অনুস্মৃতি: লুইজি বাতোলিনি অনুবাদ: এমএ মোমেন
যুদ্ধোত্তর দারিদ্র্যজর্জর ইতালি। বেকারত্ব হ্রাসের লক্ষণ নেই। বাস থেকে নেমে বেকার লোকজন ভ্যালমেলানিয়া কর্মসংস্থান অফিসের সামনে ভিড় করে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চায়, অফিসার ধমক দেয়। সবাইকে নিচেই থাকার নির্দেশ দিয়ে আন্তোনিও রিক্কিকে নাম ধরে ডাকে। সম্ভবত জনতার মধ্যে আন্তোনিও নেই। অন্য একজন তাকে ডেকে আনে। অন্যদের মতো চাকরি পেতে সেও মরিয়া হয়ে উঠেছে। জনতার মধ্য থেকে রাজমিস্ত্রিরা চেঁচিয়ে ওঠে। আমরা তো না খেয়ে মরতে বসেছি। নির্বিকারভাবে অফিসার বলে তার করার কিছু নেই।
অলৌকিকই বলতে হবে, অফিসার আন্তোনিওকে একটি চাকরি সাধলেন। তাকে গোটা শহরে পোস্টার লাগাতে হবে। অফিসার তাকে চাকরির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওয়ার্ক পারমিট এবং অবশ্যই একটি সাইকেলসহ চাকরিদাতার সঙ্গে দেখা করতে বলেন।
আন্তোনিও বলে তার একটি সাইকেল আছে, তবে প্রথম কদিন হেঁটে হেঁটে কাজটা করবে। অন্যরা হাত তুলে বলে তাদের সাইকেল আছে, এখনই সাইকেল নিয়ে আসতে পারবে।
চাকরি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে ভেবে আন্তোনিও মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় কালই সাইকেল নিয়ে হাজির হবে। এটা পুরোপুরি মিথ্যেও নয়। তার সাইকেলটি বন্ধক দেয়া আছে। আন্তোনিও বাড়ি ফিরে নিজের জন্ম হওয়াকে অভিশপ্ত বলে আখ্যায়িত করছিল। তার স্ত্রী মারিয়া এগিয়ে এসে বলল, ‘চিন্তা নেই। আমরা তো বিছানা ছাড়াই ঘুমোতে পারি।’ সুতরাং বাড়ির চাদর বন্ধক রেখে ৭৫০ লিরা পেল। সেখানে চাদরের বিশাল স্তুপে তাদের বান্ডিলটা রাখা হলো। তারপর বন্দকের দোকান থেকেই সাইকেলটা ছাড়িয়ে নিয়ে চাকরিদাতার কাছে ছুটল। জানল প্রতি দুই মাসে তার বেতন হবে ৬ হাজার লিরা, পারিবারিক ভাতা, ওভারটাইমও পাবে। আনন্দে উত্তেজিত আন্তোনিও। স্ত্রীকে বলল, হ্যাটের স্র্ব্যাপটা একটু টাইট করে দিতে হবে, যাতে তাকে সত্যিকারের পেশাজীবী মনে হয়।
ফেরার পথে মারিয়া একজন অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী নারীর ঘরে ঢুকল। আন্তোনিওর চাকরির ব্যাপারে সে ঠিক কথাই বলেছে এবং ঐশ্বরিক তদবিরের মাধ্যমে তাকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে বলে মারিয়ার ধারণা। সুতরাং সে তাকে ৫০ লিরা দিতে চায়। কিন্তু আন্তোনিও স্ত্রীর মূঢ়তায় ক্ষেপে ওঠে এবং বলে যার দুটি সন্তান আছে এবং যার ঘাড়ের ওপর একটি মাথা আছে, এসব গাঁজাখুরি কথা সে শোনে কেমন করে?
পরদিন সকালে মারিয়া স্বামীর ক্যাপ ঠিক করে স্বামীর জন্য ডিমের স্যান্ডউইচ বানায়। ছেলে ব্রুনো বন্ধকওয়ালার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনা বাবার সাইকেল পরিষ্কার করে। আন্তোনিও স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুটি করে। তারপর বাবা ও ছেলে সাইকেল নিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে যায়।
ছেলেকে হ্যান্ডলবারে বসিয়ে অনেক দিন পর সে বিজয়ীর মতো রোমের শ্রমিক বসতির ভেতর দিয়ে এগিয়ে একটি ফিলিং স্টেশনে ছেলেকে নামিয়ে দেয়। ব্রুনো এখানেই কাজ করে। আন্তোনিও তার নতুন চাকরির সদর দপ্তরে আসে। অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে দায়িত্ব বুঝে নেয়। লম্বা মই ও পোস্টার নিয়ে সবাই যার যার রাস্তায় চলে যায়। দেয়ালে লাগানোর পোস্টার যাতে কুচকে না যায় কিংবা কোথাও দলা না পাকায়, সে কায়দাটা তাকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছে। একটি পোস্টারে হলিউডের নায়িকা ও বিখ্যাত সেক্স সিম্বল রিটা হেওয়ার্থ। তার সঙ্গের চাকরিপ্রার্থীদের অধিকাংশই তখনো বেকার। তাদের সন্তানদের ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে। আন্তোনিও তার জন্য নির্ধারিত রুটে দেয়ালে মই ঠেকিয়ে রিটা হেওয়ার্থের পোস্টার লাগাচ্ছে, খানিকটা দূরে দৃষ্টিসীমার মধ্যেই তার বাইসাইকেল। ওদিকে এক তরুণ বয়স্ক একজনের সঙ্গে কথা বলে চলেছে, কিন্তু তার দৃষ্টি সাইকেলের ওপর। হঠাৎ এই তরুণ এক ঝলকে সাইকেলে চড়ে বসে এবং দ্রুত চালাতে থাকে। চিত্কার করে ওঠে আন্তোনিও, ‘চোর চোর, সাইকেল চোর। মই থেকে এক লাফে নেমে কেবল পায়ের ওপর ভর করে সাইকেল আরোহী চোরকে ধাওয়া করে। ধাওয়াকারীর অসহায় চিত্কার ও প্রাণপণে ছুটে যাওয়া একজন গাড়িচালককে ব্যথিত করে। তাকে তার গাড়িতে তুলে নিয়ে চোরের পেছনে ছুটতে থাকে, কিন্তু একটি টানেলে চোর তাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ভীষণ অসহায় অবস্থায় সাইকেলের খোঁজে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে আন্তোনিও আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। পরামর্শমতো পোস্টারে দ্বিতীয় দফা আঠা লাগায়, যাতে কুচকে না যায়। তারপর ঝিম মেরে মইয়ের সবচেয়ে নিচের পাদানিতে বসে থাকে, চোখ ফেটে কান্না আসতে চায়। সাইকেল হারানোর যন্ত্রণা তার জীবনীশক্তি শুষে নিতে থাকে।
আন্তোনিও পুলিশ স্টেশনে আসে। সাইকেলের সিরিয়াল নম্বর ও বর্ণনা লিখে মামলা রুজু করতে চায়। এতটুকু সহানুভূতিহীন পুলিশ তাকে বলে, ‘যাও নিজে নিজে খুঁজে বের করো, পুলিশের কিছু করার নেই।’
অন্তত মামলাটাও কি নেবে না? রাজনৈতিক দাঙ্গা দমনে ব্যস্ত এক অফিসার আন্তোনিওর কাতর অনুরোধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তার চোখে পড়ে থানার দেয়ালের শেলফে নিষ্পত্তি করতে না পারা হাজার হাজার মামলা। পুলিশের সহায়তার জন্য হাজার জনতা অপেক্ষমাণ, তাদের ভিড় ঠেলে আন্তোনিও বেরিয়ে যাত্রীর ভিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া একটি বাসে চড়ে ছেলের কাছে আসে। তাকে নিয়েই বাড়ি ফেরার কথা।
ব্রুনো জিজ্ঞেস করে, বাবা সাইকেল কোথায়?
খুব লজ্জা পাচ্ছে, কেমন করে সত্যিটা ছেলেকে বলবে! বলল ওটা ভেঙে গেছে।
তারপর নিঃশব্দে ছেলের পাশাপাশি হেঁটে বাড়ি পৌঁছল। ছেলেকে একই বাড়ির ভেতরে পাঠিয়ে বন্ধু বাইয়োক্কোর খোঁজে কমিউনিস্ট পার্টির একটি সভায় ঢুকে শুনল তারা শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আলাপ করছে। দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ঢুকল একটি নাটকের রিহার্সেলে। বন্ধুকে পেল, সাইকেল খুঁজে পেতে তার সাহায্য চাইল। বন্ধু বলল, যত শিগগির সম্ভব রোমের সবচেয়ে বড় চত্বর পিয়াজ্জা ভিট্টোরিওতে গিয়ে দুজন একসঙ্গে খোঁজ করবে।
মারিয়া এসে হাজির হয় দুজনের কাছে এসে বলে, সাইকেল কোথায়?
