ষোল শতক
থেকেই পারস্য
উপসাগরে ইংরেজদের
আনাগোনার প্রমাণ
মেলে। তখন
অবশ্য ব্রিটিশ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির নামেই
এ অঞ্চলে
ও পূর্বের
দেশগুলোয় ব্রিটিশরা
বাণিজ্য পরিচালনা
করত। এতদঞ্চলে
থাকা অন্যান্য
ইউরোপীয় বণিকদের
সঙ্গে তাদের
রাজনৈতিক, সামরিক
ও অর্থনৈতিক
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল
তুঙ্গে। ধীরে
ধীরে তাদের
উচ্চাকাঙ্ক্ষা এমনই
আকাশচুম্বী হয়
যে সাফাভি
আমলে খোদ
ইরানের সঙ্গেই
তাদের মনোমালিন্য
শুরু হয়।
যে বন্দরটিকে
ঘিরে ইতিহাসের
সে মাহেন্দ্রক্ষণে
এত ঘটনা-রটনার
জন্ম নেয়
তার নাম
বন্দর আব্বাস।
এটি ইরানের
হোরমুজ প্রণালিতে
অবস্থিত একটি
বন্দর। স্থানিক
অপরিহার্যতার কারণে
ইউরোপীদের বাণিজ্যে
এটি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
ওঠে এবং
ইংরেজরা পর্তুগিজদের
এ দুর্গনগরকে
ইরানে অনুপ্রবেশের
বিন্দু হিসেবে
ব্যবহার করে।
পাঠকদের এসব
গল্প জানাতে
আরেকটু আগে
থেকে শুরু
করছি।
হালাকু খান
কর্তৃক ১২৫৬
খ্রিস্টাব্দে ইলখানাত
সাম্রাজ্য গঠিত
হয়। সেকালের
পারস্য এ
সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত
হয়। তখন
থেকেই চিঠিপত্র
আদান-প্রদান
ও রাজদূত
বিনিময়ের মাধ্যমে
ইরানের সঙ্গে
ব্রিটেনের সম্পর্কের
সূত্রপাত। ১২৭৪
খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল
ইলখান আবাকা
খান ব্রিটেনের
রাজা প্রথম
এডওয়ার্ডের নিকটে
দূতমারফত পত্র
প্রেরণ করেন।
আরেক ইলখান
সম্রাট আর্গুন
শাহের সময়ে
ইউরোপের সঙ্গে
খ্রিস্টীয় দেশগুলোর
সম্পর্কের উন্নতি
ঘটে। সে
সময় ইরানি
প্রতিনিধিদের প্রধান
রাবান সোমাই
প্রথম এডওয়ার্ডের
কাছে তার
দেশের রাজবার্তা
নিয়ে উপস্থিত
হলে রাজাও
প্রত্যুত্তরে সম্রাট
আর্গুন শাহকে
চিঠি লেখেন।
শোনা যায়,
এ পারস্য
সম্রাট পরেও
ব্রিটিশরাজকে আরেকটি
চিঠি লেখেন।
মুসলিমদের সঙ্গে
সম্পর্ক উন্নয়নের
তাগিদে ১২৯১
সালে ইলখান
সম্রাটের দরবারে
ব্রিটিশরাজ প্রথম
এডওয়ার্ড তার
দূত জিওফ্রি
অব লংলেকে
প্রেরণ করেন।
অন্য ইলখান
সম্রাট গাজান
খানের শাসনামলেও
রাজা প্রথম
এডওয়ার্ডের কাছে
দূত পাঠানো
হয়। এ
ক্ষেত্রেও চিঠির
প্রত্যুত্তর আসে।
তবে ঐতিহাসিক
সূত্রের বরাতে
বলা হয়,
পারস্য সম্রাট
শাহ মুহাম্মদ
খোদাবান্দের আমলে
সর্বপ্রথম ব্রিটিশ
