বিলেতে পাতালরেলে চলার সময় কেউ কথা বলে না সহসা, ফোনে কিংবা ক্রসওয়ার্ড পাজলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ কেউ বই পড়ে বা কিন্ডলে রাখে চোখ; চাকরির ডাক এ যুগে হ্যামেলিয়নের বাঁশিওয়ালার সুর, সেই সুর শুনে পাল পাল ইঁদুরের মতো পাতালের রেলগাড়িতে চেপে দ্রুত পৌঁছে যেতে হয় কাজে। সে রকম একটি দিনেই আমার চোখ পড়ে গেছিল ট্রেনের দেয়ালে। মুখোমুখি সিটগুলির ওপরে টানা সরু ওভারহেড সাইনবোর্ডে হরেক বিজ্ঞাপন, রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা থেকে প্রেম খুঁজবার বিজ্ঞাপন, সন্তানহীন পরিবারে সন্তান আনবার আমন্ত্রণ, ব্যবসায় সহজ করবার বিধিমালা, সহজে ডাক্তারের নাগাল মিলবার তরিকা ইত্যাদি। এইসব বিজ্ঞাপনের একটিতে হঠাৎ একদিন দেখি লাল আর কালো কালিতে ছাপানো মধ্যযুগীয় কবিতা, মাঠের রাই যখন বাড়তে বাড়তে চিবুক ছুঁই ছুঁই করবে, চেরী পাকবে, ননীর পুকুরে সাঁতার কেটে বেড়াবে স্ট্রবেরি, ছেলেপুলেরা খালের জলে হইচই করে খেলবে...সেই সময়ে প্রিয়তম ফিরে আসবে, বন্দি হবে আমার বাহুডোরে (পড়লেই মনে পড়ে নজরুলের গান—‘সে বলেছিল ডাগর হবে টগর-চারা যবে, লুকিয়ে এসে আমার হাতে বৈঁচিমালা লবে।’) কবিতার নিচে লেখা ‘পোয়মস অন দি আন্ডারগ্রাউন্ড’, ডি.জে. এনরাইটের একখানা কবিতার নামে নাম এই সংকলনের, কিংবা এই তত্পরতার। প্রথম প্রথম ট্রেনে ক্রমাগত এমন কবিতার স্তবক উত্কলিত হতে দেখে আমার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুলের মূল্য’ গল্পটির একটি লাইনের কথা মনে পড়ে গেছিল, যেখানে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন টফি বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করা ছোট্ট মেয়েটি বেহালা বাজিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত শোনাতে জানে দেখে, তিনি অভিভূত হয়েছিলেন এ দেশে গণমানসের গভীরে সংস্কৃতির যে অনলমালা বইছে তার পরিচয় পেয়ে। এ দেশে প্রথম এসে পদে পদে প্রভাতকুমারের বিস্ময়ের বিপরীত বিস্ময়ে বিপন্ন হয়েছি সত্য, এই প্রথম আমি দেখলাম পাতালের ধমনীর মতো বইছে পাতাল রেল, তার আলো জ্বলা কম্পার্টমেন্টে কত না কবির কবিতার ফিসফিসানি। ইরা স্টেনবার্গ সেখানে লিখছেন,

‘অনবধানেই এসে পৌঁছেছ এমন এক জায়গায়,

যেখান থেকে ত্রিশ বছর পেছনে উঁকি দিলে পথের চিহ্ন হারিয়ে যায়

ত্রিশ বছর সামনে তাকালেও পথের চিহ্ন হারায়।

তোমার তখন নিজের ছায়ার আশ্রয়ে বসে পড়তে হয়।

ভাবতে হয় স্মৃতির কথা,

সত্য আর ইতিকথার যে জন্মদাত্রী।

যে স্থলপথের মতো ভাগ করে দেয় ধারাজলকে।’

আর রেলের কামরার সেই উত্কর্ণ আলো-জ্বলা নীরবতায় আমি টের পেলাম একটা নিরাবলম্ব প্রেতের মতো জীবন সংবাহ করে আমি চলেছি গন্তব্যে, আমি আর আমরা সেখানে একই রকম দেখতে, একই জাতের। বড় জাদুকরী সেই আবিষ্কার মুহূর্ত।

 