আন্তোনিও ধমকে উঠে বলে, এখানে ঘ্যান ঘ্যান করো না। এটা এড়াতেই আমি বাড়ি যাইনি।
মারিয়া যখন কাঁদতে শুরু করে বাইয়োক্কো তাকে আশ্বস্ত করে।
যাও ঘুমাও গে, কালই পেয়ে যাবে। অবশ্য চোরেরা দু-একটা পার্টস এদিক-ওদিক করে ফেলতে পারে।
বাইয়োক্কোর এমন নিশ্চিত আশ্বাস স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কিছুটা ঠাণ্ডা করে আনে। তবুও অস্বস্তি ও দ্বিধা নিয়েই বাড়ি ফেরে তারা—আগামীকালটা কেমন হবে, কে জানে।
পরদিন সকালে বাবা ও ছেলে বাইয়োক্কোর কাছে এলে সাইকেলের বর্ণনা শুনতে চায়। ছেলে জানায়, ‘লাইটওয়েট ফিডেস ১৯৩৫ মডেল’ তারপর বর্ণনা শোনায়। বাইয়োক্কো আরো দুজনকে নিয়োগ দিয়ে দুই ভাগ করে পিয়াজ্জা ভিট্টোরিওর সাইকেলের দোকানে অনুসন্ধানে পাঠায়।
প্লাজাতে হরেক রকম মানুষ হরেক রকম কাজে ব্যস্ত। সুবেশ একজন তার চারপাশ তোয়াক্কা না করে বুদ্বুদ উড়িয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানীরা অসংখ্য দোকানের ওপর চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। এমন খোঁজাখুঁজির সময় এক বুড়ো ধনী ব্রুনোকে খুব হেনস্তা করে। আন্তোনিওর মনে হয়, এক দোকানে তার সাইকেলের একটি অংশ দেখতে পেয়েছে। দোকানদারকে সেই অংশের সিরিয়াল নম্বর বলতে অনুরোধ করলে, তা সে প্রত্যাখ্যান করে। তারপর পুলিশ ডেকে আনে। পুলিশ পরীক্ষা করে দেখে এটা আন্তোনির সাইকেলের অংশ নয়। ভুলের কারণে পুলিশ তাকে ভর্ত্সনা করে চলে যায়।
বাইয়োক্কো এখানে অনুসন্ধান চালিয়ে যায়। আন্তোনিওকে গোর্টা পোর্টিস মার্কেট যেতে বলে। তার এক বন্ধু যখন বাবা ও ছেলেকে সেই মার্কেটে নিয়ে যায়, মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। অনুসন্ধান অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্রুনো পিছলে পড়ে যায়। আন্তোনিও ছেলেকে একটি কাপড় এগিয়ে দেয়। হঠাৎ বৃষ্টি থেমে গেলে আন্তোনিওর চোখে পড়ে তার বাইসাইকেল চোরদের একজন। তরুণ চোর এক বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ করার সময় তার হাতে ১০০ লিরা তুলে দেয়। ছেলেকে না বলেই আন্তোনিও ওই চোরকে ধাওয়া করে এবং ‘ধর ধর’ চিত্কার করতে থাকে। টের পেয়ে ছেলেও বাবার পিছু নেয়, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই চোর আবার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আন্তোনিও ফিরে আসে। বুড়োটাকে ধরতেই হবে এবং অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পায় বুড়োকে। তারপর বাবা ও ছেলে তাকে অনুসরণ করতে করতে চার্চ পর্যন্ত যায়। তারপর প্রার্থনার সময় তাকে ধরে ফেলে এবং একপর্যায়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার হুমকিতে বুড়ো তরুণ চোরের ঠিকানা ও অ্যাপার্টমেন্ট নম্বর দিয়ে দেয়।
আন্তোনিও তাকে নিয়ে ওই চোরের বাড়িতে যেতে চায়। বুড়ো অস্বীকার করলে তাকে চেপে ধরে। বুড়ো দুপুরের খাবারটা খেয়ে নেয়ার কথা বলে সটকে পড়লে আবার বাবা ও ছেলে যখন চার্চের ভেতর তল্লাশি শুরু করে, তখন চার্চের লোকজন ধমক দেয়। দুজন অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে বেশ অঘটন ঘটায়, চার্চের মর্যাদা তাতে ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা। অনুসন্ধানে ক্লান্ত আন্তোনি ও ব্রুনো বুঝতে পারে সাইকেল চোর তাদের ধারাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।
ক্ষুব্ধ ব্রুনো বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ধরেছিলেই যখন তাকে দুপুরের খাবার খেতে যাওয়ার সুযোগ দিলে কেন?
