সালভাদর দালির সাক্ষাৎকার স্টার্লিং ম্যাকল্যানি। অনুবাদ: শওকত হোসেন

১৯৬৪ সালে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্যান গখের মতো উন্মাদনার ঠিক এধারে থাকার ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবে কেউ প্রতিনিধিত্ব করে থাকলে তিনি নিশ্চিতভাবেই সালভাদর দালি। তার গোঁফসজ্জিত প্রফুল্লতা এবং নাটকীয় পাগলামি (বিশেষ করে সাংবাদিক আর ক্যামেরার উপস্থিতিতে) তাকে তার সময়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্রশিল্পীতে পরিণত করেছিল। তার কাজ এখনো গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচিত হয়।

মৌসুমের সঙ্গে কোনো শিল্পীর সমালোচনামূলক প্রশংসায় ওঠানামা থাকে (এবং দালির কাজকে অতীতে বেশ কয়েক মৌসুমে পরিহাসই করা হয়েছে), তবে শেষ পর্যন্ত তার খ্যাতি যেখানে গিয়েই ঠেকুক, দালির কথাবার্তা চমৎকারভাবেই টিকে যায়—অনেক সময় আমোদিত মজাদার রসিকতার মতোই। তিনি কপট-গুরুত্বের সঙ্গে নিজেকে অভিনয় গুরু হিসেবেও তুলে ধরেছেন।

ম্যানহাটনের সেন্ট রেজিস হোটেলের লাইব্রেরিতে স্টার্লিং ম্যাকল্যানির প্রশ্নের সময় দালি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হওয়ার কথা বলার সময় বেশ খোলামেলাই ছিলেন। (‘নিউইয়র্কে সবসময়ই মোটা অংকের টাকার নাগাল পাওয়া সম্ভব’) এ ধারায়, তিনি কারো শিল্পকর্মকে জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পর্কে অ্যান্ডি ওয়ারহল এবং অন্য পূর্বসূরিদের কিছু কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ও তুলে ধরেছেন।

 

শিল্প রসিক এবং ইতিহাসবিদ উভয়ের কাছেই সালভাদর ফিলিপে ই জাসিন্তো দালি আমাদের কালের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং স্ববিরোধী ব্যক্তিত্ব। পরাবাস্তববাদের সবচেয়ে বিখ্যাত উদ্গাতা হিসেবে তিনি এক সমালোচকের চোখে ‘মনের গুপ্ত দেশের প্রধান চিত্রকর, এবং সম্ভবত প্রধান রক্ষক’ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। তার আপাত অফুরন্ত ভিন্ন জগতের ইমেজগুলো—স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন এবং বিকারগ্রস্ত দিব্যদর্শন থেকে আঁকা, তিনি বলেছেন —ভালো বা মন্দের জন্যই হোক, সমসাময়িক প্রায় সব গ্রাফিক আর্টের ক্ষেত্রে চিহ্ন রেখে গেছেন তিনি। অলঙ্কার, মঞ্চের সেট, অটোমোবাইল, ব্যালে নাচের পোশাক, রেস্তোরাঁ, দোকানের জানালা, ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, মৌলিক ধরনের পপ-আর্ট ভাস্কর্য এবং পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের আভাঁ-গার্দ নকশাকারও ছিলেন তিনি। ১৯২৯ সালে স্বদেশী (স্প্যানিশ) চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েলের সঙ্গে অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ নামে একটা পরাবাস্তববাদী ধ্রুপদী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন; এখনো ওটার ক্ষুর দিয়ে চক্ষুবলয় কেটে ফেলার একটা বীভৎস দৃশ্য আর্ট ফিল্মের দর্শকদের চমকিত করে। তার বীভৎস ও সম্মোহনী বিষয়বস্তু—নিস্তেজ ঘড়ি এবং ফারের পশমঅলা বাথ টাব থেকে শুরু করে গণ্ডারের শিং ও জ্বলন্ত জিরাফ পর্যন্ত—‘রোগগ্রস্ত ও বিতৃষ্ণা জাগানো’ বলে নিন্দিত হলেও শিল্পী হিসেবে তার কারিগরি প্রতিভা কারো কারো তরফে ফ্লেমিশ গুরুদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যাদের কাজের সঙ্গে তার কাজও বিশ্বজুড়ে আজ বিভিন্ন জাদুঘরে টানানো আছে।

অবশ্য দালির খ্যাতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, তার প্রায় সব সমালোচককে বিরক্ত এবং সাধারণ মানুষকে সমানভাবে আমোদ জোগানো তার ৬০ বছরের জীবনের মধ্যমঞ্চে অভিনীত এক ধরনের বিচিত্র এবং ভীষণভাবে প্রচারিত ব্যক্তিগত জীবন। তার সযত্নে চর্চিত প্রকাশ্য ব্যক্তিত্ব—ব্রকেডের ভেস্ট, রুপালি মাথাঅলা ছড়ি, বাঁকানো গোঁফ এবং অবিশ্বাস্য প্রদর্শনবাদিতা—‘আলোড়ন লোভী প্রতারক’, ‘আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে শোরগোল তোলা শিল্পী’ এবং ‘একজন ভাঁড়কে অনুকরণে বাধ্য করা এক ধরনের অসুস্থতায় কলুষিত ও গ্রস্ত এক মহান প্রতিভা’র মতো বুুলির জন্ম দিয়েছে। দালি এ ধরনের বিরূপ সমালোচনায় নির্বিকার—নিজের ‘স্বর্গীয় গন্তব্যের’ ভাবনায় অটল। আত্মজীবনী দ্য সিক্রেট লাইফ অব সালভাদর দালি-তে তিনি ঘোষণা করছেন, সাত বছর বয়সে ‘আমি চেয়েছিলাম নেপোলিয়ন হতে। এবং সেই থেকে আমার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বেড়ে উঠছে।’