এই ‘পোয়মস অন দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ প্রজেক্টের শুরু ১৯৮৬ সালে। উদ্দেশ্য ছিল—যে খালি জায়গাগুলিতে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট যাচ্ছে না তা পদ্যে ভরে দিয়ে রেলের ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করা সাধারণ মানুষের কাছে কবিতাকে পৌঁছে দেয়া, এইভাবে অগণিত মানুষের দর্শক ও পাঠকসভা তৈরি করা, ভূগর্ভস্থ ওই সময়টুকুতে দুই-এক পুরিয়া আনন্দ কিংবা আশার নির্যাস বিতরণ করা। কবিতাগুলি হতে পারে ক্ল্যাসিক, হতে পারে আধুনিক। বছরে তিনবার এই কবিতাগুলি প্রদর্শিত হতো, পঞ্জিকার আকারে চলে যেত গণমানুষের হাতে। ছয়টি গ্রুপের প্রতিটিতে দুজন করে অন্তত জীবিত কবির কবিতা থাকবে, কিছু চেনা কবিতার পাশাপাশি থাকবে একেবারে অচেনা কবিতা, এমন কিছু সাধারণ নিয়মাবলি মেনে কবিতাগুলি ছাপানো হয়।

আইডিয়াটার মূলে ছিলেন তিনজন লেখক, জেরার্ড বেনসন, জুডিথ চার্নেক ও সিসলি হার্বার্ট। নীতিমালাগুলি তাদের নিজেদেরই গড়ে নেয়া, নিজেরাই সেগুলি পালন করেন, রদবদল করেন। ১৯৮৬-২০০১-এর ভেতর এই ‘পোয়মস অন দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ ৩০০-এর বেশি কবিতা ছাপিয়ে ফেলে, অনুবাদ কবিতারও ঠাঁই হয় সেখানে, জেনোফোবিক ব্রিটিশ নাগরিক তার সকালবেলার ট্রেন ভ্রমণে পড়ে ফেলে এমন সব কবির নাম এবং স্থান-কাল-পাত্রের ইতিহাস যা কিছু উচ্চারণ করতে আগে তার জিভ জড় হয়ে যেত। এই কবিতাগুলির মাধ্যমেই সে স্প্যাজিয়ানির সঙ্গে পাত পেড়ে খেতে বসে, রিটা ডাভের তিউনিসীয় জার্নালে ডুব মারে যেখানে নুনের মতো তারার গুঁড়ো ঝরে পড়ছে ইউক্যালিপ্টাসের মাঠে, বাকুকে আবিষ্কার করে সূর্যতপ্ত গমক্ষেতের মতো ঝনঝনে, লেক নিকারাগুয়ার সলেন্টিনামে দ্বীপমালার পাশ দিয়ে স্টিমারের ডেকে চেপে আকাশ দ্যাখে, তার কাছে নির্বাসন-গৃহপ্রত্যাবর্তন এবং পরবাসের মতো যেই শব্দগুলি বিবাদীপক্ষের স্বরপ্রায় শোনাত—সেই শব্দাবলির বেদনা তার বুকে ঘনিয়ে আসে। এই তো ব্রিটিশ রেলপথের এইসব কবিতায় শাদা কাঠের ক্যানৌতে করে তরতরিয়ে পাড়ি দিচ্ছে লালচে শরীরের রেড ইন্ডিয়ান, কালো লোকেরা ফ্যালফ্যাল করে শুনছে আদি নদীর গান, বাদামি লোকেরা রিভার ডেল্টার কাদা মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা, অপ্রাপ্তি, ক্ষয় ইত্যাদি শব্দের ভিতরে যে সর্বজাতিসদনগুলি রয়েছে, এই শহরের যে কোনো পাতালরেল পাড়ি দেয়া মানুষ সেইখানে গিয়ে হাজির হয়। মানুষের ভিতরে সাহিত্য যে মৌলিক শিল্পতাড়না সৃষ্টি করতে পারে, যা এই দুঃসময়ে সহায় হতে পারে, তাই অন্বিষ্ট ছিল এই প্রজেক্টের। কবিতা নির্বাচন এবং অন্যান্য বিষয়ে বেনসন-চার্নেক-হার্বার্ট কখনো অন্যের পরামর্শেও দৃকপাত করেছেন, যেমন পোল্যান্ড ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে যোগ দেবার সুবাদে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস তাদের সুপারিশ করেছিল পোলিশ কবিতা অন্তর্ভুক্তির—তারা সেই অনুরোধ রেখেছেন। কমনওয়েলথের অর্ধশতক উদযাপন উপলক্ষে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলির কবিতা ছাপানো হয়, শুধু আরেক মহাদেশের নির্যাস নয়—এবার কবিতার মাধ্যমে মধ্যমঞ্চে হাজির হয় জাতপাত ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রসঙ্গগুলি।&dquote;&dquote;

