১৭৯৮ সালের মে মাসের মাঝামাঝি ফ্রান্সিস বুকানন কুমিল্লার কাছাকাছি এসে হাজির হন। ১৫ মে তিনি তার ডায়েরিতে লিখছেন, ‘ভোরে আমি কুমিল্লার উদ্দেশে যাত্রা করলাম।’ তিনি কুমিল্লার দিকে এগোচ্ছিলেন চট্টগ্রাম সফর শেষ করে। ১৩ মে তার অবস্থান ছিল ঢাকা চট্টগ্রাম সড়কের পাশে মুহাম্মদ আলীর হাটে। স্থানটি ফেনী জেলার ফেনী সদর উপজেলায়। এখান থেকে তিনি মিরসরাই-কুমিল্লা সড়কে উঠেছিলেন। পার হয়েছেন মহুরী নদী। এর তীরে দেখেছেন লবণ উৎপাদন। পথে যা দেখেছেন তাতে সেখানে জমি বেশ নিচু। চট্টগ্রামের মতো চাষাবাদের পরিস্থিতি ততটা ভালো নয়। ১৪ মে তিনি যাত্রা করলেন চৌদ্দগ্রামে। পথে দেখলেন অনেক জলাশয়। বুকানন এত জলাশয় থাকার পেছনে কারণ হিসেবে শোনালেন একটি কৌতূহলোদ্দীপক সামাজিক মনস্তত্ত্বের কথা। ‘এখনকার দিনে যার পকেটে কিছু রুপি জমেছে সে-ই নিজের নাম স্মরণীয় করে রাখতে পুকুর খনন করেন।’ যেহেতু অনেকেরই টাকা-পয়সা বেশি ছিল না, তাই পুকুর বা দীঘিগুলো খুব ভালোভাবে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না। এগুলো থেকে তাই নানা ধরনের রোগ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত। এত পুকুরের উপস্থিতি কৃষি জমি সংকোচন করছে বলে মত দিয়েছেন বুকানন। তার ভাবনা যে এ পুকুর খোঁড়ার রীতিকে কৃষি উন্নয়নের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। কুমিল্লা অঞ্চলে পুকুর খুঁড়ে তোলা মাটি দিয়ে ঘরের ভিটা তৈরি করা হয়, নয়তো কোথায় স্তূপ হয়ে থাকে। ফলে এখানেও কৃষি উৎপাদনের সংকোচন। তবে বুকনান লিখেছেন কাছের লক্ষ্মীপুরে অবশ্য পুকুরপার সমতল করে সেখানে মরিচ, নয় তুলা চাষ করা হয়।

বুকানন পুকুর খুঁড়ে সামাজিক দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতিকে ইতিবাচক বলেই মনে করেছেন। তবে তার মত, এ প্রেরণাকে পুকুর খোঁড়ার চেয়ে বরং পথিকদের জন্য সরাইখানা নির্মাণের কাজে লাগানো উচিত। বাংলায় সরাইখানার অভাব রয়েছে সেটা বুকানন টের পেয়েছিলেন।

