ব্রিটিশরাজের আমলে কুমিল্লা অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে আসা ইংরেজ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেখানকার কর্মজীবনের স্মৃতি ও এলাকার বিবরণ পরে লিখিত আকারে উপস্থাপন করে গিয়েছেন। এগুলোর ভেতর আর্থার লয়েড ক্লের লেখা বিবরণটিই কুমিল্লা বিষয়ে কোনো ইংরেজের সবচেয়ে বিস্তারিত বয়ান বলে প্রতীয়মান হয়। কে এই ক্লে সাহেব? ১৮৬২ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ক্লে ভারতবর্ষে আসেন ওই বছরেই। কর্মজীবনের বড় একটা অংশ কাটিয়েছেন বাংলা মুলুকে। অবসরে যাওয়ার পর তিনি ছদ্মনামে নিজের সিভিলিয়ান জীবনের স্মৃতিকথা রচনা করেন, ‘লিভস ফ্রম ডায়েরি ইন লোয়ার বেঙ্গল’ শিরোনামের সেই বই ১৮৯৬ সালে (ম্যাকমিলান, লন্ডন) প্রকাশিত হয়।

চট্টগ্রাম হয়ে ১৮৬৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দিকে রওনা দেন ক্লে। সেখানে সহকারী কমিশনার পদে তাকে বদলি করা হয়েছিল। পয়লা দর্শনে কুমিল্লাকে কেমন লেগেছিল তার? ‘গোমতী নদীর দক্ষিণ অথবা বাম তীরে অবস্থিত একটি সুন্দর ছোট্ট শহর ছিল তখন কুমিল্লা’—কুমিল্লা শহর প্রথমবার দেখার পর এমন অনুভূতিই হয়েছিল ক্লের। পরে তিনি বৃক্ষ-আচ্ছাদিত বিস্তৃত স্থানীয় বাজার ও প্রকৃতির ছায়াঘেরা সার্কিট হাউজ ও ইংরেজদের থাকার ঘরবাড়ি দেখে মুগ্ধতার কথার বয়ান করেছেন। ক্লের কাছে কুমিল্লা প্রতীয়মান হয়েছিল বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক এক জায়গা বলে। কারণ সেখানে যেমন ইংরেজ প্রশাসনযন্ত্রের আবশ্যিক সব অঙ্গরূপী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আছেন (কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার কি সিভিল সার্জন), তেমনি সেখানে আছেন কয়েকজন ফরাসি জমিদারও। তারা এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূ-সম্পত্তির মালিক। আরো আছেন ত্রিপুরা রাজার ইউরোপীয় এজেন্ট। এ শহরের নানা কর্মকাণ্ডে যার ভূমিকা অশেষ গুরুত্বপর্ণ। সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদানের জন্য কুমিল্লায় আগমনের ঠিক পরের দিন ক্লেকে যেতে হয়েছিল কালেক্টরের অফিসে।

ইস্টার সানডের ছুটিতে ক্লে বেড়াতে গিয়েছিলেন কুমিল্লার নদীতীরবর্তী একটি দুর্গম এলাকায়। জায়গাটার কাছেই ছিল পাহাড়। কুমিল্লা অঞ্চল নিয়ে জরিপ করার উদ্দেশ্যে ইংরেজদের একটি ‘সার্ভে পার্টি’ সেখানে কাজ করছিল। তাঁবু ও হাতির বহর নিয়ে সে এক এলাহিকাণ্ড। সেখানে যাওয়ার সময় ক্লে খেয়াল করলেন, ‘পুরো যাত্রাপথজুড়েই ঘাসে ঢাকা মনোহর রাস্তা...এ ঘাসে ছাওয়া রাস্তাগুলো কুমিল্লার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য বটে।’ তিনি আরো লিখেছেন, বস্তুত এ ঘাসে ঢাকা পথগুলোই পুরো শহরটাকে ঘিরে রেখেছে।

