননি, সে অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে এবং মঞ্চে উপস্থিত শিল্পীদের উষ্ণ অভ্যর্থনাও জানিয়েছেন। ভারত সরকারের বর্ণবাদবিরোধী নীতি সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়েছে।

প্রশ্ন: আরো একটি বিতর্ক রয়েছে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস উল্লেখ করেছে, আপনি সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গান গেয়েছেন। এখন কেউ কেউ বলছেন, এই রেকর্ডের অধিকারী মোহাম্মদ রফি, আপনি নন।

লতা: গিনেস বুক অব রেকর্ডস বা এ নিয়ে যে বিতর্ক, সে সম্পর্কে আমি খুব সামান্যই জানি। আমাকে বলা হয়েছে তাদের তথ্য সংগ্রহের নিজস্ব পথ ও পদ্ধতি রয়েছে। এ নিয়ে আমি আগ্রহীও নই, চিন্তিতও নই।

প্রশ্ন: কোন কোন শিল্পীর সঙ্গে গান গেয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?

লতা: যাদের সঙ্গে মাইক শেয়ার করতে পেরে আমি আনন্দিত, তাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ রফি, মুকেশ, হেমন্ত কুমার, কিশোর কুমার, মান্না দে, তালাত মাহমুদ এবং অবশ্যই আমার বোন আশা ভোসলে।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় কোনো দ্বৈত সংগীতের কথা স্মরণ করবেন?

লতা: এটা খুব সহজ কাজ নয়। তবে মুকেশ ভাইয়ের সঙ্গে ‘শাওনকা মাহিনা পবন কা বে শোর’ এগুলোর একটি।

প্রশ্ন: আমরা শুনেছি, আপনি চ্যারিটি শো করেন না। সত্যি কি?

লতা: বরং উল্টোটা। সোয়াজিল্যান্ডে আমি যে তিনটা শো করেছি, তার একটা ছিল সোয়াজিল্যান্ডের প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কনসার্ট। গত আগস্টে ওয়েম্বলি অ্যারেনায় যে তিনটি কনসার্ট করেছি, তার একটির অর্থ গিয়েছে ভারতীয় বিদ্যা ভবনের জন্য। আসছে ২৮ এপ্রিল আমি একটি কনসার্ট করছি নাগপুরের বাবা আমতে আনন্দ ভ্যান লেপরসি কিউরিং সেন্টারের জন্য। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের ওয়ার্ল্ড কাপ বিজয়ের পর আমি তাদের জন্য গান গেয়েছি, সেখানে ৫৪ লাখ টাকা উঠেছে। আমার যতটুকু সাধ্য, আমি চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: আপনার সামর্থ্য আছে। কেউ কেউ বলে আপনি ভারতের সবচেয়ে ধনী নারী।

লতা: কে জানে! আপনি কি এটা গিনেস বুক অব রেকর্ডসে পড়েছেন?

প্রশ্ন: আপনার উপার্জিত এত টাকা দিয়ে আপনি কী করবেন?

লতা: এর অধিকাংশই তো ট্যাক্সওয়ালারা নিয়ে নেয়। আমি চুপচাপ বিনয়ী উপায়ে কিছু চ্যারিটির চেষ্টা করে থাকি।

প্রশ্ন: মঙ্গেশকর মিউজিক ইনস্টিটিউশন স্থাপনের কথা ভাবেন?

লতা: হ্যাঁ, ঈশ্বর এবং সরকারের অনুমোদন থাকলে আমি এটা করতে চাই।

প্রশ্ন: সঞ্জয় গান্ধী নিয়ে বিতর্ক খোলাসা করবেন—আপনি জরুরি অবস্থার সময় শো করতে চাননি।

লতা: কোনো বিতর্ক নেই। দিল্লিতে আমি গীত ভরি শাম অনুষ্ঠানে গেয়েছি, আশাও গেয়েছে।

প্রশ্ন: রাজনীতিতে আগ্রহ আছে?

লতা: না।

প্রশ্ন: রাজনীতিবিদদের নিয়ে

লতা: না।

প্রশ্ন: পণ্ডিত নেহরু আপনার খুব ভক্ত ছিলেন, এটা কি ঠিক নয়?

লতা: তার প্রতি আমার অশেষ শ্রদ্ধা, তিনি সবসময়ই সদয় ছিলেন।

প্রশ্ন: তার কন্যা ইন্দিরা?