প্রাথমিকভাবে কবিতাগুলির সংকলন প্রকাশের জন্য দেয়া হয় ফেবারকে, ফেবার এই কবিতাগুচ্ছ প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়ে দেয়। পরে ক্যাসেল পাবলিশিং এই কবিতাগুলির সংকলন প্রকাশ করে। কবিতার ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রীত বইগুলির অন্যতম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘পোয়মস অন দি আন্ডারগ্রাউন্ড’। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড ছাড়াও এই প্রজেক্টের সঙ্গে সানন্দে যোগ দেয় আর্টস কাউন্সিল, ব্রিটিশ কাউন্সিল, লন্ডন আর্টস ও পোয়েট্রি সোসাইটি।

স্বভাবতই কবিতাগুলির প্রধান বিষয় লন্ডন (লন্ডন আই, ব্রিটিশ মিউজিয়াম ইত্যাদি), কখনো লন্ডনে জন্ম নেয়া কবিরা—এই যেমন ডান-ব্লেক-রোজেনবার্গ। পাতালরেলের যাত্রীকেই মনে রেখে এসেছে প্রসারপিনার অপহরণবিষয়ক কবিতা—কবিতায় এসেছে অর্ফিয়ুসের পাতালযাত্রার প্রসঙ্গ, সাহিত্যে ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ থেকে ‘হ্যামলেট’-এর পিতার প্রেতের সঙ্গে আলাপ ইত্যাদি বহু বিষয়ের সঙ্গেই পাতালে যাপিত এই সময়ের যোগ আছে। শুধু কবিতাতেই এই প্রজেক্ট থেমে থাকেনি, কবিতাপাঠ মঞ্চায়ন করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পল্লীগীতি উৎসব আয়োজন করা হয়েছে, অগণিত দর্শককে কোলরিজের ‘দি এনশ্যান্ট ম্যারিনার’ শুনিয়েছে ওয়্যাগনারের ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ মিউজিকের সঙ্গে, ব্লেকের ‘সংজ অব ইনোসেন্স অ্যান্ড অব এক্সপিরিয়েন্স’-এর সঙ্গে ব্লেকের নিজ হাতে আঁকা ছবি দেখিয়েছে স্ক্রিনে...ওরা বলেন ওদের উদ্দেশ্য সংগীত-চিত্রকলা ও কবিতা এই তিন সহোদরার সৌন্দর্যের উদ্বোধন ও উদযাপন।

ওদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে এমন প্রকাশ্য কবিতাযাপন শুরু হয়েছে আরো অনেক শহরে, ডাবলিনে, স্টুটগার্টে, প্যারিসে, নিউইয়র্কে, স্টকহোমে, প্রাগে, কোথায় নয়! পোর্তোতে ও হেলসিংকিতে বাইলিংগুয়াল ও ট্রাইলিংগুয়াল কবিতা ছাপা হয়েছে পরিবহনগুলিতে, এমনকি কবিতা নির্বাচনে ওদের সংকলনের কিছু অংশকেও গ্রহণ করেছে পৃথিবীর অন্যান্য শহর। এই উদযোগের সংক্রমণ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে কবিত্রয় লিখেছেন, অতি বড় আশা হলেও ওরা আশা করেন আর বিশ্বাস করেন, ইহপৃথিবীতে কবিতাক্ষুধা প্রতিটি শহরে জেগে আছে।