কুমিল্লায় বদলি হয়ে আসা নিয়ে ক্লের মনে কোনো অতৃপ্তি বা আক্ষেপ ছিল না। এখানে এসে তিনি বন্ধু হিসেবে পেয়ে গেলেন পুলিশে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত জনৈক পিট সাহেবকে। কুমিল্লায় শিকার করার বিশেষ আনন্দ ছিল। একদিন তারা দুজনে মিলে পরিকল্পনা করেছিলেন লালমাই বা ময়নামতি পাহাড়ে শিকার করতে যাবেন। শেষমেশ স্থির হলো ময়নামতির দিকেই যাবেন। কুমিল্লা শহর থেকে এক কি দুই মাইল পশ্চিমের এ পাহড়ে গিয়ে তারা উঠলেন ত্রিপুরা রাজার মালিকানাধীন এক বাংলোয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল শিকার করতে গিয়ে। কুমিল্লার ঘন জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে দারোগা বন্ধুসমেত বিপদে পড়ার সেই অভিজ্ঞতা ক্লে বিবৃত করেছেন এইভাবে: ‘আমরা যাঁর যাঁর বন্দুকে গুলি ভরে জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। কথা ছিল আমরা পরস্পরের যতটা পারা যায় কাছাকাছি থাকব। কিন্তু জঙ্গলটা এত ঘটন ছিল যে দ্রুতই আমরা একে-অপরকে হারিয়ে ফেললাম। আর আমিও বুঝতে পারছিলাম না যে আসলে কোথায় যাচ্ছি।’ পরে অবশ্য দুই বন্ধু পরস্পরকে খুঁজে পেয়েছিলেন। কুমিল্লার জঙ্গলের এ দুর্গম দশা সত্ত্বেও এখানে শিকার করতে ক্লে আনন্দ পেতেন। শহরের ফরাসি জমিদারের রোমাঞ্চপ্রিয় পুত্র ও স্থানীয় জরিপ কর্মকর্তা জোসেফ দেভালের সঙ্গে শিকারি কুকুর নিয়ে তিনি শিকারে বেরোতেন সুযোগ পেলেই। অবশ্য শহরের আশপাশে তখন শিয়াল ও গন্ধগোকুল ছাড়া তেমন শিকার মিলত না। কুমিল্লার পূর্বপ্রান্তে নজরে আসা পাহাড়ঘেঁষা ঝিলের কথাও লিখেছেন ক্লে। ঘোর বর্ষাকালে যখন তা পানিতে থইথই, তখন সেখানে বেড়ে ওঠা লম্বা ঘাস ও নলখাগড়ার মধ্যে তিনি দেখা পেয়েছিলেন অনেক রকম পাখি ও হাঁসের। হাঁস শিকার করে ভোজ করা যাবে, এমন ভাবনা থেকে মাসিক ৪ টাকা বেতনে ফেনজা গাজী নামের এক স্থানীয় শিকারিকে ক্লে নিজের সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কেননা গাজী ছিলেন সরু কোন্দা নৌকা চালিয়ে জলের মধ্যে শিকার করতে ওস্তাদ। কুমিল্লার জঙ্গলে হনুমান, বানর ও উল্লুকের দেখা পেয়েছিলেন ক্লে। একবার জোঁকের কামড় খেয়েও কাবু হন শিকারের সময়।