কয়েকজন দূত
পারস্য উপসাগর
পরিদর্শন করেন
যাদের মধ্যে
জোহান নিউ
বেরির কথা
আমরা উল্লেখ
করতে পারি।
তিনিই প্রথম
ব্রিটিশ যিনি
স্থলপথে উপসাগরীয়
অঞ্চলে আগমন
করেন। এ
সময়ে আরো
যারা ভ্রমণ
করেছেন তাদের
মধ্যে রলফ
ফিচ, উইলিয়াম
ডিড, জেমস
স্টোরি প্রভৃতি
ব্রিটিশ দূতদের
নাম উল্লেখ
করা যেতে
পারে। মূলত
রলফ ফিচের
প্রতিবেদন ও
ভ্রমণবৃত্তান্তের ওপর
ভিত্তি করে
ব্রিটিশ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
গঠনের সিদ্ধান্ত
ত্বরান্বিত হয়।
এরই আগে
মস্কোভি কোম্পানি
নামের একটি
প্রতিষ্ঠান বেশ
কয়েক বছর
ধরে ইরানের
উত্তরাংশের সঙ্গে
রাশিয়ার বাণিজ্যপথ
উদ্ভাবনের প্রচেষ্টায়
রত ছিল।
তাদের পরিকল্পনা
ছিল স্থলপথে
ইরানের সঙ্গে
রাশিয়ার সহজ
কোনো পথ
আবিষ্কার করা
এবং পরে
সে পথের
সঙ্গে ইউরোপের
বাণিজ্যপথকে সংযুক্ত
করা। কিন্তু
মস্কোভি কোম্পানির
সে চেষ্টা
সাফল্যের মুখ
না দেখায়
সমুদ্রপথে ইরানের
সঙ্গে বাণিজ্যের
সম্ভাবনাই অধিক
গুরুত্ব পায়।
ফলে ব্রিটেন,
উত্তর ইউরোপ
অথবা ভূমধ্যসাগরের
দেশগুলো থেকে
নানা পরিব্রাজক
ও সওদাগর
ষোল শতকে
পারস্য উপসাগরে
আসতে শুরু
করে। তারা
স্থলপথে সিরিয়ার
আলেপ্পো হয়ে
মরুময় পথ
পাড়ি দিয়ে
এ অঞ্চলে
আসতেন।
কিন্তু দক্ষিণ
এশিয়ার অন্যান্য
সামুদ্রিক অঞ্চলের
মতো এ
সময়ে উপসাগরীয়
অঞ্চলটিও পর্তুগিজ
জলদস্যুদের একচ্ছত্র
আধিপত্য ছিল।
সেখানে অন্য
ইউরোপীয়দের যাতায়াত
করতে দেখলেই
তারা তাদের
ওপর অকথ্য
নির্যাতন চালাত
ও বন্দি
করে রাখত।
ফিচ ও
তার সহযাত্রীরাও
তাদের এ
অত্যাচারের শিকার
হন। ফিচ
কারাগার থেকে
কোনো রকমে
পালিয়ে ১৫৮৫
সালে ইউরোপে
প্রত্যাবর্তন করেন।
ইরান, ভারত
ও তত্সংলগ্ন
বিভিন্ন দেশ
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
নিয়ে তিনি
লন্ডনে একটি
ভ্রমণপুস্তিকা প্রকাশ
করেন। পুস্তকাটি
ব্রিটিশ বেনিয়াদের
মাঝে পারস্য
উপসাগর, আরব
সাগর ও
ভারত মহাসাগরে
বাণিজ্য করতে
উন্মাদনা সৃষ্টি
করে এবং
নিকট ভবিষ্যতে
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি গঠন
করতে অনুপ্রেরণা
জোগায়।
ষোল শতকের
উপান্তে ব্রিটিশ
ও হিস্পানিদের
মধ্যে যুদ্ধ
শুরু হওয়ায়
ভূমধ্যসাগরীয় সমুদ্রপথ
ব্যবসায়ীদের চলাচলের
জন্য অনিরাপদ
হয়ে পড়ে।
তাই বাণিজ্যার্থে
উত্তমাশা অন্তরীপ
হয়ে পূর্বে
গমনের সিদ্ধান্ত
