সমস্ত স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে আমাকে নিজের বিবেক অনুযায়ী জানার-বলার এবং অপ্রতিহতভাবে যুক্তি-তর্ক দেয়ার স্বাধীনতা দিন—জন মিল্টন

 

বই নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। কখনো অশ্লীলতা, কখনো শাসকদের সমালোচনা, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতা থেকে শুরু করে ইতিহাস বিকৃতি—এমন নানা অভিযোগে বই নিষিদ্ধ করার ঘটনা সব কালে এবং স্থানে দেখা যায়। গত শতকের অন্যতম সাহিত্যকীর্তি জেমস জয়েসের ইউলিসিস উপন্যাসটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনে ১৯৩০-এর দশকে নিষিদ্ধ হয়েছিল। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, ভ্লাদিমির নবোকভের লোলিটা—খুঁজলে এমন অনেক বিখ্যাত নামই পাওয়া যাবে নিষিদ্ধের তালিকায়। ঔপনিবেশিক আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থটি; এরপর আরো নিষিদ্ধ হয় বিষের বাঁশী (১৯২৪), প্রলয় শিখাসহ (১৯৩০) আরো কয়েকটি গ্রন্থ। ঔপনিবেশিক সরকার শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আলোচিত উপন্যাস পথের দাবী নিষিদ্ধ করেছিল; ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি গেজেটের মাধ্যমে বইটি বাজেয়াপ্ত হয়। এরপর নিকট অতীতের দিকে দেখা যায় তসলিমা নাসরিনের উপন্যাস লজ্জা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। সম্প্রতি দেশের একটি প্রকাশনা তাদের প্রকাশিত আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য বইটি বিতর্ক তৈরি করেছে এমন কারণ দেখিয়ে বাজার থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। বই নিষিদ্ধ, প্রত্যাহার কিংবা বই প্রকাশে কেন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত নয়, সে বিষয়ে নানা যুগে বড় বড় পণ্ডিত আলোচনা করেছেন। ইংরেজ কবি মিল্টনও তার সময়কালে ইংল্যান্ডে বইয়ের প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণে সরকারি আদেশের বিরোধিতা করেছিলেন। নিজের বিরোধিতার পেছনে যুক্তি-তর্ক তুলে ধরে রচনা করেছিলেন অ্যারিওপ্যাগিটিকা নামের একটি পুস্তিকা। মানুষের মতপ্রকাশ কিংবা লেখকের বা বইয়ের স্বাধীনতার জন্য সেটা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্যারাডাইজ লস্ট নামের মহাকাব্য ছাড়াও যে কাজটির জন্য জন মিল্টন (১৬০৮-৭৪) বিখ্যাত হয়ে আছেন, তার নাম অ্যারিওপ্যাগিটিকা। এটি অবশ্য কাব্য নয়, বরং তার আলোচিত গদ্য রচনা। কবি হিসেবে বিখ্যাত মিল্টন জীবনে যা যা লিখেছেন, তার মধ্যে গদ্যের পরিমাণই বেশি। বলা হয়, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এ-যাবৎ রচিত রচনার অন্যতম। সি. ভি. ওয়েজউডের মতে, ‘মিল্টনের অ্যারিওপ্যাগিটিকা চিত্তের সর্বাধিক মুক্তির সমর্থনে একটি মহৎ প্রয়াস।’

১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন শহরে বসে মিল্টন এ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এ রচনায় মিল্টন মূলত দুটি প্রশ্ন সামনে রেখে আলোচনা করেছেন—চিন্তার স্বাধীনতা ও মুদ্রণালয়ের স্বাধীনতা। প্রথম প্রকাশের পর বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল ১৭৩৮ সালে। মিল্টন অবশ্য এর অনেক আগেই দুনিয়াকে বিদায় জানিয়েছেন। এরপর এনলাইটমেন্টের যুগে অ্যারিওপ্যাগিটিকা আবার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মূলত বিষয়বস্তুর কারণেই এ মনোযোগ। ফরাসি বিপ্লবের আগে মিরাব্যু ফরাসি ভাষায় এর অনুবাদ করেন। ঊনবিংশ শতকে এসে অ্যারিওপ্যাগিটিকার খ্যাতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। এ শতকের শেষে বইটি বিশ্ববিদ্যালয়, পড়ুয়া সমাজ, গ্রন্থাগারে নিজের স্থান করে নেয়। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটায় অ্যারিওপ্যাগিটিকা প্রকাশের তৃতীয় শতবার্ষিকী পালিত হয়।