একজন নোটারির ছেলে দালি স্পেনের আপার কাতালোনিয়া প্রদেশের ফিগুয়েরেসে জন্মগ্রহণ করেন। সেই মধ্যযুগ থেকে এখানকার মানুষগুলো স্বাধীনতার প্রতি উদগ্র চেতনার কারণে পরিচিত। এ ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেই তিনি মুরুব্বিদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণে দেরি করেননি: শোধরানোর অতীত হওয়ায় তিনি এলিমেন্টারি স্কুল থেকে বহিষ্কার হন এবং শিল্পকলার ছাত্র হিসেবে কয়েকটা ঝড়ো বছর কাটানোর পর উগ্র বিরোধিতার কারণে কলেজ (মাদ্রিদের সম্মানজনক এস্কুয়েলা নেশিওনাল দে বেল্লাস দে আর্তেস দে স্যান ফেরনান্দো) থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। শৈল্পিক মুক্তির সন্ধান এবং আত্মপ্রত্যয়ের খোঁজে প্যারিসে এসে থিতু হয়ে দ্রুত বিকশিত হন দালি। তার প্রথম একক প্রদর্শনীটি আলোড়ন তুলেছিল—১৯৩৪ সালে আমেরিকায় তার প্রথম সফরের আগেই এ প্রদর্শনীর খবর পৌঁছে যায়। ১৯৪০ সালে তার প্রত্যাবর্তন নাগাদ তিনি এবং তার নিস্তেজ ঘড়ি ম্যানহাটনের অভিজাত স্যালন আর বৈঠকখানার ফ্যাশনবেল অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল, সেই থেকে তা-ই রয়ে গেছেন তিনি, উেকন্দ্রিকতা ও অহমবাদকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এবং উল্লেখযোগ্য সৌভাগ্যে পরিণত করছেন। এখনো স্টাইলিশ, এখনো পরাবাস্তববাদী, এখনো বিপুলভাবে সফল, তার একটি অতিসাম্প্রতিক ক্যানভাস দ্য ডিসকভারি অব আমেরিকা বাই ক্রিস্টোফার কলোম্বাস হান্টিংটন হার্টফোর্ডের সদ্য খোলা গ্যালারি অব মডার্ন আর্টের স্থায়ী সংগ্রহে যোগ হওয়ার সময় তিনি নাগালেই ছিলেন এবং আরেকটা (দাঁতভাঙা নাম ধেষধপরফধষধপরফবড়ীুত্রনড়হঁপষবরপধপরফ) চিত্রকর্মও নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে প্রদর্শিত হয়েছে।

আমরা বিশেষ সাক্ষাৎকারের অনুরোধ নিয়ে এ শেষ বসন্তে তার সামনে হাজির হলে দালি স্পেনের উত্তর-পূর্ব উপকূলের জেলে গ্রাম পোর্ট-লিগাতে নিজের বাড়ির পথ ধরবেন বলে ম্যানহাটনের সেন্ট রেজিস হোটেলের বারোক অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, যেখানে তিনি এবং তার স্ত্রী প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও শরতের মাসগুলো কাটান। তাসত্ত্বেও ‘নিজের সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ ঠেকানোর অক্ষমতা’র কথা স্বীকার করে তিনি নিমিষে প্লেবয়ের জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় বের করতে রাজি হয়ে যান।

 &dquote;&dquote;

প্রশ্ন: আপনার আত্মজীবনী দ্য সিক্রেট লাইফ অব সালভাদর দালি-তে আপনি এ কথা বলে আপনার জীবনের গল্প শুরু করেছেন যে আপনার প্রথম স্মৃতি হচ্ছে জঠর। দয়া করে আমাদের জন্য ব্যাপারটা আরেকবার উল্লেখ করবেন?

সালভাদর দালি: এটা অনেকটা কড়াই ছাড়া ভাজা ডিমের মতো। আমার জন্মপূর্ব দৃষ্টিতে এসব ডিমের হলদে অংশ, কুসুম প্রচুর সান্দ্রতা আর স্মৃতি নিয়ে প্রায় স্বাভাবিক আর সাদা অংশ সম্পূর্ণ স্বর্গীয়, কারণ সেগুলো নানা রঙে রাঙানো। সব কিছুই কোমল, সব কিছুই অন্ধকার; বাস্তবতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এটাই আমাদের জানা সেরা জিনিস। আমাদের জন্মমুহূর্তে আমরা স্বর্গ হারাই। সহসা ভীষণ আলো দেখা দেয়, সব কিছু ভীষণ শুষ্ক। এটা হচ্ছে সহিংসতা—অস্তিত্বের যাতনা। প্রায় সবারই এ জন্মপূর্ব প্রভাব আছে, তবে দালির মতো নয়।

প্রশ্ন: জন্মপূর্ব প্রভাবের কথা বলার সময় আপনার জরায়ুর ভাজি ডিমের ছবির সঙ্গে আপনার ছবির নিস্তেজ ঘড়িগুলোর কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মনে করেন?

দালি: একদিক থেকে, হ্যাঁ। আমার আর সব প্রতীকের মতো নিস্তেজ ঘড়ির প্রতীকের অনেক অর্থ আছে—যদিও প্রথমবার কাজে লাগানোর সময় ওগুলো কী বোঝাচ্ছে, কখনই জানা থাকে না। অনেক বছর পরই কেবল একটা ব্যাখ্যা দেখা দেয়—অনেক সময় তিন কি চারটে ব্যাখ্যা। শুরুতে প্রথম প্যারিসে নিস্তেজ ঘড়িগুলো তৈরির সময় ভেবেছিলাম, ওগুলো স্রেফ সময় আর স্থানের যন্ত্রণার দৃশ্য। একদিন সন্ধ্যায় সবে এক টুকরো ক্যামেম্বার্ট পনির খেয়ে শেষ করেছি, ওটার কোমলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি, খোদ কোমলতার ধরনে; তো আগেই শুরু করা স্পেনের পোর্ট-লিগাতের একটা ল্যান্ডস্কেপে নিস্তেজ ঘড়ি যোগ করে বসি। ছবিটা এত গুরুত্বপূর্ণ বলে কখনই বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন আমি নিশ্চিত, এ পেইন্টিংটাও দালির পেইন্টিংয়ের ৩০ বছর পর ১৯৫৩ সালে বিজ্ঞানী ওয়াটসন ও ক্রিকের বর্ণনা দেয়া কোষের নিউক্লিয়াসে পাওয়া প্রাণের বংশানুক্রমিক সংকেত—ডিএনএ—ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড—আমাদের কালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ঘটনা—আবিষ্কারের নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী। এটা সত্যিই অকল্পনীয়, কারণ এটিই সেই ছবি, যাকে সবাই সবচেয়ে বেশি পাগলামি, দালির সবচেয়ে অযৌক্তিক ও দুর্বোধ্য কাজ বলে বিশ্বাস করে।

প্রশ্ন: দুর্দান্ত। কিন্তু আপনি বলেছেন যে, নিস্তেজ ঘড়িগুলোর অনেক অর্থ আছে। ওগুলো আর কী প্রকাশ করে?&dquote;&dquote;

দালি: নিস্তেজ ঘড়িগুলো আবার যিশুর দেহরূপও বটে, কারণ ওগুলোই আমাকে আচ্ছন্ন করে দেয়া নরম পনির এবং দালিই যিশুর দেহ পনিরের মতো বলে আবিষ্কার করেছেন। এটা কেবল দালি নয়, প্রথম এ বিষয়ে যে মানুষটি কথা বলেছেন, তিনি সেন্ট অগাস্টিন, তিনি একবার যিশুর দেহকে পনিরের পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তো দালি কেবল পনিরের ধারণাকে যিশুর দেহে নতুন করে আরোপ করেছেন। কমিউনিয়নে দেহ ও রক্তের বদলে সবসময়ই রুটি ও মদ থাকে। একইভাবে নরম ঘড়িগুলো কোমল পনিরের মতোই আমার পেইন্টিংয়ে যিশুর দেহের উপস্থিতি।

প্রশ্ন: আলবৎ। আপনার বহু পেইন্টিংয়ে ক্রাচ আরেকটা জোরালো উপকরণ। এখানেও কি সমান জটিল প্রতীকীবাদের অস্তিত্ব আছে?