১৫ মে ফ্রান্সিস বুকানন কুমিল্লার দিকে যাত্রা করেছেন। পুরো দিনে পথে তিনি যা দেখেছেন তাতে তিনি হতাশ। মূলত চাষবাষের দুরাবস্থার বিষয়টি তাকে হতাশ করেছিল। কিছু পাহাড়ের সারির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। সেগুলোকে বলেছেন ঝোপঝাড়ে ভরা নিচু ভূমি। আর তাতে অপ্রয়োজনীয় ঝোপঝাড় গজিয়ে আছে। এরপর কিছু জমিতে দেখেছেন লম্বা ঘাস। সেখানকার জমি অবশ্য খুব উর্বর, কিন্তু নিচু হওয়ায় সেখানে ধান চাষ করা যায় না। এসব নিচু জমিতে আবার পানি জমে আছে। এসব জমিতে গজানো লম্বা ঘাস হাতির প্রিয় খাদ্য ছিল। আর যেসব জমি পরিষ্কার করা হয়েছিল, সেখানে তখনো চাষাবাদ শুরু হয়নি। বুকানন এ অবধি এসে শোনালেন ধীরে ধীরে রূপ পেতে থাকা নতুন যুগের ক্ষুধার কথা। ‘স্থানীয়রা একবার ধান চাষ ছাড়া আর কিছু করতে আগ্রহী নয়। এলাকাটিতে জনসংখ্যা খুব কম।’ অর্থাৎ, আরো বেশি ফসল ফলাতে হবে, আরো বেশি মানুষও চাই সেসব ভোগ করা, কেনা-বেচা, খাজনা চক্রে যুক্ত হওয়ার জন্য। সহজ কথায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সক্রিয় করতে হবে। অবশ্য বুকাননকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার এ কারণেই এ অভিযানে পাঠিয়েছিল। কোম্পানি সরকার বুকাননকে চট্টগ্রাম ও তার সন্নিহিত এলাকা জরিপের কাজে প্রেরণ করে। এ অঞ্চলে রফতানির উপযোগী মসলা ও কৃষিপণ্য উত্পন্ন করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখাই ছিল এ জরিপের উদ্দেশ্য। তিনি ১৭৯৮ সালের ২ মার্চ থেকে ২১ মে-র মধ্যে এ অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ, ফসল উৎপাদনের ধরন, উদ্ভিদসংক্রান্ত বিষয়, সমাজিক প্রতিষ্ঠান, গবাদি পশুপালনের অবস্থা এবং ওই অঞ্চলের সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেগুলো নিজের ডায়েরিতে দিন-তারিখ দিয়ে লিপিবদ্ধ করেন। এ অভিযানের শেষ ভাগে তিনি কুমিল্লায় হাজির হয়েছিলেন, যা লেখার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফ্রান্সিস বুকানন (১৭৬২-১৮২৯) ছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্যানুসন্ধানী ও জরিপকারী। বুকাননের জন্ম ১৭৬২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্কটল্যান্ডে। তিনি ডাক্তারি বিদ্যা লাভ করেন এডিনবরা থেকে। তার কর্মজীবন শুরু বাণিজ্যিক জাহাজের শল্যচিকিৎসক হিসেবে। ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সিস বুকানন বাংলায় নিয়োগ লাভ করেন। এর আগে তিনি এশিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমুদ্র যাত্রায় বেশ কয়েকবার অংশ নেন। বার্মার রাজধানী আভাতে ক্যাপ্টেন মাইকেল সাইমসের কূটনৈতিক দলের সঙ্গেও সার্জন হিসেবে তিনি যুক্ত ছিলেন। আভায় দায়িত্ব সম্পাদনের পর তাকে বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুরের কাছে পাত্তাহাটে নিয়োগ প্রদান করা হয়। বুকানন বাংলার উদ্ভিদ, প্রাণিকুল, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ এবং এ-সংক্রান্ত তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন।

একজন বৃদ্ধ বুকাননকে জানিয়েছিলেন, সেখানে বুনো শুয়োরের ভয়ে মানুষ মাঠে ফসল রোপণ করতে পারেনি। আরো আগে নাকি ছিল হাতির দলের উৎপাত। তবে তাদের মোটামুটি খেদিয়ে দেয়া গেছে। আর বুকানন বলছেন, হাতির মতো বুনো শুয়োরদেরও খেদিয়ে দিয়ে চাষ-বাষে সফলতা আনা সম্ভব। তার মনে হয়েছে তিনি বাংলায় তখনো যত এলাকা দেখেছেন তার মধ্যে চাষাবাদের জন্য এটাই সবচেয়ে উপযোগী, কিন্তু মানুষের উদ্যোগের অভাবে বিরান পড়ে আছে। বুকানন মন্তব্য করেছেন, ‘বালুমাটির পাহাড়ে চমত্কার পশুচারণভূমি হতে পারে। উঁচু জমিতে চাষ করা যাবে আখ, তামাক, তুলা, মরিচ। আর পানিতে ডুবে থাকা জমিতে বছরে নিঃসন্দেহে দুবার ধান ও শীতে ডাল ফলানো যাবে।’

১৬ মে কুমিল্লার একেবারে কাছে গিয়েও জমির দশার কোনো হেরফের দেখলেন না বুকানন। জমি উর্বর। নদীতীরে তামাক ও মরিচের চাষাবাদ লক্ষ করলেন। এ এলাকায় উৎপাদিত চালের মান খুব ভালো নয়। সমস্যাটি মাটির না বীজের সেটা বুকানন নিশ্চিত করতে পারেননি।

ফ্রান্সিস বুকানন কুমিল্লা থেকে এগোতে চেয়েছিলেন পূর্বদিকে পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে। কিন্তু তখন অগ্রিম বর্ষা বনের পরিবেশ খুবই অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছিল। কাঠুরেরাও তাদের কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। বুকাননকেও তাই পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। তিনি জানাচ্ছেন স্থানীয় ত্রিপুরা জাতির লোকজন পূর্বদিকে বনের মধ্যে ২০-৩০ মাইলের বেশি এগোয় না। কারণ ওদিকের কুকিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো নয়।