নেয় তারা।
প্রথম প্রথম
শামের ব্যবসায়ীরা
এর বিরোধিতা
করলেও পরক্ষণেই
তারা ডাচ
বেনিয়াদের এ
পথে বাণিজ্যে
গমনের সফলতা
অনুধাবন করতে
সক্ষম হয়।
রানী প্রথম
এলিজাবেথের সময়ে
হিস্পানিদের সঙ্গে
ব্রিটিশের যুদ্ধ
সমাপ্ত হলে
সাম্রাজ্যের অনুগ্রহপুষ্ট
হয়ে ১৬০০
খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি গঠিত
হয়। জন
কোম্পানি, বাহাদুর
কোম্পানি প্রভৃতি
নামে এটি
লোকের মুখে
প্রচলিত হয়।
এ সময়ে
সাফাভি সম্রাট
প্রথম আব্বাস
ইরানের তখতনশিন
হন। তিনি
উপসাগর থেকে
পর্তুগিজদের হটিয়ে
এখানের বন্দরগুলোর
কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ
নিজের হাতে
নিয়ে আসতে
ইউরোপের অন্য
বণিকদের সঙ্গে
আঁতাত করার
পরিকল্পনা আঁটেন।
কারণ পর্তুগিজদের
যেসব আধুনিক
যুদ্ধজাহাজ ছিল
সেগুলোর সামনে
দাঁড়ানোর মতো
কোনো সরঞ্জাম
তার নৌবাহিনীর
ছিল না।
মূলত ওসমানিদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধে
সহযাত্রী হিসেবে
এবং পর্তুগিজদের
অপ্রতিদ্বন্দ্বী সমুদ্রবহরকে
ধরাশায়ী করতে
তিনি ইংরেজদের
সঙ্গে হাত
মেলান।
ব্রিটিশরা বন্দর
আব্বাসকে ঘাঁটি
হিসেবে উত্তম
বিবেচনা করতে
শুরু করে।
যদিও এর
আবহাওয়া তাদের
জন্য মোটেই
সুখকর ছিল
না। তবু
এখান থেকে
সমগ্র পারস্য
ভূমিকে নিয়ন্ত্রণ
করা যাবে
বলে তারা
এখানে অবস্থান
গ্রহণ করে।
এরই মধ্যে
শাহ আব্বাস
বাহরাইন দ্বীপটি
থেকে পর্তুগিজদের
হটিয়ে তা
নিজের কবজায়
নিয়ে আসতে
সমর্থ হন।
খুব সম্ভবত
তখন হিস্পানের
দরবার থেকে
কয়েকজন দূতকে
ইরানের সম্রাটের
দরবারে পাঠানো
হয়। তারা
এসে বাহরাইন
ফেরত দেয়ার
বিষয়ে ইরানের
রাজার সঙ্গে
দরকষাকষি করেন।
দূতদের মধ্যে
অন্যতম একজন
ছিলেন লুইস
পেরেইরা দেলাসারদা
যার লিখিত
ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে
এ বিষয়ে
বিস্তারিত জানা
যায়। শাহ
আব্বাস বাহরাইন
ফেরত দিতে
অস্বীকৃত হন
এবং দ্বীপটিকে
নিজের পিতৃপুরুষের
সম্পত্তি বলে
দাবি করেন।
পরবর্তী সময়ে
পর্তুগিজদের বারংবার
হামলার মুখে
পড়লে ইরানি
বাহিনী দুশ্চিন্তায়
পড়ে যায়।
১৬১২ সালে
পর্তুগিজরা উপসাগরীয়
অঞ্চলে অবস্থিত
গোমবোরুন কেল্লা
দখল করে
নেয়।
গোমবোরুন শব্দটি
বন্দর আব্বাসের
নামকরণের ক্ষেত্রে
অতীব জরুরি
একটি বিষয়।
প্রাচীনকালে অর্থাৎ
ফারসি ৯২৪
সালের দিকে
