সিন্ধু হাইকোর্ট নয়জন অভিযুক্তের সবাইকে বেকসুর খালাস হিসেবে ঘোষণা করল। এ রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করল প্রাদেশিক সরকার। ২০১৪ সালের এপ্রিলে আপিলের রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট। সিন্ধু হাইকোর্টের রায়কেই বহাল রাখা হয়। সুপ্রিম কোর্টের এ সিদ্ধান্তকে বড় বিজয় হিসেবে উদযাপন করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল ‘মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট’। অভিযুক্তরা দলটির সদস্য ছিল। ১৯৯৮ সালের ১৭ অক্টোবর করাচির আরামবাগ এলাকায় বিখ্যাত ইউনানি চিকিৎসক হাকিম মুহম্মদ সাঈদকে হত্যার দায়ে তাদের গ্রেফতার করেছিলেন করাচির পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক আমিন কোরেশি। প্রাদেশিক আদালত প্রত্যেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। আসামিরা এ রায়ের বিরুদ্ধে সিন্ধু হাইকোর্টে আপিল করে এবং মুক্তি পেয়ে যায়। ফলে আরো অনেক হত্যাকাণ্ডের মতো হামদর্দ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হাকিম মুহম্মদ সাঈদের হত্যাও রহস্যাবৃত ও অমীমাংসিতই থেকে গেল। মৃত্যুর সময় তার গায়ে ছিল সাদা শেরওয়ানি ও কুর্তা। এটি ছিল তার ট্রেডমার্ক পোশাক। এ প্রসঙ্গে ২০১১ সালে ‘দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’কে তার মেয়ে সাদিয়া রশিদ বলেন, ‘তার গায়ে ছিল সেই একই সাদা পোশাক। হাতে ছিল তসবিহ আর কয়েকটি বই।’ সাদা পোশাক যেন হাকিম মুহম্মদ সাঈদের সাদামাটা ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনেরই প্রতিচ্ছবি। আর তাতে দাগ লাগিয়ে খুনিরা রচনা করল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ইউনানি চিকিৎসক হিসেবে যে মানুষটি সারা বিশ্বের মানব সম্প্রদায়ের আরোগ্যের জন্য নিজের সবটুকু ব্যয় করেছিলেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার দেশের মানুষের হাতেই তাকে প্রাণ হারাতে হলো।
১৯৪৮ সালে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে পাকিস্তানে চলে আসেন ১৯২০ সালের ৯ জানুয়ারি দিল্লিতে হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ ও রাবিয়া বেগম দম্পতির ঘরে জন্ম নেয়া হাকিম মুহম্মদ সাঈদ। তিনি ছিলেন তাদের ছোট ছেলে। বড় ভাইয়ের নাম হাকিম আবদুল হামিদ। তিনি ভারতেই থেকে যান।
হাকিম আবদুল হামিদ ও হাকিম মুহম্মদ সাঈদ উত্তরাধিকার সূত্রে হারবাল ওষুধ ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হামদর্দের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, যার যাত্রা হয়েছিল ১৯০৬ সালে, তাদের পিতা হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের হাত ধরে। ১৯২২ সালের ২২ মার্চ মাত্র ৪০ বছর বয়সে ১৮৮৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের পেলিভেটে জন্ম নেয়া আবদুল মজিদের জীবনশিখা নির্বাপিত হয়। সন্তানরা তখন নাবালক। হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে তখন হামদর্দের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাবিয়া বেগম। তার পিতার নাম শেখ করিম বখশ। ১৯০০ সালে হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের সঙ্গে রাবিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিশেষ না থাকলেও মানবিক গুণাবলির দিক দিয়ে তার কোনো ঘাটতি ছিল না। দক্ষ নাবিকের মতো হামদর্দের হাল ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে যাবতীয় বাধা-বিপত্তি থেকে বাঁচিয়ে স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। সে সময় তিনি যদি মানসিক শক্তি ও সাহসের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হতেন, হামদর্দের ইতিহাস হয়তো ভিন্নভাবে লিখতে হতো। মায়ের দেখানো পথে কালক্রমে হামদর্দের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হাকিম আবদুল হামিদ। একজন স্বনামখ্যাত ইউনানি চিকিৎসক হওয়ার পাশাপাশি তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকে দিল্লিতে ‘জামেয়া হামদর্দ’ এবং ‘হামদর্দ পাবলিক স্কুল’-এর মতো শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান রাখেন হাকিম আবদুল হামিদ। তিনি ছিলেন জামেয়া হামদর্দের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য। ১৯৬৯ সালে দিল্লিতে ‘গালিব একাডেমি’ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছিলেন তিনি। জনহিতৈষী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি ১৯৪৮ সালে হামদর্দ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং ১৯৬৪ সালে হামদর্দ ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ‘মজিদিয়া হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হাকিম আবদুল হামিদ। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাকে ১৯৬৫ সালে পদ্মশ্রী এবং ১৯৯২ সালে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগ পর্যন্ত হামদর্দের ব্যবসা হাকিম আবদুল হামিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও দেশভাগের পর বিভাজিত হয় হামদর্দ। যাত্রা হয় হামদর্দ পাকিস্তানের। আর এ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হলেন হাকিম আবদুল হামিদের ছোট ভাই হাকিম মুহম্মদ সাঈদ, নিজ যোগ্যতা ও গুণে যিনি হামদর্দ পাকিস্তানকে জনপ্রিয় করেছেন, সেই সঙ্গে নিজেও একজন ইউনানি চিকিৎসক হিসেবে জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। হামদর্দ বাংলাদেশের সূচনাও তার হাতেই। লেখক হিসেবেও তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন। ২০০টিরও বেশি বই রচনা ও সম্পাদনার সঙ্গে তার নাম জড়িত। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন। তার ভ্রমণ কাহিনীও প্রকাশিত হয়েছে। আইয়ুব খানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেনারেল বুরকি ইউনানি চিকিৎসাকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চালালে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলেন হাকিম মুহম্মদ সাঈদ। ইউনানি চিকিৎসার স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি পত্রিকায় লেখালেখি এবং কনফারেন্সের আয়োজন করেন। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের সরকার ইউনানি চিকিৎসাকে বৈধতা দিয়ে আইন পাস করতে বাধ্য হয়েছিল। তার প্রচেষ্টাতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইউনানি চিকিৎসাকে স্বীকৃতি দেয়।
বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে হাকিম মুহম্মদ সাঈদও অনাড়ম্বর, বিলাসিতাবিবর্জিত ও কর্মমুখর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘কাজ করা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই’। রাজনীতিতেও অবদান রেখেছেন হাকিম মুহম্মদ সাঈদ। ১৯৯৩ সালের ১৯ জুলাই থেকে ১৯৯৪ সালের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের গভর্নর ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৭ অক্টোবর তার জীবনাবসান হয়। প্রায় এক বছর পর ১৯৯৯ সালের ২২ জুলাই মারা যান তার বড় ভাই হাকিম আবদুল হামিদ। এভাবেই হামদর্দের দ্বিতীয় প্রজন্মের সমাপ্তি ঘটে।
মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক





