এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশরা বড় পরিবর্তন আনে ১৮৩০-এর দশকে। এ সময় থেকে হিন্দু বানিয়াদের পরিবর্তে বাহরাইন ও মাস্কাটে মুসলিম এজেন্ট নিয়োগ শুরু হয়। এ এজেন্টরা ছিলেন মূলত আরব, ইরাক ও পারস্যের বণিক। তবে কিছু এলাকায় দায়িত্ব পেয়েছিলেন ভারতের মুসলিম বণিকরা। এর মধ্যে তারা শিরাজে দায়িত্ব পালন করেন ১৮০০ থেকে ১৯০৩, মাস্কাটে ১৮৩২-৪০, বাসিদুতে ১৮৭০-৮২, গোয়াদর বন্দরে ১৮৮০-১৯৫৮ সময়কালে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের যে বণিকরা ব্রিটিশদের এজেন্ট হয়েছিলেন তারা আগে থেকেই বিভিন্নভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেসিডেন্সি স্টাফদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের বণিক পরিবারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যারা কোম্পানির এজেন্ট হয়েছিলেন তারা হলেন সফর পরিবার। ১৮২৯ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে এ পরিবারের ছয় সদস্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারত সরকারে পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন মুনশি আর একজন নায়েব। ধীরে ধীরে তারা পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। এছাড়া এ পরিবারের একজন বুশের বন্দর এবং আরেকজন ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির উপসাগরীয় স্কোয়াড্রনে মুনশি হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৩০-এর দশকে। সফর পরিবারের এ আট সদস্য হলেন মির্জা মুহাম্মদ আলী সফর (কর্মক্ষেত্র: বাহরাইন), হাজি আবদ আল-রাসুল সফর (মোখা, ইয়েমেন), হাজি মুহাম্মদ সফর (মোখা, ইয়েমেন), হাজি আবদ আল-নবী সফর (বাহরাইন), হাজি আহমাদ খান সফর (বুশের, ইরান), আগা মোহাম্মদ রহিম সফর (বুশের), মুহাম্মদ সফর (বুশের) ও আহমাদ সফর (গালফ স্কোয়াড্রন)। কয়েক প্রজন্ম ধরে সফর পরিবারের উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক পোস্টে কাজ করার ঘটনার সঙ্গে ভারতের কিছু পরিবারের সাদৃশ্য পাওয়া যায়, যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারত সরকারের হয়ে কাজ করেছেন।

এ সফর পরিবারটি উনিশ শতকে উপসাগর অঞ্চলে সমৃদ্ধিশালী এক বণিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এরা আমদানি, রফতানি, মালামাল পরিবহনের ব্যবসায় যুক্ত ছিল। চাল থেকে রাইফেল—সবকিছুই তাদের পণ্যের তালিকায়—পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে গিয়েছিল তাদের বাণিজ্য। ব্যাংকিং, ঋণ প্রদানেও তারা অগ্রগামী ছিল। এসবের সঙ্গে তাদের ছিল পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে এক কার্যকর ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। বুশের, মানামাহ, মাস্কাট, মোখা, হুদায়দাহ, মুম্বাই এমনকি হিলাহ ও বসরা বন্দরের বণিকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল।

এ রকম বণিক পরিবারগুলো অনেকটা আধুনিক কনগ্লোমারেটের মতো কাজ করত। সফর পরিবারের সদস্যরা তাদের বিভিন্ন স্থানের বাণিজ্য কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতেন। সাধারণত পিতার সঙ্গে কাজ শুরু করে তারা একসময় নিজেই স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করতেন, আবার কখনো পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগ দিতেন। কোনো ঘরের প্রধান মারা গেলে তার সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হতো। এ পরিবারের অনেক সদস্যের বাণিজ্য ও সম্পত্তি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। সফর পরিবারে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্রিটিশদের জন্য খুব মূল্যবান ছিল। ১৮৯১ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা ব্রিটিশদের এক সাধারণ এজেন্টের মন্তব্য—

 

