পারস্য উপসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপদেশ বাহরাইন। মুক্তো চাষের জন্য সেই অতীত কাল থেকে প্রসিদ্ধ। এ দেশটিতেই ভ্রমণরত কোনো পর্যটক যদি বাহরাইন ন্যাশনাল মিউজিয়াম পরিদর্শন করে, একটি আশ্চর্য বিষয় লক্ষ করবে। আর তা হলো ব্রিটিশ যুগের উল্লেখ নেই কোথাও। এমনকি দেশটির রাজার যে নিজস্ব ইতিহাস লিখিত হয়েছে, সেখানেও নেই ব্রিটিশ প্রভুত্বের কোনো নাম-নিশানা। তবে শুধু বাহরাইন না, পারস্য উপসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা অন্য দেশগুলোর চিত্রটা প্রায় একই রকম। অথচ শেখ শাসিত এই দেশগুলোর ইতিহাসে ব্রিটিশরা জড়িয়ে আছে শিরা-উপশিরার মতোই। সে আশঙ্কা থেকেই কিনা, কিছু স্থানীয় ঐতিহাসিক ব্রিটেনকে একদম বিদায় করে দিচ্ছেন না ইতিহাসের পাতা থেকে। তারা তাকে রাখছেন বটে, তবে তা আবির্ভূত হবে প্রথমে শোষণ ও নির্যাতক বিদেশী শক্তি কর্তৃক, পরে প্রতিরোধ স্থানীয় জনসাধারণ কর্তৃক এবং শেষে স্বাধীনতা এমন একটি চেনা গল্প নিয়ে। যেমন রক্ত ও ধ্বংসের যে হোলিখেলা অঙ্কিত হয়েছিল ফিলিস্তিন, মিসর, সাইপ্রাস বা ইয়েমেন থেকে ব্রিটিশদের পাততাড়ি গোটানোর কালে, তার ছিটেফোঁটাও কি পরিলক্ষিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের শেষ মাসগুলোতে শেখ শাসিত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ব্রিটিশদের বিদায়কালে? এমন আরো অনেক প্রশ্ন ইঙ্গিত দেয় যে ব্রিটিশ আধিপত্যকালে যা বিস্তৃত ছিল ১৮২০-১৯৭১ পর্যন্ত, ইতিহাসের স্রোত কিছু অন্য ধারায় বয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর উপকূলে।
উপসাগরীয়
দেশগুলোতে ব্রিটিশ রাজের কর্তৃত্ব হাজির হয়েছিল কীভাবে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এ অঞ্চলের শাসকরা তিন ধরনের সাহায্য চেয়েছিলেন। প্রথমটি ছিল কূটনৈতিক, যেখানে পরস্পর যুধ্যমান উপসাগরীয় শাসকদের মধ্যকার শান্তি আলোচনায় সালিশি করতে ব্রিটিশদের প্রয়োজন পড়েছিল। শুধু তা-ই নয়, আলোচনা থেকে কোনো সন্ধি বা যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে পারলে, তাতে জামানতকারী হওয়ার জন্য নিকটস্থ ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিকেই সব থেকে উপযুক্ত মনে হতো তাদের। দ্বিতীয় সাহায্যটি ছিল নৌশক্তি সম্বন্ধীয়, যেখানে সামুদ্রিক চুক্তির শর্তগুলো মানতে বাধ্য করার জন্য ব্রিটিশ দণ্ড কামনা করা হতো। আর সর্বশেষ ও তৃতীয় প্রার্থিত সাহায্যটি ছিল সামরিক, অর্থাৎ তাদের অধীন এলাকাগুলোকে স্থলপথে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। তবে এসব ছাড়াও আরো কিছু ভূমিকায় ব্রিটিশ কুশীলবরা অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গতিপথ চিরদিনের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, এঁকে দিয়েছিলেন অর্থনৈতিক ভূগোলের এক স্থায়ী মানচিত্র অনাগত কালের জন্য।
প্রথমদিকে অনিচ্ছা থাকলেও ইন্ডিয়ার ব্রিটিশ শাসক পরবর্তী সময়ে একে একে, যেমন ওমানের জন্য ১৮২৯ সালে, সমঝোতা চুক্তির আওতাধীন রাজ্যগুলোর (অধুনা সংযুক্ত আরব আমিরাত) জন্য ১৮৩৫ সালে, বাহরাইনের জন্য ১৮৬১ সালে, কুয়েতের জন্য ১৮৯৯ সালে, কাতারের জন্য ১৯১৬ সালে প্রটেক্টর বা রক্ষাকর্তার ভূমিকাটা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে আর প্রত্যাশার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই দায়িত্ব পালন করে যায়। আর একই সঙ্গে মক্কেলের দেয়া কমিটমেন্টকে যথাযথ সম্মান দেখাতে পিছুপা হয় না আলোচ্য আরব শাসকরা।