লতা: তিনি অত্যন্ত সক্ষম একজন মানুষ। নারী হিসেবে ভারতীয় নারীত্বকে তিনি সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন।

প্রশ্ন: গান ছাড়া আপনার আগ্রহ আর কিসে?

লতা: আমি উপন্যাস পড়ি, রাঁধতে ভালোবাসি, কিছু সময় ফটোগ্রাফি করি।

প্রশ্ন: কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজান?

লতা: দুর্ভাগ্যবশত বাজাই না।

প্রশ্ন: আপনি কোন ধরনের উপন্যাস পড়েন?

লতা: শরৎ বাবু, বঙ্কিমচন্দ্র, ভিএম খান্দেকারের (মারাঠি) লেখা উপন্যাস।

প্রশ্ন: আপনি গজল পছন্দ করেন?

লতা: আমি গুলাম আলী, মেহেদী হাসান, বেগম আখতার... এর গজল শুনি।

প্রশ্ন: যেহেতু আপনি সিনেমায় গান গাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, এখন আপনার দৈনন্দিন রুটিনটা কেমন? আপনার নিশ্চয়ই অনেক অবসর সময়?

লতা: আমি প্রতিদিন একটা গান রেকর্ড করি এবং বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, আমি এখনো ক্লাসিক্যাল মিউজিক শিখি।

প্রশ্ন: কে শেখান?

লতা: তুলসিদাস শর্মা। তিনি বড়ে শুলাম আলীর সাগরেদ।

প্রশ্ন: কেবলমাত্র ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ওপর ভিত্তি করে আপনি কি নিজের রেকর্ড বের করার কথা ভেবেছেন?

লতা: কে জানে? যদি সময় পাই হতে পারে। এমনকি এখনো আমি সিনেমার গানের বাইরে অন্য গান রেকর্ডিং করি।

প্রশ্ন: আপনার পরিবারটি তো নিবিড় বন্ধনে বাঁধা পরিবার। কে আপনার সবচেয়ে কাছের?

লতা: ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিবারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য আমার। সবাই আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। যতটা সম্ভব, আমি তাদের সময় দিতে চেষ্টা করি। বিশেষ করে আমার ভাই ও বোনের সন্তানদের।

প্রশ্ন: নিজের সন্তান থাকার ইচ্ছে কখনো জাগেনি?

লতা: না, আমার ভাইপো-ভাইজি, বোনপো-বোনজি সবাই আমার সন্তানের মতো।

প্রশ্ন: জীবনের উত্থান-পতন আপনাকে কী শিখিয়েছে?

লতা: আমাকে ভালো কিছু করতে, উপকার করতে শিখিয়েছে। আর এর বিনিময়ে কোনো কিছু প্রত্যাশা না করতে।

প্রশ্ন: প্রত্যাশা করাটাই তো মানুষের জন্য স্বাভাবিক?

লতা: হ্যাঁ সেটা মানবিক, কিন্তু যদি কেউ প্রত্যাশা না করে, তাহলে সুখে থাকবে। যদি অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায়, তাহলে আরো বেশি খুশি হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু প্রত্যাশা কি উপরে উঠতে সাহায্য করে না?

লতা: হ্যাঁ আকাঙ্ক্ষা ভালো, তা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চালিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু প্রত্যাশা—আমি মনে করি না...।

প্রশ্ন: আপনি যা পেয়েছেন, তা নিয়ে আপনি তৃপ্ত, এ কথা কি বলবেন?

লতা: হ্যাঁ, ঈশ্বর আমাকে অনেক সুখে রেখেছেন।

প্রশ্ন: আপনি কি প্রতিদিন প্রার্থনা করেন?

লতা: প্রার্থনা মনে শান্তি দেয়, শক্তি দেয় এবং আমাকে বৃহত্তর শক্তির অংশ করে নেয়।

প্রশ্ন: সাফল্য দেয় না?

লতা: আমি সত্যিই জানি না। আমার সাফল্য ছিল রাতারাতি ঘটে যাওয়া ঘটনা। আমি আদৌ অবহিত ছিলাম না, এত ছোট ছিলাম যে, কী হয়েছে বুঝিনি। আমি কখনো সাফল্যের পরিকল্পনা করিনি, এটা আমার বাবার আশীর্বাদ এবং সবার উপরে ঈশ্বরের ইচ্ছা।