সাক্ষাৎপার গ্রহণ: এমএম মুসা
[ড. হামিদা হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের একটি শহর হায়দ্রাবাদে। তার বাবা জেলা জজ ছিলেন বলে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতেন। ১৯৫১ সালে তিনি মেট্রিক পাস করেন। এরপর হায়দ্রাবাদ কলেজে ভর্তি হলেও পরে বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার ওয়েলেসলি কলেজে পড়ার সুযোগ পান। সেখানে তিন বছর পড়াশোনা করেন। এরও অনেক পরে সত্তরের দশকে তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট এন্টোনি’স কলেজ থেকে আধুনিক ইতিহাসের ওপর পিএইচডি করেন। তার থিসিসের বিষয় ছিল ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে বাংলার বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন।’
ড. হামিদা হোসেন কর্মজীবন শুরু করেন করাচিতে ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’-এর গবেষণা সহকারী হিসেবে। এছাড়া কাজ করেছেন করাচিতে ও ঢাকায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের সম্পাদক হিসেবে এবং করাচি থেকে প্রকাশিত রাজনৈতিক সাপ্তাহিক ‘আউটলুক’-এ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। তিনি ১৯৬৫ সালে আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিধবা অসহায় নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেন। আশির দশকে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে আইনি সহায়তা দেয়ার চিন্তা থেকে তিনিসহ কয়েকজন মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন।
বাংলাদেশে যারা এখন মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন, তিনি তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় নেত্রী। প্রচুর গবেষণা করেছেন, করে যাচ্ছেন। তার এসব গবেষণা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রচুর লেখা দৈনিক ও সাময়িকীগুলোয় প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৮৮ সালে তার পিএইচডি থিসিসটি ‘The Company Weavers of Bengal: The East India Company and the Organization of Textile Production in Bengal, 1750-1813’ নামে গ্রন্থাকারে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউ দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে সালমা সোবহান ও রওশন জাহানের সঙ্গে তার লেখা No Better Options? Women Workers in Bangladesh ঢাকার ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয়।
১৯৯২ সালে Cole P. Dodge ও এফ. এইচ. আবেদের সঙ্গে সহসম্পাদক হিসেবে ‘Crisis and Development: Coping with Disaster in Bangladesh’ বইটি ইউপিএল থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৯১ সালে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্বে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সাইক্লোন আক্রান্ত হওয়ার পর সবার ভিন্ন ভিন্ন ত্রাণ ও পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতার প্রবন্ধগুলো সংকলিত হয়েছিল বইটিতে।
১৯৮৭ সালে Oxford University Papers on India, Volume-1-এর part 2-তে বস্ত্র শিল্পের ইতিহাসের ওপর এবং ১৯৯৬ সালে বস্ত্র ও বাণিজ্য (Cloth and Commerce) নিয়ে বেশকিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সাময়িকী যেমন— Economic and Social History Review, Delhi; Journal of Social Science; Journal of the Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka ইত্যাদিতে লেখা প্রকাশিত হয়েছে।]
বাংলার তাঁতিদের নিয়ে গবেষণা করায় কেন উদ্যোগী হলেন?
আমি বলব এটি দৈবপাক (অ্যাকসিডেন্ট)। কারণ আমি একাডেমিশিয়ান ছিলাম না। তখন কাজ করতাম পাবলিশিং অ্যান্ড এডিটিংয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে আসার পর আমার নির্ধারিত কাজের পাশাপাশি তাঁতিদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলাম। সম্ভবত এটি ১৯৬৪-৬৫ সালের কথা। তাদের কীভাবে সংগঠিত (অর্গানাইজ) করা যায়, সে ব্যাপারে সক্রিয় হলাম। তখন তো সব জিনিস পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসত। স্বাধিকার-স্বাধীনতা আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আমরা স্বাধীনতার কথা বলছি বটে, কিন্তু তাঁতিদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। তাই ভাবলাম তাদের নিয়ে কাজ করি।
অন্য অনেক সম্প্রদায় থাকতে তাঁতিদের নিয়ে কেন আগ্রহ জন্মাল?
