ভাটির বাঘ নামে খ্যাত শমসের গাজীর ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলুপ্তপ্রায়। ৩০০ বছরের পুরনো এসব ঐতিহ্য দেখতে এখনো শত শত দর্শনার্থী ছুটে আসে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার জগন্নাথ-সোনাপুর ও চম্পক নগরের মাঝামাঝি রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে—এখানে আছে শমসের গাজীর প্রধান কেল্লা। পাহাড়ের চূড়ায় থাকা শমসের গাজীর সামরিক প্যারেড মাঠ, সমরাস্ত্র ভাণ্ডার, একখুইল্লা দিঘি, সুড়ঙ্গপথ ও বিশেষ মাটির সুরক্ষার ডুগডুগি কৌতূহল জাগিয়ে তোলে দর্শনার্থীদের মনে; অতীতের ইতিহাস মনের চোখে নানা দৃশ্য হয়ে হাজির হয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শমসের গাজীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পৌঁছে দিতে ওই এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে নবাব শমসের গাজী হাফেজিয়া মাদ্রাসা, শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্টসহ নানা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসবের মাঝে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দান ও শমসের গাজীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার দাবি করেছেন শমসের গাজীর উত্তরসূরি ও স্থানীয়রা।

ইতিহাস ও শমসের গাজীর সপ্তম উত্তরসূরিদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে ছাগলনাইয়া উপজেলার নিজকুঞ্জরা এলাকার জমিদার নাছির মোহাম্মদ চৌধুরীর আশ্রিত পীর মোহাম্মদ এবং কৈয়ারা বেগমের সংসারে জন্ম হয় শমসের গাজীর। অল্প বয়সে বাবাকে হারানো অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা বালক শমসের শৈশবেই দুরন্ত, সাহসী ছিলেন। শমসেরের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে নিঃসন্তান তালুকদার জগন্নাথ সেন ও তার স্ত্রী সোনা দেবী তাকে দরবারে থাকার সুযোগ করে দেন। তালুকদার দম্পতির স্নেহ-মমতায় বড় হওয়ার পাশাপাশি লেখাপড়াসহ তলোয়ার, লাঠি, কুস্তি, তীর-ধনুক চালনায় পারদর্শিতা লাভ করেন শমসের। জমিদার জগন্নাথ সেন শমসেরের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে পানুয়াঘাট কেল্লার অধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। মূলত এখান থেকেই শুরু হয় শমসের গাজীর উত্থানপর্ব।


তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ বাংলার এ অঞ্চল মগ, পর্তুগিজ জলদস্যুদের কাছে জিম্মি ছিল। ওই সময় পানুয়াঘাট এলাকায় প্রায় ৫০০ সদস্যের একটি শক্তিশালী দস্যু দলের রাজত্ব ছিল। শমসের গাজী অধ্যক্ষের দায়িত্ব পেয়েই কঠোর হস্তে দস্যুদের বিতাড়ন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তার সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তালুকদার জগন্নাথ সেনের মৃত্যুর পর শমসের খাজনা আদায় শুরু করেন। ১৭৩৯ সালের দিকে ত্রিপুরার মহারাজের সেনাপতি শমসেরের এলাকায় প্রবেশ করলে তাদের বন্দি করা হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজ তার সেনাপতির মুক্তির শর্তে গাজীকে জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি দেন। কয়েক বছরের মাথায় পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে শমসের কৃষকদের ওপর এক বছরের খাজনা মওকুফ ও তিন বছরের খাজনা মহারাজার কোষে জমা না দেয়ার ঘোষণা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শমসেরকে উচ্ছেদ করার জন্য ত্রিপুরার মহারাজ সাত হাজার সৈন্যের একটি দল পাঠান। শমসের ওই সৈন্যদলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। খবর পেয়ে তৎকালীন ত্রিপুরার রাজা কৃষ্ণমাণিক্য আগরতলা ছেড়ে মনিপুরের দিকে পালিয়ে যান। এতে ত্রিপুরা রাজ্যের বড় একটি অংশ শমসের গাজীর দখলে চলে আসে। ওই সময়ে ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুরে হলেও তিনি বেশির ভাগ সময় ফেনী নদী বেষ্টিত জগন্নাথ-সোনাপুরের চম্পকনগরের রঘুনাথ পাহাড়ের পাদদেশে স্থাপিত তার প্রধান কেল্লা ও প্রাসাদে থেকে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। দক্ষ শাসন ও কূটনীতির মাধ্যমে দীর্ঘ এক যুগ শমসের গাজী ত্রিপুরার শাসনকার্য পরিচালনা করে ইংরেজ বেনিয়াদের কোণঠাসা করে রাখেন।


১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফর অথবা মীর কাসিমসহ ইংরেজ বেনিয়া, ত্রিপুরা থেকে বিতাড়িত মহারাজসহ সব বিরোধী একত্র হয়ে শমসের গাজীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৭৫৯ কিংবা ১৭৬১ সালের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী এবং যুবরাজ কৃষ্ণমাণিক্যের নেতৃত্বে পাহাড়ি জাতিদের যৌথ বাহিনী শমসের গাজীর কেল্লা ও উদয়পুরে আক্রমণ চালিয়ে গাজীকে পরাজিত ও আটক করে।

তবে ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট নানা সূত্র বিশ্লেষণ করে শমসের গাজীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া গেলেও শমসের গাজীর সপ্তম বংশধর এটিএম গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী জানান, নবাব শমসের গাজীকে মুর্শিদাবাদে আলোচনার জন্য মীর জাফর আহ্বান করেন। শমসের গাজী স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের পথে রওনা হলে প্রতিমধ্যে তাদের আটক করা হয়। আটকের পর শমসের গাজীকে হত্যা করা হবে বলে মীর জাফরের বাহিনী সব রাজ্যে ঘোষণা পাঠায়। খবর পেয়ে শমসের গাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী আঁখি রানী সৈন্যসামন্ত নিয়ে ওই স্থানে হাজির হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একপর্যায়ে তিনি সেখানে পরাজিত ও শমসের গাজীসহ নিহত হন।

গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী আরো বলেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর একই কায়দায় আলোচনার জন্য ডেকে প্রতারণা করে ভাটির বাঘ শমসের গাজীকে হত্যা করে মীর জাফরের সৈন্যরা। শমসের গাজী ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার পর দ্বিতীয় মুসলিম নবাব; যাকে ষড়যন্ত্র করে পরাজিত ও হত্যা করা হয়। শমসের গাজী ছিলেন ত্রিপুরার একমাত্র মুসলিম শাসক।

ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রজাদরদি শমসের গাজীর শাসনামলের মাত্র এক যুগে তিনি অসংখ্য জনহিতকর কাজ করেছিলেন। তার সময়ে নির্মিত ফেনী নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এছাড়া প্রজাদের পানীয় জলের সমস্যা লাঘব করতে তিনি মায়ের নামে কৈয়ারা দিঘি, তার মেয়ের নামে তনু বিবির দিঘি, বল্লভপুরের আলীয়া গাজীর দিঘি, বুড়া সামন্তের দিঘি, পূর্ব ছাগলনাইয়ার দেয়ান আব্দুর রাজ্জাকের দিঘি খনন করিয়েছিলেন। সেগুলো এখনো শমসের গাজীর স্মৃতি বহন করছে। সোনাপুর জগন্নাথ, সোনাপুর জামে মসজিদ ও জগন্নাথ মন্দির স্মরণ করিয়ে দেয় শাসক হিসেবে সব ধর্মের মানুষকে মূল্যায়ন করার নীতি। অনেক হিন্দু ও মুসলিম ধর্মপ্রচারকদের তিনি অর্থ ও ভূমি দান করে গেছেন।


নবাব শমসের গাজীর বংশধর এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী জানান, শমসের গাজীর রাজপ্রাসাদ ও কেল্লার বেশির ভাগ অংশ বর্তমানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ অংশের রঘুনন্দন পাহাড়ে রয়েছে কেল্লার প্যারেড। যেখানে শমসের গাজীর সৈন্যসামন্তরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন। তার পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক একখুইল্লা দীঘি। কথির রয়েছে ওই দিঘিতেই শমসের গাজীর সামরিক অস্ত্রের ভাণ্ডার রক্ষিত ছিল। ওই দিঘির এপাশ থেকে ওপাশে ঢিল ছুড়ে কেউ পার করতে পারে না বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পাহাড়টির পূর্ব পাড়ে রয়েছে শমসের গাজীর ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গপথ। সুড়ঙ্গপথটি রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু হয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নর্দমা দিঘির পাড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে। সুড়ঙ্গটি শমসের গাজী তৈরি করেছিলেন প্রসাদের নারীদের পর্দা নিশ্চিত করতে। এ সুড়ঙ্গপথে রাজপ্রাসাদে থাকা নারীরা পর্দার সঙ্গে দিঘিতে গিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও শৌচকার্য করে পোশাক পরিধান শেষে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতেন।

শমসের গাজীকে হত্যা করার পর ইংরেজরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ইতিহাস লিখে শমসের গাজীকে দস্যু, লুটেরা, লাঠিয়াল হিসেবে আখ্যা দেয়ার অপচেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাস শমসেরকে তার মর্যাদা দিয়েছে। ভাটির বাঘ খ্যাত শমসের গাজী সাহসী ও প্রজাবান্ধব শাসক হিসেবেই ইতিহাসে পরিচিত হয়েছেন। 

শমসের গাজীর উত্তরসূরি মোতাহের হোসেন চৌধুরী রাশেদ এ লেখককে বলেন, ‘আমি ছাত্র থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. রাজিয়া সুলতানা আমাকে ডেকে নিয়ে নবাব শমসের গাজীর একটি চিঠি হাতে তুলে দেন। যা তিনি ঢাকার কোনো একটি জাদুঘরে পেয়েছিলেন। ওই চিঠিটি আমরা যত্ন করে রেখেছি। কিন্তু ওই চিঠিতে কী লেখা আছে বা ওই চিঠির রহস্য কী তা আমরা আজও উদ্ধার করতে পারিনি। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে আমাদের বাড়িতে শমসের গাজীর বেশকিছু স্মৃতিচিহ্ন রক্ষিত ছিল। কিন্তু পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সময় এসব স্মৃতিচিহ্ন আমরা রক্ষা করতে পারিনি।’

ত্রিপুরার একমাত্র মুসলিম শাসক নবাব শমসের গাজীর স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং শমসের গাজীর উত্তরসূরিরা।

 

নুর উল্লাহ কায়সার: সাংবাদিক, ফেনী