কুমিল্লা ছিল এককালের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ১৭৯০ সালে কুমিল্লাকে করা হয় ত্রিপুরা জেলা। পরে ১৯৬০ সালে পুনরায় কুমিল্লা জেলা নামে পরিচিত হয়। ঐতিহাসিক কুমিল্লা ও ত্রিপুরার ইতিহাসচর্চায় রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস একটি আকরগ্রন্থ। কৈলাসচন্দ্র সিংহ রচিত এ গ্রন্থ ১৮৯৬ সালে কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত হয়। অবশ্য এর বেশ কয়েক বছর আগেই কৈলাসচন্দ্র ১৮৭৬ সালে রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন।

কৈলাসচন্দ্র সিংহ ১২৫৮ বঙ্গাব্দে তত্কালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার কালিকচ্ছ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হিন্দু ইতিহাস নামের একটি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তিনি ব্রাহ্ম সমাজ নামের একটি পত্রিকার প্রথম সহকারী সম্পাদক ছিলেন। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এ পত্রিকার সম্পাদক। বলা হয়, কৈলাসচন্দ্রের লেখা রাজমালা বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম কোনো জেলার ইতিহাস। তিনি কাঙ্গালের গীতা নামেও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি প্রয়াত হন ১৩২১ বঙ্গাব্দে।

রাজমালা থেকে জানা যায়, সে সময় ত্রিপুরা জেলা তিনটি উপবিভাগে বিভক্ত ছিল—সদর (কুমিল্লা), ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর। সম্ভবত ১৮৬০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর বা কুমিল্লা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। চাঁদপুর উপবিভাগ গঠিত হয়েছিল ১৮৭৮ সালে। সদর মহকুমা কুমিল্লায় থানা ছিল ছয়টি—কোতোয়ালি, চাঁদিনা (নিঃসন্দেহে বর্তমানে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা), মুরাদনগর, দাউদকান্দি, লাকসাম ও চৌদ্দগ্রাম। কুমিল্লার জনসংখ্যা তখন ৮ লাখ ২১ হাজার ২৮৫।

রাজমালায় ত্রিপুরার প্রধান নগরী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে কুমিল্লাকে। রাজমালায় কুমিল্লার একটি ভৌগোলিক বর্ণনা পাওয়া যায়—‘ত্রিপুরার প্রধান নগরী কুমিল্লার ৫ মাইল পশ্চিমে লালময়ী-ময়নামতি পর্বত অবস্থিত। উত্তর দক্ষিণে ইহার দৈর্ঘ্য ১০ মাইল। ইহার পরিধি ২১ মাইল। এই পর্বত সমতল ক্ষেত্র হইতে গড়ে ৪০ ফিট উচ্চ। কিন্তু ইহার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ প্রায় ১০০ ফিট উচ্চ হইবে। অধুনা এই পর্বতটি জঙ্গলাবৃত, কিন্তু প্রাচীনকালে এই পর্বতে মনুষ্যের বাস ছিল। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কালীর বাজার রাস্তা প্রস্তুত কালে পর্বত শিখরে একটি সুন্দর দুর্গ আবিস্কৃত হইয়াছে। সেই দুর্গের পার্শ্বে প্রস্তর নির্মিত সুন্দর দেবমূর্তিসকল প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। আমরা পূর্বে রণবঙ্কমল্লের তাম্র শাসনের কথা উল্লেখ করিয়াছি। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে তাহাও এই পর্বত মধ্যে পাওয়া গিয়াছিল। ত্রিপুরার তদানীন্তন জজ-ম্যাজিস্ট্রেট ইলিয়ট সাহেব তত্কালে সেই তাম্রশাসন কলিকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রেরণ করেন।

‘এই পর্বতটি ত্রিপুরার মহারাজ তাহার স্বাধীন রাজ্যের একাংশ বলিয়া জ্ঞান করিতেছেন। কোনো কোনো ইংরেজ কর্তৃপক্ষও এরূপ লিখিয়াছেন। অল্পকাল হইল গভর্নমেন্টের সহিত এই পর্বত লইয়া মহারাজের একটি বিরোধ উপস্থিত হয়। অবশেষে গভর্নমেন্ট ২ হাজার ১০০ হাজার টাকা সেলামী গ্রহণে লালময়ী পর্বতটি লাখেরাজ স্বরূপ মহারাজকে দান করেন কিন্তু ময়নামতী শৃঙ্গটি ত্রিপুরা রাজ্যের একাংশ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন।’


রাজমালার এক অংশে কুমিল্লার তত্কালের জমিদারদের কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। অবশ্য উনিশ শতাব্দীতে তার সবাই গৌরব হারাচ্ছেন। রাজমালা থেকে—‘স্থানীয় প্রধান ও প্রাচীন জমিদারগণ প্রায় সকলেই হূতসর্বস্ব হইয়াছেন। অদ্যাপি যাহারা জমিদার আখ্যা দ্বারা পরিচিত হন, তন্মধ্যে হোমনাবাদের অন্যতম জমিদার সৈয়দ বসরত আলি চৌধুরী সর্বপ্রধান। আমরা দুঃখের সহিত উল্লেখ করিতেছি যে, সৈয়দ সাহেব উন্মাদ, তাঁহার সম্পত্তি জজসাহেবের অধীনে ম্যানেজার দ্বারা শাসিত হইতেছে।

‘হোমনাবাদের প্রাচীন জমিদার বংশজাত ইউছফ আলি চৌধুরী সাহেব দানশীল ও প্রজাহিতৈষী জমিদার বটেন। স্বীয় অবস্থা অনুসারে তিনি মুক্তহস্তে সত্কার্যে অর্থদান করিয়া থাকেন। তাহার ভগিনী নবাব ফয়জুন্নেসা সাহেবা ভ্রাতার উপযুক্তা বটেন। উক্ত নবাবসাহেবা রূপজালাল নামক একখানি উপাখ্যান গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। ইহার ভাষা বিশুদ্ধ বাংলা।’ রাজমালায় পাওয়া গেল নবাব ফয়জুন্নেসাকেও! তিনি এশিয়ার একমাত্র নারী নবাব। রূপজালাল কোনো বাঙালি মুসলিম নারী কর্তৃক রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যকর্ম।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন এ অঞ্চলে ব্রিটিশদের পদচ্ছাপ পড়েছিল তখন তারা কুমিল্লা ও সংলগ্ন এলাকার কৃষি ব্যবস্থার অনুন্নত চেহারা, বনজঙ্গল নিয়ে খেদ প্রকাশ করেছিলেন। ১৭৯৮ সালে ফ্রান্সিস বুকাননের কুমিল্লা সফরের বিবরণী পাঠ করলে তা জানা যায়। তবে কৈলাসচন্দ্র সিংহ তার রাজমালায় জানাচ্ছেন যে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে—‘ব্রিটিশাধিকারের প্রারম্ভে ইংরেজ কর্তৃপক্ষগণ যাহাকে “নিবিড়, অরণ্যপূর্ণ ও বিরল মনুষ্য বসতি” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছিলেন, শতাধিক বৎসর পূর্বে বন্য মহিষ ও বরাহ প্রভৃতি হিংস্র জন্তুগণ যে সমতল ক্ষেত্রে নির্ভয়ে বিচরণ করিত—অধুনা সেই ত্রিপুরা শ্যামলশস্যশালী একটি সুন্দর কৃষিক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছে। এই নানা প্রকার শস্য উত্পন্ন হইতেছে, তন্মধ্যে ধান্য, পাট ও গুবাক প্রধান।’

কৈলাসচন্দ্র সিংহ তার গ্রন্থে জানিয়েছেন, ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমাণিক্য সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার করুণ পরিণতিতে দুঃখিত ছিলেন। সবারই জানা, সুজা আরাকানে নিহত হয়েছিলেন। গোবিন্দমাণিক্য কুমিল্লা শহরে সুজার স্মৃতিতে শাহ সুজা মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। অবশ্য এ নিয়ে বিতর্ক আছে। আরেকটি মত হলো শাহ সুজা নিজে ত্রিপুরা জয় করে এ মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন।

