বয়সে ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে ঠিক কুড়ি বছরের ছোট, একদা কেরানি হিসেবে চাকরি পাওয়া রাজিন্দার কুমার ধাওয়ান (আর কে ধাওয়ান নামেই পরিচিত) এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন যে, এমনকি তার স্বজন ও আমলাদের কেউ কেউ বলতেন— ইন্দিরাজি ধাওয়ানের কান দিয়ে শোনেন এবং ধাওয়ানের চোখ দিয়ে দেখেন।

৬ আগস্ট, ২০১৮ আর কে ধাওয়ান ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে কংগ্রেসের চরম ক্ষমতা খাটানো যুগের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং ক্ষমতা প্রয়োগকারী শেষ মানুষটি বিদায় নিলেন।

১৯৬২ সালে ২৫ বছর বয়সে যশপাল কাপুরের আত্মীয় হিসেবে নেহরু পরিবারে কাজ করার জন্য তার আগমন। সেই বয়স থেকেই দিনরাত, কখনো টানা ২৪ ঘণ্টাও কাজ করেছেন। ওয়ার্কোহোলিক এ মানুষটি অল্প দিনেই ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং তার ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। তিনি এতটাই কাজপাগল ছিলেন যে নিজের জীবনে নারী প্রবেশের সুযোগ দেননি। কেবল ৭৪ বছর বয়সে পূর্বপরিচিত অচলাকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন।

সে সময় ধাওয়ানকে জরুরি অপারেশনের জন্য হাসপাতালে নেয়া হলে অচলাই তার সেবা-যত্ন করেন। অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগে যখন দুর্ঘটনায় কিছু ঘটলে কারো দায় নেই, এমন একটি অনাপত্তি ফর্মে স্বাক্ষর করতে দেয়া হয়, অচলা চাইলেও তা করতে পারেননি। কারণ তিনি ধাওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্কিত নন।

এ বিষয়টি অচলাকে বিব্রত করে, ধাওয়ানও এতে মনোক্ষুণ্ন হন। অতঃপর তার ঘোষিত কৌমার্যের যবনিকা টেনে অচলাকে বিয়ে করেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭— ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তার পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত ছিল।

১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যা ষড়যন্ত্রের একজন অংশীদার হিসেবে তার নামও প্রচারিত হয়েছিল, তদন্ত কমিশন তাকে সন্দেহ করেছে।

১৯৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয় ও ক্ষমতা হারানোর জন্য সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে ধাওয়ানকেও দায়ী করা হয়েছে।

অথচ সত্তরের দশকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কংগ্রেসের আঞ্চলিক প্রধান— কারো কাছেই সরাসরি কোনো আদেশ পাঠাতেন না। কাজটি করতেন ইন্দিরার বিশ্বস্ত আর কে ধাওয়ান।

সঞ্চয় গান্ধীকে রাজনীতিতে আনার দায় কিংবা কৃতিত্ব দুটোই তার। সঞ্জয় সম্পর্কে ইন্দিরার কাছে প্রশংসাসূচক কথা বলার জন্য তিনি মন্ত্রীদের অনুপ্রাণিত করতেন। পুত্র-অন্ধ ইন্দিরা তার পুরোটাই বিশ্বাস করতেন; দক্ষিণ এশিয়ায় পুত্রের কারণে সর্বনাশের নজির রয়েছে, ইন্দিরাও পুত্রস্নেহের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি।

বছর দুয়েক আগে কংগ্রেসের মুরুব্বি নেতাদের এক বৈঠকে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী হঠাৎ তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘তাহলে আপনিও একটি বই লিখছেন?’

ধাওয়ান নির্বাক রইলেন। তার আত্মজীবনী প্রকাশের সম্ভাবনা চাপা পড়ে গেল। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন কংগ্রেস নেতা— এম এল ফতেদা, নটবর সিং, সালমান খুরশিদ, প্রণব মুখার্জি, মার্গারেট আলভা এবং আরো কেউ কেউ স্মৃতিকথা প্রকাশ করেছেন; যা কংগ্রেস ও সোনিয়া গান্ধীর জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠেছে।

১৯১৪-এর অক্টোবরে ধাওয়ান ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছিলেন, তিনি যে এ বই লিখতে যাচ্ছেন, তাতে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীকে নিয়ে অজানা অনেক বিষয় তিনি প্রকাশ করবেন। ‘আমার বইটা নটবর সিংয়ের বইয়ের মতো হবে না, তাতে কিছুই নেই। কিন্তু আমার বই অনেক সত্য জানিয়ে দেবে। আমি মনে করি, কোনো বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনকে মন্ত্রীর পদে বসানো উচিত নয়, কোনো নেতারই তা করা উচিত নয়। এ ভুল রাজীব গান্ধী করেছেন— অরুণ নেহরু,  অরুণ সিং, এম এল ফতেদারকে তিনি মন্ত্রী বানিয়েছেন। তারা আমার বিরুদ্ধে রাজীবের কান ভারী করেছেন।’

১৯৩৭ সালে ধাওয়ানের জন্ম পাকিস্তানে, পরবর্তী সময়ে ভারতীয় নাগরিক ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে কম শক্তিশালী হয়ে ওঠেননি। প্রধানমন্ত্রীর হয়ে নির্দেশ তিনিই পাঠাতেন। মূলত সঞ্জয় গান্ধী ও ধাওয়ানই জরুরি অবস্থার সময় ভারত শাসন করেছেন। তাকে বলা হতো প্রধানমন্ত্রীর ডোরকিপার। ধাওয়ানকে সম্মত করাতে না পারলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কারো সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। অচিরেই তিনি ভারতীয় বিজনেস টাইকুনদের কাছে ‘ধাওয়ান সাহেব’ হয়ে উঠলেন।&dquote;&dquote;

নিজের দক্ষতার কারণেই প্রধানমন্ত্রীর আস্থা অর্জন করে তিনি ১৯৬২ সালের ইন্দিরার ব্যক্তিগত সহকারী থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার প্রাইভেট সেক্রেটারি এবং স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭— কার্যত তিনিই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। আমলারা তাকে বলতেন ‘প্যালেস গার্ড’। ইন্দিরার অফিসের জয়েন্ট সেক্রেটারি বিষম ট্যান্ডন লিখেছেন, কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারবেন এবং কে পারবেন না, কোন নথি অনুমোদনের জন্য যাবে আর কোনটা যাবে না, সবই ছিল ধাওয়ানের এখতিয়ার। ধাওয়ানের পাঠানো ফাইল তিনি পড়ারও প্রয়োজন মনে করতেন না, সই করে দিতেন। রাষ্ট্রীয় বড় বড় পদে তার ইচ্ছে ও পছন্দ অনুযায়ী পোস্টিং হতো। বুদ্ধিমান আমলারা জানতেন— ধাওয়ান খুশি তো ইন্দিরাজি খুশি।

ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর তিনি কিছুটা বিপাকে পড়েছিলেন। রাজীব গান্ধী তাকে সরিয়ে দেন কিন্তু ‘বোফর্স আর্মস ডিল’সহ অন্যান্য কেলেঙ্কারির বিষয় সামনে এলে নথিপত্রে এসব সামাল দেয়ার মতো ধাওয়ান ছাড়া দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। রাজীব তাকে আবার ডেকে আনেন।

শিখ দেহরক্ষীদের হাতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে তদন্ত কমিশনের প্রধান জাস্টিস এম পি থাক্কার বলেন, ইন্দিরা হত্যাকাণ্ডে সন্দেহের তীর ধাওয়ানের দিকেই।

১৯৮৪-এর অক্টোবরের সেই সকালে অভিনেতা পিটার উস্তিনভের সঙ্গে ইন্দিরার একটি সাক্ষাৎপার নির্ধারিত ছিল। তদন্ত কমিশন মনে করে, ধাওয়ান ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্দিরাকে অফিসে আসতে আধঘণ্টা দেরি করায়। এ সময় বিয়ন্ত সিং ও সত্যবন্ত সিং ইন্দিরাকে হত্যা করে। বিয়ন্ত সিং ব্যক্তিগতভাবে ধাওয়ানের পরিচিত। বিয়ন্ত ঘটনার পর পরই গার্ডদের হাতে নিহত হয়। ধাওয়ান এ পরিচিতির কথা অস্বীকার করেন। চার বছরের ট্রায়াল শেষে সত্যবন্ত সিং ও কেহার সিং নামের একজন সাবেক কেরানিকে ফাঁসি দেয়া হয়।

রাজীব শুরুতেই ধাওয়ানের নাম অভিযোগ থেকে ‘ক্লিয়ার’ করিয়ে নিয়ে আসেন।

ধাওয়ান দুবার রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন।

তিনি একাধিকবার বলেছেন, সেনাবাহিনীর স্বর্ণমন্দির আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞের পর তিনিও শিখ দেহরক্ষী সরিয়ে দিতে ইন্দিরাকে অনুরোধ করেছেন। ইন্দিরা গান্ধী রাজি হননি।

সঞ্জয় গান্ধীর উত্থান এবং তার দুরাচারের মদদদাতা হিসেবে ধাওয়ানকে অভিযুক্ত করা হয়। ধাওয়ান ও সঞ্জয় মিলে মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টন করেছেন।

১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থা জারির প্রধান প্ররোচনাকারী হিসেবে ধাওয়ান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে দায়ী করে বলেন, তিনি জরুরি শাসন ব্যবস্থার স্থপতি। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা জারি যে ঠিক হচ্ছে না, এটা রাজীব কিংবা সোনিয়াও বলেননি। তিনি বলেন, সঞ্জয়ের সব অপকর্মের কথা তার স্ত্রী মানেকা গান্ধীর জানা।

বিমান চালনাকালে দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের মৃত্যু হলে তিনিই ইন্দিরার সঙ্গে হাসপাতালে গেছেন। শেষকৃত্যের আয়োজন ও তদারক করেছেন।

তার প্রয়াণের পর মনে হচ্ছে, ধাওয়ানকে দিয়ে একটি আত্মকথা লিখিয়ে নিলে ভালোই ছিল। ভারতীয় রাজনীতির অন্দরমহলটা আরো স্পষ্টভাবে দেখা যেত।