বাইসাইকেলকে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, কোনো সন্দেহ নেই, এতে ব্যবহূত প্রযুক্তি আজকের বিবেচনায় যথেষ্ট সরল। কিন্তু এ সরল যন্ত্রটি তৈরি হতেই মানবসভ্যতাকে বহু শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাইসাইকেল তৈরির ইতিহাস মাত্র ২০০ বছরের। এ ইতিহাসও আবার বেশ বিভ্রান্তিকর—যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাই বলছে এ কথা। তার পরও দুই চাকার এ পঙ্খীরাজের উদ্ভবের একটি চেনাজানা ইতিহাস আছে। বাইসাইকেলের ইতিহাস জটিল নয়, তবে মজার। আজ আমরা সমান আকারের দুটি চাকার যে বাইসাইকেল দেখি, সেটা শুরুতে এমন ছিল না।
বাইসাইকেল শুরু হয়েছিল প্যাডেল ছাড়াই, মানুষ পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে দুই চাকা দিয়ে পথ চলত। সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি—মানুষ সাইকেলের মতো দুই চাকার একটি যানে বসা, প্যাডেলের বদলে নিজের পা দিয়ে মাটিতে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। জার্মানির বন কর্মকর্তা ও উদ্ভাবক কার্ল ভন ডারিস তৈরি করেছিলন এই যান। তিনি জার্মান ভাষায় এর নাম দেন Laufmaschine, ইংরেজিতে যার অর্থ রানিং মেশিন। বিদ্রূপ করে এই যানকে ডাকা হতো ড্যান্ডি হর্স নামে। ডারিস যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন ১৮১৭ সালে। তিনি পরের বছর ফ্রান্সে এর পেটেন্ট নিয়ে নেন। প্যাডেল না থাকার পাশাপাশি এর কোনো ব্রেকও ছিল না। যানটি চালানো যেমন কঠিন ছিল, তেমনি বিপজ্জনকও। যানটি খুব অল্প সময়ের জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এজন্য ১৮১৯ সালের গ্রীষ্মে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ড্যান্ডি হর্স তৈরি করেছিল। ব্রেক না থাকায় এ যানগুলো পথচারীদের আঘাত করছিল। ফলে অনেক দেশেই নগর কর্তৃপক্ষ ড্যান্ডি হর্সকে রাস্তায় নিষিদ্ধ করে দেয়।
১৮৫০ সালে তৈরি হয় প্যাডেলসহ প্রথম থ্রি হুইলার সাইকেল। ১৮৬০ সালে সত্যিকার বাইসাইকেল আবিষ্কার করেন Ernest Michaux ও Pierre Lallement। এ যান ভেলোসিপেড নামে পরিচিত হয়, এতে প্যাডেল ছিল। কিন্তু ব্রেক না থাকায় সমস্যা রয়েই গিয়েছিল। ১৮৭০ সালে তৈরি হয় পেনি ফার্দিং বা হাই হুইলার। দুই চাকার এ যানটিকে প্রথমবারের মতো ‘বাইসাইকেল’ নামে ডাকা হয়। এই যানের সামনের চাকাটি ছিল অনেক উঁচু আর পেছনের চাকাটি ছিল ছোট। পেনি ফার্দিং নামকরণ হয়েছিল এ কারণেই, চাকা দুটো দেখতে ছিল কয়েনের মতো এবং বড় চাকাটি ধরা হতো পেনি আর ছোটটি ফার্দিং। পেনি ফার্দিং চালানো ছিল খুবই কঠিন কাজ। প্যাডেল ছিল সামনের উঁচু চাকাটিতে, এটায় ওঠা এবং প্যাডেল মারা যথেষ্ট ঝামেলাপূর্ণ। এটা যে বহুল ব্যবহূত বাইসাইকেল হবে না, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। সামনের চাকাটি বড় রাখার কারণ ছিল। তখনো প্যাডেলর সঙ্গে চেইন যুক্ত হয়নি। প্যাডেল থাকত সরাসরি চাকার সঙ্গে এবং এটি লাগানো থাকত সামনের চাকায়। এক প্যাডেলে যেন বেশি পথ যাওয়া যায় এবং গতি বাড়ে, তাই চাকার পরিধি বা আকার বড় করা হতো। এরপর ১৮৮৫ সালে আসে সেই মুহূর্ত, যাকে বলা যায় আধুনিক বাইসাইকেলের জন্মক্ষণ— সমান