একবার কুমিল্লার তদানীন্তন ডেপুটি কালেক্টর এক মাসের ছুটি নেয়াতে ক্লের ঘাড়ে এলাকার রাজস্ব আদায়ের ভার পড়ে। ক্লে যে মাসে কুমিল্লা মহকুমার রাজস্ব আদায়ের কাজ করেছিলেন, সে মাসে জেলা ট্রেজারিতে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার রুপির রাজস্ব জমা পড়েছিল। সেই রাজস্ব আবার তাকে পাঠাতে হয় ঢাকায়। রীতিমতো লোহার বাক্সে করে গরুর গাড়িতে চড়িয়ে তখনকার দিনের অতগুলো টাকা তাকে ঢাকায় পাঠাতে হয়েছিল। কারণ ঝিল-নদী-পাহাড়ে পূর্ণ কুমিল্লায় নিরাপত্তার দিকটা নিয়ে শঙ্কা থাকতই। কুমিল্লার পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কথা ক্লে বিশেষভাবে লিখেছেন। কুমিল্লার ত্রিপুরাদের জীবনধারার কথা তিনি লিখেছেন এভাবে: ‘[তারা] নিজেদের চারপাশ সাফসুতরো রাখে সম্ভবত যাতে সম্ভাব্য শত্রুরা আশপাশে লুকিয়ে অবস্থান নিতে না পারে। ওদের হাটগুলো বসে বাঁশের তৈরি উঁচু মাচার ওপর।...এ জঙ্গলই তাদের নির্মাণসামগ্রীর জোগান দেয়।...তাদের চাষবাষের ধরন আদিমকালের মতো।...[তাদের উৎপাদিত] প্রধান শস্য হলো ধান, ভুট্টা আর তুলো।...’

কুমিল্লায় একবার বাঁশের তৈরি সাঁকো পেরুতে গিয়ে মহাবিড়ম্বনায় পড়েছিলেন ক্লে। একদিন মজু নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি খবর আনল তার গোয়ালের একটা গরু কোনো হিংস্র প্রাণীর হানায় নিহত। সন্দেহটা বাঘের দিকে। সে বছর কুমিল্লায় প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল। পুরো এলাকা পানিতে প্রায় ডুবুডুবু। এর মাঝেও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সহকারী শিকারি গাজীকে খবর পাঠিয়ে ক্লে নিজের কাছারিবাড়ি ছেড়ে ছুটলেন। মজুর বাড়ির কাছে এসে ঘটল বিপত্তি। মজুর বাড়ি যেতে গেলে একটা খাল পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু সেই খালের ওপর আছে স্রেফ কয়েকখানা বাঁশ দিয়ে তৈরি একটা নড়বড়ে সাঁকো, যা কিনা আবার বেত দিয়ে বাঁধা। ভালোভাবে তৈরি বাঁশের সাঁকোতেও যেখানে কিনা বুট পরে চলতে গেলে দুবার ভাবতে হয়, সেখানে এটা তো আরো বিপজ্জনক! শেষমেশ রীতিমতো কসরত করে ক্লে ওই নড়বড়ে সাঁকো পার হয়ে মজুর বাড়িতে পৌঁছলেন। মজুর বাড়ির আশপাশের জঙ্গলে অনুসন্ধান করে ক্লে বাঘের দেখা পাননি। জঙ্গলে পড়ে থাকা গরুর মাড়ি সেখানেই রেখে পরের দিন ফিরে এসে ক্লে দেখেন, মাড়িটা নেই। শুধু কতক হাড় পড়ে আছে। পরে জঙ্গলের মাটিতে পদচ্ছাপ দেখে নিশ্চিত হন, গরুটাকে মেরেছে একটা চিতাবাঘ।

