হিটলার বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯০৭ সালে ভিয়েনার একাডেমি অব ফাইন আর্টসে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। দুই দফা ব্যর্থ হয়ে ১৯১৪ সালে তিনি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী অর্থাৎ সৈনিকের পেশা বেছে নেন এবং দুবার বীরত্বসূচক খেতাব পাওয়াসহ কৃতিত্বের সঙ্গে সেই পেশার দায় মেটান। এ তথ্যটি তার জীবনীকাররা সবাই উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি যে ক্রিকেটার হওয়ারও স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা তার কোনো জীবনী গ্রন্থেই উল্লেখ নেই।
১৯১৯ সালে হিটলার সেনাজীবন ছেড়ে জার্মান রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে তার নেতৃত্বে বিয়ার হল পুশ খ্যাত সেনাবিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তিনি রাজনীতির একেবারে প্রথম সারিতে চলে আসেন এবং উঠতি নেতা হিসেবে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৮৮০ সালে জন্ম নেয়া ওলিভার লকার-লেম্পসন ছিলেন ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের রক্ষণশীল দলের রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সংসদে একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ছিলেন। ইউরোপে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে তিনি হিটলারের নজরে আসেন। হিটলারও বলশেভিকবিরোধী হওয়ায় লেম্পসন তার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে এ মধুচন্দ্রিমা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হিটলারের বিভিন্ন ফ্যাসিস্ট সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে ইহুদিবিরোধী অবস্থানের কারণে লেম্পসন একসময় হিটলার থেকে সরে দাঁড়ান। লেম্পসন যখন হিটলারের অনুরাগী ছিলেন, তখন হিটলারকে নিয়ে তিনি একটি রচনা লিখেন এবং তা ১৯৩০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি মিরর পত্রিকায় প্রকাশ পায়। রচনার শিরোনাম ছিল, ‘এডলফ হিটলার এজ আই নো হিম।’
লেম্পসন সেই রচনায় উল্লেখ করেন, দুই মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ জার্মানিতে তিনি কয়েকজন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তার দেখা পান। ততদিনে হিটলার জার্মানের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। সংগত কারণে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় হিটলারের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। এ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রথম মহাযুদ্ধে যুদ্ধবন্দি হিসেবে চিকিৎসার জন্য জার্মানির এক সামরিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হিটলারও সে সময় যুদ্ধাহত অবস্থায় সেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। হিটলার আচমকা একদিন ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কাছে এসে ১১ জন নিয়ে ক্রিকেট খেলার প্রস্তাব রাখেন। সেনা কর্মকর্তারা কিছুটা আশ্চর্য হলেও হিটলারের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান।
ম্যাচের প্রস্তুতির জন্য সেনা কর্মকর্তারা হিটলারকে ক্রিকেট খেলার নিয়মকানুন ভালো করে লিখে দেন। এরপর বেশ কিছুদিন হিটলারের আর দেখা পাওয়া গেল না। হঠাৎ একদিন উদয় হয়ে তিনি সেনা কর্মকর্তাদের জানালেন, তার টিম খেলার জন্য প্রস্তুত। যথাসময়ে খেলা হলো। তবে ম্যাচটা কবে, কোথায় হয়েছিল, ফলাফল কী হয়েছিল, হিটলারের ব্যাটিং অর্ডার কী ছিল, তিনি কত রান করেছিলেন—এসব তথ্য কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ম্যাচটি ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগেই সংঘটিত হয়েছিল। আর অধিকাংশ মানুষের ধারণা যে হিটলার অভিজ্ঞ ইংরেজদের কাছে এ খেলায় পরাজিত হয়েছিলেন।