আকারের দুই চাকার বাইসাইকেল আবিষ্কার যার পেছনের চাকা চেনের সাহায্যে প্যাডেলের সঙ্গে যুক্ত ছিল, ঠিক যেমনটা বর্তমানকালের বাইসাইকেলে দেখা যায়। বাইসাইকেলের আগের যেকোনো মডেলের চেয়ে এটি নিরাপদ ছিল বলে এর নাম হয় ‘সেফটি বাইসাইকেল’। এতদিন মেয়েদের জন্য ছিল তিন চাকার ট্রাইসাইকেল, এবার তারা লম্বা স্কার্ট পরেও সাইকেল চালাতে পারলেন। ১৯০৩ সালে সাইকেলে যুক্ত হয় গিয়ার। শিশুদের জন্য উপযুক্ত বাইসাইকেল তৈরি হয় ১৯২০ সালে। ১৯৩০ সালে সাইকেলে যুক্ত হয় স্প্রিং ও মোটা টায়ার। এটা হয়েছিল বেপরোয়া কিশোরদের সাইকেল চালনাকে নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে। পরবর্তী সময়ে এ বৈশিষ্ট্যগুলোই পর্বতারোহীদের সাইকেলে যুক্ত হয়েছিল।
১৮৯০-এর দশকে বাইসাইকেলকে দেখা হয়েছিল মানুষকে মুক্ত করার উপাদান হিসেবে, বিশেষত নারী ও সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের জন্য। সাইকেল এমন সময় সমাজে হাজির হয়েছিল, যখন মোবিলিটি শরীরী ও কাল্পনিক উভয় প্রেক্ষিতেই আধুনিক জীবনের নিত্যদিনের উপাদান হয়ে উঠছিল। বাইসাইকেল সে যুগের প্রগতিশীল ধারণা ও চেতনাকে এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
১৮৯০-এর দশকে সেফটি বাইসাইকেলকে সমাজে পরিচিত করে তুলেছিল ইউরোপের উচ্চবিত্তরা। তারা লন্ডন, প্যারিসের পার্কে তাদের দামি বাইসাইকেলগুলো অন্যদের দেখিয়ে বেড়াত। ধনী নারীদের ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল বাইসাইকেল। ১৮৯৬ সালে দ্য লেডি সাইক্লিস্ট কাউন্টেস অব ওয়ারউইক ফ্রান্সিস এভেলিন গ্রেভিলের (তিনি ডেইজি নামেও পরিচিত ছিলেন) সাইকেল ফ্যাশনের কথা উল্লেখ করে। ফ্রান্সিস এভেলিন গ্রীষ্মকালে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাদা পোশাক পরতেন এবং সে সময় তার সাইকেলের রঙও থাকত সাদা। শরত্কালে তিনি মস সবুজ রঙের পোশাক পরতেন এবং মিল রেখে তখন তার সাইকেলের রঙও হতো মস সবুজ। তবে এই ফ্যাশনসচেতনতাই কিন্তু এভেলিনের সবটা নয়, তিনি বরং ছিলেন বিদ্রোহী গোছের মানুষ। তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রী ও নারীদের ভোটাধিকার অর্জন আন্দোলনের সমার্থক। তিনি খুব সম্ভবত হেনরি ডাক্রের জনপ্রিয় গান ‘ডেইজি বেল’ (১৮৯২)-এর বিষয় ছিলেন।
লন্ডনের ব্যাটারসি পার্ক ও হাইড পার্ক অভিজাত-ধনী নারী-পুরুষদের সাইকেল চালনার জন্য উন্মুক্ত থাকত। রাজপরিবারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার কারণে সাইকেল আভিজাত্য আরো হাওয়া পায়। দ্য লেডি সাইক্লিস্ট ম্যাগাজিন লিখেছিল, প্রায় সব অভিজাতই ঘরে-বাইরে বাইসাইকেলচালক হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে ইংল্যান্ডের বা ইউরোপের রাজপরিবারের এমন কোনো শাহজাদীকে পাওয়া যাবে না, যিনি বাইসাইকেলের ভক্ত হননি।