রাজা গোবিন্দমাণিক্য ব্রাহ্মণদের বিপুল পরিমাণ জমি দিয়েছিলেন। তিনি কুমিল্লার দক্ষিণে একটি দীঘি খনন করান। তিনি এ রকম বহুবিদ সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন। ১৬৬৯ সালে তার মৃত্যু হয়।


কৈলাসচন্দ্র জানিয়েছেন, সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল বিদ্যা ও শিল্প বেশ অগ্রগামী। বিগত শতাব্দীর প্রথম ভাগে ডি. ফো. বলেছিলেন, ‘ভারতের শিল্পীগণ আমাদের সর্বনাশ করিল। এক্ষণে আমরাও বলিতে পারি যে, ইংরেজ শিল্পীগণ আমাদের সর্বনাশ করিতেছে। কার্পাস বস্ত্র-বয়ন ত্রিপুরার প্রধান শিল্পকার্য ছিল। আমরা পূর্বে বলিয়াছি বিদ্যালোচনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপবিভাগবাসীগণ ত্রিপুরার শীর্ষ স্থানে বিরাজ করিতেছেন। তদ্রুপ শিল্পকার্যের জন্যই তাহারা শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করিয়াছিল। সরাইলের তন্তুবায়গণ কার্পাস সূত্র দ্বারা উত্কৃষ্ট তঞ্জেব, ধুতি, চাদর ও শাড়ি প্রস্তুত করিত। ২০-২৫ বৎসর পূর্বে আমরা যাহা দর্শন করিয়াছি এক্ষণ তাহাও লোপ পাইতেছে। প্রাচীন “ঢাকাই মসলিন” জগতে অতুলনীয় বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছিল। সেই মসলিনেরই স্থানীয় নাম তঞ্জেব। যে তঞ্জেবের পোশাক পরিধান করত আওরঙ্গজেব বাদশাহের এক কন্যা তাহার নিকট উপস্থিত হইলে সম্রাট উহাকে উলঙ্গ বলিয়া ভর্ত্সনা করিয়াছিলেন, সেই তঞ্জেব প্রচুর পরিমাণে সরাইলে প্রস্তুত হইত। কিন্তু তাহা ঢাকাই তঞ্জেবের সহিত বিদেশে প্রেরিত হইত বলিয়া বিদেশবাসীগণ সরাইলের নাম জ্ঞাত ছিলেন না। সরাইলের তন্তুবায়গণের প্রস্তুত ২০-২৫ টাকা মূল্যের ধুতির জোড়া আমরা দর্শন করিয়াছি। পাইরের সূক্ষ্ম কার্যের জন্য এই সকল বস্ত্রের মূল্য বৃদ্ধি হইত না, কারণ সরাইলের তন্তুবায়গণ পাইরের কার্যকে অতি তুচ্ছ বিবেচনা করিত। সূক্ষ্ম সূত্র দ্বারা তাহারা অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় প্রদান করিত।’

কুমিল্লা শহরে অবস্থিত টাউনহল ও শহরের সবচেয়ে পুরনো গ্রন্থাগার বীরচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি দুটোই প্রতিষ্ঠা করেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্রমাণিক্য বাহাদুর। তার সম্পর্কে রাজমালায় উল্লেখ আছে—‘মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্য বাহাদুরের আকৃতি নাতিদীর্ঘ, নাতিখর্ব, বর্ণ বিশুদ্ধ গৌর, তিনি সর্বাঙ্গসুন্দর, মুখশ্রী অনেকটা বাঙালির ন্যায়, চক্ষু সুন্দর, নাসিকা উন্নত। মহারাজ বাংলা ভাষায় বিশেষ ব্যুত্পন্ন, তিনি একজন সুকবি। তত্প্রণীত দুইখানা কবিতা পুস্তক আমরা দর্শন করিয়াছি।...মহারাজ উর্দু ও মণিপুরী ভাষায় মাতৃভাষার ন্যায় আলাপ করিতে পারেন। ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষা সামান্য রূপ অবগত আছেন।’ কৈলাসচন্দ্র জানিয়েছেন, বীরচন্দ্র তার কবিতা প্রকাশ করলে বাঙালি কবিসমাজে উচ্চ আসন পেতেন।

 

অমিত রহমান: লেখক