আপনি সোমেন চন্দকে নিয়ে বলতে শুরু করলেই কোনো কোনো পাঠক আধো আধো বোলে কয়ে উঠবে ‘ইঁদুর! ইঁদুর!’, কেউ নবোকভের নাম শুনলেই টাগরায় শব্দ করে বলবে ‘লোলিতা’, টেড হিউজের নাম শুনলেই লোকে চলে যাবে সিলভিয়া প্লাথে, তার বায়ুশূন্য বেলজারে। লোকের আর দোষ কী। রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছিলেন, ‘দুই নক্ষত্র পরস্পরকে সেলাম ঠুকতে ঠুকতে প্রদক্ষিণ করে চলে, হঠাৎ যদি মরণের ধাক্কা লাগে, নিবে যায় দুই তারকার লণ্ঠন, দোঁহে এক হয়ে উঠবার আগুন জ্বলে ওঠে।’ টেড আর সিলভিয়া হয়তো সেই তারাদের সংঘর্ষ, সর্বভুক আগুন যার গন্তব্য। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্টারক্রসড লাভার্স’। একের নাম এলে অন্যের কথা আসবেই।

টেড হিউজ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, তিনি নিজেই এপিক, তার যাপিত জীবনও এপিকের চূড়া থেকে ঝাঁপ দেয়ার ট্র্যাজেডি— যেমন গভীর সে জীবনের শোক, তেমনি বর্ণিল তার হঠকারী বিস্তার। অবশ্য সমালোচকদের মতে, যা কিছুর জন্য তিনি দায়ী (দ্বিচারণ, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা ও দায়িত্বহীনতা), সেসব ট্র্যাজেডি নয়, মহত্তর শোকের সৌধটৌধ কিছু নয়, নেহাত অপরাধ। সিলভিয়া প্লাথকে ছুড়ে দিয়ে টেড গেছিলেন আসিয়া ওয়েভিলের কাছে, আসিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় গেছেন সুজান অ্যালিস্টনের কাছে। জীবনের শেষ কবিতায় তিনি তার কাব্যভাষাতেই দোষারোপ করেন এদের, আপনজ্ঞানে সিলভিয়া ও আসিয়া দুইখানা উন্মত্ত সুঁইয়ের মতো রক্তাক্ত করেছেন ওর নাভিমূল, বিদীর্ণ করেছেন স্নায়ুমণ্ডলী, আজন্ম-আমৃত্যু এই রক্তের উল্কি বয়ে বেরিয়েছেন হিউজ, প্রেমজীবন অসাড় হয়ে গেছিল ওর। অবশ্য  হঠকারিতার অবিমৃষ্যকারিতার এমন মাসুলও আর কেউ দিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। শুধু জীবনে নয়, জীবন বয়ে যাওয়ার পরও। যে টেড হিউজের একটি কবিতাও পড়েনি, সে-ও জানে আরেক নক্ষত্র সিলভিয়া প্লাথ মারা গেছিলেন স্বামী টেড হিউজের বিশ্বাসঘাতকতা সইতে না পেরে। হিউজ নিজেই লিখে গেছেন তার শেষ কবিতায়— কেমন করে একটি বাছাই করা অস্ত্রের মতো কিংবা মাপা ওষুধবোঝাই ইঞ্জেকশনের মতো কেউ তার কানে বিঁধিয়ে দিয়েছিল চার শব্দের একটি বাক্য— ‘তোমার স্ত্রী এখন মৃত’।

এক জীবনে প্রিয় নারী (সিলভিয়া) ভয়ানকভাবে আত্মহত্যা করেছেন সেটাই শেষ নয়, সিলভিয়া তো তবু মৃত্যুদণ্ড থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে গেছিলেন টেডের সন্তানদের; পরবর্তী নারী (আসিয়া) এমনকি তার ঔরসজাত সন্তানসমেত একইভাবে আত্মহত্যা করেছেন ছয় বছর পর। এমনি সব দোষারোপ নিয়েই হিউজ মরজগৎ থেকে চলে গেছেন, হিউজ এবং প্লাথের জীবনের সত্যিকার দ্বন্দ্ব জনসমক্ষে সমাধা করে যাননি, বলেছিলেন, ‘প্লাথকে নিয়ে এই ফ্যান্টাসিয়া আসলে সত্যের চেয়ে বেশি জরুরি’ (যদিও ‘বার্থডে লেটার্স’ মুখর হয়ে আছে এক রকমের সাফাইয়ে কিংবা আত্মপর্যালোচনায়। এই বই প্রকাশিত হওয়ার খবর নিয়ে ‘দ্য টাইমস’ ফলাও করে লিখেছিল, কয়েক দশকের নীরবতা ভাঙলেন কবি।) টেডের দিককার জবানবন্দি নিয়ে বের হয়েছিল সেই কবিতার বই, বন্ধুকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন তিনি— বহুকাল আগেই এই বইটি লেখার কথা ভাবা উচিত ছিল তার, তাহলে আরো ফলপ্রসূ হতো তার জীবন, অন্তত মনোজাগতিক পীড়া থেকে মুক্তি পেতেন তিনি।

অনেককাল পরে অবশ্য টেড-সিলভিয়ার সন্তানসন্ততিরা বাবার সেই কালিমামোচনের দায় নিয়েছেন। তারা বলছেন, বাবা-মাকে এতটাই ফিকশনালাইজ করা হয়েছে যে, সেই প্রক্রিয়ায় তাদের চেনা চেহারাটাই আমাদের মনে করতে কষ্ট হয়। ছোট্ট ফ্রিদাকে নিয়ে ‘পূর্ণিমার চাঁদ আর ক্ষুদে ফ্রিদা’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন টেড—&dquote;&dquote;

একটা সামান্য উদাস সন্ধ্যা গুটিয়ে এল

একটা কুকুরের ডাক আর বালতির ঝনঝনানিতে-

আর তোর কান পেতে শোনায়।

শিশিরের স্পর্শভীরু একখানা মাকড়সার জাল।

উত্তোলিত বালতিতে স্তব্ধ- কানায় কানায় ভরা আয়না

যেন প্রথম সন্ধ্যাতারাকে ডাকছে- কাঁপবি আয় না!

সরু ওই পথে গোঠে ফিরে যাচ্ছে গরু,

ঝোপগুলোয় গরম শ্বাসের ভাপ আটকে দিয়ে-

অন্ধকার রক্তের চলমান নদী যেন,

তাতে অনেক চাঙর ইতস্তত&dquote;&dquote;

উছলে না পড়ে দুধ।

‘চাঁদ!’ তুই হঠা? চেঁচিয়ে উঠলি ‘চাঁদ! চাঁদ!’

এক পা পিছিয়ে এল চাঁদ চিত্রকরের মতো,

অবাক বিস্ময়ে এমনি এক চিত্রকর্ম দেখবে বলে

যা কিনা অঙ্গুলিবিদ্ধ বিস্ময়ে দেখছে তাকেই।

 

বাবা যখন পরিণত ফ্রিদা হিউজকে ‘বার্থডে লেটার্স-এর খসড়া দেখিয়েছিলেন, উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ছাপাব? কী মনে হয় তোমার?’ মেয়ে একবাক্যে সায় দিয়েছিলেন। স্ত্রী ক্যারল হিউজ অত্যন্ত যত্নে এর প্রকাশ করেছিলেন। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিলে তিলে লেখা, ‘কি হয়েছিল সে রাতে? তোমার অন্তিম রাতে?’— একখানা ফোন বাকি অনেকটা জীবন কবিকে খুনির মতো উ?কর্ণ রেখে দেবে— কান পেতে আছে হন্তার হূদয়— যাকে বাঁচতে দিল না তার গলার আওয়াজ শুনবে বলে... সেই ফোনকল তুলে আনা বিস্ময়কর কবিতায়। এই বইয়েই সংরক্ত প্রশ্ন করছেন তিনি স্ত্রী সিলভিয়াকে, মনে আছে কেমন করে ড্যাফোডিল তুলেছিলে? এপ্রিলের অকালবর্ষণে নুয়ে পড়ে সিলভিয়া ড্যাফোডিল তুলছেন, আর কারো মনে নেই— কবির মনে আছে, নুয়ে পড়া সিলভিয়ার কোঁচড় থেকে ঝরে পড়ছে ড্যাফোডিল— কবরে ঝরে পড়া ফুলের মতো, আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাসের মতো দৃশ্য। আগেই বলেছি এই বইটি দীর্ঘদিন ধরে লিখেছিলেন টেড, দীর্ঘ দীর্ঘ বেলা কাটিয়েছেন প্রতিটি শব্দ আরেকবার লিখে আর কেটে। লিখেছিলেন, আসন্ন গ্রীষ্মে ল্যাবার্নামের ঝুরির নিচে প্রিয় মানুষের পাশে বসে থাকার আশ্বাস চেয়ে চেয়ে মরে গেল যে— তার উপাখ্যান আর যুগপ?ভাবে স্ত্রীর অবর্তমানে সন্তানদের হূদয়ে প্রোথিত করে দিয়েছিলেন সিলভিয়ার কল্যাণীয়া মাতৃমূর্তি। আরেক অঙ্গুলিবিদ্ধ বিস্ময়।