অবশ্য অভিজাতদের এই সাইকেলপ্রেম বেশি দিন টেকেনি। ১৮৯৯ সালে ম্যাক্স বিরবোম তার ফ্যাশন অ্যান্ড হার সাইকেল প্রবন্ধে দেখিয়েছেন অভিজাত নারীদের আগ্রহ সাইকেল থেকে বল খেলা, তারপর তীর ছোড়া থেকে টেনিসে পরিবর্তিত হয়েছিল। ১৮৯৯ নাগাদ সাইকেল নিয়ে উচ্চবিত্তদের উচ্ছ্বাস শেষ হয়ে গিয়েছিল। কারণ সাইকেল তখন কিছুটা সহজলভ্য হয়ে গেছে। এইচজি ওয়েলসের দ্য হুইলস অব চান্স প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৬ সালে। এ উপন্যাসে এক পোশাক ব্যবসায়ীর কর্মী পুরনো একটি বাইসাইকেল কিনতে পেরেছিল। তাই বোঝা যায়, সে সময় সাইকেল সাধারণ মানুষের নাগালে চলে এসেছিল। তাই উচ্চবিত্তের জন্য সামাজিক মর্যাদার অংশ হিসেবে বাইসাইকেলের আবেদন ফুরিয়ে যায়। তখন অবশ্য স্বাস্থ্যরক্ষায় অভিজাত নারী-পুরুষদের অনেকে তাদের গ্রামের বাগানবাড়িতে সাইকেল চালাতেন।
১৮৯০-এর দশক ছিল আমেরিকানদের বাইসাইকেল ক্রেজের চরম সময়। শুধু ১৮৯৭ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিক্রি হয়েছিল ২০ লাখ বাইসাইকেল। সে সময় ছুটির দিনগুলোতে বাইসাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরিটা ছিল উৎসবের মতো। রাস্তায় বাইসাইকেলের রীতিমতো জ্যাম লেগে যেত। এই সাইকেল ক্রেজ বদলে দিয়েছিল আমেরিকান নারীদের জীবন। ১৮৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নারী আন্দোলন ও সাইকেল ক্রেজ ছিল ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পর যুক্ত। ১৮৯৬ সালে সুসান বি. অ্যান্থনি নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডসকে বলেন, ‘বাইসাইকেলিং নারীদের মুক্তির জন্য যে ভূমিকা রেখেছে, তেমনটা আর কোনো কিছুই রাখতে পারেনি।’ বিখ্যাত অ্যানি কপচোভস্কি বাইসাইকেলকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এর মূলে ছিল সেফটি বাইসাইকেল। সাইকেল সম্বন্ধীয় পিরিয়ডিক্যাল দ্য বিয়ারিং ১৮৯৪ সালের অক্টোবরে লিখেছিল, ‘দ্য সেফটি বাইসাইকেল নারীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভাব পূরণ করেছিল। এই সাইকেলের সামনে ধনী-গরিবের ভেদ ছিল না। সবাই এই সাইকেল কিনতে পারত। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এই জনপ্রিয় ও স্বাস্থ্যকর অনুশীলন উপভোগ করতে পারত।
১৮৯০-এর দশক যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের জন্য একটি বিশেষ কালপর্ব। এ সময় ‘দ্য নিউ উইম্যান’ নামে একটি টার্ম চালু হয়েছিল। তাদেরই দ্য নিউ উইম্যান বলা হতো, যারা ঘরবাড়ির প্রথাগত কাজ ছেড়ে বাইরের কাজ করতে এগিয়ে আসেন। এই নারীদেরই এগিয়ে দিয়েছিল বাইসাইকেল। সমাজে নিজেকে পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নারীরা সাইকেল চালনাকে ব্যবহার করেছিলেন। সাইকেলের মাধ্যমে নারী তার ঘর ও চারপাশের গণ্ডি ছেড়ে নিজেই নিজের মতো করে ঘুরতে শুরু করেন। এ স্বাধীনতা ও সুযোগ মনস্তাত্ত্বিকভাবে সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বাইসাইকেল চালাতে গিয়ে প্রশ্ন উঠল মেয়েদের পোশাক নিয়ে। মানে এবার নারীরা চাইলেন সাইকেল চালনার জন্য উপযুক্ত পোশাক। অ্যানি নিজেই এ বিষয়ে মতামত দিয়েছিলেন। ১৮৯৫ সালে ওমাহা ওয়ার্ল্ড হেরাল্ড অ্যানিকে নিয়ে লিখেছিল, মিস লন্ডনডেরি মত প্রকাশ করেছেন যে বাইসাইকেলের প্রচলন নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে একটি বড় সংস্কার করবে। এই সংস্কার নারীদের জন্য লাভজনক হবে। বলাই বাহুল্য, পোশাক নিয়ে সংস্কার মোটেই সহজ হয়নি। ব্যাপক তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়েই এ প্রক্রিয়া এগিয়ে গিয়েছিল। প্যান্ট পরা তখন আমেরিকান নারীদের জন্য নিষিদ্ধই বলা চলে। ১৮৯৫ সালের জুনে প্যান্ট পরে ফিনিক্স সাইকেল চালাচ্ছিলেন অ্যানি। এ দৃশ্য দেখে একজন বয়স্ক নারী এতটাই চমকে গিয়েছিলেন যে তিনি কাছে একটা দোকানে ঢুকে এই নতুন নারীদের শাপশাপান্ত শুরু করেন।
নারীদের সাইকেল চালানো নিয়ে সমাজে আরেক ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৮৯০-এর দশকে কথা উঠেছিল, সাইকেল চালাতে মেয়েরা যে ভঙ্গিতে বসে, তাতে তাদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। এজন্য তৈরি হচ্ছিল বিশেষ ধরনের সিট, যা ছিল শক্ত। একই সঙ্গে মেয়েদের জন্য উঁচু হাতলের সাইকেল বানানো শুরু হয়, যেন তারা বেশি ঝুঁকে সাইকেল চালাতে না পারেন। এসবই করা হচ্ছিল যেন সাইকেল চালনা তাদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা তৈরি করতে না পারে। আরো কথা উঠল, সাইকেল চালানো মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। সব ধরনের যুক্তি কিংবা কূটতর্কের লক্ষ্য ছিল একটাই, তা হলো কীভাবে নারীদের সাইকেল চালানো থেকে বিরত রাখা যায়। আইওয়া স্টেট রেজিস্টার তাদের এক প্রবন্ধে লিখেছিল, সাইকেল চালালে রোদ-বৃষ্টিতে মেয়েদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হবে। অনেকে বলা শুরু করেছিলেন, সাইকেল চালালে কিডনি, লিভার ও মূত্রনালির সমস্যা হবে। আর এমন গুজবও রটেছিল যে সাইকেলের চাকার কম্পন থেকে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এসব প্রচারণা অনেক গণমাধ্যমেও প্রচারিত হচ্ছিল। তখন শিকাগো ডেইলি নিউজ এসবের প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছিল, ‘নারীরা যখনই কিছু শিখতে যান কিংবা দরকারি কিছু করতে শুরু করেন, তখন সবসময়ই কেউ না কেউ এগিয়ে আসেন সেটার বিরোধিতা করতে। অনেক রাজ্যে এখন মেয়েরা ফ্যাক্টরিগুলোতে ১০ ঘণ্টা করে কাজ করে। দম আটকানো দোকানগুলোতে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে। ঘণ্টাপ্রতি মাত্র ৫ সেন্ট মজুরিতে সেলাই মেশিনে উবু হয়ে থাকে। কেউ কোনোদিন এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু যখন নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে সস্তায় সতেজ হাওয়া খাওয়া ও ব্যায়ামের একটা উপায় পেয়েছে, তখনই তাদের স্বাস্থ্যের কথা নিয়ে চারদিকে মায়াকান্না শুরু হয়ে গেছে।’
১৮৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডেট্রয়েটে মিসিসিপি ভ্যালি মেডিকেল কংগ্রেসে বাইসাইকেল চালানোকে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য স্বাস্থ্যকর ব্যায়াম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অনেকে এর প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু কেউই কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ দেখাতে পারেননি।
বাইসাইকেল চালানো শুরু করার পর যাতায়াতের জন্য মেয়েদের আর পরিবহন ও পুরুষদের ওপর নির্ভর করে থাকা লাগত না। নিজের ইচ্ছেমতো তারা চলফেরা করতে শুরু করে। এককথায় বাইসাইকেল হয়ে উঠেছিল নারীদের ‘স্বাধীনতার যন্ত্র’।