দালি: আমি খুব ছোট থাকতে চিলেকোঠার গুদামে একজোড়া ক্রাচ পাই। ওগুলো আমার জন্য মৃত্যু আর পুনরুত্থানের প্রতীকে পরিণত হয়। কিন্তু বিপরীতক্রমে ওগুলো এক ধরনের অক্ষম জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল—একটা কিছুকে ঠেকনা দেয়ার মতো কিছু। বুঝতেই পারছেন, আমার প্রথম জীবনে নিজেকে অক্ষম ভাবতাম। অবশ্যই সেই থেকে কথাটা সত্যি নয় বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু আমার পেইন্টিংয়ে ক্রাচ ব্যবহার চালিয়ে গেছি। তবে এখন সেটা পরম পুলকে।

প্রশ্ন: গণ্ডার—আরেকটা পরিচিত বিষয়—আপনার কাছে কীসের প্রতিনিধিত্ব করে?

দালি: আমার কাছে এটা স্বর্গীয় শিহরণের প্রতীক। এটার চামড়ায় প্রচুর দানাদার ভাব আছে। আমার এটা পছন্দ। এরই মধ্যে উপহার হিসেবে দুটো গণ্ডার পেয়েছি আমি। কিন্তু মাদাম দালি ওগুলো গ্রহণ করেনি, কারণ আমার নিউইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে রাখার পক্ষে বড্ড মুশকিলের ব্যাপার।

প্রশ্ন: ইউনিকর্ন শিং আপনার আরেকটি প্রিয় প্রতীক। এটা কি শিশ্ন সম্পর্কিত নয়?

দালি: ইউনিকর্নের শিং এককালে আমার পেইন্টিংগুলোর সবচেয়ে বৈপরীত্যমূলক ইয়ং ভার্জিন অটোসোডোমাইজড বাই হার ওন চেস্টিটির মতো যুগপৎ শিশ্নসংক্রান্ত এবং পবিত্রতার প্রতীক ছিল। বলতে খারাপ লাগছে, এখনো জীবন্ত কোনো ইউনিকর্ন উপহার হিসেবে পাইনি। হয়তো আপনাদের কোনো পাঠক দালির প্রতি সম্মান দেখিয়ে একটা পাঠাবেন।

প্রশ্ন: মাদাম দালি হয়তো গণ্ডারের বেলায় যেমন করেছিলেন, একই রকম আপত্তি তুলবেন।&dquote;&dquote;

দালি: অনুরোধ তুলে নিচ্ছি।

প্রশ্ন: আপনার প্রতীকীবাদের প্রসঙ্গে ফেরা যাক—আপনার আরেকটি সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অনেকের কাছে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর পেইন্টিং আ জিরাফ অ্যাফ্লেম—এক নারী শরীর থেকে অসংখ্য কাঠের ড্রেসার বেরিয়ে আসছে, আর দূরে জ্বলছে একটি জিরাফ—এ ইমেজের মাধ্যমে আপনি কী প্রকাশ করতে চেয়েছেন?

দালি: আগের একটা ছবি দ্য ভেনাস দে মিলো-তে যা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম, লুভরের গ্রিক আদি ছবির মতো একই সাইজে তৈরি করেছিলাম ওটা, তবে অসংখ্য ড্রয়ারসহ। গ্রিক সভ্যতায়, বুঝতেই পারছেন, কোনো রকম অন্তদর্শন, কোনো ফ্রয়েড, কোনো ক্রিশ্চানিটি নেই। ড্রয়ার যোগ করে ভেনাস দে মিলোর দেহের ভেতর দিয়ে আত্মায় নজর চালানো সম্ভব হয়েছে। এভাবে দালি গ্রিক সভ্যতায় এক ধরনের ফ্রয়েডীয় ও ক্রিশ্চান রূপ তৈরি করেছেন।

প্রশ্ন: এসব প্রতীকী ইমেজের অনুপ্রেরণা আসলে ঠিক কীভাবে আপনার কাছে আসে?

দালি: রোজ সকাল ৬টায় প্রস াব করতে ঘুম থেকে ওঠেন দালি, আর প্রস াবের সময়ই সবকিছু দুর্দান্ত সাবলীলতার সঙ্গে বুঝতে পারি। সবকিছু সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে জানতে এটিই সবচেয়ে বড় স্বর্গীয় মুহূর্ত। একদিন সকালে জলবিয়োগের সময় আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, দালির চিন্তাভাবনার মেশিন—গরম দুধ ভরা অসংখ্য ছোট গামলা ঝোলানো একটা রকিং চেয়ার—সাইবারনেটিকস আবিষ্কারের আভাস দিয়েছিল। পরদিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে, সাইবারনেটিকসের ওপর রবার্ট ওয়েইনারের ইশতেহার দালি তার চিন্তার মেশিন তৈরির ৩০ বছর পর লেখা। তবে আমার মেশিনটা কখনই তৈরি হয়নি, কারণ আমি ইলেকট্রনিকস নিয়ে আদৌ সম্পর্কিত নই এবং এটি স্রেফ একটা পাগলাটে ধারণামাত্র।

প্রশ্ন: পাগলাটে কথাটা কখনো কখনো আপনাকে এবং আপনার ধারণাকে বর্ণনার জন্য অন্যরা ব্যবহার করেন। আপনি কি সত্যিই আপনার পেইন্টিং এবং আপনার প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বকে অনেককে যেভাবে বিশ্বাস করেছেন, আসলে কি ততটাই অদ্ভুত—নাকি অনেকে যেমন সন্দেহ করেন, আত্মপ্রচারের স্বার্থে আপনি স্রেফ অদ্ভুত কাণ্ড-কারখানাকে হিসাব করা কৌশল হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন?&dquote;&dquote;

দালি: আমি আসলে উন্মাদ নই। প্যারিসের একজন মনোবিদ দালি পাগল কিনা নিশ্চিত হতে সাত বছর কাজ করেছেন। বহু আলাপচারিতার পর তিনি স্থির করেছেন যে, দালি তার এ-যাবৎ মোকাবেলা করা সেরা সুসংগঠিত মস্তিষ্কের মালিক। তিনি বলেছেন, আমার মগজে প্যারানোয়িক ডিল্যুশন কাঠামোর বৈশিষ্ট্য আছে, কিন্তু প্যারানোয়িক ডিল্যুশন অবশ্যই সম্পূর্ণ সৃজনশীল, এবং উন্মাদনারও রূপ। কিন্তু একজন উন্মাদ এবং দালির ভেতর বিরাট তফাৎ হলো দালি প্যাথোলজিক্যাল নন। সত্যিকারের প্যাথোলজিক্যাল প্যারানোয়িক ডেলিরিয়ামে বাস্তবতার সঙ্গে কিছু সংযোগ থাকে, যেমন প্যাথোলজিক্যাল ডেলিরিয়ামের একটা ভালো নজির: একজন লোক ভাবছে তার পরিবার তার সঙ্গে শত্রুতা করছে, ওরা তার খাবারে বিষ মেশাতে চায়। নিজের পরিবারকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ওদের সম্পর্কে অনেক কিছু আবিষ্কার করে সে, যেগুলো খাঁটি সত্যি। কিন্তু তার মৌলিক অবশ্যই অনুমান মিথ্যা: কেউ তাকে হত্যা করতে চায় না। এটিই ডেলিরিয়াম আর পাগলামি। কিন্তু এ বিকারগ্রস্ত ধারণা থেকেই অসাধারণ পরিমাণ সত্যির ধারণা আসছে। বহু বাস্তব জিনিস জানতে পারছে সে, হাজার হাজার অন্তর্দৃষ্টি আর সম্পর্ক যেগুলো গড়পড়তা লোকের কাছে অবিশ্বাস্য, সাধারণ মানুষ যা কখনই অনুভব করে না। তাই বলব, আমার পার্থক্য ধরার ক্ষমতা আছে, তাই আমি এমন সব জিনিস আবিষ্কার করি, যেগুলো অন্যরা অস্তিত্ব আছে বলেই হয়তো ভাবতে যাবে না।