বন্দর আব্বাসকে
বন্দর-এ-জরুন
নামে অভিহিত
করা হতো।
এ বন্দর
ও তত্সংলগ্ন
স্থানে অনেক
কাঁকড়া পাওয়া
যেত, যেগুলো
স্থানটিতে বিচরণ
করে বেড়াত।
তখন স্থানীয়
ভাষায় হণ্টনরত
কাঁকড়াকে কামবারাও
বলা হতো।
এ থেকেই
এর নাম
হয় বন্দরে
কামবারাও। পর্তুগিজদের
মুখে পরবর্তী
সময়ে স্থানটি
গোমবোরুন নাম
ধারণ করে।
১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে
ব্রিটিশ বেনিয়া
এডওয়ার্ড কোনাকের
নেতৃত্বাধীন জেমস
বাণিজ্য জাহাজ
এ বন্দরে
ভেড়ে। জাহাজগুলো
ইরানের জাসক
বন্দর থেকে
ভারতের সুরাত
বন্দরে পণ্য
পরিবহন করত।
ব্রিটিশ পণ্য
নিয়ে সর্বপ্রথম
জাহাজটি বন্দর
আব্বাসের মাটিতে
পা রাখে।
তখন এ
স্থানে ইংরেজরা
একটি শুল্কঘর
তৈরি করে
যার মাধ্যমে
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি ইরানে
তার প্রথম
ঘাঁটি স্থাপন
করে।
জাহাজ ভিড়িয়ে
কোনাক সাহেব
ইসফাহানে যান
রাজা শাহ
আব্বাসের সঙ্গে
সৌজন্য সাক্ষাৎ
করতে। তার
সঙ্গে যান
উইলিয়ামস রুবেনস
নামের একজন
জহুরি। ওসমানি
সীমান্তে অনুষ্ঠিত
ইরানশাহের সঙ্গে
তাদের এ
বৈঠক বেশ
ফলপ্রসূ হয়।
সে সময়
ওসমানিদের বিরুদ্ধে
লড়াই করতে
ইউরোপীয় শক্তির
সাহায্য কামনা
করে শাহ
বন্দর আব্বাসসহ
সমগ্র ইরানে
ব্রিটিশদের একচেটিয়া
ব্যবসা করার
অনুমতি প্রদান
করেন। যেকোনো
অপরাধ সংঘটনের
জন্য ব্রিটিশদের
আইনি স্বাধীনতাও
প্রদান করেন
তিনি। এতে
রেশম ব্যবসায়
সাফাভিদের যে
একচেটিয়া অধিকার
ছিল তা
আস্তে আস্তে
ব্রিটিশদের হাতে
চলে যেতে
থাকে। এতে
অবশ্য ইরানও
উপকৃত হয়।
পূর্বে ওসমানি
সাম্রাজ্য হয়ে
স্থলপথে ইউরোপীয়দের
কাছে তাদের
রেশম বেচতে
হতো। ইরানি
বন্দরে ব্রিটিশ
প্রতিনিধি থাকায়
ওসমানিদের বৈরী
অঞ্চল পরিহার
করা তাদের
জন্য সহজ
হয়।
পারস্য উপসাগরের
আধিপত্যের প্রশ্নে
বন্দর আব্বাস
ও এর
আশপাশে পর্তুগিজদের
সঙ্গে ইংরেজদের
হরহামেশা যুদ্ধ
হতে থাকে।
এভাবে ১৬২২
সালে এসে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
ও ব্রিটিশ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির সম্মিলিত
বাহিনীর সঙ্গে
পর্তুগিজরা আর
পেরে উঠতে
পারেনি। ইতিহাসে
এ যুদ্ধ
হোরমুজের যুদ্ধ
নামে পরিচিত।
যুদ্ধে জয়ের
ফলে এতদঞ্চলে
ইংরেজদের রেশমের
ব্যবসা আরো
পোক্ত হয়।
কারণ পর্তুগিজদের
বিরুদ্ধে এ
জয়লাভের প্রধান
শর্তই ছিল
এর মাধ্যমে
ইংরেজরা রেশম
ব্যবসায় একচ্ছত্র
অধিকার পাবে।
যাই হোক,
এ জয়
প্রাচ্যে ইংরেজদের
অন্যতম বিজয়
হিসেবে গণ্য
হয়। এর
সংবাদ যখন
ভারতে কোম্পানির
সদর দপ্তরে
পৌঁছে তখন
সেখানে আনন্দের
হল্লা পড়ে।
ফলে বিশ্বব্যাপী
ব্রিটিশদের উন্নতি
ও গৌরব
মহিমান্বিত হয়
এবং বন্দর
আব্বাসে ব্রিটিশ
বেনিয়ারা আরো
জেঁকে বসে।
শাহ আব্বাসের
মৃত্যুর পর
নানা কারণে
পারস্যজুড়ে ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
তত্পরতা স্থবির
হয়ে পড়ে।
কিন্তু সম্রাট
শাহ সাফি
রাজকীয় ফরমান
জারি করে
সমগ্র ইরানে
ব্রিটিশদের বাণিজ্য
করমুক্ত করে
দেন। এ
সময়ে কোম্পানি
বাৎসরিকভাবে রাজাকে
১ হাজার
৫০০ লিরা
উপঢৌকন প্রদান
করত। এছাড়া
রেশমের মূল্য
বাবদ তাদের
১০ হাজার
লিরা দিতে
হতো। এসবের
অর্ধেক নগদ
অর্থে এবং
বাকি অর্ধেক
বিভিন্ন বস্তু
দিয়ে পরিশোধ
করার রীতি
ছিল। অবশ্য
বিনিময়ে বন্দর
আব্বাসের গোমরাক
বা শুল্কগৃহ
থেকে প্রাপ্ত
অর্থের পুরোটাই
ইংরেজদের কাছে
চলে যেত।
শুরুতে ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
প্রধান আকর্ষণ
ছিল উত্তর
ইরানের মনোমুগ্ধকর
গিলান ও
মাজানদারান প্রদেশে
উত্পন্ন রেশম।
যদিও কোম্পানির
সঙ্গে করে
নিয়ে আসা
ব্রিটিশ বস্ত্রের
কদর ইরানে
ভালোই ছিল।
তবু নিজেদের
পণ্যের বাজার
নিশ্চিত করতে
ইংরেজ বেনিয়ারা
নানাভাবে বিনিময়রীতি
চালু করা
জন্য সচেষ্ট
হয়। তারা
মহার্ঘ্য রেশমের
বিনিময়ে কাপড়
ও রুপার
ব্যবসা চালু
করতে শুরু
থেকেই চেষ্টা-তদবির
করে আসছিল।
পারস্য চেয়েছিল
তার রেশমের
বাজারকে আরো
প্রসারিত করতে
এবং নিত্যনতুন
বাজারের অনুসন্ধানের
মাধ্যমে রেশমকে
বিশ্বে ছড়িয়ে
দিতে। কিন্তু
ধীরে ধীরে
ইংরেজ কোম্পানি
ইরান থেকে
রেশম ক্রয়ের
মাত্রা কমিয়ে
দেয়। বেনিয়ারা
বরং অন্যান্য
ইরানি দ্রব্যের
রফতানিতে মনোযোগী
হয়। তারা
দেখে শিরাজের
আরাক, গোলাপজল,
সুগন্ধি মিষ্টির
সমগ্র এশিয়া
ও ইউরোপে
কদর রয়েছে।
ফলে এগুলো
রফতানি করতে
শুরু করে
ব্রিটিশরা। এমনকি
ভারতে ইরানের
বাদাম, মেওয়া,
খুশক মেওয়া,
শস্যদানার বাজার
আবিষ্কার করে
এগুলো রফতানিতে
মনোযোগী হয়।
অবশ্য যদি
অধিক রফতানিযোগ্য
পণ্য উদ্ঘাটনে
তত্পর না
হয়ে কেবল
রেশম ব্যবসা
নিয়েই বেনিয়ারা
পড়ে থাকত
তাহলে বন্দর
আব্বাস সেই
কবেই ১৬৩০
সালের দিকে
রেশমের সঙ্গে