বিশ শতকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইসাইকেল রফতানি ব্যাপকভাবে কমে যায়। পশ্চিমে বাইসাইকেলের ব্যবহার কমে আসার লক্ষণটি এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হতে থাকে। হেনরি ফোর্ড ও অন্যান মোটরগাড়ি নির্মাতারা জোর গলায় বলতে শুরু করেন, বাইসাইকেল এখন পুরনো ফ্যাশন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলোতে তখনো সাধারণ মানুষের গাড়ি কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য তৈরি হয়নি। তাই মোটর বাইসাইকেল ও গাড়ি বাইসাইকেলকে কুপোকাত করতে পারেনি। বৈশ্বিকভাবে বাইসাইকেলের বাজার পুরো বিশ শতকজুড়েই সম্প্রসারিত হয়েছে।
বাইসাইকেল চীন, জাপান, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন ইউরোপীয় কলোনিতে প্রথম হাজির হয় ১৮৮০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে। বিদেশী জিনিস বলে স্থানীয়রা বাইসাইকেলকে শুরুর দিকে সন্দেহ নিয়ে দেখত, উপহাস করত। সাম্রাজ্যবাদীদের সংস্কৃতি বলে অনেক জায়গায় এই আমদানি করা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও হয়েছিল। তারপর একসময় বাইসাইকেল এসব বাধা কাটিয়ে ওঠে এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়। তারপর তো স্থানীয় পণ্যের মতোই হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হওয়ার আগে সাইকেল আসত ব্রিটেন ও জাপান থেকে। সব জায়গায় এই আমদানির গতি সমান ছিল না। এই গতি নির্ভর করত স্থানীয় সমাজে পশ্চিমা আধুনিকীকরণ কতটা সহজে গৃহীত হচ্ছে তার ওপর। ইউরোপীয়দের এশিয় কলোনিগুলোতে এবং চীনের বন্দরগুলোতে সাইকেল প্রচলিত হতে বেশি সময় নেয়নি। এশীয় দেশগুলোর মধ্যে জাপানেই প্রথম স্থানীয়ভাবে বাইসাইকেল তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছিল, ভারত ও চীনে যা গড়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। বাইসাইকেল যেখানেই হাজির হয়েছে, সেখানকার সামজ ও সাস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছে। উপনিবেশগুলোতে বাইসাইকেলের ব্যবহারকে পশ্চিমা ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবেই দেখা হতো। আধুনিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে নতুন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও চলচ্ছক্তি প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে সাইকেল একটি ভূমিকা পালন করেছে। আর শেষমেশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহে সাইকেল ব্যবহূত হয়েছিল। বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে বাইসাইকেলের পশ্চিমা পরিচয় ক্ষয়ে যায়। তখন এটি স্থানীয় সমাজজীবন ও ক্ষমতায়নে যুক্ত হয়ে যায়।
এশিয়ায় সাইকেলের প্রচলন হয়েছে সমাজের উঁচুতলা থেকে সাধারণ্যে। ইউরোপেও অবশ্য এমনটা হয়েছিল। ঔপনিবেশিক ভারতে ধনীদের আধুনিক বিনোদন বা অবসর কাটানোর অংশ হিসেবে চালু হয়েছিল সাইকেল চালনা। তবে ইউরোপে মধ্যবিত্ত হয়ে নিম্নবর্গের মানুষের কাছে সাইকেল পৌঁছে গিয়েছিল এক দশকের মধ্যেই। কিন্তু এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে এ প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি সময় লেগেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এশিয়ার অনুন্নত দেশগুলোর মানুষের অধিকাংশের বাইসাইকেল কেনার সামর্থ্য ছিল না। এ দেশগুলোর আর্থিক বৈষম্য ও সামগ্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতিরই সাক্ষ্য দেয় এই সাইকেল কেনার অসামর্থ্য। আরেকটি বিষয়ও এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাইকেলের প্রচলন ঘটাতে বাধা দিয়েছিল—সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন না থাকা। পশ্চিমা দুনিয়ায় ১৮৯০-এর পরবর্তী সময়ে সাইকেলকে জনপ্রিয় করতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে নারীদের সাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা দেখা যায় ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকেও। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের কারো বুঝতে একটুও অসুবিধা হওয়ার কারণ নেই। কারণ ২০১৯ সালেও দেশের রাজধানী শহরে সাইকেল চালাতে গেলে মেয়েদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
যেহেতু আধুনিক সমাজের সঙ্গে সাইকেল প্রচলনের ও ব্যবহারের যোগ আছে, তাই ১৮৯০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সাইকেলকে আধুনিকতার একটি বাহকও বলা যায়।
সাইকেল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই বিদেশী জিনিস বলে যতই ট্যাবু থাক না কেন, খোদ চীনই একসময় বাইসাইকেলের রাজ্যে পরিণত হয়। চীনে শুরুর দিকে বিদেশী জিনিস বলে সাইকেলের প্রচলন সহিংস প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। অথচ ১৯৬০-এর দশক নাগাদ চীনের সংস্কৃতিতে বাইসাইকেল এমনভাবে মিশে যায় যে বেশির ভাগ চীনা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সাইকেল আসলে চীনেরই আবিষ্কার এবং এখনো দেশটিতে অনেকেই এ কথা বিশ্বাস করে। ১৯৩০ নাগাদ বাইসাইকেল জাপান, চীন, ঔপনিবেশিক ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় বৈদেশিক পরিচয় হারিয়ে ফেলতে থাকে। এক দশক পর চীন ও ঔপনিবেশিক আফ্রিকার সমাজে বাইসাইকেল গৃহীত হয়ে যায়। ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকায় পশ্চিম দুনিয়া থেকে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি হাজির হয়েছিল—সাইকেল ছাড়াও এসবের মধ্যে ছিল ইলেকট্রিক টর্চ, সাবান, ম্যাচ। এসব জিনিস উপযোগিতার কারণে সহজেই এশীয় সমাজে মিশে যায়। এসব পণ্যে সাম্রাজ্যবাদী বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন—লাইফবয়ের বিজ্ঞাপনে দেখা যেত, অপরিচ্ছন্ন উপনিবেশগুলো পরিষ্কারের দায়িত্ব নিয়েছে তারা। তবে সাবান বেশ ছোট জিনিস আর দৈনন্দিন জীবনে কাজেও লাগত, তাই এ নিয়ে মানুষ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের কিছু দেখত না। টর্চ, সাবান সমাজকে পরিবর্তন না করলেও সাইকেল কিন্তু সমাজে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল।