প্রশ্ন: যেমন?&dquote;&dquote;

দালি: দেয়ালের ওই পেইন্টিংয়ের মেয়েটার মুখ আর টেবিলের ল্যাম্পটার দিকে তাকান। তারপর রেকর্ডিং মেশিনে রাখা আপনার হাতের দিকে। বেশির ভাগ লোকই এগুলোর ভেতর কোনো সম্পর্ক দেখে না। কিন্তু বিপরীতে দালি নিমিষে এসব জিনিসকে সম্পর্কিত করার ব্যাখ্যার একটা পূর্ণাঙ্গ কৌশল প্রতিষ্ঠা করেন। দালির অন্যদের কাছে তার ডেলিরিয়ামের দৃশ্যকে তুলে ধরার ক্ষমতাই প্যারোনোয়িক ডেলিরিয়াম এবং অন্য ধরনের পাগলামির ভেতর পার্থক্য। এটি স্পষ্ট করে দেখার ক্ষমতা, প্রত্যেক শিল্পীর মূলে রয়েছে, এ ধরনের দর্শনের স্পষ্টতম উদাহরণটি ছিল লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, যিনি উদাহরণস্বরূপ স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গায়ে ছিটানো জলের ফোঁটার দিকে এক পলক তাকিয়েই অনেক সময় ১ ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময়ে আস্ত একটা যুদ্ধদৃশ্য এঁকে ফেলতে পারতেন। এটিই সত্যিকারের প্যারানোয়িক ব্যাপার, কারণ আপনি এভাবে কিছু দেখতে পারলে আপনার পক্ষে অন্যদের বলা সম্ভব, উদাহরণ স্বরূপ, ‘এটা একজন লোকের নাক’—আর তারা ঠিক আপনার মতোই দেখতে পাবে। অন্য ধরনের পাগলামিতে এটা ঠিক উল্টো: আপনার হয়তো কোনো দিব্যদর্শন বা স্বপ্ন দেখা হতে পারে, কিন্তু সেটা কেটে যাওয়ার পর আপনি অন্যদের জানাতে পারবেন না, কারণ সেটা পদ্ধতিগত বা সংগঠিত নয়। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার পরিবেশের সবচেয়ে জটিল উপাদানগুলোক পদ্ধতিগতভাবে সংগঠিত করার এ ক্ষমতা; একটা মহাবিশ্ব তৈরি করা।

প্রশ্ন: আপনি যেভাবে বললেন, এ ধরনের সাবলীল দর্শন—এমনকি একটা একান্ত মহাবিশ্ব সৃষ্টি পর্যন্ত—মেস্কালিন ও এলএসডির মতো সম্মোহনী মাদক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো অনেকেই এ কথা বলেছেন। আপনি কখনো এগুলো পরখ করেছেন?

দালি: না, না, না, কারণ আমি মোটেই সাহসী নই—আর কল্পনার জন্য আমার ড্রাগস লাগে না। কল্পনা সৃষ্টির আরো বহু কায়দা আছে। আমি এখন টেকনিকালারে স্বপ্ন তৈরির জন্য কন্ট্যাক্ট লেন্স নিয়ে মার্সেইয়ের ডক্টর জায়েলের সঙ্গে কাজ করছি।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: টেকনিকালারে?

দালি:  ঠিক। চোখ কখনই নিকষ অন্ধকার দেখে না। সবসময়ই ছোটখাটো প্যাটার্ন থাকে। এসব প্যাটার্নই আপনার ঘুমোতে যাওয়ার আগে দেখা ইমেজের মূল। আপনি পুরোপুরি জেগে আছেন, কিন্তু চোখ বুজলেই নানা ধরনের অসাধারণ প্রাঞ্জল ইমেজ আর বিমূর্ত আকার দেখেন, যাকে হিপনোগোগিক ইমেজ বলে। ওগুলো রেটিনাল প্যাটার্নের অবশেষ। স্বপ্ন পর্যায়ে ওগুলোই নিরেট প্যাটার্নে পরিণত হয়। ডক্টর জায়েল এসব ইমেজকে উত্তেজিত করে আরো বেশি প্যাটার্ন তৈরি এবং আরো প্রাঞ্জল করে তুলতে কন্ট্যাক্ট লেন্স তৈরি করছেন। আর আমার সর্বকালের পাগলাটে ধারণা হলো, আমি ডক্টর জায়েলকে হিপনোগোগিক ইমেজ সৃষ্টির দ্রুততর এক কৌশলের কথা বলেছি, তাকে বলেছি: দুটো লেন্সের মাঝখানে জ্যান্ত মাছি বসিয়ে দিন। প্রতিটি মাছির পিঠে এক ফোঁটা ফসফরাস। চোখে লেন্স লাগিয়ে চোখ মুদে মাছিগুলোকে চতুর্দিকে লাফালাফি আর নাচানাচি করতে দেখুন: দেখবেন আপনার চোখের পাতার ভেতরে একটা বিমূর্ত চলচ্চিত্র শুরু হয়ে গেছে, যা মেস্কালিন বা এলএসডির চেয়েও ঢের ভালো।

প্রশ্ন: আপনার এ আইডিয়ার ব্যাপারে ডক্টর জায়েলের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

দালি: জায়েল বলেছেন এটা দারুণ। তবে অবশ্যই রোজ আপনার চোখে মাছি বসানো বাস্তবসম্মত নয়।

প্রশ্ন: কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, এ-জাতীয় আজগুবি চিন্তাভাবনা আর প্রদর্শনবাদের বিচিত্র কর্মকাণ্ডের প্রতি ঝোঁকের কারণে আপনার শৈল্পিক প্রতিভা বিঘ্নিত হয়েছে। অল্প কিছুর কথা উল্লেখ করা যায়: সোনার স্পেস স্যুট পরা; আপনি একবার আপনার বর্ণনা করা ‘স্বর্গের জরায়ু’ স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ডিমের ভেতরে করে জাহাজে চেপে নিউইয়র্কে এসেছিলেন। প্যারিসে ‘ফেরমির অ্যান্ড রাইনোসোরস’ নামে এক লেকচার দেয়ার জন্য হাজারখানেক সাদা ফুলকপি ভরা একটা সাদা রোলস রয়েসে করে সরবোর্নে হাজির হয়েছিলেন। এবং এই গেল বছরই সোনালি চামড়ার ড্রেসিং গাউন পরে হাসপাতালের বেডে করে ফিফথ এভিনিউর একটা বইয়ের দোকানে এসেছেন, মানুষকে দেখাতে ইলেকট্রোকর্ডিগ্রাফে আপনার নাড়ির স্পন্দনও রেকর্ড করা হচ্ছিল...আপনি কেন এসব করেন?&dquote;&dquote;

