বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লালমাই-ময়নামতি পাহাড় ও মেঘনার প্লাবনভূমির বরপুত্র শমসের গাজী স্থানীয় কিংবদন্তিতে ‘ভাটির বাঘ’ নামে পরিচিত। ‘ভাটি’ শব্দটি ষোড়শ শতাদ্বীর আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে প্রথম ব্যবহার হলেও শমসের গাজী ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধের ‘জন নায়ক’। লোকমুখে এই যোদ্ধার দান, বীরত্ব ও সাহসিকতার নানা কথন এমনভাবে ছড়িয়েছিল যে পরবর্তী সময়ের সাহিত্য কিংবা লেখনীতে অনেকে তাকে বাংলার ‘রবিনহুড’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম লাগোয়া ত্রিপুরা রাজ্যের বহুল আলোচিত ব্যক্তি শমসের গাজীর জীবন ও কর্মসংক্রান্ত নানা আকরসূত্র বর্তমান গবেষকদের নজরে এসেছে। এ তালিকায় রয়েছে জয়কুমার বর্ধনের অদৃষ্ট চক্র, পণ্ডিত রামগঙ্গা শর্মার কৃষ্ণমালা, কৈলাসসিংহের রাজমালা, কালি প্রসন্ন সিংহের পঞ্চমাণিক্য ও শ্রীরাজমালা, সমকালীন সূত্রের এই ফর্দের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় শেখ মনোহর আলী রচিত গাজীনামা গ্রন্থটিকে।

উপর্যুক্ত আকরসূত্রাদির ভিত্তিতে শমসের গাজীকে নিয়ে রচিত গবেষণার তালিকাটিও সুদীর্ঘ। বাংলা ভাষা, কৃষক বিদ্রোহ, ভারতীয় প্রতিরোধ আন্দোলন কিংবা জন ইতিহাস রচনার নানা আয়নায় প্রতিবিম্বিত কিংবা রোশনাইয়ের ঝিলিক পড়েছে এই ঐতিহাসিক চরিত্রের ওপর। পরিসর বিবেচনায় আজকের লেখায় পদ্যাকারে রচিত শেখ মনোহরের গাজীনামার পরিচয়, কাব্যে প্রতিফলিত বীরত্ব-লোকগাথা-কবি কল্পনার ছিটেফোঁটা পাঠকের সমীপে নিবেদন করার ইচ্ছাই প্রবল।

ফেনী-ত্রিপুরাজুড়ে বিস্তৃত অষ্টাদশ শতাব্দীর রওশনবাদ পরগনার জন-মানুষের আশার আলো ছিলেন শমসের গাজী। বিষয়টি ফুটে উঠেছে বিভাস কান্তি কিলিন্দারের ত্রিপুরা অব এইটিনথ সেঞ্চুরি উইথ শমসের গাজী অ্যাগেইনস্ট ফিউডালিজম, এ হিস্টোরিক্যাল স্টাডি গ্রন্থের নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিতে:

When the whole Tripura was thus passing through ... social, economic and political turbulence and chaos, Shamsher Gazi appeared with his indomitable fighting spirit against oppression and his unequalled skill in launching struggle which shaped the destiny of Tripura into a new form to much hopes and aspirations of the mass. (page. 69)

বিশ শতকের শেষ দশকে উচ্চারিত এই উচ্ছ্বাস-আকাঙ্ক্ষার বিশদ চিত্র পাওয়া যাবে শেখ মনোহরের গাজীনামায়। কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশকাল, পূর্ণাঙ্গ কাঠামো, কবি পরিচয়, কাব্যের ভাষা, ঐতিহাসিক তথ্যাদি— প্রভৃতি বিষয়াদি নানা তর্কের ঘোরপ্যাঁচে বিদ্যমান। মান্যবরেষু আহমেদ শরীফমধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ (ঢাকা: ২০০০) গ্রন্থে জীবনী কাব্যটিকে আঠার শতকের শেষদিকে লেখা রওশনবাদ পরগনার রাজনৈতিক ইতিহাসমূলক কাব্যগ্রন্থ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন (পৃ. ৩৪৪)।

কবি মনোহর শেখ শমসের গাজীর পরিচয়ে ভণিতায় লিখেন:

ছ অ মাসে বাঙ্গালার লীখীল বৃত্তান্ত।

অঠুক সকলে কেহ নাই সমবন্ত।

যাহার বারাইব প্রভূ তার নাই উন।

দিনে দিনে তাহার বার এ যসগুন।।

লিখা পরা গুণবন্ত পীরের নন্দন।

দেখি গুরু হইলেক সানন্দিত মন।।

জমিদার দুই পুত্র না হএ সমান।

তা দেখিয়া অর্ত্তেনজির দিল পেরেসান।।

ওপরের পঙক্তিমালার ‘জমিদার দুই পুত্র’ ছিলেন দক্ষিণ শিক পরগনার জমিদার নাছির মোহাম্মদের দুই ছেলে সাদুল্লা ও বাদুল্লা। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য পরবর্তী সময়ে শমসের গাজী নাছির মোহাম্মদের তনয়াকে বিয়ে করেছিলেন এবং নিজেকে দক্ষিণ শিক জমিদারির সর্বময় কর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

শ্রী দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ‘বাংলা সাহিত্যের কতিপয় ঐতিহাসিক কাব্য’ রচনায় মন্তব্য করেছিলেন:

শমসের গাজী অতি নিঃস্ব প্রজার ঘর হইতে গ্রাম্য কবির ভাষায় ‘ভাটী বাঙ্গালার ছানি নবাব’ হইয়াছিলেন তাহার চমকপ্রদ ইতিহাস রবিনহুডের গল্পের মতো চিত্তাকর্ষক ও আশ্চর্যজনক। (পৃষ্ঠা: ৮৮)

ইংল্যান্ডের অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকের পক্ষে দাঁড়ানো রবিনহুডের সঙ্গে ফেনী-ত্রিপুরা পরগনার শমসের গাজীর যে চারিত্রিক সমন্বয় দীনেশবাবু করেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল শেখ মনোহরের গাজীনামা। পরবর্তী অংশে গাজীনামা থেকে কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া হলো। পাঠক সচেতনভাবেই মনে রাখবেন রবিনহুড ইংল্যান্ডের জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালেও শমসের গাজী কিন্তু ছিলেন জমিদার ও নিজ পরগনার প্রজাদের জন্য প্রভূ-ল্যান্ডলর্ড। ক্ষমতা কাঠামোয় রবিনহুড আর শমসের গাজীর পরিচয় সত্তার এই বিশাল বৈপরিত্য সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে মিলের প্রথম ও প্রধান দিকটি ছিল জমিদারের সম্পদ ডাকাতি করে অকাতরে গরিব প্রজাদের তা বিলিয়ে দেয়া। ডাকাতির বর্ণনায় কবি মনোহর লেখেন:

মিরাহে জানিল দৈবে ঘটিল সমন।

দেখাইল যত ইচ্ছা লই জায় ধন।।

বাইষ লৌক্ষ ধন বাইষ সিন্দুকে আছিল।

এ লক্ষ্য ধন ছাদএ গাজিএ লুটিয়া আনিল।।

কৈলাসচন্দ্র সিংহ ব্যাখ্যা করেছেন, শমসের গাজী এই ডাকাতি করেছিলেন জনৈক কৃপণ জমিদারের কোষাগারে। কেননা এই জমিদার তার প্রজাসাধারণের জন্য তেমন দান-খয়রাত করতেন না (রাজমালা, পৃ. ৮৫)। শমসের এই লুণ্ঠিত সম্পদ গরিব প্রজাসাধারণের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। শমসেরের বিরুদ্ধ শক্তি ছিল তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজারা। তাদের দৃষ্টিতে শমসের ছিলেন বিদ্রোহী-ডাকাত সর্দার। তা সত্ত্বেও ত্রিপুরার রাজপরিবারের বীরত্বগাথা সংবলিত রাজমালাতেও শমসের গাজীর এই দানকর্মের খবর পাওয়া যায়। ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত গাজীনামার সংকলক ও সম্পাদক রমেন্দ্র বর্মণ দীনেশ বাবু প্রদত্ত শমসের গাজী ও রবিনহুডের তুলনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন:

ত্রিপুরার ইতিহাসের ... টালমাটাল সময়ে ‘ভাটীর বাঘ’ শমসের গাজীর অভ্যুত্থান ও বর্ণবহুল সংগ্রামী জীবনচর্যার মধ্যে কিংবদন্তিতুল্য রবিনহুডের ছায়া সম্পাত লক্ষ্য করা দীনেশ চন্দ্রের কৃতিত্বের শুধু পরিচায়ক নয়, জনসাধারণের আশা আকাঙ্ক্ষার সচেতন রূপায়ণ ও ইচ্ছাপূরণও বটে।

ব্রিটিশ কর্মকর্তা জে ই ওয়েবস্টারের প্রস্তুতকৃত ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট  গেজেটিয়ার্স সিরিজের নোয়াখালী জেলার অংশে শমসের গাজী কর্তৃক লুণ্ঠনকৃত অর্থ দানের সংবাদ পাওয়া যায় (পৃষ্ঠা ২২)।