ভারতবর্ষে বাইসাইকেল তৈরির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩৮ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন দ্বারপ্রান্তে। আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। যদিও তখন ভারতজুড়ে ব্রিটিশ বাইসাইকেলেরই আধিপত্য ছিল। ব্রিটিশ বাইসাইকেল আমদানি ভারতে সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ১৯৪৫-৪৯ সময়কালে। এ সময়কালে প্রতি বছর দুই লাখ বাইসাইকেল আমদানি হয়েছে। ১৮৯০ সালে কলকাতায় বাইসাইকেল ক্লাবের অস্তিত্বের কথা জানা যায় এবং তখন শহরে কয়েকশ বাইসাইকেলচালক ছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শাসন সূত্রে আফ্রিকায়ও বাইসাইকেল প্রচলিত হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের নাইজেরিয়ার গ্রামগুলোয় বাইসাইকেল ছিল সমাজজীবনের মুখ্য একটি অনুষঙ্গ। প্রতি পরিবারে অন্তত একটি বাইসাইকেল ছিল।
১৯৩০-এর দশকে বাঙালিদের সাইকেলে চেপে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়ার ইতিহাস আছে। বিমল মুখোপাধ্যায় (১৯০৩-১৯৮৭) ছিলেন বাঙালি ভূপর্যটক। তিনি ১৯২৬ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বের অনেকগুলো মহাদেশ সাইকেলে চেপে ভ্রমণ করেছিলেন। বিমল মুখার্জি ১৯২৬ সালে সালে সাইকেলে চেপে তার যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে তিনি ভারত ভ্রমণ করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন। বিমল তার ভ্রমণ করেছিলেন এক সফরেই—১৯২৬ সালে কলকাতা ত্যাগ করে ১৯৩৭ সালে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে তিনি তার এ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘দু চাকায় দুনিয়া’ নামে একটি বই লেখেন।
বিমলের পর পরই আরেক বাঙালি ভূপর্যটক সাইকেলে বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছিলেন, তিনি রামনাথ বিশ্বাস। রামনাথ তার তিনটি ওয়ার্ল্ড ট্যুর করেছিলেন ১৯৩১ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে। বহুকাল ধরে রামনাথ বিশ্বাসই বাংলার প্রথম বিশ্বপরিব্রাজক বলে পরিচিত ছিলেন। তার স্মৃতিকথা ও ভ্রমণবৃত্তান্ত ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তারপর ১৯৯৫-৯৬ সালে একটি বাংলা ভ্রমণ ম্যাগাজিন বিমল মুখার্জির লেখা স্বল্প পরিচিত ও আউট অব প্রিন্ট একটি বই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু করে এবং তাকে প্রথম বাঙালি তথা ভারতীয় বিশ্বপরিব্রাজক বলে দাবি করে। বলা বাহুল্য, বাঙালির এই বিশ্বভ্রমণ হয়েছিল বাইসাইকেলে চেপেই।
যাতায়াতের বাহন, বিশ্বভ্রমণ, স্বাস্থ্যরক্ষা ছাড়াও বাইসাইকেল প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহূত হয়েছে। বাইসাইকেল প্রচলনের শুরু থেকেই এটি প্রতিবাদের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ১৮৯০-এর দশকে রাস্তার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দাবিতে লিগ অব আমেরিকান হুইলমেন নামের সাইকেল চালকদের সংগঠন প্রতিবাদ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনেও মানুষের কাছে নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে দিতে অ্যাক্টিভিস্টরা সাইকেল ব্যবহার করেছিল। ১৯৬৫ সালে ডাচ প্রোভো আন্দোলন পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিল, তাদের ‘হোয়াইট বাইসাইকেল প্ল্যান’ আমাস্টারডামের কেন্দ্রে প্রাইভেট মোটরযান নিষিদ্ধ করে শুধু পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও বাইসাইকেল শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু করার দাবি তুলেছিল। তারা প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ৫০টি সাদা বাইসাইকেল সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য রাস্তায় রেখে দিয়েছিল। ধারণা করা হয়, পুলিশ রাতের আঁধারে এ বাইসাইকেলগুলো সরিয়ে ফেলেছিল। তা সত্ত্বেও এ ঘটনা আন্দোলনের বাহন হিসেবে বাইসাইকেলের ব্যবহার এবং সাইকেল তথা গণপরিবহনের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৭৯ সালে লন্ডনে ন্যাশনাল বাইক র্যালি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ছয় হাজার সাইকেলচালক সেদিন রাস্তা দখলের জন্য হাজির হয়েছিলেন। এ পদ্ধতি ইউরোপের অন্যান্য দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। একই বছর কোপেনহেগেনে ৫০ হাজার সাইক্লিস্ট রাস্তায় নেমে শহর অচল করে দিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের মে মাসে চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সরকারের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক গণবিক্ষোভ হয়েছিল, সেখানেই বাইসাইকেলের অংশগ্রহণ ছিল, কয়েক হাজার মানুষ বাইসাইকেলে চেপে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন।
১৯৯২ সালে সানফ্রান্সিসকোতে সাইক্লিস্টরা আন্দোলন করেছিলেন পাবলিক প্লেসগুলো ক্রমাগতভাবে মোটরগাড়ির দখলে চলে যাওয়ার বিরুদ্ধে। তারা বাইসাইকেলের জন্য রাস্তায় জায়গা দেয়ার দাবি তুলেছিলেন। বিশ শতকের প্রবল হতে থাকা কনজিউমানিস্ট কলাচারের বিরুদ্ধে বাইসাইকেল এবং এর চালকরা একটি সচেতন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এই পুরো শতকে বিভিন্ন দেশের বাইসাইকেল বিক্ষোভগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে সেটা স্পষ্ট হয়। নারী স্বাধীনতা থেকে পাবলিক প্লেসে সবার সমান সুযোগের দাবি কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলন—বাইসাইকেল এদের সবাইকেই প্রেরণা ও বস্তুগত শক্তি দিয়ে সাহায্য করেছে।
বিশ শতকের শুরুতে বাইসাইকেল ছিল আধুনিক সমাজের লক্ষণ। আর আমাদের এই একুশ শতকের শুরুতে সাইকেল যেন আধুনিকতার সমালোচক হিসেবে হাজির হয়েছে। সহজ করে বললে পোস্টমর্ডান ইনস্ট্রুমেন্ট। এ শতকে এসে যান্ত্রিক পরিবহন নগরগুলোকে এমন দূষণ, যানজট আর ধনবৈষম্যের মুখোমুখি করে দিয়েছে যে সাইকেলকে ফিরিয়ে আনার কথা উঠছে জোরেশোরে। ইউরোপের অনেক দেশই বাইসাইকেলকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সেখানে এর ব্যবহারও বাড়ছে। আমেরিকায় বাইসাইকেল শেয়ারিং জনপ্রিয় হচ্ছে। ২০১২ সালে পাঁচ কোটি আমেরিকান সাইকেল চালিয়েছে, ২০১৭ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৬০ লাখ। অনেকে বলছেন, নগরগুলোয় মানুষের যাতায়াতে বাইসাইকেলই শেষ ভরসা। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে বাইসাইকেল নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় সাইকেল চালানোর জায়গা এবং নিরাপত্তা না থাকায় জনপ্রিয় হতে গিয়েও বাইসাইকেল আর শেষমেশ সুবিধা করে উঠতে পারেনি।