দালি: প্যারিসের ডক্টর রুমাগুয়েরে, যার কথা আপনাকে বলেছি—যিনি দালি পাগল নন প্রমাণ করেছিলেন—দালির দিকে সবার মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজনের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, দালি এক ধরনের সূক্ষ্ম জটিলতা ধারণ করেন, এক ধরনের ডায়োসকুরি জটিলতা: ক্যাস্টর ও পোলাক্স। গ্রিক পুরাণে জিউস রাজহাঁসের রূপ নিয়ে লিডার সঙ্গে মিলিত হন। এ মিলন থেকে লিডা দুটো ডিম পাড়েন, একটা স্বর্গীয়, অন্যটি সাধারণ ডিম। স্বর্গীয় ডিমে যমজ পোলাক্স আর হেলেন ছিলেন। এ ডাক্তার জানতে পেরেছেন যে, পোলাক্স ও হেলেনই দালি ও মাদাম দালি। অন্য ডিমে ছিল দুজন সাধারণ মরণশীল মানুষ। ক্লিতেনেস্ত্রা ও ক্যাস্টর। দালির মরণশীল প্রকৃতি পোলাক্সের মরণশীল ভাই ক্যাস্টর আসলে আমারই ভাই, দালির জন্মের তিন বছর আগে সাত বছর বয়সে মেনিনজাইটিসে মারা গিয়েছিল।

ওর নামও সালভাদর ছিল আর পরিবার আমাকে, মানে পরের বাচ্চাকে সালভাদর ডাকত। এটা আমার জন্য একটা যন্ত্রণা ছিল, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, কিন্তু আমার সেরা মঙ্গলও। আমার জন্মের পর আমার পরিবার রোজ, সারাক্ষণ আমাকে অন্য সালভাদরের কথা বলত। ওরা কখনই আমার কথা বলত না, শুধু ওর কথা। এটা বিরাট বিকারে পরিণত হয়েছিল। আমি বিশ্বাস করতাম, আমার শরীর আর আত্মা মৃত ভাই মরণশীল সালভাদরেরই অংশ। এবং এটাই আমার জীবনের উেকন্দ্রিতার শুরু ছিল, আমার প্রদর্শনবাদিতার উৎস। অন্যজন মৃত ভাইটি আসল সালভাদর নয়, এটা অবিরাম প্রমাণ করা দালির জন্য দরকার হয়ে পড়েছিল। আমাকে অবশ্যই মাথার ওপর রুটি রাখতে হবে, গোঁফ গজাতে হবে, সবকিছুই এক ধরনের অতিরঞ্জিত প্রদর্শনবাদ সৃৃষ্টির জন্য, দালির দিকে সবার মনোযোগ টানার জন্য, আমি বেঁচে আছি প্রমাণ করার জন্য। এ প্রদর্শনবাদ থেকে অমর পোলাক্সে পরিণত হয়েছি, আর অন্য সালভাদর হয়ে গেছে মৃত, শেষ। এজন্যই প্রতীক হিসেবে আমার জীবনে ডিম এত গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনে আমার বাড়িতে ডিম আকৃতির একটা কামরা আছে।

প্রশ্ন: বললেন মানুষের মনোযোগ প্রয়োজন আপনার। কিন্তু আপনি কি আসলেই নিজেকে দৃশ্যে পরিণত করা উপভোগ করেন?&dquote;&dquote;

দালি: ভীষণ। এ মুহূর্তে আপনি যখন টেপরেকর্ডারে আমাকে ধরে রাখছেন, দারুণ উপভোগ করছি। তবে আমার জীবনের সবচেয়ে অকল্পনীয় সুখের দিন ছিল, যখন প্যারিস ম্যাচ থেকে দুজন ফটোগ্রাফার লন্ডনে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ওরা দালির একটা পুরো দিন, বিস্তারিত সবকিছু জানতে চেয়েছিলেন। পরদিন শুরু করি আমরা। এমনকি আমি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময়ও ছবি তুলেছেন ওরা। আমি ছোট এক টুকরো ক্যামেম্বার্ট মুখে তুলছি, আর ক্যামেরায় ‘পপ’ শব্দ তুলছেন ওরা। প্রতিটি মুহূর্ত যারপরনাই অনন্য সাধারণ। কিন্তু পরের দিনটা একশ গুণ ভালো। কন্ট্যাক্ট প্রিন্ট হাতে পাওয়ার পর আবার সারা দিন তাকিয়ে থেকে ওইদিনের প্রতিটি মুহূর্ত নতুন করে অনুভব করি। এটা যেন মার্সেল প্রোস্ত আত্মজীবনী লিখছেন। আমার জীবন হল, লাখ লাখ লোক যেন টেলিভিশনে আমাকে দেখছে, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সেকেন্ড। এটাই সবসেরা স্বর্গীয় ব্যাপার।

প্রশ্ন: আপনি কাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীবন্ত শিল্পী মনে করেন?

দালি: আজকের দিনের সব শিল্পকর্মে একমাত্র দালিই ভালো—তবে ধারণার জন্য, বাস্তবায়নের জন্য নয়। ভালো পেইন্টং বাস্তবায়নের কোনো সময় নেই। আমি ভালো কিছু, একটা মাস্টারপিস সৃষ্টি করতে ভয় পাই, কারণ সেটা করলেই পরের বছর আমি মারা যাব—সৃজনশীলভাবে, অন্তত। সবার জন্যই এটা এক। রাফায়েল অসাধারণ কিছু আঁকার পর এবং ফেরমির তার ভিউ অব ডেল্ফট আঁকার পর বেশি কিছু করা অসম্ভব আবিষ্কার করেছেন। মোৎসার্টের বেলায়ও এটা সত্যি। লিওনার্দোর বেলায় প্রতিটি পেইন্টিংই ছিল বিপর্যয়, কিন্তু তিনি চালিয়ে গেছেন, কারণ তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, পরের বছর দুর্দান্ত কিছু অর্জন করবেন। আমিও সে রকমই মনে করি।

প্রশ্ন: বেশির ভাগ শিল্প-ইতিহাসবিদ দালির চেয়ে বরং পিকাসোকেই জীবন্ত মহান শিল্পী মনে করেন। আপনি কি তাকে দ্বিতীয় সারির মনে করেন?

দালি: তিনি গুণী হলেও ধ্বংসাত্মক, অরাজক। বিশ্রীভাবে কাজ করেন, ক্যারিকেচার। তিনি সৌন্দর্য ধ্বংস করেন। আমার বেলায় রাফায়েল, বেলাসকেস, গইয়া আর ফারমিরের ধ্রুপদী সৌন্দর্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। টেকনিকের শৃঙ্খলা নিয়ে এ ধ্রুপদী আদর্শ শেখা একজন পেইন্টারের সবচেয়ে জরুরি বিষয়; কিন্তু পেইন্টার এটা আজ শিখতে পারেন না এবং এটাই সবচেয়ে করুণ বিষয়। আজ সেরা বিমূর্ত পেইন্টাররা ধ্রুপদী পটভূমি নেই বলে আত্মহত্যা করেন। এখন আবার ফিগার আর্টে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু ড্রইংয়ের কোনো বিদ্যা না থাকায় বেশির ভাগ শিল্পীর পক্ষে এটা অসম্ভব। তাই ওরা নিজেদের পপ-আর্ট হিসেবে এক্সট্রাপিক্টোরিয়াল ধারণায় সংশ্লিষ্ট করছে, যা মামুলি বিষয়ে সম্পর্কিত—স্যুপের ক্যান, কমিক স্ট্রিপ। এসব বস্তুর প্রকৃত পেইন্টিং এ জিনিস ব্যবহারের ধারণার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: আপনার গোড়ার দিকে বহু পরাবাস্তববাদী কাজ—যেগুলো নানা ধরনের ফেলে দেয়া জিনিস থেকে জুড়ে দেয়া হয়েছিল—পুরনো জুতা, বোতল, আসবাবের টুকরো—ওগুলোকে কি সমসাময়িক পপ-আর্টের পূর্বসূরি বলা যায় না?

দালি: হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তা সবাইকে পপ-আর্টের দালিনীয় পূর্বগামিতার কথা বলতে চাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আলবার্তো গিয়াকোমেত্তির সঙ্গে সৃষ্টি করা প্রতীকী মেকানিজম। ১৯৩৬ সালে মাদাম দালির পুরনো স্লিপার ব্যবহার করে একটা পরাবাস্তব জিনিস সৃষ্টি করেছিলাম, এক গ্লাস গরম দুধ ছিল তাতে। এটার ওপর এক মুঠো চিনি ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল, দুধে মিশে যাচ্ছিল সেটা। এখানে বিষ্ঠার ছোট একটা টুকরো আর আমার গোটাকয়েক যৌনকেশসহ একদলা চিনিও ছিল, চিনি গলে যাওয়ায় দুধের ওপর ভাসছিল ওগুলো। একই সময় আমার বন্ধুর দেয়া একটা চেয়ার দিয়ে আরেকটা দারুণ জিনিস বানিয়েছিলাম। আপনি যেখানে বসেন, সেই চামড়ার জায়গাটা পুরনো হওয়ায় সাদা হয়ে যাওয়া অংশে চকোলেট প্রতিস্থাপিত করেছি। চেয়ারের একটা পায়ার নিচে দরজার নব বসিয়ে দিয়েছি, আর অন্য একটা পায়া বড়সড় একটা বিয়ারের গ্লাসে ঢুকিয়ে দিয়েছি। এসব মিলে খুবই বেসামাল ভারসাম্য তৈরি করে বেশ অনেকটা কাত হয়ে অনায়াসে উল্টে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। পপ-আর্টের এ পূর্বসূরিকে দালির অ্যাটমোস্ফেরিক চেয়ার বলি আমি।

প্রশ্ন: খুবই কৌতূহলোদ্দীপক, কিন্তু—

দালি: আপনাকে আমার হিপনোগোগিক ক্লকের কথা বলতে দিন। সুন্দর এটা। একটা পায়ার ওপর বসানো এক টুকরো ফরাসি রুটি দিয়ে বানানো। রুটিতে ফুটো করে সেগুলোয় এক ডজন কলমসহ কালির বোতল ঢুকিয়ে দিয়েছি। এ রুটির নিচে ছিল ৬০টি ছোট ছোট সুতো, ওগুলোর সঙ্গে কালির বোতল ও কলমের ৬০টি ছোট জল রঙের ছবি ঝুলিয়ে দিয়েছি। এবং একবার মাথার ওপর একটা খুবই লম্বা রুটি বসিয়ে এক ম্যানিকিন প্রদর্শন করেছিলাম; ওটার মুখের ওপর অসংখ্য পিঁপড়া ছিল। কিন্তু পিকাসো, সৌন্দর্যের ধ্বংসকারী, এটাও নষ্ট করে দিয়েছেন—তার কুকুরটা লাফিয়ে উঠে রুটি খেয়ে নিয়েছে। বুঝতেই পারছেন, আমি রুটির প্রতীকীবাদে আচ্ছন্ন হয়ে আছি।&dquote;&dquote;

প্যারিসে প্রতিটি জাতির ভেতর আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের নতুন আন্দোলন সৃষ্টির জন্য দালিনীয় গোপন সংঘের ধারণা ছিল আমার। ধারণাটা ছিল ৫০ ফুট লম্বা একটি রুটি বেক করে—ওটা বেক করার জন্য যথেষ্ট লম্বা একটা ওভেন বানানোরও দরকার ছিল বৈকি—এক রাতে প্যালেস রয়্যালের বাগানে রেখে আসা হবে। আবিষ্কারকারীদের ওপর ভীষণ মনোবল নষ্ট করার প্রভাব সৃষ্টি করবে। বিস্ফোরক আর বিষ আছে কিনা জানতে রুটিটা পরখ করা হতো। জল্পনা-কল্পনা আর পত্রিকার বিষয়ে পরিণত হতো সেটা। কে করেছে এটা? কেন? এবং তারপর ৬৫ ফুট লম্বা আরেকটা রুটি অকস্মাৎ ভার্সেইয়ের উঠোনে আবির্ভূত হতো। এবং একই দিনে ১০০ ফুট লম্বা রুটি ইউরোপ, আমেরিকা, সাংহাই, সর্বত্র রাজধানীতে দেখা দিত। সবাই ভাবত, এটা ভয়ংকর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কর্মকাণ্ড।

প্রশ্ন: আপনি হয়তো ঠিক বলেছেন, কিন্তু—

দালি: একটা সোডা ডিসপেন্সার বোতলের জন্য বানানো সত্যিকারের দুর্দান্ত একটা সাইফনের কথাও বলতে হবে আমাকে। ২৫ ফুট লম্বা একটা প্লাঞ্জার আছে ওটার। বাকি সবই স্বাভাবিক। নিউইয়র্কে জুলিয়ান লেভাই গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছিল ওটা, এদেশে আমার প্রথম প্রদর্শনীগুলোর একটা। কিন্তু কেউই খেয়াল করেনি। লোকজন এসে জিনিসটার দিকে তাকিয়েছে, কিন্তু কেউ মনোযোগ দেয়নি, কারণ একটা সমাধানের অতীত সমস্যা তৈরি করছিল ওটা: বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটা বস্তু নির্মাণ। কেউ পরোয়া করেনি। কিন্তু এখন পপ-আর্টের কারণে সবাই এসব জিনিসের বদৌলতে যারপরনাই নাম কিনছে।

প্রশ্ন: আপনার মতে তার কারণ কী?

দালি: কারণ পপ-আর্ট ক্যারিকেচারে পরিণত হওয়া বিমূর্ত এক্সপ্রেশনিজম থেকে দূরবর্তী স্বাস্থ্যকর প্রবণতার অংশ—কোনো রকম পরিমার্জন ছাড়া সবকিছু ঠিক যেভাবে দেখা যায়, সেভাবেই বিনা অদলবদলে আঁকায় ফেরা, সর্বোচ্চ দৃশ্যগত বাস্তবতায় প্রত্যাবর্তন। এ ধরনের বস্তুনিষ্ঠ অনুকৃতি নতুন নয়। সতের শতকে ফেরমির, লিখটেনস্টাইনের &dquote;&dquote;মতো এসব আধুনিক সবর্জনবিদিত পপ-আর্টিস্টদের চেয়ে বড় পপ-আর্টিস্ট ছিলেন। লিখটেনস্টাইন বস্তুনিষ্ঠ, রোমান্টিক। তিনি এক ধরনের পুরনো কেতার গ্লাসে আইসক্রিম সোডা আঁকেন যা এখন আর কোনো ড্রাগস্টোরে নেই। তিনি এটা করেন, তার কারণ আইসক্রিম সোডাকে তিনি সুখী ছোটবেলার নস্টালজিক স্মৃতি হিসেবে মনে করেন, প্রুশীয় ধরনের শিল্পকর্ম, অতীতের জিনিসের স্মরণ। কিন্তু ফেরমির, উঁহু! ফেরমির আদৌ সেন্টিমেন্টাল বা রোমান্টিক নন। তিনি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, পুরোপুরি ধ্রুপদী। তিনি ভিউ অব ডেল্ফট আঁকার সময় কিছুই পরিবর্তন করেননি। কোনো ধরনের অপটিক্যাল বিভ্রমই পরিষ্কার, বাস্তব ছবি জোগাতে পারত না। শিল্পের মহান গুরু দৃশ্যমান অবয়ব কখনই বদলাননি, সেসব বিকৃত হয়নি। এমনকি প্র্যাক্সিতেলেসের মতো গ্রিকদের ক্ষেত্রেও এটি সত্যি ছিল। সূক্ষ্মতম শিল্প সবসময়ই বেশি করে ফটোগ্রাফিক।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতের শিল্পের আকার দেয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা সম্পর্কিত আপনার বিশ্বাস অন্য সমসাময়িক শিল্পীরা সমর্থন করেন বলে মনে করেন?

দালি: আজকের দিনে কিছু শিল্পী বিজ্ঞানের বিকাশের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। কিন্তু বেশির ভাগই কোনো রকম বৈজ্ঞানিক ধারণা ছাড়াই বর্তমানের সৃষ্টিতত্ত্বকে তুলে ধরে একেবারেই স্বজ্ঞাপ্রসূত কায়দায় কাজ করেন। কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিচক্ষণ মানুষরা জানেন যে বই থেকে শেখা প্রয়োজনীয় নয়, বরং সংবেদনশীলতা আর স্বজ্ঞা থেকে শিখতে হয়। দালির বেলায় অবশ্যই পেইন্টিং তার নিজস্ব মৌলিক সৃষ্টিবিজ্ঞান প্রকাশের একক ক্ষুদ্র উপায়, যা তাকে তার মেধা ও বিকারের ভেতর দিয়ে এমনকি বৈজ্ঞানিকদের পক্ষেও অসম্ভব প্রকৃতির এক ধরনের সিন্থেসিস তৈরিতে সক্ষম করে তোলে, কারণ বিজ্ঞানী তার বিশেষায়নে বড় বেশি ব্যাকুল। দালির জন্য সবকিছু গুরুত্বপূর্ণ: পেইন্টিং, পপ-আর্ট, লেন্স, ফরাসি রুটি—একটা পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি একক দালিনীয় ধারাবাহিকতা—নৈতিকতা, দর্শন, ধর্ম আর বিজ্ঞানে।

প্রশ্ন: দালিনীয় সৃষ্টিতত্ত্ব কীভাবে বিজ্ঞান ও ধর্মের ভেতর প্রচলিত অসামঞ্জস্যতার সমন্বয় করতে পারে?

দালি: বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সুবাদেই দালি ধর্মের কাছে পৌঁছেছে। আমার জীবনের শুরুর দিকে ফরাসি বিপ্লবের যুক্তিবাদ যাজকতন্ত্রবিরোধীবাদে প্রভাবিত হওয়ায় &dquote;&dquote;আমার বাবা মুক্তচিন্তক ছিলেন বলে আমি বেশ নাস্তিক্যবাদী ছিলাম। আমি ছোট থাকতে তিনি আমাকে ক্রিশ্চান স্কুলে যেতে দেননি। পারমাণবিক বিজ্ঞানে আমার আগ্রহের ভেতর দিয়েই ধর্মে আমার আগ্রহের শুরু হয়েছিল—শক্তির প্রকৃতিসংক্রান্ত কোয়ান্টাম ফিজিক্সের আবিষ্কার, বস্তুই শক্তিতে পরিণত হয়, অবস্তুকরণের একটা পর্যায়। আমি বুঝতে পারি, বিজ্ঞান এক ধরনের আধ্যাত্মিক পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ গণ্যমান্য বিজ্ঞানীর অতীন্দ্রিয় কৌশলের ব্যাপারটা রীতিমতো বিস্ময়কর: মহান জেস্যুইট বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাংক এবং পিয়েরে টেইলার্ড দে শার্ডিনের ঘোষণা: মানুষ তার অব্যাহত বিবর্তনের ভেতর দিয়ে ক্রমেই ঈশ্বরের নিকটবর্তী হচ্ছে। এবং এখন ডিএনএ নিয়ে ওয়াটসন ও ক্রিকের ঘোষণা। এটিই আমার জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের বাস্তব প্রমাণ। বিজ্ঞান ও ধর্ম সম্পর্কে আমার সব জ্ঞানের ভেতর আমি আমার পেইন্টিংয়ের ধ্রুপদী ঐতিহ্যে অন্তর্ভুক্ত করি।

প্রশ্ন: আপনি ছবি আঁকার জন্য কতটা সময় দিতে পারেন?

দালি: বছরে আনুমানিক ছয় মাস, এ সময়টা আমি আমার পোর্ট-লিগাতের বাড়িতে কাটাই। সূর্যোদয়ের সঙ্গে জেগে ওঠি, অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কাজ করে যাই।

প্রশ্ন: নিউইয়র্কে বছরের ছয় মাস কীভাবে কাটান?

দালি: নিউইয়র্কে বেশির ভাগ সময়ই আমি ঘুমোই।

প্রশ্ন: ছয় মাস?