আসলে আমার যোগাযোগ ছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে। তিনি আমাদের পাড়ায় থাকতেন। প্রায়ই দেখা হতো। তিনি তাঁতিদের পছন্দ করতেন। তিনি এবং অন্য বন্ধুদের মাধ্যমে তাঁতিদের সঙ্গে এক ধরনের যুক্ততা (ইনভলভমেন্ট) তৈরি হয়ে গেল। এর পর থেকে চেষ্টা করলাম তারা যে গ্রামে গ্রামে খুবই সুন্দর সুন্দর নিজেদের ব্যবহার্য পণ্য তৈরি করছেন, সেই উৎপাদন প্রক্রিয়া ঘুরে দেখার। দেখলাম তাদের বেশির ভাগ পণ্যই বিক্রি হতো না। কিন্তু সব প্রয়োজনীয় কাঁচামাল (সুতা) বাইরে থেকে আসত। বিশেষ করে পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ ও অন্য জায়গা থেকে। প্রথমে আমরা চেষ্টা করলাম যোগাযোগ তৈরি করে তাদের কীভাবে সুন্দরভাবে সংগঠিত করা যায়। মূলত তাঁতিদের সঙ্গে কাজ করার সূচনা সেখান থেকেই হলো। তারপর স্বাধীনতার পরে বোধহয় আমরা প্রথম কারিগর নিয়ে সমবায় সমিতি করলাম। ওইভাবে তাঁতিদের নিয়ে আগ্রহটা তৈরি হলো।
বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পর আমরা কয়েক বছর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ছিলাম। ভাবলাম বসে না থেকে কিছু কাজ করি। কারণ বাংলা অঞ্চল বিভিন্নভাবে বিখ্যাত ছিল। এটি একটি প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র ছিল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন তপন রায় চৌধুরী। তিনি আমার সুপারভাইজর। তার সঙ্গে কথা বললাম, তাঁতিদের নিয়ে কাজ করলে কেমন হয়। এটা নিয়ে পিএইচডি করা যায় কিনা। আমার অসুবিধা, আমি একাডেমিক ছিলাম না। তিনি খুব একটা উৎসাহ দেখালেন না। বললেন— দেখো, কিছু পাও কিনা। এর ওপর তো বেশি লেখা নেই।
এত সীমাবদ্ধতায় গবেষণার কাজটি কীভাবে শুরু করলেন?
অক্সফোর্ডে একটি লাইব্রেরি ছিল। সেটিকে বলা হতো ইন্ডিয়ান লাইব্রেরি। সেখানে কিছু সেকেন্ডারি রিসোর্সেস পেয়েছিলাম। যেমন— কলকাতার কিছু ঐতিহাসিকের বই পেলাম। দু-একটি বই দেখার পর রেফারেন্স পেলাম যে কোথায় পাব আমার গবেষণার জন্য সহায়ক বই। সেখানে ইন্ডিয়া অফিস নামে একটি বিশাল কালেকশন ছিল। সাতচল্লিশের আগে ব্রিটিশরা অনেক পুরনো ডকুমেন্টস সেখানে রেখে দিয়েছিল। যেমন— ঢাকা ফ্যাক্টরি কিংবা কলকাতার ফ্যাক্টরিগুলোর রেকর্ড ছিল। ইন্ডিয়া অফিস যত্ন করে ডকুমেন্টসগুলো রেখে দিয়েছিল। ফলে আমার কাজটি অনেকখানি সহজ হলো।
আমার আগ্রহ ছিল তাঁতিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজটি করার। চেষ্টা ছিল তাদের জীবনযাপন কীভাবে পরিবর্তন হলো তা তুলে আনার। মোগল আমলে ঢাকায় তাঁতিদের ব্যবসা অনেক বিরাট ছিল। এখান থেকে পণ্য বুখারা যেত, মধ্যপ্রাচ্যে যেত। এমনকি ইন্দোনেশিয়ায় পর্যন্ত যেত। তারপর তো ব্রিটিশ কোম্পানি এল। আলোচ্য কোম্পানি আসার পর বাংলার তাঁত শিল্প প্রায় শেষই হয়ে গেল উনিশ শতকের শেষের দিকে।
আমি কোম্পানি রেকর্ডস পর্যালোচনা করেছি। সেখানে তাদের দিক থেকে তাঁতিদের সুনির্দিষ্ট পণ্যের অর্ডার দেয়ার প্রমাণ মেলে। এখান থেকে বোঝা যায়, শুধু সামাজিক নয়; কীভাবে ব্রিটিশরা একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও নিজেরা তৈরি করেছে। এমনিতেই তাঁতিদের অবস্থা কোনো দিন এত ভালো ছিল না; আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম কোম্পানি আসার পর তাঁতিদের উন্নতি হয়েছে কিনা। তাদের খুব একটা উন্নতি দেখিনি। ফ্যাক্টরি চিফকে লেখা গোমস্তাদের নানা চিঠিতে এটি স্পষ্ট। একটি ব্যাপার লক্ষ করলাম, যারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজ করেন (নিজস্ব স্টাফ), নানা সুবিধা নিয়ে তারা নিজেরা ব্যবসা করছেন। গবেষণা করতে গিয়ে আরো দেখেছি যে কোম্পানি নিজের একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা বা নিয়ন্ত্রণের জন্য কীভাবে আইন পরিবর্তন করল; যেটি তাদের পক্ষে গেছে, তাঁতিদের অনুকূলে যায়নি। এসব ফাইন্ডিংস খুঁজে বের করলাম। তারপর থিসিস লিখতে শুরু করলাম। এটি শেষ করতে চার-পাঁচ বছর লেগেছে। অনেক পরে তো বই আকারে সেটি প্রকাশ হলো।
কাজ যখন শুরু করলেন তখন তাঁতিদের অবস্থা কেমন ছিল?
বিভিন্ন বইপত্র-রেকর্ডস পড়ে জেনেছি, ব্রিটিশ কোম্পানি তথা ইউরোপীয়রা আসার আগে তাঁতিদের একটা কাজের স্বাধীনতা ছিল। যেখানে হয়তো ক্রেতা আছেন। তাদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ নিয়ে দাদনের ভিত্তিতে কাজ করছেন। ইচ্ছামতো নিজেদের তৈরি তাঁতপণ্য বিভিন্ন জায়গায় বা ক্রেতাদের দিতে পারছেন। এত বেশি নিয়ন্ত্রণ তাঁতিদের ওপর ছিল না। তারপর যখন ব্রিটিশ কোম্পানি, ডাচ কোম্পানি ও ফ্রেঞ্চ কোম্পানি এল, তখন তারা একজন তাঁতিকে নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিল। এক কোম্পানি হয়তো বলল, আমার জন্য ১০টি থান তৈরি করো, আর অন্য কোম্পানি হয়তো বলল, আমার জন্য ১৫টি। সবার কাছ থেকে অর্ডার নিতে চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু সীমিত অবকাঠামোয় তারা সব কাজ করতে পারছেন না। তার ওপর বেড়ে গেল নিয়ন্ত্রণ। ফলে তাদের কাজের স্বাধীনতা অনেকটাই খর্ব হলো।
সবাই অর্ডার দেয়ার কারণে চাহিদা বাড়লেও তাঁতিরা যেহেতু জোগান কম দিতে পারছিলেন, সেহেতু দাম বেশি পাওয়ার কথা। তারা কি তা পেয়েছিলেন?
দাম অত বেশি পাননি। তবে যেহেতু তারা কাজ করে আসছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন যথেষ্ট দাম পাচ্ছেন। কিন্তু পরে যখন কয়েকটি কোম্পানি প্রতিযোগিতায় এল, তাদের স্টাফরাও প্রতিযোগিতায় নামলেন, তখন একটু টানাটানি বেশি হচ্ছে। অবশ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে যখন প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন পলাশীর যুদ্ধ হয়। এতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জিতে গেল। এর পর থেকে তারা বেশি নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ কোম্পানি আইন পরিবর্তন করল। কোম্পানিকে তাঁতপণ্য কীভাবে দেবে, যদি না দিতে পারে কত জরিমানা হবে— এ রকম এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁতিদের।
এতে আমাদের তাঁত শিল্পের উন্নতি হয়েছিল, না আরো খারাপ অবস্থায় পড়েছিল?
মোগল ও ব্রিটিশ আমলের তাঁত শিল্পের অবস্থা পুরোপুরি ভিন্নতর। মোগল সম্রাটদের কাছে যে তাঁতপণ্য যেত, সেটি খুবই স্পেশাল কনসাইনমেন্ট ছিল। সেটি খুব উচ্চ গুণমানসম্পন্ন ছিল, যা সবাই করতে পারেনি। মোগলরা নিজস্ব কারখানা স্থাপন করেছিল। সেখানে তাদেরই লোক দেখাশোনা করত। তারাই সুতো দিত। সেখানে তাঁতিরা এসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কাজের জন্য গোড়া থেকে যে মজুরি ধরা হয়েছিল, সেটিই তারা পেতেন। কিন্তু কোম্পানি আসার পর পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেল। এখন স্পেশালাইজেশন অনুযায়ী পুরো তাঁত শিল্প ভাগ হয়ে গেল। যেমন— ঢাকার নারায়ণগঞ্জে জামিদানি শাড়ি, টাঙ্গাইলে টাঙ্গাইল শাড়ি। একটি সময় চারটি কোম্পানি ছিল, তখন প্রতিযোগিতা ছিল। স্বাভাবিকভাবে প্রতিযোগিতা থাকলে যারা কাজ করেন তাদের কিছুটা স্বাধীনতা থাকে। তখন ওই কোম্পানি বা সাধারণ বাজারে উৎপাদিত পণ্যটি বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু একটি কোম্পানি থাকলে মনোপলি হয়ে যায়। একবার যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজ শুরু করেছেন, তখন তো ঋণটা শেষ হচ্ছে না। অ্যাডভান্স নিয়ে যাচ্ছেন, আবার ফেরত দিচ্ছেন। এভাবে ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে তারা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে এলেন।
কোম্পানি এখান থেকে প্রচুর মুনাফা করেছিল। কিন্তু তাঁতিদের অবস্থার পরিবর্তন কি হয়েছিল?
একেবারে পরিবর্তন হয়নি, তা বলব না। তবে একেবারে ধনী হননি। কিন্তু কাজ পেয়েছেন। চিঠিপত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, কাজ সময়মতো দিতে পারছেন না। কারণ অর্থের সমস্যা। দেরি করে দিলে কোম্পানি আবার জরিমানা করছে। আর প্রত্যেক কোম্পানির যেসব লোক পুরো বিষয়টি দেখে তারা বলে— এটা ভালো না, ওটা ভালো না। এসব অজুহাতেও তাদের ওপর জরিমানা করা হতো। এতে তাঁতিদের ক্ষতি হয়েছিল অনেক।
তাঁতিরা কোম্পানির অধীনে এলে আর্থসামাজিক কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি?
খুব একটা আর্থসামাজিক পরিবর্তন না হলেও বলব, তাঁতিদের কাজ বেড়েছিল। তাদের চিঠিপত্র থেকেই এটি জানা যায়, তাঁতিরা ঠিকমতো কাজ দিতে পারছেন না। এর মধ্যে ১৭৭০ সালে বড় একটি দুর্ভিক্ষ হলো। তখন তারা তুলা চাষ কমিয়ে দিলেন এবং ধান চাষ করতে শুরু করলেন। বলতে গেলে, এক্ষেত্রে নানা কারণ ছিল। শুধু যে কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করত তা নয়, তাঁতিরা কিছু সময়ের জন্য নিজেদের সরিয়েও নিয়েছিলেন। তারপর শেষের দিকে কোম্পানি নতুন বিভিন্ন নিয়ম-কানুন আরোপ শুরু করল। ১৮৪৩ সালে কোম্পানির চার্টার শেষে সরাসরি সরকারের ব্যবসা ছিল। তখন তাদের ওপর বেশি চাপ ছিল না। কারণ সে সময় ল্যাঙ্কাশায়ার মিলে কাপড় তৈরি হতো। উদ্দেশ্য ছিল, তাদের কাপড় ভারতবর্ষে বিক্রি করা।
কোম্পানির শোষণের কারণে তাঁতিদের মধ্যে কি বিদ্রোহ দেখা গিয়েছিল?
বড় ধরনের কোনো বিদ্রোহ হয়নি। ক্ষুদ্র মাত্রার হয়েছিল। তখন তো এখনকার মতো তথ্যপ্রবাহের যুগ ছিল না। কাজেই বড় মাত্রার কিছু হয়নি। তবে কিছুটা প্রতিবাদ তাঁতিদের দিক থেকে হতো।
কোম্পানি আসার পরে কি কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এসেছিল?
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন জামদানিতে আসেনি। অন্য ফ্যাক্টরি বা তাঁতে এসেছিল অনেক পরে।
আপনার গবেষণার বেশির ভাগ কাজটাই কি ব্রিটেনে বসে করেছিলেন?
হ্যাঁ, ওখানে করেছিলাম। কারণ এখানে তেমন রেকর্ড নেই। কলকাতায় কিছু আছে। বেশির ভাগ লন্ডনে। ওইসব ডকুমেন্টকে বলা হয় বোর্ড অব ট্রেড। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সেগুলো সংরক্ষিত। সেখানে ঢাকা ফ্যাক্টরির রেকর্ড, আড়ং থেকে আসা চিঠিপত্র সবই রয়েছে। একটা বিষয় স্বীকার করতে হয়, আমি সাহায্য পেয়েছি ড. আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে। আমি যখন কাজটা করি, তখন তাকে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে ডাকা হলো প্রাপ্ত বাংলা ডকুমেন্টগুলো ভাষান্তরের জন্য। তিনি তখন কাজটি করতেন। তার মাধ্যমে অনেক ডকুমেন্টস আমি পেয়েছি, যা থেকে প্রভূত উপকৃত হয়েছিলাম। তিনি ভাষান্তর করছেন, পাশাপাশি সেগুলো আমি পেয়েছি। আমার কাজে লাগিয়েছি।
কোম্পানি কি মোগলদের মতো নিজস্ব ফ্যাক্টরি করেছিল?
কোম্পানি ফ্যাক্টরি করেনি। তাদের সিস্টেম ছিল ভিন্ন। এখান থেকে লন্ডনে স্যাম্পল পাঠানো হতো। একটি কাজের অর্ডার পাওয়ার জন্য দুই বছর লাগত। এখান থেকে লন্ডনে স্যাম্পল যেত। বোর্ড অব ট্রেড কী কী আছে তারা নির্বাচন করত। আবার অর্ডার পাঠানো হতো কলকাতায়। কলকাতা ছিল ফ্যাক্টরির মেইন অফিস। ওই অফিস সিদ্ধান্ত নিত এটি কোন আড়ংয়ে বা ফ্যাক্টরিতে যাবে। ফ্যাক্টরি রেসিডেন্ট ছিলেন জন টেইলার। তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন— এ কাপড়টি টাঙ্গাইলে যাবে, ওই কাপড়টি বাজিতপুরে যাবে। এ রকম কয়েকটি জায়গা ছিল। তারপর ওখান থেকে ফেরত আসত ঢাকায়। ঢাকা থেকে কলকাতায়। কলকাতা থেকে লন্ডনে। এভাবে দুই বছর লাগত।
সমস্যা হলো, তারা আগে থেকেই নির্ধারণ করত এর দাম এত হবে। তাঁতিদের মধ্যেও অনেক শ্রেণী ছিল। যাদের নিজের কারখানা আছে, তারা দৈনন্দিন মজুরি ভিত্তিতে তাঁতিদের কাজে রাখতেন। নারীদের এক ধরনের কাজ ছিল। পুরুষদের মধ্যেও কাজের ভাগ ছিল। বলতে গেলে, তাঁতি সম্প্রদায়ের মধ্যেও স্পষ্ট শ্রমবিভাজন ছিল।
কাজ করার সময় আপনার সার্বিক অভিজ্ঞতা কী? পুরো বিষয়টিকে কীভাবে দেখলেন?
কাজটি করতে আমার খুব ভালো লেগেছে। ওখানকার লাইব্রেরি খুবই চমৎপার। গবেষণার সার্বিক পরিবেশও চমকপ্রদ। বড় কথা, তাঁতিদের ওপর খুব একটা কাজ হয়নি। তাদের ওপর আমার করা কাজটি ভবিষ্যৎ গবেষকদের অনুপ্রেরণার উৎস হবে বলে আশা করছি।
শ্রুতিলিখন: হুমায়ুন কবির