মিল্টন ১৬৩৯ সালে ইতালি থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে গদ্য রচনা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী ২০ বছর তিনি গদ্য রচনাতেই কাজ করেছেন। জীবদ্দশায় মিল্টন কবির চেয়ে গদ্য রচয়িতা হিসেবেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তার প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো ছিল সমকালীন রাজনীতি-ধর্ম নিয়ে তীক্ষ মন্তব্যে ভরা, যা সমকালে চাঞ্চল্যের জন্ম দিত।

১৬৪৪ সালের নভেম্বরে মিল্টন অ্যারিওপ্যাগিটিকা রচনা করেন। এ রচনার আগে তিনি আরো নয়টি পুস্তিকা রচনা করেন। অ্যারিওপ্যাগিটিকার নামকরণের একটি প্রেক্ষিত আছে। পুস্তিকাটি মিল্টন লিখেছিলেন সেকালের ইংল্যান্ডের উচ্চতর বিধানসভা (লর্ড অ্যাসেম্বলি) ও লোকসভার (কমন্স সভা) সদস্যদের উদ্দেশে। গ্রন্থ মুদ্রণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইংল্যান্ডের বিধানসভা এক ধরনের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালুর আদেশ জারি করেছিল। এ আদেশের বিরুদ্ধেই মিল্টন তার যুক্তিতর্ক-ভাবনা তুলে ধরেন অ্যারিওপ্যাগিটিকা পুস্তিকায়।

অ্যারিওপ্যাগিটিকা নামটি মিল্টন নিয়েছিলেন গ্রিক ভাষা থেকে। প্রাচীন গ্রিসে উচ্চতম বিচারালয়ের বিচারকরাই ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নেয়ার কর্তৃপক্ষ। এই বিচারকদের সভা হতো অ্যারিওপ্যাগাস পর্বতে। তাই গ্রিক সংসদও অ্যারিওপ্যাগাস নামে পরিচিত ছিল। তাই ইংল্যান্ডের উচ্চতর বিধানসভার কাছে মিল্টন তার লেখা আবেদন/আহ্বানকে নাম দিলেন অ্যারিওপ্যাগিটিকা। মিল্টনের এই রচনা ভাষণের ভঙ্গিতে লেখা। ধারণা করা হয়, একজন গ্রিক মনীষীর রচনা কৌশলকেই মিল্টন অনুসরণ করেছিলেন। আর সেই গ্রিক পণ্ডিত ছিলেন আইসোক্র্যাটিস, তিনি ছিলেন ৪৩৬-৩৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সময়কালের মানুষ। অ্যারিওপ্যাগিটিকা এর উপক্রমণিকা অংশে এ বিষয়ে মিল্টন নিজেই আলোচনা করেছেন, ‘সেসব মনীষীর মধ্যে আমি বিশেষ করে একজনের নাম উল্লেখ করতে পারি; তিনি তার নিজের আবাসগৃহে বসেই এথেন্সের বিধান-সংসদে এমন একটি বক্তব্য লিখে পাঠিয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ তার মতো পরিবর্তন করে প্রচলিত গণতন্ত্রের চেহারাকে বদলে দিয়েছিল। সেটা ছিল গ্রিকদের রাজনৈতিক জীবনের এক সংকটকাল। আইসোক্র্যাটিসের মনে হয়েছিল, সংকট কাটাতে গ্রিকদের উচিত তাদের প্রাচীন গণতন্ত্রের ধারণাকে ফিরিয়ে আনা। গ্রিকদের উচ্চতর সংসদের সদস্যরা আইসোক্র্যাটিসের পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন এবং অনেকটাই গ্রহণ করেন। মিল্টনের উদ্দেশ্যও ছিল দেশের সংসদ। তবে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতের ভিন্নতা ছিল। আইসোক্র্যাটিস আবেদন রেখেছিলেন নিজেদেরই পুরনো একটি ঐতিহ্য-ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা আর মিল্টনের আবেদন ছিল সংসদের জারি করা একটি আদেশ (মুদ্রণযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ) রদ করার উদ্দেশ্যে।