হতাশ আন্তোনিও ছেলের প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হয়ে তাকে কষিয়ে চড় মারলে ব্রুনো কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়।
বুড়োকে খুঁজতে খুঁজতে আন্তোনিও যখন লেকের কাছে চিত্কার শোনে যে একটি বালক পানিতে ডুবে গেছে। তখন সে ভয়ঙ্কর আতঙ্কিত হয়ে ওঠে—এ নিশ্চয়ই তার ব্রুনো।
কিছুক্ষণ পর জেলেরা যে ছেলেটিকে উদ্ধার করে, সে ব্রুনো নয় জেনে আন্তোনিও আশ্বস্ত হয়। চোখ ঘুরিয়ে সেতুর সিঁড়ির সবচেয়ে উপরে ছেলেকে দেখে আনন্দিত হয়। তার ব্যথা ভোলাতে ব্রুনোকে দামি রেস্তোরাঁয় খাইয়ে সন্তুষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ছেলেকে টেনে নিয়ে আসে, বলে আমরা খাবারও খাব, মদও খাব। ছেলে অবাক হয়। আন্তোনিও দুজনের জন্য মোজ্জারেলা চিজ স্যান্ডউইচ ফরমায়েশ দেয়। সঙ্গে ওয়াইন। ব্রুনো কাটাচামচের তোয়াক্কা না করে হাতে তুলে স্যান্ডউইচ খেতে থাকে। তার দিকে তাকিয়ে থাকা ধনী পরিবারের বালকদের দিকে সে-ও তাকায়। আন্তোনিও ছেলেকে বলে ওদের মতো করে খেতে হলে মাসে এক লাখ লিরা কামাই থাকতে হবে। ব্রুনো মনে মনে টাকা-পয়সার হিসাবে করতে শুরু করে। বাবার যে বেতন পাওয়ার কথা, তা যদিও অব্যাহত থাকে... ভাবতে ভাবতে সাইকেলটার কথা সবকিছুকে ছেয়ে ফেলে। রেস্তোরাঁ ছেড়ে দুজন আবার সাইকেলের খোঁজে বের হয়।
আন্তোনিও দেখল যে অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী নারীর কাছে যাওয়ার জন্য মারিয়াকে বকা দিয়েছিল, সে নিজেই সেখানে এসে হাজির হয়েছে। বেশ ভিড় সেখানে, সে-ই নারী একজনকে বলছে, ‘তুই কুিসত। পৃথিবীতে আরো মেয়ে আছে, সেখানে তোর বীজ বপন কর। যা, তুই যা।’
ক’জনকে পাশ কাটিয়ে ব্রুনো সেই লোকটির শূন্যস্থানে বাবাকে টেনে নিয়ে বসাল। আন্তোনিও তার সাইকেলের কথা বলল। নারী তাকে বলল, ‘যদি এখনই না পাও, ভবিষ্যতে আর পাবি না। এখন চলে যা, আমার কথা বুঝতে চেষ্টা কর।’
তার হাতের শেষ মুদ্রাগুলোর কিছু নারীর হাতে দিয়ে আন্তোনিও বেরিয়ে আসে।
এখান থেকে বেরোতেই বাবা ও ছেলে দুজনই তরুণ চোরকে দেখতে পায়। আন্তোনিও তাকে ধাওয়া করে। চোর একটি পতিতালয়ে ঢুকে পড়ে। সেখানকার নারীরা আন্তোনিওকে লাথি মেরে বের করে দিতে চায়। কিন্তু সে সরে যাওয়ার লোক নয়। সে চোরকে ধরে এবং বাইসাইকেল ফেরত চায়। চোর অস্বীকার করে। চোরের প্রতিবেশীরা মিথ্যে অভিযোগ করছে, এ অজুহাতে তার ওপর চড়াও হয়। এক ফাঁকে ব্রুনো বেরিয়ে গিয়ে তার বাবাকে বাঁচাতে পুলিশের সাহায্য চায়। পুলিশ অফিসার আসে।
আন্তোনিও যাকে চোর মনে করছে, তার প্রমাণ ও সাক্ষী হাজির করতে বললে আন্তোনিও বলে, সে তো নিজেই তাকে চুরি করতে দেখেছে, এর চেয়ে বড় প্রমাণের আর কি দরকার।
