না রুহ আফজা সা কোয়ি শরবত

কাভি বানেগা, না বান চুকা হ্যায়।

—সাহিল দেহলভি

রুহ আফজা এ উপমহাদেশে নিছক পানীয় হয়ে থাকেনি, প্রায় ১১৫ বছর ধরে কোনো নাম টিকে থাকলে, বলা ভালো তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকলে সেটা অতি অবশ্যই আর সাধারণ নাম হয়ে থাকে না, সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। এ নিয়ে অল্প কথায় একটা পর্যবেক্ষণের কথা বলা যায়। ডন পত্রিকায় এ বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত সাজিয়া হাসানের লেখায় ঘটনাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। বিয়ের আসরে কে কনে তা বোঝার একটা বড় বৈশিষ্ট্য তার পোশাকের রঙ, সেটা মোটামুটি এখনো লাল। কিন্তু যখন কোনো আসরে কনের গায়ে লাল শাড়ি, লেহেঙ্গা না থাকে তখন চট করে তাকে আলাদা করা যায় না। একমাত্র বরের পাশের নির্দিষ্ট আসনে বসার পর বা পরিপার্শ্বের পরিপ্রেক্ষিতে কনেকে চিনে নিতে হয়। উপমহাদেশের ইফতার টেবিলের চেহারায়ও এমন একটা পরিস্থিতি শনাক্ত করা যায়। ইফতার টেবিলে লাল রঙের শরবত কিংবা বরফ আর লাল সিরাপ মেশানো ঠান্ডা দুধের গ্লাস না থাকলে সেটা ইফতারের টেবিল হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হতে পারে অনেকের জন্য। অন্য কোনো শরবত, লাচ্ছি বা মিল্ক ড্রিংক তার জায়গা নিতে পারেনি। 

চারপাশের স্বাদ, গন্ধ রক্ত-মাংসের মানুষের স্মৃতি, পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে। তার অন্তর্গত যে জগৎ, সেখানে এমন অনেক কিছু মিলে ব্যক্তির সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে ওঠে। দিনশেষে এভাবে সমাজের সংস্কৃতিও নির্মিত হয়। সময়ের সঙ্গে এসব বদলায়, কিন্তু ব্যক্তির অন্তর্গত স্মৃতি টিকে থাকে। সম্ভবত এমন এক স্মৃতির সাহসে উর্দু কবি সাহিল দেহলভি লিখেছিলেন, রুহ আফজার মতো কোনো শরবত হয় না, ভবিষ্যতেও হবে না। সাহিল দেহলভির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ থেকে অদক্ষ হাতে লেখকের করা বাংলা অনুবাদ দাঁড়াচ্ছে এমন—

তুমি এর রঙের দিকে তাকালে, চোখে জাদুমন্ত্র খেলে যাবে

স্বাদ নিলে একবার, প্রাণ জেগে উঠবে

ঘ্রাণ তো সব ফুলের চেয়ে সেরা

কাজে যেন অমৃত

এর উদ্দীপনা জবানে ব্যাখ্যা করা যায় না

রুহ আফজার মতো শরবত কখনো হয়নি, হবেও না।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন একটা সময় ভারতে রুহ আফজার যেকোনো বিজ্ঞাপনেই বিশিষ্ট কবিদের কবিতার লাইন স্থান পেত। এ ঘটনা বিশেষত উত্তর ভারতের শিক্ষিত সমাজে রুহ আফজার বিশেষ আবেদন তৈরি করেছিল। 

আরো কবিরা রুহ আফজা নিয়ে লিখেছেন। সে প্রসঙ্গে আসছি একটু পরে, তার আগে একবার রুহ আফজা নামটির উৎস নিয়েও একটু খোঁজ করা যেতে পারে। রুহ আফজা উর্দু নাম, অর্থ যা আত্মাকে সজীব করে তোলে। হাকিম আবদুল মজিদ (রুহ আফজার উদ্ভাবক) নামটি নিয়েছিলেন উনিশ শতকের উর্দু কবি দয়া শংকর নাসিমের গ্রন্থ মসনবি গুলজার-এ-নাসিম থেকে। এ গ্রন্থের একটি চরিত্রের নাম রুহ আফজা। পানীয়ের নাম যখন নেয়া হলো কবির কাব্য থেকে, তখন যে তা একদিন সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে তা নিয়ে কেউ সেদিন নিশ্চিত হয়তো হতে পারেননি, তবে আজ তা বাস্তব। হাকিম মজিদের সঙ্গে তাহলে অমর হয়ে রইলেন কবি দয়া শঙ্করও। 