ফলাফল যা-ই হোক, ক্রিকেট হিটলারকে আকর্ষণ করল না। তিনি ক্রিকেটকে জার্মান জাতির জন্য যথেষ্ট আক্রমণাত্মক মনে করলেন না। ক্রিকেটকে তিনি আমুদে ইংরেজদের জন্য উপযুক্ত মনে করলেও সিরিয়াস মানসিকতার জার্মানদের জন্য বেমানান ভাবলেন। হিটলারের ক্রিকেটে আগ্রহের বিষয়ে লেম্পসন ধারণা করেন যে, এটিকে ক্রীড়া হিসেবে নয় বরং এর মাধ্যমে তিনি শান্তিকালীন অথবা অবকাশে থাকাকালে সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার চিন্তা করেছিলেন। ক্রিকেটের প্রশান্ত মেজাজ ছাড়া এর আরো কিছু ত্রুটি হিটলারের নজরে আসে। তিনি প্রতিরক্ষার জন্য ব্যাটসম্যানদের প্যাড পরিধানকে অপৌরুষোচিত ও অজার্মানসুলভ আচরণ মনে করেন। তার মতে ক্রিকেটের আদর্শ হওয়া উচিত ‘ক্রিকেট’ আর ‘ব্লিত্জক্রিগ’-এর সমন্বয়ে ‘ব্ল্যিজক্রিকেট’। তিনি জার্মানদের জন্য খেলার নিয়মকানুন বদলের উদ্যোগ নিলেন। হিটলার ক্রিকেটের নতুন নিয়ম-কানুনে কোলবালিশের মতো প্যাডকে বিদায় দেয়ার সুপারিশ করলেন। সর্বোপরি তিনি পাঁচদিন ধরে খেলা ও দফায় দফায় চা-নাশতা আর ভোজের জন্য বিরতিকে বদলে দিতে চাইলেন। হিটলারের ধারণাগুলো তখনকার ক্রিকেট বিশ্বে কোনো প্রভাব ফেলেনি, অথবা হিটলার কোনো উদ্যোগই নিতে সাহস পাননি। চার শতাব্দী ধরে ইংরেজদের হাতে, তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তো এক ফুত্কারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, হিটলারের ফর্মুলা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো।
ক্রিকেটের সঙ্গে জার্মানদের যোগাযোগ খুব প্রাচীন হলেও এটি তাদের কাছে মোটেও জনপ্রিয় ছিল না। ক্রিকেটের বিস্তারিত নির্দেশিকা ইংল্যান্ডে নয় বরং ১৭৯৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল জার্মানিতে। সেই বইয়ের লেখক গুটজমুথজ লিখেছিলেন, ‘এ খেলাটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ইংল্যান্ডের মাধ্যমে।’ গুটজমুথজের প্রচার সত্ত্বেও খেলাটি জার্মানদের আকর্ষণ করেনি। তারা এটিকে ‘ইংলিশ রোগ’ মনে করত। ১৮৯৮ সালে জার্মান জিমন্যাস্ট ও শিক্ষক কার্ল প্লান্ট লিখেছিলেন, ‘এই ফালতু ইংলিশ খেলাকে আমরা শুধু জঘন্যই বলব না, বরং এটা উদ্ভট, কুিসত ও বিকৃত।’ কিন্তু ১৮৯২ সালেই বার্লিনে গঠিত হয়েছিল ‘ডয়েচ ফুটবল ও ক্রিকেট বোর্ড’।
প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানরা পরাজয় স্বীকার করে নিলে ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। বিজয়ী ব্রিটিশরা যুদ্ধবিরতির পর বেশ কিছুদিন জার্মানের বিভিন্ন জায়গায় ছাউনি করে অবস্থান নেয়। সময় কাটানোর জন্য ক্রিকেটপাগল ইংরেজরা প্রথম দিকে ছাউনি ও এর আশপাশে নিজেদের মধ্যে, আর পরবর্তীতে স্থানীয়দের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচ খেলত। ফলে এ সময় হিটলারের উত্থানের পাশাপাশি জার্মানে ক্রিকেটেরও উত্থান লক্ষ করা যায়। ক্রিকেট এ সময় কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় ১৯২১ সালের আগস্টে প্রুশিয়ান একাদশ আর নির্বাচিত হল্যান্ডের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচের বর্ণনা দিয়ে উল্লেখ করে জার্মান প্রফেসররা সম্ভবত এ খেলাকে জার্মানের সৃষ্টি প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করবে। তবে ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করলেও সে সময় থেকে বিভিন্ন কারণে ক্রিকেটের দ্রুত পতন শুরু হয়।