এবার যে আদেশের বিরুদ্ধে মিল্টন অ্যারিওপ্যাগিটিকা পুস্তিকাটি রচনা করেছিলেন, সেদিকে একটু নজর দেয়া যাক। ১৬৪৩ সালের ১৪ জুন ইংল্যান্ডের তৎকালীন বিধান-সংসদ বা লর্ড অ্যাসেম্বলি কমন্স সভার সমর্থন নিয়ে দেশের গ্রন্থ মুদ্রণ নিয়ন্ত্রণের আদেশ জারি করে। নির্দেশটি ছিল স্পষ্ট—লর্ড অ্যাসেম্বলি কর্তৃক তৈরি করা পরীক্ষণ কমিটি (পড়ুন সেন্সর বোর্ড) অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রেস বা মুদ্রণালয় কোনো বই প্রকাশ করতে পারবে না। আজকের দিনের ভাষায় ও কাঠামোয় এই মুদ্রণালয়কে প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে পড়া উচিত হবে বলে মনে হয়। উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডে মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানা চালু হয়েছিল ১৪৭১ সালে। ছাপাখানা চালু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময় সরকার, চার্চ, রাজা-রানীরা বই ও লেখা প্রকাশ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে বর্তমান লেখার মনোযোগ নষ্ট হবে। তাই ১৬৪৩-এর আদেশের অব্যবহিতপূর্বের পরিস্থিতির দিকে তাকানো যাক। সে বছর ৯ মার্চ আরেকটি আদেশ জারি হয়েছিল। সেই আদেশে বলা হয়েছিল, সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত ‘পরীক্ষণ কমিটি’ রাজা বা পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক মন্তব্য বা কুৎসা ছড়ানো লেখা ছাপা হচ্ছে এমন কোনো মুদ্রণালয়ে তল্লাশি চালাতে পারবেন। একই সঙ্গে মুদ্রাকরকে গ্রেফতার ও ছাপানো পুস্তিকাগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন। এই আদেশটি আরো সুসংবদ্ধ করে লর্ড ও কমন্স সভা যৌথভাবে ১৬৪৩ সালের ১৪ জুন জারি করে। এই আদেশে এটাও যোগ করা হয়েছিল যে, ‘পরীক্ষণ কমিটি’র অনুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশী বইও ইংল্যান্ডের বাজারে বিক্রি হতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতেই চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে সাড়া দিলেন কবি মিল্টন এবং রচনা করছেন অ্যারিওপ্যাগিটিকা। মিল্টনের রচনা উপস্থিত কোনো ফল বয়ে আনেনি। তবে জনমানসে চিন্তা ও লেখা প্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকে যে উসকে দিয়েছিল, তাতে আর সন্দেহ নেই। নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৬৯৫ সালে পুস্তক মুদ্রণ নিয়ন্ত্রণের সব নিয়ম বাতিল হয়ে ইংল্যান্ডের মুদ্রণ বা প্রকাশনা শিল্প পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।&dquote;&dquote;

অ্যারিওপ্যাগিটিকা বই প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্দেশ্য রচিত হয়েও তা এই গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের সর্বজনীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে দেশ-কালের সীমানাকে অতিক্রম করে গেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সমাজ-রাজনীতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ মিল্টনের লেখায় ভূমিকা রেখেছে। তিনি স্পর্শ করেছেন রাজনীতি, সমাজনীতি।

উপক্রমণিকা অংশে মিল্টন লিখেছেন, ‘যেসব মনীষী জ্ঞানের ও বাগৈবদগ্ধ্যের সাধনায় নিয়োজিত থাকতেন তখনকার যুগে, সেই মনীষীদের কেবল স্বদেশেই নয়, বরং বিদেশেও কদর করা হতো এবং সম্মান জানানো হতো। তারা যদি রাষ্ট্র পরিচালকদের মৃদু ভর্ত্সনায় কোনো পরামর্শ দিতেন, তাহলে রাষ্ট্রের নেতারা সানন্দে শ্রদ্ধার সঙ্গে সেসব শুনতেন।’ বোঝা গেল, জ্ঞানী মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত না থাকলেও রাষ্ট্রকে উপদেশ দিতে পারেন এবং মিল্টন মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালকদের সেসব পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শোনা প্রয়োজন।