ক্লের মতো বিস্তারিত না হলেও কুমিল্লার কিছু চমত্কার বিবরণ পাই ১৮৩০-এর দশকে বাংলায় নিয়োগ পাওয়া সিভিলিয়ান ফ্রাংক বি সিমসনের লেখায়। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত তার ‘লেটারস অন স্পোর্টস ইন ইস্টার্ন বেঙ্গল’ (আর এইচ পোর্টার, লন্ডন) বইতে কুমিল্লার শিকার অভিজ্ঞতার কথা সিমসন জানিয়েছেন। একদা কালেক্টর পদে কর্মরত সিমসনের ছিল শিকারের নেশা, কাজেই পাহাড়-নদী-জঙ্গলময় কুমিল্লায় শিকার অভিযানে আসতেন প্রায়ই। সিমসন জানাচ্ছেন, কাদাখোঁচা পাখি শিকার করতে চাইলে কুমিল্লায় আসা ছাড়া উপায় নেই: ‘খুব ভোরে কুমিল্লার এক কোণে অবস্থিত বড় কামতা এলাকায় রওনা দেন। ত্রিপুরায় থাকা সাহেবেরা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বরে কাদাখোঁচা শিকারের সেরার সেরা অভিজ্ঞতা আপনার সামনে হাজির করতে পারবেন।’ কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গিয়ে ইংরেজ শিকারিদের বরাহ শিকার করার খবরও সিমন দিয়েছেন। তবে কুমিল্লায় তখন সবচেয়ে ভালো যে শিকারটি মিলত, তা হলো বনমোরগ। সিমন লিখেছেন, কুমিল্লার ‘পাহাড়ের হাওদায় বসে বনমোরগ শিকার করবার মতো অসামান্য আনন্দ আর অন্য কিছুতে পাবেন না। এতে কষ্ট ও পরিশ্রম যেমন কম, তেমনি ব্যর্থতাজনিত হতাশার শঙ্কাও স্বল্প।’ পরে তিনি আরো লিখেছেন, বনমোরগ বাংলার প্রায় সব জেলাতেই কিছু না কিছু মেলে। তা সত্ত্বেও অন্য এলাকার চেয়ে কুমিল্লায় ‘বনমোরগ শিকারের ব্যাপারটাই আলাদা। এখানে বনমোরগ প্রচুর মেলে, স্বাদের দিক থেকেও তা মজাদার।...[কুমিল্লায়] বনমোরগ মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে, সেগুলো সারাদিন ধরে শিকার করার পর রোস্ট করে খাওয়ার অভিজ্ঞতার মতো তৃপ্তিকর আর কিছু হয় না।...’


পাখি বা বরাহের পাশাপাশি কুমিল্লায় ভাল্লুক ও বাঘের আনাগোনার কথাও লিখেছেন সিমসন। কুমিল্লায় থাকার সময় একবার খবর পেলেন, কোথায় যেন নিচু ঘাসের জঙ্গলে ভাল্লুকের পায়ের ছাপ দেখা গেছে। সংবাদ আসা মাত্র দ্রুত হাতির বহর নিয়ে তিনি সেখানে ছুটলেন। তখন পর্যন্ত তিনি মুখোমুখি কোনো ভাল্লুকের দেখা পাননি কখনো। পরে জঙ্গলে ভাল্লুকের সন্ধানে গিয়ে অবশ্য ভাল্লুকটির মুখোমুখি আর হননি। তবে খোদ কুমিল্লা শহরে তিনি বাঘের দেখা পেয়েছিলেন। তখন সিমসনের অধীনে কোনো হাতির দল ছিল না। একদিন সকাল ৯টার দিকে খবর এল কুমিল্লার সরকারি দপ্তরপাড়ার কাছেই একটা বাঘ এসেছে। তড়িঘড়ি অকুস্থলে গিয়ে সিমসন দেখেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাই, এমনকি এক ফরাসি ভদ্রলোকও যার যার অস্ত্র উঁচিয়ে আছেন গোমতী নদীর পারের দিকে। পরে নদীর পারে থাকা কাদায় বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেল। তবে তা তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র আকৃতির। তা দেখে সবাই ভাবল আদতে হয়তো ওটা মেছোবাঘ বা চিতা। পরে অবশ্য দেখা যায় সেটি প্রকৃতপক্ষে একটি বাঘই। পরে সিমসন সেটিকে পরাস্ত করেন।