আবার ফেরা যাক কবিতায়। রুহ আফজা নিয়ে আরো দুই কবির রচনা—

সিমাব আজ অগ্নিকুণ্ডেও (দিল্লির তীব্র গরম) দাঁড়িয়ে আছে,  

এটাই হামদর্দের দয়া।

—সিমাব আকবরাবাদী


খাস সাকিকে সাগরের মেজাজ দিয়ে দাও,

খুবই তৃষ্ণার্ত আমি, মিনার জওহর দিয়ে দাও, 

হাঁ, ওই রুহ প্রদায়ী সত্তার আনুগত্যের শপথ, 

হামদর্দের রুহ আফজার পাত্র দিয়ে দাও। 

—জোশ মলিহাবাদী

নাম দেয়ার পর এ দৃশ্যকে ক্রেতার চোখের সামনে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়। সে কালে মির্জা নুর আহমদ ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। তিনি রুহ আফজার লেভেল আঁকলেন একাধিক রং ব্যবহার করে। কিন্তু এমন রঙে ছাপার মতো যন্ত্র তখন দিল্লিতে ছিল না। তাই তখনকার বোম্বেতে পার্সিদের বোল্টন প্রেস থেকে সেগুলো ছাপিয়ে আনা হয়। 

কথিত আছে রুহ আফজার প্রথম গ্রাহকরা নতুন এ পানীয়ের স্বাদে এমন বিমোহিত হয়েছিলেন যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শ-খানেক বোতল বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। বিপুল চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই হাকিম মজিদ দিল্লির পাশে গাজিয়াবাদে কারখানা খোলেন। ১৯৪০ নাগাদ দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের ঘরে ঘরে রুহ আফজা জায়গা করে নেয়।

রুহ আফজা নাম হিসেবে অভিধানেও স্থান করে নিয়েছে। মুহাজাবুল-লুঘাতে (খণ্ড-৬, পৃ.-১১৬, লখনৌ, ১৯৮৬) রুহ আফজাকে বলা হয়েছে—‘‌রুহ আফজা...যা সজীব করে...দিল্লির হামদর্দ দাওয়াখানার প্রস্তুতকৃত বিখ্যাত পানীয়।’

অরুন্ধতী রায়ের সর্বশেষ উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেসে উপস্থিত আছে রুহ আফজা— 

‘‌‍ভারত ও পাকিস্তানের নতুন সীমান্ত...লাখ লাখ মানুষ ঘৃণার আগুনে মারা গেল। প্রতিবেশীরা এমনভাবে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন তারা কোনোদিন কেউ কাউকে চিনত না, কেউ কারো বিয়ের অনুষ্ঠানে যায়নি, কেউ কারো গান গায়নি। শহরঘেরা দেয়াল ভেঙে পড়ল। মুসলিমদের পুরনো পরিবারগুলো পালাল। তাদের জায়গায় হাজির হলো হিন্দু পরিবার এবং তারা শহরের প্রান্তে বসতি স্থাপন করলেন। রুহ আফজার জন্য খুব খারাপ দিন এল। কিন্তু দ্রুতই তারা পরিস্থিতি সামলে নিল, নতুন শাখা চালু হলো পাকিস্তানে। সিকি শতাব্দী পরে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার পর নতুন দেশ বাংলাদেশে চালু হলো আরেকটি শাখা। কিন্তু ধীরে ধীরে আত্মার অমৃত, যা যুদ্ধ ও তিনটি নতুন দেশের জন্ম প্রত্যক্ষ করে টিকে ছিল, দুনিয়ার আরো অনেক কিছুর মতো কোকা-কোলার উল্লাসে কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে।’ দিল্লি বা উত্তর ভারতে কিংবা উপমহাদেশের সাধারণ ইতিহাসে রুহ আফজা সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে কতটা শক্তিশালী তা বুঝতে অরুন্ধতীর উপন্যাসের এ লাইনগুলো যথেষ্ট। 

এস এম রশিদ: লেখক