একদিন রেবতীর শুক্লা তিথিতে প্রকৃতির আঁধার ঠেলে যখন ভাঙা পয়সার মতো চাঁদ উঠল, মকবুল আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে সেখানকার বিশাল সীমানায় উজ্জ্বল একটা আলোর ফুলকি দেখা যায়। আলোটার দিকে একবার তাকিয়ে মকবুল এক চিলতে উঠানটির শেষ মাথার বাগানের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। মাঝখানে পুরনো গাছপালার শাখা-প্রশাখার আড়ালে বছর কয়েক আগে আসা এক ওগরাত পরিবারের দোচালা ঝুপড়ি ঘরের টুয়া চোখে পড়ে তার। পরিবারটি বর্ষার জল থেকে নিরাপদ থাকার জন্য টুয়ার ওপর পলিথিন কাগজ কেটে ফালি করা বাঁশের চ্যাং দিয়ে চেপে দিয়েছে। চ্যাংয়ের বাইরে ঝুলে থাকা পলিথিনে বাঁকা চাঁদের অনুজ্জ্বল আলো পড়ে ফণাতোলা সাপের মাথার মতো দুলছে। দেখে চমকে উঠল মকবুল। দরজার চৌকাঠে হাত রেখে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। মুহূর্তে তার মুখের ভেতর জল শুকিয়ে খরখরা হয়ে যায়। সে ঢোক গিলে গলার ভেতরে লালা গড়িয়ে ভেজাতে চেষ্টা করে, কিন্তু কলিজা পর্যন্ত সামান্য জলের অস্তিত্বটুকু অনুভব করে না।

আচমকা অসাড় হয়ে মকবুল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, মৃদু কেঁপে কেঁপে দু’হাঁটু খুলে আসতে লাগল তার। নিঃশ্বাস এমনভাবে বন্ধ হয়ে আসে যেন সূক্ষ্ম সুতোয় চেতনা ঝুলে আছে। দিশেহারা হয়ে কখনো ঘরের ভেতর কখনো উঠানের শেষ মাথায় লিচু গাছটির নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর দ্রুত পায়ে ঘরে গিয়ে আপারের দরজা খুলে পলিথিনে মোড়ানো দলিল-দস্তাবেজের পোঁটলাটা হাতে নিয়ে দেখে।

কেরোসিন কুপির নীলচে আলোর কাছে হোগলায় মেলে ধরে কাগজগুলো। নাকের ডগায় চশমা নিয়ে অনুসন্ধিত্সুর মতো তাকায় সিএস খতিয়ানের দিকে। সুন্দরবন পরগণায় সাবেক তিন নম্বর জেএল, বিঘাই মৌজায় জমিদার নির্মল কণ্ঠ রায়। আফেলুদ্দি মৃধা জমিদারের রায়ত। মকবুল ভ্রু কুঁচকে খতিয়ানের পৃষ্ঠা উল্টে দাগের পর দাগ পরখ করে। সিএস খতিয়ানে আফেলুদ্দি মৃধার নামে তেরশ ছেচল্লিশ নাম্বার স্পষ্ট দাগ-কাটা। অবশ্য নামের সঙ্গে গং শব্দটি উল্লেখ রয়েছে। গং মানে গয়রাহ বা অন্যান্য অংশীদার, সেটা তার জানা। মকবুল তার বাবার নামে ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে খতিয়ান দেখে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। শুকিয়ে আসা গলার ভেতরে ঝলকে ঝলকে জল গড়ায় তার। সে ভাবে, ওগরাতের এই জঞ্জাল আজ এত বছর পরে কোথা থেকে-ইবা এল আবার যাবে-ইবা কবে। অনাহূত গরিব পরিবারটিকে সে বারবার ওগরাত ভেবে ভুল করে।

মকবুলের বয়স কত হবে তখন? কুড়ি-বাইশ বছর হবে হয়তো! বেশ মনে আছে তার দিনটার কথা। সেদিন পশ্চিমের সূর্যাস্তটা ছিল অপূর্ব রক্তিম। জেলা শহরের কোর্ট-কাছারির কাজ সেরে বাড়ি ফিরল মকবুলের বাবা আফেলুদ্দি। তার সঙ্গে ৩০-৩২ বছর বয়সী এক নারী। মহিলাটির চেহারায় অদম্য আকর্ষণ, সরু দুটি হাত, শান্ত কণ্ঠস্বর আর অসাধারণ দুটি কাজল কালো চোখে টলটলে জলের পুকুর। তার হাতের কনিষ্ঠা আঙুলের সাথে চার-পাঁচ বছরের নাদুসনুদুস একটি ছেলের হাতের মুষ্টি শক্ত করে ধরা। ছেলেটি যাত্রাপালার অধিকারীর মতো মাথায় তেল দিয়ে দুদিকে সিঁথিপাটি করেছে। ছেলেটির গলায় ঝুলে আছে আল্লাহু খোদাই করা চাঁদি রুপোর কবজ। নাক-নির্গত সর্দির গাঢ় জল ঠোঁটের কাছে গড়িয়ে নামছে আর ছেলেটি ক্ষণে ক্ষণে টেনে তুলছে। পথের ক্লান্তি মুছে আফেলুদ্দি স্ত্রীকে ডেকে বলল, ‘পারুল’ আইজ হইতে এই বাড়তেই থাকপে।

আজন্ম ভীরু আফেলুদ্দির স্ত্রী অনাকাঙ্ক্ষিত এক সুন্দরী মহিলার এ বাড়িতে থাকার আদেশে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। অপ্রস্তুত হয়ে সে একবার নিজের শোবার ঘরটির দিকে তাকায় আরেকবার পারুল নামক মহিলাটির মুখের দিকে। তবে বাচ্চাটির মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ায় মনটা ভরে গেল তার। ছেলেটিকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, কিরে বাবা, মিডাই খাবি? ছেলেটি ঘাড় উঁচু করে আফেলুদ্দির স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল আর অমনি মন ভালো হয়ে গেল তার। গরুর খোঁয়াড়ের পাশে তালাবদ্ধ বাংলা ঘরটা দেখিয়ে আফেলুদ্দি স্ত্রীকে বলল, ওগোরে ওহানে থাকতে দেও।

যে ঘরটিতে পারুল বেগম এবং তার ছেলেটিকে থাকতে বলা হলো, ঘরটি ভীষণ রকমের নোংরা, অবিন্যস্ত। সামনের দরজা পুরনো জং-ধরা তালাবদ্ধ, কিন্তু পেছন দিকের বেড়াটা ভেঙেচুরে হয়েছে সিঁধকাটা খোড়লের মতো। ওই ফাঁক দিয়ে কুকুর ঢুকে ঘরটিতে পুরনো বাঁশের খুঁটির দিকে এক পা উঁচিয়ে পেচ্ছাব করে। বাড়ির কিংবা প্রতিবেশীর বেড়ালগুলো সদ্য ভূমিষ্ঠ বাচ্চা নিয়ে সেখানে দুধ পান করায়। এখান-ওখান থেকে ছুঁচো-ইঁদুর মেরে ঘরটিতে বসে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বেড়ালগুলো ফোঁস ফোঁস করে। উচ্ছিষ্ট অংশ পচে গলে বীভৎস দুর্গন্ধে ঘরটা ভোঁ ভোঁ করতে থাকে। এমন একটি ঘরে পারুল বেগমকে আফেলুদ্দি কেন থাকতে বলল কে জানে!

সম্পর্কে আফেলুদ্দি পারুল বেগমের জ্ঞাতি মামা। তার আসল মামা গুটি বসন্তে গত হয়েছে বহু বছর আগে। তারপর আর আসা হয়নি এ বাড়িতে। ছোটবেলা একবার মায়ের সঙ্গে এসেছিল, কিন্তু একদিনও বেড়াবার সুযোগ হয়নি। তার মামা শাশের আলীর সঙ্গে আফেলুদ্দির সে কী যুদ্ধ! একেবারে মারামারি হানাহানি পর্যায়ে। দুজনেই গলার শিরা মোটা করে লুঙ্গি তুলে শাসায়— তুই মোর চ্যাডের বাল। খা, পারলে জাগা, খা দেহি। সন্ধ্যায় যখন দু’পক্ষের কেউ হার মানে না, তখন পাশের বাড়ির হজরত আলী এসে ব্যাপারটা মীমাংসা করল। সেই যে পারুল বেগম মামাবাড়ি ছাড়ল, এত বছরে আর আসেনি। তারপর জীবনের ওপর দিয়ে ঝড়ঝঞ্ঝা কম যায়নি তার। মা মরল হলুদ বাটা শিল-পাটার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে। বাবা গিয়েছিল মাছ ধরতে সমুদ্দুরে। গেল তো গেলই, যেন সমুদ্দুর তারে গিলে খেল। আর আসেনি। অনাথ পারুলকে চাচা-খুড়া মিলে বিয়ে দিল ফুলতলার সরুর সঙ্গে।

সরুর সঙ্গে তার দিনগুলো মন্দ কাটেনি। পায়রার পাড়ে বাড়ি ছিল তাদের, রাতদিন হু-হু করে বাতাস আসত নদী থেকে। সরু বিকেল হলেই পায়রায় নৌকা নিয়ে নেমে পড়ত, অনেক দূর যেতে যেতে নৌকাটা দেখাত দাঁড়কাকের মতো ছোট। পারুল সেই দিকে চেয়ে থাকত আর পলক ফেলত বারবার। সরু দূর থেকে বৈঠা উঁচিয়ে পারুলকে জানাত এই তো সে আসল বলে। পারুল বেগম তখন আনন্দে গুনগুন করত। মাটির কলস নিয়ে পায়রার জলে পা ডুবিয়ে অপলক চেয়ে থাকত নদীর দূরের বাঁকের দিকে। তারপর রাত হলে সরু ফিরত চিংড়ি, পাবদা আর রামছোচ মাছ নিয়ে। পারুল তখন আনন্দে কী করে! মাছ কুটে আর সরুরে গাইল দেয়, তুই একটা সউররা। সরু তখন হাসে আর দুহাত এক করে তালি বাজায়। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে রাঁধে, একসঙ্গে খায় আর নদীলক্ক হয়ে নিরালায় ঘুমায়। অন্তহীন সুখে আরেকটু হাওয়া দিতে পোয়াতি হলো পারুল বেগম। নয় মাস পরে ছেলেটা ভূমিষ্ঠ হলে সরু শিশুটিকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলে— এ দিহি মোর বাপে। সাক্ষাত হের মতন লগইত। মোর পোতায় (ভিটিতে) হাজলাবাতি দিস বাপ।

সেই পোতায় (ভিটিতে) আর হাজলা (সন্ধ্যাপ্রদীপ) দেয়া হয় না কারো। পায়রার করাল গ্রাসে জমিজিরাত, ঘরবাড়ি সব হারিয়ে নিঃস্ব হয় সরু আর পারুল বেগম। ফুলতলা ভেঙে টলটলে চর জেগেছে ওপার মির্জাগঞ্জে। কিন্তু সেই চরে গাছগাছালি জন্মানোর আগেই দখল হয়ে গেছে ভূমিদস্যুদের হাতে। উপায় যখন কিছু নেই তখন ভেড়ির ওপর অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে পারুল বেগমকে নিয়ে সরু নৌকার ছইয়ের মতো ডেরা তৈরি করে থাকে। মাছ ধরতে সে যায়, কিন্তু আগের মতো দূর-দূরান্তে নয়। ছেলেটিকে যেন চোখের আড়াল করতে মন চায় না। এ এক ছুতা তার। আসলে পারুল বেগম পাশাপাশি কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে গা-ঘেঁষে থাকে, বুক-পিঠের কাপড় খসলেই পুরুষগুলো ড্যাবড্যাব করে তাকায়। আর তাকাবে না-ই বা কেন। পূর্ণিমার রাতে ফরফর করা চাঁদের আলোর মতো পারুলের ফর্সা গতর জ্বলজ্বল করে। ব্যাপারটি মোটেও ভালো লাগে না সরুর। সেজন্য ডেরার দরজায় মাঝেমধ্যে দিনদুপুরে লাল চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে নিজেদের আড়াল করে মানুষকে জানান দেয়, ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। মাঝে মাঝে মুহূর্তের জন্য বউকে একলা পেয়ে আলিঙ্গন করে সরু। চাদরের ফাঁক দিয়ে কেউ চুপি মারে কিনা, সেই ভয়ে পারুল বেগম ভীরু ঠোঁট ফাঁক করে ঠেলে সরিয়ে দেয় সরুকে। অমনি সরু কাছে টেনে বলে— ওরে মোর সোনার ময়না পাখি।

এভাবে বেশ কয়েক বছর মন্দ চলেনি তাদের। কিন্তু ঈশ্বরের লীলা বোঝার সাধ্য কার! তুতের জলের মতো এক আঁধার রাতে তিন ব্যাটারি লাইটের ফটফটানি আলো মেরে ডেরাটা ফর্সা করে তুলল এক অচেনা চরিত্র। হ্যাঁ, সে এক চরিত্রই বটে। আলোর নেপথ্যে দাঁড়িয়ে সিনেমার ভিলেনের মতো হো হো করে হেসে ভরাট কণ্ঠে সে বলল— কই রে সরু, আয় বাপু মুখখান দেহি এট্টু তোর। পারুলের ভয়ে দম বন্ধ অবস্থা। পাশের ডেরার দু-একজন লোক মাথা উঁচু করে তাকিয়েছিল একবার। তারপর কী মনে করে তারা ঘুমের ভান ধরে চুপ করে রইল। লোকটির সঙ্গে সরু হনহন করে বেরিয়ে গেল অন্ধকার পায়রার গর্ভে। যাবার সময় মোটাতাজা পুরুষ চরিত্রটি পারুল বেগমের সঙ্গে কী এক কাণ্ড নাকি করেছিল, যা সাধারণের কাছে বলা যায় না। সেই থেকে পারুল বেগমের স্বামী নিরুদ্দেশ।

নিজের ওপর করুণা তরঙ্গায়িত হয়ে উঠল পারুল বেগমের বুকের ভেতর। ছেলেটিকে নিয়ে কোথায় দাঁড়ায়! চাচা-খুড়া যারা আছে, কেউ কিছু বলে না। শুধু বুড়ো থেকে সদ্য গোঁফ গজানো ছেলেটিও তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকায়। ছেলেটারও শরীর ভালো নয়। জল বসন্ত হলো, দাঁত উঠল, জ্বরও হলো খুব। শীত বসন্ত মিলিয়ে মাস দুয়েক ভুগল। একেবারে নিস্তেজ কাহিল হয়ে বিছানায় পড়ল ছেলেটা। উপায়ন্তর না দেখে রিলিফের কার্ড বিতরণ করতে আসা মেম্বারকে দেখে একদিন পারুল বেগম বলল, বিঘাই গ্রাম কেমনে যামু নেবাই? মেম্বার স্মিত হেসে বলল, ছেলেডার জন্যি নিজেরে বিলায়ে দিলিরে যৌবনবতী। 

অপেক্ষার সময় যখন ছয় মাস অতিক্রান্ত হলো, তখন পারুল বেগমকে ভাবতে হয় কোথায় যাবে সে ছেলেটাকে নিয়ে। কয়েক দিন পর্যন্ত তার মনে পড়ে মায়ের মৃত্যুশয্যার কথাটা। বিঘাই গ্রামে তার নানাবাড়ি ফরাসের জমি আছে, সেটা তাদের হক্ক। কদিন থেকেই পারুল বেগমের মনে হয় বিঘাই গ্রাম ছাড়া আর গতি নেই। একদিন কাউকে কিছু না বলে ছেলেকে নিয়ে বিঘাই গ্রামে রওনা দেয় সে। বিকালে মাঠিভাঙা গ্রাম পার হয়ে কাজীরহাট ব্রিজ। সন্ধ্যায় লোকের কাছে জিগ্যেস করে করে মৃধা বাড়ির পথের নাগাল পায়। তখন পথে দেখা হয় কোর্ট-কাছারি ফেরত আফেলুদ্দির সঙ্গে।

অপ্রয়োজনীয় ঘুপচি ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল পারুল বেগমের আলোয়। ছাঁচহীন কাঠের বাতা বসানো জানালাগুলো দূর থেকেই চোখে পড়ত আফেলুদ্দির। রেলিংয়ের ওপর হাত রেখে পারুল বেগম উঠানের দিকে তাকিয়ে থাকে ধুলোমাখা শিশুটির দিকে। ডানপিটে শিশুটি উঠানজুড়ে খেলা করে।

একদিন যাত্রাপালা থেকে ফিরে শেষ রাতে মকবুল শোনে বিষাদের সুর তুলে গুনগুন করে গান গাইছে পারুল। কুপির নিভু আলো শিথানের একটু দূরে মুমূর্ষু হয়ে জ্বলছে। জানালায় দলামোচড়া হয়ে ঝুলছিল পারুল বেগমের জর্জেট শাড়ি ছিঁড়ে তৈরি পর্দা। তাতে সামান্য বাতাস লেগে যখন ফাঁক হয়ে পারুলের মুখটা মকবুলের চোখের সামনে স্পষ্ট হলো, তখন আরেকটু দূরে কুণ্ডলি পাকিয়ে উড়ে যাচ্ছে বিড়ির ধোঁয়া। মকবুল বিভোর চোখে দেখে পারুল বেগম অসংবৃত। কাঁধ থেকে খসে পড়েছে তার শাড়িটা, আলগা হয়ে আছে বোতাম খোলা ব্লাউজ, আধখোলা একটা স্তন চ্যাপ্টা হয়ে মিশে আছে মেঝের ওপর। একটু পর দেখে তার পাশ দিয়ে মানুষের ছায়ার মতো কী একটা যেন বেরিয়ে গেল। ছায়াটা দেখে দ্বন্দ্বে পড়ে যায় মকবুল। মনে হতে লাগল ওই ছায়াটা তার অনেক বছর যাবৎ চেনা। আবার আলোর দিকে মুখ ঘোরাল পারুল বেগম। কি অদ্ভুত সুন্দর দুটি চোখ! বড় বড়, গভীর, টলটলে জলভরা পুকুরের মতো আর সেই সঙ্গে জান্তব। সে চোখে রমণে উন্মত্ত আবছায়া। যেন রমণোন্মুখ প্রাণীর চোখ জ্বলে উঠছে সবুজ ফুলকিতে। মকবুলের একবার মনে হয় দরজাটা ধড়াক করে খুলে পারুল বেগমের জ্বলে ওঠা অশান্ত চোখ দুটো শান্ত করে দেয়। কিন্তু আরেকবার মনে হয়, যদি প্রত্যাখ্যান করে; তবে দিনের আলোতে ও চোখের দিকে কী  করে তাকাবে!

তারপর প্রতি রাতেই পারুল বেগমের ঘর থেকে বিরহী সুর ভেসে আসে। মকবুল চুপিমেরে আড়াল থেকে দেখতে থাকে সেই গুনগুনানির ভঙ্গি। জানালার আড়ালে দাঁড়ালে ভেতর থেকে উড়ে আসে পারুল বেগমের চুলের তেল আর ঘামের মিশেল গন্ধ। মকবুল ভাবে, পারুল বেগম! তোমার যৌবন কতটা শুষ্ক, কতটা জীর্ণ আর কতটা নিষ্ফলা জমির মতন। এত রূপ থেকেও তুমি পুরনো রোগে অভ্যস্ত রোগীর মতো নিত্য অভাব সয়ে যাচ্ছ। আশ্রিতের আঙিনার কোণে ইঁদুর-বেড়ালের যুদ্ধঘরে তোমার বসবাস। অথচ তুমি চাইলেই পারো তোমার শুষ্ক নদীতে বাঁধভাঙা তরঙ্গ ফিরিয়ে আনতে। অথচ তুমি দিনের আলোতে নিশ্চুপ, দারুণ সংযমী।

কোনো এক অমাবস্যা রাতের কথা। পারুল বেগমের গান থেমে গেছে একটু আগেই। কেমন নিঝুম হয়ে আছে ঘরটা। মকবুলের মধ্যরাতে মনোজগতের তীব্র উন্মাদনা দিনে দিনে সীমা অতিক্রম করছিল। কয়েকবার বিছানায় ওঠবস করে ভাবে, কয়েক গজ দূরে থাকে বহুকালের পিপাসার্ত পারুল। যে করেই হোক ভেঙে ফেলতে হবে লজ্জার দেয়াল। শিরায় শিরায় তার বলকানো জলের মতো রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। সন্তর্পণে পা ফেলে চলে যায় নিস্তব্ধ পারুল বেগমের ঘরের কাছে।

ঘরের দরজাটা একটু সরানো ছিল। মকবুল দূর থেকেই দেখে পারুল বেগমের পাশে আরেকটি মানবছায়া। ছায়াটি ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে দরজার দিকে। ছায়াটি ক্রমেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। জলজ্যান্ত মানুষটিকে দেখে কেঁপে উঠল মকবুল। মুখোমুখি হলো দুটি চেনা মুখ। কারো সঙ্গে কথা হলো না কারো। আবার অনেক কথা হলো, কিন্তু আঁধার চাহনিতে। রাত পার হলে পরের প্রভাতের কোলাহলগুলো মকবুলের কাছে মনে হয় আগের রাত ছিল মৃত্যুপুরী, এমনকি মৃত্যুও যেন এর থেকে ভালো।

তারপর পারুল বেগমের ঘরটিতে আবার ইঁদুর-বেড়ালের তাণ্ডব শুরু হলো। সে ছেলেটিকে নিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে, আর ফেরেনি।

