ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাহরাইনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারত সরকারের এজেন্টরা কাজ করতেন। এদের বেশির ভাগই উপসাগরীয় অঞ্চলের অভিজাত ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য। তবে বাহরাইনে কাজ করলেও এরা সবাই বাহরাইনে জন্মগ্রহণ করেননি। যে তেরোজন এজেন্ট সম্পর্কে জানা যায় তাদের মধ্যে মাত্র দুজন বাহরাইনের। নিয়োগের সময় প্রায় সবারই বয়স ছিল পঞ্চাশের বেশি। ১৮৩৪ সালের আগের এজেন্টদের মধ্যে বেশির ভাগ ছিলেন হিন্দু এবং পরবর্তী সময়ে শিয়া মুসলিমদের নেয়া হতো। সাতজন এজেন্ট এর আগে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে মুনশি হিসেবে কাজ করেছেন। চারজন ছিলেন একই পরিবারের, যারা পারিবারিক ব্যবসার মতো করে প্রায় চল্লিশ বছর ব্রিটিশ এজেন্সি চালিয়েছিলেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুরু থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে সিরাজ, মাস্কাট ও বাহরাইনের ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দিত। সিরাজের ব্যবসায়ীরা প্রায় সবাই খোজা সম্প্রদায়ের (ইসমাইলি শিয়া) মানুষ। মাস্কাট ও বাহরাইনের অধিকাংশ এজেন্টই ছিলেন ‘বানিয়া’। উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু বন্দরে এ বানিয়ারা ব্যবসা করেছেন। বিশেষত মাস্কাটে বানিয়ার সংখ্যা ছিল হাজারের অধিক। বাহরাইনের বানিয়া গোষ্ঠীর ইতিহাস সপ্তদশ শতাব্দী থেকে শুরু হয়। লোরিমারের গেজেটিয়ারে প্রথম এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯০৫ সালে বাহরাইনে ভ্রমণের সময় তিনি মান্নায় ভারতের ১৯১ জন বানিয়ার খোঁজ পান। যার মধ্যে ৬৯ জন হিন্দু ও ১২২ জন মুসলিম। হিন্দুদের বেশির ভাগই সিন্ধুর ভাটিয়া ও লোহানা বর্ণের। ভারতীয় মুসলিমরা ছিলেন বেশির ভাগই খোজা, যারা গুজরাট থেকে আসতেন। সুন্নিরা ছিলেন বেলুচিস্তানের অধিবাসী।

বাহরাইনে প্রথম ব্রিটিশ এজেন্টের নাম সদানন্দ দাস। সমসাময়িক ব্রিটিশ রেকর্ডে তার নাম ‘সুদ্দা আনুদাস’ পাওয়া যায়। তবে দি অ্যারাবিয়ান ফ্রন্টিয়ার অব দ্য ব্রিটিশ রাজ গ্রন্থের লেখক জেমস অনলে নামটি সাদাহ আনন্দদাস লিখেছেন। সেখান থেকে নামটি সদানন্দ দাস বলেই মনে হয়। তিনি সিন্ধু বা গুজরাটের ভাটিয়া বলে মনে হয়। তিনি একটি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান এবং মাস্কাট অঞ্চলের ব্যবসা তার ভাই গোলাব আনন্দদাস দেখাশোনা করতেন। বুশেরের ব্যবসা এ পরিবারের আরেকজনের হাতে ছিল। বাহরাইনের ট্রেডিং হাউজটি সদানন্দ নিজেই দেখাশোনা করতেন। ধারণা করা হয় কোম্পানির সঙ্গে সদানন্দের ভাইদের ভালো সম্পর্কের কারণেই কোম্পানি সদানন্দকে এ দায়িত্ব দিয়েছিল।

১৮১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সদানন্দ বেশকিছু রিপোর্ট করেন। রিপোর্টের ভিত্তিতে পারস্য উপসাগরের একজন সিনিয়র নেভাল অফিসার একটি জাহাজ আক্রমণ করেন। সদানন্দের কথা ছিল এটি একটি জলদস্যু জাহাজ। এ কাজের কারণে বাহরাইনের সরকার ক্ষেপে যায়। বম্বের সরকার এ কারণে জাহাজের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। নৌ অফিসার হতাশা ব্যক্ত করে লেখেন, ‘আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে কিছু মানুষ তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন সব মিথ্যা বলে থাকে যা নানা ছোট-বড় অপরাধের সৃষ্টি করে। বাহরাইনে একজন এজেন্টের কারণে যথেষ্ট সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষের জীবনও নষ্ট হয়েছে। আমাদের স্বীকার করা উচিত যে আমরা একজন মিথ্যাবাদীর দ্বারা প্রতারিত হয়েছি।’

