ইতিহাসের কাছে সব প্রজন্মের দায় থেকে তৈরি হয় নতুন গল্প। সময় ও ভৌগোলিক অঞ্চলের নির্দিষ্ট সময়ের ‘গল্প’ হলেও নতুন বয়ানই তৈরি করে পুরনো ইতিহাস নিয়ে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। আবার কখনো বৃহৎ গল্পের মাপে হারিয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ ছোট ছোট ঘটনা। তখন সেই ইতিহাসের কাছে জায়গার অস্তিত্বটুকু যথেষ্ট থাকে না। পাঠককে কল্পনা দিয়ে খুঁজে নিতে হয়। পূর্বসূরিদের জীবনে পুরান ঢাকার জিন্দাবাহারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে ধরতে অমিতাভ ঘোষ বর্ণনা করেছেন একই গল্প পরবর্তী প্রজন্মের যাপনের পৃথক চিত্রে। ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’ উপন্যাসে ঠাকুমার জন্মস্থান ও নাগরিকত্বের মধ্যে ব্যবধানের অনুভব তুলে ধরতে চেয়েছেন মানুষের অস্তিত্ব সংকটের গল্প দিয়ে। সে ইতিহাসের পাঠক হয়ে আমি শুধু বাড়িটা খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম। জিন্দাবাহারে ১/৩১ নম্বর বাড়ির গলিতে ৫৪ বছর আগে নিহত হয়েছিল বিত্তবানের বাউণ্ডুলে ছেলে ত্রিদিব। ভারী কাঁচের চশমা পরা ত্রিদিব বই পড়তে পছন্দ করত আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসত। নিহত ত্রিদিব লেখকের পূর্বপ্রজন্ম, আত্মীয়। একই সময় নিহত হয়েছিল আরো দুজন মানুষ।
জিন্দাবাহারের প্রথম লেনের প্রবেশপথেই বাঁঁ-দিকে পাহারা দিচ্ছে ‘কামরাঙ্গা’ নামে কয়েকশ বছরের পুরনো মসজিদ। শ্বেত পাথরের ভেতর নীল রঙের অসংখ্য চাঁদ-তারা খোদাই করা নিপুণ স্থাপত্যটি আশপাশের আধুনিক স্থাপনার ভিড়ে এখন ধূসর ও অনেকটাই দৃষ্টির অগোচর। চলতি পথে শুধু মিনার আর গম্বুজের খানিকটা চোখে পড়ে। একসময় নিশ্চয়ই জৌলুস ছিল। তখন হয়তো আসা-যাওয়ার পথে চোখে পড়ত ঝকঝকে মেঝে, দেয়ালের নকশা, বাইরের বাঁধাই করা বিস্তৃত অংশের একপাশে ধান খুঁটে খাচ্ছে কবুতরের ঝাঁক। পরিতোষ সেনের ‘জিন্দাবাহার’ বইতে উল্লিখিত কবুতরবাজ হাফিজ মিয়া দর্জি এ মসজিদে নামাজ আদায় করতেন কিনা জানি না, তবে মিনারের ওপর দিয়ে তার কবুতরগুলোর উড়ে আসার বর্ণনা পাওয়া যায়। বাড়ি খুঁজতে গিয়ে চক্কর খেয়ে বারবার এ মসজিদের সামনেই ফিরে এসেছি আমি। এখানে যারা থাকেন তারা আকস্মিক পরিবর্তনটা ধরতে পারবেন না। আমাদের মতো যারা হঠাৎ এসেছেন তারা বুঝবেন, এই যে চারপাশে সারি সারি দোকানের পরিবেশ অনভ্যস্ত চোখে বেশ ভিন্ন রকম করে ধরা পড়ে। আলাপে পুরান ঢাকার সুরেলা ভাব, পান খাওয়ার প্রচলনটা এদিকে বেশি। পথের পাশে কাগজের দোকানের ধুলো আর ভাপসা গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কাবাবের মাংস পোড়া ঝাঁজ। শাড়ি কাপড়ের দোকান থেকে ঠিকরে আসছে ঝলমলে কাচ, পুঁতির আলো। সরু সরু দোকানগুলোর মাথার উপরের সাইনবোর্ড ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না ঝুলে থাকা জট পাকানো বৈদ্যুতিক তারের জন্য। আসার পথে