১৭ মে বুকানন গেলেন কুমিল্লার পাঁচ মাইল পশ্চিম দিকে। সেখানে তার উদ্দেশ্য ছিল লালমাই রেঞ্জ নিয়ে রেনেলের বিবরণী যাচাই করে দেখা। তিনি জানাচ্ছেন রেনেল যেটা লালমাই বলেছেন, সেটাকে স্থানীয়রা বলে ময়নামতি। এ রেঞ্জের পাহাড়গুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন। পাহাড়ের ভিত্তিগুলো ঢালু। সংলগ্ন সমতল জমিতে তুলা ও মরিচ ভালো জন্মাবে বলে মনে হয়েছিল বুকাননের।

এলাকাটি ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। বুকানন লিখছেন, এসব অবশ্যই পরিষ্কার করে গবাদি পশুর চারণভূমি বানাতে হবে। একই সঙ্গে বুনো পশু-পাখির আবাসও কেড়ে নিতে হবে। মুনাফার লোভে প্রকৃতির প্রভু হয়ে ওঠা মানুষের আগমন বার্তা শোনা গেল বুকাননের এ মন্তব্যে।

বুকানন জানাচ্ছেন অঞ্চলটি এককালে ছিল রাজাদের অবাসস্থল। বঙ্গে মুসলিম বিজয়ের কালে তারা ছিলেন মেঘনা থেকে পূর্বদিকের অঞ্চলের শাসক। আর সম্ভবত রাজারা ছিলেন আরকানের শাসকদের অধীন। পাহাড়ে তিনি রাজাদের সেই ভবনের ধ্বংসাবশেষও দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। এ চত্বরের উত্তর দিকে ইংরেজরা একটা বাংলো নির্মাণ করেছে। বুকাননের মতে, এ বাংলো নির্মিত হয়েছে সেই আগেরকালের রাজাদের একটি দুর্গের ওপর। ভবনগুলোর ইতিহাস নিয়ে নিশ্চিতভাবে বুকানন কিছু জানতে বা জানাতে পারেননি। তবে এটুকু জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে মারা যাওয়া এক ফকির বলতেন তিনি তার বাল্যকালে এসব প্রাসাদে রাজাদের বসবাস করতে দেখেছেন এবং এ রাজারা মেঘনা থেকে পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চল শাসন করতেন। বুকানন উল্লেখ করেছেন, তখন বাংলায় মোটামুটি সব হিন্দু জমিদারই রাজা বলে পরিচিত ছিলেন।

বুকানন যখন কুমিল্লায়, তখন ত্রিপুরার রাজা ছিলেন রাজধর মাণিক্য। তিনি লিখেছেন, এ রাজা ছিলেন মদাসক্ত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ১৮ মে রাজার এক হিন্দু দেওয়ানের সঙ্গে আলাপ হয় বুকাননের। সেই দেওয়ান বুকাননকে জানান যে ত্রিপুরা রাজ্যে তখন ১০ জাতের কুকি জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল।

এক বাঙালি কাঠুরের কাছে বুকানন বিস্তারিত শুনেছিলেন কুমিল্লার গোমতী নদী সম্পর্কে। এ নদীতে ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় ছিল ফেব্রুয়ারি। বর্ষাকালে স্থানীয় কাঠুরেরা বনে কাঠ কাটতে যেতেন না অসুস্থ হওয়ার ভয়ে।

১৯ মে বুকানন যাত্রা করেন পাতাহাটের উদ্দেশে। রাতে জ্বরে এসেছিল বলে পথে খুব বেশি কিছু পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়নি তার। কুমিল্লার লালমাইয়ের বাগমারা পর্যন্ত যেতে যেতে চৌদ্দগ্রাম থেকে কুমিল্লার দিকে যাত্রাপথের সঙ্গে সাদৃশ্য দেখেছেন তিনি, এখানে জ্বর আর প্রকৃতির বৃষ্টি ও গরমে কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। বেলা ১১টা নাগদ পৌঁছলেন হাজীগঞ্জ (এখনকার চাঁদপুর জেলায়)। স্থানীয় থানেদার তাকে একজন নতুন মাঝি দিলেন। মাঝিদের পরিশ্রম করার ক্ষমতা বুকাননকে বিস্মিত করেছিল। বাংলার মাঝিদের মতো প্রায় বিরতিহীনভাবে এবং অপুষ্ট শরীরে কোনো ইউরোপিয়ানকে এমন পরিশ্রম করতে কখনো দেখেননি।

ফ্রান্সিস বুকাননের কুমিল্লা ভ্রমণের এখানেই সমাপ্তি। ২১ মে তিনি দুর্গাপুর হয়ে পাতাহাট পৌঁছেন।

 

নোট: ইউপিএল প্রকাশিত ভেলাম ভান সেন্দেল সম্পাদিত ফ্রান্সিস বুকানন ইন সাউথইস্ট বেঙ্গল (১৭৯৮): হিজ জার্নি টু চিটাগং, দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস নোয়াখালী অ্যান্ড কুমিল্লা গ্রন্থ অবলম্বনে