কবির কাছে ফিরি। ছোট ছোট ভাষণে— চিরকুটে উচ্চকিত হয়ে ওঠা টেড হিউজ, ঝলসে ওঠা তার আগ্নেয় শব্দমালা— প্রায় অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের উপমা, শোকে-মনস্তাপে বিড়বিড়ে স্বগতোক্তি। কে জিজ্ঞেস করতে পারে তার মতো করে ‘কোন শয্যা? কোন বধূ? কার স্তনচ্ছায়ার প্রশান্তি?’! কে লিখতে পারে গর্হিত প্রেমে এমনি চিরকুট— ‘তোমায় দেখতে এসেছিলাম। সব বিবাহসত্ত্বেও।’ শিল্পীসত্তার দীপ্তি বিকীর্ণ হতো তার সমস্তটুকু থেকে, লোকে দেখবামাত্র ফিরে তাকাত, সমীহ করে ছেড়ে দিত স্থান, আমোদ পেত তার কাজকর্মে। তবে ইংরেজি সাহিত্যে লর্ড বায়রন ছাড়া এত বিতর্কিত এবং এত বদনামে দাগানো খুব কম সাহিত্যিকই আছেন। কোথাও গিয়ে ব্যক্তির সীমানা শেষ হয়েছে আর কোথা থেকে শুরু হয়েছে জগত্দর্শী কবির ভাষণ, সেটা নির্ধারণ করাটা দুরূহ এবং এই নিরূপণ জরুরিও নয়— কেননা কবিতা কেবল শব্দাবলি থাকতে বাধ্য নয়, জীবনও নির্ধারিত সীমা উপচে যেতে পারঙ্গম। টেডের কবিতার শরীরে বড় বেশি বিচ্ছুরণ ঘটেছে তার ব্যক্তিগত জীবনের এবং ব্যক্তিক চৌম্বকত্বের। আদ্যোপান্ত কবি তিনি, কবিতায়ই তিনি জীবনযাপন করেছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আরেক পদের অভিজ্ঞতায় উত্তীর্ণ করেছেন কবিতায়। ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন নিদারুণ আকর্ষণীয়, প্রথম দেখায় আপনাকে যে চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেবেন, তা হচ্ছে এমিলি ব্রন্টির ‘হিথক্লিফ’, সেই লার্জার-দ্যান-লাইফ প্রেমিকপুরুষ— উপন্যাসে যাকে কথকের বর্ণনা ছাড়া সরাসরি আকার দেয়া যায় না এমন মহিমাময়। হিথক্লিফের মতোই মুরল্যান্ডের সন্তান ছিলেন, পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের রুখু সামান্য পথটুকুতে, খালগুলোতে, জঙ্গলগুলোতে, উপত্যকা আর পাহাড়ের ঢালগুলোতে অজস্র উপাদান ছিল তার বেড়ে ওঠার। এখানেই তিনি পেয়েছিলেন বাঁচার, ভাবার আর প্রশ্বাস নেয়ার প্রাথমিক শিক্ষা। খুব প্রাণ খুলে হাসতেন তিনি শৈশব-কৈশোরে, প্রকৃতির কোলে থেকে বয়সে বড় তুতো দাদাদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন পশুশিকারের, ফাঁদ পাতার, বড়শি ফেলার শিক্ষা। মৃত্যু ও হত্যা একরকম প্রাকৃতিক সত্য হয়েই ধরা দিয়েছিল তার কাছে, দেহাতি লোকের কাছে প্রকৃতি এবং প্রাণিজগৎ যেমন হয় আর কী, মানুষকে ঘিরেই তো এই অফুরন্ত আয়োজন, মানুষের জন্যই এই অফুরন্ত ভাঁড়ার। কোলে একখানা মৃত পশু ফেলে দিয়ে টেডকে তার বাবা ছুরি ধরিয়ে শেখাতেন কি করে পশুর চামড়া ছাড়াতে হয়। টেডের ভাষ্যমতে, পশুর চামড়া ছাড়ানো আর কবিতা এই দুইয়ে ভেদ কমে আসতে লাগল একসময়, কবিতাও পশুর মতো আশ্চর্য— এর গায়ে জুড়বার কিছু নেই, এ আলাদা, এ স্বয়ম্ভু, মৃত্যু ছাড়া— ছাল ছাড়ানো ছাড়া এর অস্তিত্বে আর কোনোভাবেই কিছু সংযোজন করা যায় না। একে বুঝতে হলে এর মতো করে ভাবা চাই। টেডের পাইক মাছ যেমন একেবারে নিখুঁত, প্রাণিজাগতিক বিবর্তনেরও এই মাছকে কিছুই দেয়ার নেই এমনি নিখুঁত, ঝোলা পেট, মুখে বিষাক্ত হাসি, শক্তিমত্তায় অদম্য আর ডিম দশা থেকেই শিকারি এই মাছ, সবুজ এসে বাঘা চক্করে ভরে দিয়েছে এর সোনা রঙ— ডাঙার আরেক শিকারির মতো ডোরা তার, অন্ধকারের অন্তিমে যে অন্ধকার তাকে ঘুলিয়ে দিতে আসে সে। ফিলিপ লারকিন যেভাবে ফুলের কথা কিংবা প্রাণীর কথা লিখতেন কিংবা শেইমাস হিনি যেভাবে দেখতেন, তা থেকে হিউজের প্রাণিজগৎ একেবারে আলাদা; তারা ট্রেনের জানালা থেকে দেখা দূরবর্তী দৃশ্য নয়, এরা অনেক প্রত্যক্ষ, প্রকৃত প্রাণিজগতের মতো বিরোধ— আগ্রাসন আর বলপ্রয়োগের প্রচণ্ডতায় ভরা। আপাতদৃষ্টে হিউজের উচ্চারণ এবং দৃষ্টিক্ষেপ নৈর্ব্যক্তিক, হিউজের সৃষ্টি কাক একটি প্রায়-মানুষ পৌরাণিক চরিত্র, ঈশ্বরের দুঃস্বপ্ন থেকে তার উত্থান। তার খামারে সন্ধ্যায় ফিরে যাওয়া গরুগুলোর খয়েরি পিঠ অন্ধকারে বয়ে চলা রক্তের নদী, সে নদীতে অজস্র চাঙড়। কিন্তু কবিতা শেষ হতে হতে তারা কেউ নির্বিশেষ থাকে না।&dquote;&dquote;

‘অভিভূত বিস্ময়ে, অবিশ্বাসে আঙুল চালিয়ে

সে খামটা খুলল। পড়ে নিল শিলালেখ।

চট করে মুড়েও রাখল

প্রাণঘাতী বুলেটে বিদ্ধ পশু

যেমন অন্তিম দৌড়টি দেয়’

 

(‘শেষ চিঠি’- টেড হিউজ

রচনাকাল- মৃত্যুর ১৭ দিন আগে, অক্টোবর ২৮, ১৯৯৮)

কবিই অবশেষে খুঁড়ে গেছেন সেই গহ্বর, যেখানে শায়িত আছে বিপুল বেদনার শব— সে গহ্বরের নাম ‘বার্থডে লেটারস’। মেরুমজ্জা অব্দি কাঁপিয়ে তোলা শীত আর বরফের বাঁধের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কে অন্ধকার ঘরে ফিরে আসে? বরফ থেকে ঠিকরানো নীলচে আলো ভরা সকালের ঘরে আগুন করে হাত সেঁকে, সিগ্রেট ধরায় কে? আর একসময় অবধারিতভাবে একটা ফোন আসে। একখানা ফোন টেডকে বুঝিয়ে দেবে কতকাল ধরে সিলভিয়া দীর্ঘ কালো কোটখানা পরে বরফের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছেন, চুলগুলো অবিন্যস্ত বিনুনিতে জেমসক্লিপের মতন ভাঁজ দিয়ে ওল্টানো— কখন অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাবে? তার বেদনাদীর্ণ মুখ কি দেখা গেছিল শূন্য ঘরখানায়? টেড এক বরফের দিনে ফিরে এসে দেখেছিলেন সব গুঁড়িয়ে দেয়া বেদনাকে এক পাশে সরিয়ে রেখেও সিলভিয়া কী সুন্দর বিছিয়ে রেখেছেন নিকোনো সংসার— গভীর মনঃসংযোগের ছাপ তার পরিচ্ছন্নতায়, লাল রঙ ফেরানো শোয়ার ঘর, সাদা বুকশেলফ, ভিক্টোরিয়ান চেয়ারখানা, পুরনো লেখার ডেস্ক। খালি করে ফেলা সিন্দুকের মতো রিক্ত পরিচ্ছন্নতায় হাহা করছে ঘরদোর। এই ঘর, এই কফিনের মতো পচতে থাকা শেওলাচ্ছন্ন পাদ্রিঘর, হিমে জমে যাওয়া মধ্যরাত, গবাদিপশুর গোবরের পাহাড়, এই খড়ের চাল থেকে অনিঃশেষ ঝরতে থাকা শিশিরবিন্দুর অচলায়তন— এসবে এসে নিশ্চুপ হয়ে গেছিল সিলভিয়ার টাইপরাইটার, এখানে তো আসতে চাননি তিনি। এখানে কোথায় শিল্পোন্মাদের কোলাহল- ককটেল পার্টি- আর্ট গ্যালারি- সিনেমা- থিয়েটার— তবু এইখানেই কোথাও সিলভিয়া দেখে ফেলেছিলেন সেই চাঁদ, যেটা দক্ষ শিল্পীর মতো এক পা পিছিয়ে এসে নিরীক্ষণ করে নিজের জোছনাশিল্প। গোধূলিবেলা অব্দি বরফ খুঁড়ে সেদিন আলু তুলেছিলেন টেড, ভিক্টোরিয়া আর ব্র্যামলি আপেল পেড়েছিলেন রান্নার জন্য, খাওয়ার জন্য পিগস নোজ পিপিন্স আপেল। রাতে আপেল আর আলু নিয়ে গেছিলেন সিলভিয়ার লন্ডনের ফ্ল্যাটে।

‘বলো, আমরা এই গ্রীষ্মে ল্যাবার্নামের ঝুরির নিচে ঠিক বসব।

হ্যাঁ বলেছিল সে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।’

সিলভিয়ার চাওয়া এ আশ্বাস বড় বুকে এসে লাগে। কিন্তু এইবেলা আরেকজনের প্রেমে পড়াও খুব সহজ। লোকটা আসিয়াকে দেখতে এসে চিরকুটে লিখে গেছে, ‘‘I have come to see you, despite all marriages.’’ বিনিময়ে আসিয়ার কাছ থেকে খামে করে এসেছে একখানা সবুজ ঘাসের ফলক, একটিমাত্র নরম সবুজ সংকেত। এই ঘাসও একদিন ছাই হবে। 

টেড হিউজ লিখেছেন, সিলভিয়া প্লাথের অনেক মুখোশ ছিল, ব্যক্তি হিসেবে এবং তার সৃষ্টিকর্মেও। কোনো কোনোটা ছদ্মবেশ ক্লিশে বহিরাবরণ, কোনোটি আত্মরক্ষামূলক প্রতিবর্তীক্রিয়া মাত্র। আর কোনো কোনোটি স্বেচ্ছাকৃত পরিধেয়। এক পদ্ধতি থেকে আরেক পদ্ধতির দুয়ারের চাবি খুঁজে ফেরার সময় পরা মুখোশ। এর কোনোটা তার ঊন-চরিত, কোনোটা আপাত, কোনোটা অন্তর্গত রক্তের খেলায় তার নিজের সৃষ্ট চরিত্র। অবশ্য এসব ছোটখাটো চরিত্র তামাদি করে দিয়ে একদিন স্ফূরিত হয়েছিল তার কাছে আসল সিলভিয়া, যেন অনেক দিন আকারে-প্রকারে বুঝিয়ে-সুজিয়ে হঠা? করে কথা বলতে শুরু করেছে বোবা লোক, সেই কথার উদ্গীরণ লাভার স্রোতের মতন করে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সব রকমের শ্লথচারী ভান এবং ভনিতা, আর, আর সব রকমের যুযুধান ‘আমি’ এবং পরিপ্লুতিদানকারী ‘আমি’কে হটিয়ে দিয়ে। টেড সিলভিয়ার ‘দ্য বেলজার’-এর ভূমিকায় লিখেছিলেন সিলভিয়ার লেখালেখির প্রক্রিয়াটি আর্টিস্টের অম্লীয় সর্বপ্লাবী বিধ্বংসী ক্ষুধা নয়, আর্টিজানের গভীর অভিনিবেশ আর ভালো লাগার দিকভ্রান্তি। সিলভিয়াকে চিনতে চাওয়ার প্রক্রিয়া তার কবিতাকে এবং গদ্যকে এক রকমের আকার দিয়েছিল, কুমোরের আঙুল যেমন স্থির হয়ে থাকে চাকের বৃত্তাকার গতির ওপর স্তূপীকৃত কাদার তালে। দুজন দুজনের লেখালেখিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এক রকমের আন্তর পৃষ্ঠপোষকতায়। সিলভিয়া বলতেন, তিনি যেভাবে লিখছেন এবং যতটা লিখছেন তার কিছুই হতো না যদি টেড এভাবে তার আন্তরিক সহযোগিতা দিয়ে পাশে না থাকতেন। টেড বলতেন, ‘নিজের জগেক দেখার চোখের পাশাপাশি আমার আছে সিলভিয়ার জগৎ এবং সে জগেক দেখার চোখ, ও একটা মাধ্যমের মতো কাজ করে আমার জন্য।’  হিউজ নিজেই প্রাথমিক এই বিস্ময়— এই আবিষ্কারের প্রক্রিয়ার কথা লিখে গেছেন।

‘স্ট্র্যান্ডের কাছে, নাকি কোথায় ছিল সেটা? &dquote;&dquote;

আর পাঁচটা খবরের সঙ্গে বিজ্ঞাপিত ছবি।

কোনো কারণে চোখে পড়ে গেছিল আমার।

সে বছরের ফুলব্রাইট স্কলারদের একখানা ছবি।

সদ্যই এসেছে, কিংবা এসে গেছে তদ্দিনে।

কিংবা হয়তো তাদের কেউ কেউ এসেছে।

তুমি কি তাদের ভেতর ছিলে? আমি দেখছিলাম,

খুব খুঁটিয়ে নয় যদিও, ভাবছিলাম

এদের কার কার সঙ্গে আমার দেখা হবে।

তোমার মুখ নয়, সেই ভাবনাটা আমার মনে পড়ে।

সন্দেহ নেই মেয়েদের মুখগুলোই মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম আমি।

হয়তো নজরেও পড়েছিল তোমায়।

হয়তো তৌল করেও নিচ্ছিলাম তোমায়, সেটা না হওয়াই সম্ভব।

হয়তো তোমার লম্বা চুল দেখেছি, চুলের শিথিল ঢেউ-

তোমার ‘ভেরোনিকা লেইক’মার্কা ছাঁটা জুলফি,

তার আড়ালের মানুষটিকে নয়।

চুলগুলো সোনালি দেখাচ্ছিল। আর তোমার হাসি

তোমার ফলাও করে দেখানো আমেরিকান দেখন-হাসি, 

ক্যামেরার প্রতি, বিচারকদের প্রতি, অপরিচিতের প্রতি, জুজুবুড়িদের প্রতি। 

তারপর ভুলে গেছি। যদিও ছবিখানা মনে আছে আমার।

ফুলব্রাইট স্কলারদের ছবি।&dquote;&dquote;

তাদের লটবহরসমেত? নাহ, মনে হয় না।

ওরা কি দল বেঁধে এসেছিল?

পা-ব্যথা নিয়ে রোদের ভেতর গনগনে ফুটপাথে হাঁটছিলাম আমি।

তখনই কি একটা পিচ কিনেছিলাম?