এখানে উল্লেখ্য এই যে কবিতাগুলি যখন পোস্টার হয়ে পাতালরেলে এসেছে, তখন কবিতার সঙ্গে এসেছে তার শিল্পসহোদরারাও, যেমন চসারের বায়রনের বা জন ক্লেয়ারের কবিতার সঙ্গে এসেছে তাদের ম্যানুস্ক্রিপ্টের ছাপচিত্র, রোজেনবার্গের স্বাক্ষর এসেছে, জাপানি হাইকুর সঙ্গে এসেছে ক্যালিগ্রাফি, এসেছে পলিনেশীয় দেবতার ছবি, এসেছে উডকাট, যে গীতিকবিতায় সুরারোপ করা হয়েছে সেই সুরের স্টাফ নোটেশন এসেছে। কখনো এই পোস্টারে একেবারে আসল পাণ্ডুলিপির বানান এবং বাক্য অবিকল রেখে দেয়া হয়েছে। যখন পৃথিবীময় দানবের আস্ফাালন শোনা যাচ্ছে, তখন মানুষের হূদয়ে সুন্দরের সেচ ব্যবস্থার এ প্রয়াস, কত যত্নে! কত আদরে মানুষ আবার ফিরিয়ে আনছে মানবিক চিহ্নাবলি। সব কজন নাবিক মৃত্যুমুখে পতিত হবার পরে একমাত্র জীবিত লোকটি জেগে আছে, জীবন্মৃত দশায় সে তার জীবহত্যার (আলব্যাট্রস) পাপ স্মরণ করছে, যতদিন না সে অনায়াস ঘৃণার বদলে অকাতরে ভালবাসতে শিখছে, ততদিন তার গলার সঙ্গে বাঁধা মৃত আলব্যাট্রস পাখিটা খসে পড়ছে না, ততদিন পৃথিবী তাকে ক্ষমা করছে না। কেননা তার প্রার্থনাই সবচেয়ে খাঁটি, যার ভালোবাসা প্রগাঢ়। সেই কবে কলেজ জীবনে পড়েছি কোলরিজের এই ‘দ্য রাইম অব দি এনশান্ট ম্যারিনার’, পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসাবোধ না করলে জীবনের কোনো দাম নেই সেই অভিজ্ঞান এখনো কত উল্লেখ্য, কত অনস্বীকার্য তা কবিতা ছাড়া আর কে-ই বা জানাবে। কবিতা ছাড়া কে জানাবে পিতার আইভি ছাওয়া সমাধির আশপাশে আমাদের পায়ের চাপেই ভূগর্ভে চলে যায় ছোট্ট অ্যাকর্ন, ছায়াতল ফুঁড়ে নতুন গাছ উঠবে বলে, জীবনের জয়ধ্বনি গাইবে বলে। কবি ছাড়া আর কে-ই বা দেখাবে আমাদের, শিশু তার মাসিমণিকে দেখে শেখে গম্বুজ আর কিউপোলার জ্যামিতি...মসৃণতা তাকে ঘুমোতে দেয় না, যুবক ভরযুবতীর শরীরে দেখে বর্তুল-ঋজু ভাস্কর্য, দেখে লেসের কারুকার্য আর ধারণ করবার শক্তি, তারপর একদিন শিশু ও যুবকের চোখের সামনে পুরনো জ্যামিতি ধসে যায়, লেসের মতো যা কিছু সূক্ষ্ম সব পিঁজে যায়, শুধু সমূহ সর্বনাশের মতো আগুন জেগে থাকে লোকালয়ে আর শস্যক্ষেত্রে। এই শিশুর চোখ বারবার ফিরে এসেছে পাতালরেলের কবিতায়, শিশু কেমন করে দেখে ধনে-হলুদ-পাপরিকার ধূলিমাখা কিমার পাহাড়ে বইছে ঘিয়ের কোমল নদী, মা রাঁধছে (মনিজা আলভি)। শিশুর অঙ্গুলিবিদ্ধ বিস্ময়ে চাঁদ দেখাচ্ছে আর চাঁদ এক পা পিছিয়ে আসছে চিত্রকরের মতো, মরলোকের শিশুর বিস্ময় দেখবে বলে (টেড হিউজ)।

আগেই বলেছি, পাতালরেলে লোকে তেমন কথা বলে না, দূরপাল্লার ওভারগ্রাউন্ড রেলযাত্রীদের মতো দিলখুশ টিফিন ক্যারিয়ার খুলে বা কমলার খোসা খুলে ভাগাভাগি করে খায় না, যার যার গ্যাজেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে তা করতে পারে না, যে ঝুলতে ঝুলতে দীর্ঘ অন্ধকার এই অন্ত্রপথে পাড়ি দেয়, তার জন্যেও তো কিছু চাই। পোস্টারের বা বিজ্ঞাপনের রঙ আর বাণী, কিংবা কেবলই একফালি কবিতা, কলাপাতায় মোড়া বেলিফুলের মতো সংক্ষিপ্ত অথচ মেদুর। এই যে ভিড়ের ভেতর গর্ভবতীকে স্থান ছেড়ে দেয়া যাত্রী, এই যে পাশ ফিরে সংকীর্ণ দরজা দিয়ে বের হবার জন্য জায়গা করে দেয়া সহযাত্রী...এদের ভেতরে সহযোগিতার না হোক সহযাত্রার যে প্রাকৃতিক ছন্দটুকু আছে, সেইটুকুকে কবিতার মাধ্যমে সহমর্মিতা অবধি নেয়া যায় না? স্বপ্ন দেখতে দোষ কী!