মুদ্রণ নিয়ন্ত্রণবিধির বিভিন্ন ধরনের আদেশ-নির্দেশের মধ্যে মিল্টনের মূল মনোযোগ ছিল বই প্রকাশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ। ‘আমি বই সম্পর্কে অনুজ্ঞাপত্রদানের ধারাটি সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করছি।’

‘আমার সর্বশেষ কথা হলো, আপনাদের এই আদেশ মুখ্যভাবে সর্বপ্রকার জ্ঞান সাধনার পরিপন্থী হয়ে উঠবে। এটা সত্যান্বেষণকে বাধাগ্রস্ত করবে। প্রশ্ন করতে পারেন, কীভাবে সত্যান্বেষণকে রুদ্ধ করবে? আমরা যা জানি, শুধু তা নিয়েই যদি সন্তুষ্ট থাকি, তাহলে অনুশীলনের অভাব দেখা দেবে। আমাদের শক্তি-সামর্থ্যের ক্ষয় শুরু হবে। ফলে ধর্ম ও সমাজজীবনে প্রজ্ঞার নবাবিষ্কারের পথ-প্রচেষ্টা রুদ্ধ হবে।

প্রকাশের স্বাধীনতা চাইলেও মিল্টন মনে করেন, বইয়ের প্রতি চার্চ ও সাধারণতন্ত্রের সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত। কেন রাখা উচিত, সেই ব্যাখ্যাও মিল্টন দিয়েছেন এবং সেটা কৌতূহলোদ্দীপক। এই উত্তরে বই সম্পর্কে মিল্টনের ধারণাকেও দেখতে পাবেন পাঠক। বই পড়ুয়ারা এই জবাবে বেশ আনন্দিত হবেন সন্দেহ নেই, ‘বই কোনো মৃত বস্তু নয়। বইয়ে প্রাণবীজ আছে। এই প্রাণবীজ কোনো আত্মার মতোই সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।’ এর পরই মিল্টন তার আরাধ্য মতামতটি তুলেছেন, ‘আমরা যদি বই বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন না করি তাহলে দেখব, একটি ভালো বই নষ্ট করা প্রায় একজন ভালো মানুষকে হত্যা করার সমতুল্য। ...অনেক মানুষই পৃথিবীতে বোঝাস্বরূপ বেঁচে থাকে। কিন্তু একটি ভালো বই হলো মহান আত্মার প্রাণশোণিত স্বরূপ—একে মুদ্রাঙ্কিত করে দামি রত্নের মতো সঞ্চিত করে রাখা হয়েছে এই জীবনের পরে অন্য একটি জীবনের উদ্দেশ্যে। ...একটি সত্যকে বাতিল করে দেয়ার যে ক্ষতি কোনো যুগের কোনো বিপ্লবই তা পূরণ করিতে পারে না এবং সেই বাতিল করা সত্যের অভাবের জন্য সমগ্র জাতিকেই অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে হয়।’

অ্যারিওপ্যাগিটিকার সূচিটা এ রকম—উপক্রমণিকা, মুদ্রণ-নিয়ন্ত্রণের আগের ইতিহাস, সাধারণভাবে গ্রন্থের প্রয়োজন ও ব্যবহার, বর্তমান মুদ্রণ-নিয়ন্ত্রণবিধির বিরুদ্ধে যুক্তি, উপসংহার। বোঝাই যাচ্ছে, মিল্টন তার মূল কথাটি বলেছেন বর্তমান মুদ্রণ-নিয়ন্ত্রণবিধির বিরুদ্ধে যুক্তি অধ্যায়ে। এ অধ্যায়ে মিল্টন মূলত চারটি যুক্তিকে মোটাদাগে তুলে ধরেছেন এবং সেগুলোকে বিশদ আলোচনা করেছেন। মিল্টনের যুক্তিগুলো ছিল এ রকম—

ক. জারীকৃত নির্দেশনা অভীপ্সিত উদ্দেশ্য-সাধনে ব্যর্থ হবে&dquote;&dquote;

খ. আইনটি ইংরেজ জাতি তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর, কারণ—