এজেন্ট হিসেবে কোম্পানির তরফ থেকে সদানন্দকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। সদানন্দর পর যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার সম্পর্কে রেকর্ডে কোনো তথ্য নেই। তাকে ‘কোম্পানির ব্রোকার’ হিসেবেই কেবল উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যক্তির পরিচয় রহস্যের মধ্যেই রয়ে গেছে। লোরিমারের তালিকায় ১৮২৯ সালের আগের কোনো এজেন্টের উল্লেখ নেই। সদানন্দর পর ব্রিটিশ রিপোর্টে আসু নামে একজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। লোরিমারের তালিকায় তিনি ছিলেন প্রথম এজেন্ট। লোরিমারের রিপোর্টে আসুকে এক বছরের এজেন্ট হিসেবে পাওয়া যায় কিন্তু আদতে তিনি ১৮২৭ সালেই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সম্ভবত সদানন্দকে সরিয়ে তাকেই দায়িত্ব দেয়া হয়। আসু সম্পর্কে এটুকুই জানা যায় যে তিনি একজন ভারতীয় হিন্দু ছিলেন। তার বহু নৌকা (নৌকাগুলো বাগলা নামে পরিচিত ছিল) ও জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়ানো ছিল। এসব নৌকায় উপসাগর থেকে বুশের ও বুশের থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যাতায়াত করত।

১৮২৮ সালের ডিসেম্বরে আসুর একটি বাগলা ভারত থেকে মালপত্র নিয়ে আসছিল। বুশের থেকে ৪৮ মাইল উত্তর-পশ্চিমে আরব অধ্যুষিত বন্দর দিলমের কাছে নৌকাডুবি হয়। ক্রুরা তীরে এসে পৌঁছলে তাদের বন্দর দিলমের শেখ গ্রেফতার করেন। মালপত্র উদ্ধার ও অন্যান্য সহযোগিতার জন্য রেসিডেন্ট ডেভিড উইলসন শেখকে একাধিক চিঠি লেখেন। তিনি জানান যে ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারীদের সর্বোচ্চ যত্ন নিতে হবে। শেখ তার কথা আমলে না নিলেও উইলসন চেষ্টা চালিয়ে যান। শেষ চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে এ রকম ব্যবহার করে আপনি নিজের স্বার্থের ব্যাপারটি ভুলে যেতে পারেন। আমি মনে করি এ সময়ে বাগলা ও এর সম্পর্কিত ব্যক্তিদের কোনোরূপ ক্ষতি না করে তাদের দেখাশোনা ও ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে নিজের স্বার্থ রক্ষা করবেন।’

আসুর পক্ষে উইলসনের এ পদক্ষেপ কোম্পানির সঙ্গে বানিয়ার সম্পর্কের একটি দৃষ্টান্ত। তবে আসুর সঙ্গে উইলসনের সত্যিকারের ভালো সম্পর্ক ছিল না। আসুর রিপোর্টে যথেষ্ট বিস্তারিত তথ্য না থাকায় একাধিকবার উইলসনের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তার অন্যান্য ডিসপ্যাচ দেখেও মনে হয় আসুর প্রতি তার অসন্তোষ ছিল। তাই আসুর হাতে দায়িত্ব বেশিদিন ছিল না। ১৮২৯ সালে তাকে সরিয়ে পামান নামে গুজরাটের এক ব্যবসায়ীকে কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়। পামান ছিলেন গুজরাট বা সিন্ধুর অধিবাসী। তবে পামান বেশিদিন কাজ করেনি। কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে হয় অব্যাহতি দেয়া হয়, নয়তো তিনি নিজেই চলে যান।

পামানের পর উইলসন একজন সিন্ধি হিন্দুকে স্থাপন করেন। তার নাম ছিল চান্দু। ১৮৩৩ সালের শুরুর দিকে নতুন রেসিডেন্টের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে চান্দু ভারতে তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এপ্রিলে তিনি ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এ সময় তিনি তার ভাই খুশহালকে দায়িত্বে রেখে যান। কিন্তু সময়টা তখন বেশ জটিল ছিল। খুশহালের পক্ষে সে সময় দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করা সম্ভব ছিল না। এ সময়ে শেখ আবদ-আল্লাহ আল খলিফা ও তার তিন পুত্র এ অঞ্চলে শক্তি বিস্তার করতে শুরু করেন। এর পাশাপাশি শেখ খলিফা আল খলিফাও শেখ হিসেবে আরো বেশি শেয়ার প্রত্যাশা শুরু করে। বাহরাইনের শাসক ও কোম্পানির পক্ষ থেকে তাদের দাবি মানা না হলে তারা নিজেদের মতো দস্যুতা শুরু করেন।

তারা বানিয়াদের কাছ থেকে চাঁদা নিতে শুরু করে। ব্রিটিশ জাহাজের একজন কমান্ডার এ সময় দ্বীপটি ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি লেখেন, ‘শেখ আবদ আল্লাহর অনুসারীরা তাদের খেয়ালখুশিমতো কাজ করে। এখানে কোনো পুলিশ নেই, যার ফলে একজন বিত্তবান ব্যক্তি প্রতি মুহূর্তেই তার সম্পদ খোয়ানোর ভয়ে থাকে। এর কোনো প্রতিকার নেই, কেননা অভিযোগ করা হলে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এমন চলতে থাকলে বিত্তবান ব্যবসায়ীরা আর এখানে থাকবে না।’