ম্লান হয়ে
যেত।
নেহায়েত চাপে
না পড়লে
কোম্পানির চাকুরে
কর্মচারীরা বন্দর
আব্বাসে গমন
ও সেখানে
অবস্থান করতে
মোটেই পছন্দ
করত না।
তারা বরং
বোম্বে, মাদ্রাজ
কিংবা কলকাতায়
চাকরি করাকে
বেহতর মনে
করত। এর
কারণ হিসেবে
ব্রিটিশ বিভিন্ন
লেখকের লেখায়
পাওয়া যায়,
স্থানটি ছিল
বেশ রুক্ষ,
গরম ও
স্যাঁতসেঁতে। সেখানে
বৃষ্টিপাতের পরিমাণ
যেমন কম
ছিল তেমনি
আবাদযোগ্য জমির
পরিমাণও ছিল
নগণ্য। বৃষ্টিপাতের
ফলে মৌসুমি
ঋতুতে স্থানটি
কিছুটা আরামদায়ক
হয়ে উঠলেও
এর সঙ্গে
বহমান বিপুল
ঝঞ্ঝা নাবিকদের
কাছে একে
আরো অগ্রহণযোগ্য
করে তুলেছিল।
এ সময়ে
তীরে অবস্থানরত
সামুদ্রিক জাহাজের
জন্য বন্দরটি
অনিরাপদ হয়ে
উঠত।
তবু উপসাগরের
তীরে অবস্থিত
অন্য পারস্য
ও আরব
বন্দরগুলোর তুলনায়
বন্দর আব্বাস
তুলনামূলকভাবে নিরাপদ
ছিল। কারণ
এর আশপাশে
সুপেয় পানির
প্রাচুর্য যেমন
ছিল তেমনি
ছিল জাহাজ
নোঙর করার
অনেক নিরাপদ
স্থান। পার্শ্ববর্তী
কেশম ও
হোরমুজ দ্বীপদ্বয়ের
দিকে দক্ষিণমুখো
ছিল এ
বন্দর। এ
দুটোই ছিল
পারস্য উপসাগরের
অপরিহার্য দুই
স্থান। কেশমে
ছিল সুপেয়
পানির উৎস
এবং এখানে
বাসাইদু নামক
একটা নোঙর
করার স্থান
ছিল। অবশ্য
১৬২২ সাল
থেকে হোরমুজের
গুরুত্ব কমতে
শুরু করে।
তখন প্রণালির
প্রবেশমুখেই পর্তুগিজদের
পাহারারত রক্ষীবাহিনী
এবং কেল্লা
ছিল যার
নিদর্শন, যা
এখনো সেখান
থেকে মুছে
যায়নি। ডাচ
পরিব্রাজক কর্নেলিস
লে ব্রুইন
বন্দর আব্বাসে
প্রাপ্ত আরো
অনেক বিশেষ
বস্তুর কথা
উল্লেখ করেছেন।
এখানে বিশেষ
এক প্রকার
চিংড়ি মাছ
পাওয়া যেত,
যাকে ইরানিরা
গামবেরি বলে।
খেজুরের প্রাচুর্য
এখনো বেশ
রয়েছে। স্থানীয়রা
এর পাতা
ঘর তৈরিতে
ব্যবহার করে।
বাদগির নামে
এক ধরনের
বিশেষ স্থাপত্যকৌশল
এখানে নির্মিত
ঘরগুলোয় নজরে
পড়ে। বলা
হয়, বাদগিরের
এ ঐতিহ্য
তিন হাজার
বছরের পুরনো।
বাদগিরকে আমরা
বাংলায় অনুবাদ
করতে পারি
বায়ুধরা হিসেবে।
মরুর তপ্ত
বাতাস থেকে
ঘরকে ঠাণ্ডা
রাখতে এগুলো
তৈরি করা
হয়। লে
ব্রুইন অবশ্য
গ্রীষ্ম-শীত
কোনো ঋতুতে
বন্দর আব্বাসকে
বসবাসের উপযুক্ত
বলে মনে
করতেন না।
তত্কালে ইরানের
মানুষের মধ্যে
ভারতীয় সুতি
বস্ত্র ব্যবহারের
প্রমাণ পাওয়া
যায়, যেগুলো
মূলত এ
বন্দর দিয়েই
পারস্যে প্রবেশ
করত। স্থানীয়
কাপড়ের চেয়ে
এসব বস্ত্র
উত্তম বলে
গণ্য হতো