ব্রিটিশদের সঙ্গে শেখ শাসকদের সম্পর্কটা শুরু হয় সামুদ্রিক চুক্তিগুলো দিয়ে, যা অবশ্যই ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়নি, বরং শাসকদের ইচ্ছে ও প্রত্যাশার পথ বেয়েই তারা পৃথিবীর মুখ দেখেছে। এই সম্পর্কগুলো অনেকগুলো সরকারের সম্মিলিত কার্যকরণের ফল। এর মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬০০-১৮৫৮) এবং ইন্ডিয়া অফিস (১৮৫৮-১৯৪৭) পরিচালিত বম্বে ও ইন্ডিয়ার ব্রিটিশ সরকারের কূটনীতিকরা প্রাথমিক কাজগুলো করেছেন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে কাজ করেছেন লন্ডনের ফরেন অফিসের কূটনীতিকরা।
ব্রিটিশ স্বার্থ আরব উপসাগরে সীমাবদ্ধ ছিল তিনটি ক্ষেত্রে: বম্বে ও বসরার মধ্যে শিপিং লেন পরিচালনা করা, ইন্ডিয়া ও ব্রিটেনকে সংযুক্ত করা সিরিয়ার আলেপ্পোর মধ্য দিয়ে এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য নিশ্চিত করা ইরাক, ইরান ও ওমানের সঙ্গে। সুতরাং সেদিক থেকে ব্রিটিশ স্বার্থের ঢেউ পূর্ব আরবের ওমানের মাস্কাটকে ছাড়িয়ে আর ধাবিত হয়নি ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে। কিন্তু ১৭৯৭ সালে নিম্ন উপসাগরে টোল প্রথা চালু করে আরব শাসকদের একটি পরিবার, যা চাঁদাবাজি ও দস্যুতা হিসেবে বিবেচিত হয় ভারতের ব্রিটিশ সরকারের কাছে। অনেক অভিযান পরিচালনার পর অবশেষে ১৮২০ সালে ইংরেজরা একটি ‘জেনারেল ট্রিটি’ বা ‘সাধারণ চুক্তি’ করতে সক্ষম হয়, যার অধীনে হরমুজ প্রণালির কিসম দ্বীপে একজন রাজনৈতিক এজেন্ট নিয়োগ দেয়া হয় চুক্তির অধীনে ব্রিটিশ স্বার্থকে রক্ষা করতে। পরে এ পদটি ‘পলিটিক্যাল রেসিডেন্ট’ বা ‘রাজশক্তির প্রতিনিধি’ হিসেবে আখ্যায়িত হয় যার কাজ হয়ে দাঁড়ায় আরব শাসকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এক দল উপপ্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে। একই সময়ে, অর্থাৎ ১৮২১ সালে পারসিয়ান গালফ স্কোয়াড্রন গড়ে তোলা হয় উপসাগরে টহল দেয়ার জন্য।
১৮৩৫-এর মে মাসে চারজন শেখ, অর্থাৎ আবুধাবি, দুবাই, আজমান ও শারজা, রাস আল-খাইমাহ এবং লিনগাহের কাওয়াসিম সামুদ্রিক চুক্তি করলেন তত্কালিন ব্রিটিশ রেসিডেন্টের সঙ্গে, যেখানে ছয় মাস মুক্তো চাষের কালে (মে-অক্টোবর) কোনো প্রকার নৌযুদ্ধের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ চুক্তি নানা কারণে ঐতিহাসিক ছিল, পুরো উপকূলে স্বস্তির বাতাস বয়ে গিয়েছিল, কারণ ব্রিটিশ রেসিডেন্ট সত্যিকারের রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ১৮৩৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই ষান্মাসিক চুক্তিকে চিরস্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তর করার আহ্বান জানান শারজার শেখ। কিন্তু ব্রিটিশরা এটি প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তাদের মতে, আরব শাসকদের হিংসা ছয় মাসের জন্য বন্ধ করা যাবে না, যদি তারা আবার তা জাগিয়ে তুলে তৃপ্তির পথ খুঁজে না পান। ১৮৩৮ সালে বরং একটি বারো মাসের চুক্তি হয় শারজার শেখের অনুরোধে। পরে সেটির সাফল্য দশ বছরের চুক্তিতে পৌঁছে দেয় ১৮৪৩ সালে। শেখদের মনোভাব এ সময়ের মধ্যে এতটাই পরিবর্তিত হয়েছিল যে তারা আর রেসিডেন্টের মধ্যস্থতার প্রয়োজন অনুভব করছিল না, নিজেরাই প্রতিকার করছিলেন কেউ চুক্তি লঙ্ঘন করলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৫৩ সালে চিরস্থায়ী চুক্তি হয় এখনকার আরব আমিরাতের অঞ্চলগুলোর মধ্যে, যা পরে অন্য উপসাগরীয় রাজ্যগুলোও অনুসরণ করে। ১৮৩৮-এর আগে ব্রিটিশ সরকার ‘নো প্রটেকশন’ নীতি অনুসরণ করত, সেই তারাই এখন ‘ইমারজেন্সি প্রটেকশন’ নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে, যা ব্রিটিশ অনুমোদিত শাসকই শুধু ভোগ করতে পারত। ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘আনঅফিশিয়াল প্রটেকশন’ নীতি গ্রহণ করে, যা কার্যকর হবে যেকোনো শাসকের ওপর, তা সে সরকারের অনুমোদিত হোক বা না হোক। ১৮৬১ সালে বাহরাইনকে ‘চিরস্থায়ী প্রটেকশন পলিসি’র আওতায় আনা হয়, তবে শর্ত থাকে যে শাসককে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে জনগণের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে।
সামুদ্রিক চুক্তির পর রাষ্ট্রগুলো ইন্ডিয়ান ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আরো বিভিন্ন চুক্তিতে উপনীত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘এক্সক্লুসিভ এগ্রিমেন্ট’, যার
মধ্য দিয়ে বৈদেশিক নীতি বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা লোপ হয় ১৮৮০-১৯১৬-এর মধ্যে। ওমান অবশ্য এর মধ্যে আসেনি, ১৮৬২-এর অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ ডিক্লারেশনের কারণে। তবে সার্বিক বিচারে তাদের অবস্থান প্রটেকটেড স্টেটের মতোই ছিল। এক্সক্লুসিভ অ্যারেঞ্জমেন্টের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার অটোমান, জার্মান, ফরাসি ও রাশিয়ান প্রভাববলয় থেকে পূর্ব আরব উপসাগরের দেশগুলোকে মুক্ত করে আনলেন, মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে তারা কেউ নৌঘাঁটি করতে না পারে, কারণ তা ভারতে ব্রিটিশ স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক হতো। ফারুক হার্ড বে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: ‘শেখ
শাসিত দেশগুলো ও ওমান অর্ধ স্বাধীন দেশের চিত্র উপস্থাপন করে’, যাদের
অবস্থান ‘ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্ত থেকে শুরু করে এর পশ্চিমের সাগরতটের ঠিক মাঝবলয় ঘিরে’। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে তেল আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের নীতি কেন্দ্রীভূত হয় উপসাগরে ব্রিটিশ সরকারের তেল সরবরাহের নিরাপত্তাকে ঘিরে। একজন রেসিডেন্ট বা রাজপ্রতিনিধির ভাষায় এ সময় দেশগুলোকে ঘিরে ব্রিটেনের নীতি ছিল: ‘আরবের
শেখ রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা বজায় রাখা ততক্ষণ যতক্ষণ তারা আইন-শৃঙ্খলা সংরক্ষণ ও সমুন্নত করে যাবে এবং এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু রাখবে যা সন্তুষ্ট করবে বা সহ্য করে নেবে তাদের প্রজারা। যদি চাপিয়ে না দেয়া হয়, তাহলে কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো বৈদেশিক শক্তিকে প্রতিরোধ করা হবে প্রভাব সৃষ্টির প্রচেষ্টা বা কোনো বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে।’ তেলনীতি ব্রিটিশকে কাতার ও আরব আমিরাতের সঙ্গে স্থল প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করে, ভারতের স্বাধীনতার পরেও উপসাগরে থেকে যেতে প্রণোদিত করে।