দালি: হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। সারাক্ষণই ঘুমোই। এ সাক্ষাৎকারের সময় হলো যখন, আমি বিছানাতেই ছিলাম।

প্রশ্ন: এ কারণেই কি আপনি দ্বিতীয় আবাস হিসেবে নিউইয়র্ককে বেছে নিয়েছেন?&dquote;&dquote;

দালি: এটা একটা কারণ, অন্য কারণও আছে। অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় নিউইয়র্কে ‘আইডিয়া’ বেশি হওয়ার —অকল্পনীয় পরিমাণ ‘আইডিয়া’ চারদিকে—তাই নিউইয়র্ক পছন্দ করি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, মাদাম দালির পর টাকাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। নিউইয়র্কে সারাক্ষণ বিপুল পরিমাণ টাকার নাগাল পাওয়া সম্ভব। টাকার জন্য আমার এ পুলকের মূলে আছে আমার স্প্যানিশ অতীন্দ্রিয়বাদ। মধ্যযুগে আলকেমিস্টরা চাইতেন তাদের ছোঁয়া পাওয়া সবকিছু সোনা হয়ে যাক। বস্তুগত জিনিসের এ রূপান্তরই সেরা ধরনের আধ্যাত্মবাদ।

প্রশ্ন: মাদাম দালির প্রতি আপনার ভালোবাসার কথা বলেছেন। শিল্প ক্ষেত্রের বহু বিখ্যাত শিল্পীর বিপরীতে আপনি একই নারীর সঙ্গে নিরিবিলি এবং অব্যাহত বৈবাহিক জীবনযাপন করে আসছেন।

দালি: ৩০ বছর বা এ রকম কিছু হবে। সবদিক থেকেই খুবই উল্লেখযোগ্য বিয়ে—একেবারে শুরু থেকে, যখন আমরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, সিভিল রাইটের মাধ্যমে বিয়ে করেছিলাম, কারণ মাদাম দালির প্রথম স্বামী হলেন কবি পল এলুয়ার। ক্যাথলিক কোনো দেশে চার্চে নতুন করে বিয়ে করা সম্ভব না। কিন্তু এলুয়ার মারা যাওয়ার পর ওই মুহূর্তেই আমরা একজন আর্চবিশপঅলা ছোট একটি গির্জায় ক্যাথলিক বিয়ে সম্পন্ন করি। অর্গান, ট্রাম্পেট, বিশপ, সব অনুষ্ঠান এত অসম্ভব ভালো লেগেছিল যে, তখনই আবার বিয়ে করার ইচ্ছা হচ্ছিল। আমার পুরো জীবন একটা আচার পরিণত হলে খুশি হতাম। কিন্তু পোর্ট-লিগাতে একজন বিশপই ছিলেন, তাই আমরা আবার বিয়ে করতে পারিনি। তবে আর্চ বিশপ আমাকে বলেছেন কপ্টিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহিলাকে আবার বিয়ে করা সম্ভব, সেটা সবচেয়ে সুন্দর। তো আমাদের বিয়ের তাই তিনটা অনুষ্ঠান হয়েছিল: সিভিল, ক্যাথলিক ও কপ্টিক। এ বুদ্ধিটা দারুণ লেগেছিল আমার। দালি সবার উল্টো, কারণ সবাই বারবার তালাক দিয়ে থাকে, আর আমি আমার স্ত্রীকে বারবার বিয়ে করি। আরেকটা অবাক ব্যাপার হলো: আমি মাদাম দালি ছাড়া আর কারো সঙ্গে মিলিত হইনি।

প্রশ্ন: মাদ্রিদে ছাত্র থাকার সময়ও না?&dquote;&dquote;

দালি: আমার সারা জীবনে আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে কখনো না, কারণ আমি যৌনতার ব্যাপারে নিদারুণ ভীত ছিলাম, যদিও প্রচুর সুযোগ ছিল। আমি নিজেকে অক্ষম ভেবে ভয় পেতাম, কারণ স্পেনে আমি চটি বইপত্র পড়তাম, যেগুলো খুবই রগরগে স্প্যানিশ কিভাবে যৌনক্রিয়া করতে হবে তার কায়দাকানুনের বর্ণনা দিয়েছে...

প্রশ্ন: আপনার কি বাচ্চা নেয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে?

দালি: আমি বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ করি না। আমি কুকুর, বেড়াল, ছোটখাটো কিছুই পছন্দ করি না। বড়সড় জিনিস, সেটা কেবল আমার স্বপ্নে, যেখানে বড় বড় জিনিস কার্পেটে থাকে, সাগরে নয়। তবে তা সত্ত্বেও আমি ইরোটিক সবটাতেই ভীষণ আগ্রহী। আমার পেইন্টিংয়ের সব কিছু আর ধর্মের সব কিছু খুবই ইরোটিক। একটি ধর্মীয় বই আছে, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে, সব মহান স্প্যানিশ সাধু, সেন্ট তেরেসা ও সেন্ট জন অব ক্রস আগাগোড়া পবিত্র ছিলেন, কিন্তু দেবদূত আর সুন্দরতম জিনিস দেখার সময় তাদের অর্গাজমের মতো কামজ পুলক জাগত। কামজ পুলক ও ধর্মীয় পুলক খুবই কাছাকাছি: একটি যান্ত্রিক, অন্যটি আধ্যাত্মিক। কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। মাদাম দালি বলেন, আমি আমার কণ্ঠস্বর অনেক বেশি ব্যবহার করি।

প্রশ্ন: তাহলে শেষ একটি প্রশ্ন। ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত আপনার কোনো পরিকল্পনা থাকলে, সেটা কি  আমাদের?

দালি: হ্যাঁ, হ্যাঁ—আগামী দুই বছরের মধ্যে একটা ভীষণ কষ্টের পরিকল্পনা করেছি: গোঁফ ছেঁটে ফেলব। কাজটা করব, কারণ আমার চাঁদির চুল ঝরে পড়ছে, আমি একটি পরচুলা পরতে চাই। কিন্তু গোঁফ আর পরচুলা একসঙ্গে রাখা সম্ভব না—বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। তাই আমাকে গোঁফ কাটতেই হবে। অনুষ্ঠানটা হবে ভেনিসে, টেলিভিশন থাকবে, সবাই আসবে—একেবারে শাস্ত্রীয় দৃশ্য। তারপর একটা নয়, দুটো পরচুলা তৈরি করাব—দিনের জন্য একটা ধূসর, রাতের জন্য কালো। এ কাজের ভেতর দিয়ে ইউরোপে আবার রাজতন্ত্র ফিরে আসবে। জেনারেল ফ্র্যাংকো স্পেনে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেবেন এবং রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের এ মুহূর্তে সবাই আবার পরচুলা পরবে, অলঙ্কারপাতি, জয়পতাকা এবং বিপুল পরিমাণ ক্ষুদে কেক আর মোমবাতির রেনেসাঁ ঘটবে। শিল্পকর্ম আর পেইন্টিং বিকশিত হবে। তেমনি দালিও।

[ঈষৎ সংক্ষেপিত। সাক্ষাৎকারটি ‘দ্য প্লেবয় ইন্টারভিউ’ শিরোনামের একটি সাক্ষাৎকার গ্রন্থের অংশ। বইটিতে অ্যালেন গিন্সবার্গ, কুর্ট ফনগাট, টেনিসি উইলিয়ামস প্রমুখসহ আরো অনেকের সাক্ষাৎকার রয়েছে।]