এই ঘটনার অনেক বছর পরে বিঘাই গ্রামে ওলাবুড়ি আসে। চৈত্রের দুপুরে রৌদ্রতাপে পোড়া খটখটে মাঠের ওপর ঘূর্ণি বাতাসে আগুন উড়িয়ে যমের লাঠি হাতে নিয়ে আসে সে। মকবুল মনে করে সেই ভয়ঙ্কর বছরটার কথা। পুরো বিঘাই গ্রামে মুমূর্ষু কলেরা রোগীর ঘটিতে জল ভরার মতো কেউ ছিল না। একই দিনে শয্যা নিল মকবুলের বাবা আফেলুদ্দি এবং তার মা। মরল চৌদ্দঘড়ি আর মাঝরাতের ব্যবধানে। গ্রাম ছেড়ে যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে পালিয়েছিল মকবুল। মরার সময় বাবার সে রকম অছিয়ত ছিল, দ্যাশতে পলাইয়া বাঁচ বাপু। তারপর শহর নগর ঘুরে বছরখানেক পরে উজাড় হওয়া গ্রামে সে আবার ফিরে আসে। এসে দেখে অনেক পরিচিতের কবরে এখনো মাটির বাসন অক্ষত উপুর হয়ে আছে। ভাঙা কবর ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে বাঁশের কচি ডগা। তার আরো অনেক দিন পর, বছর থেকে বছর পার হয়ে শীত থেকে গ্রীষ্মের পালাবদলে মকবুলের ধনসম্পদের চেহারা ফেরে। বড় বাড়ির তারকেশ্বরকে কিছু টাকাসহ রাতের আঁধারে সে এগিয়ে দিয়ে আসে বেনাপোল সীমান্তে। তার সাতদিন পর বিঘাই গ্রামের মানুষ জানতে পারে, তারকেশ্বরের সাড়ে তিন বিঘা ধানি জমি আর খোঁয়াড়ের একপাল গরু মকবুলের কবলা সম্পত্তি।

আরো কয়েক বছর পর, কার্তিকের শেষে শীতের আনাগোনার সময়। এক শুক্রবারে বিঘাই গ্রামে আসে এক যুবক দম্পতি। তারা দুপুর নাগাদ মৃধা বাড়ির জামে মসজিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুসল্লিরা বের হলে আগন্তুক মানিক স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম কথা তোলে। সে এ বাড়ির সম্পত্তির উত্তরাধিকার পারুল বেগমের একমাত্র ছেলে। তার মা পারুল বেগম এ বাড়ির আশ্রয় হারিয়ে তাকে নিয়ে কী রকম বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরেছে পথে-প্রান্তরে। তারপর মহাখালী সাততলা বস্তিতে রোগেশোকে কাতর হয়ে কীভাবে প্রাণ হারায়— বলে সেসব ঘটনা। তবে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে সে বলে গেছে এই বাড়িতে তাদের হক আছে। মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল তার ছেলে বউ নিয়ে তার সম্পত্তিতে ভোগবান-স্বত্ববান নিযুক্ত হবে। শেষে সে আশা আর পূরণ হয়নি তার। রোগেশোকে জর্জরিত হয়ে প্রাণ হারাল বস্তিতে। দুহাত সোজা রেখে বেশ মিনতির ভঙ্গিতেই এসব কথা বলল মানিক। প্রতিবেশীরা কিছুক্ষণ নীরবতার মধ্যে কাটানোর পর ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করল একেকজন করে। মকবুল ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়তে লাগল। লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে মানিকের কাছে গিয়ে দেখে মাথার মাঝখানে সিঁথিপাটি করা সেই যাত্রাপালার অধিকারী আদলের মুখ।

এ ঘটনার সাতদিন পর প্রতিবেশীর সমর্থনে মানিক দম্পতি মকবুলের এক চিলতে আঙিনার শেষে ডোবার ওপারে ঘর তোলার চেষ্টা করে। ডোবার জলে ভেজা যে জমিটা একটু উঁচু হয়ে উঠেছে, সেখানে গাছপালার আড়ালে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানটায় গাছের গুঁড়ির মতন ফালি ফালি করে কাটা বয়রা বাঁশ দিয়ে ছোট্ট একটা কুঁড়ে তৈরি করে তারা। এমন আহামরি কিছু নয়, নিছক মাথা গোঁজার ঠাঁই মাত্র, নিছক একটা আস্তানা।

গাঁয়ে অনভ্যস্ত দম্পতির ক্রমান্বয়ে ফুরিয়ে আসতে লাগল সঞ্চিত টাকা-পয়সা। একে একে উধাও হয়ে যেতে লাগল দেশলাই, নুন, কেরোসিন এমনকি রান্নার শুকনো কাঠের ভাণ্ডার। মকবুল গ্রামের লোকের সমঝোতা উপেক্ষা করল। এসএ খতিয়ান অশুদ্ধ বয়ানে সাবেক খতিয়ান অর্থাৎ ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভের জমিদার নির্মল কণ্ঠ রায়ের রায়ত তার পূর্বপুরুষ বলে দাবি করল। উকিল নিপেন বাবু ওকালতনামার নীল কাগজের সাথে কয়েকটা রেফ সংযুক্ত করে বিশুদ্ধ বয়ানে মামলা সাজিয়ে দিলেন। মামলা নথিভুক্ত হবার পর মকবুল উল্লাসে পনের মাইল হেঁটে আদালত চত্বর থেকে বিঘাই গ্রামে আসে। দিনকয়েক বাদে খাকি খামে আদালতের জারিকারক নোটিস নিয়ে বিঘাই গ্রামে এসে অখ্যাত মানিককে খুঁজে পায় না। স্বামী-স্ত্রী দুজন বাড়ির বাইরে থাকায় জারিকারক হোগলা পাতার বেড়ার সাথে নোটিসটি লটকে দিয়ে আদালতের নোটিস জারি করে। বাড়ি আসার পর মানিক এবং তার স্ত্রী লটকানো নোটিস পড়ে জানতে পারে মামলার কথা।&dquote;&dquote;

নোটিসটা হাতে নিয়ে মানিক ভাবে এখন কী উপায়! কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখে মানিক পাথর হয়ে গেল। সন্ধ্যা অবধি সে নির্বিকার। একবার মনে হলো মকবুলকে গিয়ে চড়া গলায় কয়েকটা কথা শোনায়। কিন্তু মকবুল মস্ত একটা গোঁয়ার, কোন কাণ্ড করে বসে কে জানে! কিন্তু মামলার মতো বিবাদ যখন বেঁধেছে, কারো না কারো পরামর্শ তো নিতেই হবে। যখন আঁধার নামে চরাচরে; মানিক সৎ পরামর্শের জন্য মেম্বারের কাছে যাওয়ার চিন্তা করে।

ঝিঁঝি ডাকা নিশির গতর এতটা আঁধার মনে হয় যেন আকাশ থেকে কালো পিশাচ তার আলকাতরা রঙের জিহ্বায় লেহন করতে চাইছে চরাচর। দমে থাকার ছেলে নয় পারুলের ব্যাটা, বউয়ের হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে আঁধার ভেদ করে চলে যায় দেড় মাইল দূরে এনছান মেম্বার বাড়ি। মেম্বার হাল নকশার দাগ নির্ণয় করে টুকরো কাগজে টুকে দেয় এসএ খতিয়ান নাম্বার। পরদিন আগুনঝরা দুপুরে এই দম্পতি ভূমি অফিস থেকে পারুল বেগমের নাম মুদ্রিত এসএ খতিয়ান পেয়ে বারকয়েক চুমা খায়।

দিশেহারা মানিক স্ত্রীকে নিয়ে যখন জেলা সদরে আসে তখন মুন্সেফপাড়া সন্ধ্যা আরতির ধূপধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। সনাতনী পরিবার থেকে বাতাসে ভেসে আসে উলুধ্বনি। জঞ্জালভরা পুকুরপাড়ে বন্ধ হওয়া সিনেমা হলের পাশে সারি করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের উপরে চাঁদহীন আকাশে তারার দপদপানি। তার আরেকটু দূরে চশমাবুড়োর চায়ের দোকান। ঠিক এর উল্টো পাশে ফরমান উকিলের বৈঠকখানা।

মানিক বৈঠকখানায় গিয়ে ফরমান উকিলের উদ্দেশে হাত উঁচু করে বলে, সালামালাইকুম। উকিল সাব বেশ কয়েকটি নথিবন্দি ফাইলের সুতা খুলে ছড়িয়ে রেখেছে টেবিলের ওপর। চশমাটি নাকের ডগা থেকে টেনে তুলে সালামের উত্তর দেয়, হুঁ। মানিকের আদ্যোপান্ত  ইতিহাস শোনার সময় নেই উকিল সাবের। মামলার ইপিআর হয়ে হাল খতিয়ানের বিশদ বিবরণে পারুল বেগমের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে বর্ণনা লেখার ফিরিস্তি শোনায়। কোর্ট ফি, রেপকাগজ, ওকালতনামা মিলিয়ে খরচের অংকটা নেহাত কম নয়। দুর্মূল্যের বাজারে এত টাকা জোগাড় করা স্বাভাবিক কিছু নয়। তার একবার মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে ঢাকার লঞ্চে ওঠে, কিন্তু মায়ের সেই অনুরোধের বিষণ্ন দিনটির কথা মনে পড়ায় মনের ভেতর জোর পায়। মৃত্যুর আগের দিনটিতে মকবুলের প্রতি ঘেন্নাভরা কণ্ঠে কয়েকটি কথা বলেছিল তার মা পারুল বেগম। কথাগুলো মনে পড়লেই ঝুপড়ি ঘরের মাটি কামড়ে থাকতে ইচ্ছা করে তার। কিছুক্ষণ মাথাটা নিচু করে বেঞ্চের ওপর বসে রইল মানিক। সে ভাবে, এক চিলতে জমিটা তার মায়ের হক। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে ভূমিলোভী মকবুলের সঙ্গে। কিন্তু ফরমান উকিলের ভুখা চাহনিতে ঈশ্বরও যেন ভ্রুকুটি করলেন।

স্ত্রীর গলার খাদওয়ালা চেন বিক্রি করে, গ্যারেজের মহাজনের থেকে ধার করে মামলার ইপিআর হওয়ার টাকা উকিলের হাতে তুলে দেয় মানিক। ফুল ফজরে ঘুম থেকে উঠে ভাড়া অটোরিকশা নিয়ে শহরে যায়। যা আয়-রোজগার হয়, সন্ধ্যায় বাজার করে বাড়ি ফেরে। কিন্তু তাদের উত্খাত করার জন্য মকবুল মরিয়া। কোনো দিন দেখা যায় ঘরের পাশে লাগানো কয়েকটি চারাগাছ আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, মকবুল গরু চরিয়ে চারাগাছগুলোর কোমড় ভেঙে দিয়েছে। ঝুপড়ির কাছে খোলা জায়গায় একটু উঁচু করে মানিকের আনাড়ি বউ রান্নার চুলা বানিয়ে রাঁধে। সকালে দেখা গেল সস্থানে চুলার চিহ্নমাত্র নেই। একটি গর্তের ভেতর ছাইগুলো এলোমেলোভাবে ছড়ানো। পরিশ্রান্ত মানিক রাতে এসে খেয়েদেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে চৌকিতে শুয়ে পড়ে। মকবুলের কূটকৌশল, নিজেদের আর্থিক অনটন এবং ফরমান উকিলের ধূর্ত মুহুরি ফি টাকায় সন্তুষ্ট না হয়ে কী রকম তির্যক দৃষ্টিতে তাকায়, সেসব কথা ভাবে। স্বামীর চিন্তাগ্রস্ত বিষণ্ন মুখ দেখে একটু আবেগ দিতে স্ত্রী নিজের কাছে টানে। দুজনের জাগতিক ভাবনাগুলো আড়াল হয়ে যখন ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে মিলনের প্রস্তুতি, অমনি হোগলের বেড়ার আড়ালে কেউ ঠোঁট চেপে শিস বাজায়। অথবা মিলনোন্মুখ স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি শুয়ে যখন ঘনিষ্ঠ হতে যায়, তখন মনে হয় কয়েকটি মানবচোখ বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাদের নিরীক্ষণ করছে। যেকোনো মুহূর্তে ওই আদিম অসভ্য জন্তুগুলো হো হো করে হেসে উঠবে। এভাবে মকবুলের মামলার হয়রানি আর বিভিন্ন রকম পীড়নে অস্থির মানিক। প্রতিবেশী আর মোড়ল-মাতুব্বরের কাছে বিচার দিলে তারা আদালতের দোহাই দিয়ে দায় সারে।

চার বছর অতিবাহিত হলো, মামলা কোর্ট পরিবর্তন হয়ে ট্রায়ালে ওঠে। ফরমান উকিল মকবুলের সিএস খতিয়ানের বিপরীতে জমিদার নির্মল কণ্ঠ রায়ের দেয়া কর্ষা কবুলিয়ত দাখিল করে আদালতে। বিপক্ষের উকিল কবুলিয়তের ঘোর বিরোধিতা করে কাগজটি মিথ্যা, ভুয়া এবং জালজালিয়াতির অভিযোগ আনে। আদালত মানিকের পক্ষে বসতবাড়িতে ভোগদখলের সাক্ষী চায়। কিন্তু দীনদরিদ্র মানিকের দখল-স্বত্বের সাক্ষী দিতে গিয়ে মকবুলের ঘোর শত্রু হতে কে চাইবে। তাহলে উপায়?

উপায় কিছু একটা বের করতে চেয়ে কয়েক দিন ধরে স্বামী-স্ত্রী মহল্লায় ঘুরেছে। চোখের নরম চাহনিতে আফছের, আপ্তের, কালু, হোচেনুদ্দি এবং তার ভাই হাচনুদ্দীনকে যতটা সম্ভব অনুরোধ করেছে। কিন্তু এসব বুড়ো মানুষের নীরবতাই যেন ধর্ম। কর্তাশ্রেণির কারো মানিকের জন্য মকবুলের সাথে শত্রুতা করার মোটেও ইচ্ছে নেই। ঘরের সহূদয় স্ত্রীলোকটি স্বামীর কাছে স্বজনহারা ছেলেটির জন্য ভাবার বিশেষ অনুরোধ করে না।

মকবুল সম্ভাব্য গ্রামবাসীকে যেকোনো মূল্যে হাত করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রায় শতবর্ষী বুড়ো আপ্তের আলীকে আর হাত করা গেল না। বুড়ো আধবোঁজা চোখে দুলতে দুলতে মানিককে আশ্বস্ত করল সাক্ষী সে দেবেই। ব্রিটিশ আমলের সেইসব দিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে তার। লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল; একটু পরে ফ্যাকাসে হয়ে উঠল তার মুখ। হাঁটুর মাঝখানে জড়ো করা মাথাটা নুইয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল পুরনো দিনের কথা। মুহূর্তেই তার চোখ দুটো ভেসে গেল যেন কোন সুদূরে, পারুল বেগমের বাবার সময়ের অগুনতি স্মৃতিতে।

বিঘাই গ্রামের পত্তনি নিয়েছিল যশোর জেলার চাচরা এলাকার জমিদার নির্মল কণ্ঠ রায়। পসারি বুনিয়া নির্মাণ করল খাস কাছারি। নায়েব গোমস্তার অভাব নেই, অভাব যা ছিল সেটা তার দিলের রহম। দেশে তখন ভয়াবহ রকমের অভাব। ভাগাচাষী, গুলাপ্রজা, ক্ষেতমজুর এবং উঠবন্দি মানুষগুলোর অবস্থা একবারে শোচনীয়। মানুষের বারো বছরের দখলি স্বত্ব ধীরে ধীরে অধিকার হারাতে লাগল। ভূমিহীন কৃষকদের জন্য জমিদার নির্মল কণ্ঠ রায় নির্মাণ করল চালাঘর। দলে দলে গরিব কৃষক পরিবারসহ ঠাঁই নিতে লাগল সেখানে। দেখা দিল চরম খাদ্য সংকট। জোতদার, মজুদদার মুনাফাখোরেরা ধানচাল মজুদ করে রাখল। চারপাশে শুধু অভাব আর অভাব। জীবন ধারণের জন্য মানুষ গাছের পাতা পর্যন্ত খেয়েছে। অভুক্ত মানুষগুলো কুকুরের মতো মরে পড়ে রইল রাস্তার এখানে সেখানে। মুমূর্ষু কৃষক তখন হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়ায়। জমিদার প্রথা উচ্ছেদের বিদ্রোহ তখন চরমে। জমিদার, মহাজন, জোতদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা পালাবার আর পথ পায় না। ঠিক সেই সময় জমিদার নির্মল কণ্ঠ রায় কোর্ফা, কর্ষা, নানকার, নফর, চাকরানদেরকে কবুলিয়তের মাধ্যমে জমি ফিরিয়ে দিতে লাগল। পারুল বেগমের বাবা উক্ত কবুলিয়ত মূলে সম্পত্তির মালিক। সে সময়ের পর কবুলিয়ত বলে গুরুত্ব হারাল ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস খতিয়ান। তারপর এ পরগণার কত জমি স্রোতস্বিনী নদীর দাপটে সরু খাল হয়ে গেল। আবার সেই খাল ভরাট হয়ে পরিণত হলো সরেজমিনে। কতক জমি সরকার খাস খতিয়ানভুক্ত করল আবার কতক জমি মকবুলের বাপ জরিপওলাদের কাছারিতে এনে খাসি খাইয়ে, পয়সা দিয়ে নিজের করে নিল। সেসব এ পরগণার মানুষের কদর্য অতীত।

রাত ফুরিয়ে এল; ভোরের আগমনে গমগম করে উঠল চারপাশ। বৃদ্ধের দেয়া সাহসে মানিক শক্তিমান হয়ে উঠল। ওইদিন বিপক্ষের উকিলের জেরায় কুপোকাত হয়নি বুড়ো; বরং তিন কালের ইতিহাসের সাক্ষীর কাছে আদালতকক্ষের উপস্থিত মানুষজন শুনল পাকাপোক্ত দৃষ্টান্তমূলক সাক্ষী, যা ইতোপূর্বে তারা আর শোনেনি।

বেপরোয়া মকবুল আদালত কক্ষ থেকে বের হয়ে কলাবাগান এলাকার মস্তান ভাড়া করে। কয়েকজন উদ্ভ্রান্ত অসভ্য যুবক মানিককে এলোপাতাড়ি পেটায়। মার খেয়ে মানিক কিছুক্ষণ রাস্তার ধারে মরার মতো পড়ে থাকল। হুঁশ ফিরে ধীরপায়ে গ্যারেজের দিকে হাঁটে। টলতে টলতে অটো গাড়িটা চালিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখে তেঁতুলতলায় বউ উপুড় হয়ে কঁকায়। বাড়ির ছোটবড় গাছগুলো উধাও; ঝুপড়ির পেছনের চালটা বাড়ি থেকে একটু দূরে খোলা মাঠের ওপর ভেঙেচুরে পড়ে আছে। সম্বলহীন খুঁটিগুলো আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে একা।

এ ঘটনার পর শীতকালীন ছুটিতে দেওয়ানি আদালত এক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। আদালত খুললেই যেকোনো দিন শুরু হবে আর্গুমেন্ট। সম্বলহীন নিঃস্ব মানিকের উকিলের চাহিদামাফিক টাকা পরিশোধ করার কী উপায়! একে একে ঘর থেকে উধাও হতে লাগল দা-বঁটি, তেলের বোতল, চালের ড্রাম, ইটের মতো শক্ত তোশক আর চুলোয় পোড়া কাঠের পেরেক। ঘরের সমস্ত জিনিস বেচে উকিলকে দিলে নিরাভরণ ঘরটি ধুঁকতে থাকে। বউকে ভাঙা বেড়ার ঝুপড়িতে রেখে মানিক শহরে কামাই করতে যায়। বউ মাঝরাত পর্যন্ত মানিকের জন্য অপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু মকবুলের নতুন ষড়যন্ত্রে পুরনো কাঁথায় বউটি মুখ ডুবিয়ে আর ঘুমাতে পারে না। সন্ধ্যায় কেরোসিনের আলো জ্বেলে মাথার কাছে রাখে। রাত গভীর হতে হতে আলোটা তেলের অভাবে খাবি খায়। ঝুপড়ির ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে একঝলক বাতাস এসে যখন আলোটা নিভে যায়, মকবুল তখন বেড়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে দুজন ছোকরামতন ছেলেকে ঝুপড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে তামাশা দেখে। মানবিক আলো-বিবর্জিত ছোকড়া দুজন মানিকের বউকে বিবস্ত্র করে সম্মান লোটার হুমকি দেয়। তবুও এই দম্পতির মনের জোর অটুট থাকে। পরপর তিনবার আদালত নতুন তারিখ দিয়ে আর্গুমেন্ট পিছিয়ে দেন। কিন্তু উকিলের নিত্য হাজিরার টাকায় মোটেও কমতি নেই। শেষে সত্যিই যেদিন আদালতে দুই পক্ষের উকিলের জেরা শুরু হলো, মানিক সেদিন মুন্সেফপাড়া উকিলের বৈঠকখানায় কিংবা আদালত চত্বরে আসেনি। তবুও দুই পক্ষের উকিলের তুমুল আইন তর্ক চলল। আদালত রায় শোনানোর দিন ধার্য করল। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতে রায় অত সহজে মেলে না।

আরো কয়েক তারিখ পার হলে অনুমান করা গেল হাল খতিয়ান আমলে নিয়েছেন আদালত। ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভের সব ক্ষমতা কবুলিয়তের বলে তেলহীন কুপির মতো নিভু নিভু হতে লাগল। সারা সপ্তাহ মকবুল পাগলের মতো রেকর্ড-খতিয়ানে অভিজ্ঞ সালিশের পেছন ছুটে ক্লান্ত। রাতের আঁধারে সে ভুল বকে, বিছানায় গড়াগড়ি খায়, লাল লাল চোখে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকায় ওগরাতের ঘরের চালের দিকে। মকবুল উন্মাদপ্রায়।

রায়ের দিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বিঘাই গ্রামের মানুষ জানতে পারে গত রাতে মকবুল ঝুপড়ি ঘরের কাছে তেঁতুল গাছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়েছে।

মানিক দম্পতিকে আর বিঘাই গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো আবার কোনো এককালে এই দম্পতির কোনো উত্তরসূরি রায়ের কপি নিয়ে বিঘাই গ্রামে আবার ফিরে আসবে। হয়তো কেউ ফিরবে না আর কোনো দিন।