উনিশ শতকে কুমিল্লাবাসের সবিস্তার বর্ণনা অবশ্য আরেক ইংরেজ সিভিলিয়ান দিয়েছেন; তবে তা বইয়ের আকারে নয়, পত্র মারফত। ১৮৭৩ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়া হারম্যান উইলিয়াম কিশ্চ একদা ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও বাংলার পোস্টমাস্টার জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সিভিলিয়ান জীবনের গোড়ার দিকে তাকে একবার কুমিল্লা মহকুমায় পদায়ন করা হয়। ভারত থেকে লেখা তার চিঠিপত্র ১৯৫৭ সালে ‘আ ইয়ং ভিক্টোরিয়ান ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে বই আকারে প্রকাশ পায় লন্ডনের জোনাথন কেপ প্রকাশনা থেকে। কুমিল্লায় হারম্যানের আগমন যখন, তখন তার বয়স ২৫ বছর। সাল ১৮৭৫। কুমিল্লায় আসার পর ওই বছরের ৩ জুলাই এক চিঠিতে হারম্যান জানাচ্ছেন, ‘কুমিল্লা, আমি যেখানে আছি, একটি সুন্দর স্টেশন যার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী গোমতী। জায়গাটি নিচু কিন্তু স্বাস্থ্যকর। বলা হয়ে থাকে এখানে অসুখে পড়া মুশকিল। আমার নিজেরও বেশ তাজা লাগছে।’ কুমিল্লার ‘প্রায় পোয়া মাইল লম্বা এক দীঘি’র কথাও তিনি লিখেছেন (ধর্মসাগর দীঘি?), যার পানি খুব পরিষ্কার। ১০ জুলাই লেখা আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘কুমিল্লার স্টেশন জীবন চমত্কার, সারাদিন কাটানোর মতো অনেক কিছু করার আছে।...৯টার দিকে স্টেশনের সবাই যায় সেই দীঘিতে স্নান করতে।...’ অফিস থেকে ফিরেও ওই দীঘিতে মাঝেমধ্যে স্নান করার কথাও হারম্যান লিখেছেন, এ থেকে বোঝা যায় যে ওই অনামা দীঘিটি কুমিল্লা শহরের ইংরেজদের পছন্দসই জায়গা বলেই গণ্য হতো। কুমিল্লার জীবন হারম্যানের কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠছিল ক্রমেই, এর মাঝে ঘটল অবশ্য একটা বিপত্তি। ১৭ জুলাই লেখা চিঠিতে হারম্যান বলছেন, ‘আমার শোবার ঘরে একটি বাক্স। বাক্সের ওপর খবরের কাগজ। তারপর ছিল একটি বই। গতকাল তা নামাতে গিয়ে একটি সাপ বেরোল। ১০-১২ ইঞ্চি লম্বা। আমি প্রথমে তা দেখিনি। আমার খিদমতগারের নজরে পড়ে তা, তারা জানাল এটি বিষাক্ত। কুমিল্লায় সাপের সংখ্যা কম। কিন্তু শোবার ঘরে সাপ নিয়ে বসবাস নয়।...’ ১৮৭৫-এর জুলাইতে কুমিল্লা আসার পর একই বছরের নভেম্বরের গোড়ায় হারম্যানকে নোয়াখালী পাঠিয়ে দেয়া হয়। ৭ নভেম্বর লেখা চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন: ‘গতকাল এখানে শেষ টেনিস গেমটি খেললাম। আগামীকাল ভোরে রওনা হব।...’ এরপর লিখলেন একটি অমোঘ বাক্য, যাতে এই শহরের প্রতি তার মায়া জন্মানোর লক্ষণ সম্পূর্ণত স্পষ্ট: ‘কুমিল্লা ছাড়তেই খারাপ লাগছে, জায়গাটা আমি ভারি পছন্দ করেছিলাম।...’

 

ঋণস্বীকার: নিবন্ধে উল্লেখিত আর্থার লয়েড ক্লে ও ফ্রাংক বি সিমসনের মূল দুটি বই এখানে ব্যবহার করা হলেও হারম্যান উইলিয়াম কিশ্চের মূল বইটি আমার হাতে আসেনি। হারম্যানের বইয়ের উদ্ধৃতাংশগুলোর অনুবাদ গ্রহণ করেছি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের গবেষণাগ্রন্থ ‘কোই হ্যায়: পূর্ববঙ্গে ইংরেজ সিভিলিয়ান’ (সময় প্রকাশন, ২০০৮) থেকে।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক