আশির দশকে পাকিস্তানে রুহ আফজার সঙ্গে ক্যাপশনটি যুক্ত হয়েছিল। দেশটিতে তখন অনেক কোম্পানি পানীয় তৈরির উপযোগী লাল সিরাপ তৈরি করছিল। সেগুলো থেকে রুহ আফজার স্বকীয়তা এক বাক্যে প্রকাশ করতে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। রুহ আফজার যাত্রা কিন্তু শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে, ১৯০৬ সালে, পুরান দিল্লির ছোট একটি দোকানে। দোকানের নাম হামদর্দ। ফার্সি শব্দটির অর্থ সমব্যথী। আর রুহ আফজার রূপায়ণের পেছনের মাথাটি ছিল আবদুল মজিদের, যিনি একই সঙ্গে হাকিম ও হাফিজ ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, রুহ আফজা অঙ্কুরিত হয়েছিল হাকিম মুহাম্মদ কবিরউদ্দিনের হাতে, আর ১৮৮৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম নেয়া শেখ রহিম বখশের পুত্র হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ এর পরিপূর্ণ রূপ দিয়েছিলেন। তার সহযোগী ছিলেন আরেক ইউনানি চিকিৎসক আনসারউল্লাহ তাবানি। হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেছিলেন। ফার্সি ও উর্দু ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। পর্যায়ক্রমে তিনি ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। তারপর স্ত্রী রাবিয়া বেগমের (তাকে বলা হয় ‘মাদার অব হামদর্দ’ সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি দিল্লির ‘হাউজ কাজি’ এলাকায় একটি দোকান খুলে হারবাল ওষুধ উৎপাদন শুরু করেন। ১৯২০ সাল নাগাদ তার ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠে ছোট দোকানটি পুরোদস্তুর উৎপাদন কারখানায় পরিণত হয়। কালের পরিক্রমায় তার বংশধরদের মাধ্যমে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হামদর্দের ব্যবসা বিকাশের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়াসহ সারা বিশ্বে জনপ্রিয় পানীয়ে পরিণত হয়েছে রুহ আফজা। আর হামদর্দ হারবাল পণ্যের ব্যবসাসফল এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। সামার ড্রিংক অব দি ইস্ট। পশ্চিমা বিশ্ব রুহ আফজাকে এ নামেই চেনে। রুহ আফজা ছাড়াও সাফি, সিনকারা, মাসতুরিন, জোশিনা ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী ওষুধের ব্র্যান্ডের জন্যও পরিচিত হামদর্দ। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে উপমহাদেশে রুহ আফজার আবির্ভাব। এ অঞ্চলে সিরাপটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে পুরনো এক পত্রিকার বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল—‘When the motor car was on its way in and the horse buggy on its way out, Sharbat Rooh Afza was there.’ ১৯৬৪ সালে সামাজিক দায়িত্ব পালনের লক্ষ্য সামনে রেখে হামদর্দ ফাউন্ডেশন যাত্রা করে। কোম্পানির লাভের পুরোটাই ফাউন্ডেশনে চলে যায়। ১৯২২ সালে মারা যান হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ। তার বড় ছেলে হাকিম আবদুল হামিদ তখন হামদর্দের হাল ধরেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। সহজাত দক্ষতা ও অর্জিত অভিজ্ঞতায় এ কোম্পানিকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

তীব্র দাবদাহে খাঁ খাঁ চারপাশ। তেষ্টায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। হিট স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে পথচারীরা। এমন পরিস্থিতিতে পুরান দিল্লির হামদর্দ দাওয়াখানার ছোট কুঠরিতে এক মনে পরিত্রাণের উপায় তৈরিতে মগ্ন একজন ইউনানি চিকিৎসক। বাজারে এল এক নতুন সিরাপ। রুবি পাথরের মতো লাল তার রঙ। দুধ কিংবা পানিতে তার কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যায় প্রাণ শীতলকারী এক পানীয়। তার তীব্র সুবাসে দোকানের সামনে ভিড় জমানো উৎসুক জনতার প্রশ্ন ছিল ‘এখানে কী হচ্ছে?’ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেল প্রথমবারের মতো তৈরি হওয়া সব রুহ আফজা। প্রস্তুতকারক হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ এর নাম দিলেন রুহ আফজা। নামটি কোথা হতে এল? কারো মতে, এটি হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের মাথা থেকেই বের হয়েছে। তবে অন্য সম্ভাবনাও আছে। উনিশ শতকের কাশ্মীরি কবি দয়া শংকর নাসিমের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মসনবি গুলজার-এ-নাসিম’। সেখানে একটি নারী চরিত্রের নাম রুহ আফজা। ১৮৮২ সালে জৌনপুর থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার নামও ছিল রুহ আফজা। অনেকে মনে করেন, এ দুই সূত্রের কোনো একটি থেকেই হয়তো হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ তার প্রস্তুতকৃত সিরাপের নামটি নিয়েছিলেন। রুহ আফজার বোতলের গায়ে সাঁটা লেবেলটির নকশা করেছিলেন মির্জা নুর আহমদ নামে এক শিল্পী। ১৯১০ সালে তিনি এর চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় দিল্লিতে এমন বর্ণিল লেবেল ছাপানোর উপকরণ ছিল না। তাই মুম্বাইয়ের পার্সি সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন বোল্টন প্রেসে বিশেষ ব্যবস্থায় রুহ আফজার লেবেল ছাপানো হয়েছিল। সূচনালগ্নেই ভবিষ্যৎ ব্যবসার ইঙ্গিত দিয়েছিল রুহ আফজা। সেই যে যাত্রা হলো, উপমহাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকের সাক্ষী হয়ে অদ্যাবধি স্বমহিমায় সে সফর জারি রেখেছে রুহ আফজা। ইতিহাসের সেসব পালাবদলের অন্যতম ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। যার অভিঘাত রুহ আফজার গায়েও লেগেছিল। নবগঠিত দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত হয়ে পড়ে পানীয়ের অন্যতম জনপ্রিয় এ ব্র্যান্ড। 