বাংলার ইতিহাসে ১৭৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশক একটি ক্রান্তিকালীন পর্ব। নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়, মীর জাফর ও পরবর্তী সময়ে মীর কাশিম রাজনৈতিকভাবে বাংলার সর্বময় ক্ষমতাবান ব্যক্তি হলেও ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতের পুতুল। এহেন রাজনৈতিক অবস্থায় বাংলা-ত্রিপুরা সীমান্ত এলাকায় স্বল্প সময়ের জন্য শমসের গাজীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইতিহাসবিদদের দ্বিমতের অবকাশ নেই। নোয়াখালী, ত্রিপুরা, পার্বত্য ত্রিপুরা ও শ্রীহট্ট ছিল শমসের গাজীর কর্তৃত্ব বলয়ভুক্ত অঞ্চল। ইংল্যান্ডের গরিবের হিরো রবিনহুডের উদ্দেশ্য ছিল ‘হক-ন্যায়’ প্রতিষ্ঠা। যদিও পদ্ধতিগতভাবে তা ছিল বেআইনি। শমসের গাজীও তার জমিদারিতে হক প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। গাজীনামার ভাষায়:

হক বিচার করে গাজী বেহক ভেজিয়া।

গাজীকে ব্যখানে সবে জগত ভরিয়া।।

ভাগ্যকর্তা শমসের গাজী মানে সর্বজনে।

পানির কুম্ভির বনের ব্যাঘ্রে সব দোহাই মানে।।

প্রজাকল্যাণের অন্যতম একটি উপায় হলো রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীর সাজা সুনিশ্চিত করা। কবি মনোহর শেখের ছন্দমালায় বিষয়টি উঠে এসেছে নিম্নোক্ত শব্দকল্পে:

হেনমতে করে গাজী মুল্য করে কাম।

সদেষে বিদেষে ঘোষে গাজীর খোষ নাম।।

ডাকাইত পাইল তাকে তুরিদেন্ত সালে।

চোর পাইলে হস্ত কাট এ তৎকালে।।

পরদারা হরে যেবা মারে বেত বারি।

জেন মজা তেন সাজা গাজী করে ভারি।।

প্রজাকল্যাণের পাশাপাশি গাজীনামায় উল্লিখিত শিক্ষানুরাগেরও নিম্নোক্তাংশ উদ্ধৃতির লোভ সংবরণ করতে না পারায় হয়তো পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি বা বিরক্তের উদ্রেক হতে পারে। ছন্দগুলো হলো:

তোলাব খানায় ছাত্র শতেক রাখিয়া।

গাজী পালে সে সকলে অন্নবস্ত্র দিয়া।।

সন্দীপের অন্ধ এক হাফিজ আনিয়া।

কোরান পড়াএ সবে পুণ্যের লাগিয়া।।

হিন্দুস্তান হৈতে এক মৌলবী আনিল।

আরবী এলেম ছাত্রগণের শিখাইল।।

যুগদিয়া হৈতে এক গুরুবর আনি।

শিখাইল ছাত্রগণে বাঙ্গলার বাণী।।

ঢাকা হইতে মুন্শী আাানি ফারসি পড়াএ।

হেনমতে নানা ভাষাএ এলেম শিখাএ।।

শমসের গাজীকে কি বাংলার রবিনহুড বলা যায়? তিনি কি জমিদার শ্রেণীভুক্ত নন? কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে জমিদার হওয়ার প্রক্রিয়াটি কি সাদামাটা? কবি শেখ মনোহর কি কল্পনার আশ্রয় নেননি? জীবনচরিত গাজীনামা ইতিহাসনির্ভর না অতিশয় প্রশংসায় পূর্ণ?—এসব প্রশ্নের উত্তর পূর্ববর্তী গবেষকদের লেখনিতে নানাভাবে উচ্চারিত হয়েছে। চেষ্টা হয়েছে নানা তথ্যের বিচার বিশ্লেষণ করার। তাই সে পথ এড়িয়ে সমাপ্তি টনতে চাই শমসের গাজীর ত্রিপুরা রাজ্যের বিশ শতকের গবেষক রমেন্দ্র বর্মনের ভাষায়:

পল্লী কবি শেখ মনোহরের ‘গাজীনামা’ ঐতিহাসিক কাব্য। কবি বিষয়বস্তুর মাহাত্ম্য রক্ষা করতে গিয়ে কল্পনার পক্ষ বিস্তারের সুযোগ কমই পেয়েছেন। ... শেখ মনোহরের ... কাব্যটির বস্তুভিত্তির সুদৃঢ়তা ... এবং শমসের গাজী ত্রিপুরার বহমান রাজনৈতিক ইতিহাসের স্বীকৃত বিদ্রোহী নায়ক ... এই সূত্রেই এসেছে দৈবানুগ্রহ, পীরের আশীর্বাদ লাভ, স্বপ্নদর্শন ইত্যাদির কথা। (পৃষ্ঠা ১৬)

 

কৃতজ্ঞতা: আগরতলার অক্ষর পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত গাজীনামা গ্রন্থটির কপি প্রদান করে আমাকে সহায়তা করেছেন ত্রিপুরার কবি আকবর আহমদ। তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

 

শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

sahidul.hasan@du.ac.bd