[লোকসংস্কৃতি গবেষক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার দীনেশচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৬৬ সালে মানিকগঞ্জ জেলায়। তিনি জগন্নাথ স্কুল থেকে এনট্রান্স (১৮৮২), ঢাকা কলেজ থেকে এফএ (১৮৮৫) পাস করেন। এরপর পিতা-মাতার মৃত্যুর কারণে তিনি বহিরাগত ছাত্র হিসেবে পরীক্ষা দিয়ে ১৮৮৯ সালে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তার কর্মজীবন শুরু হয় সিলেটের হবিগঞ্জ স্কুলে (১৮৮৭)। পরে তিনি কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশন (১৮৮৯) ও ভিক্টোরিয়া স্কুলের (১৮৯০) প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেন।

কুমিল্লায় কেটেছে দীনেশচন্দ্র সেনের কর্ম ও গবেষণাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গ্রন্থ কুমার ভূপেন্দ্রসিংহ (১৮৯০)। এটি একটি আখ্যান কাব্য। কুমিল্লায় অবস্থানকালে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রাচীন বাংলার পুথি সংগ্রহ করেন। বিপুল শ্রমসাধ্য এ কাজে তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন এবং দীর্ঘ সময়ের গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৯৬ সালে কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত হয় তার বঙ্গভাষা ও সাহিত্য শীর্ষক একটি আকরগ্রন্থ। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ওপর এ গবেষণাগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সমকালের পণ্ডিতদের প্রশংসা লাভ করে।

দীনেশচন্দ্র সেনের স্মৃতিকথা ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য গ্রন্থে তার কুমিল্লাজীবনের গল্প জানা যায়। গ্রন্থের ‘কুমিল্লায় চাকুরী’ অধ্যায়ের কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে সংকলিত হলো। লেখার বর্তমান শিরোনামটি আমাদের দেয়া]

যাহা হউক একরকম পাশ হওয়া গেল। ইহার পরে কুমিল্লা শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশনে ৫০ টাকা মাহিয়ানার হেডমাস্টারি পদ খালি হইয়াছে বিজ্ঞাপন দেখিয়া দরখাস্ত করিলাম। কুমিল্লায় আমার শ্বশুর উমানাথ সেন এবং আমার পিতার মাতুল চন্দ্রমোহন দাশ ছিলেন, তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। সুতরাং সে জায়গাটার উপর আমার একটা লোভ ছিল। কাজ জুটিয়া গেল। যে দিন নিয়োগ পত্র পাইলাম, সেই দিনই কালবিলম্ব না করিয়া পত্নী ও সদ্যোজাতা প্রথমা কন্যা মাখনবালাকে লইয়া হবিগঞ্জ ত্যাগ করিলাম।

কুমিল্লার জীবন স্মরণ করিতে এখনও আমার হিপণ্ড কাঁপিয়া উঠে। কত দুঃখই না সহিয়াছি। আমার গ্রহগণ সকলেই তখন আকাশ হইতে বোধ হয় এক যোগে আমার দিকে ক্রুদ্ধ নেত্রে তাকাইতেছিলেন। প্রথম হইতেই ঝগড়া, আত্মীয়েরা পর হইলেন, যে দুই এক জনকে যথাসর্বস্ব হারাইয়া একমাত্র আশ্রয়ের ন্যায় আঁকড়াইয়া ধরিয়াছিলাম, তাঁহারা পর হইলেন। শ্বশুর-শাশুড়ী পর হইলেন। চন্দ্রমোহন দাশ আমার প্রতি বিমুখ হইলেন, এবং আমার বড় ভগিনী দিগ্বসনী দেবী ঝগড়া করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে কাশী চলিয়া গেলেন। নিজেকে তেমন একা আর কখনও মনে করি নাই। মনে কেবল এক ইচ্ছা জাগিতেছিল, কি করিয়া প্রাণত্যাগ করা যায়। কত দিন মনে ভাবিয়াছি, কাহাকেও বাঘের মুখ হইতে রক্ষা করিতে যাইয়া যদি নিজে প্রাণ দিতে পারিতাম, কোন শিশুকে জলমগ্ন হওয়া হইতে বাঁচাইতে গিয়া যদি মরিতে সুযোগ পাইতাম, প্রাণ তো দিবই কিন্তু কাহারও মূলবান জীবনের পরিবর্তে যদি আমার এই ছার প্রাণটা দিতে পারিতাম, তবে মৃত্যু সার্থক হইত! আঁধার রাতে দুর্গম পথে চলিয়া গিয়াছি, নিবিড় মেঘগর্জনের সঙ্গে মন হইতে আর্তনাদ উঠিয়াছে, আমি সেই সর্পবহুল জঙ্গলের পথে এত অন্ধকারে প্রাণ তুচ্ছ করিয়া চলিয়াছি, কিন্তু আর আমার মা নাই, যিনি উত্কণ্ঠিত চক্ষু দুটি আমার পথের দিকে ফেলিয়া রাখিবেন। বিদ্যুৎ দেখিলে ছাতা খুলিয়া মাথায় দিয়াছি, শুনিয়াছিলাম, ছাতার লৌহ বিদ্যুৎ আকর্ষণ করে—অন্ধকারে যেখানে জঙ্গল বেশী সেই পথে চলিয়াছি, কিন্তু উরগ জাতীয় কোন বন্ধু আমার ভবপারের কাণ্ডারী হইয়া দর্শন দেয় নাই।

কুমিল্লা আসিবার পর আমার শ্বশুর মহাশয় ও ঠাকুরদাদা চন্দ্রমোহনবাবু বলিলেন, ‘তুমি কিছু না জানিয়া দরখাস্ত করিয়াছ। শম্ভুনাথ স্কুল স্কুলই নহে। ভিক্টোরিয়া স্কুলের কয়েকটি বিদ্রোহী ছাত্র একটা স্কুল খুলিবার চেষ্টা করিতেছে। শম্ভুনাথ নামক এক ধনী হিন্দুস্থানীর নামে স্কুলটা হইয়াছে; কিন্তু তিনি কয়েকদিনের জন্য ছেলেদিগকে স্কুল করিবার জন্য কয়েকটি তাঁবু দিয়াছিলেন—বাড়ী নির্মাণ কি অন্য কোন বিষয়ে কিছুই সাহায্য করেন নাই। এখন কয়েকটা ভাঙা খড়ো ঘরে স্কুল বসে, মাস্টাররা মাহিয়ানা পান না, তাঁহাদের গুণপনাও কিছুই নাই, অম্বিকাবাবু সেক্রেটারি, তাঁহার খুব আগ্রহ আছে কিন্তু পয়সাকড়ি নাই, তিনি কি করিবেন?’

চন্দ্রমোহনবাবু বলিলেন, ‘একবার আমাদের জিজ্ঞাসা করিলে না, অমনি দরখাস্ত করিয়া বসিলে?’ শ্বশুরবাড়ীর সম্মোহন-আকর্ষণ যে আমাকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করিয়া টানিয়া আনিয়াছিল, তাহা তাঁহাকে কি করিয়া বলিব! সুতরাং চুপ করিয়া রহিলাম। যাহা হউক স্কুলে যাইতে লাগিলাম। দেখিলাম মাস্টাররা যখন ইচ্ছা আসেন, যখন ইচ্ছা যান, আমি কৈফিয়ৎ চাহিলে মুচকি হাসিয়া পাশ কাটাইয়া যান। কেহ একটায় আসেন, দুইটায় যান, কলেজের প্রফেসারদের মত—গুণপনাও সেইরূপ। একজন একটি ছাত্রকে দাঁড় হইবার জন্য বারংবার বলিতেছিলেন ‘Stood up, stood up’, আর একজন ইতিহাস পড়াইবার সময় একটি ছত্র পাইলেন, ‘Babar founded the Mogul Empire’ অমনি চিত্কার করিয়া টিপ্পনী করিতে লাগিলেন, ‘find, found, found, এই তিন রকম পদ ব্যাকরণ-শুদ্ধ, কিন্তু এখানে লেখক founded লিখিয়াছেন, সাহেব কি না, যাহা ইচ্ছা লিখিয়া পার পাইলেন, বাঙালী হইলেই তাহার টিকিতে হাত পড়িত।’

আমি আমার আত্মীয় ইনস্পেক্টর দীননাথ সেন মহাশয়কে লিখিলাম, ‘শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশনের এ্যাফিলিয়েটেড হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কিনা।’ তিনি অতি স্পষ্ট করিয়া একবারে নির্লজ্জ অকপটতার সহিত আমাকে জানাইলেন—কোন সম্ভাবনা নাই—কারণ ইহাদের ফাণ্ডে কোন অর্থই নাই, যদ্বারা একটা এনট্রান্স স্কুল চলিতে পারে।

অম্বিকাবাবু কিন্তু আমার বেতনটি মাসের প্রথম তারিখেই জোগাইতেন। স্কুল এ্যাফিলিয়েটেড হইলেই অপর সকলকে মাহিয়ানা দিবেন, এই ভরসায় তাঁহাদিগকে খাটাইতেছিলেন, এজন্যই তাঁহাদের গুণপনা ও ব্যবহারের কোন শৃঙ্খলা বা শোভা ছিল না। কিন্তু ছাত্রগণ ভিক্টোরিয়া স্কুলের উপর হাড়ে হাড়ে চটিয়াছিল, বর্ষাকালে ছেঁড়া ছনের ছাউনির মধ্য দিয়া ঘরে বেশ খরপ্রবাহে জল পড়িয়া তাহাদের মাথার চুলে শিবজটাবদ্ধ গঙ্গার ন্যায় আটকাইয়া যাইত, তাহা তাহারা মাথা হইতে ঝাড়িয়া ফেলিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু তদ্বিরুদ্ধে কোন আপত্তি করিত না। বৃষ্টি পড়িতে শুরু করিলে দুই-তিন জন ছত্রধরের ন্যায় আমার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইত, আমার মাথা জল হইতে রক্ষা করিবার জন্য। সেই ভাঙা কপর্দকশূন্য নিরাশ্রয় স্কুলটির প্রতি তাহাদের মমতা দেখিলে আমার বড় কষ্ট হইত। ইহার মধ্যে তাহারা খুব বড় একটা সভা করিল, তাহাতে আমি ইংরাজীতে এক দীর্ঘ বক্তৃতা করিয়া অল্প সময়ের মধ্যে যশস্বী হইয়া পড়িলাম। জেলা স্কুল, এমন কি ভিক্টোরিয়া স্কুল হইতেও ছাত্রগণ আমার কাছে পড়া বুঝিয়া লইবার জন্য এবং আলাপ দ্বারা আপ্যায়িত হইবার জন্য আসিত।

আমি আমার শ্বশুর ও ঠাকুরদাদার তাড়নায় একদিন বাধ্য হইয়া ভিক্টোরিয়া স্কুলের স্বত্বাধিকারী জমিদার আনন্দচন্দ্র রায় মহাশয়ের সঙ্গে সন্ধ্যাকালে দেখা করিতে গেলাম। ভিক্টোরিয়া স্কুল তখন খুব জাঁকের স্কুল—জেলা স্কুলের মতই তাহার প্রতিপত্তি।

আনন্দবাবু এমন ভাব দেখাইলেন যে তিনি যেন আমার প্রতীক্ষা করিয়াই বসিয়াছিলেন। আমার অধ্যাপনা প্রভৃতির ষশ তাহার কানে পৌঁছিয়াছিল, তিনি বলিলেন, ‘আমার এখানেই আপনার স্থান, আপনি ওখানে থাকিতে পারিবেন না, তাহা আমি পূর্বেই জানিতাম।’ আমি প্রথম দিনেই তাহার বন্ু্ল হইলাম, তিনি প্রথম হইতেই আমার বন্ধু হইলেন। আমার বহু কষ্টের মধ্যে একমাত্র সহূদয় উপদেষ্টা তিনি ছিলেন, তাঁহার দুঃখের সময় আমি সর্বদা পার্শ্বচর ছিলাম। কুমিল্লাজীবনের নিবিড় ঘনান্ধকারে তাঁহার বন্ু্লত্ব আমার পক্ষে একমাত্র আলোকসঞ্চারী বিদ্যুল্লেখা। কয়েক বৎসর হইল রায় বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায় স্বর্গীয় হইয়াছেন। ইহার মত মহাপ্রাণ লোক সংসারে বড় সুলভ নহে।

***

ভিক্টোরিয়া স্কুলের হেডমাস্টার হইয়া আমি কাজে বেশ সাফল্য দেখাইলাম। প্রথম বৎসরেই আমার স্কুল হইতে একজন কুড়ি টাকা স্কলারশিপ পাইল, অঙ্কে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হইল, সংস্কৃত ও ইংরাজীতেও তাহার নম্বর খুব উঁচুতে উঠিয়াছিল। চট্টগ্রাম ডিভিসনে ইহার পূর্বে কেহ কুড়ি টাকা বৃত্তি পায় নাই, ছেলেটির নাম ছিল ‘ঝাড়ু মিঞা’। সে একটি গরীব কৃষকের ছেলে ছিল, আমি তাহাকে স্কুল হইতে চার টাকা মাসিক বৃত্তি দিয়া পড়াইয়াছিলাম। সে পরীক্ষাগুলি পাশ করিয়া ‘এসকেন্দার আলি’ নাম গ্রহণ করে এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হইয়া শেষে পাগল হইয়া যায়। ইহার পরের বৎসরও আমাদের স্কুল হইতে একজন চাটগাঁ ডিভিসনে প্রথম হয় এবং ছোটলাট ইলিয়ট সাহেব আমাদের স্কুল পরিদর্শন করিয়া এই মন্তব্য প্রকাশ করিয়া যান যে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া স্কুল যখন এরূপ ভাল হইয়াছে, তখন এখানে গভর্নমেন্ট স্কুল থাকিবার কোন প্রয়োজন নাই।

***

আমি বঙ্গের প্রাচীন সাহিত্য লইয়া এতদিন ঘাঁটাঘাঁটি করিতেছিলাম; সুতরাং এ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখিতে সহজেই প্রবৃত্ত হইলাম। এই সময় আমি ‘নবজীবন’, ‘জন্মভূমি’, ‘অনুসন্ধান’ প্রভৃতি পত্রিকায় অনেক প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তখন ‘দাসী’ নামক এক পত্রিকা প্রকাশিত করেন, আমি তাহার রীতিমত লেখক ছিলাম। আমার প্রবন্ধের সর্বত্রই আদর হইতেছিল। এমন কি ‘জন্মভূমি’ পত্রিকার সম্পাদক আমার প্রবন্ধগুলির ভূয়সী প্রশংসা করিয়া অযাচিত ভাবে কয়েকবার টাকা পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। আমার প্রবন্ধ পাঠ করিয়া বাহিরের পাঠকদের মধ্যেও অনেকে প্রশংসা করিয়া চিঠি লিখিতেন—অনুসন্ধানে আমার জন্মান্তরবাদ নামক প্রবন্ধ প্রকাশিত হইলে কবি হেমচন্দ্রের ভ্রাতা সাহিত্যক্ষেত্রে সুপরিচিত ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় সম্পাদককে যে চিঠি লিখিয়াছিলেন, তাহাতে আমার অজস্র প্রশংসাবাদ ছিল, সে প্রবন্ধের নীচে আমার নাম ছিল না। পিস অ্যাসোসিয়েশন ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ সম্বন্ধে আমার প্রবন্ধই পুরস্কারযোগ্য মনে করিয়াছিলেন।

এই প্রবন্ধের সঙ্গে সঙ্গেই আমি ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস লিখিতে শুরু করিয়াছিলাম। কুমিল্লায় হাকিমদের মধ্যে আমার অনেক বন্ধু জুটিয়াছিল, তন্মধ্যে স্বর্গীয় স্ট্যাটুটরি সিভিলিয়ান সুকবি বরদাচরণ মিত্র মহাশয়ের নাম সসম্মানে উল্লেখযোগ্য। তিনি তখন মেঘদূতের পদ্যানুবাদ করিতেছিলেন। তিনি কুমিল্লায় একটি সাহিত্য সমিতি গঠন করেন, আমি তাহার সম্পাদক হইয়াছিলাম। বরদাচরণ মিত্র মহাশয় সুদীর্ঘদেহ, গৌরবর্ণ ছিলেন; তাঁহার সুবহৎ চক্ষে, তিলফুলের মত সুগঠিত নাসিকায় ও উজ্জ্বল কপোল হইতে যেন প্রতিভা ফুটিয়া বাহির হইত; তিনি অতি সুপুরুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁহার হাতের আঙ্গুলগুলি জন্মাবধি পরস্পর সংলিপ্ত ছিল ও সেগুলি পূর্ণগঠিত ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই হাত লইয়া তিনি এত দ্রুতভাবে লিখিয়া যাইতেন, যেন মুক্তাহারের সৃষ্টি করিয়া যাইতেন। কি ইংরাজী, কি বাংলায় তাঁহার মত ক্ষিপ্ত কবিত্বময় ওজস্বিনী ভাষায় লিখিতে আমি অল্প লোককেই দেখিয়াছি। ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকায় বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে তাঁহার একটি সন্দর্ভ প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহার ভাষা এরূপ ওজস্বিনী, রচনা এরূপ সূক্ষ্ম বিশ্লেষণময়ী এবং ইংরাজী এরূপ বিশুদ্ধ যে রমেশ দত্ত মহাশয়ের বঙ্গসাহিত্য সম্বন্ধে পুস্তক পাঠ করিয়া যে ধারণা হয়, এই অপেক্ষাকৃত অতি ক্ষুদ্র প্রবন্ধে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধে তাহা হইতে অনেক বেশী জ্ঞান জন্মে। ইনি ঠিক সাহেবের চালচলনে থাকিতেন। যত জজ-ম্যাজিস্ট্রেট আসিতেন, সকলের অপেক্ষা তিনি পাণ্ডিত্যে, কর্মঠতায়, এমন কি ইংরাজী ভাষার জ্ঞানেও উত্কৃষ্ট ছিলেন, তাঁহারা সকলেই তাঁহাকে শ্রদ্ধা এমন কি ভয় করিতেন। সাহেবী কায়দা এতটা চালাইতেন যে সব জজগণ কার্ড দিয়া বসিয়া থাকিতেন, অবসরক্রম অল্প সময়ের জন্য দেখা করিতেন, এবং তাঁহাদের সঙ্গে আদৌ মিশিতেন না। কিন্তু সাহিত্যিক বন্ধু পাইলে যেন তাঁহার গোচারণের মাঠ মনে পড়িত। রাজবেশ, রাজভাষা ভুলিয়া যাইতেন, এবং অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত মেলামেশা করিতেন।

***

আমার কুমিল্লার আর এক সঙ্গী ছিলেন ডেপুটি রসিকলাল সেন, বিটসন বেল সাহেব ইহার সঙ্গে ঝগড়া করিয়া একবার ইহার বাহু মলে সন্ধির অস্থিটির স্থান বদলাইয়া দিয়াছিলেন। ইনি ইংরাজী ভাষায় কৃতবিদ্য ছিলেন এবং সাহিত্যিক ব্যাপারেও ইহার সুতীক্ষ দৃষ্টি ও পাণ্ডিত্য ছিল। আমি রাতদিন ইহার সঙ্গে থাকিতাম। কিন্তু সকলের চাইতে ডেপুটি ছিলেন, আমার খুল্লতাত কালীশংকর সেন; লম্বায় ইনি ছিলেন সাত ফুট, বর্ণ ছিল গাঢ় কৃষ্ণ, বাংলা দেশে এত কালো রং বড় দেখা যায় না। ঠোঁট দুখানি ছিল পুরু। বোধ হয় নীল নদের তীরে জন্মিলেই ঠিক হইত, যেন পথ ভুলিয়া বঙ্গদেশে আসিয়া পড়িয়াছিলেন। কিন্তু চক্ষু দুটি ক্ষুদ্র হইলেও জ্যোতিষ্মান ছিল। প্রচলিত সমাজনীতি, ধর্মনীতি ইনি প্রতিদিন ডিঙাইয়া চলিতেন এবং এরূপ যদৃচ্ছাক্রমে জীবন চালাইতেন যে তিনি পরের হাঁটাপথে চলিবেন না, এই সংকল্প করিয়াই যেন জীবনযাত্রা শুরু করিয়াছিলেন। তাঁহার রীতিনীতি এত মৌলিক ছিল যে তাহা বলিয়া বুঝাইতে পারিব না। আমি দুই একজন অশীতিপর বৃদ্ধ মোক্তারকে ইহার খাস কামরায় কোমর দোলাইয়া খেমটা নাচ নাচিতে দেখিয়াছি। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়িয়া ইনি পড়া সাঙ্গ করেন এবং শুধু কপালের লেখা ও দৈববলে ডেপুটিগিরি লাভ করেন। যদিও ইংরাজী খুব ভাল লিখিতে পারিতেন না এবং বড় বড় রিপোর্টগুলি আমি ও রসিকবাবু মাঝে মাঝে লিখিয়া দিতাম, তথাপি ঐ রিপোর্টে যদি কোন অসঙ্গতি থাকিত, তাহা তাঁহার চক্ষে অমনই ধরা পড়িত। তিনি নিজ হাতে না লিখিলেও রিপোর্টটি যে পর্যন্ত মনের মতন না হইত, সে পর্যন্ত লেখক অব্যাহতি পাইতেন না। সেই সকল রিপোর্টের কৃতিত্বও সর্বাংশে তাঁহারই থাকিত, এমন কি রিপোর্টের ভাষার অসঙ্গতি পর্যন্ত তাঁহার কান এড়াইত না। তিনি নির্ভীক ও একান্ত উদারপ্রকৃতি ছিলেন। সাত দিনের মধ্যে মাহিয়ানার ৮০০ টাকা ফুরাইয়া ধার করিতে বসিতেন। তাহার মনস্বিতা এত তীক্ষ ছিল যে তিনি যে কাজ উতরাইতে পারিতেন, এরূপ আর কোন ডেপুটির সাধ্য ছিল না, এজন্য কটন প্রভৃতি বড় বড় সিভিলিয়ানরা তাঁহার বিশেষ পক্ষপাতী ছিলেন। নিজের কৃষ্ণবর্ণ ও বিরূপ চেহারা লইয়া যে তিনি নিজেই কত ব্যঙ্গ করিতেন, তাহা আর কি লিখিব? একদিন আমায় বলিলেন, ‘দীনেশ! আমি যে কত কালো তা তোরা বুঝিস নাই, আমি আজ বুঝিয়াছি। আজ জজ সাহেবের মেম আমায় পথে বলিলেন মিস্টার সেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমাদের বাসাবাড়ীর কাছ দিয়া তুমি যাবে কি? আমি অতিশয় ভদ্রতা করিয়া তাঁহাকে আমার গাড়ীতে তুলিয়া লইলাম। তাঁহার হাত দুখানির ঠিক পাশেই আমার হাতখানি ছিল, আমার মনে হইল খুব সাদা কাগজটার এক প্রান্তে যেন কে কতকটা কালি ঢালিয়া ফেলিয়াছে—আমি যে এত কালো, মেম সাহেবের হাতের কাছে আমার হাত না থাকিলে তাহা বুঝিতেই পারিতাম না।’

সন্ধ্যাকালে কুমিল্লায় আমরা একটা আড্ডা দিতাম। কালীশংকরবাবু, রসিকবাবু, প্রসন্ন গুপ্ত ও সত্যবাবু, মুন্সেফদ্বয়, গোপাল বসু সাব জজ, নগেন দত্ত ডেপুটি, কান্তিবাবু, ইন্সপেক্টর হেমচন্দ্র খাস্তগির ডেপুটি প্রভৃতি এই আড্ডার রীতিমত সদস্য ছিলেন। গোপাল বসু ইংরাজী ভাষায় বক্তৃতা করিতেন, concatenation, troglodzte প্রভৃতি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কথায় তাঁহার বক্তৃতা চলিত, তিনি অভিধানের সাহায্যে চিঠি লিখিতেন, অভিধানের সাহায্যে কথা বলিতেন, অভিধানের সাহায্য ব্যতীত তাহার অর্থ স্ফুট করে, কাহার সাধ্য? কৃষ্ণনগরের রাজবংশের ডেপুটি ক্ষেত্রগোপাল রায়, হারমোনিয়াম বাজাইয়া ‘বাঁশী বাজাও না শ্যাম’ গান ধরিতেন এবং প্রসন্ন গুপ্ত মুন্সেফ নানারূপ বিদ্রূপ ও হাসিঠাট্টায় আড্ডাটা মুখরিত করিয়া ফেলিতেন। আমাদের বিদ্রূপ প্রায়ই কালেক্টরীর সেরেস্তাদার চন্দ্রকুমার বাবু ও তাঁহাদের থিওসফির দলের উপর প্রযুক্ত হইত। আমরা রহস্য করিয়া ভোট লইয়া ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত করিতাম। পুলিশ ইন্সপেক্টর কান্তিবাবু চোর ধরার জন্য একবার বাটি চালান দিয়াছিলেন। কালীশংকর বাবু বলিলেন, ‘শোনো কান্তি, আমরা হচ্ছি ঘটিরাম ডেপুটি, তুমি হচ্ছ বাটিরাম ইন্সপেক্টর।’ ইহার কিছু পরে প্রকাশচন্দ্র সিংহ ও তাঁহার ভ্রাতা সুরেশচন্দ্র সিংহ (রায় বাহাদুর) এবং মি. এ. কে. রায় ডেপুটি হইয়া কুমিল্লায় আসিলেন। বাংলা কথার মধ্যে ইংরাজী বকনি দিলে প্রতিটি কথায় এক টাকা জরিমানা দেওয়ার কড়ার করিয়া আমরা অনেক কৌতুক ও আমোদের সৃষ্টি করিয়াছি।

ইহার মধ্যে ডিক্রুজ নামক একজন টেলিগ্রাফ মাস্টার আসিয়া জুটিল। সে ফিরিঙ্গী হইলেও খাঁটি ইংরাজের মত তাহার চেহারা ছিল, তাহার ছোট ছোট দুই তিনটি সন্তান ছিল, একজন ছিল চার্লি (Charles)। মেয়েটির নাম ছিল ম্যাগি (Margaret); এই হতভাগ্যের স্ত্রী বাঁচিয়া ছিলেন না। ডিক্রুজ দিনরাত আমার কাছে পড়িয়া থাকিত। শেষে বাজারে বেড়াইতে গিয়া গোলাপী নাম্মী এক শ্রীলোকের কুহকে পড়িয়া সে সর্বস্বান্ত হইয়া যায়। ছেলেমেয়ে যে কি কষ্ট পাইত, তাহা আর কি লিখিব? তাহাকে তাহার সাহেবসমাজ ধৃণা করিয়া পরিত্যাগ করে। আমি তাহাকে ফিরাইতে অনেক চেষ্টা করিয়াছিলাম, কিন্তু গোলাপী তাহাকে ভেড়া বানাইয়া ফেলিয়াছিল। সাহেবেরা চক্রান্ত করিয়া উপরে চিঠি লিখিয়া তাহাকে বদলী করাইলেন একেবারে পাঞ্জাবে। গোলাপী বুঝিয়াছিল, ইহার হাতে আর কপর্দকও নাই। তখন সাহেব তাহার পায়ের উপর একদিন একরাত্রি পড়িয়া ছিল। কিন্তু সে কিছুতেই বাংলা দেশ ছাড়িয়া পাঞ্জাবে যাইতে স্বীকৃত হইল না। যে দিন যাইবে, সে দিন অপরাহ্নে আমাকে একটা নির্জন জায়গায় লইয়া গিয়া সে যে কি কান্নাটা কাঁদিয়াছিল, কত আক্ষেপ করিয়াছিল, তাহা আমি ভুলি নাই। স্ত্রীলোকের কুহকে যে মানুষ কতটা বিড়ম্বিত হইতে পারে, ডিক্রুজ-গোলাপী অধ্যায় আমার নিকট তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ হইয়া আছে।