তরুণ চোরের প্রতিবেশীরা সবাই আন্তোনিওর বিরুদ্ধে বলছে, তার পরও তার ঘর তল্লাশি করার পর সাইকেলের হদিস মিলল না। পুলিশ চলে যায়, মারের মুখে বেরিয়ে আসে বাবা ও ছেলে। ছুটে বেরোনোর সময় অল্পের জন্য গাড়ি চাপা পড়া থেকে ব্রুনো রক্ষা পায়। কিন্তু আন্তোনিও এমনই ঘোরের মধ্যে ছিল যে, কিছুই টের পায়নি।
ততক্ষণে দিন ফুরিয়ে আসছে, ফুটবল স্টেডিয়ামের বাইরে একটি বাঁকে দুজন বসে পড়ে। তাদের চোখের সামনে দিয়ে শত শত মানুষ সাইকেল নিয়ে এগিয়ে যায়। স্টেডিয়ামভর্তি মানুষ, জমজমাট ম্যাচ। হাজার সাইকেল, তালা মারা, মালিকের অপেক্ষায়। দূরের দরজাপথে একটি নিঃসঙ্গ সাইকেল আন্তোনিওর চোখে পড়ে। হাতের অবশিষ্ট কিছু টাকা ছেলের হাতে দিয়ে বলে মন্তে সেক্রোগামী গাড়ি ধরে বাড়ি চলে যা।
ব্রুনো টাকা নিয়ে ছোটে, কিন্তু অল্পের জন্য ধরতে পারেনি, গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
আন্তোনিও সাইকেলটির দিকে এগোয়। ভীষণ চিত্কার-চেঁচামেচি শুনে ব্রুনো ছুটে এসে দেখে লোকজন জোর করে তার বাবাকে সাইকেল থেকে নামাচ্ছে। সাইকেলের মালিক তার হ্যাট চড় মেরে ফেলে দিয়েছে। হ্যাট ছিল তার সম্মানের প্রতীক। ‘বাবা বাবা’ বলে কাঁদতে কাঁদতে ব্রুনো ক্ষুব্ধ জনতা ঠেলে এগিয়ে যায়। চড়-থাপ্পড়ে আন্তোনিওর মুখমণ্ডল বিক্ষত হয়ে পড়েছে। একজন ব্রুনোকে বলল, ‘চোর শালাকে তুইও মারতে শুরু কর।’
একটি চলমান গাড়ি জনতার মাঝখান দিয়ে গিয়ে ক্ষুব্ধ জমায়েতকে দু’ভাগ করে দেয়। চার-পাঁচজনের একটি দল বল খাটিয়ে আন্তোনিওকে থানার দিকে নিয়ে যায়। ব্রুনো দ্রুত বাবার হ্যাট তুলে দেয়। ব্রুনোর কান্না দেখে বাইসাইকেলের মালিক হঠাৎ সদয় হয়ে ওঠে এবং আন্তোনিওকে পুলিশে সোপর্দ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যরা সাইকেল চোরকে গালাগাল দিতে থাকে। মাথা নিচু করে মার খাওয়া সাইকেল চোর আন্তোনিও এবং চোরের ছেলে ব্রুনো হাঁটতে থাকে।
ব্রুনো বাবার হাতে হ্যাট তুলে দেয়। বিশাল, অজ্ঞাত জনতার ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আন্তোনিও মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকে। ব্রুনো বাবার হাত ধরে। দুজন বাড়ির পথে জনতার মধ্যে মিশে যায়, তাদের আর দেখা যায় না।
[লুইজি বার্তোলিনি ইতালীয় পেইন্টার, লেখক ও কবি। তবে ‘বাইসাইকেল থিভস’ই তাকে খ্যাতিমান করে তোলে। ভিত্তোরি দ্য সিকার হাতে নির্মিত নিউ রিয়েলিস্ট ধারার এ সিনেমাটি (১৯৪৮) ৭০ বছর ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঁচটি সিনেমার একটি হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। কোনো কোনো সময় এটি থাকছে শীর্ষ অবস্থানেও।]