খুশহালকেও হুমকি দেয়া হয়। এমনকি তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন, যে কারণে তাকে এমনি আত্মগোপন পর্যন্ত
করতে হয়েছে। তত্কালীন রেসিডেন্ট ডেভিড ব্লেন শেখ
আবদ আল্লাহকে এসব কাজের ক্ষতিপূরণসহ বন্ধ করার জন্য চাপ দেন। ব্লেন একটি জাহাজ প্রেরণ করেছিলেন কিন্তু সেটি বন্দরে পৌঁছলে খুশহাল আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এলে আবার ছিনতাইয়ের মুখোমুখি হন। জাহাজের কমান্ডার চিঠিটি শেখকে পৌঁছে এজেন্ট অর্থাৎ খুশহালকে সঙ্গে করে বুশেরে ফিরে আসেন।

এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনজন দাসের শাস্তি প্রদানের বিষয়টি এড়িয়ে যান। মার্চের শেষ নাগাদ ব্লেন আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। তিনি দুটো যুদ্ধজাহাজ একজন সিনিয়র নেভাল অফিসারের নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। তিনি এগারো দিন বাহরাইনে অবস্থান করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে শেখকে রাজি করাতে সমর্থ হয়েছিলেন। বুশেরে ফিরে এসে এই নাবিক লিখেছেন, ‘ধর্মের কারণে হিন্দু ও ইহুদিদের প্রতি আরবের এক ধরনের বিরোধী মনোভাব রয়েছে এবং একজন মুসলমান হিসেবে শেখ আবদুল্লাহ এখানে এজেন্ট হওয়ার বাসনা রাখেন।’

ইংরেজ কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টদের বাহরাইনের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাল রেখেই ব্যবসা করতে হতো। ফলে এ ধরনের দ্বন্দ্ব তাদের কাজ ও ব্যবসার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্লেন এ কথা আমলে নিয়ে নৌবাহিনীর এ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার রিপোর্টটি বোম্বের গভর্নরের কাছে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু পাশাপাশি এও বুঝতে পারেন যে বানিয়াদের তিনি আগের মতো এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন না। রিপোর্ট পাঠানোর কিছুদিন পরই তিনি বাহরাইনে একজন মুসলিম মুনশি নিয়োগ দেন। মির্জা মুহম্মদ আলী সাফার নামের এ ব্যক্তিকে ভারপ্রাপ্ত এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি নতুন চুক্তি সম্পর্কে শেখ আবদ আল্লাহকে জানানো হয়। সেখানে বলা হয়—

এ অবস্থায় আমি মনে করি বিষয়টি মির্জা মোহাম্মদ আলী সাফারকে নিয়োগ করার মাধ্যমে সামাল দেয়া যাবে। তাকেই বর্তমানে গভর্নরের এজেন্ট হিসেবে বাহরাইনে পাঠানো হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের বোঝাপড়া এবং বন্ধুত্বের বিষয়টি সে অনুধাবন করবে এবং সে অনুযায়ীই নিজের কর্মপরিকল্পনা করবে। আর সে কারণেই (আশা করব) আপনি তাকে বন্ধুভাবাপন্নভাবে গ্রহণ করবেন।

নৌ কর্মকর্তার রিপোর্টের জবাবও বোম্বে থেকে পরের মাসেই চলে আসে। সেখানেও জানানো হয় যে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে একজন মুসলিম এজেন্ট প্রেরণ করাই যুক্তিযুক্ত হবে। কিন্তু ব্লেন তো বোম্বের জবাব আসার আগেই নিজের কাজ করে ফেলেছিলেন। তাই তিনি সে মর্মেই বোম্বেকে জানালেন যে এরই মধ্যে একজন মুসলিম এজেন্ট তিনি নিয়োগ করে ফেলেছেন। যে অবস্থা বাহরাইনে চলছিল সেখানে ব্লেনের এ সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আর তার কাজটা যে সময়োপযোগী হয়েছে তাতে বোম্বেরও সন্দেহ ছিল না

কোম্পানির এজেন্টদের পক্ষে বাহরাইনের স্থানীয় শেখদের মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। কোম্পানিও তাদের ব্যবসা ঠিকভাবে চালু রাখার স্বার্থে কোনো প্রকার দ্বন্দ্বে যাওয়ার তুলনায় বন্ধুত্ব রক্ষায় সচেষ্ট ছিল। তাই ব্লেনের চুক্তি মেনে নেয়ার পাশাপাশি কোম্পানিও একমত হলো যে বাহরাইনে এখন হিন্দু বানিয়াদের তুলনায় মুসলিমদের নিয়োগ দেয়াই সময়ের দাবি। ১৮৩০-এর দশক থেকে বাহরাইন ও মাস্কাটে হিন্দুদের বদলে মুসলিম ব্যবসায়ীদের এজেন্ট করা শুরু হয়। এখান থেকেই সাফার বংশের ‘এজেন্টশিপ’ শুরু হয়।

 

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক