ঘটনাটি বিবিসির রিপোর্টার জোবিন বেকহার্দ বর্ণিত। একদিন আমি, বন্ধু জামশেদ ও শিরিন ধীরগতিতে তেহরানে এক পর্বতের পাদদেশে হাঁটছিলাম। খুব সম্প্রতি শিরিনের এক বন্ধুর ক্যান্সার ধরা পড়েছে আর এ ঘটনা জানার পর মানসিকভাবে সে খুবই বিধ্বস্ত। আমি ও জামশেদ ওকে নানাভাবে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলাম। মন খারাপ করো না দেখবে চিকিৎসা করলে সে ঠিক হয়ে যাবে, আবার আগের মতো হয়ে যাবে সবকিছু ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কিছুতেই তাকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। দল বেঁধে পাহাড়ের ঢালুতে জলাধারের পাশ দিয়ে আমরা হাঁটছিলাম। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর একটি বাড়ির সামনে এসে পৌঁছলাম, যেখানে জীর্ণশীর্ণ এক ব্যক্তি বাক্সের মধ্যে রঙবেরঙের কিছু কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু ‘থামো’ বলে শিরিন আমাদের দাঁড় করাল। তারপর পার্স থেকে টাকা বের করে লোকটির দিকে এগোতে লাগল। তার দিকে একটা নোট এগিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে দুই হাত প্রার্থনার ভঙ্গিতে শিরিন তার সামনে দাঁড়ায়। ছোট্ট একটি পাখি সেখানে থাকা এলোমেলো কার্ডগুলো থেকে একটি কার্ড ঠোঁটে তুলে নেয়। লোকটি সেটি শিরিনের হাতে তুলে দিল। খাম থেকে কার্ডে আগে থেকে লেখা কবিতার পঙিক্ত পড়ে হাসিতে ঝিকমিক করে উঠল তার চেহারা।  জামশেদ জিজ্ঞেস করল, ‘কী লেখা ছিল সেখানে?’

সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, এরপর সে সেখানে পঙিক্তটি পড়ে শোনাল, ‘দুঃখিত হয়ো না-হারিয়ে যাওয়া জোসেফ আবার দেশে ফিরে আসবে।’ এর অর্থ হলো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

ভালোবাসা ও শরাব: &dquote;&dquote;

ইরানের সংস্কৃতিতে কবিতা একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আমরা ইরানিরা বিশ্বাস করি আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে কবিতা একটি বিশেষ শিল্পের মতো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

এখানে রাস্তার একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীও ওমর খৈয়ামের লেখা জীবনমুখী কবিতার লাইন বলতে পারেন, একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারও বলতে পারেন রুমির লেখা রহস্য কবিতার শ্লোক, একজন রাজনীতিবিদ বলতে পারেন ফেরদৌসির দেশাত্মবোধ নিয়ে লেখা কবিতার লাইন। অন্যদিকে আমার মহান চাচা ভলতেয়ারকে খুব পছন্দ করতেন, শেখ সাদির পথনির্দেশক বাণী পছন্দ করতেন। তার কবিতার একটি লাইন থেকেই আমাদের পারিবারিক নামের একটি উপাধি বেকহার্দ সংযোজন করা হয় (যার অর্থ বুদ্ধিমান)।

তারপর যখন পার্সিয়ান বেলস লেটার্সের প্রচলন শুরু হয়, তখন আসে হাফিজের নাম। যিনি ইরানিদের মননে ও চিন্তায় একচ্ছত্রভাবে আসন গেঁড়ে আছেন। 

হাফিজ ছিলেন চৌদ্দ শতকের কবি। হাফিজ তার জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন সিরাজ নামক শহরে। এই শহরকে অনেকে কবিদের শহর বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। গজল ও প্রেমের কবিতার জন্য তিনি বেশ প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার কবিতায় মূলত প্রেম, শরাব, তথাকথিত সাধু পুরুষদের কপটতা ও ধর্মীয় অসামঞ্জস্যপূর্ণ দিকগুলো বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নিজেকে কখনো জাহির করতেন না তিনি, তবে যখন যা খুশি, তা করতেন। পাপ-পুণ্যের মধ্যে কোনো ফারাক করতেন না। সুন্দর, স্বচ্ছ, সুপাঠ্য ও ভিন্ন ধারার লিখনশৈলীর জন্য তার কবিতা এখনো বিশ্বে বহুল পঠিত। তার সংগৃহীত রাজসভার কবিতাগুলোকে পার্সিয়ান কবিতার মধ্যে সর্বোচ্চ আসনে পরিগণনা করা হয়। হাফিজের  কবিতার মতো হাফিজও ছিলেন বেশ প্রসিদ্ধ। যে সময়ে কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল সেই সময়ে তার অনেক লেখাই ছিল বিতর্কিত। পুরো শতাব্দীতে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা হয়তো এর পেছনে একটা নেপথ্য কারণ হতে পারে। আধুনিক ইরানে হাফিজ একক, অসামান্য ও দেবতুল্য ব্যক্তি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। তার কবিতা বিভিন্ন গান ও শাস্ত্রীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মৃত্যুর পর তিনি সিরাজেই সমাহিত হন। যেখানে বিশ্বজুড়ে তার অসংখ্য ভক্ত, অনুসারী ও পর্যটকরা সারা বছর ভিড় করে থাকেন তার সমাধিস্থল এক নজর দেখার জন্য। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ইরানি ঐতিহ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে হাফিজের কবিতার প্রয়োগ। অন্যভাবে বলা যায় সেদিন শিরিন তেহরানে যা করেছিল।&dquote;&dquote;

ভবিষ্যৎ কথন:  

ফাল-ই-হাফিজ (যেসব লেখা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে হাফিজ কর্তৃক লিপিবদ্ধ)। ইরানিরা পরম্পরায় সেসব কথাকে অদৃশ্যের জিহ্বা বলে আখ্যা দিয়ে থাকে— ভবিষ্যতের প্রশ্নে, পথনির্দেশিকা হিসেবে, জটিল সমস্যা সমাধানে কিংবা দ্বন্দ্ব অবসানে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ফাল-ই-হাফিজ ইরান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত আছে। হাফিজের মৃত্যুর পর একটি গল্প প্রচলিত হয়— ১৭৬৮ সালে হাঙ্গেরিয়ান ঔপন্যাসিক কারোলি রেভিকজোকি ভাষাবিদ স্যার উইলিয়াম জনসকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। যিনি কোথাও হাফিজ সম্পর্কে জেনেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন কিছু সাধু পুরুষ হাফিজের মৃত্যুর পর তার কবিতার বৈধতা নিয়ে কি করবে জানি না! রেভিকজোকি তার উত্তরে লিখেছিলেন মৃত্যুর পর তার দাফন হবে কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। তারা নিজেদের মধ্যে এই জটিল সিদ্ধান্ত নেয়া ছেড়ে দিয়েছিল। এলেমেলোভাবে তার বিভিন্ন বই খুলে রেখে। তারা সেখান থেকে পাওয়া প্রথম শ্লোকটি বেছে নেয় তার শেষ পরিণতির অংশ হিসেবে।

“হাফিজের মৃতদেহ দেখে অপসৃত হয়ো না

 যদিও ডুবে গেছে পাপে, ভাগ্য তার স্বর্গ”

সে সময়ে হাফিজের কবিতা ইরানিদের মধ্যে খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। প্রাচীনকাল থেকেই ইরানিরা বিশ্বের বিভিন্ন অপ্রকাশিত সূত্র ও রহস্য উদ্ঘাটনের ব্যাপারে উৎসাহী ছিল। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা অনুসারে, ইতিহাসবিদ বাইজেন্টাইনের বর্ণনা মতে, ইরানিরা হলো সে জাতি, যারা ভবিষ্যেক স্ফুলিঙ্গ হিসেবে দেখছে। ইরানের জাতীয় মহাকাব্যে ফেরদৌসির বর্ণনায় (রাজসভার জন্য লিখিত শ্লোক) রাজার আসন্ন মৃত্যু, সিংহাসন থেকে রাজবংশের পতন, নানা দুর্ঘটনা ইত্যাদির উল্লেখ ছিল। আরো আধুনিক সময়ের মধ্যে পার্সিয়ান সাহিত্য বোদ্ধা মাহমুদ অমিদসালার এনসাইক্লোপিডিয়ায় লিখেন, ইরানিরা কার্ড খেলতে অভ্যস্ত ছিল। তারা ভাগ্য নির্ণয়ে কার্ড ও ছোলার ব্যবহার করত। অনেকে ফার্সি শ্লোকের অন্যান্য বই ব্যবহার করত (যেমন রুমির মাসনাভি)। অমিদসালারের মতে হাফিজের দিওয়ান (রাজকীয় শ্লোক) ছিল তার মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।&dquote;&dquote;

সিরাজ নগরীর কবিদের বর্ণনার মতো ইরানের যেকোনো স্থানে আজ আপনার ভাগ্য নিহিত থাকতে পারে। এখনো পুরুষ লোকেরা প্রশিক্ষিত পাখি দ্বারা কবিতার বিভিন্ন শ্লোক ব্যবহার করে ব্যস্ত রাস্তা, পর্যটনকেন্দ্র ও বিনোদনকেন্দ্রে ভাগ্য নির্ণয়ের কাজ করে থাকেন। ঠিক যেমন তেহরানের দারবান্ড অঞ্চল, যেখানে শিরীন তার বন্ধুর নিয়তি সম্পর্কে জেনেছিল। উল্লেখযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে তেহরান ও যেসব শহর অধিক জনাকীর্ণ, শিশুরা এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে, পথিক ও যাত্রীরা উৎসাহী হয়ে কবিতার শ্লোক লেখা কার্ডে তাদের ভাগ্য খুঁজে ফেরেন। যদিও হাফিজের কবিতা লেখা কার্ড ইরানের সর্বত্র বিপুলভাবে ছড়িয়ে আছে। যতদিন দিওয়ান থাকবে, ততদিন ফাল-ই-হাফিজ থাকবে। মনে মনে শুধু একটি প্রশ্ন করুন আর বইয়ের যেকোনো একটি পৃষ্ঠা উল্টে তার উপযুক্ত জবাব খুঁজুন; দেখবেন পেয়ে যাবেন।

ভেনিস ভ্রমণ কি আমার জন্য উপযোগী? আমার প্রেমিকা কি আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে? আমি কি চাকরিটা পাব? প্রবাদ আছে, একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং সিরাজের কবি হাফিজের কাছে রয়েছে এর জবাব। এখনো ইরানিরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু জানার প্রয়োজন হলে কবিদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে।

সে হিসেবে শিরিন বেশ সৌভাগ্যবান। কেননা হাফিজের কাছ থেকে সে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছিল। সবার ভাগ্যে সাধারণত ভালো সংবাদ থাকে না।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ। পরের দিন ইরান সঙ্গে আর্জেন্টিনার ম্যাচ। খেলার পরিণতি জানার ভীষণ কৌতূহল হলো আমার। চোখ বন্ধ করে আমি সশ্রদ্ধ চিত্তে একটি প্রশ্ন করলাম, তারপর দৈবচয়ন ভিত্তিতে হাফিজের দিওয়ান খুললাম। আমাদের ছেলেরা তাদের চৌকস খেলার মাধ্যমে লিওনেল মেসিকে মাঠের বাইরে পাঠাতে সক্ষম হবে কিনা? জবাবের জন্য হাফিজের শ্লোক যেটা পেলাম, সেটা ছিল আমার জন্য বেশ কষ্টকর ও হতাশাজনক। 

‘এই বয়সে কষ্ট, যার কোনো শেষ নেই&dquote;&dquote;

 বেগুনি শরাব ছাড়া,

 প্রতিকার জানা নেই আমার’ 

শিগগিরই আমি আবিষ্কার করলাম হাফিজ কেবল একটি বা দুটি বিষয়ে জানতেন, তা নয় বিশ্বকাপ নিয়েও তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য ছিল। তিনি যা বলেছিলেন, তাই সত্য হলো। সে আর কেউ নয়, লিওনেল মেসি, যে কিনা আমাদের মাঠছাড়া করেছিল।

সর্বকালের কবি:

বন্ধু হিসেবে শেখ সাদি আর নায়ক হিসেবে ওমর খৈয়াম সবসময় আমার প্রিয়। কিন্তু হাফিজের প্রতি দেশবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভালোবাসা আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। শৈশবে হাফিজের প্রতি পিতামাতা বা পিতামহের মুগ্ধতার বিষয়টা অতটা বুঝতাম না। আমার নানা প্রতিদিন সকাল ও রাতে হাফিজের কবিতা পড়তেন। শোয়ার ঘরের টেবিলে খোলা অবস্থায় একটি দিওয়ান রাখতেন নিত্যব্যবহার্য জিনিসের মতো।       

এখন আমি বিষয়গুলো বেশ উপলব্ধি করি। শব-এ-ইয়ালদাতে আমার খালা চোখ বন্ধ করে মনে মনে কি যেন বললেন! তারপর হাফিজের দিওয়ান খুললেন, সে বিষয়ে কি ব্যাখ্যা আছে, তা দেখার জন্য এবং অবিশ্বাসভাবে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেয়ে গেলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি হাফিজের কবিতার সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোয় বিমোহিত হতে লাগলাম। ফাল-ই-হাফিজের প্রতি আর বেশি ঝুঁকে পড়তে লাগলাম। যদিও আমি কখনো ভাগ্যের পূর্ব নির্ধারণে বিশ্বাসী নই। কবিদের কোনো দক্ষতাই সমস্যা সমাধানে কাজ করতে পারে না। যদিও ইরানি সংস্কৃতিতে এর প্রভাব বিস্তর। তবুও যখন কোনো জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়, কোনো দিকনির্দেশনার প্রয়োজন পড়ে কিংবা স্পর্শকাতর বিষয় সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন আমি ফাল-ই-হাফিজের শরণাপন্ন হই। 

বিশ্বকাপে ইরান ও আর্জেন্টিনা ম্যাচের ফলাফল জানতে গিয়ে হাফিজের লেখা থেকে সেদিন যে উত্তর আমি পেয়েছিলাম, আমরা আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করতে পারব না, তা হতাশাজনক হলেও সেখানে সান্ত্বনার বাণী নিহিত ছিল। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। সারকথা এই, আমাদের জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত যত ঘটনা ঘটুক না কেন, সবকিছুই আবার একসময় ঠিক হয়ে যায়। হোক সে ইরানি, হোক সে বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলের জাতিগোষ্ঠী। তবুও আমরা ভবিষ্যৎ জানতে উৎসাহী হই। ভবিতব্য নিয়ে যা শুনি, তা অন্তত বিশ্বাস করতে চাই।