ও এদের
রঙও টেকসই
হতো। উপসাগরের
বাসিন্দারা এগুলো
দিয়ে মানদিল
ও পরিকর
তৈরি করত।
তখন ইরানে
সস্তা মানের
কেরবাজ সুতি
বস্ত্র তৈরি
হতো। কিছুটা
উন্নত মানের
জন্য তারা
ভারতীয় বস্ত্রের
দ্বারস্থ হতো।
মূলত ষোল
শতকের দিকে
পার্শ্ববর্তী সিন্ধু
জনপদ থেকে
ইরানে কাপড়
রফতানি শুরু
হয়। তখন
পর্তুগিজরা পুরোপুরি
এ ব্যবসা
নিয়ন্ত্রণ করত।
এ সময়ে
কাঁচা রেশমও
ইরান থেকে
ভারত আসত।
১৬২২ সালে
হোরমুজের পতনের
পর সেখানকার
অধিকাংশ ব্যবসায়ী
সিন্ধুতে এসে
বাস করতে
শুরু করে।
পর্তুগিজ ও
তাদের মিত্র
ব্যবসায়ীরা সেখানে
মসলা নিয়ে
যেত। তার
বিনিময়ে তারা
সেখান থেকে
সস্তা খাদ্যদ্রব্য
ও কম
দামের কাপড়
নিয়ে পারস্যে
বাণিজ্য করতে
আসত। ধীরে
ধীরে সিন্ধুর
শাসকের সঙ্গে
তারা মিত্রতা
স্থাপন করতে
সক্ষম হয়।
সে সময়ে
ভারত থেকে
যেসব সামান
ওসমানি সাম্রাজ্যে
যেত, সেগুলোর
জন্য বন্দর
আব্বাসকে ব্যবহার
করতেই হতো।
এ বন্দর
দিয়েই সিন্ধু
থেকে আলাগা
নামে এক
প্রকার কাপড়
আলেপ্পো ও
বাগদাদ যেত।
এ কাপড়ের
এত কদর
ছিল যে
সাফাভি আমলে
সাবুনি নামে
একে নকল
করে ইরানের
বাজারে ছাড়া
হয়। এভাবে
বন্দর আব্বাসের
মাধ্যমে অতিপ্রাচীন
কালে ইস্ট
ইন্ডয়া কোম্পানির
বেনিয়ারা প্রাচ্য
ও পাশ্চাত্য
দাপিয়ে বেড়ায়।
আমেরিকা ও
ভারতে অনুপ্রবেশের
সামুদ্রিক পথ
আবিষ্কারের মাধ্যমে
বৈশ্বিক বাণিজ্য
ব্যাপক আকারে
ছড়িয়ে পড়ে।
এতে ইউরোপে
শিল্পবিপ্লব সূচিত
হয়। বিশেষ
করে বৃহৎ
শিল্পের উত্থানের
ফলে উৎপাদন
ব্যবস্থায় রাতারাতি
পরিবর্তন ঘটে
এবং সেখানে
নতুন রকমের
আর্থসামাজিক স্তরবিন্যাস
পরিলক্ষিত হয়।
পূর্বের দেশগুলো
থেকে সেখানে
স্বর্ণ-রুপার
আমদানি ব্যাপক
হারে শুরু
হয়। মর্যাদা
ও সময়ের
ব্যাপারে সমাজে
পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত
অধিবাসীদের মনে
নতুন অনুধাবন
কাজ করতে
শুরু করে।
সামন্ততান্ত্রিক বিত্তবৈভব
ও শ্রমিকদের
ওপরে এর
ব্যাপক প্রভাব
পড়ে। নতুন
দেশ জয়
ও সেখানে
উপনিবেশ গড়ে
তুলতে এবং
পাশাপাশি দখলীকৃত
দেশগুলোয় স্থানীয়
বাজার তৈরি
করতে ইউরোপের
বিভিন্ন জাতি
নিজেদের মধ্যে
দ্বন্দ্বে জড়িয়ে
পড়ে। বন্দর
আব্বাসের মতো
প্রাচ্যের এমন
অসংখ্য বন্দর
সভ্য ইউরোপের
বর্বরতার সাক্ষী
হয়ে এখানো
পৃথিবীতে বিরাজ
করছে।
ইসফানদিয়র আরিওন: লেখক ও অনুবাদক