আরব শাসকদের জন্য ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা নানা দিক থেকে উপকারী ছিল। প্রথমত, এতে রাজত্বে তাদের অবস্থান সংহত হয়েছে, অন্যদিকে তাদের শাসিত ভূখণ্ডের রাজনৈতিক অবস্থান ও মর্যাদা পরিবর্ধিত ও শক্তিশালী হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা প্রজা দমনে স্বৈরতান্ত্রিক পন্থা গ্রহণ করতে পেরেছে ব্রিটিশ বলে বলীয়ান হয়ে। দ্বিতীয়ত অভ্যন্তরীণ গোত্রপতি এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত অঞ্চলগুলোকে এ আরব শাসকরা তাদের অধীনে আনতে পেরেছেন, যেহেতু ওই ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর ওপর ব্রিটিশ অনুমোদন ছিল না। এভাবে করদ রাজ্য বাড়িয়ে রাজ্যের সীমা বড় করা গেছে। তবে উপসাগরীয় শাসকরা কিছু ক্ষতিরও শিকার হয়েছেন। প্রথমত, বাইরের কিছু রাজ্য যাদের তারা তাদের অংশ মনে করতেন, তাকে দখলে আনার জন্য কোনো আক্রমণ চালনা করতে পারেননি সামুদ্রিক চুক্তির শর্তকে মানতে গিয়ে। যেমন বাহরাইনের ওপর ওমানসহ অনেকেরই আগ্রহ ছিল। দ্বিতীয়ত, সামুদ্রিক ও এক্সক্লুসিভ চুক্তি অনুযায়ী, জবাবদিহির একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্পিত ছিল ব্রিটিশ রেসিডেন্টের ওপর, যখন তখন যেকোনো আরব শাসককে তিনি ডকে ডুলতে পারতেন বিচারের জন্য। তৃতীয়ত, ব্রিটিশ সরকারের উপসাগরীয় প্রতিনিধি তার ক্ষমতাবলে যেকোনো শাসককে উত্খাত করতে পারতেন, যে তার দৃষ্টিতে সাম্রাজ্যের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে না। উদাহরণস্বরূপ, বাহরাইনে তিনজন শাসককে উত্খাত করা হয়, একজন গভর্নরকে নির্বাসন দেয়া হয়। চতুর্থত, আরব শাসককে প্রায়ই দেশী প্রজা ও ব্রিটিশ প্রশাসকের পরস্পরবিরোধী স্বার্থকে মোকাবেলা করতে হতো। প্রায়ই দেখা যেত ব্রিটিশ বণিক বা ব্রিটিশ আশ্রিত ও পালিত প্রজাদের সুবিধা প্রদান করতে যেয়ে স্থানীয় প্রজাদের ঠকাতে হতো। ফলে তাদের চোখে শাসনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতো। অন্যদিকে স্থানীয় প্রজাদের সুবিধা দেখতে গিয়ে ব্রিটিশদের অবজ্ঞা করলে ব্রিটিশ আক্রমণ বা সমর্থন প্রত্যাহারের আশঙ্কা থাকত। এভাবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা নীতি আরব শাসকের মর্যাদা শক্তিশালী করলেও তার কর্তৃত্বকে ঠুনকো করে ফেলে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আরবের পুবের দেশগুলোতে ব্রিটিশ স্বার্থ সীমাবদ্ধ ছিল শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্রিটিশ জাহাজ ও প্রজাদের রক্ষা করা, ইংল্যান্ড থেকে ইন্ডিয়ার যোগাযোগ চ্যানেলকে নিরাপদ করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো, অর্থাৎ রাশিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানিকে এ অঞ্চলে নৌঘাঁটি বা অন্য স্থাপনা গড়ে তোলা থেকে বিরত রাখা। প্রথম ও বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে পূর্ব আরব নিজের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসকের কাছে। এখানে তারা বিমান ঘাঁটি, রাজকীয় নৌঘাঁটি, আরএএফ স্টেশন প্রভৃতি গড়ে তোলে। তেলের আবিষ্কার জায়গাটিকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। অবকাঠামো, বিমান চলাচল ও তেল ব্যবসার অপার সম্ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরবের তেল ও বিনিয়োগের ওপর ব্রিটিশ আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশকে সস্তায় যুক্ত করার কৌশল থেকে কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, দুবাই, শারজা ও ওমানের শাসকদের কাছ থেকে বিমানঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি পায় ব্রিটিশ শাসক। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ব্রিটেন থেকে বাগদাদ, বসরা, বাহরাইন, শারজা, গোয়াদার হয়ে ইন্ডিয়া পর্যন্ত রুটে প্যাসেঞ্জার ও ডাক সার্ভিস চালু করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় বিমানঘাঁটি সুয়েজ খাল ও রাজকীয় নৌঘাঁটির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে ব্রিটেনের উপদেশ ও সাহায্যে সব আধুনিক সরকারি দপ্তর গড়ে ওঠে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণপূর্তসহ প্রায় সবকিছুর প্রথম ডিরেক্টর ছিলেন স্থানীয় শাসকের অধীনে নিয়োজিত একজন ব্রিটিশ নাগরিক। হ্যালক্রোর মতো ব্রিটিশ ফার্ম প্রকৌশলী এবং স্থাপত্যবিদ সরবরাহ করেছে উপসাগরীয় শহরগুলোর ভবন, বিমানবন্দর ও সেতু নির্মাণে। ব্রিটিশ কাউন্সিল উপসাগরীয় দেশগুলোর মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে এবং শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছে ছাত্রদের। ১৯২০ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকার স্থানীয় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে মনোযোগী হয়ে ওঠে এবং ছয়টি স্থানীয় পুলিশ ইউনিট, তিনটি আরএএফ লেভি ইউনিট, ২০টির বেশি সামরিক ইউনিট গড়ে তোলায় সহযোগিতা করে যারা ব্রিটিশ প্রশাসকের পরিবর্তে স্থানীয় শাসকের কাছেই দায়বদ্ধ ছিল।
উপসাগরীয় শাসকদের কাছে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট একজন প্রতিনিধি মাত্র ছিলেন না, তিনি নিজেই যেন ছিলেন একজন পূর্ণ শাসক, উপসাগরের কোলজুড়ে থাকা দেশগুলোর ওপর যার ছিল একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা, যার থেকে শক্তিশালী বা প্রভাবশালী শাসকের কথা তাদের অভিধানে ছিল না। তারা তাকে রইস আল-খলজি (উপসাগরের প্রধান), ফখামাত
আল-রইস (মাননীয় প্রধান) ইত্যাদি খেতাবে ভূষিত করেন শ্রদ্ধাবনত চিত্তে। এ শ্রদ্ধার সংগত কারণ ছিল; কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পুরো সময়টা এ ব্রিটিশ অভিভাবকত্ব উপসাগরীয় দেশগুলোকে পুষ্টি জুগিয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ স্বার্থও সংরক্ষিত হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো অন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর থাবা থেকে মুক্ত থেকেছে, এর মাটি ও জল ব্রিটিশদের শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটির কাজে ব্যবহূত হয়েছে, এর তেল সম্পদ ব্রিটিশদের পুরো কুক্ষিগত থেকেছে একটা সময় পর্যন্ত। এই প্রটেকশন আরোপিত ছিল না, অন্যান্য দেশের মতো চাপিয়ে দেয়া ছিল না। উপসাগরীয় দেশগুলোর আমন্ত্রণে ভারতীয় ব্রিটিশ সরকার তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিরক্ষা দিয়েছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতার বাতাবরণ তৈরি করতে পেরেছে, উন্নত রাষ্ট্রের অবকাঠামো গড়ে দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরব জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের ওপর ভর করে এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝাঁকি খেয়েছে, কিন্তু এর শেকড় এত গভীরে প্রোথিত ছিল যে এখনো আলোচ্য দেশগুলোতে ব্রিটিশ শাসনের গন্ধ পাওয়া যায়। এর রাস্তাগুলো, দালানগুলো, উপসাগরের পানি যেন সাক্ষ্য দিতে থাকে এক নিবিড় ও অভূতপূর্ব সম্পর্কের, আশ্রিত ও আশ্রয়দাতার, যা উভয়ের ইচ্ছেতেই ঘটেছে এবং যা পারস্পরিক স্বার্থের সুতোয় শক্ত করে বাঁধা ছিল। তাই তো তাকে ছিন্ন করা যায়নি আজও, যতই চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন।
মোহাম্মদ কাজী মামুন: লেখক