১৯৯৩ সালে বিবিসিতে স্টিফেন স্পেনডার স্বরচিত কবিতাপাঠ করেছিলেন ‘টু মাই ডটার’, জীবনের প্রথম পাবলিক এক্সামিনেশন দিয়ে কেবল বাড়ি ফিরেছি, কবিতা শুনে আমি হতভম্ব, এই কবিতা আমার মনে রাখতেই হবে। কিন্তু কেমন করে রেকর্ড করব? কবির নামও তো ভালো করে দেখিনি। দ্রুত অনুবাদ করে ফেললাম, যা মনে আছে তাই। ১৪ বছর পর সেই কবিতা আমি আবিষ্কার করেছিলাম রেলের দেয়ালে, ঠিকানা হারিয়ে ফেলা প্রিয়তম ফিরে এসেছে পোয়মস অন দি আন্ডারগ্রাউন্ডে। গাঢ় মুষ্টিতে ছোট্ট মেয়ে তার সবকটি আঙুল দিয়ে বাপের একখানা আঙুল ধরে আছে, এই উজ্জ্বল আংটিটি বাপের আঙুলে চিরদিন রয়ে যাবে, এমনকি মেয়েটি অনেক বড় হয়ে যাবার পরও...বাড়ি ফিরে খুলে দেখি কৈশোরের নোটবুক—শেষ লাইন লেখা সেইসময়ের টানা হাতের লেখায়, ‘এখনি তার চোখ কত না সুদূর’। সে আনন্দের কোনো তুলনা নেই। তুলনা নেই অ্যানাবেল ডেসপার্ডের সেই প্রেমের কবিতাটির সহজতার, যা আমি পড়েছি ট্রেনের দেয়ালে—

যদি তুমি আমার আগে মরে যাও

দাও তোমার গায়ের ঘ্রাণ, তোমার নিদর্শন,&dquote;&dquote;

বগলতলা, পশমের সোয়েটার, আঙুলে ধূমপানের হলদে দাগ।

তোমার পায়ের একটা ছাপ করিয়ে নিই, দাও।

দাও, তোমার হাসির শব্দ রেকর্ড করে রাখি।

এইসব চিহ্ন নিয়ে দ্বীপান্তরের নির্জনতা পাড়ি দেব;

এই আমার শরীর, একখানি সেন্ট হেলেনা দ্বীপ, জাহাজেরা ভিড়ে না আর,

যেন সমুদ্রে জেগে থাকা একখানা পাথরের চাঁই,

শূন্য তীরঘর যেখানে বাতাস আর মেরুভল্লুক

দরজা আঁচড়ায়।

 

ট্রেনের কামরায় চেঁচিয়ে ওঠেন বায়রন ‘ইটারনাল স্পিরিট অব দ্য চেইনলেস মাইন্ড! ব্রাইটেস্ট ইন ডাঞ্জনস, লিবার্টি!’ আর আমি শুনতে পাই বুদ্ধদেব বসুর গলার স্বর—

‘প্রবৃত্তির অবিচ্ছেদ্য কারাগারে চিরন্তন বন্দী করি রচেছো আমায়—

নির্মম নির্মাতা মম!’

 

বিচিত্র সব কবিতা, হরেক তাদের জন্মদাতাদের নাম, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম জীবনানন্দ দাশের মতো করেই আর্থার সিমন্সও জানেন যেন,

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;

যাদের হূদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

কবির মাথায় তখন শূন্য আকাশজুড়ে ক্যাচোরকোচোর শব্দ করে উইন্ডমিল ঘুরতে থাকে, একটা নিরর্থক প্রশ্নের মতো, পুরনো ধাঁধার মতো। কবির তখন মনে হয় তার বেঁচে থাকবার শতাব্দীটা ধসের আর পতনের (জর্জ জার্তেস)। কবি যুগদর্শীর মতো দেখতে পান শস্যের ক্ষেতের পাশে নাড়াপোড়া মাঠ পড়ে আছে, সুসংবদ্ধ দাঁতের সারিতে একটি ফোকলা স্থানের মতো, জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সোনা আর মধু (আইজ্যাক রোজেনবার্গ)। কবির মনে হয় বাকি পৃথিবীর মানুষরা, যাদের মানুষের প্রতি এখনো গভীর আস্থা আছে তাদের একত্র হওয়ার সময় এসেছে, একীভূত হবার সময় হয়েছে।

মনে মনে ভাবি, কবিতা মানুষকে মুক্তি দেয়, জ্বালা ধরিয়ে দেয়, প্রশমিত করে, আধুনিকে অন্তর্ভুক্ত করে, সেই কবিতা কবে আমাদের দেশেও রেলপথে, বাসরুটে, সিএনজিতে এসে ধরা দেবে? খুব দুরূহ তো নয়। কিন্তু জনজীবনকে নিঃশব্দে ঋদ্ধ করতে অব্যর্থ।

 

বি.দ্র. লেখাটির শিরোনাম দস্তয়েভস্কির নভেলার নামে।