তেমনটিই তো মনে পড়ে।

চ্যারিং ক্রস স্টেশনের কাছে একটা দোকান থেকে।

আমার এ জীবনে আস্বাদ করা প্রথম টাটকা পিচ।

প্রায় অবিশ্বাস্যরকমের নধর।

পঁচিশ বছর বয়সে আমি আরেকবার হতবাক হয়ে গেছিলাম

সহজতম বস্তুগুলোর বিষয়ে আমার অজ্ঞানতায়।’

(ফুলব্রাইট স্কলাররা- টেড হিউজ)

এই বিস্ময় বিপন্ন বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে কালে। টেড হাতে লিখতেন, সিলভিয়া টাইপ করে লিখতেন, সিলভিয়া টেডের কবিতাও টাইপ করতেন এবং টাইপ করে সেগুলো জার্নালে পাঠাতেন। সিলভিয়াই প্রথম দেখলেন নিউইয়র্কের বড় মাপের একটি পাবলিশার প্রথম কবিতাগুচ্ছকে নিয়ে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে; টাইপ করে তিনি নিজের কবিতা পাঠালেন না, পাঠালেন টেডের কবিতা। টেড হিউজ হয়ে উঠল এক নতুন (এবং স্থায়ী) বিস্ফোরণের নাম। সিলভিয়া এক পর্যায়ে পরিচিত হতে লাগলেন টেডের স্ত্রী হিসেবে, নবীন মাতৃত্ব খুব স্বাভাবিকভাবেই বয়ে নিয়ে এল প্রসূতিকালীন বিষাদ। আসিয়া দৃশ্যে আসার অনেক আগ থেকেই মৃত্যু নিয়ে- অপদেবতা নিয়ে- প্রেত নিয়ে সিলভিয়ার এক রকমের অস্বাস্থ্যকর অবসেশন শুরু হয়। সিলভিয়ার ভেতর এক আশ্চর্য ফাটল ছিল, ভেতরে ভেতরে ভঙ্গুর, টেড সেই ভাঙনের শুশ্রূষা করতেন, আচ্ছন্ন করে রাখতেন স্ত্রীকে, টেড-সিলভিয়া দম্পতির সন্তানরা বারবার বলেছেন সেই স্নেহ-করুণা এবং পারস্পরিক সহানুভূতি আর সহূদয়তার কথা।

‘লাল ছিল একেবারে তোমার রঙ।

লাল না হলে, সাদা। কিন্তু লাল সেই রঙ যাতে

নিজেকে তুমি জড়াতে।

রক্ত-লাল। রক্তই কি?

নাকি মেটে-লাল? মৃতসঞ্জীবনী লাল?

যে নোয়া-লাল বংশানুক্রমে হাড়কে

করে তোলে অমর, উত্তরাধিকারসূত্রে জোটা হাড়।

 

তোমার মর্জিমাফিক আমাদের ঘরখানা হলো লাল।

একটা বিচারসভা। ডালাবদ্ধ একখানা রত্নপেটিকা।

মেঝেয় রক্তের গালিচা, তাতে কালচে কারুকাজ

যেন জমাট থোকা থোকা রক্ত।

পর্দাগুলো চুনিরঙা বনাত-

একেবারে শোণিত-প্রপাত ছাদ থেকে মেঝে অব্দি।

তাকিয়াগুলোও তাই। একদম একই

দগদগে লাক্ষা-লাল জানালার ধারের আসনগুলোতে।

একটা ধুকপুকে ঘর। অ্যাজটেকদের নরবলি মন্দির।

 

শুধু বইয়ের তাকগুলো আশ্রয় পেয়েছিল শুভ্রতায়।

 

আর জানালার বাইরে

পপিগুলো নাজুক-মথিত-পেলব

যেন সর পড়েছে রক্তের ওপর,

স্যালভিয়াগুচ্ছ, যেগুলোর নামে বাবা তোমার নাম রেখেছিল

জখম থেকে উদ্গত রক্তের ফোয়ারার মতো,

আর  হূদয়ের অন্তিম গেঁটেবাত- গোলাপ,

সর্বনেশে- শিরায় শিরায় তাণ্ডব তার- বিনষ্ট।

 

তোমার ভেলভেটের লং স্কার্ট, একটা রক্তে-ভেজা পট্টি,

অপরিমিত বার্গ্যান্ডি।

তোমার ঠোঁট  নিমগ্ন গভীর ক্রিমসনে।

 