দেখেছি মখমলের গিলাফে ঢাকা মাজার আর পুরনো মন্দির। আমাকে যে বাড়িটা খুঁজে বের করতে হবে ওটার সামনের গলিতে ছিল কানা বাবুর মিষ্টির দোকান। ১৯৩৬ সালেরও বহু আগে একটা ছোট ছেলে একবার না বলে মিষ্টি খেয়ে ফেলেছিল সে দোকান থেকে। পেট মোটা কানা বাবু শাস্তি হিসেবে মিষ্টির ঝোল মাখিয়ে দিয়েছিলেন ওর হাফপ্যান্টে। এরপর কী হয়েছিল যদিও অমিতাভ ঘোষ নিজেই জানতেন না, তবে আমি ধারণা করি, কিশোর পুনরায় সে কাজ করে থাকবে। পরিতোষ সেন সমকালীন মানুষদের সম্পর্ক নিয়ে তেমনই উষ্ণতার কথা বলেছেন পাঠককে। সেই আমলে জিন্দাবাহারে জন্মাষ্টমীর মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও আক্ষরিকভাবে সে উৎসব সম্পন্ন হয়েছে সর্বজনীন অংশগ্রহণে। বাবুবাজারের দিক থেকে মিছিলের জন্য হাতি আনার সময় ‘ঐ আসছে’ কলরব তুলত সব ধর্মের মানুষ।
কানা বাবুর মিষ্টির দোকানের গলির ভেতরে বাড়িটাতে জন্মেছিলেন দ্য শ্যাডো লাইনসের লেখকের ঠাকুমা। দেশভাগের কয়েক বছর আগে সংসার করতে রেঙ্গুন চলে যাওয়া ঠাকুমা ঠিক তেমন করে নাগরিকত্ব হারানোর বিষয়টি ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানে আসার আগে প্রবলভাবে অনুভব করেননি। তবে যখন বুঝলেন তখন বিস্ময় ও বেদনার অভিঘাতের মুখে জীবন তাকে উপহার দিল আরো ভয়াবহ নির্মম এক অভিজ্ঞতা। লেখকের ঠাকুমা সেই বাউণ্ডুলে ত্রিদিবের বড় মাসি। নিজের মাসিকে নিয়ে ত্রিদিব বলেছিল, ‘সারা পৃথিবী জুড়ে যত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ আছে, তাদের মতোই একটা জীবন সে চেয়েছিল। সেখানে সে জাতিগত সংহতি আর ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর আস্থা রাখতে পারবে, আত্মমর্যাদা, আর জাতীয় শক্তির ওপর বিশ্বাস সেখানে টলে যাবে না। নতুন যুগের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ হিসেবে সে শুধু বাঁচতে চেয়েছিল। এই ছোট্ট জিনিসটা ইতিহাস তাকে পুরোপুরি দেয়নি।’
লেখকের বাবা আর জ্যাঠামশাইয়ের বিবাদে জিন্দাবাহারের ১/৩১ নম্বর বাড়িটা দুই ভাগ করা হয়েছিল ঠাকুমার কিশোর বয়সে। মাঝখান দিয়ে দেয়াল তুলে মুছে দেয়া হয়েছিল অন্যপাশের দৃশ্যপট। দেয়ালের এ পাশের শিশুরা বলত, ওপাশে সবকিছু নাকি চলে উল্টো নিয়মে। রান্নাঘরে স্নান করে আর বিকালবেলা খায় সকালের নাশতা। সবাই ঘুমোয় উল্টো মাথায় আর বিছানা পরিষ্কার হয় উঠোন পরিষ্কারের ঝাড়ু দিয়ে। বাড়ি বা সীমান্ত, মানুষ বা প্রকৃতি যেকোনো কিছুতেই ‘দাগ’ টানলেই দূরত্ব হয় আর পরিচিত অভ্যস্ততাও তখন হয়ে যায় ভীষণ অচেনা। সে অভিজ্ঞতার মুখে দাঁড়িয়ে একেক প্রজন্ম জীবনকে গ্রহণ করে ভিন্ন ভিন্নভাবে আর তখন তৈরি হয় গল্পের বৈচিত্র্য। তবে আমি নিজেই এখন বাড়ি খুঁজতে এসে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছি, কোনো ঠিকানাই আর ৫৪ বছর আগের সেই ধারায় নেই। জিপিএস, গুগুল ট্র্যাকার কিছুই কোনো ফিডব্যাক দিতে পারছে না। আসলে দেশভাগের আগের সে ঠিকানা ছিল এক মালিকানার। এরপর পূর্ব পাকিস্তান আমলে ‘শত্রু সম্পত্তি’, বাংলাদেশ পর্বে ‘অর্পিত সম্পত্তি’, এ শতকের শুরুতে আবার তা প্রত্যর্পণ আইনের ফেরে ঠিকানার চরিত্রের দফারফা হয়ে গেছে। একই জমিতে কত ভাগ, কত নতুন নতুন নাম বদল হয়েছে, সে শুধু ভূমি জরিপ অফিসই বলতে পারবে। এ গলির বুকের ভেতর দিয়ে ও গলির বাহুর কাছে পৌঁছে সে গলি অতিক্রম করতে করতে টের পেলাম, লুডুর কোটে সাপ আর মইয়ের দ্বন্দ্বে পড়ে আমি অসহায় গুটি। হাফিজ দর্জির কবুতরের মতো সেই পুরনো ঠিকানাটা নিয়ে চক্কর দিচ্ছি একই জায়গা দিয়ে। ঘণ্টাখানেক এমন ত্রাহি পরিস্থিতির পর আশার আলো দেখালেন শূন্য দোকানে বসে থাকা একজন মুরব্বি। অবশ্য তার আগে দমিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই হয়তো উদাস মুখে অদ্ভুত এক তথ্য দিলেন তিনি, ‘৩১ নম্বরের ঠিকানায় এখনো মাঝে মাঝে চিঠিপত্র আসে বটে, কেউ খুঁজে পায় না বাড়িটা।’ ওই বাড়ির সামনে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনা শুনে তিনি একটু চুপ করে রইলেন। এরপর বললেন, ‘এই পথ দিয়ে এগিয়ে শেষ মাথায় ধোপা বাড়ির আগের বাড়িটাতে জিজ্ঞেস করেন, ওইটার নম্বর ৩২।’ বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকটা মাথা তুলে দেখতে হলো বহুতল ছাদের সীমানা। এটা ৩২ হলেও সত্যি কিন্তু ৩১ নেই আশেপাশে। চারপাশে কাগজের দোকান আর কয়েকটা গৃহস্থালি ফেলে সাহস নিয়ে ঢুকে গেলাম অন্দরমহলে। অনেকটা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার সরু পথ পেরিয়ে এক টুকরো উঠোন এইটুকুতে অনেকটাই আলো এসে পড়েছে।
পেছন দিকটায় পুরনো ধাঁচটা ধরে রেখেছেন বাড়িওয়ালা। একসময় ইঁদারা ছিল মনে হচ্ছে। নিচতলায় চার ফুট বাই দুই ফুট ঘরের লাল মেঝেতে আনাজপাতি ছড়িয়ে কাটছেন এক তরুণী। বড় কড়াই থেকে মাছ ভেজে তুলছেন দুই নারী। একজন মাঝবয়সী, অন্যজন প্রৌঢ়া। একেবারে তিন প্রজন্মের তিনজন। ক্যামেরা দেখে তরুণীর খানিকটা চাঞ্চল্য হলেও মধ্যবয়স্কার শীতল চাহনি তাকেও দমিয়ে দিয়েছে। বেশ শান্ত কণ্ঠে কথা বলতে বলতে মধ্যবর্তীজন ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে মাপছেন আমাকে। তবে মুখে হাসি নিয়ে বজায় রাখছেন সৌহার্দ। কেটে কেটে জানালেন, প্রায় পাঁচ যুগ আগে এখানে কোনো উকিল বাবুরা ছিলেন কিনা, সে খবর তাদের জানা নেই। ৬৪’র দাঙ্গার সময় বেহাত হয়ে যাওয়ার খবর তো দূরস্থান। এ পর্যন্ত যাও ঠিক ছিল, ভজঘট পাকল নিহতের প্রসঙ্গ তোলায়। প্রৌঢ়া যেন কেমন আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। যত দ্রুত মাথা নাড়িয়ে আমাকে বিদায় দিতে চাইলেন, মনে হলো দাঙ্গার স্মৃতি তার রয়েছে। তবে সে স্মৃতির সত্যতা বহনের ক্ষমতা নেই অথবা অনিরাপত্তা বোধ করেন। অনুনয়ের সুরেও ঘনিষ্ঠ হওয়ার কোনো আশা নেই বলে বেরিয়ে এলাম। কখন যেন সেই দাড়িওয়ালা মুরব্বি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। জানতে চাইলেন হদিস পেলাম কিনা। দ্য শ্যাডো লাইনস বইটা আমার হাতের ভেতর তখন রয়েছে। বললাম, চাচা ‘ফুল ফোটার সেই বিশেষ সপ্তাহটি দৃষ্টি এড়িয়ে গেলে বহুমাস ধরে একটা গাছকে নজর করলেও তার সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না।’ তিনি ঠিক বুঝলেন না হয়তো, তাই ব্যাখ্যা করতে হলো, বাড়িটা আমি খুঁজে বের করতে পারি হয়তো
কিন্তু সে ঘটনা যারা দেখেননি বা বলতে না চাইলে কেমন করে জানব সেদিনের জানুয়ারিতে ত্রিদিবসহ তিনজন নিহত হওয়ার গল্পটা? এখন যারা আছেন তাদের কেউ কেউ হয়তো তখনো ছিলেন, তবে দাঙ্গার আতঙ্কে তাদের মন ঘটনায় অনুপস্থিত ছিল অথবা বহু হত্যার ঘটনায় হারিয়ে গেছে ওটা।
লেখকের ঠাকুমা তিন যুগ পর ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন ১৯৬৪ সালের ৩ জানুয়ারি। উড়োজাহাজে চেপে নামতে নামতে ত্রিদিবকে বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঢাকা কোথায়? ঢাকাকে কেন দেখতে পাচ্ছি না? নিজের শৈশবে দেখা ঢাকার সঙ্গে ব্যাপক বদলে গেছে এ শহর। অথচ ঠাকুমার মুখ থেকে গল্প শুনতে শুনতে লেখক তার কিশোর বয়সে এ শহরকে এমনভাবে কল্পনা করতে শিখেছিলেন যেন এসে নামলে একা একাই ঠিক পৌঁছে যাবেন জিন্দাবাহারে। ‘আমার সম্বল ছিল ঠাকুমার কাছ থেকে পাওয়া পুরনো ঢাকার কিছু স্মৃতিচিত্র। সেগুলোকে জোড়া দিয়ে বেশ কয়েক দশক আগে ঠাকুমার সেই অল্পবয়সে ঢাকায় আসার ছবি আঁকতে চেষ্টা করতাম... অস্পষ্ট কালচে বাদামি রঙে ছোপানো পুরনো দিনের ছবি। আমি দেখতে পেতাম কিছুটা দূরে একটা কালো স্টিম ইঞ্জন ভস্ ভস্ করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে আসছে, পরপর অনেকগুলো ট্রেনের বগি ডান দিকে ঘুরে গেছে—যেগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। সামনে আধা-অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে কুলি আর ফেরিওয়ালার ভিড়। তার মধ্যে যাত্রীদের আত্মীয়স্বজন ট্রেন এসে থামামাত্র ধাক্কাধাক্কি করে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে—প্রত্যেকেই চাইছে কাছে পৌঁছাতে। আর ছবির পিছনে মসজিদের কারুকার্যখচিত মিনারের আবছা রেখা।’ কোন মসজিদের কথা বলেছিলেন ঠাকুমা? বাড়ির পাশের কারুকার্যময় মিনারের সেই মসজিদের স্মৃতিই হয়তো ছিল ঠাকুমার, যেখান দিয়ে আমি প্রথম লেনে ঢুকেছি। তবে বিমান থেকে পুরনো সেই ঢাকা দেখতে না পাওয়ার হতাশা কিন্তু ছিল ঠাকুমার জন্য সবে শুরু। বিমানবন্দরে জন্মস্থানের কোটায় লিখতে হয়েছে ঢাকা অথচ নাগরিকত্ব ভারতীয়, তাই জন্মস্থানেই নিজেকে আবিষ্কার করলেন বহিরাগত হিসেবে। আসার আগে ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, প্লেন থেকে ভারত আর পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত দেখা যায় কিনা। হয়তো ভেবেছিলেন সীমান্ত বলতে একটা মোটা করে টানা কালো দাগ, যার একপাশে সবুজ আর অন্যপাশে লাল মাটি। যেমন ম্যাপে থাকে আর কি। এমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না শুনে জীবনের বিপুল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রৌঢ়াও শিশুর মতো জানতে চাইলেন, তফাত যদি না-ই থাকে, তবে ভাগের প্রয়োজন কী ছিল? ভাগের প্রয়োজন আসলে মানুষের ক্ষুদ্র প্রবৃত্তির ভেতরই থাকে, আবার সম্পূর্ণ করার প্রবৃত্তিও মানুষের তেমনই সহজাত।
লেখকের ঠাকুমা কলকাতা থেকে ঢাকা আসার এক সপ্তাহ আগে থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। কাশ্মীরের হজরতবাল মসজিদে নিয়ে আসার ২৬৩ বছর পর ১৯৬৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর হজরত মুহাম্মদের (স.) সংরক্ষিত মাথার চুল অদৃশ্য হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। সে ঢেউ দ্রুতই এসে পৌঁছেছিল এ দেশে। প্রথমে খুলনা অঞ্চলে, এরপর দাঙ্গা ছড়িয়ে যায় নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায়। ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ও সিরাজগঞ্জ থেকে আসা ঢাকাগামী ট্রেনের হিন্দু যাত্রীদেরকে টঙ্গী ও তেজগাঁও নেমে যেতে বলেছিল গুণ্ডারা। অস্বীকৃতি জানানো মানুষদের সেখানেই হত্যা করা হয়। ১৫ তারিখ আরেক দল নবাবপুর রোডের পুরোহিতের বাড়িতে ঢুকে রাধা-কৃষ্ণ মন্দির ধ্বংস করে পুরোহিতের মুণ্ডচ্ছেদ করে। এ সময় নবাবপুরের বিখ্যাত ‘দাস স্টুডিও’ লুটপাট করে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। ঢাকার আশেপাশে কয়েকশ গ্রাম এ তাণ্ডবের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
২০১১ সালে এ দাঙ্গা নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। দাঙ্গার সময়ের সাক্ষী গাফ্ফার চৌধুরী বলেছিলেন, সে সময় দৈনিক ইত্তেফাক ও পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা কিছু সত্য ঘটনা প্রকাশ করায় পাকিস্তান সরকারের রোষে পড়ে। ১৬ জানুয়ারি গঠন করা হয় ১১ সদস্যের একটি দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হাজী মোহম্মদ দানেশ, হামিদুল হক, বেগম রোকেয়া আনোয়ারা, বেগম সুফিয়া কামাল, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, তোয়াব খান, গাফ্ফার চৌধুরীসহ আরো অনেকে ছিলেন দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্বে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গণমাধ্যমের ওপর সর্বোচ্চ বিধিনিষেধ আরোপ করে সম্পূর্ণভাবে কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। আলোকচিত্র ধারণও নিষিদ্ধ। দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্বে ১৮ জানুয়ারি ইত্তেফাক, আজাদ ও সংবাদ পত্রিকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে আবেদনপত্র প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালে সেই আবেদনপত্র ছিল মাইলফলক পদক্ষেপ। নিউইয়র্ক টাইমসের সে সময়ের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এ দাঙ্গায় শুধু ঢাকা শহরেই প্রাণ হারিয়েছিল এক হাজার হিন্দু। কলকাতায় ছড়িয়ে গেছে দাঙ্গা। সেখান থেকে প্রতিদিন পালিয়ে আসছে মুসলমান মোহাজিররা। আর ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সামনে তখন প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার হিন্দু আশ্রয়ের জন্য দাঁড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়, যাদের অধিকাংশকে যেতে হয়েছিল দণ্ডকারণ্যে আশ্রয়ের নামে এক রকম নির্বাসনে। কলকাতা শহরের বাবুদের বাগানবাড়ির এলাকাগুলোয় তৈরি হয়েছিল বাবুই পাখির বাসার মতো অসংখ্য ছোট ঘর। কলকাতার রিফিউজি কলোনির মানুষেরা এখনো আদি ঢাকার সেই ভাষায় কথা বলে, যে ভাষা এখন আর ঢাকা শহরেই নেই। ঐতিহ্য ধরে রাখার কিছু ছিল না বলে ভাষার আঞ্চলিকতা বজায় রেখে হয়তো ক্ষণিকের তরে জিতে যাওয়ার চেষ্টা মানুষের। আর দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তুদের জীবনের সহানুভূতিশীল, চরিত্রসন্নিবেশ প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছেন নারায়ণ স্যানাল। অপরিচিত অনুর্বর লাল মাটিতে ফলনের চেষ্টা, বন্য পশুর আক্রমণ, সুপেয় জলের অভাব, খাবারের জন্য সস্তা শ্রম— এসব নিখুঁতভাবে স্থান পেয়েছে তার ‘অরণ্যদণ্ডক’ গ্রন্থে।
দাঙ্গার শুরুর দিকে লেখকের ঠাকুমা ঢাকায় আসার কয়েক মাস আগে খবর পেয়েছেন, ৯০ বছরের জ্যাঠামশাই বেঁচে আছেন। তবে সে বাড়িতে এখন দেশভাগ, পঞ্চাশের দাঙ্গার পর ভারত থেকে আসা মুসলমান শরণার্থীদের আশ্রয়। ও রকমই একজনের আশ্রয়ে আছেন তার জ্যাঠামশাই। ১/৩১ নম্বর বাড়িতে তিন যুগ পর ফিরে তিনি মায়ের হাতে লাগানো একটা গাছ খুঁজেছিলেন উঠোনে। গাড়ির চালক বারবার সতর্ক করেছে পরিস্থিতি নিয়ে। যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ঠাকুমার বোন মায়া দেবী, তার ছেলে ত্রিদিব আর মে নামে ত্রিদিবের বিদেশী বন্ধু সঙ্গে রয়েছে। স্মৃতিবিভ্রান্ত জ্যাঠামশাই বারবার বলছিলেন, একবার চলা শুরু হলে আর কখনো থামা হয় না, কখনো ফেরা যায় না, যেমন তার ছেলেরা আর কখনো ফিরে আসেনি ভারত থেকে। তাই অনাত্মীয় পরিবেষ্টিত হয়েও এ বাড়িতেই তিনি শেষ সময় পর্যন্ত থাকতে চান। বহু অনুনয়ের পর জ্যাঠামশাইকে নিজেদের কাছে নিয়ে যেতে রাজি করাতে পেরেছিলেন ঠাকুমা। গলি থেকে বের হওয়ার সময় সবকিছু সুনসান। হঠাৎ তাদের গাড়ি ঘিরে ফেলল কয়েকজন। পেছনের রিকশায় জ্যাঠামশাইকে নিয়ে আসছে তারই এতদিনের আশ্রিত রিকশাচালক খলিল। খলিল তার আশ্রয়দাতাকে নিজের রিকশায় করে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। যখন ঢাকা শহরের অধিকাংশ জায়গায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছে, সে সময় এক স্মৃতিহীন হিন্দু প্রবীণ আর মুসলমান রিকশাচালকের সম্পর্ক পরমাত্মীয়তায় বাধা পড়ল। দ্য শ্যাডো লাইনসে লেখক সে ব্যাখ্যা আরো আগেই দিয়ে তৈরি করেছেন পাঠকের মন— ‘যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে মানুষ ভুলে যায় সে হিন্দু না মুসলমান, বাঙালি না পাঞ্জাবি! একই রক্তবন্যার মধ্যে থেকে জন্ম নেয় একটা ঐক্যবদ্ধ পরিবার।’ অস্ত্র হাতে গুণ্ডারা গাড়ি ছেড়ে তখন ঘিরে ফেলল রিকশাটাকে। গাড়ির ভেতর থেকে মে বেরিয়ে গিয়েছিল তাদের রক্ষা করতে। সেই বাউণ্ডুলে, পথের মোড়ে বসে চা খাওয়া আর রাজ্যের গল্প বানিয়ে বলা ত্রিদিব এগিয়ে এল সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে। ১/৩১ নম্বর বাড়ির সামনের গলির মোড়ে, কানা বাবুর সেই মিষ্টির দোকানের কাছে ১১ জানুয়ারি পড়েছিল তিনটি দেহ। খলিল, ঠাকুমার জ্যাঠামশাই আর ত্রিদিবের।
আমি খুঁজতে খুঁজতে ৩২ নম্বর বাড়ি অব্দি পৌঁছেছি, যে বাড়ির নিচতলায় বসে খাবারের আয়োজন করছিলেন তিন নারী। সে বাড়ি থেকে ব্যর্থ হয়ে বেরিয়ে এসেছি, হাল ছেড়ে দিয়ে পথে দাঁড়িয়ে আছি। সঙ্গেই লাগোয়া একটা ধ্বংসাবশেষ, এতক্ষণ চোখে পড়েনি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুরব্বি জানালেন, ওখানে কেউ থাকে না। বহুদিন ধরে পতিত রয়েছে। বাড়িটা কত নম্বরের তিনি বলতে পারলেন না। টিন দিয়ে ঘিরে রাখা ওই জায়গাটুকুর ভেতরের বিশেষ কিছু দেখা যায় না। বিধ্বস্ত দোতলা বাড়ির এক পাশের ছাদের চিহ্ন উঁকি দিচ্ছে। উপরের দিকটায় অনেকগুলো পরজীবী গাছ বড় হচ্ছে স্বাধীনতায়। টিনের ঘেরের কাছে বেশকিছু ধুতরা ফুলের গাছ। সেসব ফুলের কেন্দ্রটা গাঢ় বেগুনি। ইতিহাসের আখ্যানে লেখকের সামান্য বিচ্ছিন্নতা না থাকলে আর পাঠকের সমান সংযোগ তৈরি হলে সেইসব শব্দ সত্য হয়ে যায়। জিন্দাবাহারের প্রথম লেনের এ ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ৬৪’র দাঙ্গার সময় ঠিক এ বাড়ির কাছেই কোথাও ঘটেছে সেই ঘটনা। হতে পারে হয়তো তার নাম ত্রিদিব নয়, অন্য কিছু। হয়তো তারিখটা ১১ নয়, ১৪ বা ১৫ জানুয়ারি। এ ত্রিদিব নামটাও হয়তো আসলে দাঙ্গায় নিহত সব তরুণের অস্তিত্বের প্রতীক। এমনও হতে পারে ১/৩১ নম্বরটাই লেখকের কল্পনাপ্রসূত। যদিও অমিতাভ ঘোষকে জিন্দাবাহারের ধ্বংসস্তূপের মতো বাড়িটার ছবি পাঠানোর পর তেমনটা তিনি বলেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টুইট করেছেন ছবিগুলো। লেখক বিশ্বাস করেন ‘জায়গার বাস্তব অস্তিত্বটুকুই যথেষ্ট নয়, তাকে নিজের কল্পনা দিয়ে খুঁজে নিতে হয়। আর প্রতিটি স্থানই তার নিজের মতো করে নির্ধারণ করে নেয় বিশেষ সময়টা।’
১৯৮৯ সালে ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত দ্য শ্যাডো লাইনসের এ বছর ৩০তম প্রকাশনা বার্ষিকী উদযাপন হয়েছে। গল্পটা এখানে শেষ হয়নি। সেদিনের মৃত্যুর ঘটনা থেকে শুরু হয়েছিল পরবর্তী প্রজন্মের নতুন গল্প। ইতিহাসের গতি নির্ধারণ করে দেয়া সে গল্পের অভিঘাত থেকে তৈরি হয়েছে নতুন পথ। পাঠক হিসেবে আমার কাছে এ গ্রন্থের সব শব্দকে সত্য বলে বিশ্বাস করাতেই তাই স্বস্তি।