দেশ ভাগ হলো। ভাগ হলো রুহ আফজাও। হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের বড় ছেলে হাকিম আবদুল হামিদ তার দুই পুত্রকে নিয়ে ভারতে থেকেই ব্যবসা সামলাতে থাকেন। তখন অনেক মুসলিম পরিবার পাকিস্তানে হিজরত করছিল। কিন্তু ভারতকে নিজের মাতৃভূমি দাবি করে তা ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান হাকিম আবদুল হামিদ। কিন্তু তার ছোট ভাই হাকিম মুহম্মদ সাঈদের ভাবনা ছিল ভিন্ন। তিনি পাকিস্তানে চলে যান। গালফ নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার মেয়ে সাদিয়া রশিদ জানান, তার পিতা ১৯৪৮ সালের ৯ জানুয়ারি পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন। হাকিম মুহম্মদ সাঈদের হাতেই পাকিস্তানে হামদর্দের যাত্রা। এভাবেই বড় ভাই ভারতে এবং ছোট ভাই পাকিস্তানে বসে তাদের পিতার ব্যবসায়িক উত্তরাধিকার বয়ে নিতে লাগলেন। ভারতে হামদর্দের ব্যবসা ততদিনে জমজমাট। কিন্তু পাকিস্তানে রুহ আফজার যাত্রা করাতে হাকিম মুহম্মদ সাঈদকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। সাদিয়া রশিদের ভাষ্য অনুসারে, করাচির আরামবাগ এলাকায় দুই রুমের একটি বাসায় হামদর্দ পাকিস্তানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন হাকিম মুহম্মদ সাঈদ। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে হামদর্দ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটিকে ‘ওয়াকফ’-এ রূপান্তরিত করা হয়। পাকিস্তানে হামদর্দের প্রথম উৎপাদন কারখানা স্থাপিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। এর নাম ‘আল রাবিয়া হামদর্দ’। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হামদর্দ তিব্বিয়া কলেজ’। এটি উদ্বোধন করেছিলেন ‘মাদার-এ-মিল্লাত’ ফাতিমা জিন্নাহ। ১৯৮৩ সালে পাকিস্তানে হামদর্দের ইতিহাসে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা করে। এর নাম দেয়া হয় ‘মদিনাতুল হিকমত’। আর ১৯৮৯ সালে ‘বায়তুল হিকমত’ নামে পাকিস্তানের অন্যতম বড় ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করে হামদর্দ। ভারত, পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশে হামদর্দের যাত্রা হয় ১৯৫৩ সালে, ঢাকায়। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় অদ্যাবধি জারি আছে হামদর্দ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। সারা দেশে চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছে হামদর্দ। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগীদের বিনামূল্যে সব ধরনের সেবা দেয়া হয়। রোগীদের কেবল ওষুধের দাম পরিশোধ করতে হয়। সোনারগাঁয় ঔষধি গাছের একটি বাগান স্থাপন করেছে হামদর্দ। দুর্লভ ও মূল্যবান ঔষধি গাছের চাষ ও সংরক্ষণের জন্য চট্টগ্রামে ৩০০ একর জমির ব্যবস্থা করেছে হামদর্দ বাংলাদেশ। এ প্রকল্প সফল হলে হারবাল পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানি করতে হবে না। বরং রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ভূমিকা রাখা যাবে। ‘হামদর্দ বিজ্ঞান নগর’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে হামদর্দ বাংলাদেশ। পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছে এ প্রতিষ্ঠান। এসব গবেষণাগারে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সমাবেশ ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা এসব যন্ত্র পরিচালিত হয়।

পানীয় হিসেবে সারা বছর রুহ আফজার জনপ্রিয়তা থাকলেও রমজান মাসে এর চাহিদা যেন বহু গুণ বেড়ে যায়। ইফতারিতে আলাদা ব্যঞ্জনা তৈরি করে রুহ আফজা। সারা দিন রোজা রাখার পর এক গ্লাস রুহ আফজার শরবত নিমেষেই শরীরের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। তাই প্রতিটি ঘরে শোভা পায় রুহ আফজার বিশেষ আকৃতির বোতল। রুবি পাথরের মতো লাল সে পানীয় দেখতেও চিত্তাকর্ষক। তবে কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের কাছে সমাদৃত পানীয় হিসেবেই আটকে থাকেনি রুহ আফজার পরিচয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উপমহাদেশের সব মানুষের পছন্দের পানীয় তালিকায় অন্যতম অবস্থান দখল করেছে রুহ আফজা।

সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-সাহিত্যিকরাও প্রেমে পড়েছেন রুহ আফজার বর্ণ ও স্বাদের। তাদের অন্যতম ছিলেন সাহিল দেহলভি। তার রচিত কবিতা রুহ আফজার বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছে হামদর্দ। রুহ আফজা তার রূপ ও গুণ দিয়ে হরণ করেছিল সাহিলের হৃদয়। তার প্রেমে মজেছিলেন দিল্লির এ কবি। কবিতায় ঘটিয়েছেন তার অন্তরের সে অনুভূতির সার্থক প্রতিফলন। রুহ আফজাকে নিয়ে সাহিল দেহলভির সেই বিখ্যাত কবিতার শেষ দুটি লাইন—‘না রুহ আফজা সা কোয়ি শরবত / কাভি বানেগা, না বান চুকা হ্যায়।’

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক