এপ্রিলে বপন
করার পর
ধানের চারা
গজিয়ে ওঠে
এবং পানির
সঙ্গে সঙ্গে
চারাগুলো বেড়ে
ওঠে। পানির
ওপরে ফুটখানেক
মাথা জাগিয়ে
কোথাও কোথাও
ধানের কাণ্ড
ফুট বিশেক
পর্যন্ত লম্বা
হয়। অবশ্য
পানির সঙ্গে
ধানগাছের এ
বেড়ে ওঠা
হওয়া চাই
ধীরে ধীরে,
হঠাৎ বন্যা
হলেই সাড়ে
সর্বনাশ! তখন
ধানগাছগুলো তলিয়ে
যায় এবং
এ ফসল
ধ্বংস হয়ে
যায়। আমরা
ঝিল ছেড়ে
গোকর্ণ খালে
ঢুকলাম, যেটি
আড়াআড়িভাবে বয়ে
গিয়ে তিতাস
নদীতে মিশেছে।
জায়গাটি থেকে
দৃশ্যপট সুন্দর
হয়ে উঠতে
শুরু করল।
প্রতিটি বাঁকেই
একের পর
এক গ্রামীণ
দৃশ্য আমাদের
মুগ্ধ করছিল।
উঁচু পাড়
ধরে বেত
ও অন্যান্য
ঝোপের সঙ্গে
মিশে ছিল
কচু এবং
ঝলমলে লতাগুল্ম,
আর তা
ছায়াময় বড়
বড় গাছের
পুরোভাগ তৈরি
করে রাখছিল।
দুই তীরের
এ সুশীতল
ছায়াদায়ী গাছগুলোর
মাথা পর্যন্ত
ছেয়ে আছে
লতাগুল্মে। কিছু
দূর পর
পরই ছবির
মতো ছোট
ছোট গ্রাম,
ছোট ছোট
ছেলেপেলে সারাদিনই
সেখানে নদী
বা খালের
পাড়ে খেলছে
বা পানিতে
ঝাঁপিয়ে পড়ে
হুটোপুটি খেলছে,
একে-অন্যকে
পানি ছিটাচ্ছে,
সারা গ্রাম
মাথায় করে
রাখছে। এখানকার
মানুষ মনে
হয় যতক্ষণ
ডাঙায় থাকে,
ততক্ষণই কাটায়
পানিতে। কারণ
যখন মাছ
ধরছে না
বা পানি
ভেঙে যাতায়াত
করছে না,
তখনো দেখা
যায় তারা
পানির ধারেকাছেই
আছে বা
পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি
করছে।
দুপুরে আমরা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছলাম
এবং ডাঙার
পথ ধরে
সাইকেল চালিয়ে
মাইল সাতেক
দূরে দাউদকান্দির
দিকে রওনা
দিলাম। এখানে
খুব ভালো
মানের একটা
ডাকবাংলো আছে।
রাতটা আমরা
এখানেই কাটালাম।
এখান থেকে
কুমিল্লা ৩৩
মাইলের পথ।
চোখ জুড়ানো
চমত্কার সব
গ্রামের মাঝ
দিয়ে গেছে
রাস্তাটা। বেশ
কয়েকটা নদী
পেরুতে হবে।
সারাটা পথ
থেকে ত্রিপুরা
পাহাড়ের চমত্কার
দৃশ্য দেখা
যাচ্ছিল। পুতিয়ার
পরই কসবায়
গাছপালায় প্রায়
ছেয়ে থাকা
পথ-করের
বিনিময়ে কাটানোর
একটি বাংলো
রয়েছে। পাহাড়ের
পাদদেশে খুবই
সুন্দর জায়গা
এটি, যা
হিল ত্রিপুরার
রাজধানী আগরতলা
থেকে ১২
মাইল দূরে।
এখানে থামার
কোনো দরকার
নেই, কারণ
কুমিল্লা ২০
মাইল দূরেও
নয় এবং
আগে আগে
রওনা হলে
আমরা সেখানে
সকাল ১০টার
মধ্যেই পৌঁছে
যেতে পারব।
কুমিল্লা হচ্ছে দীঘি-পুকুর, মঠ, বা মন্দিরের জেলা, যেগুলো বহুদিন আগে মৃত অভিজাতদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং তাদের দেহাবশেষ যেখানে আগুনের শিখায় আহুতি দেয়া হয়েছিল, সেখানেই এগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল। চার্চের চোখা গম্বুজের মতো পোক্ত ও উঁচু এ মঠগুলোর বেশির ভাগই স্রেফ স্মৃতিস্তম্ভ ছাড়া কিছু নয়, তবে কোনো কোনো বড় মঠ মন্দিরে পরিণত হয়ে যায়, যেগুলো সাধারণত মৃতের পরিবার শিব পূজোর জন্য উৎসর্গ করে। এগুলোতে থাকে শিবলিঙ্গ এবং এক বা একাধিক পুরোহিতকে এসব মন্দিরে ভরণ-পোষণ করা হয়। দীঘি-পুকুরের ভেতর কোনো কোনোটি থাকে বিশাল জায়গাজুড়ে, যেগুলো খনন করে থাকেন পুরনো ভূস্বামীরা। এর একটি কুমিল্লা স্টেশনের কাছেই, যেটির পরিধি প্রায় তিন মাইল। কুমিল্লার কাছাকাছি এসে রাস্তাটি বিখ্যাত গোমতী বাঁধের সঙ্গে মিশেছে। অনেক বেশি এঁকেবেঁকে এসেছে বলে নদীটির নাম হয়েছে গোমতী। স্বাধীন ত্রিপুরার এটি প্রধান নদী। এর উত্পত্তি ত্রিপুরা পাহাড় থেকে। একটা জায়গায় এসে এটি এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে নৌকায় প্রায় সারাদিনের যাত্রা শেষে এর তীরের মন্দিরটির দেখা মেলে! কুমিল্লা থেকে ৩২ মাইল দূরে গিয়ে এটি মেঘনা নদীতে মিশেছে। এর পাড় ধরে নির্মিত বাঁধটি ৩৬ মাইল দীর্ঘ এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের পুরো খরচ বহন করেন হিল ত্রিপুরার মহারাজ।
এর পরে
আমরা যে
গ্রামটি পেরিয়ে
আসি, সেটির
নাম চান্দিনা,
যেখান থেকে
কুমিল্লা দেড়
ঘণ্টার পথ।
কুমিল্লায় গিয়ে
আমরা সার্কিট
হাউজে উঠতে
পারব, রাতে
ঘুমাতে পারব
এবং পরদিন
সকালে চট্টগ্রামের
পথে রওনা
হতে পারব।
এর মধ্যে
দিনটি আমরা
স্টেশন এবং
এর চারপাশে
সাইকেল চালিয়ে
আনন্দের সঙ্গে
কাটাতে পারব।
বাংলার স্টেশনগুলোর
মধ্যে কুমিল্লা
নিজেকে একটি
বিখ্যাত জায়গা
বলে দাবি
করতেই পারে।
এখানকার ঘাটে
নেমে শহরের
মাঝ দিয়ে
গেলে প্রথমেই
যে ব্যাপারটা
ভ্রমণকারীদের নজর
কাড়ে তা
হচ্ছে গাছপালায়
ছাওয়া কুমিল্লা
চমত্কার এক
শহর। অবশ্য
শহরের চেয়ে
এখানে নিঃসন্দেহে
পরিবেশটায় গ্রাম
গ্রাম ভাবই
বেশি। প্রতিটি
বাড়ি, বাংলো
বা কাচারির
রয়েছে নিজস্ব
উদ্যান। বেশ
কয়েকটিতে তো
গাছপালার জন্য
ভেতরের বাড়িঘর-দালানকোঠা
দেখাই যায়
না! প্রতিটি
রাস্তাই চলে
গিয়েছে কৃষ্ণচূড়া,
পিপুল, সেগুন,
তেঁতুল, কাঁঠাল
এবং অন্যান্য
বিশাল সুন্দর
সুন্দর গাছের
সারির মাঝ
দিয়ে। কেউ
স্টেশনের চারপাশ
বা স্টেশনের
মাঝ দিয়ে
সাইকেল বা
গাড়ি চালিয়ে
যেতে পারে
প্রায় পুরোটা
পথই ছায়ার
ভেতরে থেকেই।
রেসকোর্সের কাছেই
ট্রাংক রোড—যেটি
এটির সমান্তরালে
চলে গেছে।
প্রায় মাইলখানেক
পথ দুটি
এভাবে পাশাপাশি
চলে গেছে
আর এ
পুরোটা পথের
পাশে বিশাল
বিশাল চমত্কার
সব গাছ
লাগানো হয়েছে।
রেস কোর্সটি
নিজে অতীত
দিনের একটি
ধ্বংসাবশেষ; ঘোড়দৌড়ের
ট্র্যাক প্রায়
মাইল দেড়েক
এখনো রয়ে
গেছে, কিন্তু
এটিকে ঘিরে
থাকা বৃত্তটি
ধানক্ষেতের দখলে
চলে গেছে;
এমনকি ‘গ্র্যান্ড
স্ট্যান্ড’কে
চিহ্নিত করা
খুঁটি বা
বাঁশের একটিও
আর টিকে
নেই। কলকাতার
রেসকোর্সের বিখ্যাত
জুয়াড়ি, যিনি
ভারতের একজন
বড় ঘোড়দৌড়বিদ।
তিনি এ
ঘোড়দৌড় নিয়ে
বইও লিখেছেন।
তিনিও এখন
আর কুমিল্লার
এ রেসকোর্সটির
ব্যাপারে কিছুই
জানেন না।
বেঙ্গলের সাবেক
এক লেফটেন্যান্ট
গভর্নর স্যার
অগাস্টাস রিভার্স
থম্পসন কুমিল্লায়
প্রথম আলো
দেখেছিলেন। তার
বাবা জি
পি থম্পসন
ছিলেন জজ
ও কালেক্টর—তখনকার
দিনে একসঙ্গে
এ দুটি
পদেই আসীন
থাকতে হতো—এবং
প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ
এখনো টিকে
আছে, যেখানে
মজার মজার
সব কাণ্ড
ঘটে। থম্পসন’স
ব্রিজ এবং
ব্রিজ বাংলো
এখনো টিকে
আছে, একটি
প্রস্তরফলকে ‘জি
পি টি’
এবং ‘১৮৩৬’
লেখা উত্কীর্ণ
আছে।
কুমিল্লা বাজারকে
বাংলার আদর্শ
বাজার বলে
গণ্য করা
হয়। এ
বাজারে রয়েছে
একটি সোজা
রাস্তা, যার
দুই পাশেই
রয়েছে দোকান;
মাঝের পাকা
রাস্তাটি ৮০
ফুট চওড়া।
এর পরেই
রয়েছে প্রাচীন
বট ও
পিপুল গাছের
সারি, এর
পরে চওড়া
একটি পাকা
নর্দমা এবং
বাইরের দিকে
রয়েছে দোকানগুলো।
এর অনেক
দোকানের কাঠামোতেই
ইটের গাঁথুনি,
বাকিগুলো কাঁচা,
কিন্তু প্রায়
সব দোকানেই
হয় ঢেউটিনের
চাল বা
খড়ের চাল।
দোকান থেকে
দোকানে যাওয়ার
রাস্তাটি ওল্ড
কোর্ট হাউজ
স্ট্রিটের চেয়ে
সামান্য একটু
বেশি চওড়া,
কয়েক গুণ
বেশি পরিষ্কার
এবং একজন
শিল্পীর দৃষ্টিতে
একেবারেই নিখুঁত।
দুটি ঝরনা,
আধা ডজন
ধুলোয় ছাওয়া
শহুরে গাছ,
এগুলোর পটভূমিতে
থাকা লোহার
খুঁটি ও
পাইপ—এসব
নিয়ে গড়ে
ওঠা কলকাতা মিউনিসিপ্যাল
মার্কেট হয়তো
এক ধরনের
শহুরে দৃশ্যের
দাবিদার, কিন্তু
তা সত্ত্বেও
কোনো ভ্রমণকারী
গ্রামীণ বেঙ্গলের
এক কোনার
এ মফস্বল
শহরের বাজার
দেখে মুগ্ধ
না হয়ে
পারেন না।
কুমিল্লার প্রতিটি
ব্যক্তিগত বাড়িরই
রয়েছে পুকুর
এবং রয়েছে
সরকারি দীঘি-পুকুরও।
যার ভেতরে
রয়েছে রানী
দীঘি ও
ধর্মসাগর দীঘিও
(ধর্মসাগর দীঘিটি
কলকাতার লাল
দীঘির চেয়ে
দ্বিগুণ লম্বা)।
দৃশ্যত এসব
দীঘি খোঁড়া
হয়েছে যেখানে
সুবিধামতো জায়গা
পাওয়া গেছে
সেখানেই। এসব
দীঘি স্থানীয়দের
পানীয় জল
সরবরাহ করে,
যেহেতু গোমতীর
পানি পানযোগ্য
নয়। শুধু
কুমিল্লা স্টেশনেই
রয়েছে ৫০০-এরও
বেশি দীঘি-পুকুর
এবং এসব
পুকুর কুমিল্লা
শহরের পাঁচ
ভাগের এক
ভাগ জায়গা
দখল করে
আছে। একটি
চার্চ এবং
বীর চন্দ্র
গণগ্রন্থাগার, স্বাভাবিক
সরকারি অফিসগুলো
এবং বেশ
কয়েকটি চমত্কার
মসজিদ, মন্দির,
মঠ এবং
কয়েকটি প্রাচীন
নীল কারখানাও
এখানে চোখে
পড়ে। এখানকার
সিমেট্রিতেও বেশকিছু
সমাধিফলক ও
স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে,
যেগুলো সমাধিসৌধের
সন্ধানে ছুটে
বেড়ানো পর্যটকদের
অনিবার্যভাবেই দৃষ্টি
আকর্ষণ করে।
পাহাড়ের ঢাল
বেয়ে উঁচুতে
উঠে যাওয়া
রাস্তাটি ভ্রমণে
বৈচিত্র্য আনে
এবং আমাদের
তা ছোট
পাহাড় বেয়ে
ওঠার সুযোগ
করে দিল—বেঙ্গলে
এমন সুযোগ
খুব কমই
মেলে।
পরদিন খুব সকাল সকাল রওনা হওয়াটা ছিল সঠিক সিদ্ধন্ত। চট্টগ্রাম ৫০ মাইল দূরে। এ রাস্তায় বেশকিছু মজার জিনিস দেখার আছে। কোথাও কোথাও রাস্তাটা আগের মতো ভালো ছিল না, যদিও তা সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার উপযোগীই ছিল। কুমিল্লা ছাড়ার পর ত্রিপুরা পাহাড় রইল আমাদের ডানে এবং শিগগিরই আমাদের বাঁয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো দেখা যেতে থাকল। এ রাস্তা আমাদের ইছাখালী পাহাড়শ্রেণীর পাদদেশে নিয়ে চলল, যা ছিল ১০ মাইল দূরেই। আরেকটু দূরেই মিরসরাই। খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি জায়গা আমাদের পেরোতে হলো সীতাকুণ্ডে পৌঁছনোর আগে। কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের রাস্তার মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে এ সীতাকুণ্ড। এখানে একটি বাংলো রয়েছে এবং রয়েছে বড় একটি বাজার, যেখানে সপ্তাহে একদিন হাট বসে। আমাদের অবশ্যই নামতে হবে এবং এখানকার বিখ্যাত মন্দিরটি ঘুরে দেখতে হবে।