লালেই তুমি ছিলে উচ্চকিত।

আমি টের পেতাম-  তাজা জখমকে মোড়ানো

গজকাপড়ের কড়কড়ে ধারগুলোর মতো।

ছুঁলেই পাওয়া যাবে খোলা ধমনী, চকচকে মামড়ি।

 

যা কিছু তুমি রঙ করতে, প্রথম করতে সাদা

তারপর তাতে ছুড়ে দিতে রক্তগোলাপ, পরাস্ত করতে,

এলিয়ে দিতে, চুইয়ে পড়া গোলাপ,

ঝুরতে থাকা গোলাপ আরো গোলাপ,

কখনোসখনো তার ভেতরেই একখানা ছোট্ট নীল পাখি।

 

এর চেয়ে নীল ঢের ভালো ছিল তোমার জন্য, নীল মানে ছিল ডানা।

সানফ্রান্সিসকোর মাছরাঙা-নীল সিল্কের ভাঁজে

লুকোনো তোমার গর্ভ-

সোহাগী আধারে।

তোমার  সহূদয় মেজাজটুকু ছিল নীল- প্রেত-পিশাচ নয়,

কেমন তড়িতায়িত- অহিতবিনাশী- দয়ালু।

 

আলোহিম গহ্বরে গিয়ে লুকিয়েছিলে তুমি

আরোগ্যসদনের হাড়-সাদা থেকে বাঁচতে

 

শুধু যে রতন হারিয়ে গেছিল তোমার থেকে, তার রঙ নীল।’

(লাল- টেড হিউজ)

 

জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটি লাইন এ লেখার শিরোনাম, দুই শিল্পীর সংসারে ভালোবাসার প্রত্যয়ী সুর এ লাইন। একজন ছবি আঁকে অন্যজন লেখে, দুজনই নাগরিক জীবনের কাছে প্রায় পরাজিত। প্রাণিজগতের নিষ্ঠুরতা আর প্রচণ্ডতার ছাপ পড়ছিল টেড-সিলভিয়া এ দুই শিল্পীর জীবনেও। বড় অবলীলায় আসিয়া এসে গেলেন টেডের জীবনে, বড় সহজে প্রতিস্থাপিত হলেন সিলভিয়া। আসিয়া লিখলেন, বিছানায় টেডের গায়ের গন্ধ কসাইকে মনে করিয়ে দেয়। আসিয়ার ফোনকল আসার পর সিলভিয়া ফোনখানা দেয়াল থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিলেন— যেন কোনো রন্ধ্রপথে আর তার কানে না পৌঁছায় সেই কণ্ঠস্বর। টেডকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। টেডের পাণ্ডুলিপি দাহ করলেন। একদিন রেডিওতে টেডের লেখা শ্রুতিনাটক শুনলেন সিলভিয়া, গাড়িচাপা পড়া একটা খরগোশকে কসাইখানায় এনে বেচে দিচ্ছে সেই গাড়ির চালক— কেন না সে সেই পয়সায় প্রেমিকার জন্য গোলাপ কিনবে। একদিন নীল রতন হারিয়ে যাওয়া লালের ক্ষুধা গিলে খেল সিলভিয়াকে, সাক্ষী থাকলেন টেড, আমৃত্যু। ধরা হয় এই শ্রুতিনাটকই সিলভিয়াকে শেষ আঘাত করে; টেড বলতেন— খুব কম লোকে এমন অপরাধ করে, প্রতিভাকে হত্যা করার অপরাধ। বন্ধুরা তাকে বোঝাতে অপারগ হয়েছিলেন যে এ খুন নয়, হিউজের পৃথিবীতে এটা খুনই ছিল। দ্বিচারণ এ জগতে সর্বোচ্চ অপরাধ নয়, লোকে এর আঘাত সয়ে দিব্যি বেঁচে থাকে— এমনকি আবার গড়েও নেয় কত কিছু, কিন্তু হত্যা অপরাধ। আর টেড বলেছিলেন, ইহজীবনে যতটা ভাগাভাগি করেছি সিলভিয়ার সঙ্গে, সেই ভাগটুকু সরে যাওয়া মানে আমারও মৃত্যু। জীবন বলতে যা বাকি থাকে, তা কেবল পলে পলে এসবের অর্থ খোঁজার নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম।

১৮.১১.২০১৮