এ আইন বিদ্যানুশীলনে অবনতি ঘটাবে,

এটা পুরো ইংরেজ জাতির অপমানস্বরূপ

এ আইন মন্ত্রিসভাকে হেয়প্রতিপন্ন করেছে

এ আদেশ সত্যের ঘোর পরিপন্থী

বর্তমান মুদ্রণ-নিয়ন্ত্রণবিধির বিরুদ্ধে যুক্তি আলোচনাতেই মিল্টন সত্যের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা তুলেছেন, ‘সত্যের নিজস্ব একটি চাতুরী আছে, তা বেশ লক্ষ করার মতো। বিভিন্ন পদ্ধতি পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে তাকে যে সময়ের মধ্যে ধরা যায়, তা অপেক্ষা অনেক তাড়াতাড়ি সে নিজেকে মুক্ত করে দেয়, যদি সে স্বচ্ছন্দে ও সানন্দে প্রকাশের সুযোগ পায়। প্রথম থেকে আমি এটাই দেখাতে চেয়েছি, যেসব জাতি বা সুগঠিত রাষ্ট্র বইকে কোনো মূল্য দিয়েছে, তারা বই সম্পর্কে এ ধরনের অনুজ্ঞাপত্রদানের আইন কখনই করেনি।’

আমরা এ যুগেও একটি প্রশ্নের মুখে হরহামেশাই পড়ি আর তা হলো বইয়ের মূল্যায়ন কে করবেন, কীভাবে করবেন। মিল্টন স্পষ্টতই বলেছেন, চাইলেই যে কেউ বইয়ের মূল্যায়ন করতে পারেন না। যিনি বা যারা বইয়ের মূল্যায়ন করবেন, তাকে ‘এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই বইগুলো জগতে আলগোছে ভেসে আসুক আর না আসুক যে লোককে এসব বইয়ের জীবন-মৃত্যুর বিচারক হতে হবে, তাকে সাধারণ পর্যায়ের মানুষ থেকে ঊর্ধ্বে অবস্থিত হতে হবে। তাকে পড়ুয়া যেমন হতে হবে, তেমনি বিদ্বান এবং একই সঙ্গে বিচারশীলও হতে হবে। তা না হলে বইকে মূল্যায়নে বিরাট ভুল হওয়ার আশংকা থাকে।’ মিল্টনের যুক্তি হলো, বই মূল্যায়নের জন্য এমন গুণসম্পন্ন বিচারক খুব বেশি পাওয়া সম্ভব নয়। আর পেলেও তাদের ধরে গাদা গাদা বই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়ানোটা তাদের মেধা ও সময় অপচয়ের শামিল। এই অনর্থক কর্মযজ্ঞ দিয়েও সব বই মূল্যায়ন সম্পন্ন করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল পাওয়া সম্ভব নয়। মিল্টন তাই মনে করেন, এ যুক্তিতেই আইনটি যে কার্যকর হবে না, সেটা বলা যায়। আর বই প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে যে সমাজে ভালো মানুষ তৈরি করা যায় না, সে বিষয়েও মিল্টন ইংরেজ শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, ‘মানুষের আচরণ-ব্যবহার সংশোধন করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আপনাদের একবার ইতালি ও স্পেনের দিকে দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করব। এ দেশগুলোয় বই নিয়ন্ত্রণে তদন্ত-বিচার কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিন্তু তাতে দেশগুলোয় একটু বেশি ভালো, সৎ বা জ্ঞানী, নৈতিক জীবনে বেশি সংযমী মানুষ তৈরি হয়েছে কি?’&dquote;&dquote;