শিগগিরই আমি ভারতে যাব, এই সুযোগে আগা মোহাম্মদ রহিম সফরের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। বহুবার তিনি নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করেছেন। এমন তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষ কৌশল, ব্যবস্থাপনা ও ব্যক্তিগত প্রভাব থাকা প্রয়োজন। তিনি বিশ্বস্ত, দায়িত্ববান, উদ্যমী। তাকে কোনো কাজ দেয়া হলে তিনি সেটা ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। স্থানীয় বিষয়াদি তিনি খুব ভালো খোঁজখবর রাখতেন। বুশেরসহ পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরে তার অনেক বন্ধু আছে। তার মাধ্যমে সবসময় সঠিক তথ্যটি পাওয়া যেত। গোপন এজেন্ট হিসেবে বুশের রেসিডেন্সির জন্য তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সমাজে তার যে প্রভাব রয়েছে তাতে জটিল কোনো বিষয়ে সমঝোতার জন্য তাকে প্রয়োজন। তাই আমি তার যোগ্যতা নিয়ে এই সাক্ষ্য দিচ্ছি।

 

সফর পরিবারের কর্মকুশলতা নিয়ে এমন অনেক প্রশংসামূলক চিঠি, বিবৃতি বাহরাইনের বুশেরি আর্কাইভে পাওয়া যায়।

উনিশ শতকে সফর পরিবারের অন্তত তিনজন সদস্য প্রথম গ্রেডের বণিক ছিলেন। এ শ্রেণীর বণিকরা উপসাগরীয় অঞ্চলে শাসকদের পরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। পরিবারটির সমৃদ্ধ অবস্থা তাদের সম্পত্তির তালিকা দেখলেও স্পষ্ট হয়। বসরা ও মানামাহতে ছিল তাদের খেজুর বাগান; বুশের, শিরাজ, মানামাহ, মাস্কাট, মোখা, হুদায়দাহ ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরে তাদের বাড়ি ও সম্পত্তি ছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনো জমি ধন ও সম্মানের প্রতীক।

সফর পরিবারের বাণিজ্য ও উপস্থিতি ইরাক, পারস্য ও ভারতে বিস্তৃত হলেও উনিশ শতকে তাদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল বুশের। এখানে তাদের বিরাট আয়তনের বাড়িটির অবস্থান ছিল উপসাগর অঞ্চলে ব্রিটেনের রাজনৈতিক রেসিডেন্ট ও স্থানীয় গভর্নরের বাড়ির পাশেই। প্রতীকীভাবে এখানে লক্ষ করা যায় সফরদের বাড়ির অবস্থান ছিল ব্রিটেনের রেসিডেন্টের কাছে আর প্রসাদোপম বাড়িটি তাদের বিপুল ধনসম্পদের ইঙ্গিত দেয়। এ বাড়ির নাম ছিল বায়েত সফর বা সফর হাউজ। পরিবারটির বংশধররা এখনো বুশেরে বসবাস করেন, তবে বাহরাইনের সফরদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক আগেই বিলোপ ঘটেছে।

ইরাক, পারস্য, বাহরাইন, ওমান, ইয়েমেন, ভারত ও ব্রিটেনের সঙ্গে নানাবিধ সম্পর্কের কারণে এ পরিবারে সদস্যরা বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয়দের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বুশেরের শরিফ পরিবারের সঙ্গে বিয়ে। ইতিহাস বলে এ দুই পরিবার একসময় একটিই ছিল।

বাহরাইনে প্রথম স্থানীয় বণিক হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া নিয়োগ করেছিল মির্জা মুহাম্মদ আলী সাফরকে। ১৮৩৪ সালে তিনি নিয়োগ পান এবং পরবর্তী আট বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে বাহরাইনে ভারতের হিন্দু বানিয়াদের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল। স্থানীয় বণিকদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করার কারণ ছিল মূলত তিনটি—ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক লাভ, কার্যক্রম সহজে পরিচালনা করার সুযোগ ও মুসলিম হিসেবে স্থানীয় শাসকের সঙ্গে সহজে সমঝোতা করতে পারা। এসব কারণে বানিয়াদের তুলনায় সফররা বেশি দায়িত্ব পেয়েছিল। সফর ছাড়াও আরো যারা ব্রিটিশদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগ ছিল শিয়া সম্প্রদায়ের। তবে আল খলিফা ছিলেন সুন্নি। তবে বাহরাইনে ব্রিটিশদের নেটিভ এজেন্সির কর্মকালের অর্ধেক সময়ই তা ছিল সফরদের হাতে। স্থানীয় শাসক শেখ ইসা আল খলিফার সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তী সময়ে ভারতে ব্রিটিশ সরকারের জন্য সফর পরিবার পারস্য উপসাগরে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

সূত্র: দি অ্যারাবিয়ান ফ্রন্টিয়ার অব দ্য ব্রিটিশরাজ, জেমস অনলে

এসএম রশিদ: লেখক