হিটলারের ক্রিকেট দর্শনের এখানেই হয়তো সমাপ্তি টানা যেত, যদি না অল্প কিছুদিন আগে প্রকাশিত ডেন ওয়েডেলের বিখ্যাত ‘ফিল্ড অব স্যাডো’ বইয়ে হিটলারের ক্রিকেট সম্পৃক্ততার আরো কিছু নতুন তথ্য পেতাম। ১৯৩৬ সালে জার্মানরা বার্লিন অলিম্পিকে বড় ধরনের সাফল্য লাভ করে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য ১৯৩৭ সালের জুলাইয়ে হিটলারের ক্রীড়ামন্ত্রী হানস ফন সামার ওন্ড ওসটেন দুই সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড সফর করেন। উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজরা কীভাবে ক্রীড়ার সাহায্যে জাতির স্বাস্থ্য নিশ্চিত করছে বা জাতি গঠনে ক্রীড়ার ব্যবহার কী, তা ভালোভাবে দেখবেন। অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, সফরটি জার্মানির একনায়ক হিটলারের আগ্রহ বা অনুমোদনেই হয়েছিল।
ওসটেন ইংল্যান্ড সফরে উইম্বলডন (টেনিস), উম্বলে (সাঁতার), হোয়াইট সিটি (অ্যাথলেটিকস), এলডারসট (আর্মি স্কুল অব ফিজিক্যাল ট্রেনিং), ক্লারিজ (ন্যাশনাল ফিটনেস কাউন্সিল) সহ আরো অনেক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান সফর করেন। এছাড়া তিনি ইংল্যান্ডের উল্লেখযোগ্য ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। সফরের একেবারে শেষ দিকে অর্থাৎ ২৩ জুলাই ওসটেন লর্ডসের ময়দানে মিডলেক্স ও উস্টারশায়ারের মধ্যে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি উপভোগ করেন এবং এমসিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন। মধ্যাহ্নভোজে উপস্থিত ছিলেন ইংল্যান্ড ক্রিকেট সাম্রাজ্যের প্রায় সব তারকা। এমসিসি ছিল অভিজাতদের ক্লাব এবং ওখানকার সদস্যদের প্রায় সবাই ছিলেন বলশেভিকবিরোধী। ডেন ওয়েডেল মনে করেন, অতিরিক্ত পান করার কারণে বা হালকা মেজাজে থাকার কারণে ওসটেন হয়তো এ অভিজাতদের হিটলার ও তার ঘনিষ্ঠ জনদের ক্রিকেটপ্রীতির ধারণা দেন এবং এমসিসিকে বার্লিনে আমন্ত্রণ জানান। এমসিসি ওসটনের আমন্ত্রণ নিজেরা গ্রহণ না করে ‘উস্টারশায়ার জেন্টলম্যান ক্লাব’কে জার্মান সফরের আহ্বান জানায়। এ ক্লাব মধ্যমানের ও অপেশাদার ক্লাব হিসেবে পরিচিত ছিল। ২৪ জুলাই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায়, উস্টারশায়ার জেন্টলম্যান ক্লাব দিন দশেকের জন্য বার্লিন সফরে যাচ্ছে।
হিটলারকে ক্রিকেটে আগ্রহী করে তোলার জন্য এর আগের একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। কমিউনিজমের বিরুদ্ধে হিটলারের দৃঢ় অবস্থান আর মহাযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ইংল্যান্ডের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি তাকে বেশ গুরুত্ব দেয়া শুরু করেন। অনেকে বার্লিন গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। অনেকে আবার ইংরেজ ও জার্মানির মধ্যে মৈত্রী সৃষ্টি করে যৌথভাবে কমিনিউজম প্রতিহত করার উদ্যোগও নেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বও ছিলেন। তাদের মধ্যে সিবি ফ্রাই একজন। সিবি ফ্রাই ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে দেশ ও দেশের বাইরে ২৬টি ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ খেলেছিলেন। এছাড়া তিনি লং জাম্পে ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী ছিলেন। তিনি রাগবি খেলতেন এবং নামকরা অ্যাথলেটও ছিলেন। রয়াল নেভির রিজার্ভ বাহিনীতে তিনি ক্যাপ্টেন ছিলেন। তিনি একাধারে ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ছিলেন এবং ক্রিকেট বিষয়ে বেশকিছু বইও লিখেছিলেন। রাজনীতিতে লিবারেল দলের প্রার্থী হিসেবে ব্রিজটন থেকে নির্বাচন করেন। ফ্রাই ১৯৩৪ সালে জার্মানি গিয়ে হিটলারের সঙ্গে দেখা করেন। এর আগে তিনি ইয়োখিম ফন রিবেনট্রুপের সঙ্গে দেখা করেন। রিবেনট্রুপ পরে লন্ডনে জার্মান দূত হয়েছিলেন। ফ্রাই রিবেনট্রুপকে ক্রিকেটের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অর্থ বিনিয়োগের সুপারিশ করেন। রিবেনট্রুপ অবশ্য ক্রিকেটকে জার্মানদের জন্য বেশ জটিল খেলা বলে মন্তব্য করেন। ফ্রাই তা অস্বীকার করে রিবেনট্রুপকে বলেন যে কয়েক সপ্তাহ সময় পেলে জার্মানদের নিয়ে তিনি ভালো দল গড়ে তুলতে পারবেন। এমনকি ডব্লিউ জি গ্রেসের মতো খেলোয়াড়ও জার্মানিতে তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মত দেন। রিবেনট্রুপ ফ্রাইয়ের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। হিটলারের সঙ্গে ফ্রাইয়ের আলোচনায় রিবেনট্রুপ দোভাষীর কাজ করেন। পরে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ফ্রাই আলোচনাকালে ক্রিকেট নিয়ে হিটলারকে কিছুই বলেননি।