‘আইনটি ইংরেজ জাতি তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর’ অংশে মিল্টন যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন এ আইন কেন শুধু ইংল্যান্ডের জন্য নয়, বরং দুনিয়ার জন্যই ক্ষতিকর। ‘শুধু বিদ্যার পক্ষে নয়, বিদ্বানের পক্ষেও আপনাদের এই আদেশ হলো সর্বপ্রথম এবং সর্ববৃহৎ নিরুৎসাহ এবং প্রকাশ্য অবমাননা।’ একজন জ্ঞানচর্চাকারী, বিদ্বানের বইকে কোনো সরকারি পরীক্ষকের মুখোমুখি হতে হবে—এটি ছিল মিল্টনের বিবেচনায় ভয়ানক অপমানজনক এক ঘটনা। ‘তিনি তার কঠোর পরিশ্রম, বিনিদ্র রজনী, জ্ঞানসাধনায় ব্যয় করা প্রদীপের তেল নিয়ে হাজির হবেন একজন অনুমতিদানকারী কর্মকর্তার সামনে! সেই অনুমতিদানকারী সম্ভবত বয়সে অনেক ছোট, বিচারক্ষমতায় অনেক নিকৃষ্ট; সম্ভবত এমন একজনের কাছে যেতে হবে যিনি বই লেখার পরিশ্রম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার হয়ে লেখকের মনে যদি ঘৃণা না ধরে যায়, তাহলে তার লেখা ছেপে প্রকাশিত হবে। সেটা আবার কেমন চেহারায়? তার বইয়ের শিরোনামের পিঠে লেখা থাকবে তার নিয়ন্ত্রণকারীর নাম—লেখক যে একজন আস্ত মূর্খ নন, তিনি যে প্রলোভনকারীও নন, তার জামিনদার হিসেবে। এটা যে একজন লেখক, একটি বই এবং জ্ঞানের মর্যাদার প্রতি বিরাট অবমাননা, তাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।’ এরপর মিল্টন বলেছেন পাঠকের মর্যাদার কথা। অনুমতিপত্রসংবলিত বই একজন বিদগ্ধ পাঠকের বিরক্তি উদ্রেক করবে। এ রকম বই হাতে নিয়ে সেই পাঠকের মনোভাব কেমন হতে পারে? ‘যিনি নিজেই অন্যের অধীনে ছাত্র, এমন একজন শিক্ষককে আমি ঘৃণা করি; যে লেখক একজন পরিদ্রষ্টার উদ্যতমুষ্টির অভিভাবকত্বে আমার সামনে হাজির হয়েছেন, তাকে আমি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারব না।’

মিল্টনের বিদগ্ধ পাঠক এবার লেখককে ছেড়ে একহাত নিয়েছেন স্বয়ং রাষ্ট্রকে। বোঝাই যাচ্ছে পাঠক হিসেবে নিজের মতকেই মিল্টন কোনো বিদগ্ধ পাঠকের চরিত্র দিয়ে বলাচ্ছেন। ‘রাষ্ট্র হবে আমার শাসনকর্তা, সমালোচক নয়। রাষ্ট্র সহজেই এ অনুমতিপত্রদানকারী নির্বাচনে ভুল করতে পারে। আবার এ অনুমতিদানকারীরাও লেখক নির্বাচনে ভুল করতে পারেন।’

বই প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ আইন আরেক ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে বলে মিল্টন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত শতকের কাফকার মতো মিল্টনের আমলেও অনেক লেখক জীবদ্দশায় খ্যাতি পাননি। এখন যদি এ রকম কোনো লেখকের বই পুনর্মুদ্রণ বা মুদ্রণই হতে যায়, তাহলে সেটাকে অনুমতিদানকারী কর্মকর্তার সামনে হাজির হতে হবে। এবার যদি সেই লেখকের লেখায় দু-একটি তীক্ষ, যুগান্তকারী মন্তব্য, বিশ্লেষণ থাকে আর যদি সেগুলো কর্মকর্তার পছন্দ না হয়, তাহলে তো এ জ্ঞানভাণ্ডারের খোঁজ কোনোকালেই মানুষ পাবে না।

মিল্টন মনে করতেন মুদ্রণ নিয়ন্ত্রণ বিধি ইংরেজ জাতির জন্য মর্যাদাহানিকর। ‘ইংল্যান্ডের যত নব নব উদ্ভাবন, ইংল্যান্ডের শিল্পকলা, রসবোধ, গম্ভীর ও বলিষ্ঠ বিচারবুদ্ধি—এসবকে আমি এত হালকা জিনিস মনে করি না যে সেগুলো শুধু ২০ জন কর্মকর্তাই বুঝতে পারবেন।’ অনেক খারাপ মানুষ ইংল্যান্ডে বিধি-নিষেধ ছাড়াই ঘুরে বেড়াতে পারবে আর বইকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে—এমন পরিস্থিতি মিল্টনের মতো মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন ছিল। আর সে কথা তিনি জানাতে দ্বিধা করেননি। কর্মকর্তাদের অনুমোদিত বইয়ের চেহারা কেমন হবে, সেটা জানাতে মিল্টন ভুল করেননি। এজন্য তিনি ধার করেছিলেন ফ্রান্সিস বেকনের একটি উক্তিকে—‘এসব অনুমতিপ্রাপ্ত বই শুধু সাময়িক কথা ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে না।’