ওসটেন সফর শেষে বার্লিন ফিরে গিয়ে সফরের বিস্তারিত বর্ণনাসহ একটি প্রতিবেদন হিটলারের কাছে উপস্থাপন করেন এবং হিটলার প্রতিবেদনটি পড়ে দেখেন। প্রতিবেদনে ওসটেন ইংরেজদের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় সরকারের উদ্যোগকে খুব একটা প্রশংসা করেননি। তবে লর্ডস সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন, ‘[এটি] সো কল্ড মক্কা অব ইংলিশ ক্রিকেট।’ এরপরের ঘটনা হচ্ছে, ১৯৩৭ সালে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে উস্টারশায়ার জেন্টলমেন ক্লাব বার্লিন সফরে যায় এবং একটি প্রস্তুতিমূলক ও দুটি টেস্ট ম্যাচে অংশ নেয়। ইতিহাসে এর আগে একবারই শুধু ইংল্যান্ডের একটি দল জার্মান সফর করেছিল। সেটা ছিল ১৯১১ সালে এবং দলটির নাম ছিল লিস্টার ক্রিকেট ক্লাব। সেই সফরে লিস্টার চারটি ম্যাচেই জিতেছিল। উস্টারের দলের বার্লিন সফর উপলক্ষে উস্টারশায়ার আর বার্লিনে সাজসাজ রব পড়ে যায়। উস্টারশায়ারের ৪০০ বছরের প্রাচীন পত্রিকা বরোস উস্টারশায়ার জার্নাল-এর ১৯৩৭ সালের ৩১ জুলাই সংখ্যায় লেখা হয়, ‘মেজর এমএফএস জুয়েলের নেতৃত্বে উস্টারশায়ার জেন্টলম্যান দল শিগগিরই ১০ দিনের ক্রিকেট সফরে বার্লিন যাচ্ছে। ফুরার হিটলার এ সফরে খুব আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যদিও জার্মান ক্রিকেট এখনো একেবারেই শিশু অবস্থায় আছে।’ ক্রিকেট সফর শুরু হওয়ার আগে বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক পাম ওয়ার্নার লন্ডনের জনপ্রিয় ও সবচেয়ে প্রাচীন ক্রিকেট পত্রিকা ‘দ্য ক্রিকেটার’-এ লিখেছিলেন, এ বার্লিন সফর ক্রিকেটের উন্নয়নে সাহায্য করবে, যেহেতু হিটলার ক্রিকেটে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
এ সময়ে জার্মানিতে বিদেশীদের চলাচলের ওপর অনেক বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু উস্টারের দলকে বার্লিনে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরার জন্য লন্ডনের জার্মান দূতাবাস থেকেই পাস দেয়া হয়েছিল। উস্টারের দল বার্লিন স্টেশনে পৌঁছালে তাদের ভিআইপি সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেখানে কয়েক হাজার স্থানীয় ক্রীড়ামোদী ও সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। আলডন নামের একটি অভিজাত হোটেলে রাখা হয়।
উস্টারের দল ৬ আগস্ট বিএসভি মাঠে বার্লিন এ একাদশের সঙ্গে একদিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে। এরপর ৮ ও ৯ আগস্ট টিব প্লাত্জ মাঠে এবং ১০ ও ১১ আগস্ট অলিম্পিক স্টেডিয়ামে বার্লিন একাদশের সঙ্গে দুটি টেস্ট ম্যাচে মুখোমুখি হয়। সবগুলো ম্যাচেই উস্টারের দল বড় ব্যবধানে জয়ী হয়।
উস্টারের দলের অন্তত দুজন খেলোয়াড়ের পরিবার ডেন ওয়েডেলের কাছে জানায়, দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচের প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ আগস্ট হিটলারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও জার্মানের প্রচারমন্ত্রী যোসেফ গোয়েবলস মাঠে উপস্থিত ছিলেন এবং দলের সঙ্গে একটা ছবি তুলতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
১১ আগস্ট রাতে সফরকারী দলের সম্মানে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে মন্ত্রীসহ বার্লিনের বিখ্যাত ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, ‘ক্রিকেট খুব ভালো একটি খেলা। আমি ১৯৩৮ সালে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার জন্য ইংল্যান্ড যেতে পারি।’
১২ আগস্ট রাতে উস্টারের দল দেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। পরের বছরের আগস্টে ইংল্যান্ডের সমারসেট ওয়ান্ডারার্স নামে আরেকটা অপেশাদার ও আরো দুর্বল ক্রিকেট দল বার্লিনে তিনটা ম্যাচ খেলে। এ দলও সবগুলো ম্যাচেই জয়ী হয়।
সফরগুলোর আয়োজন এবং গোয়েবলস ও ওসটেনের মতো মানুষদের সম্পৃক্ততার কারণে অনেকে ধারণা করেন যে, এর পেছনে হিটলারের হাত ছিল। তখনকার বাস্তবতা অনুযায়ী হিটলারের অগোচরে ইংল্যান্ডের কোনো ক্রিকেট দলকে বার্লিনে আমন্ত্রণ জানানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এ থেকে কেউ কেউ ভাবতেই পারেন, হিটলারের তরুণ বয়সের ক্রিকেটপ্রীতিও হয়তো এখানে কাজ করেছিল। ম্যাচগুলোর ফলাফল তার মনঃপূত হওয়ার মতো ছিল না। ফলে প্রচলিত ক্রিকেটের প্রতি হিটলার হয়তো আরো কিছুটা বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েন।
এরপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। জার্মানি ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। যদিও ১৯৩৫ সাল থেকেই জার্মানের সঙ্গে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছিল এবং ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করে নিয়েছিলেন। যা হোক, ১৯৪৫ সালের মে মাসে রাশিয়ার বার্লিন দখলের মধ্য দিয়ে জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হয়। হিটলার ৩০ এপ্রিল আত্মহত্যা করেন। এর মাধ্যমে ক্রিকেটের প্রতি তার রাগ, অনুরাগ বা বিরাগেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। বেঁচে থাকলে হয়তো মাইন ক্যাম্প বা মাই স্ট্রাগলের মতো আর একটা বই লিখতে পারতেন—মাই স্ট্রাগল উইথ ক্রিকেট।
ক্রিকেট বোদ্ধা জর্জ অরওয়েল হিটলার ও তার পারিষদের ভয়াবহ ক্রিকেট উদাসীনতা বা রূঢ় অর্থে বিরোধিতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন, হিটলার ক্রিকেটের নিয়মকানুন শিখেছিলেন, খেলাটি অনুশীলন করেছিলেন, ম্যাচও খেলেছিলেন এবং শেষে রায় দিয়েছিলেন, খেলাটি যথেষ্ট পুরুষালি নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ইংলিশ বিদ্বেষ যত বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে ইংলিশ সংস্কৃতি ও বাতিকের প্রতি অরুচিও; ক্রিকেট এর মধ্যে অন্যতম।
দুর্জনরা বলে থাকেন, ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচটিতে হিটলার মাত্র একটি বল খেলেছিলেন, শূন্য রানে স্টাম্পড হয়েছিলেন। অন্যদিকে ১৯৩৭ সালে উস্টারশায়ার জেন্টলম্যান ক্লাব আর ১৯৩৮ সালে সমারসেট ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কাছে সব ম্যাচেই বার্লিন পরাজয় বরণ করে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, হিটলার ক্রিকেটে সফল হতে পারেননি। হিটলার বা বার্লিন বিজয়ী হলে ক্রিকেট বিশ্ব তো বটেই, বিশ্ব ইতিহাসেও এর প্রভাব পড়ত। ১৯৩৯ সালে হয়তো বিশ্বযুদ্ধের বদলে প্রথম বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেট যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতো। কিংবা হিটলারই হয়তো তার দর্শনের সঙ্গে সংগতি রেখে শর্টার ভার্সন বা শর্টেস্ট ভার্সন ক্রিকেটের জন্মদাতা হতেন। বলা যায় না, হয়তো লর্ডস থেকে ক্রিকেটের মক্কা নুরেমবার্গে চলে আসত। তার উগ্র বিশ্ব জয়ের নেশাটা হয়তো ক্রিকেটের সাহায্যেই তিনি চরিতার্থ করতে পারতেন। আর ক্রিকেটও ইংরেজদের বলয় থেকে বেরিয়ে বিশ্ববলয়ে ঢুকতে পারত। ক্রিকেট বিশ্বকাপের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই তখন আট-দশ দেশের বদলে ৩২ বা ৪৮টি দেশের মধ্যে চলত।






